📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ইমাম আজম ও কুরআনের বিচ্ছিন্ন পাঠ (কিরাআতে শাযযাহ)

📄 ইমাম আজম ও কুরআনের বিচ্ছিন্ন পাঠ (কিরাআতে শাযযাহ)


কিছু কিছু গ্রন্থে ইমাম আজম রহ.-এর নামে আরও একটি অভিযোগ আরোপ করা হয় যে, তিনি নাকি কুরআন কারিমের কিছু আয়াতকে তাঁর নিজস্ব কেরাতে পড়তেন, যা প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কেরাতের চেয়ে ভিন্ন। যেমন—আল্লাহ তায়ালার বাণী : 'আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে (প্রকৃত) ভয় করে।' [ফাতির: ২৮] আয়াতে 'আল্লাহ' শব্দটি 'যবর' এবং 'উলামা' পেশ দিয়ে পড়া হয়। কিন্তু ইমাম আজমের ব্যাপারে বলা হয়, তিনি নাকি এর বিপরীত তথা 'আল্লাহ' শব্দের উপর 'পেশ' এবং 'উলামা' শব্দের উপর 'যবর' দিয়ে পড়তেন!

এটা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, তাতে আয়াতের অর্থ সম্পূর্ণ উলটে যায়। অর্থ দাঁড়ায়— 'আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মাঝে যারা আলেম তাদের ভয় করেন।' এটা ইমাম আজমের উপর অপবাদ। তিনি এ ধরনের কাজ থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি কেরাত শিখেছেন খোদ ইমাম আসেম রহ. থেকে। সুতরাং তিনি প্রসিদ্ধ কেরাতের বাইরে কোনো শায তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়তেন না।৯১৬

হ্যাঁ, তিনি জমহুরের মতো সাত হরফে কুরআনের অবতরণ এবং কুরআনের একাধিক কেরাতের স্বীকৃতি দিতেন। ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে মানুষের জন্য সহজ করার লক্ষ্যে সাত অক্ষরে অবতীর্ণ করেছেন। ফলে এটা তাঁর হিকমত।'৯১৭ আবু উবাইদ ও মুবাররিদের মতে, সাত অক্ষর বলতে আরবের সাতটি (আঞ্চলিক) ভাষা উদ্দেশ্য।৯১৮ কেরাতের ব্যাপারে ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই।' কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়া বৈধ। কারণ, কেরাতের ভিন্নতার ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো, কেরাতটা সালাফ থেকে প্রমাণিত হওয়া এবং অর্থ বিশুদ্ধ হওয়া। অর্থ বদলে গেলে—যেমনটা উপরের আয়াতে তাঁর নামে বলা হয়েছে—সে ধরনের কেরাত মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই। কারণ, পড়ার ভিন্নতা সত্ত্বেও এগুলোর অর্থ এক ও অভিন্ন।'৯১৯ সুতরাং যে ধরনের বিচ্ছিন্ন কেরাতে অর্থও বিকৃত হয়ে যাবে, সেটা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

উপরের উসুলের ভিত্তিতে তিনি বিভিন্ন মাসআলাতে কিরাআতে শাযযাহ তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। যেমন—শপথ ভঙ্গের কাফফারার ক্ষেত্রে ইমাম আজমের বক্তব্য হলো, টানা তিন দিন রোযা রাখতে হবে। মাঝে ফাঁকা রাখা যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি কুরআনের এই আয়াত দিয়ে দলিল দেন : 'আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য; কিন্তু পাকড়াও করেন ওই শপথের জন্য যা তোমরা মজবুত করে করো। অতএব, এর কাফফারা এই যে— দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেণির খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাকো। অথবা তাদের বস্ত্র প্রদান করবে, অথবা একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দেবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফারা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা করো। এমনইভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।' [মায়িদা : ৮৯]

এখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা স্রেফ তিন দিন রোযার কথা বলেছেন। তাহলে ইমাম আজম 'ধারাবাহিক/টানা' শর্তটা কীভাবে যোগ করলেন? বাস্তব কথা হলো, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। আর ইবনে মাসউদের কেরাতে (মুতাতাবিআত) তথা 'ধারাবাহিক'/'একটানা' তিন দিন কথাটা আছে।৯২০

প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে তো প্রমাণিত হয়েই গেলে তিনি 'বিচ্ছিন্ন কেরাতের' প্রবক্তা। আমরা বলব, না। তিনি বিচ্ছিন্ন কেরাতকে কুরআনের আয়াত হিসেবে দলিল দেননি। বরং 'খবর' তথা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবির একটি বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ বক্তব্য হিসেবে দলিল দিয়েছেন। অর্থাৎ, এমন 'বর্ধিত' কেরাত ইমাম আজমের যুগে ইবনে মাসউদ থেকে প্রসিদ্ধ ছিল। বরং বলা হয়ে থাকে, সুলাইমান আল-আ'মাশ কুরআন এক খতম করতেন ইবনে মাসউদের অক্ষরে, আরেক খতম করতেন উসমানের অক্ষরে। সে যা-ই হোক, ইবনে মাসউদ রাযি. নিঃসন্দেহে উক্ত শব্দ কুরআনে নিজ থেকে জুড়ে দেননি। এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। বরং তিনি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শুনে থাকবেন। সুতরাং এটা হাদিসের মর্যাদা পাবে এবং কুরআনের 'সংক্ষিপ্ত' আয়াতের 'ব্যাখ্যা' গণ্য হবে, যা শরয়ি বিধানের দলিল হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ। কিন্তু এটাকে মূল কুরআনের অংশ ধরে তেলাওয়াত, নামাযে বা নামাযের বাইরে পাঠ করা বৈধ নয়।৯২১

টিকাঃ
৯১৬. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৯১-২৯২)।
৯১৭. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৮৮)।
৯১৮. প্রাগুক্ত (৭৯৩)।
৯১৯. প্রাগুক্ত (৭৮৮)।
৯২০. দেখুন : আল-মানখুল, গাযালি (৩৭৪)।
৯২১. দেখুন : আল-মাবসুত, সারাখসি (৩/৭৫)। আরও দেখুন: আত-তাহরির, ইবনুল হুমাম (২৯৯)।

কিছু কিছু গ্রন্থে ইমাম আজম রহ.-এর নামে আরও একটি অভিযোগ আরোপ করা হয় যে, তিনি নাকি কুরআন কারিমের কিছু আয়াতকে তাঁর নিজস্ব কেরাতে পড়তেন, যা প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কেরাতের চেয়ে ভিন্ন। যেমন—আল্লাহ তায়ালার বাণী : 'আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে (প্রকৃত) ভয় করে।' [ফাতির: ২৮] আয়াতে 'আল্লাহ' শব্দটি 'যবর' এবং 'উলামা' পেশ দিয়ে পড়া হয়। কিন্তু ইমাম আজমের ব্যাপারে বলা হয়, তিনি নাকি এর বিপরীত তথা 'আল্লাহ' শব্দের উপর 'পেশ' এবং 'উলামা' শব্দের উপর 'যবর' দিয়ে পড়তেন!

এটা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, তাতে আয়াতের অর্থ সম্পূর্ণ উলটে যায়। অর্থ দাঁড়ায়— 'আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মাঝে যারা আলেম তাদের ভয় করেন।' এটা ইমাম আজমের উপর অপবাদ। তিনি এ ধরনের কাজ থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি কেরাত শিখেছেন খোদ ইমাম আসেম রহ. থেকে। সুতরাং তিনি প্রসিদ্ধ কেরাতের বাইরে কোনো শায তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়তেন না।৯১৬

হ্যাঁ, তিনি জমহুরের মতো সাত হরফে কুরআনের অবতরণ এবং কুরআনের একাধিক কেরাতের স্বীকৃতি দিতেন। ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে মানুষের জন্য সহজ করার লক্ষ্যে সাত অক্ষরে অবতীর্ণ করেছেন। ফলে এটা তাঁর হিকমত।'৯১৭ আবু উবাইদ ও মুবাররিদের মতে, সাত অক্ষর বলতে আরবের সাতটি (আঞ্চলিক) ভাষা উদ্দেশ্য।৯১৮ কেরাতের ব্যাপারে ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই।' কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়া বৈধ। কারণ, কেরাতের ভিন্নতার ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো, কেরাতটা সালাফ থেকে প্রমাণিত হওয়া এবং অর্থ বিশুদ্ধ হওয়া। অর্থ বদলে গেলে—যেমনটা উপরের আয়াতে তাঁর নামে বলা হয়েছে—সে ধরনের কেরাত মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই। কারণ, পড়ার ভিন্নতা সত্ত্বেও এগুলোর অর্থ এক ও অভিন্ন।'৯১৯ সুতরাং যে ধরনের বিচ্ছিন্ন কেরাতে অর্থও বিকৃত হয়ে যাবে, সেটা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

উপরের উসুলের ভিত্তিতে তিনি বিভিন্ন মাসআলাতে কিরাআতে শাযযাহ তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। যেমন—শপথ ভঙ্গের কাফফারার ক্ষেত্রে ইমাম আজমের বক্তব্য হলো, টানা তিন দিন রোযা রাখতে হবে। মাঝে ফাঁকা রাখা যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি কুরআনের এই আয়াত দিয়ে দলিল দেন : 'আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য; কিন্তু পাকড়াও করেন ওই শপথের জন্য যা তোমরা মজবুত করে করো। অতএব, এর কাফফারা এই যে— দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেণির খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাকো। অথবা তাদের বস্ত্র প্রদান করবে, অথবা একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দেবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফারা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা করো। এমনইভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।' [মায়িদা : ৮৯]

এখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা স্রেফ তিন দিন রোযার কথা বলেছেন। তাহলে ইমাম আজম 'ধারাবাহিক/টানা' শর্তটা কীভাবে যোগ করলেন? বাস্তব কথা হলো, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। আর ইবনে মাসউদের কেরাতে (মুতাতাবিআত) তথা 'ধারাবাহিক'/'একটানা' তিন দিন কথাটা আছে।৯২০

প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে তো প্রমাণিত হয়েই গেলে তিনি 'বিচ্ছিন্ন কেরাতের' প্রবক্তা। আমরা বলব, না। তিনি বিচ্ছিন্ন কেরাতকে কুরআনের আয়াত হিসেবে দলিল দেননি। বরং 'খবর' তথা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবির একটি বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ বক্তব্য হিসেবে দলিল দিয়েছেন। অর্থাৎ, এমন 'বর্ধিত' কেরাত ইমাম আজমের যুগে ইবনে মাসউদ থেকে প্রসিদ্ধ ছিল। বরং বলা হয়ে থাকে, সুলাইমান আল-আ'মাশ কুরআন এক খতম করতেন ইবনে মাসউদের অক্ষরে, আরেক খতম করতেন উসমানের অক্ষরে। সে যা-ই হোক, ইবনে মাসউদ রাযি. নিঃসন্দেহে উক্ত শব্দ কুরআনে নিজ থেকে জুড়ে দেননি। এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। বরং তিনি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শুনে থাকবেন। সুতরাং এটা হাদিসের মর্যাদা পাবে এবং কুরআনের 'সংক্ষিপ্ত' আয়াতের 'ব্যাখ্যা' গণ্য হবে, যা শরয়ি বিধানের দলিল হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ। কিন্তু এটাকে মূল কুরআনের অংশ ধরে তেলাওয়াত, নামাযে বা নামাযের বাইরে পাঠ করা বৈধ নয়।৯২১

টিকাঃ
৯১৬. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৯১-২৯২)।
৯১৭. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৮৮)।
৯১৮. প্রাগুক্ত (৭৯৩)।
৯১৯. প্রাগুক্ত (৭৮৮)।
৯২০. দেখুন : আল-মানখুল, গাযালি (৩৭৪)।
৯২১. দেখুন : আল-মাবসুত, সারাখসি (৩/৭৫)। আরও দেখুন: আত-তাহরির, ইবনুল হুমাম (২৯৯)।

কিছু কিছু গ্রন্থে ইমাম আজম রহ.-এর নামে আরও একটি অভিযোগ আরোপ করা হয় যে, তিনি নাকি কুরআন কারিমের কিছু আয়াতকে তাঁর নিজস্ব কেরাতে পড়তেন, যা প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কেরাতের চেয়ে ভিন্ন। যেমন—আল্লাহ তায়ালার বাণী : 'আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে (প্রকৃত) ভয় করে।' [ফাতির: ২৮] আয়াতে 'আল্লাহ' শব্দটি 'যবর' এবং 'উলামা' পেশ দিয়ে পড়া হয়। কিন্তু ইমাম আজমের ব্যাপারে বলা হয়, তিনি নাকি এর বিপরীত তথা 'আল্লাহ' শব্দের উপর 'পেশ' এবং 'উলামা' শব্দের উপর 'যবর' দিয়ে পড়তেন!

এটা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, তাতে আয়াতের অর্থ সম্পূর্ণ উলটে যায়। অর্থ দাঁড়ায়— 'আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মাঝে যারা আলেম তাদের ভয় করেন।' এটা ইমাম আজমের উপর অপবাদ। তিনি এ ধরনের কাজ থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি কেরাত শিখেছেন খোদ ইমাম আসেম রহ. থেকে। সুতরাং তিনি প্রসিদ্ধ কেরাতের বাইরে কোনো শায তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়তেন না।৯১৬

হ্যাঁ, তিনি জমহুরের মতো সাত হরফে কুরআনের অবতরণ এবং কুরআনের একাধিক কেরাতের স্বীকৃতি দিতেন। ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে মানুষের জন্য সহজ করার লক্ষ্যে সাত অক্ষরে অবতীর্ণ করেছেন। ফলে এটা তাঁর হিকমত।'৯১৭ আবু উবাইদ ও মুবাররিদের মতে, সাত অক্ষর বলতে আরবের সাতটি (আঞ্চলিক) ভাষা উদ্দেশ্য।৯১৮ কেরাতের ব্যাপারে ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই।' কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়া বৈধ। কারণ, কেরাতের ভিন্নতার ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো, কেরাতটা সালাফ থেকে প্রমাণিত হওয়া এবং অর্থ বিশুদ্ধ হওয়া। অর্থ বদলে গেলে—যেমনটা উপরের আয়াতে তাঁর নামে বলা হয়েছে—সে ধরনের কেরাত মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই। কারণ, পড়ার ভিন্নতা সত্ত্বেও এগুলোর অর্থ এক ও অভিন্ন।'৯১৯ সুতরাং যে ধরনের বিচ্ছিন্ন কেরাতে অর্থও বিকৃত হয়ে যাবে, সেটা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

উপরের উসুলের ভিত্তিতে তিনি বিভিন্ন মাসআলাতে কিরাআতে শাযযাহ তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। যেমন—শপথ ভঙ্গের কাফফারার ক্ষেত্রে ইমাম আজমের বক্তব্য হলো, টানা তিন দিন রোযা রাখতে হবে। মাঝে ফাঁকা রাখা যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি কুরআনের এই আয়াত দিয়ে দলিল দেন : 'আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য; কিন্তু পাকড়াও করেন ওই শপথের জন্য যা তোমরা মজবুত করে করো। অতএব, এর কাফফারা এই যে— দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেণির খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাকো। অথবা তাদের বস্ত্র প্রদান করবে, অথবা একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দেবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফারা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা করো। এমনইভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।' [মায়িদা : ৮৯]

এখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা স্রেফ তিন দিন রোযার কথা বলেছেন। তাহলে ইমাম আজম 'ধারাবাহিক/টানা' শর্তটা কীভাবে যোগ করলেন? বাস্তব কথা হলো, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। আর ইবনে মাসউদের কেরাতে (মুতাতাবিআত) তথা 'ধারাবাহিক'/'একটানা' তিন দিন কথাটা আছে।৯২০

প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে তো প্রমাণিত হয়েই গেলে তিনি 'বিচ্ছিন্ন কেরাতের' প্রবক্তা। আমরা বলব, না। তিনি বিচ্ছিন্ন কেরাতকে কুরআনের আয়াত হিসেবে দলিল দেননি। বরং 'খবর' তথা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবির একটি বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ বক্তব্য হিসেবে দলিল দিয়েছেন। অর্থাৎ, এমন 'বর্ধিত' কেরাত ইমাম আজমের যুগে ইবনে মাসউদ থেকে প্রসিদ্ধ ছিল। বরং বলা হয়ে থাকে, সুলাইমান আল-আ'মাশ কুরআন এক খতম করতেন ইবনে মাসউদের অক্ষরে, আরেক খতম করতেন উসমানের অক্ষরে। সে যা-ই হোক, ইবনে মাসউদ রাযি. নিঃসন্দেহে উক্ত শব্দ কুরআনে নিজ থেকে জুড়ে দেননি। এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। বরং তিনি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শুনে থাকবেন। সুতরাং এটা হাদিসের মর্যাদা পাবে এবং কুরআনের 'সংক্ষিপ্ত' আয়াতের 'ব্যাখ্যা' গণ্য হবে, যা শরয়ি বিধানের দলিল হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ। কিন্তু এটাকে মূল কুরআনের অংশ ধরে তেলাওয়াত, নামাযে বা নামাযের বাইরে পাঠ করা বৈধ নয়।৯২১

টিকাঃ
৯১৬. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৯১-২৯২)।
৯১৭. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৮৮)।
৯১৮. প্রাগুক্ত (৭৯৩)।
৯১৯. প্রাগুক্ত (৭৮৮)।
৯২০. দেখুন : আল-মানখুল, গাযালি (৩৭৪)।
৯২১. দেখুন : আল-মাবসুত, সারাখসি (৩/৭৫)। আরও দেখুন: আত-তাহরির, ইবনুল হুমাম (২৯৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00