📄 ইমাম আজম কি ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াত বৈধ বলতেন?
ইমাম আজম রহ.-এর উপর কুরআনকেন্দ্রিক আরেকটি অভিযোগ আরোপ করা হয়। সেটা হলো, তিনি নাকি নামাযের ভিতরে ফারসিতে কুরআন পাঠ করতে বলেছেন! যতটুকু বোঝা যায়, মূল বিষয়টি ইমাম থেকে প্রমাণিত। কিন্তু অভিযোগকারীরা তাঁর বক্তব্য ভুল বুঝেছেন এবং ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাস্তবে ইমাম ফারসিতে কুরআন পড়ার মত দিয়েছিলেন, কিন্তু কুরআন তো আরবি। তাহলে ফারসিতে পড়া হবে কী করে? বোঝা গেল, মতটি ছিল ফারসিতে কুরআন পড়া নয়, বরং কুরআনের অনুবাদ পড়া। তা ছাড়া, এটা তিনি তাদের জন্য রুখসত (সুযোগ) দিয়েছিলেন যারা আরবি পড়তে পারে না। সুতরাং এমন ব্যক্তি নীরব থাকার পরিবর্তে কুরআনের যা-কিছু বোঝে সেটা বলবে কিংবা যেকোনো জিকির পড়বে—এটুকুই। সেটা ফারসি, ইংরেজি, উর্দু বা বাংলা যে ভাষাতেই হোক। এটাকে উন্মুক্তভাবে নামাযে ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের বৈধতা নামে প্রচার করা যথাযথ নয়। কারণ, যে ব্যক্তি আরবিতে কুরআন পড়তে সক্ষম, তাকে আরবিতেই পড়তে হবে।৯০৮
ফারসিতে কুরআন পড়ার বৈধতার কথা বলা ইমামের জ্ঞানগত দুর্বলতা নয়; বরং দূরদর্শিতা এবং ইসলামের সর্বজনীনতার প্রমাণ। এতে ইসলামের প্রশস্ততা এবং মাতৃভাষায় ইসলাম চর্চার নবদিগন্ত উন্মোচনের আভাষ ছিল। ফলে ইমাম ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের অনুমতি দেন। স্রেফ কুরআন তেলাওয়াত নয়, নামাযের তাকবির, হজের তালবিয়া, পশু যবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ ইত্যাদিও যদি কেউ আরবিতে না পেরে ফারসি বা নিজস্ব অন্য যেকোনো ভাষায় দেয়, সেটাকে বৈধ ঘোষণা করেন।৯০৯
এটা ইমামের মনগড়া বিদআত ছিল না, বরং সুন্নাহ ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিসের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রিফাআহ ইবনে রাফে রাযি. থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসে এক গ্রাম্য সাহাবিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক নামায শেখানোর বর্ণনায় এসেছে, “... (নামাযে) তাকবির বলার পরে যদি তোমার কুরআনের কিছু জানা থাকে, তবে সেটা পড়ো। না থাকলে 'সুবহানাল্লাহ', 'আল্লাহ আকবার', 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলো।”৯১০
আলেমরা উক্ত হাদিস থেকে ইজতিহাদ করেছেন—নামাযে কুরআন পড়া আবশ্যক। অথচ ওজর থাকার কারণে সে ক্ষেত্রে 'রুখসত' তথা ছাড় দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনো নওমুসলিম কিংবা যৌক্তিক ওজরের কারণে কোনো সাধারণ মুসলিম যদি আরবিতে আল্লাহর যিকিরগুলো করতেও অক্ষম হয়, তবে সে যিকিরগুলো নিজের ভাষায় করতে পারবে, ঠিক কালিমার মতো। কোনো অমুসলিম যদি ইসলামে প্রবেশ করতে চায়, তবে তাকে 'কালিমা' পাঠ করতে হয়। কিন্তু সে যদি আরবি কালিমা পাঠ না করতে পারে, বরং নিজের মাতৃভাষায় কালিমার অর্থ স্বীকৃতি দেয়, তবে সে মুমিন গণ্য হবে। কারণ, মূল উদ্দেশ্য তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া। আর সেটা অন্য ভাষাতেও সম্ভব।৯১১
তবে জটিলতা হলো, কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায়—আরবিতে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফারসিতে কেরাত পড়ার বৈধতা দিয়েছেন! কাসানি লিখেন, 'আবু হানিফার মতে, আরবির মতো ফারসিতেও (নামাযে) কেরাত পড়া বৈধ। আরবি পারুক না পারুক সেটা বিবেচ্য নয়। বিপরীতে আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর মতে, আরবি পারলে ফারসিতে বৈধ হবে না। আরবি না পারলে বৈধ হবে। ইমাম শাফেয়ির মত আরও ভিন্ন। তিনি বলেন, আরবি পারুক না পারুক, কোনো অবস্থাতেই ফারসিতে কিছু পড়া যাবে না। যদি আরবি না পারে, তবে তাসবিহ পড়বে। তবুও ফারসিতে কেরাত পড়বে না।' প্রশ্ন আসতে পারে, যদি ইমাম থেকে এই বর্ণনা বিশুদ্ধ হয়, তবে তিনি কীসের ভিত্তিতে আরবি পারা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন পাঠের বৈধতা দিলেন?
মূলত এ প্রশ্নের জবাবই উক্ত ফিকহি মাসআলাকে আকিদার মাসআলায় পরিণত করে। মুতাকাল্লিমিন হানাফি ফকিহগণ মনে করেন, ইমাম আজমের কাছে কুরআন আরবি শব্দগুলো নয়; বরং আল্লাহর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান সিফাতে কালাম হলো মূল কুরআন। শব্দগুলো সেগুলোর নির্দেশক মাত্র। সুতরাং নামাযে কুরআন পাঠের নির্দেশ আল্লাহর সঙ্গে বিদ্যমান সেই অর্থ পাঠ করা উদ্দেশ্য, যা আরবিতে যেমন সম্ভব, অন্য ভাষাতেও সম্ভব। (এ জন্য ইমাম আজম এবং কোনো কোনো বর্ণনামতে আবু ইউসুফের বক্তব্য হলো—কুরআনি ইজায স্রেফ আরবি ছন্দের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়)... ফলে যে ভাষাতেই কুরআনের অর্থগুলো উচ্চারণ করা হবে, সেটাকেই কুরআন বলা যাবে! সুতরাং—কাসানি লিখেন—ইমাম আজমের কথাই শুদ্ধ। একই কথা প্রযোজ্য তাশাহহুদ, জুমার খুতবা, যবাইয়ের সময় (অন্য ভাষায়) বিসমিল্লাহ পড়া, তালবিয়া পড়ার ক্ষেত্রেও। বরং কারও কারও মতে, আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় আজান দেওয়াও বৈধ, যদি মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারে।৯১২
কিন্তু কাসানির উক্ত বক্তব্য উন্মুক্তভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং ইমাম আজম থেকে উক্ত মত (আরবিতে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন বৈধতা) প্রমাণিত ধরা হলেও সেটা স্বীকৃত বক্তব্য নয়। এক্ষেত্রে তাঁর দুই শাগরেদ ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের বক্তব্য বিশুদ্ধ। বরং বলা হয়ে থাকে, সর্বশেষে ইমাম আজম উক্ত উন্মুক্ত মত প্রত্যাহার করে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেন। বাযদাবি বর্ণনা করেন, 'ইমাম আজমের বিশুদ্ধ মাযহাব হলো কুরআন ছন্দ ও অর্থ দুটোর সমন্বয়।'৯১৩ সুতরাং আরবিতে সক্ষমতা থাকলে ফারসি বা অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। এভাবে এটা হানাফি ইমামদের সর্বসম্মত বক্তব্যে পরিণত হয়।
একই কথা অন্যান্য যিকিরের ক্ষেত্রেও—আরবিতে সক্ষম হলে অন্য ভাষায় করবে না। ইবনে আবিদিন 'সিরাজিয়্যাহ'র উদ্ধৃতিতে লিখেছেন, 'ফারসি (তথা অনারবি ভাষায়) আজান দেওয়া বিশুদ্ধ নয়। মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারলেও বিশুদ্ধ হবে না।'৯১৪ কারণ, ইবাদতটা এভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হয়েছে। আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআন স্রেফ অর্থ নয়; বরং অর্থ ও ছন্দ/শব্দ (নযম) দুটোর সমন্বয়ে আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ আমাদের এটাই পড়তে বলেছেন। এগুলো আরবিতে যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, সেভাবে পড়লেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) প্রতি শব্দে দশটি পুণ্যের ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা এই আরবি কুরআনকেই সুরক্ষিত রাখার ঘোষণা করেছেন। একটি শব্দও তাতে বেশি-কম হবে না। অথচ অনুবাদে মুহূর্তে মুহূর্তে ভাষায় ভাষায় পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও বিকৃতির আশঙ্কা প্রবল। বরং অন্য ধর্মগ্রন্থগুলো বিকৃতির অন্যতম কারণ ছিল শব্দগুলোকে হেফাজত না করা, অর্থের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা। এ জন্য কুরআনকে আল্লাহ শব্দ ও অর্থ দুটোসহই হেফাজত করবেন।
মোটকথা, কুরআনের শব্দ ও অর্থ দুটোকেই আল্লাহ তায়ালা কুরআন হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং নামাযে এই কুরআনই পড়তে হবে যা ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.সহ সকল আলেমের মত। ইমাম আজম থেকে বিপরীতটা বর্ণিত থাকলেও তিনি পরবর্তীকালে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেছেন বলে ধরা হবে। তাই আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। হ্যাঁ, আরবি কুরআন না পারলে যেহেতু রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাসবিহ, তাহলিল তথা যিকির করতে বলেছেন, আর যিকির অন্য ভাষাতেও বৈধ, সুতরাং তখন (অক্ষম অবস্থায়) নিজস্ব মাতৃভাষায় কুরআনের যিকিরসংক্রান্ত আয়াতগুলোর অনুবাদ পড়া বৈধ হবে।৯১৫
টিকাঃ
৯০৮. দেখুন: ইলাউস সুনান (৪/১৪৮-১৫০)।
৯০৯. দেখুন : আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১০. আবু দাউদ (কিতাবুস সালাত/বাবু সালাতি মান লা ইউকিমু সুলবাহ : ৮৫৬)। তিরমিযি (আবওয়াবুস সালাত : ৩০২)।
৯১১. আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১২. দেখুন: বাদায়েউস সানায়ে' (১/১১২-১১৩)। আরও দেখুন: আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (৭৮-৭৯)।
৯১৩. কাশফুল আসরার (১/২৪)।
৯১৪. রদ্দুল মুহতার (১/৩৮৩, ৪৮৪)।
৯১৫. রদ্দুল মুহতার (১/৪৮৫)।
ইমাম আজম রহ.-এর উপর কুরআনকেন্দ্রিক আরেকটি অভিযোগ আরোপ করা হয়। সেটা হলো, তিনি নাকি নামাযের ভিতরে ফারসিতে কুরআন পাঠ করতে বলেছেন! যতটুকু বোঝা যায়, মূল বিষয়টি ইমাম থেকে প্রমাণিত। কিন্তু অভিযোগকারীরা তাঁর বক্তব্য ভুল বুঝেছেন এবং ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাস্তবে ইমাম ফারসিতে কুরআন পড়ার মত দিয়েছিলেন, কিন্তু কুরআন তো আরবি। তাহলে ফারসিতে পড়া হবে কী করে? বোঝা গেল, মতটি ছিল ফারসিতে কুরআন পড়া নয়, বরং কুরআনের অনুবাদ পড়া। তা ছাড়া, এটা তিনি তাদের জন্য রুখসত (সুযোগ) দিয়েছিলেন যারা আরবি পড়তে পারে না। সুতরাং এমন ব্যক্তি নীরব থাকার পরিবর্তে কুরআনের যা-কিছু বোঝে সেটা বলবে কিংবা যেকোনো জিকির পড়বে—এটুকুই। সেটা ফারসি, ইংরেজি, উর্দু বা বাংলা যে ভাষাতেই হোক। এটাকে উন্মুক্তভাবে নামাযে ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের বৈধতা নামে প্রচার করা যথাযথ নয়। কারণ, যে ব্যক্তি আরবিতে কুরআন পড়তে সক্ষম, তাকে আরবিতেই পড়তে হবে।৯০৮
ফারসিতে কুরআন পড়ার বৈধতার কথা বলা ইমামের জ্ঞানগত দুর্বলতা নয়; বরং দূরদর্শিতা এবং ইসলামের সর্বজনীনতার প্রমাণ। এতে ইসলামের প্রশস্ততা এবং মাতৃভাষায় ইসলাম চর্চার নবদিগন্ত উন্মোচনের আভাষ ছিল। ফলে ইমাম ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের অনুমতি দেন। স্রেফ কুরআন তেলাওয়াত নয়, নামাযের তাকবির, হজের তালবিয়া, পশু যবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ ইত্যাদিও যদি কেউ আরবিতে না পেরে ফারসি বা নিজস্ব অন্য যেকোনো ভাষায় দেয়, সেটাকে বৈধ ঘোষণা করেন।৯০৯
এটা ইমামের মনগড়া বিদআত ছিল না, বরং সুন্নাহ ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিসের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রিফাআহ ইবনে রাফে রাযি. থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসে এক গ্রাম্য সাহাবিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক নামায শেখানোর বর্ণনায় এসেছে, “... (নামাযে) তাকবির বলার পরে যদি তোমার কুরআনের কিছু জানা থাকে, তবে সেটা পড়ো। না থাকলে 'সুবহানাল্লাহ', 'আল্লাহ আকবার', 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলো।”৯১০
আলেমরা উক্ত হাদিস থেকে ইজতিহাদ করেছেন—নামাযে কুরআন পড়া আবশ্যক। অথচ ওজর থাকার কারণে সে ক্ষেত্রে 'রুখসত' তথা ছাড় দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনো নওমুসলিম কিংবা যৌক্তিক ওজরের কারণে কোনো সাধারণ মুসলিম যদি আরবিতে আল্লাহর যিকিরগুলো করতেও অক্ষম হয়, তবে সে যিকিরগুলো নিজের ভাষায় করতে পারবে, ঠিক কালিমার মতো। কোনো অমুসলিম যদি ইসলামে প্রবেশ করতে চায়, তবে তাকে 'কালিমা' পাঠ করতে হয়। কিন্তু সে যদি আরবি কালিমা পাঠ না করতে পারে, বরং নিজের মাতৃভাষায় কালিমার অর্থ স্বীকৃতি দেয়, তবে সে মুমিন গণ্য হবে। কারণ, মূল উদ্দেশ্য তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া। আর সেটা অন্য ভাষাতেও সম্ভব।৯১১
তবে জটিলতা হলো, কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায়—আরবিতে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফারসিতে কেরাত পড়ার বৈধতা দিয়েছেন! কাসানি লিখেন, 'আবু হানিফার মতে, আরবির মতো ফারসিতেও (নামাযে) কেরাত পড়া বৈধ। আরবি পারুক না পারুক সেটা বিবেচ্য নয়। বিপরীতে আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর মতে, আরবি পারলে ফারসিতে বৈধ হবে না। আরবি না পারলে বৈধ হবে। ইমাম শাফেয়ির মত আরও ভিন্ন। তিনি বলেন, আরবি পারুক না পারুক, কোনো অবস্থাতেই ফারসিতে কিছু পড়া যাবে না। যদি আরবি না পারে, তবে তাসবিহ পড়বে। তবুও ফারসিতে কেরাত পড়বে না।' প্রশ্ন আসতে পারে, যদি ইমাম থেকে এই বর্ণনা বিশুদ্ধ হয়, তবে তিনি কীসের ভিত্তিতে আরবি পারা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন পাঠের বৈধতা দিলেন?
মূলত এ প্রশ্নের জবাবই উক্ত ফিকহি মাসআলাকে আকিদার মাসআলায় পরিণত করে। মুতাকাল্লিমিন হানাফি ফকিহগণ মনে করেন, ইমাম আজমের কাছে কুরআন আরবি শব্দগুলো নয়; বরং আল্লাহর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান সিফাতে কালাম হলো মূল কুরআন। শব্দগুলো সেগুলোর নির্দেশক মাত্র। সুতরাং নামাযে কুরআন পাঠের নির্দেশ আল্লাহর সঙ্গে বিদ্যমান সেই অর্থ পাঠ করা উদ্দেশ্য, যা আরবিতে যেমন সম্ভব, অন্য ভাষাতেও সম্ভব। (এ জন্য ইমাম আজম এবং কোনো কোনো বর্ণনামতে আবু ইউসুফের বক্তব্য হলো—কুরআনি ইজায স্রেফ আরবি ছন্দের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়)... ফলে যে ভাষাতেই কুরআনের অর্থগুলো উচ্চারণ করা হবে, সেটাকেই কুরআন বলা যাবে! সুতরাং—কাসানি লিখেন—ইমাম আজমের কথাই শুদ্ধ। একই কথা প্রযোজ্য তাশাহহুদ, জুমার খুতবা, যবাইয়ের সময় (অন্য ভাষায়) বিসমিল্লাহ পড়া, তালবিয়া পড়ার ক্ষেত্রেও। বরং কারও কারও মতে, আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় আজান দেওয়াও বৈধ, যদি মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারে।৯১২
কিন্তু কাসানির উক্ত বক্তব্য উন্মুক্তভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং ইমাম আজম থেকে উক্ত মত (আরবিতে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন বৈধতা) প্রমাণিত ধরা হলেও সেটা স্বীকৃত বক্তব্য নয়। এক্ষেত্রে তাঁর দুই শাগরেদ ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের বক্তব্য বিশুদ্ধ। বরং বলা হয়ে থাকে, সর্বশেষে ইমাম আজম উক্ত উন্মুক্ত মত প্রত্যাহার করে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেন। বাযদাবি বর্ণনা করেন, 'ইমাম আজমের বিশুদ্ধ মাযহাব হলো কুরআন ছন্দ ও অর্থ দুটোর সমন্বয়।'৯১৩ সুতরাং আরবিতে সক্ষমতা থাকলে ফারসি বা অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। এভাবে এটা হানাফি ইমামদের সর্বসম্মত বক্তব্যে পরিণত হয়।
একই কথা অন্যান্য যিকিরের ক্ষেত্রেও—আরবিতে সক্ষম হলে অন্য ভাষায় করবে না। ইবনে আবিদিন 'সিরাজিয়্যাহ'র উদ্ধৃতিতে লিখেছেন, 'ফারসি (তথা অনারবি ভাষায়) আজান দেওয়া বিশুদ্ধ নয়। মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারলেও বিশুদ্ধ হবে না।'৯১৪ কারণ, ইবাদতটা এভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হয়েছে। আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআন স্রেফ অর্থ নয়; বরং অর্থ ও ছন্দ/শব্দ (নযম) দুটোর সমন্বয়ে আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ আমাদের এটাই পড়তে বলেছেন। এগুলো আরবিতে যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, সেভাবে পড়লেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) প্রতি শব্দে দশটি পুণ্যের ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা এই আরবি কুরআনকেই সুরক্ষিত রাখার ঘোষণা করেছেন। একটি শব্দও তাতে বেশি-কম হবে না। অথচ অনুবাদে মুহূর্তে মুহূর্তে ভাষায় ভাষায় পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও বিকৃতির আশঙ্কা প্রবল। বরং অন্য ধর্মগ্রন্থগুলো বিকৃতির অন্যতম কারণ ছিল শব্দগুলোকে হেফাজত না করা, অর্থের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা। এ জন্য কুরআনকে আল্লাহ শব্দ ও অর্থ দুটোসহই হেফাজত করবেন।
মোটকথা, কুরআনের শব্দ ও অর্থ দুটোকেই আল্লাহ তায়ালা কুরআন হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং নামাযে এই কুরআনই পড়তে হবে যা ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.সহ সকল আলেমের মত। ইমাম আজম থেকে বিপরীতটা বর্ণিত থাকলেও তিনি পরবর্তীকালে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেছেন বলে ধরা হবে। তাই আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। হ্যাঁ, আরবি কুরআন না পারলে যেহেতু রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাসবিহ, তাহলিল তথা যিকির করতে বলেছেন, আর যিকির অন্য ভাষাতেও বৈধ, সুতরাং তখন (অক্ষম অবস্থায়) নিজস্ব মাতৃভাষায় কুরআনের যিকিরসংক্রান্ত আয়াতগুলোর অনুবাদ পড়া বৈধ হবে।৯১৫
টিকাঃ
৯০৮. দেখুন: ইলাউস সুনান (৪/১৪৮-১৫০)।
৯০৯. দেখুন : আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১০. আবু দাউদ (কিতাবুস সালাত/বাবু সালাতি মান লা ইউকিমু সুলবাহ : ৮৫৬)। তিরমিযি (আবওয়াবুস সালাত : ৩০২)।
৯১১. আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১২. দেখুন: বাদায়েউস সানায়ে' (১/১১২-১১৩)। আরও দেখুন: আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (৭৮-৭৯)।
৯১৩. কাশফুল আসরার (১/২৪)।
৯১৪. রদ্দুল মুহতার (১/৩৮৩, ৪৮৪)।
৯১৫. রদ্দুল মুহতার (১/৪৮৫)।
ইমাম আজম রহ.-এর উপর কুরআনকেন্দ্রিক আরেকটি অভিযোগ আরোপ করা হয়। সেটা হলো, তিনি নাকি নামাযের ভিতরে ফারসিতে কুরআন পাঠ করতে বলেছেন! যতটুকু বোঝা যায়, মূল বিষয়টি ইমাম থেকে প্রমাণিত। কিন্তু অভিযোগকারীরা তাঁর বক্তব্য ভুল বুঝেছেন এবং ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাস্তবে ইমাম ফারসিতে কুরআন পড়ার মত দিয়েছিলেন, কিন্তু কুরআন তো আরবি। তাহলে ফারসিতে পড়া হবে কী করে? বোঝা গেল, মতটি ছিল ফারসিতে কুরআন পড়া নয়, বরং কুরআনের অনুবাদ পড়া। তা ছাড়া, এটা তিনি তাদের জন্য রুখসত (সুযোগ) দিয়েছিলেন যারা আরবি পড়তে পারে না। সুতরাং এমন ব্যক্তি নীরব থাকার পরিবর্তে কুরআনের যা-কিছু বোঝে সেটা বলবে কিংবা যেকোনো জিকির পড়বে—এটুকুই। সেটা ফারসি, ইংরেজি, উর্দু বা বাংলা যে ভাষাতেই হোক। এটাকে উন্মুক্তভাবে নামাযে ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের বৈধতা নামে প্রচার করা যথাযথ নয়। কারণ, যে ব্যক্তি আরবিতে কুরআন পড়তে সক্ষম, তাকে আরবিতেই পড়তে হবে।৯০৮
ফারসিতে কুরআন পড়ার বৈধতার কথা বলা ইমামের জ্ঞানগত দুর্বলতা নয়; বরং দূরদর্শিতা এবং ইসলামের সর্বজনীনতার প্রমাণ। এতে ইসলামের প্রশস্ততা এবং মাতৃভাষায় ইসলাম চর্চার নবদিগন্ত উন্মোচনের আভাষ ছিল। ফলে ইমাম ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের অনুমতি দেন। স্রেফ কুরআন তেলাওয়াত নয়, নামাযের তাকবির, হজের তালবিয়া, পশু যবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ ইত্যাদিও যদি কেউ আরবিতে না পেরে ফারসি বা নিজস্ব অন্য যেকোনো ভাষায় দেয়, সেটাকে বৈধ ঘোষণা করেন।৯০৯
এটা ইমামের মনগড়া বিদআত ছিল না, বরং সুন্নাহ ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিসের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রিফাআহ ইবনে রাফে রাযি. থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসে এক গ্রাম্য সাহাবিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক নামায শেখানোর বর্ণনায় এসেছে, “... (নামাযে) তাকবির বলার পরে যদি তোমার কুরআনের কিছু জানা থাকে, তবে সেটা পড়ো। না থাকলে 'সুবহানাল্লাহ', 'আল্লাহ আকবার', 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলো।”৯১০
আলেমরা উক্ত হাদিস থেকে ইজতিহাদ করেছেন—নামাযে কুরআন পড়া আবশ্যক। অথচ ওজর থাকার কারণে সে ক্ষেত্রে 'রুখসত' তথা ছাড় দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনো নওমুসলিম কিংবা যৌক্তিক ওজরের কারণে কোনো সাধারণ মুসলিম যদি আরবিতে আল্লাহর যিকিরগুলো করতেও অক্ষম হয়, তবে সে যিকিরগুলো নিজের ভাষায় করতে পারবে, ঠিক কালিমার মতো। কোনো অমুসলিম যদি ইসলামে প্রবেশ করতে চায়, তবে তাকে 'কালিমা' পাঠ করতে হয়। কিন্তু সে যদি আরবি কালিমা পাঠ না করতে পারে, বরং নিজের মাতৃভাষায় কালিমার অর্থ স্বীকৃতি দেয়, তবে সে মুমিন গণ্য হবে। কারণ, মূল উদ্দেশ্য তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া। আর সেটা অন্য ভাষাতেও সম্ভব।৯১১
তবে জটিলতা হলো, কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায়—আরবিতে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফারসিতে কেরাত পড়ার বৈধতা দিয়েছেন! কাসানি লিখেন, 'আবু হানিফার মতে, আরবির মতো ফারসিতেও (নামাযে) কেরাত পড়া বৈধ। আরবি পারুক না পারুক সেটা বিবেচ্য নয়। বিপরীতে আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর মতে, আরবি পারলে ফারসিতে বৈধ হবে না। আরবি না পারলে বৈধ হবে। ইমাম শাফেয়ির মত আরও ভিন্ন। তিনি বলেন, আরবি পারুক না পারুক, কোনো অবস্থাতেই ফারসিতে কিছু পড়া যাবে না। যদি আরবি না পারে, তবে তাসবিহ পড়বে। তবুও ফারসিতে কেরাত পড়বে না।' প্রশ্ন আসতে পারে, যদি ইমাম থেকে এই বর্ণনা বিশুদ্ধ হয়, তবে তিনি কীসের ভিত্তিতে আরবি পারা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন পাঠের বৈধতা দিলেন?
মূলত এ প্রশ্নের জবাবই উক্ত ফিকহি মাসআলাকে আকিদার মাসআলায় পরিণত করে। মুতাকাল্লিমিন হানাফি ফকিহগণ মনে করেন, ইমাম আজমের কাছে কুরআন আরবি শব্দগুলো নয়; বরং আল্লাহর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান সিফাতে কালাম হলো মূল কুরআন। শব্দগুলো সেগুলোর নির্দেশক মাত্র। সুতরাং নামাযে কুরআন পাঠের নির্দেশ আল্লাহর সঙ্গে বিদ্যমান সেই অর্থ পাঠ করা উদ্দেশ্য, যা আরবিতে যেমন সম্ভব, অন্য ভাষাতেও সম্ভব। (এ জন্য ইমাম আজম এবং কোনো কোনো বর্ণনামতে আবু ইউসুফের বক্তব্য হলো—কুরআনি ইজায স্রেফ আরবি ছন্দের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়)... ফলে যে ভাষাতেই কুরআনের অর্থগুলো উচ্চারণ করা হবে, সেটাকেই কুরআন বলা যাবে! সুতরাং—কাসানি লিখেন—ইমাম আজমের কথাই শুদ্ধ। একই কথা প্রযোজ্য তাশাহহুদ, জুমার খুতবা, যবাইয়ের সময় (অন্য ভাষায়) বিসমিল্লাহ পড়া, তালবিয়া পড়ার ক্ষেত্রেও। বরং কারও কারও মতে, আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় আজান দেওয়াও বৈধ, যদি মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারে।৯১২
কিন্তু কাসানির উক্ত বক্তব্য উন্মুক্তভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং ইমাম আজম থেকে উক্ত মত (আরবিতে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন বৈধতা) প্রমাণিত ধরা হলেও সেটা স্বীকৃত বক্তব্য নয়। এক্ষেত্রে তাঁর দুই শাগরেদ ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের বক্তব্য বিশুদ্ধ। বরং বলা হয়ে থাকে, সর্বশেষে ইমাম আজম উক্ত উন্মুক্ত মত প্রত্যাহার করে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেন। বাযদাবি বর্ণনা করেন, 'ইমাম আজমের বিশুদ্ধ মাযহাব হলো কুরআন ছন্দ ও অর্থ দুটোর সমন্বয়।'৯১৩ সুতরাং আরবিতে সক্ষমতা থাকলে ফারসি বা অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। এভাবে এটা হানাফি ইমামদের সর্বসম্মত বক্তব্যে পরিণত হয়।
একই কথা অন্যান্য যিকিরের ক্ষেত্রেও—আরবিতে সক্ষম হলে অন্য ভাষায় করবে না। ইবনে আবিদিন 'সিরাজিয়্যাহ'র উদ্ধৃতিতে লিখেছেন, 'ফারসি (তথা অনারবি ভাষায়) আজান দেওয়া বিশুদ্ধ নয়। মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারলেও বিশুদ্ধ হবে না।'৯১৪ কারণ, ইবাদতটা এভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হয়েছে। আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআন স্রেফ অর্থ নয়; বরং অর্থ ও ছন্দ/শব্দ (নযম) দুটোর সমন্বয়ে আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ আমাদের এটাই পড়তে বলেছেন। এগুলো আরবিতে যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, সেভাবে পড়লেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) প্রতি শব্দে দশটি পুণ্যের ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা এই আরবি কুরআনকেই সুরক্ষিত রাখার ঘোষণা করেছেন। একটি শব্দও তাতে বেশি-কম হবে না। অথচ অনুবাদে মুহূর্তে মুহূর্তে ভাষায় ভাষায় পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও বিকৃতির আশঙ্কা প্রবল। বরং অন্য ধর্মগ্রন্থগুলো বিকৃতির অন্যতম কারণ ছিল শব্দগুলোকে হেফাজত না করা, অর্থের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা। এ জন্য কুরআনকে আল্লাহ শব্দ ও অর্থ দুটোসহই হেফাজত করবেন।
মোটকথা, কুরআনের শব্দ ও অর্থ দুটোকেই আল্লাহ তায়ালা কুরআন হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং নামাযে এই কুরআনই পড়তে হবে যা ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.সহ সকল আলেমের মত। ইমাম আজম থেকে বিপরীতটা বর্ণিত থাকলেও তিনি পরবর্তীকালে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেছেন বলে ধরা হবে। তাই আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। হ্যাঁ, আরবি কুরআন না পারলে যেহেতু রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাসবিহ, তাহলিল তথা যিকির করতে বলেছেন, আর যিকির অন্য ভাষাতেও বৈধ, সুতরাং তখন (অক্ষম অবস্থায়) নিজস্ব মাতৃভাষায় কুরআনের যিকিরসংক্রান্ত আয়াতগুলোর অনুবাদ পড়া বৈধ হবে।৯১৫
টিকাঃ
৯০৮. দেখুন: ইলাউস সুনান (৪/১৪৮-১৫০)।
৯০৯. দেখুন : আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১০. আবু দাউদ (কিতাবুস সালাত/বাবু সালাতি মান লা ইউকিমু সুলবাহ : ৮৫৬)। তিরমিযি (আবওয়াবুস সালাত : ৩০২)।
৯১১. আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১২. দেখুন: বাদায়েউস সানায়ে' (১/১১২-১১৩)। আরও দেখুন: আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (৭৮-৭৯)।
৯১৩. কাশফুল আসরার (১/২৪)।
৯১৪. রদ্দুল মুহতার (১/৩৮৩, ৪৮৪)।
৯১৫. রদ্দুল মুহতার (১/৪৮৫)।
📄 ইমাম আজম ও কুরআনের বিচ্ছিন্ন পাঠ (কিরাআতে শাযযাহ)
কিছু কিছু গ্রন্থে ইমাম আজম রহ.-এর নামে আরও একটি অভিযোগ আরোপ করা হয় যে, তিনি নাকি কুরআন কারিমের কিছু আয়াতকে তাঁর নিজস্ব কেরাতে পড়তেন, যা প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কেরাতের চেয়ে ভিন্ন। যেমন—আল্লাহ তায়ালার বাণী : 'আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে (প্রকৃত) ভয় করে।' [ফাতির: ২৮] আয়াতে 'আল্লাহ' শব্দটি 'যবর' এবং 'উলামা' পেশ দিয়ে পড়া হয়। কিন্তু ইমাম আজমের ব্যাপারে বলা হয়, তিনি নাকি এর বিপরীত তথা 'আল্লাহ' শব্দের উপর 'পেশ' এবং 'উলামা' শব্দের উপর 'যবর' দিয়ে পড়তেন!
এটা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, তাতে আয়াতের অর্থ সম্পূর্ণ উলটে যায়। অর্থ দাঁড়ায়— 'আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মাঝে যারা আলেম তাদের ভয় করেন।' এটা ইমাম আজমের উপর অপবাদ। তিনি এ ধরনের কাজ থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি কেরাত শিখেছেন খোদ ইমাম আসেম রহ. থেকে। সুতরাং তিনি প্রসিদ্ধ কেরাতের বাইরে কোনো শায তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়তেন না।৯১৬
হ্যাঁ, তিনি জমহুরের মতো সাত হরফে কুরআনের অবতরণ এবং কুরআনের একাধিক কেরাতের স্বীকৃতি দিতেন। ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে মানুষের জন্য সহজ করার লক্ষ্যে সাত অক্ষরে অবতীর্ণ করেছেন। ফলে এটা তাঁর হিকমত।'৯১৭ আবু উবাইদ ও মুবাররিদের মতে, সাত অক্ষর বলতে আরবের সাতটি (আঞ্চলিক) ভাষা উদ্দেশ্য।৯১৮ কেরাতের ব্যাপারে ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই।' কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়া বৈধ। কারণ, কেরাতের ভিন্নতার ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো, কেরাতটা সালাফ থেকে প্রমাণিত হওয়া এবং অর্থ বিশুদ্ধ হওয়া। অর্থ বদলে গেলে—যেমনটা উপরের আয়াতে তাঁর নামে বলা হয়েছে—সে ধরনের কেরাত মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই। কারণ, পড়ার ভিন্নতা সত্ত্বেও এগুলোর অর্থ এক ও অভিন্ন।'৯১৯ সুতরাং যে ধরনের বিচ্ছিন্ন কেরাতে অর্থও বিকৃত হয়ে যাবে, সেটা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
উপরের উসুলের ভিত্তিতে তিনি বিভিন্ন মাসআলাতে কিরাআতে শাযযাহ তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। যেমন—শপথ ভঙ্গের কাফফারার ক্ষেত্রে ইমাম আজমের বক্তব্য হলো, টানা তিন দিন রোযা রাখতে হবে। মাঝে ফাঁকা রাখা যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি কুরআনের এই আয়াত দিয়ে দলিল দেন : 'আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য; কিন্তু পাকড়াও করেন ওই শপথের জন্য যা তোমরা মজবুত করে করো। অতএব, এর কাফফারা এই যে— দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেণির খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাকো। অথবা তাদের বস্ত্র প্রদান করবে, অথবা একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দেবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফারা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা করো। এমনইভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।' [মায়িদা : ৮৯]
এখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা স্রেফ তিন দিন রোযার কথা বলেছেন। তাহলে ইমাম আজম 'ধারাবাহিক/টানা' শর্তটা কীভাবে যোগ করলেন? বাস্তব কথা হলো, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। আর ইবনে মাসউদের কেরাতে (মুতাতাবিআত) তথা 'ধারাবাহিক'/'একটানা' তিন দিন কথাটা আছে।৯২০
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে তো প্রমাণিত হয়েই গেলে তিনি 'বিচ্ছিন্ন কেরাতের' প্রবক্তা। আমরা বলব, না। তিনি বিচ্ছিন্ন কেরাতকে কুরআনের আয়াত হিসেবে দলিল দেননি। বরং 'খবর' তথা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবির একটি বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ বক্তব্য হিসেবে দলিল দিয়েছেন। অর্থাৎ, এমন 'বর্ধিত' কেরাত ইমাম আজমের যুগে ইবনে মাসউদ থেকে প্রসিদ্ধ ছিল। বরং বলা হয়ে থাকে, সুলাইমান আল-আ'মাশ কুরআন এক খতম করতেন ইবনে মাসউদের অক্ষরে, আরেক খতম করতেন উসমানের অক্ষরে। সে যা-ই হোক, ইবনে মাসউদ রাযি. নিঃসন্দেহে উক্ত শব্দ কুরআনে নিজ থেকে জুড়ে দেননি। এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। বরং তিনি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শুনে থাকবেন। সুতরাং এটা হাদিসের মর্যাদা পাবে এবং কুরআনের 'সংক্ষিপ্ত' আয়াতের 'ব্যাখ্যা' গণ্য হবে, যা শরয়ি বিধানের দলিল হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ। কিন্তু এটাকে মূল কুরআনের অংশ ধরে তেলাওয়াত, নামাযে বা নামাযের বাইরে পাঠ করা বৈধ নয়।৯২১
টিকাঃ
৯১৬. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৯১-২৯২)।
৯১৭. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৮৮)।
৯১৮. প্রাগুক্ত (৭৯৩)।
৯১৯. প্রাগুক্ত (৭৮৮)।
৯২০. দেখুন : আল-মানখুল, গাযালি (৩৭৪)।
৯২১. দেখুন : আল-মাবসুত, সারাখসি (৩/৭৫)। আরও দেখুন: আত-তাহরির, ইবনুল হুমাম (২৯৯)।
কিছু কিছু গ্রন্থে ইমাম আজম রহ.-এর নামে আরও একটি অভিযোগ আরোপ করা হয় যে, তিনি নাকি কুরআন কারিমের কিছু আয়াতকে তাঁর নিজস্ব কেরাতে পড়তেন, যা প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কেরাতের চেয়ে ভিন্ন। যেমন—আল্লাহ তায়ালার বাণী : 'আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে (প্রকৃত) ভয় করে।' [ফাতির: ২৮] আয়াতে 'আল্লাহ' শব্দটি 'যবর' এবং 'উলামা' পেশ দিয়ে পড়া হয়। কিন্তু ইমাম আজমের ব্যাপারে বলা হয়, তিনি নাকি এর বিপরীত তথা 'আল্লাহ' শব্দের উপর 'পেশ' এবং 'উলামা' শব্দের উপর 'যবর' দিয়ে পড়তেন!
এটা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, তাতে আয়াতের অর্থ সম্পূর্ণ উলটে যায়। অর্থ দাঁড়ায়— 'আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মাঝে যারা আলেম তাদের ভয় করেন।' এটা ইমাম আজমের উপর অপবাদ। তিনি এ ধরনের কাজ থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি কেরাত শিখেছেন খোদ ইমাম আসেম রহ. থেকে। সুতরাং তিনি প্রসিদ্ধ কেরাতের বাইরে কোনো শায তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়তেন না।৯১৬
হ্যাঁ, তিনি জমহুরের মতো সাত হরফে কুরআনের অবতরণ এবং কুরআনের একাধিক কেরাতের স্বীকৃতি দিতেন। ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে মানুষের জন্য সহজ করার লক্ষ্যে সাত অক্ষরে অবতীর্ণ করেছেন। ফলে এটা তাঁর হিকমত।'৯১৭ আবু উবাইদ ও মুবাররিদের মতে, সাত অক্ষর বলতে আরবের সাতটি (আঞ্চলিক) ভাষা উদ্দেশ্য।৯১৮ কেরাতের ব্যাপারে ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই।' কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়া বৈধ। কারণ, কেরাতের ভিন্নতার ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো, কেরাতটা সালাফ থেকে প্রমাণিত হওয়া এবং অর্থ বিশুদ্ধ হওয়া। অর্থ বদলে গেলে—যেমনটা উপরের আয়াতে তাঁর নামে বলা হয়েছে—সে ধরনের কেরাত মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই। কারণ, পড়ার ভিন্নতা সত্ত্বেও এগুলোর অর্থ এক ও অভিন্ন।'৯১৯ সুতরাং যে ধরনের বিচ্ছিন্ন কেরাতে অর্থও বিকৃত হয়ে যাবে, সেটা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
উপরের উসুলের ভিত্তিতে তিনি বিভিন্ন মাসআলাতে কিরাআতে শাযযাহ তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। যেমন—শপথ ভঙ্গের কাফফারার ক্ষেত্রে ইমাম আজমের বক্তব্য হলো, টানা তিন দিন রোযা রাখতে হবে। মাঝে ফাঁকা রাখা যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি কুরআনের এই আয়াত দিয়ে দলিল দেন : 'আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য; কিন্তু পাকড়াও করেন ওই শপথের জন্য যা তোমরা মজবুত করে করো। অতএব, এর কাফফারা এই যে— দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেণির খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাকো। অথবা তাদের বস্ত্র প্রদান করবে, অথবা একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দেবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফারা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা করো। এমনইভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।' [মায়িদা : ৮৯]
এখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা স্রেফ তিন দিন রোযার কথা বলেছেন। তাহলে ইমাম আজম 'ধারাবাহিক/টানা' শর্তটা কীভাবে যোগ করলেন? বাস্তব কথা হলো, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। আর ইবনে মাসউদের কেরাতে (মুতাতাবিআত) তথা 'ধারাবাহিক'/'একটানা' তিন দিন কথাটা আছে।৯২০
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে তো প্রমাণিত হয়েই গেলে তিনি 'বিচ্ছিন্ন কেরাতের' প্রবক্তা। আমরা বলব, না। তিনি বিচ্ছিন্ন কেরাতকে কুরআনের আয়াত হিসেবে দলিল দেননি। বরং 'খবর' তথা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবির একটি বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ বক্তব্য হিসেবে দলিল দিয়েছেন। অর্থাৎ, এমন 'বর্ধিত' কেরাত ইমাম আজমের যুগে ইবনে মাসউদ থেকে প্রসিদ্ধ ছিল। বরং বলা হয়ে থাকে, সুলাইমান আল-আ'মাশ কুরআন এক খতম করতেন ইবনে মাসউদের অক্ষরে, আরেক খতম করতেন উসমানের অক্ষরে। সে যা-ই হোক, ইবনে মাসউদ রাযি. নিঃসন্দেহে উক্ত শব্দ কুরআনে নিজ থেকে জুড়ে দেননি। এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। বরং তিনি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শুনে থাকবেন। সুতরাং এটা হাদিসের মর্যাদা পাবে এবং কুরআনের 'সংক্ষিপ্ত' আয়াতের 'ব্যাখ্যা' গণ্য হবে, যা শরয়ি বিধানের দলিল হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ। কিন্তু এটাকে মূল কুরআনের অংশ ধরে তেলাওয়াত, নামাযে বা নামাযের বাইরে পাঠ করা বৈধ নয়।৯২১
টিকাঃ
৯১৬. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৯১-২৯২)।
৯১৭. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৮৮)।
৯১৮. প্রাগুক্ত (৭৯৩)।
৯১৯. প্রাগুক্ত (৭৮৮)।
৯২০. দেখুন : আল-মানখুল, গাযালি (৩৭৪)।
৯২১. দেখুন : আল-মাবসুত, সারাখসি (৩/৭৫)। আরও দেখুন: আত-তাহরির, ইবনুল হুমাম (২৯৯)।
কিছু কিছু গ্রন্থে ইমাম আজম রহ.-এর নামে আরও একটি অভিযোগ আরোপ করা হয় যে, তিনি নাকি কুরআন কারিমের কিছু আয়াতকে তাঁর নিজস্ব কেরাতে পড়তেন, যা প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কেরাতের চেয়ে ভিন্ন। যেমন—আল্লাহ তায়ালার বাণী : 'আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে (প্রকৃত) ভয় করে।' [ফাতির: ২৮] আয়াতে 'আল্লাহ' শব্দটি 'যবর' এবং 'উলামা' পেশ দিয়ে পড়া হয়। কিন্তু ইমাম আজমের ব্যাপারে বলা হয়, তিনি নাকি এর বিপরীত তথা 'আল্লাহ' শব্দের উপর 'পেশ' এবং 'উলামা' শব্দের উপর 'যবর' দিয়ে পড়তেন!
এটা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, তাতে আয়াতের অর্থ সম্পূর্ণ উলটে যায়। অর্থ দাঁড়ায়— 'আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মাঝে যারা আলেম তাদের ভয় করেন।' এটা ইমাম আজমের উপর অপবাদ। তিনি এ ধরনের কাজ থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি কেরাত শিখেছেন খোদ ইমাম আসেম রহ. থেকে। সুতরাং তিনি প্রসিদ্ধ কেরাতের বাইরে কোনো শায তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়তেন না।৯১৬
হ্যাঁ, তিনি জমহুরের মতো সাত হরফে কুরআনের অবতরণ এবং কুরআনের একাধিক কেরাতের স্বীকৃতি দিতেন। ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে মানুষের জন্য সহজ করার লক্ষ্যে সাত অক্ষরে অবতীর্ণ করেছেন। ফলে এটা তাঁর হিকমত।'৯১৭ আবু উবাইদ ও মুবাররিদের মতে, সাত অক্ষর বলতে আরবের সাতটি (আঞ্চলিক) ভাষা উদ্দেশ্য।৯১৮ কেরাতের ব্যাপারে ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই।' কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, বিচ্ছিন্ন কেরাত পড়া বৈধ। কারণ, কেরাতের ভিন্নতার ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো, কেরাতটা সালাফ থেকে প্রমাণিত হওয়া এবং অর্থ বিশুদ্ধ হওয়া। অর্থ বদলে গেলে—যেমনটা উপরের আয়াতে তাঁর নামে বলা হয়েছে—সে ধরনের কেরাত মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম বলেন, 'কেরাতের ভিন্নতার মাঝে হালাল-হারাম এ-জাতীয় কিছু নেই। কারণ, পড়ার ভিন্নতা সত্ত্বেও এগুলোর অর্থ এক ও অভিন্ন।'৯১৯ সুতরাং যে ধরনের বিচ্ছিন্ন কেরাতে অর্থও বিকৃত হয়ে যাবে, সেটা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
উপরের উসুলের ভিত্তিতে তিনি বিভিন্ন মাসআলাতে কিরাআতে শাযযাহ তথা বিচ্ছিন্ন কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। যেমন—শপথ ভঙ্গের কাফফারার ক্ষেত্রে ইমাম আজমের বক্তব্য হলো, টানা তিন দিন রোযা রাখতে হবে। মাঝে ফাঁকা রাখা যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি কুরআনের এই আয়াত দিয়ে দলিল দেন : 'আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য; কিন্তু পাকড়াও করেন ওই শপথের জন্য যা তোমরা মজবুত করে করো। অতএব, এর কাফফারা এই যে— দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেণির খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাকো। অথবা তাদের বস্ত্র প্রদান করবে, অথবা একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দেবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফারা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা করো। এমনইভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।' [মায়িদা : ৮৯]
এখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা স্রেফ তিন দিন রোযার কথা বলেছেন। তাহলে ইমাম আজম 'ধারাবাহিক/টানা' শর্তটা কীভাবে যোগ করলেন? বাস্তব কথা হলো, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কেরাত দিয়ে দলিল দিয়েছেন। আর ইবনে মাসউদের কেরাতে (মুতাতাবিআত) তথা 'ধারাবাহিক'/'একটানা' তিন দিন কথাটা আছে।৯২০
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে তো প্রমাণিত হয়েই গেলে তিনি 'বিচ্ছিন্ন কেরাতের' প্রবক্তা। আমরা বলব, না। তিনি বিচ্ছিন্ন কেরাতকে কুরআনের আয়াত হিসেবে দলিল দেননি। বরং 'খবর' তথা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবির একটি বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ বক্তব্য হিসেবে দলিল দিয়েছেন। অর্থাৎ, এমন 'বর্ধিত' কেরাত ইমাম আজমের যুগে ইবনে মাসউদ থেকে প্রসিদ্ধ ছিল। বরং বলা হয়ে থাকে, সুলাইমান আল-আ'মাশ কুরআন এক খতম করতেন ইবনে মাসউদের অক্ষরে, আরেক খতম করতেন উসমানের অক্ষরে। সে যা-ই হোক, ইবনে মাসউদ রাযি. নিঃসন্দেহে উক্ত শব্দ কুরআনে নিজ থেকে জুড়ে দেননি। এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। বরং তিনি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শুনে থাকবেন। সুতরাং এটা হাদিসের মর্যাদা পাবে এবং কুরআনের 'সংক্ষিপ্ত' আয়াতের 'ব্যাখ্যা' গণ্য হবে, যা শরয়ি বিধানের দলিল হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ। কিন্তু এটাকে মূল কুরআনের অংশ ধরে তেলাওয়াত, নামাযে বা নামাযের বাইরে পাঠ করা বৈধ নয়।৯২১
টিকাঃ
৯১৬. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৯১-২৯২)।
৯১৭. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৮৮)।
৯১৮. প্রাগুক্ত (৭৯৩)।
৯১৯. প্রাগুক্ত (৭৮৮)।
৯২০. দেখুন : আল-মানখুল, গাযালি (৩৭৪)।
৯২১. দেখুন : আল-মাবসুত, সারাখসি (৩/৭৫)। আরও দেখুন: আত-তাহরির, ইবনুল হুমাম (২৯৯)।