📄 সালাফের নামে অসত্য প্রচার
বাড়াবাড়ির চরম বাজে দৃষ্টান্ত হলো—এসব ভ্রান্ত আকিদাকে সালাফের আকিদা হিসেবে প্রচার করা। একজন আল্লাহর নড়াচড়া সম্পর্কে লিখেন, “....এই বক্তব্যের ইমামগণ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি (আল্লাহ) নড়াচড়া করেন। এটা আহলে সুন্নাতের ইমাম, যেমন—আহমদ ইবনে হাম্বল, সাইদ ইবনে মনসুর, ইসহাক ইবনে ইবরাহিম প্রমুখের আকিদা। উসমান ইবনে সাইদ দারেমিও এটাকে আহলে সুন্নাতের আকিদা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর জন্য 'নড়াচড়া' অস্বীকারকে জাহমিয়্যাহদের বক্তব্য হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রত্যেক জীবিত বস্তু নড়াচড়া করে। যা নড়াচড়া করে না সেটা জীবিত নয়। ... নড়াচড়া আল্লাহর কামালিয়্যাত।”
কেউ কেউ আল্লাহর হাত দিয়ে স্পর্শ করার কথাও বলেছেন। আল্লাহর জন্য পিঠ সাব্যস্ত করে সেটা দিয়ে হেলান দেওয়ার কথাও লিখেছেন এবং সালাফের নামে চালিয়ে দিয়েছেন! আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে তারা বর্ণনা করেছেন—আল্লাহ তায়ালা যখন মুসার জন্য তাওরাত লিখলেন, তখন তিনি একটি পাথরের সঙ্গে হেলান দিয়ে লিখেছেন।
আহমদ ইবনে হাম্বল কিংবা সালাফে সালেহিনের নামে এখানে যা বলা হলো, সেগুলো ভিত্তিহীন দাবি। ঠিক আরও বড় ভিত্তিহীন দাবি নড়াচড়াকে আল্লাহর কামালিয়্যাত (পূর্ণতা) বলে দাবি করা। এগুলো কখনোই কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ আকিদা এবং সালাফের আকিদা নয়; বরং দেহবাদীদের আকিদা। আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির বিভিন্ন জীবিত ও মৃত বস্তুর সঙ্গে তুলনা করার দুঃসাহস। জীবন ও মৃত্যু বিষয়টা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তিনি চিরঞ্জীব, সদা বিদ্যমান। তিনি মৃত্যুহীন। তাঁর জীবন আমাদের জীবনের মতো সৃষ্ট নয়। তাঁর মতো কিছু নেই। তাহলে আমাদের নড়াচড়া করতে হলে তাঁর কেন করতে হবে? সবচেয়ে বড় কথা, সালাফে সালেহিনের আকিদা হলো: আল্লাহ নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, সেগুলা সাব্যস্ত করা এবং সেগুলাতেই সীমাবদ্ধ থাকা, মনগড়া কোনোকিছু আল্লাহর উপর প্রয়োগ না করা। তাহলে নড়াচড়া, দাঁড়ানো, বসা—এগুলো আল্লাহর উপর প্রয়োগ করার চেয়ে বড় জুলুম আর কী হতে পারে?
আরেকজন লিখেছেন, “আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—তিনি আরশের উপর 'ইস্তিওয়া' করেছেন। আর বসা ছাড়া ইস্তিওয়া হয় নাকি?” আমরা উলটো প্রশ্ন করব, ইস্তিওয়া কেন বসা হবে? তাহলে আল্লাহ তায়ালা বসা শব্দই ব্যবহার করতেন। তা ছাড়া, আপনাদের মূলনীতি হলো, আল্লাহ তায়ালা নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন এর বাইরে না যাওয়া। আল্লাহ তো তাঁর জন্য 'বসা' সাব্যস্ত করেননি। তাহলে এটা কি আল্লাহর উপর অনধিকার চর্চা নয়?
বরং আরও জটিলতা হলো ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করা, বিচ্যুতির সাফাই গাওয়া, সঠিকটাকে ভুল বলা। 'সালাফ সালাফ' জপে সালাফের বক্তব্য নিজেদের মনোমতো না হলে ছুড়ে ফেলা, আঘাত করা। যেমন—পিছনে আমরা দেখেছি—ইবনে হিব্বান রহ. যখন আল্লাহকে সীমাবদ্ধ রাখার আকিদার সমালোচনা করলেন, তারা তাঁকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিলো। উলটো এর মাধ্যমে সহিহ আকিদার জয় হয়েছে বলে গর্বও করল। একইভাবে ইমাম আজম রহ.-এর আকিদা হলো—যেমনটা পিছনে উল্লেখ করা হয়েছে—তিনি আল্লাহর জন্য 'দিক' সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দিয়েছেন। কিন্তু তারা যেহেতু আল্লাহকে মাথার উপরে কল্পনা করেন, এ জন্য তারা 'দিক' সাব্যস্ত করেন। 'দিক' নাকচকে হারাম ও বাতিল মনে করেন!
অথচ এটা বিভ্রান্তি। আহলে সুন্নাতের আকিদা নয়। কারণ, দিক আল্লাহর সৃষ্ট বস্তু। আর সৃষ্টি স্রষ্টাকে ধারণ করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা সকল দিক ও সীমা-পরিসীমার ঊর্ধ্বে। একইভাবে আমরা পিছনে বলে এসেছি কীভাবে ইমাম আজম আল্লাহকে জিসম থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছেন। তাঁর অনুসরণে সকল আলেম করেছেন। অথচ তারা শত শত বছর পরে এসে দাবি করছেন—সালাফে সালেহিন আল্লাহর উপর জিসম প্রয়োগ করেননি, নিষেধও করেননি। তাহলে ইমাম আজম এবং অন্য আলেমগণ কী করলেন? ইমাম আজম কি সালাফ নন? উপরে বর্ণিত প্রত্যেকটা অতিরঞ্জন ইমাম আজমসহ অন্যান্য সালাফের আকিদার বিপরীত। তারা সালাফের নামে যেটা প্রচার করেছেন, সেটা আরও কয়েকশো বছর পরের কিছু লোকের আকিদা, যাদের বিরুদ্ধে দেহবাদের শক্ত অভিযোগ রয়েছে।