📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অতিরঞ্জন নিরসন

📄 অতিরঞ্জন নিরসন


সিফাত সাব্যস্তের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন এবং আল্লাহর উপর মনগড়া শব্দ প্রয়োগের কিছু কারণ ও যুক্তি আছে। সেই অসার যুক্তি ও কারণগুলো এড়িয়ে চলতে পারলেই এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যেমন:

এক. আল্লাহর সিফাতগুলোর 'লাওয়াযিম' তথা সৃষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবশ্যকতা খোঁজা যাবে না। এটা করলে বিশুদ্ধ 'ইসবাত' বজায় থাকবে না। যেমন: আল্লাহর শোনা সত্য। কিন্তু সেটার জন্য কান খোঁজা যাবে না। আল্লাহর দেখা সত্য। কিন্তু সেটার জন্য তিনি চোখের মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সেটার জন্য তিনি মস্তিষ্কের মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ ভালোবাসেন। কিন্তু সেটার জন্য তিনি হৃদয়ের মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ কথা বলেন। কিন্তু সেটার জন্য তিনি মানুষের কথা বলার বিভিন্ন উপকরণ, যেমন জিহ্বা, অক্ষর ইত্যাদির মুখাপেক্ষী নন।

একইভাবে আল্লাহর হাত (ইয়াদ), চেহারা (ওয়াজহ) সত্য। এগুলো আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করতে হবে। এগুলো সাব্যস্ত করতে গিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, রক্ত-মাংস খোঁজা যাবে না। আল্লাহর উপর জিসম (শরীর), সুরত (আকার-আকৃতি) এ জাতীয় শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। তাতে তানযিহের পরিবর্তে তাশবিহ হয়ে যাবে। একইভাবে আল্লাহর দিদার সত্য। আরশের উপর তাঁর ইস্তিওয়া সত্য। 'নুযুল' ও 'মাজি'সহ অন্য সকল সিফাত সত্য। কিন্তু সেগুলো সাব্যস্ত করতে গিয়ে আল্লাহর জন্য কোনো দিক (জিহাহ), সীমা-পরিসীমা (হুদুদ), স্থান (মাকান) ইত্যাদি সাব্যস্ত করা যাবে না। ভৌগোলিক দূরত্ব ও নৈকট্য সাব্যস্ত করা যাবে না। সেটা করতে গেলে আল্লাহকে সৃষ্টির মতো কল্পনা করা হবে। ফলে ইসবাত বা তানযিহের পরিবর্তে উক্ত কাজ তাশবিহ হয়ে যাবে।

দুই. কুরআন-সুন্নাহতে যে সিফাত যেমন এসেছে, সেভাবে রেখে দিতে হবে; শব্দ পরিবর্তন করা যাবে না। ফলে 'ইস্তিওয়া'র জায়গায় 'জুলুস' (বসা), 'সুউদ' (আরোহণ) ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না। আল্লাহ 'কারিম' ও 'জাওয়াদ' (দাতা/মহানুভব); সে জায়গায় 'সাখি' (দাতা) বলা যাবে না। তিনি 'কাদির' (শক্তিশালী); সে জায়গাতে 'বাতাল'/ 'শুজা' (বীর) বলা যাবে না। তিনি 'রহিম' (দয়ালু)। কিন্তু এর জায়গায় 'রফিক' বলা যাবে না।

একইভাবে এক বচনকে দুই বচন বানানো যাবে না। যেমন কোথাও 'ইয়াদ' (হাত) এলে সেটাকে 'ইয়াদাইন' (দুই হাত) বানানো যাবে না। বহুবচনকে এক বা দুই বচন বানিয়ে প্রয়োগ করা যাবে না। যেমন আ'ইয়ুন (চোখসমূহ)-কে 'আইন' (চোখ) বা 'আইনাইন' (দুই চোখ) বানানো যাবে না। আল্লাহর 'ইয়াদ', ‘ইস্তিওয়া', 'নুযুল' ইত্যাদি সাব্যস্ত করতে গিয়ে ‘প্রকৃত' (হাকিকি), ‘সত্তাসহ’ (বিয-যাত) এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। এটা সালাফের মানহাজ নয়। হ্যাঁ, পূর্ববর্তী যুগের দু-একজন আলেম থেকে এ ধরনের 'বিচ্ছিন্ন' বক্তব্য বর্ণিত আছে, কিন্তু এক্ষেত্রে তারা হুজ্জত নন। কারণ, পূর্ববর্তী যুগের এক ব্যক্তি একক কোনো ক্ষেত্রে হুজ্জত নয়। বিশেষত এমন কোনো বিষয়, কুরআন-হাদিসে যে ব্যাপারে তার সমর্থন নেই, অন্য ইমামদেরও বক্তব্য নেই, সেক্ষেত্রে পূর্ববর্তী কারও বিচ্ছিন্ন মতামত থাকলে প্রত্যাখ্যান করা হবে। ইজতিহাদের কারণে তাকে 'মায়ুর' মনে করা হবে। কিন্তু সেই বিচ্যুতির অনুসরণ বৈধ হবে না। বরং এসব ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে, হুবহু শব্দ ধরে ধরে অনুসরণ করতে হবে। একবিন্দু ডানে-বামে যাওয়া যাবে না।

তিন. শব্দের রূপ পরিবর্তন করা যাবে না। অর্থাৎ, কুরআন-সুন্নাহতে যে শব্দে আল্লাহর ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে, সেটাকে অন্য শব্দে রূপান্তর করে তাঁর নাম ও সিফাত হিসেবে প্রয়োগ করা যাবে না। ফলে আল্লাহর কোনো 'সিফাত' (গুণ) বা ফে'ল (ক্রিয়া) থেকে তাঁর নাম বের করা যাবে না। যেমন—আল্লাহ কুরআনে জান্নাতবাসীকে পবিত্র পানীয় পান করানোর কথা বলেছেন ﴿وَসَقَهُمْ رَبَّهُمْ شَرَابًا طَهُورًا﴾ অর্থ : 'আর তাদের প্রতিপালক তাদের পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয়।' [ইনসান : ২১] এখানে পান করানোর আরবি হলো 'সাকা।' এই ফে'ল তথা ক্রিয়াকে ফায়েল তথা কর্মকারক বানিয়ে আল্লাহকে 'সাকি' বলা যাবে না।৬৩৫ আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, 'রহমান আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন।' এখানে 'ইস্তিওয়া'-কে পরিবর্তন করে আল্লাহ আরশের উপর 'মুস্তাওয়িন' এমন বলা যাবে না।

টিকাঃ
৬৩৫. আস-সাহায়িফুল ইলাহিয়্যাহ (৩৯৯)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ‘নেই’ জটিলতা

📄 ‘নেই’ জটিলতা


ইমাম আজমের মানহাজ থেকে সরে আসার ফলে পরবর্তী লোকদের কারও কারও মানহাজে আরও একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে, যেটাকে আমরা 'নেই' সংক্রান্ত জটিলতা বলতে পারি। সহজভাবে বললে, ইসবাত প্রতিরোধ করতে গিয়ে নাকচের বন্যা। ফলে অনেক আলেমকে দেখা যাবে, তাদের আকিদার গ্রন্থে এক থেকে দুই পৃষ্ঠা কেবল 'না', 'না' বলতেই থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বাস্তবিকপক্ষে এগুলো থেকে পবিত্র নিঃসন্দেহে। কিন্তু এভাবে নাকচ করা সালাফে সালেহিনের মানহাজ নয়। বরং সালাফে সালেহিনের মানহাজ হলো, কুরআনে যেটাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে সেটাকে সাব্যস্ত করা, যেটাকে নাকচ করা হয়েছে সেটাকে নাকচ করা। আর যে ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ নীরব, সে ব্যাপারে নীরব ও নিরপেক্ষ থাকা। ফলে যেসব ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ নীরব, সেগুলোও সমূলে নাকচ করা, বরং এমন অনেক বিষয়ও নাকচ করা, যেগুলো প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কুরআন-সুন্নাহতে এসেছে—সেটা অননুমোদিত।

গযনবি লিখেছেন, 'পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তার অবতরণ (নুযুল) নেই! আরোহণ নেই। ... সন্তুষ্টি (রিয়া) নেই! ক্রোধ (গাযাব) নেই! ... হাসি (যাহিক) নেই। কাছে নেই, দূরে নেই। ...স্থান নেই। উপর-নিচ, ডান-বাম, সম্মুখ-পশ্চাৎ নেই। ... মন নেই, চিন্তা নেই...।'৬৮৯ এখানে কিছু বিষয় ঠিকই আছে। কিন্তু এভাবে নাকচ করা ঝুঁকিপূর্ণ। তানযিহ করতে গিয়ে অনেক সময় বিভিন্ন প্রমাণিত সিফাতও নাকচ হয়ে যায়, যেমনটা 'গাযাব', ও 'রিযা' নাকচ করা হলো, 'নুযুল' নাকচ করা হলো। অথচ এগুলো আল্লাহর জন্য কুরআন-সুন্নাহতেই সাব্যস্ত করা হয়েছে।

আল্লামা কাওকজি লিখেন, 'আল্লাহর ডান নেই, বাম নেই; সম্মুখ নেই, পিছন নেই; তিনি আরশের উপরে নন, নিচে নন; আরশের ডানে নন, বামে নন; জগতের ভিতরে নন, বাইরে নন...।'৬৯০ এভাবে বলার কী যৌক্তিকতা? 'আল্লাহ আরশের উপরে'—এটা সালাফের মাযহাব। কীভাবে এটা বুঝব সে সম্পর্কে আলোচনা সামনে আসছে। কিন্তু 'আরশের উপর নন' এভাবে উন্মুক্তভাবে নাকচ করার সুযোগ নেই।

আল্লামা গুমুশখানভি (১৩১১ হি.) লিখেন, “আল্লাহর কোনো শরিক নেই—সত্তার ক্ষেত্রে নেই, গুণের ক্ষেত্রে নেই; নামের ক্ষেত্রে নেই, কর্মের ক্ষেত্রে নেই; রাজত্বের ক্ষেত্রে নেই। তিনি জিসম নন, জাওহার নন, আকৃতিযুক্ত নন, সীমাবদ্ধ নন; পরিমাপযোগ্য নন; গণনাযোগ্য নন; ভাঙা যায় এমন নন; কোথাও সীমাবদ্ধ নন; গঠিত নন। ...তাঁর মতো কিছু নেই। তাঁর সীমা নেই, পরিমাণ নেই; স্থান নেই, দিক নেই। তাঁকে কোনোকিছু ধারণ করে না, বেষ্টন করে না। তাঁর জন্য সময় ও স্থান প্রযোজ্য নয়। তাঁর ক্ষেত্রে 'এখন' নেই, 'দিন' নেই, 'রাত' নেই। তাঁর দুর্বলতা নেই, মৃত্যু নেই, ধ্বংস নেই, ঘুম নেই, নিদ্রা নেই: তাঁর জ্ঞানের শেষ নেই। আল্লাহর উপর ধরন শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না; 'অবস্থা' প্রয়োগ করা যাবে না; 'হাসি' না, 'চিন্তা' না; 'মুচকি হাসি না', 'বড় হাসি না'; 'মন খারাপ' না, 'খুশি' না; 'পেরেশান' না, 'উদ্যম' না; 'যন্ত্রণা' না, 'আহ্লাদ' না; 'বিপদ' না; তাঁর উপর 'আসা', 'যাওয়া', 'আগমন', 'প্রস্থান', 'মিলন', 'বিচ্ছেদ', 'স্থিতি', ‘আরোহণ’, ‘অবতরণ’, ‘দাঁড়ানো’, ‘বসা’, ‘শোয়া’, ‘নড়াচড়া’, ‘স্থির থাকা’– এগুলা প্রয়োগ করা যাবে না। তিনি বাড়েন না, কমেন না; ছোট হন না, বড় হন না; ভুলে যান না, ভুল করেন না; দিশেহারা হন না; অসুস্থ হন না, রোগে ভোগেন না; দুর্বল হন না; কষ্ট পান না; ক্লান্ত হন না; ভয় পান না; হাল ছাড়েন না; একঘেয়েমি করেন না। তাঁর উপর নির্বুদ্ধিতা শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। ...আল্লাহর আধিক্য নেই; সংখ্যা নেই। অংশ নেই; অঙ্গ নেই; মিশ্রণ নেই; উপকরণ নেই। মেযাজ নেই, স্বভাব নেই, তবিয়ত নেই। লম্বা নেই, খাটো নেই; সংকীর্ণতা নেই। প্রস্থ নেই, গভীরতা নেই। ...শুরু নেই, শেষ নেই। পরিবর্তন নেই, পরিবর্ধন নেই। আকার নেই, আকৃতি নেই; অবকাঠামো নেই। রং নেই, স্বাদ নেই, ঘ্রাণ নেই। কুনিয়ত নেই, লকব নেই।”৬৯১

এভাবে লেখক দীর্ঘ প্রায় চার পৃষ্ঠা জুড়ে স্রেফ ‘নেই’ বর্ণনা করেছেন। অথচ কুরআন-সুন্নাহতে এমন করা হয়নি। সালাফে সালেহিন এভাবে করেননি। ইমাম আজম করেননি; বরং যুগেরও প্রয়োজন নেই। ‘তাঁর মতো কিছু নেই’ এটুকুই যথেষ্ট। হ্যাঁ, আল্লাহর উপর যদি কেউ অযাচিত কোনো শব্দ প্রয়োগ করে, তবে সেটা খণ্ডন করা হবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে অতিরঞ্জন সঠিক নয়। আল্লাহর উপর ‘রং’, ‘গন্ধ’, ‘স্বাদ’, কুনিয়ত’, ‘লকব’ এসব শব্দ কেউ প্রয়োগ করে না। কেউ বলেনি আল্লাহর রং আছে, স্বাদ আছে, ঘ্রাণ আছে। কিংবা আল্লাহকে গোনা যায়, মাপা যায় বা ভাঙা যায় ইত্যাদি। ফলে নাকচ করার ক্ষেত্রে এ ধরনের পদ্ধতি ‘তাকাল্লুফ’ বিবেচিত হবে। বরং এটা করতে গিয়ে কুরআন-সুন্নাহতে প্রমাণিত বিভিন্ন সিফাতকেও নাকচ করা হবে, যা লেখকের বক্তব্যে স্পষ্ট। ফলে এমন কর্মপদ্ধতি বর্জনীয়।

টিকাঃ
৬৮৯. উসুলুদ্দিন, গযনবি (৮৪-৮৭)।
৬৯০. মুখতাসারুল ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৯-১০)।
৬৯১. জামেউল মুতুন (৫-৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00