📄 মুমিন জিনরা কি জান্নাতে যাবে না?
প্রশ্ন হলো, পুণ্যবান মুমিন জিনরা কি মানুষের মতো জান্নাতে যাবে? সেখানকার নেয়ামত উপভোগ করবে? নাকি তাদের ভিন্ন কোনো পরিণতি বরণ করতে হবে?
এটা মতভেদপূর্ণ বিষয়। ইমাম আবু হানিফার আকিদাবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে এ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য নেই। তবে মাতুরিদি তাঁর তাফসিরে ইমাম আজমের একটি মত উল্লেখ করেছেন। মাতুরিদি লিখেন, 'আবু হানিফা থেকে বর্ণিত আছে—জিনদের কোনো পুণ্য নেই। কিন্তু অবাধ্য হলে পাপ আছে। অর্থাৎ, জিনরা যদি গুনাহ করে, কুফরি করে, তবে আল্লাহ তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। কিন্তু তারা যদি পুণ্য করে, ভালো কাজ করে, তাদের জান্নাত দান করবেন—এ কথা বলা যাবে না। কারণ হিসেবে ইমাম আজম মনে করেন, জিনদের শাস্তির কথা কুরআনে এসেছে, কিন্তু জান্নাতে নেয়ামত ভোগের কথা আসেনি। ফলে কুরআনে যতটুকু এসেছে ততটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। তা ছাড়া, মুমিনদের জান্নাত লাভ তাদের কর্মফল নয়; বরং আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি। আর এ ধরনের প্রতিশ্রুতি যেহেতু জিনদের ব্যাপারে বিদ্যমান নেই, তাই তাদের ব্যাপারে জান্নাত সাব্যস্ত করা যাবে না।৭৯৫ অন্য হানাফি আলেমগণও ইমামের অনুসরণে একই কথা বলেছেন।
সদরুল ইসলাম বাযদাবি ও সাফফার বুখারি বলেন, এটাই আহলে সুন্নাতের মত। কারণ, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে মুমিন জিনদের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘোষণা করেছেন। জান্নাতের ঘোষণা করেননি। [আহকাফ : ৩১]৭৯৬ আবুল মুঈন নাসাফি ও হাফিজুদ্দিন নাসাফিসহ অন্য সকল হানাফি আলেমের মতও এটাই। তারা সকলে এ ব্যাপারে ইমাম আজমের নীরব থাকার মত বর্ণনা করেছেন।৭৯৭
কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ও শাফেয়িসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাতের মতে, জিনদের পাপ-পুণ্য যেমন আছে, তাদের কর্মের প্রতিদানস্বরূপ জান্নাত-জাহান্নামও আছে। সুরা আর রহমান এর সাক্ষী। কারণ, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সুরা আর-রহমানের সবগুলো প্রসঙ্গ মানুষ ও জিন উভয় জাতির ব্যাপারে এনেছেন। উভয়কে সম্বোধন করেছেন। সেখানে যেমন জাহান্নামের কথা আছে, তেমন জান্নাতের কথাও আছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান। সুতরাং তোমরা (জ্বিন ও মানুষ) উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয় উদ্যানই ঘন শাখা-পল্লববিশিষ্ট। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রবহমান দুই প্রস্রবণ। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই দুই প্রকার। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? তারা তথায় রেশমের আস্তরবিশিষ্ট বিছানায় হেলান দিয়ে বসবে। উভয় উদ্যানের ফল তাদের নিকট ঝুলবে। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে। সেই সকলের মাঝে রয়েছে বহু আনতনয়না, যাদের পূর্বে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি।’ [আর-রহমান : ৪৬-৫৬]৭৯৮
ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্য, তাঁর ইলম ও ইজতিহাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক আমরা যদি নিষ্ঠার সঙ্গে কুরআনের প্রতি তাকাই, দেখতে পাব, ইমাম আজমের চেয়ে তাঁর দুই শাগরেদ ও জমহুরের বক্তব্য অধিকতর শক্তিশালী। ফলে জান্নাত ও জাহান্নাম দুটোই মানুষ ও জিন উভয় জাতির জন্য। জান্নাতে মানুষ যেমন নেয়ামত ভোগ করবে, জিনরাও একই নেয়ামত ভোগ করবে। কারণ, তাদের প্রকৃতি, জীবনের উদ্দেশ্য, মানসিকতা, স্বভাব-চরিত্র সবগুলোই মৌলিকভাবে অভিন্ন। কেবল সৃষ্টিগত পদার্থের ক্ষেত্রে পার্থক্য। ফলে আখিরাতেও তারা এই পার্থক্যসহই জান্নাতে থাকবে।
টিকাঃ
৭৯৫. তাফসিরে মাতুরিদি (১০/২৫৫)।
৭৯৬. দেখুন : উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২১০)। তালখিসুল আদিল্লাহ (৫৮৪)।
৭৯৭. দেখুন : বাহরুল কালাম (১৮০)। আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৪৫২)।
৭৯৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২১০-২১১)। আল-আকিদাহ রুকনিয়্যাহ (৫৯)।