📄 ইমাম আজমের মাযহাব
প্রথমেই যেটা আমরা বলেছিলাম, এ ব্যাপারে ইমাম আজম রহ.-এর সরাসরি কোনো বক্তব্য নেই, তাঁর ছাত্রদেরও বক্তব্য নেই। কারণ, এসব বিষয়ে তিনি কথা বলা পছন্দ করতেন না। আবু ইউসুফ রহ. বর্ণনা করেন, 'আমরা আবু হানিফা রহ.-এর কাছে ছিলাম। এমন সময় একদল লোক দুই ব্যক্তিকে নিয়ে এলো। এসে বলল, এই ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলে। আর দ্বিতীয় জন তাকে নিষেধ করে বলে, কুরআন মাখলুক নয়। (আমরা তাদের ব্যাপারে কী করব?) ইমাম বললেন, 'তাদের কারও পিছনে নামায পড়ো না।' আমি বললাম, প্রথম জনের ব্যাপার তো স্পষ্ট। কারণ, সে কুরআনকে মাখলুক বলে। কিন্তু দ্বিতীয় জনের পিছনে নামায বাদ দেওয়ার কারণ কী? তার কথা তো ঠিকই আছে! ইমাম বললেন, 'কারণ, তারা দ্বীন নিয়ে বিবাদ করেছে। অথচ দ্বীন নিয়ে বিবাদ বিদআত।' ৮৮৩ হাসান ইবনে আবি মালিক বলেন, আমি আবু ইউসুফ রহ.-কে বলতে শুনেছি, “কুরআন আল্লাহর কালাম। যদি কেউ বলে, 'কীভাবে' কিংবা 'কেন', অথবা এটা নিয়ে বিতর্ক করে, তাকে বন্দি করা হবে। ভালো করে বেত্রাঘাত করা হবে।” ৮৮৪
ইমাম আবু ইউসুফের মতে, আল্লাহর কালামের ব্যাপারে যদি কেউ 'কীভাবে' কিংবা 'কেন' বলে, তবে তাকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাঠক খেয়াল করবেন, উপরের বিতর্কগুলো সেই ‘কীভাবে’-কেন্দ্রিকই। অন্যকথায়, আল্লাহর সিফাতের কাইফিয়্যাত অনুসন্ধান, যা আহলে সুন্নাতের সকল ধারার কাছে সর্বসম্মতিক্রমে নিষিদ্ধ। এখানে এসে তারা সেটাই সন্ধান করেছেন। সেটা নিয়েই বিতর্ক করেছেন। অবশ্য প্রত্যেকেই সেটা করেছেন প্রতিপক্ষের 'বিভ্রান্তি' খণ্ডনের উদ্দেশ্যে বা অজুহাতে।
মোটকথা, এটা যেহেতু একরকম নিষিদ্ধ বিতর্ক, সে জন্য এ ব্যাপারে আমরা ইমাম আজম রহ. এবং তাঁর প্রথম স্তরের শাগরেদদের বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট বক্তব্য পাই না। তবে যেহেতু জাহমিয়্যাহ ও কাররামিয়্যাহদের বিভ্রান্তি ইমাম আজমের যুগেই প্রকাশ পেয়েছিল, ফলে তাদের খণ্ডনে ইমাম আজম এবং তাঁর শাগরেদদের কিছু কিছু বক্তব্য আমরা পাই। সেগুলোর আলোকে উদ্ভূত বিতর্ক সমাধানের চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
(এক.) ইমাম আজম এবং তাঁর শাগরেদরা কুরআনকে কেবল 'আল্লাহর কালাম; সৃষ্ট নয়—এটুকু বলার মাঝে সীমাবদ্ধ থেকেছেন। আল্লাহর কালামের রূপরেখা কী, সেটার মাঝে প্রবেশ করেননি। আল্লাহর কালামের উপর 'কালামে নাফসি' (আত্মকথা) শব্দ প্রয়োগ করেননি। তবে তিনি আল্লাহর কালামকে 'অক্ষর' হওয়া নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, “আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত (কালামুল্লাহি তায়ালা কায়িমুন বিযাতিহি)। লেখা (আল-কিতাবাহ), অক্ষর (আল-হারফ), শব্দ (আল-কালিমাত) ও আয়াত (আল-আয়াত)—এগুলো সেই সিফাতের অর্থের বাহক। মানুষের প্রয়োজনে এগুলো অস্তিত্বে এসেছে।" ৮৮৫ উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহর কালাম 'অক্ষর ও আওয়াজের সমন্বয়'—এটা নাকচ হয়ে যায়। ইমাম আল-ফিকহুল আকবারে বলেন, 'আল্লাহ তায়ালার সকল সিফাত (গুণ) মাখলুকের সিফাতের (গুণ) চেয়ে ভিন্ন। ...আমরা বিভিন্ন উপকরণ ও অক্ষরের মাধ্যমে কথা বলে থাকি। আল্লাহ কথা বলেন কোনো উপকরণ ও অক্ষর ছাড়াই। অক্ষর (আল-হুরুফ) হলো সৃষ্ট। কিন্তু আল্লাহর কালাম সৃষ্ট নয়।' ৮৮৬ এ বক্তব্যেও সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর কালাম 'অক্ষরসহ' নাকচ হয়ে যায়। ফলে ইমামের বক্তব্যের অর্থ দাঁড়ায় : 'কালাম আল্লাহর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান চিরন্তন গুণ। অক্ষর ও শব্দজাতীয় নয়।' এ হিসেবে হানাফি আলেমদের বক্তব্য ইমামের বক্তব্যের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রথম ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে ইমাম কি অক্ষরের মতো আওয়াজকেও নাকচ করতেন? সে ব্যাপারে স্বতন্ত্র আলোচনা সামনে আসছে।
(দুই.) মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে আল্লাহর কথোপকথন সম্পর্কে ইমাম বলেন, “মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কালাম (কথা) শুনেছেন, যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, ﴾وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا﴿ অর্থ : 'আল্লাহ মুসার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন।' [নিসা : ১৬৪] কিন্তু মুসার সঙ্গে কথা বলার অনেক আগে অনাদিতেও আল্লাহ তায়ালা 'মুতাকাল্লিম' (কালাম গুণসম্পন্ন) ছিলেন, যেমন গোটা সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করার আগেও আল্লাহ তায়ালা 'খালিক' (সৃষ্টিকর্তা) ছিলেন। সুতরাং তিনি যখন মুসার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তখন তাঁর সেই শাশ্বত 'কালাম' গুণের মাধ্যমে কথা বলেছিলেন।” ৮৮৭ ইমাম আজম আরও বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালামকে তাঁর রিসালাত ও কথোপকথনের জন্য মনোনীত করেছেন। ফলে তিনি তাঁর সঙ্গে কোনো দূত ছাড়া (সরাসরি) কথা বলেছেন।' ৮৮৮
ইমাম আজম রহ.-এর উপরের বক্তব্য দ্বারা বোঝা যায়, আল্লাহ শাশ্বত কালাম গুণের মাধ্যমে মুসার সঙ্গে কথা বলেছেন। এখানে অক্ষর ও আওয়াজের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। ফলে (প্রথম দল) যারা বলেন, আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে অক্ষর ও আওয়াজসহ কথা বলেছেন, তাদের বক্তব্য এখানেও ইমামের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। বিশেষত ইমাম আল্লাহর কালামের জন্য অক্ষর ও শব্দকে নাকচ করেন, যা আমরা উপরে দেখেছি। ফলে এখানেও মুসার সঙ্গে কথোপকথনের ক্ষেত্রে অক্ষর/শব্দ নাকচ হবে।
একইভাবে (দ্বিতীয় দল তথা সমরকন্দি উলামায়ে কেরাম) যারা বলেন, আল্লাহ অক্ষর ও আওয়াজ সৃষ্টি করে মুসাকে সেটা শুনিয়ে দিয়েছেন—এটাও ইমামের কথার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, ইমাম এখানে অক্ষর ও আওয়াজ সৃষ্টি করে মুসাকে শোনানোর কথা বলেননি। স্রেফ শাশ্বত গুণের মাধ্যমে কথার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন আর এটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। বিপরীতে এখানে অক্ষর ও আওয়াজ সৃষ্টির কথা এলে 'হাদেস' ঢুকে যাচ্ছে, যা ইমামের কথার দূরতম ব্যাখ্যাও হয় না। ইমাম শাফেয়ি 'আল্লাহ তায়ালা কালাম সৃষ্টি করে মুসাকে সেটা শুনিয়েছেন' এমন বক্তব্যকে জাহমিয়্যাহদের বক্তব্য আখ্যা দিয়েছেন। ৮৮৯ বরং পরবর্তী সময়ে খোদ হানাফি (বুখারা ও বলখের) আলেমগণই 'অক্ষর ও আওয়াজ সৃষ্টি করে শোনানো' এ ধরনের কথাকে অবৈধ বলেছেন, যা পিছনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৮৯০
একইভাবে 'আল্লাহর কালাম শোনা যায় না, তাই কালামের নির্দেশক অক্ষর ও আওয়াজ শোনা' কিংবা “বৃক্ষকে আল্লাহর কালামের উপর নির্দেশক অক্ষর ও আওয়াজের 'মহল্ল' বলে আল্লাহর মূল কালাম শোনা নাকচ করাও” ইমামের মাযহাব নয়। খোদ ইমাম আজম বলেছেন, মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কালাম শুনেছেন। যদি তারা বলেন, মুসা আলাইহিস সালাম তাহলে আল্লাহর কালাম কীভাবে শুনলেন? আমরা বলব জানি না, আল্লাহ ভালো জানেন। বরং এটা আল্লাহর সিফাতের কাইফিয়্যাত নিয়ে প্রশ্ন, যা আপনাদের কাছেও বৈধ নয়।
(তিন.) আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআন কি শব্দ ও অর্থসহ (আল-লাফজু ওয়াল মা'না) আল্লাহর কালাম, নাকি স্রেফ অর্থ আল্লাহর কালাম; শব্দ সেই কালাম সিফাতের উপর নির্দেশক উপকরণ মাত্র? ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্য দ্বারা বোঝা যায়, তিনি কুরআনের শব্দ ও অর্থ দুটোকে আল্লাহর কালাম মনে করতেন না। বরং তিনি আল্লাহর কালাম সিফাতকে অন্যান্য সিফাতের মতো কদিম তথা শাশ্বত বলতেন। এর বাইরের সবকিছুকে উপকরণ বলতেন। ইমাম আল-ফিকহুল আকবারে বলেন, “কুরআন আল্লাহ তায়ালার ‘কালাম’ (বাণী), গ্রন্থে লিপিবদ্ধ, হৃদয়ে সুরক্ষিত, মুখে পঠিত, নবিজি (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ। কুরআন (পাঠের সময়) আমাদের শব্দগুলো (আল-লাফজ) সৃষ্ট। কুরআন (লেখার সময়) আমাদের লেখাগুলো সৃষ্ট। আমাদের (কুরআনের) পাঠ সৃষ্ট। কিন্তু স্বয়ং কুরআন সৃষ্ট নয়।” ৮৯১
ইমাম আল-ওয়াসিয়্যাহ গ্রন্থে বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি কুরআন আল্লাহর কালাম। মাখলুক নয়। এটা তাঁর ওহি এবং তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাঁর গুণ (সিফাত)। ফলে কুরআন আল্লাহ নয়, আবার তাঁর থেকে আলাদাও নয়। মুসহাফে লিখিত, মুখে পঠিত, হৃদয়ে সংরক্ষিত। কিন্তু এগুলোতে অবস্থানকারী নয় (গইরু হাল্লিন ফিহা)। আর কাগজ, কালি, (কলমের) লেখা—এগুলো সব মাখলুক। কেননা এগুলো মানুষের কাজ। আর মানুষ মাখলুক। ফলে মাখলুকের কাজও মাখলুক। আল্লাহর কালাম মাখলুক নয়। লেখা, অক্ষর (আল-হারফ), শব্দ (আল-কালিমাত) ও আয়াত—এগুলো কুরআনের নির্দেশক। মানুষের প্রয়োজনে এগুলো অস্তিত্বে এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। সেই কালামের অর্থ বোধগম্য হয় এসব উপকরণের মধ্য দিয়ে (লিআন্নাল কিতাবাতা ওয়াল হারফা ওয়াল কালিমাতা ওয়াল আয়াতি কুল্লাহা দালালাতুল কুরআনি লিহাজাতিল ইবাদি ইলাইহি, ওয়া কালামুল্লাহি তায়ালা কায়িমুন বিযাতিহি, ওয়া মা'নাহু মাফহুমুন বি হাযিহিল আশ্য়াই)।” ৮৯২
এসব বক্তব্যে ইমাম স্পষ্টভাবে ‘অক্ষর’ (আল-হারফ) ও ‘শব্দ’ (আল-লাফজ/আল-কালিমা) এগুলোকে আল্লাহর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান ‘কালাম’-এর স্রেফ নির্দেশক এবং সেই কালামের অর্থের বাহক বলছেন। প্রকৃত কালাম এতে হুলুল বা অবতরণের দাবি অস্বীকার করেছেন। এর দ্বারা বোঝা যায়, ইমাম রহ.-এর মতে, আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআনের শব্দ ও অক্ষর সরাসরি (সিফাতে) কালাম নয়। বরং এসবের মাধ্যমে ধারণকৃত ‘অর্থ’ আল্লাহর (সিফাতে) কালাম, যা প্রথম দলের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, দ্বিতীয় তথা হানাফি আলেমদের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
টিকাঃ
৮৮৩. তালখিসুল আদিল্লাহ (৫৬)।
৮৮৪. ফাযায়িলু আবি হানিফা, ইবনে আবিল আওয়াম (৩১১)।
৮৮৫. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৮৮৬. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৮৮৭. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৮৮৮. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৮)।
৮৮৯. দেখুন: আল-ইনতিকা, ইবনে আবদিল বার (১৩২)।
৮৯০. দেখুন : তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৪৮)।
৮৯১. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৮৯২. দেখুন: আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)। শরহুল আকায়েদ, তাফতাযানি (১৬৪)। শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, খাদেমি (১৬৬-১৬৭)।
📄 আল্লাহর আওয়াজের ব্যাপারে ইমামের মাযহাব
পিছনের আলোচনাতে আমরা ইমাম আজম রহ.-এর দূরদর্শিতা ও দ্বীনি ইলমে তাঁর বিপুল গভীরতা এবং সর্বোপরি কুরআন-সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের আরও একটি সুস্পষ্ট দলিল পাই। সেটা হলো, ইমাম আজম তাঁর আকিদার বিভিন্ন গ্রন্থে আল্লাহর কালাম গুণের আলোচনার সময় অক্ষর (আল-হারফ)-কে নাকচ করেছেন; কিন্তু আওয়াজ (আস-সাউত)-কে সরাসরি নাকচ করেননি, যা পরবর্তী সময়ের হানাফি আলেমগণ সুস্পষ্টভাবে ও এককথায় নাকচ করেছেন।
ইমাম 'আল-ফিকহুল আকবার' গ্রন্থে বলেন, 'আমরা বিভিন্ন উপকরণ (আল-আলাহ) ও অক্ষরের মাধ্যমে কথা বলে থাকি। আল্লাহ কথা বলেন কোনো উপকরণ ও অক্ষর ছাড়াই। অক্ষর হলো সৃষ্ট। কিন্তু আল্লাহর কালাম সৃষ্ট নয়।'৮৯৩ 'আল-ওয়াসিয়্যাহ' গ্রন্থে ইমাম বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি কুরআন আল্লাহর কালাম। মাখলুক নয়। এটা তাঁর ওহি এবং তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাঁর গুণ (সিফাত)। লেখা (আল-কিতাবাহ), অক্ষর (আল-হারফ), শব্দ (আল-কালিমাত) ও আয়াত (আল-আয়াত) এগুলো কুরআনের নির্দেশক। মানুষের প্রয়োজনে এগুলো অস্তিত্বে এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। সেই কালামের অর্থ বোধগম্য হয় এসব উপকরণের মধ্য দিয়ে।'৮৯৪
এই দুটো বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইমাম আজম রহ. আল্লাহর কালামের জন্য 'অক্ষর' থাকার প্রয়োজনীয়তা নাকচ করে দিয়েছেন। অথচ তিনি কোথাও সরাসরি 'আওয়াজ'-কে নাকচ করেননি। এর রহস্য কী? তাহলে কি তিনি অক্ষর ও আওয়াজের মাঝে পার্থক্য করতেন? তিনি কি 'অক্ষর' নাকচ করলেও আল্লাহর কালামের জন্য 'আওয়াজ' সাব্যস্ত করতেন?
প্রথম কথা হলো, আল্লাহর কালামের জন্য 'অক্ষর' থাকার বিষয়টি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। আল্লাহর কালামের জন্য 'অক্ষর' সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে যেসব আয়াত ও হাদিস পেশ করা হয়, সেগুলোর একটাও কাছাকাছি দলিল নয়, যথাযথ তো নয়ই। বিপরীতে ইমামের বক্তব্য সুস্পষ্ট। তাঁর কথা হলো, আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআনে লিখিত আয়াতের অক্ষরগুলো (যেমন— আলিফ, লাম, মিম) আল্লাহর কালাম উচ্চারণের একটা উপকরণ মাত্র। কাগজে আমরা কুরআন লিখি, তাতে কাগজ আল্লাহর কালাম হয়ে যায় না। কালি দিয়ে আমরা লিখি, তাতে লাল বা কালো কালি আল্লাহর কালাম হয়ে যায় না। মুখে আমরা একেকজন একেকভাবে কুরআন তেলাওয়াত করি। তাই বলে আমাদের মুখের উচ্চারণ, মাখরাজ, জিহ্বা, স্বর—এগুলো আল্লাহর কালাম হয়ে যায় না। আল্লাহর কালাম হচ্ছে কুরআনের আয়াতগুলো; উপকরণ নয়। একই কথা প্রযোজ্য অক্ষরের ক্ষেত্রেও। অক্ষর মানুষের প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে অস্তিত্বে এসেছে। মানুষ মুখের নানাবিধ উচ্চারণকে অক্ষরের মাধ্যমে আলাদা করে এবং আরও পরে সেগুলোর লিখিত রূপ দান করেছে। এই লিখিত রূপ চিরন্তন নয়। একটা ভাষাকে যেমন আরবি অক্ষরে লেখা যায়, সেটাকে ল্যাটিন অক্ষরেও লেখা যায়। উপরন্তু আল্লাহ তাওরাত, ইঞ্জিলসহ অন্যান্য আসমানি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন বিভিন্ন ভাষায়, সেসব ভাষার অক্ষরে। যেগুলো পরবর্তীকালে অস্তিত্বে এসেছে। ফলে সকল ভাষার সকল অক্ষর আল্লাহর কালাম হবে—এমন নয়। বরং এগুলো মানুষের প্রয়োজনে পরবর্তীকালে অস্তিত্ব এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম হলো আল্লাহর সত্তাগত গুণ, তাঁর সত্তার মতো চিরন্তন। যখন কোনো ভাষা, শব্দ ও অক্ষর ছিল না, তখনও আল্লাহ ছিলেন, তাঁর কালাম ছিল। ফলে তাঁর কালাম মানুষের ভাষা, শব্দ ও ‘অক্ষর’-এর প্রতি মুখাপেক্ষী নয়। বরং এসব যুক্তিতর্ক বাদ দিলেও সবচেয়ে বড় কথা ‘আল্লাহ অক্ষরসহ কথা বলেন’— এমন কথা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
ফলে ইমাম আল্লাহর কালামের জন্য ‘অক্ষর’ নাকচ করেছেন। কিন্তু তিনি কোথাও কি ‘আওয়াজ’ নাকচ করেছেন? হানাফি আলেমদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তারা আল্লাহর অক্ষর ও আওয়াজ দুটোই নাকচ করেন। কিন্তু আমরা যদি এ ব্যাপারে ইমামের বক্তব্য খুঁজি, তবে সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধরূপে বর্ণিত ইমামের কোনো বক্তব্য পাই না। নানাবিধ উপায়ে এ বাস্তবতার ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অধমের কাছে যেটা জুতসই ও প্রকৃত কারণ মনে হয়েছে সেটা হলো, ‘আওয়াজ’- এর বিষয়টি সুন্নাহ দ্বারা ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও প্রমাণিত।
অর্থাৎ, কয়েকটি হাদিসে—কিংবা ন্যূনতম একটি হাদিসে—আল্লাহর ‘আওয়াজ’সহ ডাকার কথা এসেছে। সেটা হলো, আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি— ‘আল্লাহ তায়ালা হাশরের দিন তার বান্দাদের একত্র করবেন। অতঃপর তিনি তাদের ‘আওয়াজ’সহ ডাক দিয়ে বলবেন, ‘আমি মালিক। আমি বিচারের অধিপতি।’ কাছে ও দূরের সবাই সেটা সমানভাবে শুনতে পাবে।’৮৯৫
জটিলতা হলো, বুখারির এ বর্ণনাটি মুআল্লাক, অর্থাৎ মূল সহিহতে অনুসৃত অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানি বুখারির এ বর্ণনার সনদের উপর আপত্তি করেছেন। বরং খোদ বুখারি এটাকে 'বলা হয়ে থাকে' শব্দে উল্লেখ করেছেন, যা এটার দুর্বলতা প্রমাণ করে। ইবনে হাজার বলেন, “এটা ছাড়া আর কোনো সহিহ হাদিসে 'আওয়াজ' প্রমাণিত নয়। আর প্রমাণিত হলেও—যেসব ইমাম আওয়াজ নাকচ করেন তাদের কাছে—সেগুলোর ভিন্ন অর্থ ও ভিন্ন ব্যাখ্যা (যেমন ফেরেশতার আওয়াজ) ইত্যাদি রয়েছে। বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “আল্লাহর সিফাত সৃষ্টির সিফাতের মতো ভাবা যাবে না। সুতরাং যদি বিশুদ্ধ হাদিসে 'আওয়াজ' প্রমাণিত হয়, তবে সেটার উপর ঈমান আনা ওয়াজিব হবে। এরপর সেটাকে তাফবিজ অথবা তাবিল করা হবে।”৮৯৬
ইমাম বুখারি রহ. 'খালকু আফআলিল ইবাদ' গ্রন্থে বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা (কিয়ামতের দিন) এমন আওয়াজে ডাক দেবেন, যা দূরের ও কাছের সবাই সমানভাবে শুনতে পারবে।'৮৯৭ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর জন্য 'আওয়াজ'সহ কালাম সাব্যস্ত করতেন। আবদুল্লাহ বলেন, আমি আব্বাজান (আহমদ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, একদল লোক বলে, আল্লাহ তায়ালা যখন মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে কথা বলেছেন, তখন আওয়াজসহ বলেননি। আব্বা বললেন, 'বরং হ্যাঁ, তোমার প্রভু আওয়াজসহ কথা বলেছেন। আমরা এসব হাদিস যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দেবো।'৮৯৮
আমাদের জানা নেই ইমাম আজম উপরের হাদিসটি (অথবা হাদিসগুলো) গ্রহণযোগ্য মনে করতেন কি করতেন না। তবে এ ব্যাপারে যেহেতু সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ নীরব ছিলেন (যে কারণে পরবর্তী সময়ে বুখারি ও আহমদ ছাড়া এ ব্যাপারে সালাফের উল্লেখযোগ্য কারও সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই), ফলে ইমাম আজম সম্ভবত এ ব্যাপারে নীরব থাকাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হ্যাঁ, ইমামের বক্তব্য 'কুরআন (পাঠের সময়) আমাদের শব্দগুলো সৃষ্ট। আমাদের (কুরআনের) পাঠ (তেলাওয়াত) সৃষ্ট'৮৯৯—এটাসহ পিছনে উল্লিখিত আরও কিছু বক্তব্য দ্বারা কেউ বুঝতে পারে যে, ইমাম 'আওয়াজ'-কেও নাকচ করেছেন। কিন্তু সেটা স্পষ্ট নয়। অর্থাৎ, ইমাম স্পষ্টভাবে শব্দ ও অক্ষরকে যেমন নাকচ করেছেন, আওয়াজকে সেভাবে নাকচ করেননি। আল্লাহ ভালো জানেন。
টিকাঃ
৮৯৩. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৮৯৪. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৮৯৫. বুখারি (কিতাবুত তাওহিদ: ৭৪৮১ নং হাদিসের আগে মুআল্লাকান বর্ণিত)।
৮৯৬. দেখুন: ফাতহুল বারি: (১৩/৪৫৮)।
৮৯৭. খালকু আফআলিল ইবাদ (২৪০)।
৮৯৮. দেখুন: আস-সুন্নাহ (২৩৮)। ফাতহুল বারি (১৩/৪৬০)।
৮৯৯. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
পিছনের আলোচনাতে আমরা ইমাম আজম রহ.-এর দূরদর্শিতা ও দ্বীনি ইলমে তাঁর বিপুল গভীরতা এবং সর্বোপরি কুরআন-সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের আরও একটি সুস্পষ্ট দলিল পাই। সেটা হলো, ইমাম আজম তাঁর আকিদার বিভিন্ন গ্রন্থে আল্লাহর কালাম গুণের আলোচনার সময় অক্ষর (আল-হারফ)-কে নাকচ করেছেন; কিন্তু আওয়াজ (আস-সাউত)-কে সরাসরি নাকচ করেননি, যা পরবর্তী সময়ের হানাফি আলেমগণ সুস্পষ্টভাবে ও এককথায় নাকচ করেছেন।
ইমাম 'আল-ফিকহুল আকবার' গ্রন্থে বলেন, 'আমরা বিভিন্ন উপকরণ (আল-আলাহ) ও অক্ষরের মাধ্যমে কথা বলে থাকি। আল্লাহ কথা বলেন কোনো উপকরণ ও অক্ষর ছাড়াই। অক্ষর হলো সৃষ্ট। কিন্তু আল্লাহর কালাম সৃষ্ট নয়।'৮৯৩ 'আল-ওয়াসিয়্যাহ' গ্রন্থে ইমাম বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি কুরআন আল্লাহর কালাম। মাখলুক নয়। এটা তাঁর ওহি এবং তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাঁর গুণ (সিফাত)। লেখা (আল-কিতাবাহ), অক্ষর (আল-হারফ), শব্দ (আল-কালিমাত) ও আয়াত (আল-আয়াত) এগুলো কুরআনের নির্দেশক। মানুষের প্রয়োজনে এগুলো অস্তিত্বে এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। সেই কালামের অর্থ বোধগম্য হয় এসব উপকরণের মধ্য দিয়ে।'৮৯৪
এই দুটো বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইমাম আজম রহ. আল্লাহর কালামের জন্য 'অক্ষর' থাকার প্রয়োজনীয়তা নাকচ করে দিয়েছেন। অথচ তিনি কোথাও সরাসরি 'আওয়াজ'-কে নাকচ করেননি। এর রহস্য কী? তাহলে কি তিনি অক্ষর ও আওয়াজের মাঝে পার্থক্য করতেন? তিনি কি 'অক্ষর' নাকচ করলেও আল্লাহর কালামের জন্য 'আওয়াজ' সাব্যস্ত করতেন?
প্রথম কথা হলো, আল্লাহর কালামের জন্য 'অক্ষর' থাকার বিষয়টি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। আল্লাহর কালামের জন্য 'অক্ষর' সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে যেসব আয়াত ও হাদিস পেশ করা হয়, সেগুলোর একটাও কাছাকাছি দলিল নয়, যথাযথ তো নয়ই। বিপরীতে ইমামের বক্তব্য সুস্পষ্ট। তাঁর কথা হলো, আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআনে লিখিত আয়াতের অক্ষরগুলো (যেমন— আলিফ, লাম, মিম) আল্লাহর কালাম উচ্চারণের একটা উপকরণ মাত্র। কাগজে আমরা কুরআন লিখি, তাতে কাগজ আল্লাহর কালাম হয়ে যায় না। কালি দিয়ে আমরা লিখি, তাতে লাল বা কালো কালি আল্লাহর কালাম হয়ে যায় না। মুখে আমরা একেকজন একেকভাবে কুরআন তেলাওয়াত করি। তাই বলে আমাদের মুখের উচ্চারণ, মাখরাজ, জিহ্বা, স্বর—এগুলো আল্লাহর কালাম হয়ে যায় না। আল্লাহর কালাম হচ্ছে কুরআনের আয়াতগুলো; উপকরণ নয়। একই কথা প্রযোজ্য অক্ষরের ক্ষেত্রেও। অক্ষর মানুষের প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে অস্তিত্বে এসেছে। মানুষ মুখের নানাবিধ উচ্চারণকে অক্ষরের মাধ্যমে আলাদা করে এবং আরও পরে সেগুলোর লিখিত রূপ দান করেছে। এই লিখিত রূপ চিরন্তন নয়। একটা ভাষাকে যেমন আরবি অক্ষরে লেখা যায়, সেটাকে ল্যাটিন অক্ষরেও লেখা যায়। উপরন্তু আল্লাহ তাওরাত, ইঞ্জিলসহ অন্যান্য আসমানি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন বিভিন্ন ভাষায়, সেসব ভাষার অক্ষরে। যেগুলো পরবর্তীকালে অস্তিত্বে এসেছে। ফলে সকল ভাষার সকল অক্ষর আল্লাহর কালাম হবে—এমন নয়। বরং এগুলো মানুষের প্রয়োজনে পরবর্তীকালে অস্তিত্ব এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম হলো আল্লাহর সত্তাগত গুণ, তাঁর সত্তার মতো চিরন্তন। যখন কোনো ভাষা, শব্দ ও অক্ষর ছিল না, তখনও আল্লাহ ছিলেন, তাঁর কালাম ছিল। ফলে তাঁর কালাম মানুষের ভাষা, শব্দ ও ‘অক্ষর’-এর প্রতি মুখাপেক্ষী নয়। বরং এসব যুক্তিতর্ক বাদ দিলেও সবচেয়ে বড় কথা ‘আল্লাহ অক্ষরসহ কথা বলেন’— এমন কথা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
ফলে ইমাম আল্লাহর কালামের জন্য ‘অক্ষর’ নাকচ করেছেন। কিন্তু তিনি কোথাও কি ‘আওয়াজ’ নাকচ করেছেন? হানাফি আলেমদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তারা আল্লাহর অক্ষর ও আওয়াজ দুটোই নাকচ করেন। কিন্তু আমরা যদি এ ব্যাপারে ইমামের বক্তব্য খুঁজি, তবে সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধরূপে বর্ণিত ইমামের কোনো বক্তব্য পাই না। নানাবিধ উপায়ে এ বাস্তবতার ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অধমের কাছে যেটা জুতসই ও প্রকৃত কারণ মনে হয়েছে সেটা হলো, ‘আওয়াজ’- এর বিষয়টি সুন্নাহ দ্বারা ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও প্রমাণিত।
অর্থাৎ, কয়েকটি হাদিসে—কিংবা ন্যূনতম একটি হাদিসে—আল্লাহর ‘আওয়াজ’সহ ডাকার কথা এসেছে। সেটা হলো, আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি— ‘আল্লাহ তায়ালা হাশরের দিন তার বান্দাদের একত্র করবেন। অতঃপর তিনি তাদের ‘আওয়াজ’সহ ডাক দিয়ে বলবেন, ‘আমি মালিক। আমি বিচারের অধিপতি।’ কাছে ও দূরের সবাই সেটা সমানভাবে শুনতে পাবে।’৮৯৫
জটিলতা হলো, বুখারির এ বর্ণনাটি মুআল্লাক, অর্থাৎ মূল সহিহতে অনুসৃত অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানি বুখারির এ বর্ণনার সনদের উপর আপত্তি করেছেন। বরং খোদ বুখারি এটাকে 'বলা হয়ে থাকে' শব্দে উল্লেখ করেছেন, যা এটার দুর্বলতা প্রমাণ করে। ইবনে হাজার বলেন, “এটা ছাড়া আর কোনো সহিহ হাদিসে 'আওয়াজ' প্রমাণিত নয়। আর প্রমাণিত হলেও—যেসব ইমাম আওয়াজ নাকচ করেন তাদের কাছে—সেগুলোর ভিন্ন অর্থ ও ভিন্ন ব্যাখ্যা (যেমন ফেরেশতার আওয়াজ) ইত্যাদি রয়েছে। বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “আল্লাহর সিফাত সৃষ্টির সিফাতের মতো ভাবা যাবে না। সুতরাং যদি বিশুদ্ধ হাদিসে 'আওয়াজ' প্রমাণিত হয়, তবে সেটার উপর ঈমান আনা ওয়াজিব হবে। এরপর সেটাকে তাফবিজ অথবা তাবিল করা হবে।”৮৯৬
ইমাম বুখারি রহ. 'খালকু আফআলিল ইবাদ' গ্রন্থে বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা (কিয়ামতের দিন) এমন আওয়াজে ডাক দেবেন, যা দূরের ও কাছের সবাই সমানভাবে শুনতে পারবে।'৮৯৭ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর জন্য 'আওয়াজ'সহ কালাম সাব্যস্ত করতেন। আবদুল্লাহ বলেন, আমি আব্বাজান (আহমদ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, একদল লোক বলে, আল্লাহ তায়ালা যখন মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে কথা বলেছেন, তখন আওয়াজসহ বলেননি। আব্বা বললেন, 'বরং হ্যাঁ, তোমার প্রভু আওয়াজসহ কথা বলেছেন। আমরা এসব হাদিস যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দেবো।'৮৯৮
আমাদের জানা নেই ইমাম আজম উপরের হাদিসটি (অথবা হাদিসগুলো) গ্রহণযোগ্য মনে করতেন কি করতেন না। তবে এ ব্যাপারে যেহেতু সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ নীরব ছিলেন (যে কারণে পরবর্তী সময়ে বুখারি ও আহমদ ছাড়া এ ব্যাপারে সালাফের উল্লেখযোগ্য কারও সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই), ফলে ইমাম আজম সম্ভবত এ ব্যাপারে নীরব থাকাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হ্যাঁ, ইমামের বক্তব্য 'কুরআন (পাঠের সময়) আমাদের শব্দগুলো সৃষ্ট। আমাদের (কুরআনের) পাঠ (তেলাওয়াত) সৃষ্ট'৮৯৯—এটাসহ পিছনে উল্লিখিত আরও কিছু বক্তব্য দ্বারা কেউ বুঝতে পারে যে, ইমাম 'আওয়াজ'-কেও নাকচ করেছেন। কিন্তু সেটা স্পষ্ট নয়। অর্থাৎ, ইমাম স্পষ্টভাবে শব্দ ও অক্ষরকে যেমন নাকচ করেছেন, আওয়াজকে সেভাবে নাকচ করেননি। আল্লাহ ভালো জানেন。
টিকাঃ
৮৯৩. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৮৯৪. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৮৯৫. বুখারি (কিতাবুত তাওহিদ: ৭৪৮১ নং হাদিসের আগে মুআল্লাকান বর্ণিত)।
৮৯৬. দেখুন: ফাতহুল বারি: (১৩/৪৫৮)।
৮৯৭. খালকু আফআলিল ইবাদ (২৪০)।
৮৯৮. দেখুন: আস-সুন্নাহ (২৩৮)। ফাতহুল বারি (১৩/৪৬০)।
৮৯৯. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
পিছনের আলোচনাতে আমরা ইমাম আজম রহ.-এর দূরদর্শিতা ও দ্বীনি ইলমে তাঁর বিপুল গভীরতা এবং সর্বোপরি কুরআন-সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের আরও একটি সুস্পষ্ট দলিল পাই। সেটা হলো, ইমাম আজম তাঁর আকিদার বিভিন্ন গ্রন্থে আল্লাহর কালাম গুণের আলোচনার সময় অক্ষর (আল-হারফ)-কে নাকচ করেছেন; কিন্তু আওয়াজ (আস-সাউত)-কে সরাসরি নাকচ করেননি, যা পরবর্তী সময়ের হানাফি আলেমগণ সুস্পষ্টভাবে ও এককথায় নাকচ করেছেন।
ইমাম 'আল-ফিকহুল আকবার' গ্রন্থে বলেন, 'আমরা বিভিন্ন উপকরণ (আল-আলাহ) ও অক্ষরের মাধ্যমে কথা বলে থাকি। আল্লাহ কথা বলেন কোনো উপকরণ ও অক্ষর ছাড়াই। অক্ষর হলো সৃষ্ট। কিন্তু আল্লাহর কালাম সৃষ্ট নয়।'৮৯৩ 'আল-ওয়াসিয়্যাহ' গ্রন্থে ইমাম বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি কুরআন আল্লাহর কালাম। মাখলুক নয়। এটা তাঁর ওহি এবং তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাঁর গুণ (সিফাত)। লেখা (আল-কিতাবাহ), অক্ষর (আল-হারফ), শব্দ (আল-কালিমাত) ও আয়াত (আল-আয়াত) এগুলো কুরআনের নির্দেশক। মানুষের প্রয়োজনে এগুলো অস্তিত্বে এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। সেই কালামের অর্থ বোধগম্য হয় এসব উপকরণের মধ্য দিয়ে।'৮৯৪
এই দুটো বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইমাম আজম রহ. আল্লাহর কালামের জন্য 'অক্ষর' থাকার প্রয়োজনীয়তা নাকচ করে দিয়েছেন। অথচ তিনি কোথাও সরাসরি 'আওয়াজ'-কে নাকচ করেননি। এর রহস্য কী? তাহলে কি তিনি অক্ষর ও আওয়াজের মাঝে পার্থক্য করতেন? তিনি কি 'অক্ষর' নাকচ করলেও আল্লাহর কালামের জন্য 'আওয়াজ' সাব্যস্ত করতেন?
প্রথম কথা হলো, আল্লাহর কালামের জন্য 'অক্ষর' থাকার বিষয়টি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। আল্লাহর কালামের জন্য 'অক্ষর' সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে যেসব আয়াত ও হাদিস পেশ করা হয়, সেগুলোর একটাও কাছাকাছি দলিল নয়, যথাযথ তো নয়ই। বিপরীতে ইমামের বক্তব্য সুস্পষ্ট। তাঁর কথা হলো, আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআনে লিখিত আয়াতের অক্ষরগুলো (যেমন— আলিফ, লাম, মিম) আল্লাহর কালাম উচ্চারণের একটা উপকরণ মাত্র। কাগজে আমরা কুরআন লিখি, তাতে কাগজ আল্লাহর কালাম হয়ে যায় না। কালি দিয়ে আমরা লিখি, তাতে লাল বা কালো কালি আল্লাহর কালাম হয়ে যায় না। মুখে আমরা একেকজন একেকভাবে কুরআন তেলাওয়াত করি। তাই বলে আমাদের মুখের উচ্চারণ, মাখরাজ, জিহ্বা, স্বর—এগুলো আল্লাহর কালাম হয়ে যায় না। আল্লাহর কালাম হচ্ছে কুরআনের আয়াতগুলো; উপকরণ নয়। একই কথা প্রযোজ্য অক্ষরের ক্ষেত্রেও। অক্ষর মানুষের প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে অস্তিত্বে এসেছে। মানুষ মুখের নানাবিধ উচ্চারণকে অক্ষরের মাধ্যমে আলাদা করে এবং আরও পরে সেগুলোর লিখিত রূপ দান করেছে। এই লিখিত রূপ চিরন্তন নয়। একটা ভাষাকে যেমন আরবি অক্ষরে লেখা যায়, সেটাকে ল্যাটিন অক্ষরেও লেখা যায়। উপরন্তু আল্লাহ তাওরাত, ইঞ্জিলসহ অন্যান্য আসমানি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন বিভিন্ন ভাষায়, সেসব ভাষার অক্ষরে। যেগুলো পরবর্তীকালে অস্তিত্বে এসেছে। ফলে সকল ভাষার সকল অক্ষর আল্লাহর কালাম হবে—এমন নয়। বরং এগুলো মানুষের প্রয়োজনে পরবর্তীকালে অস্তিত্ব এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম হলো আল্লাহর সত্তাগত গুণ, তাঁর সত্তার মতো চিরন্তন। যখন কোনো ভাষা, শব্দ ও অক্ষর ছিল না, তখনও আল্লাহ ছিলেন, তাঁর কালাম ছিল। ফলে তাঁর কালাম মানুষের ভাষা, শব্দ ও ‘অক্ষর’-এর প্রতি মুখাপেক্ষী নয়। বরং এসব যুক্তিতর্ক বাদ দিলেও সবচেয়ে বড় কথা ‘আল্লাহ অক্ষরসহ কথা বলেন’— এমন কথা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
ফলে ইমাম আল্লাহর কালামের জন্য ‘অক্ষর’ নাকচ করেছেন। কিন্তু তিনি কোথাও কি ‘আওয়াজ’ নাকচ করেছেন? হানাফি আলেমদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তারা আল্লাহর অক্ষর ও আওয়াজ দুটোই নাকচ করেন। কিন্তু আমরা যদি এ ব্যাপারে ইমামের বক্তব্য খুঁজি, তবে সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধরূপে বর্ণিত ইমামের কোনো বক্তব্য পাই না। নানাবিধ উপায়ে এ বাস্তবতার ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অধমের কাছে যেটা জুতসই ও প্রকৃত কারণ মনে হয়েছে সেটা হলো, ‘আওয়াজ’- এর বিষয়টি সুন্নাহ দ্বারা ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও প্রমাণিত।
অর্থাৎ, কয়েকটি হাদিসে—কিংবা ন্যূনতম একটি হাদিসে—আল্লাহর ‘আওয়াজ’সহ ডাকার কথা এসেছে। সেটা হলো, আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি— ‘আল্লাহ তায়ালা হাশরের দিন তার বান্দাদের একত্র করবেন। অতঃপর তিনি তাদের ‘আওয়াজ’সহ ডাক দিয়ে বলবেন, ‘আমি মালিক। আমি বিচারের অধিপতি।’ কাছে ও দূরের সবাই সেটা সমানভাবে শুনতে পাবে।’৮৯৫
জটিলতা হলো, বুখারির এ বর্ণনাটি মুআল্লাক, অর্থাৎ মূল সহিহতে অনুসৃত অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানি বুখারির এ বর্ণনার সনদের উপর আপত্তি করেছেন। বরং খোদ বুখারি এটাকে 'বলা হয়ে থাকে' শব্দে উল্লেখ করেছেন, যা এটার দুর্বলতা প্রমাণ করে। ইবনে হাজার বলেন, “এটা ছাড়া আর কোনো সহিহ হাদিসে 'আওয়াজ' প্রমাণিত নয়। আর প্রমাণিত হলেও—যেসব ইমাম আওয়াজ নাকচ করেন তাদের কাছে—সেগুলোর ভিন্ন অর্থ ও ভিন্ন ব্যাখ্যা (যেমন ফেরেশতার আওয়াজ) ইত্যাদি রয়েছে। বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “আল্লাহর সিফাত সৃষ্টির সিফাতের মতো ভাবা যাবে না। সুতরাং যদি বিশুদ্ধ হাদিসে 'আওয়াজ' প্রমাণিত হয়, তবে সেটার উপর ঈমান আনা ওয়াজিব হবে। এরপর সেটাকে তাফবিজ অথবা তাবিল করা হবে।”৮৯৬
ইমাম বুখারি রহ. 'খালকু আফআলিল ইবাদ' গ্রন্থে বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা (কিয়ামতের দিন) এমন আওয়াজে ডাক দেবেন, যা দূরের ও কাছের সবাই সমানভাবে শুনতে পারবে।'৮৯৭ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর জন্য 'আওয়াজ'সহ কালাম সাব্যস্ত করতেন। আবদুল্লাহ বলেন, আমি আব্বাজান (আহমদ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, একদল লোক বলে, আল্লাহ তায়ালা যখন মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে কথা বলেছেন, তখন আওয়াজসহ বলেননি। আব্বা বললেন, 'বরং হ্যাঁ, তোমার প্রভু আওয়াজসহ কথা বলেছেন। আমরা এসব হাদিস যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দেবো।'৮৯৮
আমাদের জানা নেই ইমাম আজম উপরের হাদিসটি (অথবা হাদিসগুলো) গ্রহণযোগ্য মনে করতেন কি করতেন না। তবে এ ব্যাপারে যেহেতু সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ নীরব ছিলেন (যে কারণে পরবর্তী সময়ে বুখারি ও আহমদ ছাড়া এ ব্যাপারে সালাফের উল্লেখযোগ্য কারও সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই), ফলে ইমাম আজম সম্ভবত এ ব্যাপারে নীরব থাকাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হ্যাঁ, ইমামের বক্তব্য 'কুরআন (পাঠের সময়) আমাদের শব্দগুলো সৃষ্ট। আমাদের (কুরআনের) পাঠ (তেলাওয়াত) সৃষ্ট'৮৯৯—এটাসহ পিছনে উল্লিখিত আরও কিছু বক্তব্য দ্বারা কেউ বুঝতে পারে যে, ইমাম 'আওয়াজ'-কেও নাকচ করেছেন। কিন্তু সেটা স্পষ্ট নয়। অর্থাৎ, ইমাম স্পষ্টভাবে শব্দ ও অক্ষরকে যেমন নাকচ করেছেন, আওয়াজকে সেভাবে নাকচ করেননি। আল্লাহ ভালো জানেন。
টিকাঃ
৮৯৩. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৮৯৪. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৮৯৫. বুখারি (কিতাবুত তাওহিদ: ৭৪৮১ নং হাদিসের আগে মুআল্লাকান বর্ণিত)।
৮৯৬. দেখুন: ফাতহুল বারি: (১৩/৪৫৮)।
৮৯৭. খালকু আফআলিল ইবাদ (২৪০)।
৮৯৮. দেখুন: আস-সুন্নাহ (২৩৮)। ফাতহুল বারি (১৩/৪৬০)।
৮৯৯. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনাতে স্পষ্ট যে, আলোচিত দুটো ধারার মাঝেই আল্লাহর কালামের ক্ষেত্রে এমন অনেক বক্তব্যের উদ্ভব ঘটেছে, যা ইমাম বলে যাননি। স্রেফ ইমাম আজম নন, সালাফে সালেহিনের প্রথম যুগ তথা সাহাবা ও তাবেয়িদের কেউ বলেননি। বরং সময়ের বিবর্তনে এসব বক্তব্য তৈরি হয়েছে। এগুলোকে কেন্দ্র করে হাজার বছর ধরে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-পর্যালোচনা ও দলিল-প্রমাণ গড়ে উঠেছে। বরং আমরা দেখেছি কীভাবে একই ধারার আলেমদের মাঝেও পরস্পরবিরোধী ও সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে।
এসব বিষয়ে তর্ক যেহেতু শেষ হবার নয়, ফলে এখানেই আমরা আমাদের কথা শেষ করতে চাচ্ছি। বাস্তব কথা হলো, এসব মাসআলা একজন মুসলিমের দ্বীন ও দুনিয়া, ইহকাল ও পরকাল কোনো জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নয়। ফলে কুরআনে এ সম্পর্কে কোনো তফসিলি আলোচনা করা হয়নি, হাদিসেও এ ব্যাপারে সবিস্তার এবং এটাকে মুখ্য বানিয়ে কিছু বলা হয়নি। এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িনসহ সালাফের প্রথম প্রজন্মের কেউ এ ব্যাপারে দীর্ঘ কথা বলেননি। এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় আরও পরে। তাই কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে এগুলোর কোনো একটাকে চূড়ান্ত ও দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ করার সুযোগ নেই।
তবে কিছু প্রশ্ন করার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। ফিতরত ও সুস্থ আকল দিয়ে কিছু ভাবার সুযোগ আছে। আল্লাহ তায়ালা তো সৃষ্টি নন, সৃষ্টিকর্তা। তাহলে আমরা সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলব কেন? মানুষ স্বপ্নে এমন অনেককিছু দেখে, বাস্তবে যেসব বস্তুর অস্তিত্ব নেই। স্বপ্নে অনেককিছু শোনে, বাস্তবে যেসব কথার অস্তিত্ব নেই। অন্ধ ব্যক্তি স্বপ্নে স্বাভাবিক মানুষের মতোই দেখতে সক্ষম। বধির স্বপ্নে শুনতে সক্ষম। এমনকি জন্মাদ্ধ কিংবা জন্ম থেকে বধির ব্যক্তি, যার বাস্তব জগতের দৃশ্য কিংবা শব্দের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তারাও স্বপ্নে বিভিন্ন টাইপের ভিজুয়াল ও অডিটোরি সেন্সেশন এক্সপেরিয়েন্স করে, বিভিন্ন মাত্রায় দেখা ও শ্রবণের অভিজ্ঞতা নেয়। পার্থক্য এটুকু যে, তারা সেগুলোর হাকিকত ও কাইফিয়্যাত (স্বরূপ ও ধরন) বর্ণনা করতে পারে না। উপলব্ধি করতে পারে না। স্বপ্নের ঘোরে ঘুমন্ত মানুষ নিজেকে যুদ্ধক্ষেত্রে আবিষ্কার করে; খাটে-শোয়া মানুষ নিজেকে সমুদ্রের তুফানের সামনে লড়াই করতে দেখে, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সবকিছু অনুভব করে, অথচ বাস্তবতার সঙ্গে তার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। সে নীরব বদ্ধ ঘরে ঘুমন্ত।
পৃথিবীর সিস্টেমে যদি এগুলো সম্ভব হয়, আল্লাহর ক্ষেত্রে কেন অসম্ভব ভাবছি? আমাদের দেখতে চোখ লাগে, ধরতে হাত লাগে, শুনতে কান লাগে। আল্লাহর এগুলোর কিছুই প্রয়োজন নেই। আল্লাহর ডাক দেওয়া এবং কথা বলার জন্য যদি অক্ষর, আওয়াজ ইত্যাদি উপকরণ দরকার হয়, তবে দেখতে চোখ দরকার হবে, ভাবতে ব্রেইন দরকার হবে, সন্তুষ্ট ও অসন্তুষ্ট হতে হৃদয় দরকার হবে। অথচ তিনি এসব মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত।
একইভাবে আল্লাহ আমাদের দেখার জন্য চোখ উপকরণ হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি চাইলে আমাদের চোখ ছাড়াও দেখাতে পারেন। আমাদের তিনি শোনার জন্য কান দিয়েছেন। ভাষা, অক্ষর ও আওয়াজ উপকরণ হিসেবে তৈরি করেছেন। তিনি চাইলে আমাদের এসব মাধ্যম ছাড়াও শোনাতে পারেন। মুসা আলাইহিস সালামকে শোনাতে গাছকে মাধ্যম ধরতে হবে কেন? গাছের মাঝে আওয়াজ সৃষ্টি করে সেটা শোনাতে হবে কেন? তাহলে তো মুসা আল্লাহর সঙ্গে নয়, গাছের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা কি উপকরণ ছাড়া মুসাকে কথা শোনাতে পারেন না? অবশ্যই পারেন।
কাযি বাযদাবি এখানে সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “কেউ বলতে পারে—'অক্ষর ও আওয়াজ ছাড়া কথার অস্তিত্ব নেই।' এটা ভিত্তিহীন দাবি। পৃথিবীতে আমাদের সামনেও অক্ষর ও আওয়াজ ছাড়া কথার অস্তিত্ব দেখি। আল্লাহ তায়ালা অনেক জড় বস্তুর কথার বিষয়টি কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তাদের কথা বলতে কি অক্ষর ও আওয়াজ লাগে? বরং কালামের ক্ষেত্রে অক্ষর ও আওয়াজের শর্ত করলে অন্যান্য সিফাতের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করতে হবে। যেমন—আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) সিফাতের জন্য মস্তিষ্ক ও হৃদয় ইত্যাদির শর্ত লাগবে। অথচ আল্লাহর ক্ষেত্রে এসব বিষয় প্রযোজ্য নয়। মোটকথা, সৃষ্টিকে বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন উপকরণের মুখাপেক্ষী হতে হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী।”৯০০
একইভাবে কুরআনে কারিমে লিখিত অক্ষরগুলোকে আল্লাহর হাকিকি কালাম বললে যথেষ্ট জটিলতা আছে। আপনি পেন্সিল দিয়ে কোনো আয়াত লিখলেন। আপনার লেখা অক্ষরগুলো মাত্রই অস্তিত্বে এলো। আবার চাইলে আপনি নিমিষেই সেটা মুছে ফেলতে পারবেন। তাহলে এটাকে আল্লাহর ‘হাকিকি’ কালাম বলার অর্থ কী? কোনো অর্থ নেই। হ্যাঁ, আপনি যা লিখছেন সেটা আল্লাহর কালাম, আপনি মুখে যা পড়ছেন সেটা আল্লাহর কালাম। কিন্তু আপনার লেখাটা বা সামনে বিদ্যমান লিখিত অক্ষরগুলো কিংবা আপনার উচ্চারণ করা শব্দগুলো আপনার নিজের কাজ; এগুলো আল্লাহর সিফাত নয়। অথচ কেউ কেউ যারা লিখিত অক্ষরকে কালাম না বলবে, তাদের কাফের ফাতাওয়া দিয়েছেন। উক্ত ফাতাওয়ার আলোকে তো ইমাম আজমও কাফের হয়ে যান। কারণ তিনি বলেছেন, ‘লেখা, অক্ষর, শব্দ ও আয়াত—এগুলো কুরআনের নির্দেশক। মানুষের প্রয়োজনে এগুলো অস্তিত্বে এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। সেই কালামের অর্থ বোধগম্য হয় এসব উপকরণের মধ্য দিয়ে’।৯০১
তা ছাড়া, আল্লাহ ‘কথা বলেন’—এতটুকুই তাঁর সিফাত সাব্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। এতটুকুই তানযিহ। এরপর কীভাবে কথা বলেন, সেটা মূলত কাইফিয়্যাত (ধরন) অনুসন্ধান, যা শরিয়তে মূলত নিষিদ্ধ। অথচ এখন সেই নিষিদ্ধের সন্ধানকেই আমরা আমাদের মূল ব্যস্ততা বানিয়ে রেখেছি। ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার সকল সিফাত (গুণ) মাখলুকের সিফাতের (গুণ) চেয়ে ভিন্ন। তিনি জানেন; কিন্তু আমাদের জানার মতো নয়। তিনি শক্তি রাখেন; কিন্তু আমাদের শক্তির মতো নয়। তিনি দেখেন; তবে আমাদের দেখার মতো নয়। তিনি কথা বলেন; তবে আমাদের কথা বলার মতো নয়। তিনি শোনেন; তবে আমাদের শোনার মতো নয়। আমরা বিভিন্ন উপকরণ ও অক্ষরের মাধ্যমে কথা বলে থাকি। তিনি কথা বলেন কোনো উপকরণ ও অক্ষর ছাড়াই। অক্ষর হলো সৃষ্ট, কিন্তু আল্লাহর কালাম সৃষ্ট নয়’।৯০২ তহাবি বলেন, কুরআন আল্লাহর কালাম। এর উৎস আল্লাহ তায়ালার ‘কথা’ যার স্বরূপ তিনিই জানেন।৯০৩
ফলে ‘কুরআন আল্লাহর কালাম; মাখলুক নয়’ এবং ‘কালাম আল্লাহর সিফাত’—এটুকু বিশ্বাস করাই যথেষ্ট। এর অতিরিক্ত অনুসন্ধান এবং সেটা নিয়ে বিতর্ক পরিত্যাজ্য। এটাই সালাফে সালেহিনের আকিদা। আর এটুকুতে গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত। ফলে ঐকমত্যপূর্ণ মৌলিক বিষয় বাদ দিয়ে আল্লাহর কালাম কি 'আত্মকথা' না 'অক্ষর ও আওয়াজের সমন্বয়ে কথা'-এ ধরনের শাখাগত অপ্রয়োজনীয় মতভেদপূর্ণ বিষয়ে অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করা, সেগুলোকে ঈমান ও আকিদার মৌলিক বিষয়ের পর্যায়ে উন্নীত করে চিরদিন বিতর্ক জিইয়ে রাখা দ্বীন ও উম্মাহর ক্ষতি বই উপকার করবে না; আগেও উপকার করেনি। হাদিসের সনদসংক্রান্ত ইলম (জারহ ও তাদিল)-এর ক্ষেত্রে এই বিতর্ক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। মুহাদ্দিসদের এমন জটিলতায় জড়িয়ে ফেলেছিল, যার কোনো দরকার ছিল না। এই মতভেদকে কেন্দ্র করে রিজালের কিতাবগুলোতে অভিযোগ-অপবাদ, কাদা ছোড়াছুড়ি, অতিরঞ্জিত মন্তব্য এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সীমালঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।৯০৪ এটা পরবর্তীকালেও অব্যাহত থেকেছে। এমনকি সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ. সরকারিভাবে আইন করে আল্লাহর কালাম 'অক্ষর ও আওয়াজ'সহ নাকি ছাড়া এ ব্যাপারে ঘাঁটাঘাঁটি নিষিদ্ধ করেছিলেন।৯০৫
এক্ষেত্রে আমাদের আদর্শ হতে পারেন ইমাম আজমসহ হানাফি মাযহাবের প্রথম যুগের আলেমগণ, যারা আকিদার ক্ষেত্রে হুবহু ইমাম আজম ও সালাফে সালেহিনের অনুসরণ করেছেন, পরবর্তীকালে উদ্ভাবিত বিভিন্ন ইজতিহাদি ব্যাখ্যা কিংবা অতিরঞ্জন পরিহার করেছেন। তাদের মাঝে অন্যতম হলেন আহলে সুন্নাতের ইমাম আবু জাফর তহাবি রহ.। তিনি কুরআনকেন্দ্রিক বিতর্কের চরম সংক্ষুব্ধ শতাব্দে জন্ম নিয়েও কুরআনকেন্দ্রিক যতটুকু আকিদা বর্ণনা করেছেন, ততটুকুকে উম্মাহর সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। তহাবি বলেন, “কুরআন আল্লাহর কালাম। এর উৎস আল্লাহ তায়ালার 'কথা', যার স্বরূপ তিনিই জানেন। এটা তিনি তাঁর রাসুলের উপর ওহি হিসেবে পাঠিয়েছেন। মুমিনগণ এটা হক হিসেবে সত্যায়ন করেছেন। এটাকে প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর কথা হিসেবে দৃঢ় বিশ্বাস করেছেন। এটা সৃষ্টির কথার মতো সৃষ্ট নয়। সুতরাং যদি কেউ মনে করে কুরআন মানুষের কথা, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা এমন ব্যক্তির নিন্দা-ভর্ৎসনা করেছেন। তাকে জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন, যেমনটি কুরআনে তিনি বলেছেন, 'আমি তাকে সাকার (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করব।' সুতরাং কুরআনকে 'এটা তো কেবল মানুষের কথা' সাব্যস্তকারীকে আল্লাহ তায়ালা যখন জাহান্নামে নিক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আমরা নিশ্চিতরূপে জানতে পারলাম, কুরআন মানুষের স্রষ্টার কথা, মানুষের কথার সঙ্গে এর সাদৃশ্য নেই।”৯০৬ আরও একজন হলেন ইমাম আবু হাফস বুখারি রহ.। তিনি লিখেন, 'কুরআন আল্লাহর কালাম, গাইরে মাখলুক। কারণ, কুরআন আল্লাহর প্রকৃত কালাম, রূপক নয়। ফলে কুরআনকে মাখলুক বললে আল্লাহর সিফাতকে মাখলুক বলা হয়। আর এটা কুফর।৯০৭ আল্লাহর কালাম গুণের ব্যাপারে এটুকু আকিদাই যথেষ্ট ও নিরাপদ।
টিকাঃ
৯০০. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৬৪)।
৯০১. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৯০২. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৯০৩. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।
৯০৪. দেখুন: আল-ইখতিলাফ ফিল-লফজ (২০)। আল-ইমতা' (৫৮-৬০)।
৯০৫. দেখুন: তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ আল-কুবরা, তাজুদ্দিন সুবকি (৭/৩৫১)।
৯০৬. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।
৯০৭. আস-সাওয়াদুল আজম (১৭)।
উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনাতে স্পষ্ট যে, আলোচিত দুটো ধারার মাঝেই আল্লাহর কালামের ক্ষেত্রে এমন অনেক বক্তব্যের উদ্ভব ঘটেছে, যা ইমাম বলে যাননি। স্রেফ ইমাম আজম নন, সালাফে সালেহিনের প্রথম যুগ তথা সাহাবা ও তাবেয়িদের কেউ বলেননি। বরং সময়ের বিবর্তনে এসব বক্তব্য তৈরি হয়েছে। এগুলোকে কেন্দ্র করে হাজার বছর ধরে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-পর্যালোচনা ও দলিল-প্রমাণ গড়ে উঠেছে। বরং আমরা দেখেছি কীভাবে একই ধারার আলেমদের মাঝেও পরস্পরবিরোধী ও সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে।
এসব বিষয়ে তর্ক যেহেতু শেষ হবার নয়, ফলে এখানেই আমরা আমাদের কথা শেষ করতে চাচ্ছি। বাস্তব কথা হলো, এসব মাসআলা একজন মুসলিমের দ্বীন ও দুনিয়া, ইহকাল ও পরকাল কোনো জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নয়। ফলে কুরআনে এ সম্পর্কে কোনো তফসিলি আলোচনা করা হয়নি, হাদিসেও এ ব্যাপারে সবিস্তার এবং এটাকে মুখ্য বানিয়ে কিছু বলা হয়নি। এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িনসহ সালাফের প্রথম প্রজন্মের কেউ এ ব্যাপারে দীর্ঘ কথা বলেননি। এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় আরও পরে। তাই কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে এগুলোর কোনো একটাকে চূড়ান্ত ও দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ করার সুযোগ নেই।
তবে কিছু প্রশ্ন করার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। ফিতরত ও সুস্থ আকল দিয়ে কিছু ভাবার সুযোগ আছে। আল্লাহ তায়ালা তো সৃষ্টি নন, সৃষ্টিকর্তা। তাহলে আমরা সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলব কেন? মানুষ স্বপ্নে এমন অনেককিছু দেখে, বাস্তবে যেসব বস্তুর অস্তিত্ব নেই। স্বপ্নে অনেককিছু শোনে, বাস্তবে যেসব কথার অস্তিত্ব নেই। অন্ধ ব্যক্তি স্বপ্নে স্বাভাবিক মানুষের মতোই দেখতে সক্ষম। বধির স্বপ্নে শুনতে সক্ষম। এমনকি জন্মাদ্ধ কিংবা জন্ম থেকে বধির ব্যক্তি, যার বাস্তব জগতের দৃশ্য কিংবা শব্দের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তারাও স্বপ্নে বিভিন্ন টাইপের ভিজুয়াল ও অডিটোরি সেন্সেশন এক্সপেরিয়েন্স করে, বিভিন্ন মাত্রায় দেখা ও শ্রবণের অভিজ্ঞতা নেয়। পার্থক্য এটুকু যে, তারা সেগুলোর হাকিকত ও কাইফিয়্যাত (স্বরূপ ও ধরন) বর্ণনা করতে পারে না। উপলব্ধি করতে পারে না। স্বপ্নের ঘোরে ঘুমন্ত মানুষ নিজেকে যুদ্ধক্ষেত্রে আবিষ্কার করে; খাটে-শোয়া মানুষ নিজেকে সমুদ্রের তুফানের সামনে লড়াই করতে দেখে, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সবকিছু অনুভব করে, অথচ বাস্তবতার সঙ্গে তার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। সে নীরব বদ্ধ ঘরে ঘুমন্ত।
পৃথিবীর সিস্টেমে যদি এগুলো সম্ভব হয়, আল্লাহর ক্ষেত্রে কেন অসম্ভব ভাবছি? আমাদের দেখতে চোখ লাগে, ধরতে হাত লাগে, শুনতে কান লাগে। আল্লাহর এগুলোর কিছুই প্রয়োজন নেই। আল্লাহর ডাক দেওয়া এবং কথা বলার জন্য যদি অক্ষর, আওয়াজ ইত্যাদি উপকরণ দরকার হয়, তবে দেখতে চোখ দরকার হবে, ভাবতে ব্রেইন দরকার হবে, সন্তুষ্ট ও অসন্তুষ্ট হতে হৃদয় দরকার হবে। অথচ তিনি এসব মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত।
একইভাবে আল্লাহ আমাদের দেখার জন্য চোখ উপকরণ হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি চাইলে আমাদের চোখ ছাড়াও দেখাতে পারেন। আমাদের তিনি শোনার জন্য কান দিয়েছেন। ভাষা, অক্ষর ও আওয়াজ উপকরণ হিসেবে তৈরি করেছেন। তিনি চাইলে আমাদের এসব মাধ্যম ছাড়াও শোনাতে পারেন। মুসা আলাইহিস সালামকে শোনাতে গাছকে মাধ্যম ধরতে হবে কেন? গাছের মাঝে আওয়াজ সৃষ্টি করে সেটা শোনাতে হবে কেন? তাহলে তো মুসা আল্লাহর সঙ্গে নয়, গাছের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা কি উপকরণ ছাড়া মুসাকে কথা শোনাতে পারেন না? অবশ্যই পারেন।
কাযি বাযদাবি এখানে সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “কেউ বলতে পারে—'অক্ষর ও আওয়াজ ছাড়া কথার অস্তিত্ব নেই।' এটা ভিত্তিহীন দাবি। পৃথিবীতে আমাদের সামনেও অক্ষর ও আওয়াজ ছাড়া কথার অস্তিত্ব দেখি। আল্লাহ তায়ালা অনেক জড় বস্তুর কথার বিষয়টি কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তাদের কথা বলতে কি অক্ষর ও আওয়াজ লাগে? বরং কালামের ক্ষেত্রে অক্ষর ও আওয়াজের শর্ত করলে অন্যান্য সিফাতের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করতে হবে। যেমন—আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) সিফাতের জন্য মস্তিষ্ক ও হৃদয় ইত্যাদির শর্ত লাগবে। অথচ আল্লাহর ক্ষেত্রে এসব বিষয় প্রযোজ্য নয়। মোটকথা, সৃষ্টিকে বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন উপকরণের মুখাপেক্ষী হতে হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী।”৯০০
একইভাবে কুরআনে কারিমে লিখিত অক্ষরগুলোকে আল্লাহর হাকিকি কালাম বললে যথেষ্ট জটিলতা আছে। আপনি পেন্সিল দিয়ে কোনো আয়াত লিখলেন। আপনার লেখা অক্ষরগুলো মাত্রই অস্তিত্বে এলো। আবার চাইলে আপনি নিমিষেই সেটা মুছে ফেলতে পারবেন। তাহলে এটাকে আল্লাহর ‘হাকিকি’ কালাম বলার অর্থ কী? কোনো অর্থ নেই। হ্যাঁ, আপনি যা লিখছেন সেটা আল্লাহর কালাম, আপনি মুখে যা পড়ছেন সেটা আল্লাহর কালাম। কিন্তু আপনার লেখাটা বা সামনে বিদ্যমান লিখিত অক্ষরগুলো কিংবা আপনার উচ্চারণ করা শব্দগুলো আপনার নিজের কাজ; এগুলো আল্লাহর সিফাত নয়। অথচ কেউ কেউ যারা লিখিত অক্ষরকে কালাম না বলবে, তাদের কাফের ফাতাওয়া দিয়েছেন। উক্ত ফাতাওয়ার আলোকে তো ইমাম আজমও কাফের হয়ে যান। কারণ তিনি বলেছেন, ‘লেখা, অক্ষর, শব্দ ও আয়াত—এগুলো কুরআনের নির্দেশক। মানুষের প্রয়োজনে এগুলো অস্তিত্বে এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। সেই কালামের অর্থ বোধগম্য হয় এসব উপকরণের মধ্য দিয়ে’।৯০১
তা ছাড়া, আল্লাহ ‘কথা বলেন’—এতটুকুই তাঁর সিফাত সাব্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। এতটুকুই তানযিহ। এরপর কীভাবে কথা বলেন, সেটা মূলত কাইফিয়্যাত (ধরন) অনুসন্ধান, যা শরিয়তে মূলত নিষিদ্ধ। অথচ এখন সেই নিষিদ্ধের সন্ধানকেই আমরা আমাদের মূল ব্যস্ততা বানিয়ে রেখেছি। ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার সকল সিফাত (গুণ) মাখলুকের সিফাতের (গুণ) চেয়ে ভিন্ন। তিনি জানেন; কিন্তু আমাদের জানার মতো নয়। তিনি শক্তি রাখেন; কিন্তু আমাদের শক্তির মতো নয়। তিনি দেখেন; তবে আমাদের দেখার মতো নয়। তিনি কথা বলেন; তবে আমাদের কথা বলার মতো নয়। তিনি শোনেন; তবে আমাদের শোনার মতো নয়। আমরা বিভিন্ন উপকরণ ও অক্ষরের মাধ্যমে কথা বলে থাকি। তিনি কথা বলেন কোনো উপকরণ ও অক্ষর ছাড়াই। অক্ষর হলো সৃষ্ট, কিন্তু আল্লাহর কালাম সৃষ্ট নয়’।৯০২ তহাবি বলেন, কুরআন আল্লাহর কালাম। এর উৎস আল্লাহ তায়ালার ‘কথা’ যার স্বরূপ তিনিই জানেন।৯০৩
ফলে ‘কুরআন আল্লাহর কালাম; মাখলুক নয়’ এবং ‘কালাম আল্লাহর সিফাত’—এটুকু বিশ্বাস করাই যথেষ্ট। এর অতিরিক্ত অনুসন্ধান এবং সেটা নিয়ে বিতর্ক পরিত্যাজ্য। এটাই সালাফে সালেহিনের আকিদা। আর এটুকুতে গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত। ফলে ঐকমত্যপূর্ণ মৌলিক বিষয় বাদ দিয়ে আল্লাহর কালাম কি 'আত্মকথা' না 'অক্ষর ও আওয়াজের সমন্বয়ে কথা'-এ ধরনের শাখাগত অপ্রয়োজনীয় মতভেদপূর্ণ বিষয়ে অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করা, সেগুলোকে ঈমান ও আকিদার মৌলিক বিষয়ের পর্যায়ে উন্নীত করে চিরদিন বিতর্ক জিইয়ে রাখা দ্বীন ও উম্মাহর ক্ষতি বই উপকার করবে না; আগেও উপকার করেনি। হাদিসের সনদসংক্রান্ত ইলম (জারহ ও তাদিল)-এর ক্ষেত্রে এই বিতর্ক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। মুহাদ্দিসদের এমন জটিলতায় জড়িয়ে ফেলেছিল, যার কোনো দরকার ছিল না। এই মতভেদকে কেন্দ্র করে রিজালের কিতাবগুলোতে অভিযোগ-অপবাদ, কাদা ছোড়াছুড়ি, অতিরঞ্জিত মন্তব্য এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সীমালঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।৯০৪ এটা পরবর্তীকালেও অব্যাহত থেকেছে। এমনকি সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ. সরকারিভাবে আইন করে আল্লাহর কালাম 'অক্ষর ও আওয়াজ'সহ নাকি ছাড়া এ ব্যাপারে ঘাঁটাঘাঁটি নিষিদ্ধ করেছিলেন।৯০৫
এক্ষেত্রে আমাদের আদর্শ হতে পারেন ইমাম আজমসহ হানাফি মাযহাবের প্রথম যুগের আলেমগণ, যারা আকিদার ক্ষেত্রে হুবহু ইমাম আজম ও সালাফে সালেহিনের অনুসরণ করেছেন, পরবর্তীকালে উদ্ভাবিত বিভিন্ন ইজতিহাদি ব্যাখ্যা কিংবা অতিরঞ্জন পরিহার করেছেন। তাদের মাঝে অন্যতম হলেন আহলে সুন্নাতের ইমাম আবু জাফর তহাবি রহ.। তিনি কুরআনকেন্দ্রিক বিতর্কের চরম সংক্ষুব্ধ শতাব্দে জন্ম নিয়েও কুরআনকেন্দ্রিক যতটুকু আকিদা বর্ণনা করেছেন, ততটুকুকে উম্মাহর সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। তহাবি বলেন, “কুরআন আল্লাহর কালাম। এর উৎস আল্লাহ তায়ালার 'কথা', যার স্বরূপ তিনিই জানেন। এটা তিনি তাঁর রাসুলের উপর ওহি হিসেবে পাঠিয়েছেন। মুমিনগণ এটা হক হিসেবে সত্যায়ন করেছেন। এটাকে প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর কথা হিসেবে দৃঢ় বিশ্বাস করেছেন। এটা সৃষ্টির কথার মতো সৃষ্ট নয়। সুতরাং যদি কেউ মনে করে কুরআন মানুষের কথা, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা এমন ব্যক্তির নিন্দা-ভর্ৎসনা করেছেন। তাকে জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন, যেমনটি কুরআনে তিনি বলেছেন, 'আমি তাকে সাকার (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করব।' সুতরাং কুরআনকে 'এটা তো কেবল মানুষের কথা' সাব্যস্তকারীকে আল্লাহ তায়ালা যখন জাহান্নামে নিক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আমরা নিশ্চিতরূপে জানতে পারলাম, কুরআন মানুষের স্রষ্টার কথা, মানুষের কথার সঙ্গে এর সাদৃশ্য নেই।”৯০৬ আরও একজন হলেন ইমাম আবু হাফস বুখারি রহ.। তিনি লিখেন, 'কুরআন আল্লাহর কালাম, গাইরে মাখলুক। কারণ, কুরআন আল্লাহর প্রকৃত কালাম, রূপক নয়। ফলে কুরআনকে মাখলুক বললে আল্লাহর সিফাতকে মাখলুক বলা হয়। আর এটা কুফর।৯০৭ আল্লাহর কালাম গুণের ব্যাপারে এটুকু আকিদাই যথেষ্ট ও নিরাপদ।
টিকাঃ
৯০০. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৬৪)।
৯০১. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৯০২. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৯০৩. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।
৯০৪. দেখুন: আল-ইখতিলাফ ফিল-লফজ (২০)। আল-ইমতা' (৫৮-৬০)।
৯০৫. দেখুন: তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ আল-কুবরা, তাজুদ্দিন সুবকি (৭/৩৫১)।
৯০৬. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।
৯০৭. আস-সাওয়াদুল আজম (১৭)।
উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনাতে স্পষ্ট যে, আলোচিত দুটো ধারার মাঝেই আল্লাহর কালামের ক্ষেত্রে এমন অনেক বক্তব্যের উদ্ভব ঘটেছে, যা ইমাম বলে যাননি। স্রেফ ইমাম আজম নন, সালাফে সালেহিনের প্রথম যুগ তথা সাহাবা ও তাবেয়িদের কেউ বলেননি। বরং সময়ের বিবর্তনে এসব বক্তব্য তৈরি হয়েছে। এগুলোকে কেন্দ্র করে হাজার বছর ধরে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-পর্যালোচনা ও দলিল-প্রমাণ গড়ে উঠেছে। বরং আমরা দেখেছি কীভাবে একই ধারার আলেমদের মাঝেও পরস্পরবিরোধী ও সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে।
এসব বিষয়ে তর্ক যেহেতু শেষ হবার নয়, ফলে এখানেই আমরা আমাদের কথা শেষ করতে চাচ্ছি। বাস্তব কথা হলো, এসব মাসআলা একজন মুসলিমের দ্বীন ও দুনিয়া, ইহকাল ও পরকাল কোনো জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নয়। ফলে কুরআনে এ সম্পর্কে কোনো তফসিলি আলোচনা করা হয়নি, হাদিসেও এ ব্যাপারে সবিস্তার এবং এটাকে মুখ্য বানিয়ে কিছু বলা হয়নি। এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িনসহ সালাফের প্রথম প্রজন্মের কেউ এ ব্যাপারে দীর্ঘ কথা বলেননি। এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় আরও পরে। তাই কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে এগুলোর কোনো একটাকে চূড়ান্ত ও দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ করার সুযোগ নেই।
তবে কিছু প্রশ্ন করার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। ফিতরত ও সুস্থ আকল দিয়ে কিছু ভাবার সুযোগ আছে। আল্লাহ তায়ালা তো সৃষ্টি নন, সৃষ্টিকর্তা। তাহলে আমরা সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলব কেন? মানুষ স্বপ্নে এমন অনেককিছু দেখে, বাস্তবে যেসব বস্তুর অস্তিত্ব নেই। স্বপ্নে অনেককিছু শোনে, বাস্তবে যেসব কথার অস্তিত্ব নেই। অন্ধ ব্যক্তি স্বপ্নে স্বাভাবিক মানুষের মতোই দেখতে সক্ষম। বধির স্বপ্নে শুনতে সক্ষম। এমনকি জন্মাদ্ধ কিংবা জন্ম থেকে বধির ব্যক্তি, যার বাস্তব জগতের দৃশ্য কিংবা শব্দের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তারাও স্বপ্নে বিভিন্ন টাইপের ভিজুয়াল ও অডিটোরি সেন্সেশন এক্সপেরিয়েন্স করে, বিভিন্ন মাত্রায় দেখা ও শ্রবণের অভিজ্ঞতা নেয়। পার্থক্য এটুকু যে, তারা সেগুলোর হাকিকত ও কাইফিয়্যাত (স্বরূপ ও ধরন) বর্ণনা করতে পারে না। উপলব্ধি করতে পারে না। স্বপ্নের ঘোরে ঘুমন্ত মানুষ নিজেকে যুদ্ধক্ষেত্রে আবিষ্কার করে; খাটে-শোয়া মানুষ নিজেকে সমুদ্রের তুফানের সামনে লড়াই করতে দেখে, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সবকিছু অনুভব করে, অথচ বাস্তবতার সঙ্গে তার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। সে নীরব বদ্ধ ঘরে ঘুমন্ত।
পৃথিবীর সিস্টেমে যদি এগুলো সম্ভব হয়, আল্লাহর ক্ষেত্রে কেন অসম্ভব ভাবছি? আমাদের দেখতে চোখ লাগে, ধরতে হাত লাগে, শুনতে কান লাগে। আল্লাহর এগুলোর কিছুই প্রয়োজন নেই। আল্লাহর ডাক দেওয়া এবং কথা বলার জন্য যদি অক্ষর, আওয়াজ ইত্যাদি উপকরণ দরকার হয়, তবে দেখতে চোখ দরকার হবে, ভাবতে ব্রেইন দরকার হবে, সন্তুষ্ট ও অসন্তুষ্ট হতে হৃদয় দরকার হবে। অথচ তিনি এসব মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত।
একইভাবে আল্লাহ আমাদের দেখার জন্য চোখ উপকরণ হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি চাইলে আমাদের চোখ ছাড়াও দেখাতে পারেন। আমাদের তিনি শোনার জন্য কান দিয়েছেন। ভাষা, অক্ষর ও আওয়াজ উপকরণ হিসেবে তৈরি করেছেন। তিনি চাইলে আমাদের এসব মাধ্যম ছাড়াও শোনাতে পারেন। মুসা আলাইহিস সালামকে শোনাতে গাছকে মাধ্যম ধরতে হবে কেন? গাছের মাঝে আওয়াজ সৃষ্টি করে সেটা শোনাতে হবে কেন? তাহলে তো মুসা আল্লাহর সঙ্গে নয়, গাছের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা কি উপকরণ ছাড়া মুসাকে কথা শোনাতে পারেন না? অবশ্যই পারেন।
কাযি বাযদাবি এখানে সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “কেউ বলতে পারে—'অক্ষর ও আওয়াজ ছাড়া কথার অস্তিত্ব নেই।' এটা ভিত্তিহীন দাবি। পৃথিবীতে আমাদের সামনেও অক্ষর ও আওয়াজ ছাড়া কথার অস্তিত্ব দেখি। আল্লাহ তায়ালা অনেক জড় বস্তুর কথার বিষয়টি কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তাদের কথা বলতে কি অক্ষর ও আওয়াজ লাগে? বরং কালামের ক্ষেত্রে অক্ষর ও আওয়াজের শর্ত করলে অন্যান্য সিফাতের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করতে হবে। যেমন—আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) সিফাতের জন্য মস্তিষ্ক ও হৃদয় ইত্যাদির শর্ত লাগবে। অথচ আল্লাহর ক্ষেত্রে এসব বিষয় প্রযোজ্য নয়। মোটকথা, সৃষ্টিকে বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন উপকরণের মুখাপেক্ষী হতে হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী।”৯০০
একইভাবে কুরআনে কারিমে লিখিত অক্ষরগুলোকে আল্লাহর হাকিকি কালাম বললে যথেষ্ট জটিলতা আছে। আপনি পেন্সিল দিয়ে কোনো আয়াত লিখলেন। আপনার লেখা অক্ষরগুলো মাত্রই অস্তিত্বে এলো। আবার চাইলে আপনি নিমিষেই সেটা মুছে ফেলতে পারবেন। তাহলে এটাকে আল্লাহর ‘হাকিকি’ কালাম বলার অর্থ কী? কোনো অর্থ নেই। হ্যাঁ, আপনি যা লিখছেন সেটা আল্লাহর কালাম, আপনি মুখে যা পড়ছেন সেটা আল্লাহর কালাম। কিন্তু আপনার লেখাটা বা সামনে বিদ্যমান লিখিত অক্ষরগুলো কিংবা আপনার উচ্চারণ করা শব্দগুলো আপনার নিজের কাজ; এগুলো আল্লাহর সিফাত নয়। অথচ কেউ কেউ যারা লিখিত অক্ষরকে কালাম না বলবে, তাদের কাফের ফাতাওয়া দিয়েছেন। উক্ত ফাতাওয়ার আলোকে তো ইমাম আজমও কাফের হয়ে যান। কারণ তিনি বলেছেন, ‘লেখা, অক্ষর, শব্দ ও আয়াত—এগুলো কুরআনের নির্দেশক। মানুষের প্রয়োজনে এগুলো অস্তিত্বে এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। সেই কালামের অর্থ বোধগম্য হয় এসব উপকরণের মধ্য দিয়ে’।৯০১
তা ছাড়া, আল্লাহ ‘কথা বলেন’—এতটুকুই তাঁর সিফাত সাব্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। এতটুকুই তানযিহ। এরপর কীভাবে কথা বলেন, সেটা মূলত কাইফিয়্যাত (ধরন) অনুসন্ধান, যা শরিয়তে মূলত নিষিদ্ধ। অথচ এখন সেই নিষিদ্ধের সন্ধানকেই আমরা আমাদের মূল ব্যস্ততা বানিয়ে রেখেছি। ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার সকল সিফাত (গুণ) মাখলুকের সিফাতের (গুণ) চেয়ে ভিন্ন। তিনি জানেন; কিন্তু আমাদের জানার মতো নয়। তিনি শক্তি রাখেন; কিন্তু আমাদের শক্তির মতো নয়। তিনি দেখেন; তবে আমাদের দেখার মতো নয়। তিনি কথা বলেন; তবে আমাদের কথা বলার মতো নয়। তিনি শোনেন; তবে আমাদের শোনার মতো নয়। আমরা বিভিন্ন উপকরণ ও অক্ষরের মাধ্যমে কথা বলে থাকি। তিনি কথা বলেন কোনো উপকরণ ও অক্ষর ছাড়াই। অক্ষর হলো সৃষ্ট, কিন্তু আল্লাহর কালাম সৃষ্ট নয়’।৯০২ তহাবি বলেন, কুরআন আল্লাহর কালাম। এর উৎস আল্লাহ তায়ালার ‘কথা’ যার স্বরূপ তিনিই জানেন।৯০৩
ফলে ‘কুরআন আল্লাহর কালাম; মাখলুক নয়’ এবং ‘কালাম আল্লাহর সিফাত’—এটুকু বিশ্বাস করাই যথেষ্ট। এর অতিরিক্ত অনুসন্ধান এবং সেটা নিয়ে বিতর্ক পরিত্যাজ্য। এটাই সালাফে সালেহিনের আকিদা। আর এটুকুতে গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত। ফলে ঐকমত্যপূর্ণ মৌলিক বিষয় বাদ দিয়ে আল্লাহর কালাম কি 'আত্মকথা' না 'অক্ষর ও আওয়াজের সমন্বয়ে কথা'-এ ধরনের শাখাগত অপ্রয়োজনীয় মতভেদপূর্ণ বিষয়ে অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করা, সেগুলোকে ঈমান ও আকিদার মৌলিক বিষয়ের পর্যায়ে উন্নীত করে চিরদিন বিতর্ক জিইয়ে রাখা দ্বীন ও উম্মাহর ক্ষতি বই উপকার করবে না; আগেও উপকার করেনি। হাদিসের সনদসংক্রান্ত ইলম (জারহ ও তাদিল)-এর ক্ষেত্রে এই বিতর্ক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। মুহাদ্দিসদের এমন জটিলতায় জড়িয়ে ফেলেছিল, যার কোনো দরকার ছিল না। এই মতভেদকে কেন্দ্র করে রিজালের কিতাবগুলোতে অভিযোগ-অপবাদ, কাদা ছোড়াছুড়ি, অতিরঞ্জিত মন্তব্য এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সীমালঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।৯০৪ এটা পরবর্তীকালেও অব্যাহত থেকেছে। এমনকি সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ. সরকারিভাবে আইন করে আল্লাহর কালাম 'অক্ষর ও আওয়াজ'সহ নাকি ছাড়া এ ব্যাপারে ঘাঁটাঘাঁটি নিষিদ্ধ করেছিলেন।৯০৫
এক্ষেত্রে আমাদের আদর্শ হতে পারেন ইমাম আজমসহ হানাফি মাযহাবের প্রথম যুগের আলেমগণ, যারা আকিদার ক্ষেত্রে হুবহু ইমাম আজম ও সালাফে সালেহিনের অনুসরণ করেছেন, পরবর্তীকালে উদ্ভাবিত বিভিন্ন ইজতিহাদি ব্যাখ্যা কিংবা অতিরঞ্জন পরিহার করেছেন। তাদের মাঝে অন্যতম হলেন আহলে সুন্নাতের ইমাম আবু জাফর তহাবি রহ.। তিনি কুরআনকেন্দ্রিক বিতর্কের চরম সংক্ষুব্ধ শতাব্দে জন্ম নিয়েও কুরআনকেন্দ্রিক যতটুকু আকিদা বর্ণনা করেছেন, ততটুকুকে উম্মাহর সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। তহাবি বলেন, “কুরআন আল্লাহর কালাম। এর উৎস আল্লাহ তায়ালার 'কথা', যার স্বরূপ তিনিই জানেন। এটা তিনি তাঁর রাসুলের উপর ওহি হিসেবে পাঠিয়েছেন। মুমিনগণ এটা হক হিসেবে সত্যায়ন করেছেন। এটাকে প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর কথা হিসেবে দৃঢ় বিশ্বাস করেছেন। এটা সৃষ্টির কথার মতো সৃষ্ট নয়। সুতরাং যদি কেউ মনে করে কুরআন মানুষের কথা, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা এমন ব্যক্তির নিন্দা-ভর্ৎসনা করেছেন। তাকে জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন, যেমনটি কুরআনে তিনি বলেছেন, 'আমি তাকে সাকার (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করব।' সুতরাং কুরআনকে 'এটা তো কেবল মানুষের কথা' সাব্যস্তকারীকে আল্লাহ তায়ালা যখন জাহান্নামে নিক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আমরা নিশ্চিতরূপে জানতে পারলাম, কুরআন মানুষের স্রষ্টার কথা, মানুষের কথার সঙ্গে এর সাদৃশ্য নেই।”৯০৬ আরও একজন হলেন ইমাম আবু হাফস বুখারি রহ.। তিনি লিখেন, 'কুরআন আল্লাহর কালাম, গাইরে মাখলুক। কারণ, কুরআন আল্লাহর প্রকৃত কালাম, রূপক নয়। ফলে কুরআনকে মাখলুক বললে আল্লাহর সিফাতকে মাখলুক বলা হয়। আর এটা কুফর।৯০৭ আল্লাহর কালাম গুণের ব্যাপারে এটুকু আকিদাই যথেষ্ট ও নিরাপদ।
টিকাঃ
৯০০. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৬৪)।
৯০১. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৯০২. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৯০৩. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।
৯০৪. দেখুন: আল-ইখতিলাফ ফিল-লফজ (২০)। আল-ইমতা' (৫৮-৬০)।
৯০৫. দেখুন: তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ আল-কুবরা, তাজুদ্দিন সুবকি (৭/৩৫১)।
৯০৬. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।
৯০৭. আস-সাওয়াদুল আজম (১৭)।