📄 প্রথম পক্ষের খণ্ডন
ইমাম আবু হানিফার আকিদা মোটেই প্রথম পক্ষের আকিদার মতো নয়, সেটা পিছনে বিভিন্ন জায়গাতে আমরা স্পষ্ট করেছি। এ পক্ষের আলেমগণ আল্লাহকে 'আরশে' বলেন এবং এক্ষেত্রে ইমাম আজমের বক্তব্যের সঙ্গে তাদের কথার বাহ্যিক সাদৃশ্য আছে। কিন্তু তারা 'আল্লাহর আরশে থাকা'—কে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন, যার সঙ্গে ইমামের আকিদা পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। তারা আল্লাহর 'ইস্তিওয়া' ও 'উলু' (ঊর্ধ্বত্ব)—কে হিসসি তথা শারীরিক ও আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেন। ফলে তারা আল্লাহর জন্য দিক ও সীমা সাব্যস্ত করেন। তারা মনে করেন—আমাদের ঠিক মাথা বরাবর উপরের দিকে আরশ এবং সে আরশের উপর আল্লাহ তায়ালা। যেখান থেকে আরশের সীমা শেষ সেখান থেকে আল্লাহর বিদ্যমানতা শুরু। উপরন্তু তারা ইস্তিওয়াকে আরোহণ, ঊর্ধ্বগমন, উপবেশন ইত্যাদি নানাবিধ শব্দে ব্যাখ্যা করেন। অথচ ইমাম আজম এসব কথা সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। ৭৪৬ ইমাম আজম আল্লাহর জন্য 'দিক', 'সীমা', 'দূরত্ব' নাকচ করেন। স্থান ও অবস্থান নাকচ করেন। 'বসা' নাকচ করেন। অথচ এ ধারায় দিক, সীমা, বসা ও অবস্থান নেওয়া ইস্তিওয়ার স্বীকৃত অর্থ। বরং তাদের এ ব্যাপারে স্বতন্ত্র গ্রন্থও রয়েছে। ইমাম আজম তাদের খণ্ডনে বলেন, 'আল্লাহ যদি বসা কিংবা অবস্থান গ্রহণের মুখাপেক্ষী হতেন, তবে আরশ সৃষ্টির আগে কোথায় ছিলেন?' ৭৪৭ বরং এ ধরনের বক্তব্যও প্রথম ধারার কাছে প্রত্যাখ্যাত, বাতিলপন্থিদের বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত। তাহলে তাদের আকিদা আর ইমামের আকিদা এক হবে কীরূপে?
পরকালে আল্লাহর দিদারকেও এ ধারার আলেমগণ দিকসহ বিশ্বাস করেন। দিক ছাড়া দেখার কথাকে পাগলামি মনে করেন এবং দিদার অস্বীকারকারী বলেন! কারণ, তাদের মতে, দিক ছাড়া কোনো দর্শন সম্ভব নয়। বিপরীতে ইমাম আবু হানিফা পরকালে আল্লাহর দিদারকে দিক ছাড়াই বিশ্বাস করেন। তিনি মানেন, আল্লাহকে দেখতে দিকের প্রয়োজন হবে না। ৭৪৮
টিকাঃ
৭৪৬. দেখুন: আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৯)।
৭৪৭. আল-ওয়াসিয়্যাহ (পাণ্ডুলিপি) (৩)।
৭৪৮. আল-ওয়াসিয়্যাহ, আবু হানিফা (৫৯)।
📄 দ্বিতীয় পক্ষের খণ্ডন
তাহলে কি তাঁর আকিদা দ্বিতীয় পক্ষের আকিদা? না, সেটাও নয়। কারণ, দ্বিতীয় পক্ষের আলেমগণ (বিশেষত পরবর্তীরা) আল্লাহর ইস্তিওয়াকে তাবিল করেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফার বক্তব্যে সুস্পষ্ট যে, তিনি ইস্তিওয়াকে ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি এগুলো দিয়ে তাবিল করেননি। তা ছাড়া, এ পক্ষের আলেমগণ 'আল্লাহ আকাশে' কিংবা 'আরশের উপরে' এমন বিশ্বাস গলত মনে করেন। অথচ ইমাম আবু হানিফা সুস্পষ্টভাবে বলছেন, 'আল্লাহ আকাশে। আরশের ওপরে'। এ জন্য অনেক আলেম অন্যান্য জায়গার মতো ইমাম আবু হানিফার ব্যাখ্যাকেও তাবিল করেছেন। তারা বলেছেন, উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে ইমাম বুঝিয়েছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য স্থান নির্ধারণ করবে সে কাফের! আবুল লাইস সমরকন্দি, আবু শাকুর সালেমি, ইয ইবনে আবদুস সালাম, তাকিউদ্দিন হিসনি, আহমদ রিফায়িসহ আল-ফিকহুল আবসাতের সকল ব্যাখ্যাতা এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ৭৪৯
টিকাঃ
৭৪৯. দেখুন : শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (২৫)। আত-তামহিদ, সালেমি (৪২)। হাম্মুর রুমুয সূত্রে শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৩৩৩)। দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা, হিসনি (১৮) আল-বুরহানুল মুয়াইয়াদ, আহমদ রিফায়ি (১৮)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
তাহলে ইমাম আবু হানিফার মাযহাব কী? তাঁর কথার অর্থ কী? ইমাম আবু হানিফার উক্ত বক্তব্যের অর্থ ঠিক তা-ই, যা কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য। তিনি নতুন কিছু বলেননি; বরং কুরআন ও সুন্নাহতে যা আছে তা-ই বলেছেন। আমরা প্রথমে তাদের যুক্তির বিপক্ষে দুটো কথা বলে এরপর ইমামের মাযহাব বর্ণনা করব।
ইমাম আবু হানিফা উভয় বাক্যে কুফরের ফাতওয়া দিয়েছেন। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি বলবে, আল্লাহ আকাশে নাকি যমিনে আমি জানি না, সে কাফের। আবার যে ব্যক্তি বলবে, আমি জানি না আরশ আকাশে নাকি যমিনে, সে কাফের। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, প্রথম পক্ষের আলেমগণ যেহেতু মনে করেন, ইমাম আবু হানিফা এর দ্বারা সত্তাগতভাবে আল্লাহর আরশের উপর থাকা প্রমাণ করেছেন, তাহলে যারা সত্তাগতভাবে আল্লাহর আরশের উপর অবস্থানকে কিংবা 'হিস্স্সি' ঊধর্বত্বকে নাকচ করে আল্লাহকে 'বিলা-মাকান' বলেন তারা কি কাফের? তারা বলবেন—না, তারা কাফের নয়; অপব্যাখ্যাকারী গোমরাহ। বোঝা গেল, ইমাম আবু হানিফা তাদের আকিদার কথা বলেননি। একইভাবে দ্বিতীয় পক্ষের আলেমগণ যেহেতু মনে করেন, ইমাম আবু হানিফা এই বক্তব্যের মাধ্যমে সত্তাগতভাবে আল্লাহর আরশের উপর থাকাকে অস্বীকার করেছেন। প্রশ্ন হলো, তাদের মত অনুযায়ী যারা ইস্তিওয়াসংক্রান্ত আয়াতগুলোর বাহ্যিক অর্থ ধরে আরশের উপরে আল্লাহর সত্তাগত অধিষ্ঠানের কথা বলে, তারা কি কাফের? তারা বলবেন: না, তারা কাফের নয়; দেহবাদী গোমরাহ। বোঝা গেল, ইমাম তাদের দুই পক্ষের কারও কথাই বলেননি; বরং তিনি বলেছেন কুরআন ও হাদিসের কথা, সালাফের কথা।
কীভাবে? তাঁর কথার প্রতি গভীর দৃষ্টি দিন। পাশাপাশি কুরআন ও সুন্নাহর দিকে দৃষ্টি দিন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তিনি আকাশে। [মুলক : ১৬] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এক দাসীকে 'আল্লাহ কোথায়' জিজ্ঞাসা করলে সে ইশারা করে দেখাল 'আকাশে।' রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সেটা সমর্থন করেন। খোদ ইমাম নিজস্ব সনদে উক্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। ৭৫০ বরং আল-ফিকহুল আবসাতের আলোচিত বক্তব্যের পরেও হাদিসটি উল্লেখ করেছেন ৭৫১। হ্যাঁ, এসব আয়াত ও হাদিসের অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে আকাশের মাঝে। কারণ, তিনি সকল স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে। তথাপি কুরআন-হাদিসে যেহেতু এভাবে বলা হয়েছে, ফলে নসের প্রতি সম্মান রেখে আমাদেরও এগুলো মেনে নিতে হবে, আল্লাহ তায়ালা যা উদ্দেশ্য নিয়েছেন, সে ব্যাপারে ঈমান রাখতে হবে। এটা আহলে সুন্নাতের প্রতিষ্ঠিত মাযহাব, ইমামেরও মাযহাব, যা পিছনে একাধিক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং এগুলাএকে সরাসরি অস্বীকার করে কেউ যদি মুখের উপর বলে, 'না, আল্লাহ আকাশে নয়', তাহলে সে কুরআন ও হাদিস দু'টোকেই অস্বীকার করছে। ফলে উক্ত ব্যক্তি কাফের। একইভাবে একাধিক হাদিসে আল্লাহর আরশকে পৃথিবী ও মহাবিশ্বের বাইরে সর্বোর্ধ্বে বলা হয়েছে ৭৫২। ফলে কেউ যদি বলে, আমি জানি না আরশ কোথায়, তবে সে যেন সেসব হাদীস এবং ফলশ্রুতিতে আরশের অস্তিত্ব ও আরশের ওপর আল্লাহর ইস্তিওয়াকেই প্রত্যাখ্যান করলো। আর এই সবগুলো বিষয় প্রত্যাখ্যানকারী কাফের। তাহলে দেখা গেল, ইমাম আবু হানিফা রহ. আকিদার প্রচলিত কোনো পক্ষের কথা বলেননি, বরং তিনি বলেছেন কুরআন ও সুন্নাহর কথা। সেই যুগের বিভ্রান্ত জাহমিয়্যাহদের খণ্ডনে।
এবার প্রশ্ন হলো, তাহলে আল্লাহ আকাশে এবং আরশ আকাশের ঊর্ধ্বে—এগুলোর মাধ্যমে ইমাম কী বুঝিয়েছেন? ইমাম বুঝিয়েছেন সেটাই, যেটা সকল সালাফের মাযহাব ছিল। আর তা হলো (আমিররুহা কামা জাআত বিলা কাইফ) অর্থাৎ যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দাও। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল বলেছেন তিনি আকাশে, তাই আমরাও বলি তিনি আকাশে। কিন্তু এর অর্থ—তিনি আমাদের সামনে দৃশ্যমান আকাশের মাঝে সীমাবদ্ধ—এমন নয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বলেছেন, আল্লাহ আরশে ইস্তিওয়া করেছেন আর আরশ সর্বোর্ধ্বে। তাই আমরাও বলি, আল্লাহ আরশে ইস্তিওয়া করেছেন আর আরশ আকাশের ঊর্ধ্বে। কিন্তু এই ঊর্ধ্বত্বের নিগূঢ় মর্ম আল্লাহ তায়ালা জানেন। কারণ, তিনি সকল স্থান, দিক, সীমা-পরিসীমার ঊর্ধ্বে। ফলে এসব আয়াত ও হাদীসের বাহ্যিক বক্তব্যের প্রতি ঈমান এনে এগুলোর প্রকৃত মর্ম, স্বরূপ, ধরন, ব্যাখ্যা সবকিছু আল্লাহর কাছে সঁপে দেয়া আবশ্যক। ৭৫৩
এটা আমাদের মনগড়া ব্যাখ্যা নয়; খোদ আল-ফিকহুল আবসাতের একটি নুসখাতে এমন বক্তব্য রয়েছে। কাওরানির সেই নুসখাতে এসেছে (ক্বলা আবু হানিফাহ মান ক্বলা: লা আ'রিফু রব্বি ফিস সামাআতি আম ফিল আরদ্বি ফাক্বদ কাফারা, লিআন্নাল্লাহ তায়ালা ক্বলা: আর-রহমানু আলাল আরশিস তাওয়া, ফাইন ক্বলা: ইন্নাহু তায়ালা আলাল আরশিস তাওয়া, ওয়ালাকিননাহু ইয়াকুলু: লা আদরি আল আরশু ফিস সামাআতি আম ফিল আরদ্বি, ক্বলা: হুয়া কাফিরুন, লিআন্নাহু আনকারা কাউনাল আরশি ফিস সামাআতি, লিআন্নাল আরশা ফি আ'লা ইল্লিয়্যিন) অর্থাৎ আবু হানিফা রহ. বলেন, যে ব্যক্তি বলবে, আমি জানি না আল্লাহ আকাশে নাকি যমিনে, সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'রহমান আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন'। একইভাবে যে ব্যক্তি বলবে, তিনি আরশের উপরে ইস্তিওয়া করেছেন, কিন্তু আমি জানি না আরশ আকাশে নাকি যমিনে, সেও কাফের হয়ে যাবে। কারণ সে আকাশে আরশ থাকাকে অস্বীকার করেছে। অথচ আরশ ঊর্ধ্বজগতে। ৭৫৪
উপরোত্ত এই বক্তব্য বাইহাকীর একটি বর্ণনা দ্বারাও প্রমাণিত হয়। বাইহাকি নিজস্ব সূত্রে নুহ ইবনে আবু মারইয়াম থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন—আমরা আবু হানিফার কাছে ছিলাম। তখন তিরমিয থেকে জাহমের অনুসারী এক নারী কুফায় এলো। সে কুফাবাসীকে তার (জাহমি) মতবাদের দিকে ডাকতে লাগল। হাজার হাজার মানুষ তার বক্তব্য শুনত। তখন তাকে বলা হলো, এখানে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ আবু হানিফা নামের একজন মানুষ আছেন। মাহিলাটি ইমামের কাছে এসে বলল, আপনি মানুষকে মাসআলা-মাসায়েল শেখাচ্ছেন, অথচ নিজে দ্বীন ত্যাগ করে বসে আছেন? আপনি যে মাবুদের উপাসনা করেন, আপনার সেই মাবুদ কোথায় বলেন তো? ইমাম আজম নীরব থাকলেন। সাত দিন পরে বললেন, 'আল্লাহ তায়ালা আকাশে; যমিনে নন।' তখন এক ব্যক্তি বলল, তাহলে আল্লাহর বাণী 'তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সাথে আছেন'-এর অর্থ কী? ইমাম বললেন, এটার অর্থ ঠিক তেমন, যেমন তুমি কোনো লোকের কাছে চিঠি লিখলে—'আমি তোমার সাথে আছি', অথচ তুমি তার কাছে নও। উক্ত ঘটনা উল্লেখের পর বাইহাকি বলেন, আবু হানিফা রাযি. সঠিক কথা বলেছেন। তিনি আল্লাহর যমিনে থাকাকে নাকচ করে দিয়েছেন। কুরআন ও সুন্নাহর স্বাভাবিক বর্ণনার অনুসরণপূর্বক 'আল্লাহ আকাশে' বলেছেন। কারণ, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, 'তোমরা কি তার থেকে নিরাপদ হয়ে গেছ যিনি আকাশে?' [মুলক : ১৬] ৭৫৫
এখানে 'আল্লাহ আকাশে' অর্থ তিনি আকাশের মাঝে ঢুকে আছেন এমন নয়; বরং সৃষ্টি থেকে তিনি ঊর্ধ্বে ও আলাদা সেটা বলা হয়েছে। এভাবেই বুঝতে হবে ইমাম মালেকের বক্তব্য : ‘আল্লাহ আকাশে, কিন্তু তাঁর ইলম সর্বত্র।’ ৭৫৬ এমন নয় যে, আল্লাহ সত্তাগতভাবে আকাশের মাঝে ঢুকে আছেন। বরং তিনি সৃষ্টির মাঝে নন। এটাকে কুরআন-সুন্নাহতে 'আকাশে' শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে, তাই কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণে ইমাম এই শব্দেই ব্যক্ত করেছেন। এর মাধ্যমে সালাফের মূলত বিভ্রান্ত জাহমিয়্যাহদের খণ্ডানো উদ্দেশ্য। যাদের মুআততিলা গোষ্ঠী আরশের ওপর আল্লাহর ইস্তিওয়া অস্বীকার করতো। আর হুলুলী গোষ্ঠী আল্লাহকে সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজমান বলতো। দু'টোর একটাও সঠিক আকিদা নয়। ইমাম দু'টোকেই কুফর সাব্যস্ত করেছেন।
টিকাঃ
৭৫০. মুসনাদু আবি হানিফা, হারেসির বর্ণনা (২৫)।
৭৫১. আল-ফিকহুল আবসাত (৫১)।
৭৫২. বুখারি (২৭৯০)। মুসনাদে আহমদ (৮৫৩৫)।
৭৫৩. দেখুন: আল-ওয়াসিয়্যাহ (৩৮-৩৯)। আস-সিফাত, দারাকুতনি (৪১-৪২)।
৭৫৪. দেখুন : আল-ফিকহুল আবসাতের টীকায় আল্লামা কাওসারি রহ. কর্তৃক কাওরানীর নুসখা থেকে সংশ্লিষ্ট অংশের উদ্ধৃতি (৫০)।
৭৫৫. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (৫৮৮-৫৮৯)।
৭৫৬. মাসায়িলুল ইমাম আহমদ, রিওয়াইয়াতু আবি দাউদ (২৬৩)।
📄 দোয়ার মাঝে আকাশের দিকে হাত তোলার রহস্য
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে দোয়ার সময় মানুষ উপরের দিকে হাত তোলে কেন? আকাশের দিকে তাকায় কেন?
ইমাম জবাবে বলেন, 'আল্লাহকে নিচের দিকের পরিবর্তে উপরের দিকে ডাকা হয়; কারণ, 'নিচুতা' রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহর শানের সঙ্গে সমাঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হাদিসের মাধ্যমেও এটা প্রমাণিত হয়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে জনৈক সাহাবি একজন নারী দাসী নিয়ে এসে বলেন, আমার উপর মুমিন দাসী আযাদ করা আবশ্যক হয়েছে। তাকে আযাদ করলে হবে? রাসুলুল্লাহ তাকে বললেন, তুমি মুমিন? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে বলো তো আল্লাহ কোথায়? সে আকাশের দিকে ইশারা করল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তাকে আযাদ করো। সে মুমিন।'৭৫৭
এখানে লক্ষণীয়, দাসীর হাদিসটিকে ইমাম ‘নিচুতা রবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের শানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’ তাই ঊর্ধ্বত্ব বলা হয়েছে—এ হিসেবে নিয়েছেন: স্থান নির্ধারণ হিসেবে নেননি। কারণ আল্লাহ আকাশ নামক স্থানের মাঝে নন। যেহেতু একদিকে আল্লাহ সৃষ্টির মাঝে নন, অপরদিকে ‘নিচুটা’ তাঁর শানের উপযোগী নয়। এ জন্য তাঁকে সৃষ্টির ঊর্ধ্বে ও তাঁর শানের ঊর্ধ্বত্ব প্রমাণের জন্যই তাঁকে ‘আকাশে’ বলা হয়।
আলেমগণ মোনাজাতে উপরে হাত তোলার হিকমত প্রসঙ্গে বলেন—কারণ, সেটা রহমত ও রিযিক অবতীর্ণ হওয়ার জায়গা। [যারিয়াত: ২২] যদি আল্লাহর অবস্থানের জায়গা হতো, তবে সেদিকে মুখ দিয়ে দোয়া করতে বলা হতো। অথচ এভাবে দোয়া করা হয় না। একইভাবে কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন আমার বান্দারা আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলে দিন, আমি কাছেই রয়েছি।’ [বাকারা : ১৮৬] ফলে আল্লাহকে সবার সঙ্গে ভাবতে হবে। আরও বলা হয়েছে, “পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। সুতরাং তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও, সেদিকেই আল্লাহর ‘মুখ’।” [বাকারা : ১১৫] এ আয়াত দিয়ে সব জায়গায় আল্লাহর চেহারা কল্পনা করতে হবে। অথচ বাস্তবতা এমন নয়। সুতরাং আল্লাহকে কোনো নির্দিষ্ট দিকে সীমাবদ্ধ করা যাবে না।
টিকাঃ
৭৫৭. আল-ফিকহুল আবসাত (৫১-৫২)।