📄 জাল ও দুর্বল হাদিসের ব্যবহার
আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে দুর্বল ও জাল বর্ণনা গ্রহণ। ফলে তারা জাল বর্ণনার উপর ভিত্তি করে আল্লাহর শানে এমন শব্দ প্রয়োগ করেছেন, যার মাঝে আর দেহবাদের মাঝে ফারাক নেই। তারা হাদিস পেশ করেন, 'আল্লাহ আরশের উপর বসেন। ফলে আরশে শুধু চার আঙুল জায়গা ফাঁকা থাকে। হাওদার উপর ভারী মানুষ উঠলে যেমন কটকট আওয়াজ হয়, (আল্লাহ আরশে উঠলে) এমন কটকট আওয়াজ হয়!' এ ধরনের বর্ণনা তারা উমর ইবনুল খাত্তাবের মতো মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। উমর রাযি. পরবর্তী লোকদের দেহবাদ থেকে পবিত্র।
একই পদ্ধতিতে কেউ কেউ বিশুদ্ধ আকিদার নামে আল্লাহকে আটটি পাহাড়ি ছাগলের পিঠে বসিয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, 'এই ছাগলগুলো আসলে ফেরেশতা। তারা আল্লাহর আরশ বহন করছে। আল্লাহর আরশের উপর বসা আছেন।' ফেরেশতারা সবকিছু বাদ দিয়ে ছাগলের রূপ ধারণ করতে গেলেন! বরং কেউ কেউ (স্বপ্নে) আল্লাহকে এক সবুজ বাগানে একটি স্বর্ণের সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখেছেন। চারজন ফেরেশতা সিংহাসনটি বহন করছিল। একজন মানুষের আকৃতিতে, আরেকজন সিংহরূপে, আরেকজন ষাঁড়ের সুরতে, চতুর্থ ফেরেশতা ইগলের আকৃতিতে।' এগুলো অসত্য বর্ণনা। আসমানের ফেরেশতারা যেন ছাগল, ষাঁড় আর জন্তু-জানোয়ারের চেয়ে সুন্দর কোনো আকৃতিই খুঁজে পাননি।৬৩৪
টিকাঃ
৬৩৪. আলোচ্য অধ্যায়ে বর্ণিত বক্তব্যগুলোর সকল উৎস ও সূত্র স্বেচ্ছায় সরিয়ে ফেলা হলো। কারণ বিচ্যুতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করা আমাদের উদ্দেশ্য; কোনো ব্যক্তি বা মতাদর্শকে টার্গেট করা উদ্দেশ্য নয়। তথাপি এগুলো বিস্তারিত জানতে দেখতে পারেন : আর-রাদ্দু আলা বিশর, ইসবাতুল হদ্দ, আস-সুন্নাহ, আত-তাম্বিহ ওয়ার রাদ্দু আলা আহলিল আহওয়া, নাকযুত তাসিস, মিনহাজুস সুন্নাহ, আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, মাজমুউল ফাতাওয়া ইত্যাদি গ্রন্থ।
📄 অতিরঞ্জন নিরসন
সিফাত সাব্যস্তের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন এবং আল্লাহর উপর মনগড়া শব্দ প্রয়োগের কিছু কারণ ও যুক্তি আছে। সেই অসার যুক্তি ও কারণগুলো এড়িয়ে চলতে পারলেই এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যেমন:
এক. আল্লাহর সিফাতগুলোর 'লাওয়াযিম' তথা সৃষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবশ্যকতা খোঁজা যাবে না। এটা করলে বিশুদ্ধ 'ইসবাত' বজায় থাকবে না। যেমন: আল্লাহর শোনা সত্য। কিন্তু সেটার জন্য কান খোঁজা যাবে না। আল্লাহর দেখা সত্য। কিন্তু সেটার জন্য তিনি চোখের মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সেটার জন্য তিনি মস্তিষ্কের মুখোপেক্ষী নন। আল্লাহ ভালোবাসেন। কিন্তু সেটার জন্য তিনি হৃদয়ের মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ কথা বলেন। কিন্তু সেটার জন্য তিনি মানুষের কথা বলার বিভিন্ন উপকরণ, যেমন জিহ্বা, অক্ষর ইত্যাদির মুখাপেক্ষী নন।
একইভাবে আল্লাহর হাত (ইয়াদ), চেহারা (ওয়াজহ) সত্য। এগুলো আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করতে হবে। এগুলো সাব্যস্ত করতে গিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, রক্ত-মাংস খোঁজা যাবে না। আল্লাহর উপর জিসম (শরীর), সুরত (আকার-আকৃতি) এ জাতীয় শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। তাতে তানযিহের পরিবর্তে তাশবিহ হয়ে যাবে। একইভাবে আল্লাহর দিদার সত্য। আরশের উপর তাঁর ইস্তিওয়া সত্য। 'নুযুল' ও 'মাজি'সহ অন্য সকল সিফাত সত্য। কিন্তু সেগুলা সাব্যস্ত করতে গিয়ে আল্লাহর জন্য কোনো দিক (জিহাহ), সীমা-পরিসীমা (হুদুদ), স্থান (মাকান) ইত্যাদি সাব্যস্ত করা যাবে না। ভৌগোলিক দূরত্ব ও নৈকট্য সাব্যস্ত করা যাবে না। সেটা করতে গেলে আল্লাহকে সৃষ্টির মতো কল্পনা করা হবে। ফলে ইসবাত বা তানযিহের পরিবর্তে উক্ত কাজ তাশবিহ হয়ে যাবে।
দুই. কুরআন-সুন্নাহতে যে সিফাত যেমন এসেছে, সেভাবে রেখে দিতে হবে; শব্দ পরিবর্তন করা যাবে না। ফলে 'ইস্তিওয়া'র জায়গায় 'জুলুস' (বসা), 'সুউদ' (আরোহণ) ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না। আল্লাহ 'কারিম' ও 'জাওয়াদ' (দাতা/মহানুভব); সে জায়গায় 'সাখি' (দাতা) বলা যাবে না। তিনি 'কাদির' (শক্তিশালী); সে জায়গাতে 'বাতাল'/ 'শুজা' (বীর) বলা যাবে না। তিনি 'রহিম' (দয়ালু)। কিন্তু এর জায়গায় 'রফিক' বলা যাবে না।
একইভাবে এক বচনকে দুই বচন বানানো যাবে না। যেমন কোথাও 'ইয়াদ' (হাত) এলে সেটাকে 'ইয়াদাইন' (দুই হাত) বানানো যাবে না। বহুবচনকে এক বা দুই বচন বানিয়ে প্রয়োগ করা যাবে না। যেমন আ'ইয়ুন (চোখসমূহ)-কে 'আইন' (চোখ) বা 'আইনাইন' (দুই চোখ) বানানো যাবে না। আল্লাহর 'ইয়াদ', ‘ইস্তিওয়া', 'নুযুল' ইত্যাদি সাব্যস্ত করতে গিয়ে ‘প্রকৃত' (হাকিকি), ‘সত্তাসহ’ (বিয-যাত) এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। এটা সালাফের মানহাজ নয়। হ্যাঁ, পূর্ববর্তী যুগের দু-একজন আলেম থেকে এ ধরনের 'বিচ্ছিন্ন' বক্তব্য বর্ণিত আছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে তারা হুজ্জত নন। কারণ, পূর্ববর্তী যুগের এক ব্যক্তি একক কোনো ক্ষেত্রে হুজ্জত নয়। বিশেষত এমন কোনো বিষয়, কুরআন-হাদিসে যে ব্যাপারে তার সমর্থন নেই, অন্য ইমামদেরও বক্তব্য নেই, সেক্ষেত্রে পূর্ববর্তী কারও বিচ্ছিন্ন মতামত থাকলে প্রত্যাখ্যান করা হবে। ইজতিহাদের কারণে তাকে 'মায়ুর' মনে করা হবে। কিন্তু সেই বিচ্যুতির অনুসরণ বৈধ হবে না। বরং এসব ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে, হুবহু শব্দ ধরে ধরে অনুসরণ করতে হবে। একবিন্দু ডানে-বামে যাওয়া যাবে না।
তিন. শব্দের রূপ পরিবর্তন করা যাবে না। অর্থাৎ, কুরআন-সুন্নাহতে যে শব্দে আল্লাহর ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে, সেটাকে অন্য শব্দে রূপান্তর করে তাঁর নাম ও সিফাত হিসেবে প্রয়োগ করা যাবে না। ফলে আল্লাহর কোনো 'সিফাত' (গুণ) বা ফে'ল (ক্রিয়া) থেকে তাঁর নাম বের করা যাবে না। যেমন—আল্লাহ কুরআনে জান্নাতবাসীকে পবিত্র পানীয় পান করানোর কথা বলেছেন ﴿وَسَقَهُمْ رَبَّهُمْ شَرَابًا طَهُورًا﴾ অর্থ : 'আর তাদের প্রতিপালক তাদের পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয়।' [ইনসান : ২১] এখানে পান করানোর আরবি হলো 'সাকা।' এই ফে'ল তথা ক্রিয়াকে ফায়েল তথা কর্মকারক বানিয়ে আল্লাহকে 'সাকি' বলা যাবে না।৬৩৫ আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, 'রহমান আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন।' এখানে 'ইস্তিওয়া'-কে পরিবর্তন করে আল্লাহ আরশের উপর 'মুস্তাওয়িন' এমন বলা যাবে না।
টিকাঃ
৬৩৫. আস-সাহায়িফুল ইলাহিয়্যাহ (৩৯৯)।
📄 অতিরঞ্জন নিরসনে ইমাম আবু হানিফা এবং হানাফি আলেমদের বক্তব্য
ইমাম আজম রহ. এ কারণে আল্লাহর জন্য 'শরীর' (জিসম), 'আকার' (সুরত), 'সীমা' (হদ), 'স্থান' (মাকান), 'দিক' (জিহাহ) সবকিছু নাকচ করেছেন। ইমাম বলেন, “তিনি 'শাইউন' (বস্তু), কিন্তু অন্যান্য বস্তুর মতো নন। আর 'শাইউন'-এর অর্থ হলো 'জিসম' (দেহ), 'জাওহার' (মৌল), 'আরাজ' (বাহ্যিক রূপ-রং)-বিহীন বিদ্যমান সত্তা। তাঁর কোনো 'হদ' (সীমা) নেই।”৬৩৬ 'দিক' নাকচ প্রসঙ্গে ইমাম বলেন, 'আল্লাহর দিদার কোনো ধরন (কাইফিয়্যাহ), সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য (তাশবিহ) ও দিক (জিহাহ) ছাড়া। কারণ, আল্লাহ এসবের ঊর্ধ্বে।'৬৩৭
স্থান নাকচ প্রসঙ্গে ইমাম বলেন, “আল্লাহ তায়ালা তখন ছিলেন, যখন কোনো স্থানের অস্তিত্ব ছিল না। আল্লাহ তায়ালা তখন ছিলেন, যখন 'কোথায়', 'সৃষ্টি' কিংবা 'বস্তু' এমন কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা।”৬৩৮ ইমাম আরও বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ আরশের উপর 'ইস্তিওয়া' করেছেন; কিন্তু তিনি আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন; আরশের উপর 'স্থির' (ইসতিকরার) নন। বরং তিনি কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আরশ ও আরশের বাইরে অন্য সকল বস্তুর রক্ষাকর্তা। সৃষ্টির মতো তিনি যদি কোনো জিনিসের মুখাপেক্ষী হতেন, তবে জগৎ সৃষ্টি ও পরিচালনা করতে সক্ষম হতেন না। তিনি যদি বসা কিংবা স্থির হওয়ার প্রতি মুখাপেক্ষী হতেন, তবে আরশ সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন? আল্লাহ এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।”৬৩৯
পরবর্তী হানাফি উলামায়ে কেরাম ইমামের অনুসরণে আল্লাহকে দিক (জিহাহ), সীমা (হদ), স্থান (মাকান) ও কাল (যামান) সহ এ ধরনের সকল 'লাওয়াযিম' (সৃষ্টির আবশ্যকতা) যা কুরআন-সুন্নাহতে আসেনি, সেগুলো থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছেন।৬৪০
ইমাম তহাবি (৩২১ হি.) বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের সীমা-পরিসীমা ও গণ্ডির ঊর্ধ্বে। তিনি সকল উপাদান, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও উপকরণ থেকে মুক্ত। সৃষ্টির মতো ছয় দিক তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না।'৬৪১
আবু হাফস বুখারি বলেন, "আল্লাহর জন্য কোনো স্থান, কাল, (স্থানান্তর অর্থে) 'আসা', 'যাওয়া' ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না।” অন্যত্র বলেন, "আল্লাহর জন্য স্থান সাব্যস্ত করা যাবে না। (মাখলুকের গুণের মতো) আসা, যাওয়া এবং অন্যান্য বিষয় তাঁর উপর প্রয়োগ করা যাবে না। ফলে এটা বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ কোনো স্থানের উপর নন। তিনি কোনো স্থানের মুখাপেক্ষী নন। আরশ তাঁর কুদরতে বিদ্যমান।... মোটকথা, মুতাশাবিহ আয়াত ও হাদিসের ক্ষেত্রে কর্তব্য হলো এগুলাতে ঈমান রাখা, ব্যাখ্যা না করা। কারণ, এগুলো ব্যাখ্যা করতে গেলে সিফাত নাকচ হয়ে যায়, যা বিদআতি মুআত্তিলাদের মাযহাব। ফলে এগুলোর ইলম আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হবে।”৬৪২
মাতুরিদি (৩৩৩ হি.) বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা যখন ছিলেন, তখন স্থান ছিল না। আবার এমনও হওয়া সম্ভব যে, স্থান থাকবে না, কিন্তু আল্লাহ থাকবেন। ফলে তিনি যেমন ছিলেন, এখনও তেমন আছেন, ভবিষ্যতেও তেমন থাকবেন। কারণ, তিনি সকল পরিবর্তন-পরিবর্ধন, ধ্বংস-বিলুপ্তি ও বিবর্তন থেকে পবিত্র। এগুলো সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ স্রষ্টা। ফলে তিনি চিরন্তন বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, অপরিবর্তনীয়। তিনি যেমন ছিলেন, তেমন আছেন।'৬৪৩
আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন (৪৯৩ হি.), “আহলে সুন্নাতের মতে—আল্লাহ কোনো স্থানের উপর নন। আরশ কিংবা অন্য কোনো বস্তুকেই আল্লাহর স্থান ভাবা যাবে না। আল্লাহর জন্য কোনো জিহাহ তথা দিক সাব্যস্ত করা যাবে না। ...কাররামিয়্যাহ, ইহুদি এবং যারা আল্লাহকে 'শরীর' মনে করে, তারা বলে, আল্লাহ আরশের উপর 'অবস্থান' গ্রহণ করেছেন। তাদের কারও মতে, অন্য সবকিছুর মতো আল্লাহরও ছয় দিক রয়েছে। কারও মতে, ছয় দিক নয়, কেবল এক দিক (উপর) রয়েছে। এটা কাররামিয়্যাহদের বক্তব্য...। কিন্তু সঠিক কথা হলো, আল্লাহ কোনো স্থানে নন। বরং তিনি স্থান সৃষ্টির আগে যেমন ছিলেন, এখনও তেমন। কারণ, তিনি সকল পরিবর্তন ও স্থানান্তর থেকে ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তায়ালা নবিজি (ﷺ)-কে মিরাজের রাতে ঊর্ধ্বজগতে নিয়েছেন। এটা এ জন্য নয় যে, তিনি সেখানে থাকেন; বরং তাঁর কুদরত দেখানোর জন্য একটি জায়গা নির্ধারণ করে তাঁকে সম্মানিত করেছেন। যেমন—তিনি মুসা আ.-কে তুর পাহাড়ে যেতে বলেছেন, অথচ তিনি তুর পাহাড়ে থাকেন না। একইভাবে তিনি কাবা যিয়ারত করতে বলেছেন, কাবার দিকে ফিরে নামায পড়তে বলেছেন, অথচ তিনি কাবার ভিতরে নন। দোয়ার মাঝে আমরা উপরের দিকে তাকাই এ জন্য নয় যে, তিনি সেদিকে বিদ্যমান। বরং উপরের দিকটা রহমত অবতরণের স্থান এবং দোয়ার কিবলা।”৬৪৪
নাসাফি (৫০৮ হি.) বলেন, “জাহমিয়্যাহরা মনে করে, আল্লাহ সর্বত্র। এক্ষেত্রে তারা সেসব আয়াত দিয়ে দলিল দেয়, যেগুলাতে আল্লাহর কোনো স্থানে থাকা বোঝা যায়। যেমন—আল্লাহ বলেন, ﴿ وَهُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ إِلَهُ وَفِي الْأَرْضِ إِلَهُ ﴾ অর্থ : 'তিনি আকাশে ইলাহ, যমিনেও ইলাহ।' [যুখরুফ : ৮৪] অন্যত্র বলেন, ﴿ وَهُوَ اللَّهُ فِي السَّمَاتِ وَ فِي الْأَرْضِ ﴾ অর্থ : 'তিনি আল্লাহ আকাশসমূহে ও যমিনে।' [আনআম : ৩] আরও বলেন, 'আপনি কি ভেবে দেখেননি যে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা-কিছু আছে, আল্লাহ তা জানেন। তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত থাকেন না... তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তাদের সাথে আছেন। তারা যা করে, তিনি কেয়ামতের দিন তা তাদের জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।' [মুজাদালা : ৭] এসব ক্ষেত্রে আহলে হকের মাযহাব হলো, 'তাঁর মতো কিছু নেই।' [শুরা : ১১] ফলে উপরের আয়াতগুলো দিয়ে আল্লাহর কোনো স্থানের মাঝে হওয়া, কোনো স্থানের উপর হওয়া, বসা, স্থির হওয়া, অবস্থান করা ইত্যাদি বোঝানো যাবে না। আল্লাহকে বিশেষ কোনো স্থানে কিংবা সকল স্থানে কল্পনা করা যাবে না। আল্লাহর জন্য কোনো দিক বা একাধিক দিক সাব্যস্ত করা যাবে না। বরং এসব আয়াতকে যেভাবে এসেছে সেভাবেই রেখে দেওয়া হবে।'৬৪৫ নাসাফি তাঁর বাহরুল কালামে লিখেন, 'আল্লাহ এক, শরিকবিহীন। তিনি সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। তাঁর মতো কিছু নেই। তাঁর সদৃশ কিছু নেই। তাঁর উপর আকার-আকৃতি (শাকল) প্রয়োগ করা যাবে না। তিনি সকল ত্রুটির ঊর্ধ্বে। স্থান ও সময় সৃষ্টি করার আগে তিনি ছিলেন। অতঃপর তিনি আরশ সৃষ্টি করেছেন, সময় সৃষ্টি করেছেন। আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন। কিন্তু তিনি আরশ থেকে অমুখাপেক্ষী। আরশ তাঁর স্থান কিংবা অবস্থানস্থল নয়। বরং তিনি আরশসহ সকল স্থানের রক্ষাকর্তা। তিনি সকল স্থানের ঊর্ধ্বে।'৬৪৬
আবু ইসহাক সাফফার (৫৩৪ হি.) বলেন, “আল্লাহ সকল (সুরত) আকৃতির স্রষ্টা। আল্লাহর উপর 'সুরত' (আকার-আকৃতি) শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। ইহুদিরা আল্লাহকে সুরত কল্পনা করেছে। একদল মুসলিম সম্প্রদায়, যেমন ইবরাহিম ইবনে আবি ইয়াহইয়া, দাউদ আল-জাওয়ারেবি, হিশাম ইবনুল হাকাম জাওয়ালেকি আল্লাহকে মানুষের আকৃতিতে কল্পনা করেছে। তারা বলত, আল্লাহর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে! জাওয়ারেবি বলত, আল্লাহর দাড়ি ও লজ্জাস্থান ছাড়া সবকিছু আছে! হিশাম ইবনে সালেম বলত, আল্লাহর উপরের অর্ধেক ফাঁকা। তাঁর চুল কালো! মুগিরা ইবনে সাইদ বলত, আল্লাহ মানুষের আকৃতিতে বিদ্যমান। তাঁর মাথার উপর মুকুট রয়েছে। তাঁর পেট ও হৃদয় আছে। সেটা প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ!” নাউযুবিল্লাহ! কেউ আল্লাহকে কোঁকড়া চুলবিশিষ্ট দাড়ি-মোচহীন যুবকের মতো বলত। আরেক দল আল্লাহকে খ্রিষ্টানদের মতো মানুষের আকৃতির ভিতরে ঢুকে যাওয়া কল্পনা করেছে। এরা মূলত পুনর্জন্ম, হুলুলসহ বিভিন্ন বিভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাসী। ... প্রশ্ন আসতে পারে—একটা হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি আমার প্রভুকে সর্বোত্তম 'আকৃতিতে' দেখেছি—এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো, তাঁকে সর্বোত্তম রূপে দেখেছেন। এটা ব্যক্তির আমলের উপর নির্ভরশীল। কারণ, সকল আলেম একমত যে, আল্লাহর প্রকৃত রূপ এ জগতে কেউ দেখতে পারবে না—জাগ্রত অবস্থায় নয়, স্বপ্নেও নয়।৬৪৭ সাফফার আরও বলেন, (আল্লাহকে কোনো স্থানে কল্পনা করে) "তিনি কোথায় সেটা বলা যাবে না। কারণ, কোনো জিনিস তাঁকে বহন করে না। কোনোকিছু তাঁকে ধারণ করে না। সামনে, পিছনে, উপর, নিচ, ডান, বাম তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। মুখোমুখি, পাশাপাশি, কাছাকাছি—এসব বিষয়ের ঊর্ধ্বে তিনি।”৬৪৮
লামিশি (৫৫২ হি.) লিখেন : “ইহুদি, মুজাসসিমাহ (দেহবাদী), কাররামিয়্যাহ ও চরমপন্থি রাফেযিরা মনে করে—আল্লাহ আরশের উপর অবস্থান গ্রহণকারী। তারা এক্ষেত্রে 'ইস্তিওয়া' ও 'উলু'-সম্পর্কিত আয়াতগুলো দিয়ে দলিল দেয়। অথচ এগুলো তাদের দলিল নয়। কারণ, আল্লাহ সকল দিকের ঊর্ধ্বে।”৬৪৯
সাবুনি (৫৮০ হি.) বলেন, “আল্লাহর উপর 'জিসম' ও 'সুরত' শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। ...তেমনইভাবে আল্লাহকে কোনো স্থানে অবস্থানকারী ভাবা যাবে না। কোনোকিছু তাঁকে বহন করে না; আল্লাহ তায়ালা সকল দিক ও স্থান থেকে পবিত্র। তিনি কোনো স্থানে অবস্থান গ্রহণ থেকে পবিত্র। উপর, নিচ, ডান, বাম এগুলো সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদি সৃষ্টি না থাকত, তবে ডান-বাম, উপর-নিচ, সামনে-পিছনে বলতে কিছু থাকত না।”৬৫০
কাসানি (৫৮৭ হি.) তাঁর আকিদার গ্রন্থ শুরুই করেছেন এভাবে, 'সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য, যিনি প্রতিপালক, প্রশংসিত; যিনি সকল দিক ও সীমারেখা থেকে পবিত্র' (আল-মুনান্নাহু আনিল জিহাতি ওয়াল হুদুদ)। তিনি আরও লিখেন, 'আল্লাহ জিসম, জাওহার ও আরাজ নয়। তিনি কোনো স্থানের ভিতরে বা স্থানের উপরে নন। তিনি ছয় দিকের কোনো দিকে নন। তিনি কোনো কালে বা স্থানে নন। তিনি যখন ছিলেন, তখন কাল ও স্থান কিছুই ছিল না। এখনও তিনি তেমন আছেন, যেমন ছিলেন। স্থান ও কাল তাঁকে ধারণ করতে পারে না। আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে দোয়া করি মানে আল্লাহ আকাশে আছেন এমন নয়। বরং এটা ইবাদতের পদ্ধতি। যেমন—কাবাঘরের দিকে ফিরে আমরা নামায পড়ি। এ জন্য নয় যে, আল্লাহ কাবাঘরের মাঝে আছেন।'৬৫১
হাফিজুদ্দিন নাসাফি (৭১০ হি.) লিখেন, 'রাফেযিরা আল্লাহকে মানুষের আকৃতিতে (সুরত) মনে করে। আহলে সুন্নাতের মতে, আল্লাহ তায়ালা সুরত থেকে পবিত্র। স্থান ও দিক থেকে পবিত্র।'৬৫২
আলাউদ্দিন বুখারি (৮৪১ হি.) লিখেছেন, 'আল্লাহ তায়ালা কোনো স্থানে নন। কারণ, তিনি সবসময় ছিলেন, অথচ স্থান একসময় ছিল না। ফলে তাঁর কোনো স্থানে থাকা তাঁর মাঝে পরিবর্তনের নির্দেশক; অথচ আল্লাহ সব ধরনের পরিবর্তন ও সৃষ্টির গুণাবলি থেকে মুক্ত।'৬৫৩ বুখারি আরও লিখেন, 'সালাফে সালেহিনের কাছে আল্লাহর সাতটির বাইরেও অসংখ্য সিফাত রয়েছে, যেগুলোর প্রকৃত রূপরেখা আমাদের জানা নেই। কিন্তু সেগুলোর হাকিকি অর্থ যা দেহবাদিতার দিকে নিয়ে যায়, সেগুলাও উদ্দেশ্য নয়; বরং আমরা এগুলোর জ্ঞান আল্লাহর কাছে সঁপে দেবো, যেমনটা আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, 'আল্লাহ ছাড়া এগুলোর ব্যাখ্যা আর কেউ জানে না।' [আলে ইমরান : ৭]৬৫৪
কামাল ইবনুল হুমাম (৮৬১ হি.) লিখেন, 'হাত', 'আঙুল' ইত্যাদিসহ এ জাতীয় সকল বিষয়ে এই আকিদা রাখতে হবে যে, এগুলো আল্লাহর সিফাত; অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয়।৬৫৫
কাসেম ইবনে কুতলুবুগা (৮৭৯ হি.) লিখেছেন, “আরশের উপর আল্লাহর ইস্তিওয়া আল্লাহর ধরনহীন সিফাত। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন, যেভাবে তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছেন সেভাবে। তিনি (কোথাও) অবস্থান গ্রহণ এবং স্থির হওয়া থেকে পবিত্র। ইমাম শাফেয়ি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুরআন ও সুন্নাহতে এসব সিফাত যেভাবে এসেছে, আমরা সেভাবে সাব্যস্ত করব। এগুলোর তাশবিহ নাকচ করব, যেমনটা আল্লাহ নিজে করেছেন। এক্ষেত্রে আমাদের সালাফের মানহাজ হলো—এগুলোর প্রতি আমরা ঈমান রাখব। এগুলোর তাবিল (ব্যাখ্যা) আল্লাহর কাছে সঁপে দেবো। (সৃষ্টির) সাদৃশ্য থেকে তাঁকে পবিত্র ঘোষণা করব। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর শাব্দিক অনুসরণ করতে হবে। বাইরে অতিরিক্ত একটা শব্দও বলা যাবে না। অর্থাৎ, 'ইস্তিওয়া'-কে অন্য কোনো শব্দ দিয়ে (যথা ইসতিকরার) কিংবা অন্য কোনো শব্দরূপে (যথা মুসতাউইন) বলা যাবে না। শব্দ পরিবর্তন করা যাবে না। যেমন—'ইস্তিওয়ার' ক্ষেত্রে কুরআনে 'আলা' বলা হয়েছে। সুতরাং সমার্থক হওয়া সত্ত্বেও 'আলা'-এর জায়গায় 'ফাওকা' বলা যাবে না।”৬৫৬ ইবনে কুতলুবুগা আরও লিখেন, “কুরআনে এ জাতীয় বর্ণিত সকল শব্দ যেমন 'ওয়াজহ', 'আইন', 'জামব', 'সাক', হাদিসের শব্দ, যেমন— 'আল্লাহ আদমকে রহমানের সুরতে সৃষ্টি করেছেন', আল্লাহ প্রতি রাতে দুনিয়ার আকাশে নুযুল করেন’—এগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবে বিশ্বাস করতে হবে।”৬৫৭
আবুল মাহাসিন কাওকজি (১৩০৫ হি.) বলেন, “আল্লাহ আসমান কিংবা যমিনের কোনো স্থানে নন, বরং তিনি স্থান ও কাল সৃষ্টির আগে যেভাবে ছিলেন, এখনও সেভাবে আছেন...। আল্লাহ দিক ও দেহাবয়বের সকল বৈশিষ্ট্য থেকে পবিত্র। সুতরাং তাঁর জন্য 'ডান', 'বাম', 'পিছন', 'সম্মুখ', 'উপর', 'নিচ' সাব্যস্ত করা যাবে না।”৬৫৮
টিকাঃ
৬৩৬. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৬৩৭. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৮-৫৯)।
৬৩৮. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৭)।
৬৩৯. আল-ওয়াসিয়্যাহ (পাণ্ডুলিপি) (৩)।
৬৪০. দেখুন : তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/২৭২-২৭৩)। বাহরুল কালাম, নাসাফি (৩০-৩১)। লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি : ৪৬-৪৭)।
৬৪১. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১৫)।
৬৪২. আস-সাওয়াদুল আজম (৫, ৪০)।
৬৪৩. আত-তাওহিদ (৫৪)।
৬৪৪. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৪০-৪২)।
৬৪৫. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/৩৩৪, ৩৪০-৩৪৪)।
৬৪৬. দেখুন: বাহরুল কালাম (৫৫-৫৬)।
৬৪৭. তালখিসুল আদিল্লাহ (৬০৩-৬১০)।
৬৪৮. তালখিসুল আদিল্লাহ (১৫৪)।
৬৪৯. আত-তামহিদ, লামিশি (৬৪-৬৫)।
৬৫০. দেখুন : আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (৭১-৭৫)। আল বিদায়াহ মিনাল কিফায়াহ (৪৪-৪৮)।
৬৫১. আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ, কাসানি (১, ৮)।
৬৫২. দেখুন: আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (১৫৮-১৫৯)।
৬৫৩. রিসালাহ ফিল ইতিকাদ (১১৯)।
৬৫৪. মুলজিমাতুল মুজাসিমাহ (৬৬)।
৬৫৫. আল-মুসামারাহ (৩৫-৩৬)।
৬৫৬. আল-মুসামারাহ ফি শরহিল মুসায়ারাহ (৩১-৩২)।
৬৫৭. আল-মুসামারাহ (৩৫-৩৬)।
৬৫৮. মুখতাসারুল ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৭-১০)।
📄 আল্লাহর জন্য ‘দিক’-সম্পর্কিত সংশয় নিরসন
প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহর জন্য সকল দিক নাকচ করলে আল্লাহর অস্তিত্ব নাকচ করা হয় না? তিনি কোথাও নেই মানে তিনি নেই—এমন হয় না? আমরা বলব, না, এটা অর্থহীন যুক্তি। আল্লাহ কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে। সকল স্থান ও দিকের ঊর্ধ্বে। এগুলো সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য। স্রষ্টার জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি কোনো দিক বা স্থানেই সীমাবদ্ধ নন। তাহলে তার জন্য দিক নাকচ করলে তার অস্তিত্ব কেন নাকচ করা হবে? উপরন্তু পৃথিবীর বাইরে মহাবিশ্বে দিকের ধারণা নিতান্তই আপেক্ষিক। বরং পৃথিবীতেও দিকগুলো পুরোটাই আপেক্ষিক ব্যাপার। আপনি-আমি মুখোমুখি দাঁড়ালে আমার যা সামনে আপনার তা পিছনে; আমার যা ডানে আপনার তা বামে। বরং উলটো হয়ে দাঁড়ালে আমার যা নিচে আপনার তা উপরে। ফলে আল্লাহকে এসব কৃত্রিম দিকে সীমাবদ্ধ করা বরং দুঃসাহসিকতা। এ জন্য সকল মুতাকাদ্দিম ইমামগণ আল্লাহকে দিকমুক্ত বলেছেন। দিক সাব্যস্ত করলে আল্লাহর উপর এমন শব্দ ও গুণ প্রয়োগ করা হলো, যা তিনি নিজে বা রাসুল বা সালাফের কেউ করেননি।৬৫৯
আজ বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা পৃথিবীর আকার-আকৃতি ও অবকাঠামো সম্পর্কে একরকম নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করছি। আমরা জানতে পারছি, মহাবিশ্বে দিকের ধারণা শাশ্বত নয়। ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, অবস্থান ইত্যাদির প্রেক্ষিতে দিক নির্ণীত হয়। ফলে 'উপর' বলতে শাশ্বত কোনো 'উপর' নেই। নিচ বলতে শাশ্বত কোনো 'নিচ' নেই। আমাদের জ্ঞানীরা এটা আরও প্রায় সহস্র বছর আগেও অনুভব করেছিলেন। আল্লামা জামালুদ্দিন খাব্বাযি এ প্রসঙ্গে লিখেন, 'ঘরের ছাদ বেয়ে যদি একটি ভিমরুল হাঁটে তবে উপর-নিচ কীভাবে নির্ণীত হবে? একদিক থেকে ভিমরুলটি উপরে। কারণ, সে মানুষের মাথার উপর হাঁটছে। আরেক দিক থেকে ভিমরুলটি নিচে; কারণ, মানুষ তাঁর মাথার উপরে। অন্যকথায়, ঘরের ছাদ বেয়ে ভিমরুল হাঁটলে যেহেতু ঘরের ভিতরে থাকা মানুষ ও ভিমরুলের মাথা একদিকে হয়ে যায়, ফলে মানুষের বিবেচনায় ভিমরুল উপরে আর ভিমরুলের বিবেচনায় মানুষ উপরে।'৬৬০ এই যদি হয় সৃষ্টির ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে। মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে তো এটা আরও বেশি প্রযোজ্য। ফলে সেখানে দিক বলতে চিরন্তন কিছুর অস্তিত্ব থাকে না।
আল্লাহর ক্ষেত্রে 'উপর'-'নিচ' প্রয়োগ মূলত সমতল ও চ্যাপটা পৃথিবীর কল্পনা থেকে এসেছে। এমনকি একদল মানুষ পৃথিবীকে গোলাকার জানা ও মানার পরও সমতল পৃথিবীর ধারণার প্রভাবে মহাবিশ্বকে শেষ পর্যন্ত সেই সমতলই কল্পনা করে, যার ফলে আল্লাহকে এই ক্ষুদ্র বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। মোটকথা, কুরআনের আয়াতগুলোর বাহ্যিক অর্থ ধরতে গিয়ে আল্লাহর শানে মনগড়া শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'রহমান আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন।' [তহা: ৫] এটাকে যদি নিচ থেকে উপরে ওঠা, আরশের উপর ওঠা, বসা, অবস্থান করা ইত্যাদি শব্দে ব্যক্ত করা হয়, তাঁকে আরশের উপর সত্তাসহ হাকিকি অবস্থানকারী হিসেবে মানা হয়, 'নুযুল' বলতে গিয়ে যদি উপর থেকে নিচে অবতরণ বলা হয়,৬৬১ তবে কুরআনের অন্য আয়াতগুলোকেও বাহ্যিক অবস্থার উপর ছেড়ে দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, 'তিনি আকাশে ইলাহ, যমিনেও ইলাহ।' [যুখরুফ : ৮৪] সুতরাং আল্লাহকে হাকিকিভাবে আকাশের ভিতরে, মাটির ভিতরে মানতে হবে; ব্যাখ্যা করা যাবে না। আল্লাহ আরেক আয়াতে বলেন, 'আপনি কি ভেবে দেখেননি যে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা-কিছু আছে, আল্লাহ তা জানেন... তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তাদের সাথে আছেন।' [মুজাদালা : ৭] এখানেও হাকিকিভাবে আল্লাহকে সবার সাথে সর্বত্র মানতে হবে; ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। আল্লাহর বাণী, 'তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে রয়েছেন।' [হাদিদ : ৪] এটাকেও হাকিকিভাব মানতে হবে; ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। আর এগুলো যদি বিভিন্ন শব্দের মারপ্যাঁচে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তবে ইস্তিওয়াকে যারা ব্যাখ্যা দেয়, তাদের ব্যাখ্যাও মানতে হবে। এটা এমন টানাটানি, যার সমাপ্তি নেই।
ফলে সিফাত সাব্যস্তের নামে আল্লাহর উপর মনগড়া শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। আবার এগুলোর এমন ব্যাখ্যাও করা যাবে না, যা সালাফ থেকে প্রমাণিত নয়। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে নুসুসের কাছে আত্মসমর্পণ করা, যতটুকু এসেছে ততটুকুতে থেমে যাওয়া। ইস্তিওয়াকে যেমন আল্লাহর বসা, সত্তাসহ অবস্থান ইত্যাদি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, তেমনই 'রাজত্ব', 'প্রতিপত্তি' দিয়ে এর তাবিলও করা যাবে না। বরং ইমাম আজমসহ সালাফ যেটা বলেছেন, সেভাবে বলতে হবে : “আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ আরশের উপর 'ইস্তিওয়া' করেছেন; কিন্তু তিনি আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন। আরশের উপর স্থির ও অবস্থানকারী নন। বরং তিনি কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আরশ ও আরশের বাইরে অন্য সকল বস্তুর রক্ষাকর্তা...।”৬৬২
টিকাঃ
৬৫৯. দেখুন: আল-আকিদাহ আর রুকনিয়্যাহ, সমরকন্দি (৭-৮)। আত-তামহিদ, নাসাফি (৩৬-৩৯)। জামেউল মুতুন, গুমুশখানভি (৫)।
৬৬০. আল-হাদি ফি উসুলিদ্দিন, খাব্বাযি (৪৮)।
৬৬১. দেখুন আবুল হুসাইন মালাতির 'আত-তাম্বিহ ওয়ার রাদ্দ' (১০০)।
৬৬২. আল-ওয়াসিয়্যাহ (পাণ্ডুলিপি) (৩)।