📄 ফেরেশতাদের দায়িত্ব
ফেরেশতাদের আল্লাহ তায়ালা অনর্থক সৃষ্টি করেননি। বরং তাদের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রেখেছেন। একদল তাঁর ইবাদতের দায়িত্বে নিয়োজিত। একদল ফেরেশতাদের আল্লাহ তায়ালা মানুষের আমল লিখে রাখার জন্য নিযুক্ত করেছেন। তাদের 'কিরামান কাতিবিন' তথা সম্মানিত লেখক ফেরেশতা বলা হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে বলেন, ‘না, কখনো না, তোমরা তো শেষ বিচারকে অস্বীকার করে থাকো। অবশ্যই তোমাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ’। [ইনফিতার : ৯-১১] আরও বলেন, ‘যখন দুই (আমল) গ্রহণকারী ফেরেশতা তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে’। [কাফ : ১৭] দুজন ফেরেশতা রয়েছেন কবরে মানুষকে প্রশ্নের দায়িত্বে। তাদের বলা হয় ‘মুনকার’ ও ‘নাকির’। ইমাম তহাবি বলেন, “আমরা কিরামান কাতিবিন (ফেরেশতাদের) প্রতি ঈমান রাখি। আল্লাহ তায়ালা তাদের আমাদের পর্যবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত করেছেন। আমরা মৃত্যুর ফেরেশতার প্রতি ঈমান রাখি, আল্লাহ তায়ালা যাকে গোটা জগদ্বাসীর প্রাণ সংহারের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমরা আল্লাহর রাসুল এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে একাধিক হাদিসে বর্ণিত কবরে মুনকার-নাকিরের 'তোমার রব কে', 'তোমার দ্বীন কী' এবং 'তোমার নবি কে' উক্ত তিনটি প্রশ্নে ঈমান রাখি।”৭৮৭
আরেকজন রয়েছেন মৃত্যুর ফেরেশতা এবং তাঁর সহযোগিবৃন্দ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ফেরেশতারা এই অবস্থায় তাদের প্রাণ সংহার করে যে, তারা নিজেদের উপর যুলুম করছিল।’ [নাহল : ২৮] একদল ফেরেশতা রয়েছেন জাহান্নামের প্রহরী। আল্লাহ তায়ালা তাদের একটি দল সম্পর্কে বলেন, ‘তার উপর রয়েছে উনিশ জন।’ [মুদ্দাসসির : ৩০] আরেক দল ফেরেশতা আল্লাহর আরশের আশপাশে রয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আপনি ফেরেশতাদের দেখতে পাবেন, তারা আরশের চারপাশ ঘিরে তাদের প্রতিপালকের প্রশংসার সাথে তাঁর তাসবিহ পাঠ করছে।’ [যুমার : ৭৫] একদল ফেরেশতা রয়েছেন মানুষের সংরক্ষণ এবং তাকে বিপদাপদ থেকে সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের জন্য তার অগ্রে ও পশ্চাতে পালাক্রমে প্রহরী থাকে। তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে।’ [রাদ : ১১]
টিকাঃ
৭৮৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৫)।
📄 ফেরেশতা নাকি মানুষ উত্তম?
সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতে ঈমানদার (মুমিন) আদম সন্তান ফেরেশতার চেয়ে উত্তম। বিপরীতে কাদারিয়্যাহ ও মুতাযিলা সম্প্রদায়ের মতে, ফেরেশতারা মানুষের চেয়ে উত্তম। তাদের যুক্তি কুরআনের কিছু আয়াতের বাহ্যিক অর্থ। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, ‘(ঈসা) মসিহ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে কখনও হেয় জ্ঞান করে না। আর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারাও এটা করে না। কেউ তাঁর ইবাদতকে হেয় জ্ঞান করলে এবং অহংকার করলে তিনি অবশ্যই তাদের সকলকে তাঁর নিকট একত্র করবেন।’ [নিসা : ১৭২] এ আয়াতে বোঝা যায় ফেরেশতা মানুষের চেয়ে উত্তম! তা ছাড়া, তারা আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করেন না। আল্লাহ তাদের ব্যাপারে আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো দোযখ থেকে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে না। যা করতে আদিষ্ট হয় তা-ই করে।’ [তাহরিম : ৬] অথচ মানুষ অহরহ আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘন করে। আর স্বাভাবিকভাবেই যে আল্লাহর যত অনুগত, সে তত শ্রেষ্ঠ। উপরন্তু আল্লাহ নিজে তাদের সম্মানিত বান্দা বলেছেন: ‘তারা বলে, দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি পবিত্র। বরং তারা (ফেরেশতা) সম্মানিত বান্দা।’ [আম্বিয়া : ২৬] আল্লাহর কাছে সম্মানের মানদণ্ড হলো তাকওয়া। তিনি বলেন, ‘তোমাদের মাঝে আল্লাহর কাছে সে সবচেয়ে সম্মানিত যে তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।’ [হুজুরাত : ১৩]
আহলে সুন্নাতের দলিল হলো কুরআনের অসংখ্য আয়াত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদের উত্তম রিযিক দান করেছি এবং আমার সৃষ্টির অনেকের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ [ইসরা : ৭০] অন্য আয়াতে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ আদম, নুহ, ইবরাহিমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে সমস্ত জগদ্বাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।’ [আলে ইমরান: ৩৩] আরেক জায়গায় বলেন, ‘স্মরণ করুন আমার বান্দা ইবরাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবের কথা, তারা ছিল শক্তিশালী ও সূক্ষ্মদর্শী। আমি তাদের এক বিশেষ গুণ তথা পরকালের স্মরণ দ্বারা স্বাতন্ত্র্য দান করেছিলাম। অবশ্যই তারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।’ [সোয়াদ : ৪৫-৪৭] এসব আয়াতে দেখা যাচ্ছে, গোটা সৃষ্টির মাঝে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে। আর সৃষ্টির মাঝে ফেরেশতাও অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং ফেরেশতার চেয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলো। অধিকন্তু ফেরেশতাদের ব্যাপারে এমন কোনো বক্তব্য নেই।
একইভাবে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পৃথিবীতে রাজত্ব দিয়েছেন; সম্পদ এবং অন্যান্য নেয়ামত দিয়েছেন। ফেরেশতাদের সেগুলো দেওয়া হয়নি। বরং তাদের মানুষের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছে। মানুষের দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে লাগানো হয়েছে। একইভাবে আল্লাহ তায়ালা জান্নাত মানুষের জন্য বানিয়েছেন। পরকালে মানুষকে আল্লাহর দিদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফেরেশতাদের জন্য এমন কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। হ্যাঁ, ফেরেশতারাও জান্নাতে প্রবেশ করবেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জান্নাত দেবেন সেখানকার নেয়ামত উপভোগ করার জন্য। বিপরীতে ফেরেশতারা সেখানে মুমিনদের দেখতে যাবেন, জান্নাতের নেয়ামত উপভোগ করতে নয়। কারণ, মানুষ বিবেক ও প্রবৃত্তি দুটোর মিশ্রণে তৈরি। কিন্তু ফেরেশতাদের মাঝে বিবেক থাকলেও তারা প্রবৃত্তিমুক্ত। এ কারণে মানুষ ভালো কাজ করলে পুণ্য লাভ করে। ফেরেশতারা ভালো কাজের বিনিময়ে পুণ্য লাভ করেন না।৭৮৮
পরবর্তী হানাফি আলেমদের ঐকমত্যে সাধারণ মানুষ সাধারণ ফেরেশতাদের চেয়ে উত্তম। আর নবি-রাসুলগণ ফেরেশতাদের মাঝ থেকে যারা রাসুল তথা বার্তাবাহক, তাদের চেয়ে উত্তম। এ হিসেবে ফেরেশতাদের মাঝে যারা প্রথম সারিতে, যেমন—জিবরাইল, মিকাইল, ইসরাফিল ও মালাকুল মওতসহ আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ সাধারণ মানুষের চেয়ে উত্তম।৭৮৯ বাযদাবি বলেন, 'আবু মনসুর মাতুরিদি থেকে বর্ণিত : সৃষ্টির সর্বোত্তম হলেন মুহাম্মাদ (ﷺ), অতঃপর মানব রাসুলগণ, অতঃপর ফেরেশতা রাসুলগণ, অতঃপর মানব নবিগণ, অতঃপর মানব মুত্তাকিগণ, অতঃপর সাধারণ মুমিনগণ, অতঃপর সাধারণ ফেরেশতাগণ।৭৯০
কিন্তু এটা দ্বীনের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো বিষয় নয়। দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো কাজে লাগার মতো মাসআলা নয়। ফলে এটা নিয়ে অতিরঞ্জন না করা চাই। ইমাম মাতুরিদি তার তাফসিরে বলেন, 'মানুষ না ফেরেশতা উত্তম—এটা আমাদের জানা নেই। এ জ্ঞান আল্লাহর কাছে। আমাদের এ ব্যাপারে জানার প্রয়োজনও নেই।'৭৯১
সুবকি বলেন, 'যদি সারা জীবনেও কোনো মানুষের অন্তরে ফেরেশতার চেয়ে নবিকে শ্রেষ্ঠ বলার বিষয়টি না আসে, আল্লাহ তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন না।'৭৯২ কারণ, এটা ঈমানের কোনো জরুরি বিষয় নয়। বান্দার উপর এটা জানা আবশ্যক নয়।
টিকাঃ
৭৮৮. বিস্তারিত দেখুন : আল-ইতিকাদ, বলখি (১০৩)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২০৫-২০৮)। আল-আকিদাহ রুকনিয়্যাহ (৪৩)। হাসান বসরি থেকে বর্ণিত আছে, তিনিও ফেরেশতাদের নবি-রাসুল-সহ সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলতেন। তার কথার খণ্ডন মুতাযিলা ও কাদারিয়্যাহদের কথার খণ্ডনই। দেখুন : তালখিসুল আদিল্লাহ (৮০৩) শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৪১)।
৭৮৯. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২০৫-২০৮)। আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ, নাসাফি (৪৫৮)।
৭৯০. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২০৫-২০৮)।
৭৯১. তাফসিরে মাতুরিদি (৭/৮৭)।
৭৯২. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (১০২)।
📄 জিন জাতির পরিচয়
জিন জাতি ফেরেশতাদের মতো আল্লাহ তায়ালার একটি অদৃশ্য সৃষ্টি। আমরা তাদের দেখতে পাই না। তারাও ফেরেশতাদের মতো বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে সক্ষম। কিন্তু জিন জাতি ফেরেশতা থেকে সৃষ্টি ও প্রকৃতি তথা সকল দিক থেকেই আলাদা। ফেরেশতারা নূরের তৈরি, আর জিন আগুনের তৈরি। প্রধান শয়তান ইবলিস ফেরেশতা নয়; জিন জাতিভুক্ত।৭৯৩
জিন তাদের প্রকৃতির দিক থেকে মানুষের খুব কাছাকাছি। মানুষের মাঝে যেমন নারী-পুরুষ আছে, তেমন জিনদের মাঝেও নারী-পুরুষ আছে। তারা মানুষের মতোই ক্ষুধা ও প্রবৃত্তির চাহিদার অধিকারী। মানুষের মতো তারাও আল্লাহর ইবাদতের জন্য আদিষ্ট। রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের মতো তাদের কাছেও রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। পরকালে মানুষের মতো জিনদেরও বিচার হবে। তাদের মাঝে যারা কাফের, মানব জাতিভুক্ত কাফেরদের মতো চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে। যারা গুনাহগার, তারা গুনাহগার মানুষের মতো অস্থায়ীভাবে জাহান্নামে যাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেককে সঠিক দিক-নির্দেশ দিতাম; কিন্তু আমার এ উক্তি অবধারিত সত্য যে, আমি জিন ও মানব সকলকে দিয়ে অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করব।’ [সাজদা : ১৩] অন্য আয়াতে বলেন, (জিনরা বলল) ‘হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। আল্লাহ তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে তোমাদের রক্ষা করবেন।’ [আহকাফ : ৩১]৭৯৪
টিকাঃ
৭৯৩. শরহুল আকায়েদ (৩৩১)।
৭৯৪. তাফসিরে মাতুরিদি (৪/৪১৮)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২১০)।
📄 মুমিন জিনরা কি জান্নাতে যাবে না?
প্রশ্ন হলো, পুণ্যবান মুমিন জিনরা কি মানুষের মতো জান্নাতে যাবে? সেখানকার নেয়ামত উপভোগ করবে? নাকি তাদের ভিন্ন কোনো পরিণতি বরণ করতে হবে?
এটা মতভেদপূর্ণ বিষয়। ইমাম আবু হানিফার আকিদাবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে এ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য নেই। তবে মাতুরিদি তাঁর তাফসিরে ইমাম আজমের একটি মত উল্লেখ করেছেন। মাতুরিদি লিখেন, 'আবু হানিফা থেকে বর্ণিত আছে—জিনদের কোনো পুণ্য নেই। কিন্তু অবাধ্য হলে পাপ আছে। অর্থাৎ, জিনরা যদি গুনাহ করে, কুফরি করে, তবে আল্লাহ তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। কিন্তু তারা যদি পুণ্য করে, ভালো কাজ করে, তাদের জান্নাত দান করবেন—এ কথা বলা যাবে না। কারণ হিসেবে ইমাম আজম মনে করেন, জিনদের শাস্তির কথা কুরআনে এসেছে, কিন্তু জান্নাতে নেয়ামত ভোগের কথা আসেনি। ফলে কুরআনে যতটুকু এসেছে ততটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। তা ছাড়া, মুমিনদের জান্নাত লাভ তাদের কর্মফল নয়; বরং আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি। আর এ ধরনের প্রতিশ্রুতি যেহেতু জিনদের ব্যাপারে বিদ্যমান নেই, তাই তাদের ব্যাপারে জান্নাত সাব্যস্ত করা যাবে না।৭৯৫ অন্য হানাফি আলেমগণও ইমামের অনুসরণে একই কথা বলেছেন।
সদরুল ইসলাম বাযদাবি ও সাফফার বুখারি বলেন, এটাই আহলে সুন্নাতের মত। কারণ, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে মুমিন জিনদের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘোষণা করেছেন। জান্নাতের ঘোষণা করেননি। [আহকাফ : ৩১]৭৯৬ আবুল মুঈন নাসাফি ও হাফিজুদ্দিন নাসাফিসহ অন্য সকল হানাফি আলেমের মতও এটাই। তারা সকলে এ ব্যাপারে ইমাম আজমের নীরব থাকার মত বর্ণনা করেছেন।৭৯৭
কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ও শাফেয়িসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাতের মতে, জিনদের পাপ-পুণ্য যেমন আছে, তাদের কর্মের প্রতিদানস্বরূপ জান্নাত-জাহান্নামও আছে। সুরা আর রহমান এর সাক্ষী। কারণ, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সুরা আর-রহমানের সবগুলো প্রসঙ্গ মানুষ ও জিন উভয় জাতির ব্যাপারে এনেছেন। উভয়কে সম্বোধন করেছেন। সেখানে যেমন জাহান্নামের কথা আছে, তেমন জান্নাতের কথাও আছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান। সুতরাং তোমরা (জ্বিন ও মানুষ) উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয় উদ্যানই ঘন শাখা-পল্লববিশিষ্ট। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রবহমান দুই প্রস্রবণ। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই দুই প্রকার। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? তারা তথায় রেশমের আস্তরবিশিষ্ট বিছানায় হেলান দিয়ে বসবে। উভয় উদ্যানের ফল তাদের নিকট ঝুলবে। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে। সেই সকলের মাঝে রয়েছে বহু আনতনয়না, যাদের পূর্বে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি।’ [আর-রহমান : ৪৬-৫৬]৭৯৮
ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্য, তাঁর ইলম ও ইজতিহাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক আমরা যদি নিষ্ঠার সঙ্গে কুরআনের প্রতি তাকাই, দেখতে পাব, ইমাম আজমের চেয়ে তাঁর দুই শাগরেদ ও জমহুরের বক্তব্য অধিকতর শক্তিশালী। ফলে জান্নাত ও জাহান্নাম দুটোই মানুষ ও জিন উভয় জাতির জন্য। জান্নাতে মানুষ যেমন নেয়ামত ভোগ করবে, জিনরাও একই নেয়ামত ভোগ করবে। কারণ, তাদের প্রকৃতি, জীবনের উদ্দেশ্য, মানসিকতা, স্বভাব-চরিত্র সবগুলোই মৌলিকভাবে অভিন্ন। কেবল সৃষ্টিগত পদার্থের ক্ষেত্রে পার্থক্য। ফলে আখিরাতেও তারা এই পার্থক্যসহই জান্নাতে থাকবে।
টিকাঃ
৭৯৫. তাফসিরে মাতুরিদি (১০/২৫৫)।
৭৯৬. দেখুন : উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২১০)। তালখিসুল আদিল্লাহ (৫৮৪)।
৭৯৭. দেখুন : বাহরুল কালাম (১৮০)। আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৪৫২)।
৭৯৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২১০-২১১)। আল-আকিদাহ রুকনিয়্যাহ (৫৯)।