📄 ‘নেই’ জটিলতা
ইমাম আজমের মানহাজ থেকে সরে আসার ফলে পরবর্তী লোকদের কারও কারও মানহাজে আরও একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে, যেটাকে আমরা 'নেই' সংক্রান্ত জটিলতা বলতে পারি। সহজভাবে বললে, ইসবাত প্রতিরোধ করতে গিয়ে নাকচের বন্যা। ফলে অনেক আলেমকে দেখা যাবে, তাদের আকিদার গ্রন্থে এক থেকে দুই পৃষ্ঠা কেবল 'না', 'না' বলতেই থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বাস্তবিকপক্ষে এগুলো থেকে পবিত্র নিঃসন্দেহে। কিন্তু এভাবে নাকচ করা সালাফে সালেহিনের মানহাজ নয়। বরং সালাফে সালেহিনের মানহাজ হলো, কুরআনে যেটাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে সেটাকে সাব্যস্ত করা, যেটাকে নাকচ করা হয়েছে সেটাকে নাকচ করা। আর যে ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ নীরব, সে ব্যাপারে নীরব ও নিরপেক্ষ থাকা। ফলে যেসব ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ নীরব, সেগুলোও সমূলে নাকচ করা, বরং এমন অনেক বিষয়ও নাকচ করা, যেগুলো প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কুরআন-সুন্নাহতে এসেছে—সেটা অননুমোদিত।
গযনবি লিখেছেন, 'পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তার অবতরণ (নুযুল) নেই! আরোহণ নেই। ... সন্তুষ্টি (রিয়া) নেই! ক্রোধ (গাযাব) নেই! ... হাসি (যাহিক) নেই। কাছে নেই, দূরে নেই। ...স্থান নেই। উপর-নিচ, ডান-বাম, সম্মুখ-পশ্চাৎ নেই। ... মন নেই, চিন্তা নেই...।'৬৮৯ এখানে কিছু বিষয় ঠিকই আছে। কিন্তু এভাবে নাকচ করা ঝুঁকিপূর্ণ। তানযিহ করতে গিয়ে অনেক সময় বিভিন্ন প্রমাণিত সিফাতও নাকচ হয়ে যায়, যেমনটা 'গাযাব', ও 'রিযা' নাকচ করা হলো, 'নুযুল' নাকচ করা হলো। অথচ এগুলো আল্লাহর জন্য কুরআন-সুন্নাহতেই সাব্যস্ত করা হয়েছে।
আল্লামা কাওকজি লিখেন, 'আল্লাহর ডান নেই, বাম নেই; সম্মুখ নেই, পিছন নেই; তিনি আরশের উপরে নন, নিচে নন; আরশের ডানে নন, বামে নন; জগতের ভিতরে নন, বাইরে নন...।'৬৯০ এভাবে বলার কী যৌক্তিকতা? 'আল্লাহ আরশের উপরে'—এটা সালাফের মাযহাব। কীভাবে এটা বুঝব সে সম্পর্কে আলোচনা সামনে আসছে। কিন্তু 'আরশের উপর নন' এভাবে উন্মুক্তভাবে নাকচ করার সুযোগ নেই।
আল্লামা গুমুশখানভি (১৩১১ হি.) লিখেন, “আল্লাহর কোনো শরিক নেই—সত্তার ক্ষেত্রে নেই, গুণের ক্ষেত্রে নেই; নামের ক্ষেত্রে নেই, কর্মের ক্ষেত্রে নেই; রাজত্বের ক্ষেত্রে নেই। তিনি জিসম নন, জাওহার নন, আকৃতিযুক্ত নন, সীমাবদ্ধ নন; পরিমাপযোগ্য নন; গণনাযোগ্য নন; ভাঙা যায় এমন নন; কোথাও সীমাবদ্ধ নন; গঠিত নন। ...তাঁর মতো কিছু নেই। তাঁর সীমা নেই, পরিমাণ নেই; স্থান নেই, দিক নেই। তাঁকে কোনোকিছু ধারণ করে না, বেষ্টন করে না। তাঁর জন্য সময় ও স্থান প্রযোজ্য নয়। তাঁর ক্ষেত্রে 'এখন' নেই, 'দিন' নেই, 'রাত' নেই। তাঁর দুর্বলতা নেই, মৃত্যু নেই, ধ্বংস নেই, ঘুম নেই, নিদ্রা নেই: তাঁর জ্ঞানের শেষ নেই। আল্লাহর উপর ধরন শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না; 'অবস্থা' প্রয়োগ করা যাবে না; 'হাসি' না, 'চিন্তা' না; 'মুচকি হাসি না', 'বড় হাসি না'; 'মন খারাপ' না, 'খুশি' না; 'পেরেশান' না, 'উদ্যম' না; 'যন্ত্রণা' না, 'আহ্লাদ' না; 'বিপদ' না; তাঁর উপর 'আসা', 'যাওয়া', 'আগমন', 'প্রস্থান', 'মিলন', 'বিচ্ছেদ', 'স্থিতি', ‘আরোহণ’, ‘অবতরণ’, ‘দাঁড়ানো’, ‘বসা’, ‘শোয়া’, ‘নড়াচড়া’, ‘স্থির থাকা’– এগুলা প্রয়োগ করা যাবে না। তিনি বাড়েন না, কমেন না; ছোট হন না, বড় হন না; ভুলে যান না, ভুল করেন না; দিশেহারা হন না; অসুস্থ হন না, রোগে ভোগেন না; দুর্বল হন না; কষ্ট পান না; ক্লান্ত হন না; ভয় পান না; হাল ছাড়েন না; একঘেয়েমি করেন না। তাঁর উপর নির্বুদ্ধিতা শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। ...আল্লাহর আধিক্য নেই; সংখ্যা নেই। অংশ নেই; অঙ্গ নেই; মিশ্রণ নেই; উপকরণ নেই। মেযাজ নেই, স্বভাব নেই, তবিয়ত নেই। লম্বা নেই, খাটো নেই; সংকীর্ণতা নেই। প্রস্থ নেই, গভীরতা নেই। ...শুরু নেই, শেষ নেই। পরিবর্তন নেই, পরিবর্ধন নেই। আকার নেই, আকৃতি নেই; অবকাঠামো নেই। রং নেই, স্বাদ নেই, ঘ্রাণ নেই। কুনিয়ত নেই, লকব নেই।”৬৯১
এভাবে লেখক দীর্ঘ প্রায় চার পৃষ্ঠা জুড়ে স্রেফ ‘নেই’ বর্ণনা করেছেন। অথচ কুরআন-সুন্নাহতে এমন করা হয়নি। সালাফে সালেহিন এভাবে করেননি। ইমাম আজম করেননি; বরং যুগেরও প্রয়োজন নেই। ‘তাঁর মতো কিছু নেই’ এটুকুই যথেষ্ট। হ্যাঁ, আল্লাহর উপর যদি কেউ অযাচিত কোনো শব্দ প্রয়োগ করে, তবে সেটা খণ্ডন করা হবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে অতিরঞ্জন সঠিক নয়। আল্লাহর উপর ‘রং’, ‘গন্ধ’, ‘স্বাদ’, কুনিয়ত’, ‘লকব’ এসব শব্দ কেউ প্রয়োগ করে না। কেউ বলেনি আল্লাহর রং আছে, স্বাদ আছে, ঘ্রাণ আছে। কিংবা আল্লাহকে গোনা যায়, মাপা যায় বা ভাঙা যায় ইত্যাদি। ফলে নাকচ করার ক্ষেত্রে এ ধরনের পদ্ধতি ‘তাকাল্লুফ’ বিবেচিত হবে। বরং এটা করতে গিয়ে কুরআন-সুন্নাহতে প্রমাণিত বিভিন্ন সিফাতকেও নাকচ করা হবে, যা লেখকের বক্তব্যে স্পষ্ট। ফলে এমন কর্মপদ্ধতি বর্জনীয়।
টিকাঃ
৬৮৯. উসুলুদ্দিন, গযনবি (৮৪-৮৭)।
৬৯০. মুখতাসারুল ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৯-১০)।
৬৯১. জামেউল মুতুন (৫-৮)।