📄 আল্লাহর জন্য ‘দিক’-সম্পর্কিত সংশয় নিরসন
প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহর জন্য সকল দিক নাকচ করলে আল্লাহর অস্তিত্ব নাকচ করা হয় না? তিনি কোথাও নেই মানে তিনি নেই—এমন হয় না? আমরা বলব, না, এটা অর্থহীন যুক্তি। আল্লাহ কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে। সকল স্থান ও দিকের ঊর্ধ্বে। এগুলো সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য। স্রষ্টার জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি কোনো দিক বা স্থানেই সীমাবদ্ধ নন। তাহলে তার জন্য দিক নাকচ করলে তার অস্তিত্ব কেন নাকচ করা হবে? উপরন্তু পৃথিবীর বাইরে মহাবিশ্বে দিকের ধারণা নিতান্তই আপেক্ষিক। বরং পৃথিবীতেও দিকগুলো পুরোটাই আপেক্ষিক ব্যাপার। আপনি-আমি মুখোমুখি দাঁড়ালে আমার যা সামনে আপনার তা পিছনে; আমার যা ডানে আপনার তা বামে। বরং উলটো হয়ে দাঁড়ালে আমার যা নিচে আপনার তা উপরে। ফলে আল্লাহকে এসব কৃত্রিম দিকে সীমাবদ্ধ করা বরং দুঃসাহসিকতা। এ জন্য সকল মুতাকাদ্দিম ইমামগণ আল্লাহকে দিকমুক্ত বলেছেন। দিক সাব্যস্ত করলে আল্লাহর উপর এমন শব্দ ও গুণ প্রয়োগ করা হলো, যা তিনি নিজে বা রাসুল বা সালাফের কেউ করেননি।৬৫৯
আজ বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা পৃথিবীর আকার-আকৃতি ও অবকাঠামো সম্পর্কে একরকম নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করছি। আমরা জানতে পারছি, মহাবিশ্বে দিকের ধারণা শাশ্বত নয়। ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, অবস্থান ইত্যাদির প্রেক্ষিতে দিক নির্ণীত হয়। ফলে 'উপর' বলতে শাশ্বত কোনো 'উপর' নেই। নিচ বলতে শাশ্বত কোনো 'নিচ' নেই। আমাদের জ্ঞানীরা এটা আরও প্রায় সহস্র বছর আগেও অনুভব করেছিলেন। আল্লামা জামালুদ্দিন খাব্বাযি এ প্রসঙ্গে লিখেন, 'ঘরের ছাদ বেয়ে যদি একটি ভিমরুল হাঁটে তবে উপর-নিচ কীভাবে নির্ণীত হবে? একদিক থেকে ভিমরুলটি উপরে। কারণ, সে মানুষের মাথার উপর হাঁটছে। আরেক দিক থেকে ভিমরুলটি নিচে; কারণ, মানুষ তাঁর মাথার উপরে। অন্যকথায়, ঘরের ছাদ বেয়ে ভিমরুল হাঁটলে যেহেতু ঘরের ভিতরে থাকা মানুষ ও ভিমরুলের মাথা একদিকে হয়ে যায়, ফলে মানুষের বিবেচনায় ভিমরুল উপরে আর ভিমরুলের বিবেচনায় মানুষ উপরে।'৬৬০ এই যদি হয় সৃষ্টির ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে। মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে তো এটা আরও বেশি প্রযোজ্য। ফলে সেখানে দিক বলতে চিরন্তন কিছুর অস্তিত্ব থাকে না।
আল্লাহর ক্ষেত্রে 'উপর'-'নিচ' প্রয়োগ মূলত সমতল ও চ্যাপটা পৃথিবীর কল্পনা থেকে এসেছে। এমনকি একদল মানুষ পৃথিবীকে গোলাকার জানা ও মানার পরও সমতল পৃথিবীর ধারণার প্রভাবে মহাবিশ্বকে শেষ পর্যন্ত সেই সমতলই কল্পনা করে, যার ফলে আল্লাহকে এই ক্ষুদ্র বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। মোটকথা, কুরআনের আয়াতগুলোর বাহ্যিক অর্থ ধরতে গিয়ে আল্লাহর শানে মনগড়া শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'রহমান আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন।' [তহা: ৫] এটাকে যদি নিচ থেকে উপরে ওঠা, আরশের উপর ওঠা, বসা, অবস্থান করা ইত্যাদি শব্দে ব্যক্ত করা হয়, তাঁকে আরশের উপর সত্তাসহ হাকিকি অবস্থানকারী হিসেবে মানা হয়, 'নুযুল' বলতে গিয়ে যদি উপর থেকে নিচে অবতরণ বলা হয়,৬৬১ তবে কুরআনের অন্য আয়াতগুলোকেও বাহ্যিক অবস্থার উপর ছেড়ে দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, 'তিনি আকাশে ইলাহ, যমিনেও ইলাহ।' [যুখরুফ : ৮৪] সুতরাং আল্লাহকে হাকিকিভাবে আকাশের ভিতরে, মাটির ভিতরে মানতে হবে; ব্যাখ্যা করা যাবে না। আল্লাহ আরেক আয়াতে বলেন, 'আপনি কি ভেবে দেখেননি যে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা-কিছু আছে, আল্লাহ তা জানেন... তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তাদের সাথে আছেন।' [মুজাদালা : ৭] এখানেও হাকিকিভাবে আল্লাহকে সবার সাথে সর্বত্র মানতে হবে; ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। আল্লাহর বাণী, 'তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে রয়েছেন।' [হাদিদ : ৪] এটাকেও হাকিকিভাব মানতে হবে; ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। আর এগুলো যদি বিভিন্ন শব্দের মারপ্যাঁচে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তবে ইস্তিওয়াকে যারা ব্যাখ্যা দেয়, তাদের ব্যাখ্যাও মানতে হবে। এটা এমন টানাটানি, যার সমাপ্তি নেই।
ফলে সিফাত সাব্যস্তের নামে আল্লাহর উপর মনগড়া শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। আবার এগুলোর এমন ব্যাখ্যাও করা যাবে না, যা সালাফ থেকে প্রমাণিত নয়। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে নুসুসের কাছে আত্মসমর্পণ করা, যতটুকু এসেছে ততটুকুতে থেমে যাওয়া। ইস্তিওয়াকে যেমন আল্লাহর বসা, সত্তাসহ অবস্থান ইত্যাদি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, তেমনই 'রাজত্ব', 'প্রতিপত্তি' দিয়ে এর তাবিলও করা যাবে না। বরং ইমাম আজমসহ সালাফ যেটা বলেছেন, সেভাবে বলতে হবে : “আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ আরশের উপর 'ইস্তিওয়া' করেছেন; কিন্তু তিনি আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন। আরশের উপর স্থির ও অবস্থানকারী নন। বরং তিনি কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আরশ ও আরশের বাইরে অন্য সকল বস্তুর রক্ষাকর্তা...।”৬৬২
টিকাঃ
৬৫৯. দেখুন: আল-আকিদাহ আর রুকনিয়্যাহ, সমরকন্দি (৭-৮)। আত-তামহিদ, নাসাফি (৩৬-৩৯)। জামেউল মুতুন, গুমুশখানভি (৫)।
৬৬০. আল-হাদি ফি উসুলিদ্দিন, খাব্বাযি (৪৮)।
৬৬১. দেখুন আবুল হুসাইন মালাতির 'আত-তাম্বিহ ওয়ার রাদ্দ' (১০০)।
৬৬২. আল-ওয়াসিয়্যাহ (পাণ্ডুলিপি) (৩)।
📄 ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং অন্য আলেমদের বক্তব্য
হানাফি ধারার বাইরে কেবল ইবনে হিব্বান বা যাহাবি নন, যেমনটা পিছনে বর্ণনা করা হয়েছে; বরং বিভিন্ন ধারার অসংখ্য মুহাক্কিক আলেম আল্লাহর উপর সেসব শব্দ প্রয়োগ নিষেধ করেছেন, যেগুলো কুরআন-সুন্নাহতে না আসা সত্ত্বেও পরবর্তী যুগের লোকজন আল্লাহর উপর প্রয়োগ করেছে। ইমাম খাত্তাবি (৩৮৮ হি.) আল্লাহর জন্য 'হদ' সাব্যস্ত করাকে নাকচ করেছেন। একইভাবে মুতাহহার মাকদিসি (৩৫৫ হি.)৬৬৩, কাযি ইয়ায, ইমাম নববি আল্লাহর জন্য দিক ও সীমা (জিহাহ ও হদ) নাকচ করেছেন।৬৬৪ হাম্বলী আলেম সাফারিনি লিখেছেন, 'আল্লাহ তায়ালা হদ তথা সীমাবদ্ধ হওয়ার ঊর্ধ্বে। এটা তাদের খণ্ডন যারা আরশের উপর আল্লাহর ইস্তিওয়াকে সীমাবদ্ধতা মনে করে।'৬৫৫ এটাই হক কথা।
ইমাম বাইহাকি রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-আসমা ওয়াস সিফাতে' আল্লাহর সিফাত বর্ণনার যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, সেটা এক্ষেত্রে উত্তম আদর্শ ও অনুসরণীয় হতে পারে। তিনি আল্লাহর সেসব সিফাত যা সৃষ্টির জন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অর্থ বহন করে, সেগুলা বলার সময় প্রত্যেক জায়গাতে সর্বোচ্চ তানযিহ অবলম্বন করেছেন এবং যেকোনো তাশবিহ সংঘটিত হওয়া থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থেকেছেন। তিনি 'ওয়াজহ' (চেহারা) সম্পর্কিত অধ্যায়ের শিরোনাম লিখেন এভাবে : 'ওয়াজহ'-সম্পর্কিত অধ্যায়: সিফাত হিসেবে; সুরত হিসেবে নয়।' 'আইন' (চোখ)-এর অধ্যায়ের শিরোনাম লিখেন: 'আইন'-সম্পর্কিত অধ্যায় : সিফাত হিসেবে; চোখের তারা (তথা দেহের অংশ) হিসেবে নয়।' 'ইয়াদাইন' (দুই হাত)-এর অধ্যায়ের শিরোনাম লিখেন: 'ইয়াদাইন'-সম্পর্কিত অধ্যায় : সিফাত হিসেবে; অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হিসেবে নয়।৬৬৬
সবশেষে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর মাযহাব বর্ণনার মাধ্যমে বর্তমান আলোচনা শেষ করছি। মুহাদ্দিসদের মাঝে ইমাম আহমদের আকিদাই কুরআন ও সুন্নাহর সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্বশীল, সালাফে সালেহিনের আকিদার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। হাম্বল ইবনে ইসহাক সূত্রে বর্ণিত ইমাম আহমদ বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপরে যেভাবে তিনি চেয়েছেন, যেমন চেয়েছেন। এর কোনো 'হদ' (সীমা) নেই, বিবরণ নেই; কেউ এর বর্ণনা দিতে পারবে না, সীমাবদ্ধ করতে পারবে না। এটা আল্লাহর সিফাত তেমন যেমন তিনি বলেছেন।”
...হাম্বল ইবনে ইসহাক আরও বলেন, আমি ইমাম আহমদকে আল্লাহ তায়ালার 'দুনিয়ার আকাশে নুযুল', 'আল্লাহর দিদার', 'জাহান্নামে আল্লাহর পা রাখা' ইত্যাদি হাদিসগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, 'আমরা এসব হাদিসে ঈমান রাখি। সত্যায়ন করি। এর কোনো ধরন নেই, অর্থ নেই (বিলা কাইফিন ওয়ালা মা'না)। আমরা এসব হাদিস প্রত্যাখ্যান করি না। রাসুলদের আনীত সকল পয়গাম সত্য মনে করি। বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত রাসুলুল্লাহর সকল বক্তব্য সঠিক মনে করি। এগুলা বর্জন করি না। আল্লাহ নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, এরচেয়ে বেশি কিছু সাব্যস্ত করি না। (তাঁর সিফাত) সীমা-পরিসীমা বিহীন (বিলা হাদ্দিন ওয়ালা গায়াতিন)।' ইমাম আহমদ আরও বলেন, “আল্লাহ তায়ালা 'সর্বশ্রোতা', 'সর্বদ্রষ্টা।' 'হদ'-বিহীন। পরিমাণবিহীন। কেউ এটার বর্ণনা দিতে পারবে না। ...আল্লাহ তায়ালাকে আখিরাতে দেখা যাবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ (তাহদিদ) বিদআত। কোনো 'হদ' ও বিবরণ ছাড়া আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হবে। তিনি বলেছেন, 'রহমান আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন।' [তহা : ৫] সুতরাং তিনি আরশের উপরে। 'হদ' (সীমা ও সংজ্ঞা)-বিহীন। যেভাবে চেয়েছেন।”৬৬৭
খাল্লাল বর্ণনা করেন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর মাযহাব হলো, 'আল্লাহর 'চেহারা' (ওয়াজহ) রয়েছে। কিন্তু সেটা আকার-আকৃতি নয়। শরীরী বস্তু নয়। বরং 'ওয়াজহ' তাঁর সিফাত... 'ওয়াজহ' অর্থ দেহ নয়, সুরত নয়, নকশা-অবয়ব নয়। এমন কথা বলা (লিইসা মা'না ওয়াজহিন মা'না জাসাদিন ইনদাহু ওয়ালা সূরাতিন ওয়ালা তাখতীত্বিন ওয়ামান ক্বলা যালিকা ফাক্বদ ইবতা'দাআ)। খাল্লাল আরও বলেন, “ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. আল্লাহর উপর 'জিসম' (দেহ) শব্দ প্রয়োগ নিষেধ করেছেন। কারণ, ভাষাবিদদের কাছে 'জিসম' শব্দটি দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ঘনত্ব, গভীরতা, অবকাঠামো, সুরত, গঠন ইত্যাদিবিশিষ্ট বস্তুর উপর প্রয়োগ করা হয়। অথচ আল্লাহ তায়ালা এ সবকিছু থেকে পবিত্র! সুতরাং আল্লাহকে 'জিসম' বলা বৈধ নয়।”৬৬৮
সুবহানাল্লাহ! কত বিশুদ্ধ ও ভারসাম্যপূর্ণ আকিদা। এই আকিদার মাঝে আর ইমাম আজম আবু হানিফা এবং সবেমাত্র পিছনে উল্লিখিত হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি আলেমদের আকিদার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।
মোটকথা, সিফাত সাব্যস্ত করা সালাফের মানহাজ। কিন্তু সিফাত সাব্যস্তের নামে অতিরঞ্জন, এগুলোর অর্থের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি, কুরআনি শব্দের পরিবর্তন-পরিবর্ধন, নিজেদের পক্ষ থেকে সংযুক্তি ইত্যাদি সবকিছু পরিত্যাজ্য। এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির অনিবার্য ফলাফল দেহবাদ, যা ইমাম আবু হানিফা ও আহমদ ইবনে হাম্বলসহ সালাফে সালেহিনের কারও মাযহাব নয়।
টিকাঃ
৬৬৩. আল-বাদউ ওয়াত তারিখ (১/১৬৬)।
৬৬৪. শরহে মুসলিম, নববি (৫/২৪-২৫)।
৬৬৫. লাওয়ামিউল আনওয়ার (১/২০১-২০২)।
৬৬৬. আল-আসমা ওয়াস সিফাত (৩/৪৪৩-৪৬১)।
৬৬৭. ইসবাতুল হদ্দ লিল্লাহ, দাশতি (২১৮-২২০)।
৬৬৮. খাল্লালের বর্ণনায় 'আল-আকিদাহ' (১0৩, ১১১)।