📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কিতাবের পরিচয় ও সংখ্যা

📄 কিতাবের পরিচয় ও সংখ্যা


কিতাবের উপর ঈমান আনার অর্থ হলো, আল্লাহ কর্তৃক বিভিন্ন নবি-রাসুলের উপর অবতীর্ণ বিভিন্ন আসমানি গ্রন্থের ব্যাপারে এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহর অনেকগুলো আসমানি কিতাব রয়েছে। এগুলো তাঁর শাশ্বত কালাম। তাঁর পক্ষ থেকে এগুলো বিভিন্ন নবি-রাসুলের উপর অবতীর্ণ হয়েছে।

আসমানি কিতাবসমূহে বিশ্বাস ঈমানের ছয়টি রোকনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুকন। ঈমানের একটি ভিত্তি। কারণ, এসব গ্রন্থের মাধ্যমেই যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, যোগাযোগ করেছেন; কিতাবরূপে তাঁর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। মানুষ নিজ নিজ ভাষায় তাঁর বাণী পড়েছে, শুনেছে, বুঝেছে এবং আমল করেছে। ফলে আসমানি কিতাব হলো আল্লাহ ও মানুষের যোগাযোগ মাধ্যম। এগুলো অস্বীকার করার অর্থ হলো ঈমানের ভিত্তি অস্বীকার করা। আল্লাহ, ফেরেশতা, নবি-রাসুল, তাকদির, পরকাল অন্য সবকিছুকে অস্বীকার করা। আল্লাহ বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِن قَبْلُ وَمَن يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا অর্থ : 'হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করো এবং বিশ্বাস স্থাপন করো তাঁর রাসুল ও তাঁর কিতাবের উপর, যা তিনি নাযিল করেছেন স্বীয় রাসুলের উপর। ঈমান আনো সে সমস্ত কিতাবের উপর, যেগুলো নাযিল করা হয়েছিল ইতঃপূর্বে। যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ এবং কিয়ামত দিনের উপর বিশ্বাস করবে না, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহু দূরে গিয়ে পড়বে।' [নিসা : ১৩৬]

আসমানি কিতাবের সংখ্যা কতগুলো? উলামায়ে কেরাম লিখেন, একশত চারটি। তন্মধ্যে আদম আলাইহিস সালামের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল দশটি, শীস আলাইহিস সালামের উপর পঞ্চাশটি, ইদরিস আলাইহিস সালামের উপর ত্রিশটি, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের উপর দশটি। মুসা আলাইহিস সালামের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল তাওরাত, দাউদ আলাইহিস সালামের উপর যাবুর, ঈসা আলাইহিস সালামের উপর ইনজিল; আর মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল কুরআন।৭৯৯

কিন্তু সংখ্যাসংশ্লিষ্ট এ বক্তব্যটি চূড়ান্ত নয়। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন নবি-রাসুলের উপর অসংখ্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। যেমন—ইবরাহিম আলাইহিস সালামের উপর সহিফা অবতীর্ণ করেছেন। মুসা আলাইহিস সালামকে তাওরাত দিয়েছেন। ঈসা আলাইহিস সালামকে ইনজিল দিয়েছেন। মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। এই বিষয়গুলো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত। কারণ, আল্লাহ তায়ালা এগুলো কুরআনে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অন্য নবিদের আল্লাহ তায়ালা কতগুলো কিতাব দিয়েছেন এবং কোন কোন কিতাব দিয়েছেন, সেগুলোর সংখ্যা বা নাম আল্লাহ তায়ালা আমাদের জানাননি। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত কোনো বিশুদ্ধ হাদিসে এ ব্যাপারে বক্তব্য নেই। যা আছে সেগুলো দুর্বল। ফলে এর জ্ঞান আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়াই উত্তম।

আসমানি কিতাবের উপর ঈমানের পদ্ধতি হলো—পূর্বের নবি-রাসুলকে প্রদত্ত সকল কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য—এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। কিন্তু সেগুলোর ভিতরে বিদ্যমান আল্লাহর কালামের ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা না বলা। কারণ, সেসব গ্রন্থ হারিয়ে গিয়েছে। যেগুলো আজও অবশিষ্ট আছে—যেমন ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের গ্রন্থ—সেগুলোও সম্পূর্ণ কিংবা সিংহভাগ অংশ বিকৃতির শিকার হয়েছে। ফলে তাদের হাতে বিদ্যমান গ্রন্থগুলো হুবহু আসমানি গ্রন্থ হিসেবে বিশ্বাস করা যাবে না। বিপরীতে কুরআন আল্লাহর শাশ্বত ও অবিকৃত গ্রন্থ। আল্লাহ তায়ালা আসমান থেকে যেভাবে অবতীর্ণ করেছেন সেভাবেই রয়েছে, কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। একটি অক্ষরও পরিবর্তন হয়নি, কখনো হবেও না। কারণ, আল্লাহ তায়ালা এটাকে সুরক্ষিত রাখার ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ অর্থ : 'নিশ্চয়ই আমি এ উপদেশগ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি আর নিশ্চয় আমিই এর সংরক্ষণকারী।' [হিজর : ৯] ফলে কুরআনের প্রত্যেকটি অক্ষর সত্য বলে বিশ্বাস রাখতে হবে। কুরআনের মাঝে বিদ্যমান সকল ঘটনা ও পয়গামকে সত্য বলে স্বীকার করতে হবে। কুরআনের বিধিবিধানকে শিরোধার্য হিসেবে মেনে নিতে হবে। ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘কেউ যদি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষরও অস্বীকার করে, সে কাফের হয়ে যাবে।'৮০০

টিকাঃ
৭৯৯. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১০৪-১০৫)।
৮০০. আল-ইনতিকা (৩১৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কুরআনের আয়াতগুলোর পারস্পরিক মর্যাদার তারতম্য

📄 কুরআনের আয়াতগুলোর পারস্পরিক মর্যাদার তারতম্য


কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়টিই আল্লাহর চিরন্তন মুজিযা। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অতীত ও ভবিষ্যতের এমন সংবাদ দিয়েছেন, যা কোনো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কুরআনের প্রত্যেকটি শব্দ এবং এগুলোর গাঁথুনি আল্লাহ তায়ালা এমনভাবে করেছেন, যেভাবে কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। প্রশ্ন হতে পারে, অন্যান্য আসমানি গ্রন্থও কি মুজিযা ছিল? অর্থের দিক থেকে নিঃসন্দেহে সেগুলোও মুজিযা ছিল। কারণ, তাতেও অনেক ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। যেমন—রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী। কিন্তু অনেক আলেমের মতে, সেসব কিতাবে বর্ণিত শব্দগুলো মুজিযা ছিল না। ফলে সেগুলো সাধারণ মানুষের ভাষায় ছিল। যে-কেউ সেগুলোর মতো বাক্য গঠন করতে পারত। এই কারণে সেগুলো বিকৃতির শিকার হয়। বিপরীতে কুরআনের শব্দগুলোও মুজিযা। ফলে আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ কুরআনের মতো ছন্দ তৈরি করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না।৮০১

ইমাম আজম বলেন, ‘কুরআন আল্লাহর রাসুল (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ, গ্রন্থে লিপিবদ্ধ। কুরআন কারিমের সকল আয়াত আল্লাহর কালাম হওয়ার ভিত্তিতে ফযিলত ও মর্যাদার দিক থেকে সমস্তরের। কিন্তু বর্ণনা ও বিষয়বস্তুর কারণে কিছু আয়াতের বাড়তি ফযিলত রয়েছে, যেমন আয়াতুল কুরসি। এতে আল্লাহর মহিমা, শ্রেষ্ঠত্ব ও গুণাবলি উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এতে দুটি ফযিলত একত্র হয়েছে। এক. বর্ণনার ফযিলত, দুই, বর্ণিতের (তথা বিষয়বস্তুর)। আর কিছু আয়াতে কেবল বর্ণনার ফযিলত রয়েছে, বিষয়বস্তুর নয়, যেমন কাফেরদের আলোচনা। এখানে কাফেরদের কোনো ফযিলত নেই।'৮০২

অর্থাৎ, কুরআনের 'নযম' (ছন্দ) আল্লাহর কালাম হিসেবে সব সমান। কোনো একটি আয়াতের অন্য আয়াতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কিন্তু আলোচ্য বিষয় হিসেবে কিছু আয়াত অপর আয়াতের চেয়ে উত্তম। যেমন—সুরা ইখলাসের আলোচ্য বিষয় (তাওহিদ) সুরা লাহাবের আলোচ্য বিষয়ের চেয়ে উত্তম।

এটা বিভিন্ন হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত। যেমন—রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সুরা ইখলাসকে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ বলেছেন।৮০৩ কারণ, এখানে তাওহিদের আলোচনা করা হয়েছে। আর তাওহিদ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ আলোচ্য বিষয়। ফলে চার আয়াতের একটি ক্ষুদ্র সুরা মর্যাদার দিক থেকে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সুরা ফাতিহা সম্পর্কে বলেছেন—তাওরাত, যাবুর, ইনজিল এমনকি খোদ কুরআনেও এর মতো কোনো (শ্রেষ্ঠ) সুরা অবতীর্ণ হয়নি।৮০৪ এটাও মূলত মর্যাদার ক্ষেত্রে অন্যান্য সুরা ও আয়াতের উপর সুরা ফাতিহা ও এর আয়াতগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের দলিল।

টিকাঃ
৮০১. দেখুন : উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২২৭)।
৮০২. আল-ফিকহুল আকবার (৮)।
৮০৩. মুসলিম (কিতাবু সালাতিল মুসাফিরিন : ৮১১)। তিরমিযি (আবওয়াবু ফাযায়িলিল কুরআন: ১৮৯৯)।
৮০৪. তিরমিযি (আবওয়াবু ফাযায়িলিল কুরআন: ২৮৭৫)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ৮৮০৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলুক নয়

📄 কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলুক নয়


কুরআন আল্লাহ তায়ালার কালাম (তথা বাণী)—এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে কুরআন নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে উম্মাহর একদল বুদ্ধিপূজারী মানুষকে শয়তান উসকে দিয়েছে। তারা কুরআনের পয়গাম আত্মস্থ এবং নির্দেশ পালন করার পরিবর্তে কুরআনের স্বরূপ-প্রকৃতি নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্কে জড়িয়ে গিয়েছে। প্রথমে ছোট ছোট মজলিসে শুরু হওয়া এই তাত্ত্বিক বিতর্ক একসময় সর্বভুক দাবানলে পরিণত হয়ে গোটা উম্মাহকে কয়েক শতাব্দ জ্বালিয়েছে, পুড়িয়েছে, বরং আজও জ্বালাচ্ছে।

এই বিতর্কের সারকথা ছিল: কুরআন আল্লাহর কালাম ঠিক আছে, কিন্তু এই কালামের রূপরেখা কী? এটা কি আল্লাহর সরাসরি গুণ, নাকি তাঁর সৃষ্টি করা বস্তু? আল্লাহর সিফাত (গুণ) অস্বীকারকারী ভ্রান্ত লোকজন কুরআনকে আল্লাহর 'মাখলুক' তথা সৃষ্টি বলে আখ্যা দিলো, যাতে আল্লাহর কালাম সিফাত অস্বীকারের পথ প্রশস্ত হয়। আহলে সুন্নাতের আলেমগণ তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করলেন। কুরআনকে আল্লাহর কালাম ও 'গাইরে মাখলুক' তথা সৃষ্টি নয় বলে আখ্যা দিলেন।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানেই ঘটনা শেষ হলো না। দ্বীনের মৌলিক বিষয় বাদ দিয়ে অর্থহীন বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ির অনিবার্য কুফল সর্বত্র প্রকাশ পেতে থাকল। একসময় আহলে সুন্নাতের আলেমরাও জড়িয়ে গেলেন অভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিতর্কে। কয়েক শতাব্দ এটা চলল। মৌখিক কাদা ছোড়াছুড়ি একসময় সহিংসতায় রূপ নিল। পরস্পরের বিরুদ্ধে গিবত-শেকায়েত, অভিযোগ-অপবাদের তুফান বয়ে চলল। বরং একপর্যায়ে মামলা-হামলা, একে অন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, জালিমের কাছে বিচার দিয়ে শাস্তির মুখোমুখি করা, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়াসহ কোনোকিছু বাদ থাকল না। এটা ছিল একটা অভিশাপ, যা আজও উম্মাহর কাঁধ ভারী করে রেখেছে।

ইমাম আজম রহ. এই ফেতনার সূচনা নিজ চোখে দেখেছিলেন, যার সামনে চুপ থাকা সমীচীন ছিল না। ফলে তিনি হক প্রকাশ এবং বাতিলের খণ্ডন নিজের দায়িত্ব মনে করে সামনে এগিয়ে আসেন। কুরআন সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা তুলে ধরেন। ইমাম বলেন, “কুরআন আল্লাহ তায়ালার ‘কালাম' (বাণী), গ্রন্থে লিপিবদ্ধ, হৃদয়ে সুরক্ষিত, মুখে পঠিত, নবিজি (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ। ...কুরআন সৃষ্ট নয়। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালামসহ যেসব নবির ঘটনা বর্ণনা করেছেন, ফিরাউন ও ইবলিসের ঘটনা বলেছেন, সেগুলোর সবই আল্লাহ তায়ালার 'কালাম' (বাণী)। তিনি নিজের 'কালামে'র মাধ্যমে তাদের সংবাদ দিয়েছেন। তাঁর কালাম সৃষ্ট নয়। কিন্তু মুসা আলাইহিস সালামসহ অন্যান্য সৃষ্টির 'কালাম' (কথা) সৃষ্ট। কুরআন আল্লাহর কালাম। সুতরাং এটা চিরন্তন। এটা তাদের কালাম নয়।”৮০৫

ইমাম আল-ওয়াসিয়্যাহ গ্রন্থে বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি, কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলুক নয়। এটা তাঁর ওহি এবং তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাঁর গুণ (সিফাত)। ফলে কুরআন আল্লাহ নয়, আবার তাঁর থেকে আলাদাও নয়। মুসহাফে লিখিত, মুখে পঠিত, হৃদয়ে সংরক্ষিত। ...আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। ... সুতরাং যে বলবে আল্লাহর কালাম (কুরআন) মাখলুক, সে মূলত মহান আল্লাহকে অস্বীকারকারী' (কাফের)।৮০৬

ইমাম তহাবি রহ. ইমাম আজমের আকিদা বর্ণনা করেন এভাবে, “কুরআন আল্লাহর কালাম। এর উৎস আল্লাহ তায়ালার 'কথা' যার স্বরূপ তিনিই জানেন। এটা তিনি তাঁর রাসুলের উপর ওহি হিসেবে পাঠিয়েছেন। মুমিনগণ এটা হক হিসেবে সত্যায়ন করেছেন। এটাকে প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর কথা হিসেবে দৃঢ় বিশ্বাস করেছেন। এটা সৃষ্টির কথার মতো সৃষ্ট নয়। সুতরাং যদি কেউ মনে করে কুরআন মানুষের কথা, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা এমন ব্যক্তির নিন্দা-ভর্ৎসনা করেছেন। তাকে জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন, যেমনটি কুরআনে তিনি বলেছেন, 'আমি তাকে সাকার (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করব।' সুতরাং কুরআনকে 'এটা তো কেবল মানুষের কথা' সাব্যস্তকারীকে আল্লাহ তায়ালা যখন জাহান্নামে নিক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আমরা নিশ্চিতরূপে জানতে পারলাম, কুরআন মানুষের স্রষ্টার কথা, মানুষের কথার সঙ্গে এর সাদৃশ্য নেই।”৮০৭

টিকাঃ
৮০৫. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৮০৬. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
৮০৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ‘কুরআন সৃষ্টি’র মাসআলাতে ইমামের উপর অভিযোগ

📄 ‘কুরআন সৃষ্টি’র মাসআলাতে ইমামের উপর অভিযোগ


উপরের আলোচনাতে স্পষ্ট যে, ইমাম আবু হানিফা রহ. 'কুরআন আল্লাহর সৃষ্ট' এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করতেন। বরং তিনিই এই ভ্রান্তির বিরুদ্ধে আহলে সুন্নাতের সংগ্রামী ইমামদের প্রথম সারিতে ছিলেন। একপর্যায়ে যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক (সৃষ্টি) বলবে তাকে কাফের বলেছেন। এটা তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাযহাব। তাঁর ছাত্রগণ শতাব্দের পরে শতাব্দ এ আকিদা তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন। ফলে তাঁর দিকে সম্বন্ধকৃত সবগুলো গ্রন্থেই এটা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

দুঃখের বিষয় হলো, এত বক্তব্য থাকার পরও অতীত ও বর্তমানের কিছু ব্যক্তি তাঁর দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি কুরআনকে মাখলুক (সৃষ্ট) বলতেন—এমন অভিযোগ করেছেন। বরং এ কারণে একদল তাকে মুশরিকও বলেছেন! অথচ এটা ডাহা মিথ্যা অপবাদ। সত্যের ছিটেফোঁটাও নেই তাতে। কিছু বিভ্রান্ত মানুষ এসব অপবাদ ইমাম আজমের নামে রটিয়েছে। পরবর্তীকালে আহলে সুন্নাতের একদল আলেম তাদের ফাঁদে পড়ে ইমাম আজমকে ভুল বুঝেছেন। গোমরাহ লোকদের অপপ্রচারে বিশ্বাস করে ইমামের অন্যায্য সমালোচনা করেছেন। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করুন।

ইমামকে ভুল বুঝে তাঁর নামে ছড়ানো ভিত্তিহীন বক্তব্য বিশ্বাস ও বর্ণনার প্রথম সারিতে রয়েছেন ইমাম বুখারি। বুখারি তাঁর 'খালকু আফআলিল ইবাদ' গ্রন্থে লিখেছেন, সুফিয়ান সাওরিকে হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান বলেন, (أَبْلِغْ أَبَا فُلانٍ الْمُشْرِكَ, أَنِّي بَرِيءٌ مِنْ دِينِهِ) আপনি আবু ফুলান তথা জনৈক মুশরিককে জানিয়ে দিন যে, আমি তার দ্বীন থেকে মুক্ত। সুফিয়ান বলেন, কারণ তিনি বলতেন, কুরআন মাখলুক।৮০৮ প্রশ্ন আসতে পারে, এখানে ‘আবু ফুলান’ (জনৈক) বলতে কে উদ্দেশ্য? উত্তর হলো, দুঃখজনকভাবে এখানে ‘আবু ফুলান’ বলতে ‘আবু হানিফা’ উদ্দেশ্য! কারণ বুখারি এখানে নামটা অস্পষ্ট রাখলেও তাঁর ‘আত তারিখুল কাবির’-এ অস্পষ্ট রাখেননি। সেখানে লিখেন, (أبلغ أبا حنيفة المشرك أنى برئ منه) অর্থাৎ, আপনি মুশরিক আবু হানিফাকে জানিয়ে দিন যে, আমি তার থেকে মুক্ত।৮০৯

উভয় জায়গাতেই বুখারি বর্ণনা দুটো উল্লেখের পরে কোনো খণ্ডন করেননি। বোঝা যায়, তিনি এসব বর্ণনার প্রতি একরকম বিশ্বাস করতেন, এগুলো সমর্থন করতেন। এ কারণে ইমাম আজমকে ‘মুশরিক’ বলার পরও সেটা খণ্ডনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি।

বুখারির পরে ইমাম আজমকে এ ধরনের অপবাদে বিশ্বাসী ও প্রচারকারী আরেকজন হলেন, বরং এক্ষেত্রে শীর্ষ সারিতে রয়েছেন, ইমাম আহমদ তনয় আবদুল্লাহ। তিনি ইমাম আজমের নামে কেবল ‘কুরআন মাখলুক’ বলার বক্তব্য চালিয়েছেন এমন নয়; বরং তিনি তাঁকে এই বিদআতের সর্বপ্রথম সৃষ্টিকর্তা এবং প্রধান কারিগর বানিয়ে দিয়েছেন! তিনি ইমাম আবু ইউসুফ সূত্রে (!) বর্ণনা করেন—সর্বপ্রথম ‘কুরআন মাখলুক’ এমন কথা বলেন আবু হানিফা।৮১০ অথচ আমরা দেখব, ইমাম আজম কখনো এ ধরনের কথা বলেননি। বরং তিনি এটার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। ফলে উলটো তাঁকে এই বিদআতের জনক বানিয়ে দেওয়া বড় রকমের জুলুম। লালাকায়ি বর্ণনা করেন, ‘এ বিষয়ে উম্মাহর মাঝে কোনো দ্বিমত নেই যে, সর্বপ্রথম কুরআনকে মাখলুক বলেছে জা'দ ইবনে দিরহাম। অতঃপর জাহম ইবনে সফওয়ান।'৮১১ আবদুল্লাহ কি এগুলো জানতেন না? তাহলে ইমাম আজমকে কীভাবে এই বিভ্রান্তির উদ্ভাবক বানালেন? আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন।

অতঃপর আরেকজন বড় ইমাম, যিনি এই মুসিবতে মুবতালা হয়েছেন, তিনি আবুল হাসান আশআরি। তিনি তাঁর ‘আল-ইবানাহ’ গ্রন্থে এমন একাধিক বর্ণনা এনেছেন, যেগুলো ইমাম আজমের উপর সুস্পষ্ট অপবাদ। যেমন—তিনি লিখেছেন, সুফিয়ান সাওরি বলেন, 'আমাকে হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান (بلغ أبا حنيفة المشرك أني منه بريء) (আপনি মুশরিক আবু হানিফাকে জানিয়ে দিন যে, আমি তার থেকে মুক্ত)। সুফিয়ান বললেন, কারণ তিনি কুরআনকে মাখলুক বলতেন!' আশআরি ইমাম আজমকে উক্ত বক্তব্য থেকে তাওবা করানোর কথাও বলেছেন। শেষে বলেন, হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান আবু হানিফার কাছে খবর পাঠান, তাওবা করার আগ পর্যন্ত আমি তোমার থেকে মুক্ত। তার কাছে তখন ইবনে আবি উকবা ছিলেন। তিনি বললেন, আপনার প্রতিবেশী আমাকে জানিয়েছে, আবু হানিফাকে (খলকে কুরআন বক্তব্য থেকে) তাওবা করানোর পরও তিনি তাকে সেটার দাওয়াত দিয়েছেন।'৮১২ এর মানে, তাওবা করানোর পরও আবু হানিফা তাঁর ভ্রান্ত আকিদা থেকে ফেরেননি!

ইমামের উপর এমন অভিযোগকারীদের প্রথম সারির আরেকজন হলেন আবু বকর খতিবে বাগদাদি। তিনি বিভিন্ন অজ্ঞাত ও দুর্বল ব্যক্তির পতিত সনদে বর্ণনা করেছেন, আবু হানিফা কুরআন মাখলুক মনে করতেন, যার ফলে তাকে তাওবা করানো হয় এবং তিনি ফিরে আসেন।৮১৩ খতিব তার তারিখে এর সপক্ষে অনেকগুলো বর্ণনা তুলে ধরেছেন। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলো হিংসা, প্রতিপক্ষের প্রোপাগান্ডা থেকে উৎসারিত। আর অধিকাংশ দুর্বল, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বর্ণনা।

টিকাঃ
৮০৮. খালকু আফআলিল ইবাদ (৭)।
৮০৯. আত-তারিখুল কাবির, বুখারি (৪/১২৭)।
৮১০. দেখুন: আস-সুন্নাহ, আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ (১২৬)।
৮১১. শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ (২/৩৪৪)।
৮১২. আল-ইবানাহ আন উসুলিদ দিয়ানাহ, আশআরি (২৯)। 'ইবানা'র কিছু কিছু নুসখাতে এসব বর্ণনা উল্লেখের পরে আশআরির পক্ষ থেকে ইমামের পক্ষে প্রতিরক্ষামূলক বক্তব্য উল্লেখ আছে (যেমন: ড. ফাওকিয়্যাহর নুসখায়)। তাই কিছু কিছু আলেম এই নুসখাকে অন্যান্য নুসখার উপর 'হুজ্জাহ' ধরেছেন এবং সেগুলোকে বিকৃত বলেছেন। অথচ ইবানাহ'র অসংখ্য পাণ্ডুলিপিতে এ ধরনের কোনো বক্তব্য নেই। এমনকি ইমাম সাখাভির হাতে লেখা টীকাসংবলিত একটি প্রাচীন বিশুদ্ধ নুসখা (যা ইদারাতুত তিবাআহ আল-মুনিরিয়্যাহ থেকে ছাপানো হয়েছে), সেখানেও এ ধরনের বক্তব্য নেই। ফলে একই যুক্তিতে উলটো ড. ফাওকিয়্যাহর নুসখাকেই বিকৃত এবং ইমামের শানে প্রতিরক্ষামূলক বক্তব্যগুলোকে পরবর্তীকালে সংযোজিত বলা যেতে পারে। বরং আশআরির নামে খণ্ডনী বক্তব্যের ভাষা ও উসলুব পরবর্তীকালে সংযোজিত হওয়ার সম্ভাবনাকেই বৃদ্ধি করে। কারণ, এ ধরনের অভিযোগ কেবল ইবানাহতে নয়; বুখারিও তার 'খালকু আফআলিল ইবাদ (৭) ও 'আত তারিখুল কাবির' (৪/১২৭)-এ করেছেন, যা আমরা উপরে বলেছি। ফলে ইবানাহতেও এমন অভিযোগ পরে সংযোজিত হবার পরিবর্তে মূল গ্রন্থে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। আল্লামা কাওসারি ইবনে কুতাইবা দিনাওয়ারির 'আল-ইখতিলাফ ফিল লফজ'-এর টাকায় লিখেন, এখানে ইবানাহর বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে। মূল বক্তব্যে 'আবু হানিফা' নেই; বরং 'আবু ফুলান' (জনৈক ব্যক্তি) উল্লেখ আছে, যেমনটা বুখারির 'খালকু আফআলিল ইবাদ' গ্রন্থেও এসেছে। [আল-ইখতিলাফ ফিল লফজ ৪২]
৮১৩. তারিখে বাগদাদ (১৫/৫১৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00