📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলুক নয়

📄 কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলুক নয়


কুরআন আল্লাহ তায়ালার কালাম (তথা বাণী)—এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে কুরআন নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে উম্মাহর একদল বুদ্ধিপূজারী মানুষকে শয়তান উসকে দিয়েছে। তারা কুরআনের পয়গাম আত্মস্থ এবং নির্দেশ পালন করার পরিবর্তে কুরআনের স্বরূপ-প্রকৃতি নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্কে জড়িয়ে গিয়েছে। প্রথমে ছোট ছোট মজলিসে শুরু হওয়া এই তাত্ত্বিক বিতর্ক একসময় সর্বভুক দাবানলে পরিণত হয়ে গোটা উম্মাহকে কয়েক শতাব্দ জ্বালিয়েছে, পুড়িয়েছে, বরং আজও জ্বালাচ্ছে।

এই বিতর্কের সারকথা ছিল: কুরআন আল্লাহর কালাম ঠিক আছে, কিন্তু এই কালামের রূপরেখা কী? এটা কি আল্লাহর সরাসরি গুণ, নাকি তাঁর সৃষ্টি করা বস্তু? আল্লাহর সিফাত (গুণ) অস্বীকারকারী ভ্রান্ত লোকজন কুরআনকে আল্লাহর 'মাখলুক' তথা সৃষ্টি বলে আখ্যা দিলো, যাতে আল্লাহর কালাম সিফাত অস্বীকারের পথ প্রশস্ত হয়। আহলে সুন্নাতের আলেমগণ তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করলেন। কুরআনকে আল্লাহর কালাম ও 'গাইরে মাখলুক' তথা সৃষ্টি নয় বলে আখ্যা দিলেন।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানেই ঘটনা শেষ হলো না। দ্বীনের মৌলিক বিষয় বাদ দিয়ে অর্থহীন বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ির অনিবার্য কুফল সর্বত্র প্রকাশ পেতে থাকল। একসময় আহলে সুন্নাতের আলেমরাও জড়িয়ে গেলেন অভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিতর্কে। কয়েক শতাব্দ এটা চলল। মৌখিক কাদা ছোড়াছুড়ি একসময় সহিংসতায় রূপ নিল। পরস্পরের বিরুদ্ধে গিবত-শেকায়েত, অভিযোগ-অপবাদের তুফান বয়ে চলল। বরং একপর্যায়ে মামলা-হামলা, একে অন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, জালিমের কাছে বিচার দিয়ে শাস্তির মুখোমুখি করা, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়াসহ কোনোকিছু বাদ থাকল না। এটা ছিল একটা অভিশাপ, যা আজও উম্মাহর কাঁধ ভারী করে রেখেছে।

ইমাম আজম রহ. এই ফেতনার সূচনা নিজ চোখে দেখেছিলেন, যার সামনে চুপ থাকা সমীচীন ছিল না। ফলে তিনি হক প্রকাশ এবং বাতিলের খণ্ডন নিজের দায়িত্ব মনে করে সামনে এগিয়ে আসেন। কুরআন সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা তুলে ধরেন। ইমাম বলেন, “কুরআন আল্লাহ তায়ালার ‘কালাম' (বাণী), গ্রন্থে লিপিবদ্ধ, হৃদয়ে সুরক্ষিত, মুখে পঠিত, নবিজি (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ। ...কুরআন সৃষ্ট নয়। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালামসহ যেসব নবির ঘটনা বর্ণনা করেছেন, ফিরাউন ও ইবলিসের ঘটনা বলেছেন, সেগুলোর সবই আল্লাহ তায়ালার 'কালাম' (বাণী)। তিনি নিজের 'কালামে'র মাধ্যমে তাদের সংবাদ দিয়েছেন। তাঁর কালাম সৃষ্ট নয়। কিন্তু মুসা আলাইহিস সালামসহ অন্যান্য সৃষ্টির 'কালাম' (কথা) সৃষ্ট। কুরআন আল্লাহর কালাম। সুতরাং এটা চিরন্তন। এটা তাদের কালাম নয়।”৮০৫

ইমাম আল-ওয়াসিয়্যাহ গ্রন্থে বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি, কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলুক নয়। এটা তাঁর ওহি এবং তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাঁর গুণ (সিফাত)। ফলে কুরআন আল্লাহ নয়, আবার তাঁর থেকে আলাদাও নয়। মুসহাফে লিখিত, মুখে পঠিত, হৃদয়ে সংরক্ষিত। ...আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। ... সুতরাং যে বলবে আল্লাহর কালাম (কুরআন) মাখলুক, সে মূলত মহান আল্লাহকে অস্বীকারকারী' (কাফের)।৮০৬

ইমাম তহাবি রহ. ইমাম আজমের আকিদা বর্ণনা করেন এভাবে, “কুরআন আল্লাহর কালাম। এর উৎস আল্লাহ তায়ালার 'কথা' যার স্বরূপ তিনিই জানেন। এটা তিনি তাঁর রাসুলের উপর ওহি হিসেবে পাঠিয়েছেন। মুমিনগণ এটা হক হিসেবে সত্যায়ন করেছেন। এটাকে প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর কথা হিসেবে দৃঢ় বিশ্বাস করেছেন। এটা সৃষ্টির কথার মতো সৃষ্ট নয়। সুতরাং যদি কেউ মনে করে কুরআন মানুষের কথা, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা এমন ব্যক্তির নিন্দা-ভর্ৎসনা করেছেন। তাকে জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন, যেমনটি কুরআনে তিনি বলেছেন, 'আমি তাকে সাকার (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করব।' সুতরাং কুরআনকে 'এটা তো কেবল মানুষের কথা' সাব্যস্তকারীকে আল্লাহ তায়ালা যখন জাহান্নামে নিক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আমরা নিশ্চিতরূপে জানতে পারলাম, কুরআন মানুষের স্রষ্টার কথা, মানুষের কথার সঙ্গে এর সাদৃশ্য নেই।”৮০৭

টিকাঃ
৮০৫. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৮০৬. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৮০৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ‘কুরআন সৃষ্টি’র মাসআলাতে ইমামের উপর অভিযোগ

📄 ‘কুরআন সৃষ্টি’র মাসআলাতে ইমামের উপর অভিযোগ


উপরের আলোচনাতে স্পষ্ট যে, ইমাম আবু হানিফা রহ. 'কুরআন আল্লাহর সৃষ্ট' এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করতেন। বরং তিনিই এই ভ্রান্তির বিরুদ্ধে আহলে সুন্নাতের সংগ্রামী ইমামদের প্রথম সারিতে ছিলেন। একপর্যায়ে যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক (সৃষ্টি) বলবে তাকে কাফের বলেছেন। এটা তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাযহাব। তাঁর ছাত্রগণ শতাব্দের পরে শতাব্দ এ আকিদা তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন। ফলে তাঁর দিকে সম্বন্ধকৃত সবগুলো গ্রন্থেই এটা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

দুঃখের বিষয় হলো, এত বক্তব্য থাকার পরও অতীত ও বর্তমানের কিছু ব্যক্তি তাঁর দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি কুরআনকে মাখলুক (সৃষ্ট) বলতেন—এমন অভিযোগ করেছেন। বরং এ কারণে একদল তাকে মুশরিকও বলেছেন! অথচ এটা ডাহা মিথ্যা অপবাদ। সত্যের ছিটেফোঁটাও নেই তাতে। কিছু বিভ্রান্ত মানুষ এসব অপবাদ ইমাম আজমের নামে রটিয়েছে। পরবর্তীকালে আহলে সুন্নাতের একদল আলেম তাদের ফাঁদে পড়ে ইমাম আজমকে ভুল বুঝেছেন। গোমরাহ লোকদের অপপ্রচারে বিশ্বাস করে ইমামের অন্যায্য সমালোচনা করেছেন। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করুন।

ইমামকে ভুল বুঝে তাঁর নামে ছড়ানো ভিত্তিহীন বক্তব্য বিশ্বাস ও বর্ণনার প্রথম সারিতে রয়েছেন ইমাম বুখারি। বুখারি তাঁর 'খালকু আফআলিল ইবাদ' গ্রন্থে লিখেছেন, সুফিয়ান সাওরিকে হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান বলেন, (أَبْلِغْ أَبَا فُلانٍ الْمُشْرِكَ, أَنِّي بَرِيءٌ مِنْ دِينِهِ) আপনি আবু ফুলান তথা জনৈক মুশরিককে জানিয়ে দিন যে, আমি তার দ্বীন থেকে মুক্ত। সুফিয়ান বলেন, কারণ তিনি বলতেন, কুরআন মাখলুক।৮০৮ প্রশ্ন আসতে পারে, এখানে ‘আবু ফুলান’ (জনৈক) বলতে কে উদ্দেশ্য? উত্তর হলো, দুঃখজনকভাবে এখানে ‘আবু ফুলান’ বলতে ‘আবু হানিফা’ উদ্দেশ্য! কারণ বুখারি এখানে নামটা অস্পষ্ট রাখলেও তাঁর ‘আত তারিখুল কাবির’-এ অস্পষ্ট রাখেননি। সেখানে লিখেন, (أبلغ أبا حنيفة المشرك أنى برئ منه) অর্থাৎ, আপনি মুশরিক আবু হানিফাকে জানিয়ে দিন যে, আমি তার থেকে মুক্ত।৮০৯

উভয় জায়গাতেই বুখারি বর্ণনা দুটো উল্লেখের পরে কোনো খণ্ডন করেননি। বোঝা যায়, তিনি এসব বর্ণনার প্রতি একরকম বিশ্বাস করতেন, এগুলো সমর্থন করতেন। এ কারণে ইমাম আজমকে ‘মুশরিক’ বলার পরও সেটা খণ্ডনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি।

বুখারির পরে ইমাম আজমকে এ ধরনের অপবাদে বিশ্বাসী ও প্রচারকারী আরেকজন হলেন, বরং এক্ষেত্রে শীর্ষ সারিতে রয়েছেন, ইমাম আহমদ তনয় আবদুল্লাহ। তিনি ইমাম আজমের নামে কেবল ‘কুরআন মাখলুক’ বলার বক্তব্য চালিয়েছেন এমন নয়; বরং তিনি তাঁকে এই বিদআতের সর্বপ্রথম সৃষ্টিকর্তা এবং প্রধান কারিগর বানিয়ে দিয়েছেন! তিনি ইমাম আবু ইউসুফ সূত্রে (!) বর্ণনা করেন—সর্বপ্রথম ‘কুরআন মাখলুক’ এমন কথা বলেন আবু হানিফা।৮১০ অথচ আমরা দেখব, ইমাম আজম কখনো এ ধরনের কথা বলেননি। বরং তিনি এটার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। ফলে উলটো তাঁকে এই বিদআতের জনক বানিয়ে দেওয়া বড় রকমের জুলুম। লালাকায়ি বর্ণনা করেন, ‘এ বিষয়ে উম্মাহর মাঝে কোনো দ্বিমত নেই যে, সর্বপ্রথম কুরআনকে মাখলুক বলেছে জা'দ ইবনে দিরহাম। অতঃপর জাহম ইবনে সফওয়ান।'৮১১ আবদুল্লাহ কি এগুলো জানতেন না? তাহলে ইমাম আজমকে কীভাবে এই বিভ্রান্তির উদ্ভাবক বানালেন? আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন।

অতঃপর আরেকজন বড় ইমাম, যিনি এই মুসিবতে মুবতালা হয়েছেন, তিনি আবুল হাসান আশআরি। তিনি তাঁর ‘আল-ইবানাহ’ গ্রন্থে এমন একাধিক বর্ণনা এনেছেন, যেগুলো ইমাম আজমের উপর সুস্পষ্ট অপবাদ। যেমন—তিনি লিখেছেন, সুফিয়ান সাওরি বলেন, 'আমাকে হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান (بلغ أبا حنيفة المشرك أني منه بريء) (আপনি মুশরিক আবু হানিফাকে জানিয়ে দিন যে, আমি তার থেকে মুক্ত)। সুফিয়ান বললেন, কারণ তিনি কুরআনকে মাখলুক বলতেন!' আশআরি ইমাম আজমকে উক্ত বক্তব্য থেকে তাওবা করানোর কথাও বলেছেন। শেষে বলেন, হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান আবু হানিফার কাছে খবর পাঠান, তাওবা করার আগ পর্যন্ত আমি তোমার থেকে মুক্ত। তার কাছে তখন ইবনে আবি উকবা ছিলেন। তিনি বললেন, আপনার প্রতিবেশী আমাকে জানিয়েছে, আবু হানিফাকে (খলকে কুরআন বক্তব্য থেকে) তাওবা করানোর পরও তিনি তাকে সেটার দাওয়াত দিয়েছেন।'৮১২ এর মানে, তাওবা করানোর পরও আবু হানিফা তাঁর ভ্রান্ত আকিদা থেকে ফেরেননি!

ইমামের উপর এমন অভিযোগকারীদের প্রথম সারির আরেকজন হলেন আবু বকর খতিবে বাগদাদি। তিনি বিভিন্ন অজ্ঞাত ও দুর্বল ব্যক্তির পতিত সনদে বর্ণনা করেছেন, আবু হানিফা কুরআন মাখলুক মনে করতেন, যার ফলে তাকে তাওবা করানো হয় এবং তিনি ফিরে আসেন।৮১৩ খতিব তার তারিখে এর সপক্ষে অনেকগুলো বর্ণনা তুলে ধরেছেন। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলো হিংসা, প্রতিপক্ষের প্রোপাগান্ডা থেকে উৎসারিত। আর অধিকাংশ দুর্বল, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বর্ণনা।

টিকাঃ
৮০৮. খালকু আফআলিল ইবাদ (৭)।
৮০৯. আত-তারিখুল কাবির, বুখারি (৪/১২৭)।
৮১০. দেখুন: আস-সুন্নাহ, আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ (১২৬)।
৮১১. শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ (২/৩৪৪)।
৮১২. আল-ইবানাহ আন উসুলিদ দিয়ানাহ, আশআরি (২৯)। 'ইবানা'র কিছু কিছু নুসখাতে এসব বর্ণনা উল্লেখের পরে আশআরির পক্ষ থেকে ইমামের পক্ষে প্রতিরক্ষামূলক বক্তব্য উল্লেখ আছে (যেমন: ড. ফাওকিয়্যাহর নুসখায়)। তাই কিছু কিছু আলেম এই নুসখাকে অন্যান্য নুসখার উপর 'হুজ্জাহ' ধরেছেন এবং সেগুলোকে বিকৃত বলেছেন। অথচ ইবানাহ'র অসংখ্য পাণ্ডুলিপিতে এ ধরনের কোনো বক্তব্য নেই। এমনকি ইমাম সাখাভির হাতে লেখা টীকাসংবলিত একটি প্রাচীন বিশুদ্ধ নুসখা (যা ইদারাতুত তিবাআহ আল-মুনিরিয়্যাহ থেকে ছাপানো হয়েছে), সেখানেও এ ধরনের বক্তব্য নেই। ফলে একই যুক্তিতে উলটো ড. ফাওকিয়্যাহর নুসখাকেই বিকৃত এবং ইমামের শানে প্রতিরক্ষামূলক বক্তব্যগুলোকে পরবর্তীকালে সংযোজিত বলা যেতে পারে। বরং আশআরির নামে খণ্ডনী বক্তব্যের ভাষা ও উসলুব পরবর্তীকালে সংযোজিত হওয়ার সম্ভাবনাকেই বৃদ্ধি করে। কারণ, এ ধরনের অভিযোগ কেবল ইবানাহতে নয়; বুখারিও তার 'খালকু আফআলিল ইবাদ (৭) ও 'আত তারিখুল কাবির' (৪/১২৭)-এ করেছেন, যা আমরা উপরে বলেছি। ফলে ইবানাহতেও এমন অভিযোগ পরে সংযোজিত হবার পরিবর্তে মূল গ্রন্থে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। আল্লামা কাওসারি ইবনে কুতাইবা দিনাওয়ারির 'আল-ইখতিলাফ ফিল লফজ'-এর টাকায় লিখেন, এখানে ইবানাহর বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে। মূল বক্তব্যে 'আবু হানিফা' নেই; বরং 'আবু ফুলান' (জনৈক ব্যক্তি) উল্লেখ আছে, যেমনটা বুখারির 'খালকু আফআলিল ইবাদ' গ্রন্থেও এসেছে। [আল-ইখতিলাফ ফিল লফজ ৪২]
৮১৩. তারিখে বাগদাদ (১৫/৫১৬)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অভিযোগের পর্যালোচনা

📄 অভিযোগের পর্যালোচনা


প্রথম কথা হলো, এগুলো ইমামের উপর সুস্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ। বুখারি ও আশআরি দুজনই উক্ত ঘটনা আবু নুআইম (যিরার ইবনে সুরাদ) থেকে বর্ণনা করেছেন। মুহাক্কিকদের মতে, তিনি মিথ্যুক ছিলেন। শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানি ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন-এর উদ্ধৃতিতে লিখেন, “কুফাতে দুজন মিথ্যুক রয়েছে। একজন আবু নুআইম নাখায়ি, অন্যজন আবু নুআইম যিরার ইবনে সুরাদ। বুখারি নিজে ও নাসায়ি ইবনে সুরাদকে 'পরিত্যক্ত' (মাতরূক) বলেছেন।”৮১৪ অর্থাৎ, বুখারি হাদিসের ক্ষেত্রে তাকে বর্জন করলেও আবু হানিফার বিরুদ্ধে অভিযোগটা ঠিকই তার কাছ থেকে গ্রহণ করলেন এবং সেটা কোনো মন্তব্য বা পর্যালোচনা ছাড়া বর্ণনা করলেন। আশআরি ও বুখারির এই ভূমিকা দুঃখজনক এবং তাদের সঙ্গে বেমানান। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করুন।

এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত হানাফি মাযহাবের একমাত্র বক্তব্য হলো, কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলুক (সৃষ্ট) নয়, যেমনটা উপরে খোদ ইমাম আজমের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। একাধিক গ্রন্থে তিনি এটার তাগিদ দিয়েছেন। 'আল-ফিকহুল আকবারে' বলেন, কুরআন আল্লাহ তায়ালার 'কালাম' (বাণী)... সৃষ্ট নয়।৮১৫ বরং ইমাম 'আল-ওয়াসিয়্যাহ' গ্রন্থে যারা কুরআন মাখলুক বলে তাদের কাফের বলেছেন। তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলুক নয়। এটা তাঁর ওহি এবং তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাঁর গুণ (সিফাত)। ...সুতরাং যে বলবে আল্লাহর কালাম (কুরআন) মাখলুক, সে মূলত মহান আল্লাহকে অস্বীকারকারী (কাফের)।”৮১৬ তহাবি ইমাম আজমের আকিদা লিখেছেন এভাবে, "কুরআন আল্লাহর কালাম। এর উৎস আল্লাহ তায়ালার 'কথা', যার স্বরূপ তিনিই জানেন। এটা তিনি তাঁর রাসুলের উপর ওহি হিসেবে পাঠিয়েছেন। মুমিনগণ এটা হক হিসেবে সত্যায়ন করেছেন। এটাকে প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর কথা হিসেবে দৃঢ় বিশ্বাস করেছেন। এটা সৃষ্টির কথার মতো সৃষ্ট নয়। সুতরাং যদি কেউ মনে করে কুরআন মানুষের কথা, তবে সে কাফের হয়ে যাবে।”৮১৭

কাযি আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'কুরআনকে মাখলুক বলা হারাম। এমন কথা যে বলবে তাকে পরিত্যাগ করা ফরয।৮১৮ অন্য বর্ণনায় আবু ইউসুফ বলেন, 'যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলে, সে পথভ্রষ্ট ও বিদআতি।৮১৯ ইমামের আরেক শাগরেদ মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শাইবানি বলেন, 'যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলবে, তার পিছনে নামায পড়ো না।'৮২০

উল্লেখ্য, কোনো কোনো গ্রন্থে আবু ইউসুফ থেকে একটি ঝামেলাপূর্ণ বর্ণনা এসেছে যা পরবর্তীকালে ইমাম আজমের ব্যাপারে অনেককে বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। যেমন—খোদ আশআরি আবু ইউসুফ থেকে বর্ণনা করেন, “আমি দুই মাস আবু হানিফার সঙ্গে বিতর্ক করেছি। পরিশেষে তিনি 'কুরআন মাখলুক' এমন মত থেকে ফিরে আসেন।”৮২১ সময়টা কোথাও কোথাও ছয় মাস আবার কোথাও এক বছরের কথা এসেছে। এ থেকে অনেকে সন্দেহ করেছেন (যেমনটা খতিবে বাগদাদি), ইমাম যদি কুরআনকে মাখলুক না বলতেন, তবে এ দীর্ঘ সময় এটা নিয়ে আলোচনা করা লাগল কেন? বিশেষত কিছু বর্ণনায় কথা বলার পরিবর্তে বিতর্কের কথা পাওয়া যায়।

বাস্তবতা হলো, ইমাম কখনোই কুরআনকে মাখলুক বলতেন না। আশআরির উক্ত বর্ণনাটি আগের বর্ণনাগুলোর মতোই পরিত্যাজ্য। এ ব্যাপারে ইমামের দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার কারণ হলো, মুহাক্কিক হিসেবে পুরো মাসআলাটির উপর চূড়ান্ত রায় দিতে তিনি সময় নিয়েছেন। কারণ, কাউকে কাফের বলা বড় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তা ছাড়া, কিছু কিছু বর্ণনায় বোঝা যায়, তাদের আলোচনা বা বিতর্ক কুরআন মাখলুক কি না সে ব্যাপারে ছিল না। বরং যে ব্যক্তি এমন কথা বলবে (তাকে কাফের বলা হবে কি না) তার ব্যাপারে ছিল। এ কারণে বাইহাকির বর্ণনায় ইমামের সঙ্গে আবু ইউসুফের মুনাযারার কথা উল্লেখ থাকলেও 'তিনি কুরআন মাখলুক বলা থেকে প্রত্যাবর্তন করেন'—এ ধরনের বক্তব্য নেই যেমনটা আশআরি বলেছেন। বাইহাকির বর্ণনা এমন—'আবু ইউসুফ বলেন, আমি এক বছর ইমামের সঙ্গে কুরআন মাখলুক কি না বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছি। পরিশেষে তিনি ও আমি উভয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি—যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলবে, সে কাফের।'৮২২

ইমাম ফখরুল ইসলাম বাযদাবিও একই শব্দে উক্ত বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। সেখানেও 'তিনি কুরআন মাখলুক বলা থেকে ফিরে এসেছেন'—এ ধরনের কোনো কথা নেই। বাযদাবি লিখেন, আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— 'আমি ছয় মাস ইমামের সঙ্গে কুরআন মাখলুক কি না সেটা নিয়ে কথা বলেছি। পরিশেষে তিনি ও আমি উভয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি—যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলবে, সে কাফের।'৮২৩

সুতরাং আর কোনো সন্দেহ থাকে না। ইবনে আবদিল বার খোদ আবু ইউসুফ থেকেই বর্ণনা করেন—আবু ইউসুফ রহ.-এর ছেলে সালম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আব্বাজান, এ ব্যাপারে আবু হানিফা রহ. সম্পর্কে কিছু বলবেন? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ। আবু হানিফাও এ কথা (কুরআন আল্লাহর কালাম; মাখলুক নয়) বলতেন। আমি তাঁর কাছ থেকে এটা ছাড়া আর কিছু শুনিনি। যদি এমন কিছু শুনতাম, তবে তাঁর সান্নিধ্যে থাকতাম না! তিনি তো তাঁর যুগে ফিকহ, ইলম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে গোটা জগতের ইমাম ছিলেন! তিনি ছিলেন হকের মানদণ্ড; তাঁর মাধ্যমে আহলে সুন্নাত থেকে আহলে বিদআত চেনা যেত'।৮২৪

বাইহাকি ইমাম মুহাম্মাদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলবে, তার পিছনে নামায পড়ো না।' তিনি মুহাম্মাদ ইবনে সাবেক থেকে বর্ণনা করেন, আমি আবু ইউসুফকে জিজ্ঞাসা করলাম—আবু হানিফা কি কুরআনকে মাখলুক বলতেন? জবাবে আবু ইউসুফ বললেন, 'নাউযুবিল্লাহ।' তিনি এমন কথা বলতেন না, আমিও এমন কথা বলি না।৮২৫ লালাকায়িও উক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন।৮২৬

বরং খতিবে বাগদাদি নিজেও বর্ণনা করেন, সুফিয়ান সাওরি এবং নুমান ইবনে সাবেত (আবু হানিফা) দুজনেই বলতেন, কুরআন আল্লাহর কালাম; মাখলুক নয়।৮২৭ খতিব আরও বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. আবু হানিফার কাছে এলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের কী সমস্যা? ইবনুল মুবারক বলেন, জাহম নামের এক লোকের আর্বিভাব ঘটেছে। আবু হানিফা বলেন, সে কী বলে? ইবনুল মুবারক বললেন, কুরআনকে মাখলুক বলে। তখন আবু হানিফা রহ. এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন, 'এই বিষয়ে এদের কোনো জ্ঞান নেই এবং এদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না। এদের মুখনিঃসৃত বাক্য কী সাংঘাতিক! এরা তো কেবল মিথ্যাই বলে।' [কাহাফ : ৫] উক্ত বর্ণনায় স্পষ্ট যে, ইমাম আজম কখনোই কুরআনকে মাখলুক বলতেন না। বরং আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে খতিব বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন, আহমদ ইবনে হাম্বল বলেন, 'আবু হানিফা কুরআনকে মাখলুক বলতেন এমন অভিযোগ সত্য নয়।'৮২৮ আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ছিলেন এ ময়দানের বীর পুরুষ। তিনি যখন এ বিষয়ে ইমাম আজমের শুদ্ধতার সাক্ষ্য দেন, তখন এক্ষেত্রে আর সন্দেহ করা অমূলক।

ইবনে তাইমিয়্যাহ (৭২৮ হি.) একই সাক্ষ্য দেন এভাবে: 'উম্মাহর প্রসিদ্ধ ইমামদের সবাই আল্লাহর সিফাতকে সাব্যস্ত করতেন। তারা বলতেন, কুরআন আল্লাহর কালাম; মাখলুক নয়। ... এটা সকল সাহাবি, আহলে বাইত ও তাবেয়িনের মাযহাব। এটা মালেক ইবনে আনাস, (সুফিয়ান) সাওরি, লাইস ইবনে সাদ, আওযায়ি, আবু হানিফা, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বলসহ সকল ইমামের মাযহাব।'৮২৯ ইবনে হাজার আসকালানিও লিখেছেন, আবু হানিফা রহ.-এর প্রতি এ ধরনের অভিযোগ মিথ্যা।৮৩০

প্রশ্ন হতে পারে, কুরআনকে কেউ মাখলুক বললে কাফের কেন হবে? আমাদের সামনে বিদ্যমান সবকিছুই তো মাখলুক। সবগুলোকে আমরা মাখলুক বলি। কুরআনকে কেন মাখলুক বলা যাবে না? এর অনেকগুলো কারণ আছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হলো, কুরআন আল্লাহ তায়ালার কালাম। কালাম তাঁর চিরন্তন সিফাত। এমন কোনো সময় ছিল না যখন তাঁর মাঝে কালাম সিফাত ছিল না। কারণ, সেটা ত্রুটি হিসেবে গণ্য হবে। বিপরীতে মাখলুক চিরন্তন নয়। হাদেস তথা নবসৃষ্ট। ফলে আল্লাহর কালাম কুরআনকে মাখলুক বলার অর্থ হলো আল্লাহর 'কালাম' সিফাতকে অস্বীকার করা, সিফাতের আযালিয়্যাত তথা অনাদি হওয়াকে অস্বীকার করা, আল্লাহকে নবসৃষ্ট বিষয়ের পাত্র (মুবতালিল হাওয়াদিস) বানানো, অপূর্ণতার দোষে দোষী করা। আল্লাহর সত্তার সঙ্গে নবসৃষ্ট বিষয় জুড়ে দেওয়া। এ সবগুলো কুফর। ফলে আল্লাহর কালাম কুরআনকে মাখলুক বলাও কুফর। হ্যাঁ, কেউ যদি বলে, 'কুরআন মাখলুক', কিন্তু কুরআন বলতে সে আল্লাহর চিরন্তন কালাম গুণকে উদ্দেশ্য না নেয়; বরং আমাদের সামনে কাগজ-কলম ও লিখিত অক্ষর-শব্দ ইত্যাদি উদ্দেশ্য নেয়, তবে সেটা কুফর হবে না।

টিকাঃ
৮১৪. তাহযিবুত তাহযিব (৪/৪৫৬)।
৮১৫. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৮১৬. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৮১৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।
৮১৮. উসুল ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (২/২৯৮)।
৮১৯. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৪২)।
৮২০. দেখুন: উসুল ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (২/২৯৯)। আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (১/৩৮১)।
৮২১. দেখুন: আল ইবানাহ (২৯-৩০)।
৮২২. আসমা ওয়াস সিফাত (১/৩৮১)।
৮২৩. কাশফুল আসরার (১/৯)।
৮২৪. আল-ইনতিকা (৩১৯)।
৮২৫. আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (১/৩৮১)।
৮২৬. দেখুন: উসুল ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (২/২৯৭)।
৮২৭. দেখুন: তারিখে বাগদাদ (১৫/৫১৭)। মুহাক্কিক ড. বাশার আওয়াদ উক্ত বর্ণনার সনদকে হাসান বলেছেন। বিপরীতে মুনাযারাসংক্রান্ত বর্ণনার সনদকে যয়িফ তথা দুর্বল আখ্যা দিয়েছেন।
৮২৮. দেখুন: তারিখে বাগদাদ (১৫/৫১৭)।
৮২৯. মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১০৬)।
৮৩০. লিসানুল মিযান (২/১১৪)। এ বিষয়ে লিখিত সমকালীন একটি সুন্দর রিসালাহ হলো আমর আবদুল মুনইমকৃত 'ইমাম আবু হানিফা ওয়া নিসবাতুহু ইলাল কাওলি বিখালকিল কুরআন'। এতে তিনি ইমাম আজমের উপর অভিযোগমূলক সবগুলো বর্ণনার সনদ যাচাই করে সেগুলোর অসারতা প্রমাণ করেছেন।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ইমাম আজম কি ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াত বৈধ বলতেন?

📄 ইমাম আজম কি ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াত বৈধ বলতেন?


ইমাম আজম রহ.-এর উপর কুরআনকেন্দ্রিক আরেকটি অভিযোগ আরোপ করা হয়। সেটা হলো, তিনি নাকি নামাযের ভিতরে ফারসিতে কুরআন পাঠ করতে বলেছেন! যতটুকু বোঝা যায়, মূল বিষয়টি ইমাম থেকে প্রমাণিত। কিন্তু অভিযোগকারীরা তাঁর বক্তব্য ভুল বুঝেছেন এবং ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাস্তবে ইমাম ফারসিতে কুরআন পড়ার মত দিয়েছিলেন, কিন্তু কুরআন তো আরবি। তাহলে ফারসিতে পড়া হবে কী করে? বোঝা গেল, মতটি ছিল ফারসিতে কুরআন পড়া নয়, বরং কুরআনের অনুবাদ পড়া। তা ছাড়া, এটা তিনি তাদের জন্য রুখসত (সুযোগ) দিয়েছিলেন যারা আরবি পড়তে পারে না। সুতরাং এমন ব্যক্তি নীরব থাকার পরিবর্তে কুরআনের যা-কিছু বোঝে সেটা বলবে কিংবা যেকোনো জিকির পড়বে—এটুকুই। সেটা ফারসি, ইংরেজি, উর্দু বা বাংলা যে ভাষাতেই হোক। এটাকে উন্মুক্তভাবে নামাযে ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের বৈধতা নামে প্রচার করা যথাযথ নয়। কারণ, যে ব্যক্তি আরবিতে কুরআন পড়তে সক্ষম, তাকে আরবিতেই পড়তে হবে।৯০৮

ফারসিতে কুরআন পড়ার বৈধতার কথা বলা ইমামের জ্ঞানগত দুর্বলতা নয়; বরং দূরদর্শিতা এবং ইসলামের সর্বজনীনতার প্রমাণ। এতে ইসলামের প্রশস্ততা এবং মাতৃভাষায় ইসলাম চর্চার নবদিগন্ত উন্মোচনের আভাষ ছিল। ফলে ইমাম ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের অনুমতি দেন। স্রেফ কুরআন তেলাওয়াত নয়, নামাযের তাকবির, হজের তালবিয়া, পশু যবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ ইত্যাদিও যদি কেউ আরবিতে না পেরে ফারসি বা নিজস্ব অন্য যেকোনো ভাষায় দেয়, সেটাকে বৈধ ঘোষণা করেন।৯০৯

এটা ইমামের মনগড়া বিদআত ছিল না, বরং সুন্নাহ ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিসের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রিফাআহ ইবনে রাফে রাযি. থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসে এক গ্রাম্য সাহাবিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক নামায শেখানোর বর্ণনায় এসেছে, “... (নামাযে) তাকবির বলার পরে যদি তোমার কুরআনের কিছু জানা থাকে, তবে সেটা পড়ো। না থাকলে 'সুবহানাল্লাহ', 'আল্লাহ আকবার', 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলো।”৯১০

আলেমরা উক্ত হাদিস থেকে ইজতিহাদ করেছেন—নামাযে কুরআন পড়া আবশ্যক। অথচ ওজর থাকার কারণে সে ক্ষেত্রে 'রুখসত' তথা ছাড় দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনো নওমুসলিম কিংবা যৌক্তিক ওজরের কারণে কোনো সাধারণ মুসলিম যদি আরবিতে আল্লাহর যিকিরগুলো করতেও অক্ষম হয়, তবে সে যিকিরগুলো নিজের ভাষায় করতে পারবে, ঠিক কালিমার মতো। কোনো অমুসলিম যদি ইসলামে প্রবেশ করতে চায়, তবে তাকে 'কালিমা' পাঠ করতে হয়। কিন্তু সে যদি আরবি কালিমা পাঠ না করতে পারে, বরং নিজের মাতৃভাষায় কালিমার অর্থ স্বীকৃতি দেয়, তবে সে মুমিন গণ্য হবে। কারণ, মূল উদ্দেশ্য তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া। আর সেটা অন্য ভাষাতেও সম্ভব।৯১১

তবে জটিলতা হলো, কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায়—আরবিতে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফারসিতে কেরাত পড়ার বৈধতা দিয়েছেন! কাসানি লিখেন, 'আবু হানিফার মতে, আরবির মতো ফারসিতেও (নামাযে) কেরাত পড়া বৈধ। আরবি পারুক না পারুক সেটা বিবেচ্য নয়। বিপরীতে আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর মতে, আরবি পারলে ফারসিতে বৈধ হবে না। আরবি না পারলে বৈধ হবে। ইমাম শাফেয়ির মত আরও ভিন্ন। তিনি বলেন, আরবি পারুক না পারুক, কোনো অবস্থাতেই ফারসিতে কিছু পড়া যাবে না। যদি আরবি না পারে, তবে তাসবিহ পড়বে। তবুও ফারসিতে কেরাত পড়বে না।' প্রশ্ন আসতে পারে, যদি ইমাম থেকে এই বর্ণনা বিশুদ্ধ হয়, তবে তিনি কীসের ভিত্তিতে আরবি পারা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন পাঠের বৈধতা দিলেন?

মূলত এ প্রশ্নের জবাবই উক্ত ফিকহি মাসআলাকে আকিদার মাসআলায় পরিণত করে। মুতাকাল্লিমিন হানাফি ফকিহগণ মনে করেন, ইমাম আজমের কাছে কুরআন আরবি শব্দগুলো নয়; বরং আল্লাহর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান সিফাতে কালাম হলো মূল কুরআন। শব্দগুলো সেগুলোর নির্দেশক মাত্র। সুতরাং নামাযে কুরআন পাঠের নির্দেশ আল্লাহর সঙ্গে বিদ্যমান সেই অর্থ পাঠ করা উদ্দেশ্য, যা আরবিতে যেমন সম্ভব, অন্য ভাষাতেও সম্ভব। (এ জন্য ইমাম আজম এবং কোনো কোনো বর্ণনামতে আবু ইউসুফের বক্তব্য হলো—কুরআনি ইজায স্রেফ আরবি ছন্দের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়)... ফলে যে ভাষাতেই কুরআনের অর্থগুলো উচ্চারণ করা হবে, সেটাকেই কুরআন বলা যাবে! সুতরাং—কাসানি লিখেন—ইমাম আজমের কথাই শুদ্ধ। একই কথা প্রযোজ্য তাশাহহুদ, জুমার খুতবা, যবাইয়ের সময় (অন্য ভাষায়) বিসমিল্লাহ পড়া, তালবিয়া পড়ার ক্ষেত্রেও। বরং কারও কারও মতে, আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় আজান দেওয়াও বৈধ, যদি মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারে।৯১২

কিন্তু কাসানির উক্ত বক্তব্য উন্মুক্তভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং ইমাম আজম থেকে উক্ত মত (আরবিতে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন বৈধতা) প্রমাণিত ধরা হলেও সেটা স্বীকৃত বক্তব্য নয়। এক্ষেত্রে তাঁর দুই শাগরেদ ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের বক্তব্য বিশুদ্ধ। বরং বলা হয়ে থাকে, সর্বশেষে ইমাম আজম উক্ত উন্মুক্ত মত প্রত্যাহার করে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেন। বাযদাবি বর্ণনা করেন, 'ইমাম আজমের বিশুদ্ধ মাযহাব হলো কুরআন ছন্দ ও অর্থ দুটোর সমন্বয়।'৯১৩ সুতরাং আরবিতে সক্ষমতা থাকলে ফারসি বা অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। এভাবে এটা হানাফি ইমামদের সর্বসম্মত বক্তব্যে পরিণত হয়।

একই কথা অন্যান্য যিকিরের ক্ষেত্রেও—আরবিতে সক্ষম হলে অন্য ভাষায় করবে না। ইবনে আবিদিন 'সিরাজিয়্যাহ'র উদ্ধৃতিতে লিখেছেন, 'ফারসি (তথা অনারবি ভাষায়) আজান দেওয়া বিশুদ্ধ নয়। মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারলেও বিশুদ্ধ হবে না।'৯১৪ কারণ, ইবাদতটা এভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হয়েছে। আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআন স্রেফ অর্থ নয়; বরং অর্থ ও ছন্দ/শব্দ (নযম) দুটোর সমন্বয়ে আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ আমাদের এটাই পড়তে বলেছেন। এগুলো আরবিতে যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, সেভাবে পড়লেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) প্রতি শব্দে দশটি পুণ্যের ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা এই আরবি কুরআনকেই সুরক্ষিত রাখার ঘোষণা করেছেন। একটি শব্দও তাতে বেশি-কম হবে না। অথচ অনুবাদে মুহূর্তে মুহূর্তে ভাষায় ভাষায় পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও বিকৃতির আশঙ্কা প্রবল। বরং অন্য ধর্মগ্রন্থগুলো বিকৃতির অন্যতম কারণ ছিল শব্দগুলোকে হেফাজত না করা, অর্থের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা। এ জন্য কুরআনকে আল্লাহ শব্দ ও অর্থ দুটোসহই হেফাজত করবেন।

মোটকথা, কুরআনের শব্দ ও অর্থ দুটোকেই আল্লাহ তায়ালা কুরআন হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং নামাযে এই কুরআনই পড়তে হবে যা ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.সহ সকল আলেমের মত। ইমাম আজম থেকে বিপরীতটা বর্ণিত থাকলেও তিনি পরবর্তীকালে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেছেন বলে ধরা হবে। তাই আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। হ্যাঁ, আরবি কুরআন না পারলে যেহেতু রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাসবিহ, তাহলিল তথা যিকির করতে বলেছেন, আর যিকির অন্য ভাষাতেও বৈধ, সুতরাং তখন (অক্ষম অবস্থায়) নিজস্ব মাতৃভাষায় কুরআনের যিকিরসংক্রান্ত আয়াতগুলোর অনুবাদ পড়া বৈধ হবে।৯১৫

টিকাঃ
৯০৮. দেখুন: ইলাউস সুনান (৪/১৪৮-১৫০)।
৯০৯. দেখুন : আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১০. আবু দাউদ (কিতাবুস সালাত/বাবু সালাতি মান লা ইউকিমু সুলবাহ : ৮৫৬)। তিরমিযি (আবওয়াবুস সালাত : ৩০২)।
৯১১. আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১২. দেখুন: বাদায়েউস সানায়ে' (১/১১২-১১৩)। আরও দেখুন: আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (৭৮-৭৯)।
৯১৩. কাশফুল আসরার (১/২৪)।
৯১৪. রদ্দুল মুহতার (১/৩৮৩, ৪৮৪)।
৯১৫. রদ্দুল মুহতার (১/৪৮৫)।

ইমাম আজম রহ.-এর উপর কুরআনকেন্দ্রিক আরেকটি অভিযোগ আরোপ করা হয়। সেটা হলো, তিনি নাকি নামাযের ভিতরে ফারসিতে কুরআন পাঠ করতে বলেছেন! যতটুকু বোঝা যায়, মূল বিষয়টি ইমাম থেকে প্রমাণিত। কিন্তু অভিযোগকারীরা তাঁর বক্তব্য ভুল বুঝেছেন এবং ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাস্তবে ইমাম ফারসিতে কুরআন পড়ার মত দিয়েছিলেন, কিন্তু কুরআন তো আরবি। তাহলে ফারসিতে পড়া হবে কী করে? বোঝা গেল, মতটি ছিল ফারসিতে কুরআন পড়া নয়, বরং কুরআনের অনুবাদ পড়া। তা ছাড়া, এটা তিনি তাদের জন্য রুখসত (সুযোগ) দিয়েছিলেন যারা আরবি পড়তে পারে না। সুতরাং এমন ব্যক্তি নীরব থাকার পরিবর্তে কুরআনের যা-কিছু বোঝে সেটা বলবে কিংবা যেকোনো জিকির পড়বে—এটুকুই। সেটা ফারসি, ইংরেজি, উর্দু বা বাংলা যে ভাষাতেই হোক। এটাকে উন্মুক্তভাবে নামাযে ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের বৈধতা নামে প্রচার করা যথাযথ নয়। কারণ, যে ব্যক্তি আরবিতে কুরআন পড়তে সক্ষম, তাকে আরবিতেই পড়তে হবে।৯০৮

ফারসিতে কুরআন পড়ার বৈধতার কথা বলা ইমামের জ্ঞানগত দুর্বলতা নয়; বরং দূরদর্শিতা এবং ইসলামের সর্বজনীনতার প্রমাণ। এতে ইসলামের প্রশস্ততা এবং মাতৃভাষায় ইসলাম চর্চার নবদিগন্ত উন্মোচনের আভাষ ছিল। ফলে ইমাম ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের অনুমতি দেন। স্রেফ কুরআন তেলাওয়াত নয়, নামাযের তাকবির, হজের তালবিয়া, পশু যবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ ইত্যাদিও যদি কেউ আরবিতে না পেরে ফারসি বা নিজস্ব অন্য যেকোনো ভাষায় দেয়, সেটাকে বৈধ ঘোষণা করেন।৯০৯

এটা ইমামের মনগড়া বিদআত ছিল না, বরং সুন্নাহ ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিসের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রিফাআহ ইবনে রাফে রাযি. থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসে এক গ্রাম্য সাহাবিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক নামায শেখানোর বর্ণনায় এসেছে, “... (নামাযে) তাকবির বলার পরে যদি তোমার কুরআনের কিছু জানা থাকে, তবে সেটা পড়ো। না থাকলে 'সুবহানাল্লাহ', 'আল্লাহ আকবার', 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলো।”৯১০

আলেমরা উক্ত হাদিস থেকে ইজতিহাদ করেছেন—নামাযে কুরআন পড়া আবশ্যক। অথচ ওজর থাকার কারণে সে ক্ষেত্রে 'রুখসত' তথা ছাড় দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনো নওমুসলিম কিংবা যৌক্তিক ওজরের কারণে কোনো সাধারণ মুসলিম যদি আরবিতে আল্লাহর যিকিরগুলো করতেও অক্ষম হয়, তবে সে যিকিরগুলো নিজের ভাষায় করতে পারবে, ঠিক কালিমার মতো। কোনো অমুসলিম যদি ইসলামে প্রবেশ করতে চায়, তবে তাকে 'কালিমা' পাঠ করতে হয়। কিন্তু সে যদি আরবি কালিমা পাঠ না করতে পারে, বরং নিজের মাতৃভাষায় কালিমার অর্থ স্বীকৃতি দেয়, তবে সে মুমিন গণ্য হবে। কারণ, মূল উদ্দেশ্য তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া। আর সেটা অন্য ভাষাতেও সম্ভব।৯১১

তবে জটিলতা হলো, কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায়—আরবিতে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফারসিতে কেরাত পড়ার বৈধতা দিয়েছেন! কাসানি লিখেন, 'আবু হানিফার মতে, আরবির মতো ফারসিতেও (নামাযে) কেরাত পড়া বৈধ। আরবি পারুক না পারুক সেটা বিবেচ্য নয়। বিপরীতে আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর মতে, আরবি পারলে ফারসিতে বৈধ হবে না। আরবি না পারলে বৈধ হবে। ইমাম শাফেয়ির মত আরও ভিন্ন। তিনি বলেন, আরবি পারুক না পারুক, কোনো অবস্থাতেই ফারসিতে কিছু পড়া যাবে না। যদি আরবি না পারে, তবে তাসবিহ পড়বে। তবুও ফারসিতে কেরাত পড়বে না।' প্রশ্ন আসতে পারে, যদি ইমাম থেকে এই বর্ণনা বিশুদ্ধ হয়, তবে তিনি কীসের ভিত্তিতে আরবি পারা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন পাঠের বৈধতা দিলেন?

মূলত এ প্রশ্নের জবাবই উক্ত ফিকহি মাসআলাকে আকিদার মাসআলায় পরিণত করে। মুতাকাল্লিমিন হানাফি ফকিহগণ মনে করেন, ইমাম আজমের কাছে কুরআন আরবি শব্দগুলো নয়; বরং আল্লাহর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান সিফাতে কালাম হলো মূল কুরআন। শব্দগুলো সেগুলোর নির্দেশক মাত্র। সুতরাং নামাযে কুরআন পাঠের নির্দেশ আল্লাহর সঙ্গে বিদ্যমান সেই অর্থ পাঠ করা উদ্দেশ্য, যা আরবিতে যেমন সম্ভব, অন্য ভাষাতেও সম্ভব। (এ জন্য ইমাম আজম এবং কোনো কোনো বর্ণনামতে আবু ইউসুফের বক্তব্য হলো—কুরআনি ইজায স্রেফ আরবি ছন্দের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়)... ফলে যে ভাষাতেই কুরআনের অর্থগুলো উচ্চারণ করা হবে, সেটাকেই কুরআন বলা যাবে! সুতরাং—কাসানি লিখেন—ইমাম আজমের কথাই শুদ্ধ। একই কথা প্রযোজ্য তাশাহহুদ, জুমার খুতবা, যবাইয়ের সময় (অন্য ভাষায়) বিসমিল্লাহ পড়া, তালবিয়া পড়ার ক্ষেত্রেও। বরং কারও কারও মতে, আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় আজান দেওয়াও বৈধ, যদি মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারে।৯১২

কিন্তু কাসানির উক্ত বক্তব্য উন্মুক্তভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং ইমাম আজম থেকে উক্ত মত (আরবিতে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন বৈধতা) প্রমাণিত ধরা হলেও সেটা স্বীকৃত বক্তব্য নয়। এক্ষেত্রে তাঁর দুই শাগরেদ ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের বক্তব্য বিশুদ্ধ। বরং বলা হয়ে থাকে, সর্বশেষে ইমাম আজম উক্ত উন্মুক্ত মত প্রত্যাহার করে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেন। বাযদাবি বর্ণনা করেন, 'ইমাম আজমের বিশুদ্ধ মাযহাব হলো কুরআন ছন্দ ও অর্থ দুটোর সমন্বয়।'৯১৩ সুতরাং আরবিতে সক্ষমতা থাকলে ফারসি বা অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। এভাবে এটা হানাফি ইমামদের সর্বসম্মত বক্তব্যে পরিণত হয়।

একই কথা অন্যান্য যিকিরের ক্ষেত্রেও—আরবিতে সক্ষম হলে অন্য ভাষায় করবে না। ইবনে আবিদিন 'সিরাজিয়্যাহ'র উদ্ধৃতিতে লিখেছেন, 'ফারসি (তথা অনারবি ভাষায়) আজান দেওয়া বিশুদ্ধ নয়। মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারলেও বিশুদ্ধ হবে না।'৯১৪ কারণ, ইবাদতটা এভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হয়েছে। আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআন স্রেফ অর্থ নয়; বরং অর্থ ও ছন্দ/শব্দ (নযম) দুটোর সমন্বয়ে আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ আমাদের এটাই পড়তে বলেছেন। এগুলো আরবিতে যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, সেভাবে পড়লেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) প্রতি শব্দে দশটি পুণ্যের ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা এই আরবি কুরআনকেই সুরক্ষিত রাখার ঘোষণা করেছেন। একটি শব্দও তাতে বেশি-কম হবে না। অথচ অনুবাদে মুহূর্তে মুহূর্তে ভাষায় ভাষায় পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও বিকৃতির আশঙ্কা প্রবল। বরং অন্য ধর্মগ্রন্থগুলো বিকৃতির অন্যতম কারণ ছিল শব্দগুলোকে হেফাজত না করা, অর্থের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা। এ জন্য কুরআনকে আল্লাহ শব্দ ও অর্থ দুটোসহই হেফাজত করবেন।

মোটকথা, কুরআনের শব্দ ও অর্থ দুটোকেই আল্লাহ তায়ালা কুরআন হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং নামাযে এই কুরআনই পড়তে হবে যা ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.সহ সকল আলেমের মত। ইমাম আজম থেকে বিপরীতটা বর্ণিত থাকলেও তিনি পরবর্তীকালে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেছেন বলে ধরা হবে। তাই আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। হ্যাঁ, আরবি কুরআন না পারলে যেহেতু রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাসবিহ, তাহলিল তথা যিকির করতে বলেছেন, আর যিকির অন্য ভাষাতেও বৈধ, সুতরাং তখন (অক্ষম অবস্থায়) নিজস্ব মাতৃভাষায় কুরআনের যিকিরসংক্রান্ত আয়াতগুলোর অনুবাদ পড়া বৈধ হবে।৯১৫

টিকাঃ
৯০৮. দেখুন: ইলাউস সুনান (৪/১৪৮-১৫০)।
৯০৯. দেখুন : আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১০. আবু দাউদ (কিতাবুস সালাত/বাবু সালাতি মান লা ইউকিমু সুলবাহ : ৮৫৬)। তিরমিযি (আবওয়াবুস সালাত : ৩০২)।
৯১১. আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১২. দেখুন: বাদায়েউস সানায়ে' (১/১১২-১১৩)। আরও দেখুন: আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (৭৮-৭৯)।
৯১৩. কাশফুল আসরার (১/২৪)।
৯১৪. রদ্দুল মুহতার (১/৩৮৩, ৪৮৪)।
৯১৫. রদ্দুল মুহতার (১/৪৮৫)।

ইমাম আজম রহ.-এর উপর কুরআনকেন্দ্রিক আরেকটি অভিযোগ আরোপ করা হয়। সেটা হলো, তিনি নাকি নামাযের ভিতরে ফারসিতে কুরআন পাঠ করতে বলেছেন! যতটুকু বোঝা যায়, মূল বিষয়টি ইমাম থেকে প্রমাণিত। কিন্তু অভিযোগকারীরা তাঁর বক্তব্য ভুল বুঝেছেন এবং ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাস্তবে ইমাম ফারসিতে কুরআন পড়ার মত দিয়েছিলেন, কিন্তু কুরআন তো আরবি। তাহলে ফারসিতে পড়া হবে কী করে? বোঝা গেল, মতটি ছিল ফারসিতে কুরআন পড়া নয়, বরং কুরআনের অনুবাদ পড়া। তা ছাড়া, এটা তিনি তাদের জন্য রুখসত (সুযোগ) দিয়েছিলেন যারা আরবি পড়তে পারে না। সুতরাং এমন ব্যক্তি নীরব থাকার পরিবর্তে কুরআনের যা-কিছু বোঝে সেটা বলবে কিংবা যেকোনো জিকির পড়বে—এটুকুই। সেটা ফারসি, ইংরেজি, উর্দু বা বাংলা যে ভাষাতেই হোক। এটাকে উন্মুক্তভাবে নামাযে ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের বৈধতা নামে প্রচার করা যথাযথ নয়। কারণ, যে ব্যক্তি আরবিতে কুরআন পড়তে সক্ষম, তাকে আরবিতেই পড়তে হবে।৯০৮

ফারসিতে কুরআন পড়ার বৈধতার কথা বলা ইমামের জ্ঞানগত দুর্বলতা নয়; বরং দূরদর্শিতা এবং ইসলামের সর্বজনীনতার প্রমাণ। এতে ইসলামের প্রশস্ততা এবং মাতৃভাষায় ইসলাম চর্চার নবদিগন্ত উন্মোচনের আভাষ ছিল। ফলে ইমাম ফারসিতে কুরআন তেলাওয়াতের অনুমতি দেন। স্রেফ কুরআন তেলাওয়াত নয়, নামাযের তাকবির, হজের তালবিয়া, পশু যবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ ইত্যাদিও যদি কেউ আরবিতে না পেরে ফারসি বা নিজস্ব অন্য যেকোনো ভাষায় দেয়, সেটাকে বৈধ ঘোষণা করেন।৯০৯

এটা ইমামের মনগড়া বিদআত ছিল না, বরং সুন্নাহ ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিসের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রিফাআহ ইবনে রাফে রাযি. থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসে এক গ্রাম্য সাহাবিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক নামায শেখানোর বর্ণনায় এসেছে, “... (নামাযে) তাকবির বলার পরে যদি তোমার কুরআনের কিছু জানা থাকে, তবে সেটা পড়ো। না থাকলে 'সুবহানাল্লাহ', 'আল্লাহ আকবার', 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলো।”৯১০

আলেমরা উক্ত হাদিস থেকে ইজতিহাদ করেছেন—নামাযে কুরআন পড়া আবশ্যক। অথচ ওজর থাকার কারণে সে ক্ষেত্রে 'রুখসত' তথা ছাড় দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনো নওমুসলিম কিংবা যৌক্তিক ওজরের কারণে কোনো সাধারণ মুসলিম যদি আরবিতে আল্লাহর যিকিরগুলো করতেও অক্ষম হয়, তবে সে যিকিরগুলো নিজের ভাষায় করতে পারবে, ঠিক কালিমার মতো। কোনো অমুসলিম যদি ইসলামে প্রবেশ করতে চায়, তবে তাকে 'কালিমা' পাঠ করতে হয়। কিন্তু সে যদি আরবি কালিমা পাঠ না করতে পারে, বরং নিজের মাতৃভাষায় কালিমার অর্থ স্বীকৃতি দেয়, তবে সে মুমিন গণ্য হবে। কারণ, মূল উদ্দেশ্য তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া। আর সেটা অন্য ভাষাতেও সম্ভব।৯১১

তবে জটিলতা হলো, কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায়—আরবিতে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফারসিতে কেরাত পড়ার বৈধতা দিয়েছেন! কাসানি লিখেন, 'আবু হানিফার মতে, আরবির মতো ফারসিতেও (নামাযে) কেরাত পড়া বৈধ। আরবি পারুক না পারুক সেটা বিবেচ্য নয়। বিপরীতে আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর মতে, আরবি পারলে ফারসিতে বৈধ হবে না। আরবি না পারলে বৈধ হবে। ইমাম শাফেয়ির মত আরও ভিন্ন। তিনি বলেন, আরবি পারুক না পারুক, কোনো অবস্থাতেই ফারসিতে কিছু পড়া যাবে না। যদি আরবি না পারে, তবে তাসবিহ পড়বে। তবুও ফারসিতে কেরাত পড়বে না।' প্রশ্ন আসতে পারে, যদি ইমাম থেকে এই বর্ণনা বিশুদ্ধ হয়, তবে তিনি কীসের ভিত্তিতে আরবি পারা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন পাঠের বৈধতা দিলেন?

মূলত এ প্রশ্নের জবাবই উক্ত ফিকহি মাসআলাকে আকিদার মাসআলায় পরিণত করে। মুতাকাল্লিমিন হানাফি ফকিহগণ মনে করেন, ইমাম আজমের কাছে কুরআন আরবি শব্দগুলো নয়; বরং আল্লাহর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান সিফাতে কালাম হলো মূল কুরআন। শব্দগুলো সেগুলোর নির্দেশক মাত্র। সুতরাং নামাযে কুরআন পাঠের নির্দেশ আল্লাহর সঙ্গে বিদ্যমান সেই অর্থ পাঠ করা উদ্দেশ্য, যা আরবিতে যেমন সম্ভব, অন্য ভাষাতেও সম্ভব। (এ জন্য ইমাম আজম এবং কোনো কোনো বর্ণনামতে আবু ইউসুফের বক্তব্য হলো—কুরআনি ইজায স্রেফ আরবি ছন্দের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়)... ফলে যে ভাষাতেই কুরআনের অর্থগুলো উচ্চারণ করা হবে, সেটাকেই কুরআন বলা যাবে! সুতরাং—কাসানি লিখেন—ইমাম আজমের কথাই শুদ্ধ। একই কথা প্রযোজ্য তাশাহহুদ, জুমার খুতবা, যবাইয়ের সময় (অন্য ভাষায়) বিসমিল্লাহ পড়া, তালবিয়া পড়ার ক্ষেত্রেও। বরং কারও কারও মতে, আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় আজান দেওয়াও বৈধ, যদি মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারে।৯১২

কিন্তু কাসানির উক্ত বক্তব্য উন্মুক্তভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং ইমাম আজম থেকে উক্ত মত (আরবিতে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফারসিতে কুরআন বৈধতা) প্রমাণিত ধরা হলেও সেটা স্বীকৃত বক্তব্য নয়। এক্ষেত্রে তাঁর দুই শাগরেদ ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের বক্তব্য বিশুদ্ধ। বরং বলা হয়ে থাকে, সর্বশেষে ইমাম আজম উক্ত উন্মুক্ত মত প্রত্যাহার করে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেন। বাযদাবি বর্ণনা করেন, 'ইমাম আজমের বিশুদ্ধ মাযহাব হলো কুরআন ছন্দ ও অর্থ দুটোর সমন্বয়।'৯১৩ সুতরাং আরবিতে সক্ষমতা থাকলে ফারসি বা অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। এভাবে এটা হানাফি ইমামদের সর্বসম্মত বক্তব্যে পরিণত হয়।

একই কথা অন্যান্য যিকিরের ক্ষেত্রেও—আরবিতে সক্ষম হলে অন্য ভাষায় করবে না। ইবনে আবিদিন 'সিরাজিয়্যাহ'র উদ্ধৃতিতে লিখেছেন, 'ফারসি (তথা অনারবি ভাষায়) আজান দেওয়া বিশুদ্ধ নয়। মানুষ সেটা শুনে আজান বুঝতে পারলেও বিশুদ্ধ হবে না।'৯১৪ কারণ, ইবাদতটা এভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হয়েছে। আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআন স্রেফ অর্থ নয়; বরং অর্থ ও ছন্দ/শব্দ (নযম) দুটোর সমন্বয়ে আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ আমাদের এটাই পড়তে বলেছেন। এগুলো আরবিতে যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, সেভাবে পড়লেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) প্রতি শব্দে দশটি পুণ্যের ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা এই আরবি কুরআনকেই সুরক্ষিত রাখার ঘোষণা করেছেন। একটি শব্দও তাতে বেশি-কম হবে না। অথচ অনুবাদে মুহূর্তে মুহূর্তে ভাষায় ভাষায় পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও বিকৃতির আশঙ্কা প্রবল। বরং অন্য ধর্মগ্রন্থগুলো বিকৃতির অন্যতম কারণ ছিল শব্দগুলোকে হেফাজত না করা, অর্থের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা। এ জন্য কুরআনকে আল্লাহ শব্দ ও অর্থ দুটোসহই হেফাজত করবেন।

মোটকথা, কুরআনের শব্দ ও অর্থ দুটোকেই আল্লাহ তায়ালা কুরআন হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং নামাযে এই কুরআনই পড়তে হবে যা ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.সহ সকল আলেমের মত। ইমাম আজম থেকে বিপরীতটা বর্ণিত থাকলেও তিনি পরবর্তীকালে দুই শাগরেদদের মত গ্রহণ করেছেন বলে ধরা হবে। তাই আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় কেরাত পড়া যাবে না। হ্যাঁ, আরবি কুরআন না পারলে যেহেতু রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাসবিহ, তাহলিল তথা যিকির করতে বলেছেন, আর যিকির অন্য ভাষাতেও বৈধ, সুতরাং তখন (অক্ষম অবস্থায়) নিজস্ব মাতৃভাষায় কুরআনের যিকিরসংক্রান্ত আয়াতগুলোর অনুবাদ পড়া বৈধ হবে।৯১৫

টিকাঃ
৯০৮. দেখুন: ইলাউস সুনান (৪/১৪৮-১৫০)।
৯০৯. দেখুন : আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১০. আবু দাউদ (কিতাবুস সালাত/বাবু সালাতি মান লা ইউকিমু সুলবাহ : ৮৫৬)। তিরমিযি (আবওয়াবুস সালাত : ৩০২)।
৯১১. আল-বাহরুর রায়েক (১/৫৩৫)।
৯১২. দেখুন: বাদায়েউস সানায়ে' (১/১১২-১১৩)। আরও দেখুন: আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (৭৮-৭৯)।
৯১৩. কাশফুল আসরার (১/২৪)।
৯১৪. রদ্দুল মুহতার (১/৩৮৩, ৪৮৪)।
৯১৫. রদ্দুল মুহতার (১/৪৮৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00