📄 সিফাতের ক্ষেত্রে খালাফ তথা পরবর্তীদের বিচ্যুতি
সিফাতের ক্ষেত্রে ইমামের মাযহাব সুস্পষ্ট। এর সারমর্ম হলো : এগুলোকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য দেওয়া যাবে না। আবার কল্পিত সাদৃশ্যের দোহাই দিয়ে অস্বীকারও করা যাবে না। ইমাম আজম রহ. এই দুই প্রান্তিকতা এবং এগুলোর পতাকাবাহী তথা জাহম ইবনে সাফওয়ান ও মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা জাহম ইবনে সাফওয়ান ও মুকাতিল ইবনে সুলাইমানকে ধ্বংস করে দিন। প্রথমটা অস্বীকারের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে, দ্বিতীয়টা সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে।'৬২৬ অন্য বর্ণনায় এসেছে, ইমাম বলেন, 'মুকাতিল সিফাত সাব্যস্তের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহকে সৃষ্টির মতো বানিয়ে দিয়েছে।'৬২৭ যাহাবির বর্ণনামতে, ইমাম আজম বলেছেন, 'প্রাচ্য থেকে আমাদের কাছে দুটো নিকৃষ্ট মতবাদ এসেছে—এক. সিফাত অস্বীকারকারী জাহম, দুই. সাদৃশ্যবাদী মুকাতিল।'৬২৮ অন্য বর্ণনায় বলেন, ‘আমরা জাহমের মতো আল্লাহর সিফাত থেকে পলায়ন করি না; আবার মুকাতিল আল্লাহর ব্যাপারে যা বলেছে তা বলি না।'৬২৯ ফলে ইমামের মাযহাব এই দুটোর মাঝামাঝি। এটাই আহলে সুন্নাতের মাযহাব।
ইমামের অনুসরণে তহাবি বলেন, 'দ্বীনের ক্ষেত্রে সে ব্যক্তিই নিরাপদে থাকে, যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি আত্মসমর্পণ করে এবং যা জানে না (সে ব্যাপারে কথা বলা পরিত্যাগ করে) যিনি জানেন তাঁর জন্যই ছেড়ে দেয়।' অন্যত্র বলেন, 'আল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয় বোঝার একমাত্র বিশুদ্ধ পন্থা হচ্ছে, অপব্যাখ্যা (তাবিল) বর্জন এবং আত্মসমর্পণ। এই আত্মসমর্পণের উপরই দাঁড়িয়ে আছে সকল রাসুলের দ্বীন, নবির শরিয়ত এবং মুসলমানের দ্বীনদারি। সুতরাং যে ব্যক্তি এসব ক্ষেত্রে অস্বীকার কিংবা (সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার) সাদৃশ্যকরণ থেকে বেঁচে না থাকবে, তার পদস্খলন ঘটবে এবং বিশুদ্ধ তাওহিদ (তানযিহ) পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। কারণ, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের একত্ববাদের গুণে গুণান্বিত, অদ্বিতীয়ের বিশেষণে বিশেষিত, সৃষ্টির কেউ সেসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়।' অন্যত্র ইমাম তহাবি বলেন, 'আত্মসমর্পণ এবং বশ্যতা স্বীকার ব্যতীত ইসলামে কারও অবস্থান অবিচল হতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন বিষয় জানতে যাবে যেগুলো জানা তার পক্ষে সম্ভব নয় এবং এক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করে তুষ্ট থাকবে না, সে নির্ভেজাল তাওহিদ, সুনির্মল জ্ঞান এবং বিশুদ্ধ ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে। কুফর ও ঈমান, সত্যায়ন ও মিথ্যায়ন, স্বীকার ও অস্বীকৃতির দোলাচলে দোদুল্যমান থাকবে। সন্দেহ নিয়ে পথভ্রষ্টের মতো উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকবে; না হবে সত্যায়নকারী মুমিন, না মিথ্যা প্রতিপন্নকারী কাফের।'৬৩০
টিকাঃ
৬২৬. ফাযায়িলু আবি হানিফা (১২৪)। আল-জাওয়াহিরুল মুযিআহ (১/৩১)।
৬২৭. মিযানুল ইতিদাল (৪/৩৭৫)।
৬২৮. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/২০২)।
৬২৯. আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (১০৭)।
৬৩০. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১৩, ১৪, ১৫)।
📄 সালাফের তাবিল আর খালাফের তাবিলের মাঝে পার্থক্য কী?
প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কি তাবিল পুরোপুরি নিষিদ্ধ? আমরা বলব, কখনোই নয়। সালাফে সালেহিন থেকে একাধিক সিফাতের তাবিল পাওয়া গিয়েছে। কারণ, যেসব জায়গায় তাবিল করা সম্ভব, সেখানে তারা তাবিল করেছেন। যেখানে সম্ভব নয় কিংবা অনুমোদিত নয়, সেখানে করেননি। বরং অনেক জায়গায় তাবিল করতে সরাসরি নিষেধ করেছেন। তাই পরবর্তী লোকদের কর্তব্য হলো সালাফে সালেহিনের পথে থাকা। যেখানে তারা তাবিল করেছেন, সেখানে করা। তারা যেখানে করেননি, সেখানে না করা। বিষয়টি আরেকটু খুলে বলা যাক।
কুরআনের কিছু কিছু শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করার ব্যাপারে সকল সালাফ একমত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴿ নَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ ﴾ অর্থ : 'তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, আল্লাহও তাদের ভুলে গেছেন।' [তাওবা : ৬৭] এখানে আল্লাহর ভুলে যাওয়ার অর্থ হলো তাদের পরিত্যাগ করা, নিজেদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেওয়া; মানুষের মতো ভুলে যাওয়া নয়। আল্লাহর বাণী, 'তোমরা তাদের হত্যা করোনি, বরং আল্লাহ তাদের হত্যা করেছেন। (হে রাসুল) আপনি যখন নিক্ষেপ করেছেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি, বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন।' [আনফল : ১৭] এখানে আল্লাহ বলছেন, (বদরযুদ্ধে) তিনি কাফেরদের হত্যা করেছেন; মুসলমানরা করেনি। তিনি মাটি নিক্ষেপ করেছেন; রাসুলুল্লাহ (ﷺ) করেননি। অথচ সকল মুফাসসির এ ব্যাপারে একমত যে, মুসলমানরাই হত্যা করেছেন, আল্লাহ নিজে করেননি। রাসুলুল্লাহই হাতে মাটি নিয়ে কাফেরদের দিকে ছুড়েছেন; আল্লাহ তায়ালা নিজে ছোড়েননি। হ্যাঁ, যেহেতু এগুলা সম্পন্ন হয়েছে আল্লাহর শক্তি ও তৌফিকে, তাই তাঁর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী : 'জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যবর্তী হয়ে যান।' [আনফাল : ২৪]৬৯২ এখানে সর্বসম্মতিক্রমে এর অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অবস্থান নেন, বরং মানুষের হৃদয় আল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে বোঝানো উদ্দেশ্য।৬৯৩
'আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি অপেক্ষাও নিকটতর।' [কাফ : ১৬] এখানে মানুষের ঘাড়ের কাছে সত্তাগতভাবে আল্লাহর থাকা উদ্দেশ্য নয়; সবকিছু সম্পর্কে অবগতি ও নিয়ন্ত্রণ উদ্দেশ্য। একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী, 'তিনি আকাশে ইলাহ, যমিনেও ইলাহ।' [যুখরুফ : ৮৪] এখানে আকাশ ও যমিনে আল্লাহর সত্তাগত বিদ্যমানতা উদ্দেশ্য নয়; বরং আকাশ ও যমিনের সর্বত্র তাঁর উলুহিয়্যাত এবং তিনিই যে ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত সে চিরসত্য ঘোষণা করা উদ্দেশ্য।৬৯৩
'স্মরণ করুন সেই দিনের কথা, যেদিন পায়ের গোছা উন্মোচিত করা হবে। সেদিন এদের আহ্বান করা হবে সিজদা করার জন্য। কিন্তু এরা সক্ষম হবে না।' [কলম : ৪২] এখানে ইবনে আব্বাস রাযি., মুজাহিদ, যাহহাক, সাইদ ইবনে যুবাইর, কাতাদাসহ উম্মাহর প্রথম সারির সাহাবি ও তাবেয়ি ব্যাখ্যাতাদের মতে, আল্লাহর 'পায়ের গোছা' উদ্দেশ্য নয়; বরং কিয়ামতের ভয়াবহতা উদ্দেশ্য।৬৯৪ একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী, 'আপনার পালনকর্তা আর ফেরেশতারা আসবেন কাতারে কাতারে।' [ফজর: ২২] ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত আছে, তিনি এখানে 'আল্লাহর আগমন'-কে 'সওয়াব আগমন' দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন। ইমাম বাইহাকি বলেন, এটার সনদে কোনো অস্পষ্টতা নেই।৬৯৫ আল্লাহ তায়ালার বাণী, 'তারা কি এ জন্য অপেক্ষা করছে যে, তাদের কাছে ফেরেশতারা এসে পড়বে। কিংবা আপনার পালনকর্তা আসবেন অথবা তাঁর কিছু নিদর্শন এসে পড়বে?' [আনআম : ১৫৮] ইবনে আব্বাস ও যাহহাকের মতে, এখানে 'আল্লাহর আগমন' বলতে তাঁর নির্দেশ আগমন উদ্দেশ্য।৬৯৬ একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী, 'তাঁর কুরসি আকাশমণ্ডলী ও জমিন পরিবেষ্টন করে রয়েছে।' [বাকারা: ২৫৫] এখানে ইবনে আব্বাস, সাইদ ইবনে যুবাইর থেকে 'কুরসি'র তাবিল বর্ণিত আছে, 'ইলম' তথা জ্ঞান। অর্থাৎ, তিনি সর্বজ্ঞানী। সবকিছু জানেন।৬৯৭
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর দোয়া 'হে আল্লাহ, আপনি আমার গুনাহগুলো পানি, বরফ ও শিলা দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।'৬৯৮ এখানে সর্বসম্মতিক্রমে হাদিসের উদ্দেশ্য প্রকৃত অর্থেই ধোয়া নয়; বরং ক্ষমা করা। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর অন্য একটি হাদিসে এসেছে, (আল্লাহ তায়ালা বলেন) ‘যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’ তিরমিযি উক্ত হাদিসটি বর্ণনার পর বলেন, ‘আ’মাশ থেকে উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘ক্ষমা’ ও ‘অনুগ্রহ’ দিয়ে। অন্য আলেমরাও উক্ত হাদিসকে এভাবে ব্যাখ্যা (তাফসির) করেছেন। তাদের মতে, (এগিয়ে আসা বা কাছাকাছি আসার) অর্থ হলো, ‘বান্দা যখন ইবাদত ও আমার নির্দেশ পালনের মাধ্যমে আমার কাছাকাছি আসে, আমি দ্রুত তাকে ক্ষমা করে দিই এবং অনুগ্রহ করি’ (অর্থাৎ বস্তুগত নৈকট্য ও দূরত্ব উদ্দেশ্য নয়)।৬৯৯
বরং আল্লাহর নুযুল যা ইমাম আজম থেকেও যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, ইমাম মালেক ও ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর সেটার তাবিল করেছেন।৭০০ এমনকি খোদ ইমাম আজম রহ. আল্লাহর ‘নফস’, ‘ইয়াদ’, ‘ওয়াজহ’, ‘ইস্তিওয়া’ ও ‘নুযুল’ ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাবিল না করলেও আমরা দেখব আল্লাহর ‘নৈকট্য’ (কুরব) এবং ‘দূরত্ব’ (বুদ) ইত্যাদির কিছু ক্ষেত্রে একরকম রূপক ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর নৈকট্য বা দূরত্ব (বস্তুগত) কাছে বা দূরে থাকার ভিত্তিতে নয়। এটা মর্যাদা ও অপমানের ভিত্তিতে। অনুগত বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী, ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে। অবাধ্য আল্লাহ থেকে দূরবর্তী, ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে। একইভাবে জান্নাতে আল্লাহর পাশে থাকা ধরন ব্যতিরেকে। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো ধরন ব্যতিরেকে।’৭০১
ফলে তাবিলকে একবাক্যে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে যে বিষয়টি খুব ভালোভাবে বোঝা আবশ্যক সেটা হলো—ইমাম আজম ও সালাফে সালেহিন থেকে বর্ণিত এসব তাবিলের সংখ্যা খুবই সীমিত। কারণ, সালাফ উন্মুক্তভাবে সকল সিফাতের তাবিল করেননি। এ কারণে ইমাম আজম রহ. এবং হানাফি মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় ইমামদের থেকেও বর্ণিত তাবিল সংখ্যা নিতান্তই কম। হাতেগোনা কয়েকটা। এটা বৃদ্ধি পায় পরবর্তী সময়ে। মাহমুদ ইবনে যায়েদ লামিশি (৫২২ হি.) লিখেন, 'আমাদের অসংখ্য বড় মাশায়েখ থেকে বর্ণিত আছে—আমরা (আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে) সেগুলা যেভাবে এসেছে সেভাবে বিশ্বাস রাখব। তাবিলে লিপ্ত হব না। আর কিছু কিছু মাশায়েখ থেকে বর্ণিত আছে—শব্দের জন্য প্রযোজ্য কোনো তাবিল করা।'৭০২ সুতরাং কিছু মাশায়েখের পথ ছেড়ে প্রথম যুগের অসংখ্য ও বড় মাশায়েখের পথে চলা যে উত্তম, সেটা বলা বাহুল্য। তা ছাড়া, পিছনেও যেটা বলা হয়েছে—এ দরজা উন্মুক্ত রাখলে এর গন্তব্য নেই, শেষ মঞ্জিল নেই। ফলে এটাকে শুরুতেই রুদ্ধ রাখতে হবে। আর সেটার সীমারেখা হলো সালাফের মাযহাব। তারা যতটুকুতে সীমাবদ্ধ থেকেছেন আমরাও ততটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকব। তারা যেখানে তাবিল করেছেন, আমরা সেখানে করব। তারা যেখানে করেননি বা নিষেধ করেছেন, আমরা সেখানে করব না। সালাফের অনুসারী দাবির প্রতি এটা ন্যূনতম সুবিচার। ইমাম আজম বলেন, 'কারও জন্য তার নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহর ব্যাপারে কিছু বলা বৈধ নয়। বরং মানুষের কর্তব্য হলো, আল্লাহর জন্য সেগুলাই সাব্যস্ত করা যা তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন; তাঁর ব্যাপারে মনগড়া কোনো বক্তব্য না দেওয়া। বড় মহান বরকতময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা।'৭০৩
টিকাঃ
৬৯২. তাফসিরে তাবারি (১৩/৪৭১)।
৬৯৩. প্রাগুক্ত (১৬/১২১)।
৬৯৪. তাফসিরে তাবারি (২৩/৫৫৫)।
৬৯৫. দেখুন: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১৪/৩৮৬)।
৬৯৬. তাফসিরে কুরতুবি (৭/১৪৪)।
৬৯৭. তাফসিরে তাবারি (৫/৩৯৭)।
৬৯৮. বুখারি (কিতাবুল আজান: ৭৪৪)। ইবনে মাজা (আবওয়াবু ইকামাতিস সালাত: ৮০৫)।
৬৯৯. তিরমিযি (আবওয়াবুদ দা‘আওয়াত আন রাসুলিল্লাহ : ৩৯৩০)।
৭০০. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৮/১০৫)।
৭০১. আল-ফিকহুল আকবার (৭-৮)।
৭০২. আত-তামহিদ (৫৮-৫৯, ৮৪-)।
৭০৩. দেখুন: আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (৮৯)। আল-উসুলুল মুনিফাহ (১৫)।
📄 আল্লাহর সিফাত নিয়ে বিবাদ নিষিদ্ধ
আল্লাহর সিফাত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আমরা এখানেই শেষ করব। তবে শেষ করার আগে এ ব্যাপারে আলেমদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নসিহত সংযোজিত করব, যাতে এ ধরনের আলোচনার ক্ষেত্রে শরয়ি হেদায়াত ও কল্যাণ লাভ হয়, সব ধরনের অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকা যায়।
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, কুরআন-সুন্নাহতে আল্লাহর ব্যাপারে বিবাদ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, “তিনিই তোমার প্রতি এ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যার কিছু আয়াত 'মুহকাম' (সুস্পষ্ট), এইগুলো কিতাবের মূল; আর অন্যগুলো 'মুতাশাবিহ' (দজ্ঞেয়)। যাদের অন্তরে সত্য-লঙ্ঘন প্রবণতা রয়েছে, শুধু তারাই ফেতনা ও ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহাতের অনুসরণ করে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলে, 'আমরা এটা বিশ্বাস করি, সমস্তই আমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে আগত।' বোধশক্তিসম্পন্নেরা ব্যতীত অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।” [আলে ইমরান : ৭]
আয়েশা রাযি. বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) উপরের আয়াতটি তেলাওয়াত করে বলেন, 'সুতরাং তোমরা যদি কাউকে কুরআনের নিগূঢ় বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক করতে দেখো, তবে বুঝে নিয়ো, আল্লাহ তাদেরই উদ্দেশ্য করেছেন। সুতরাং সেসব লোকের কাছ থেকে তোমরা দূরে থেকো।' ৭৭৪
এ কারণেই ইমাম একদিকে যেমন আল্লাহর সিফাত নিয়ে আলোচনা একেবারে বাদ দেননি, আবার সিফাতের আলোচনার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনও করেননি। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে খুঁজে খুঁজে আল্লাহর হাত-পা-চেহারা, ওঠা-নামা—এ জাতীয় সিফাতগুলো দিয়ে বই ভরে ফেলেননি, যেমনটা পরবর্তী লোকেরা সালাফের নামে করেছে। বরং তাঁর দিকে সম্বন্ধকৃত পাঁচটি গ্রন্থে হাতেগোনা কয়েকটি সিফাত উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। অথচ ইমাম আজমই সালাফ। আমরা দেখি, ইমাম আজম তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে আল্লাহর অসংখ্য সিফাত থেকে মৌলিক কিছু সিফাত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ, আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য নাম ও গুণের অধিকারী, যার সবগুলোর সবিস্তার ব্যাখ্যা সকল গ্রন্থে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া, সেগুলোর সবকিছু সবিস্তারে জানা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য নয়; অধিকাংশ মানুষের জন্য সম্ভবও নয়। ফলে ইমাম কয়েকটি নিয়ে আলোচনার মাঝেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন।
আবু ইউসুফ রহ. বলেন, আমি আবু হানিফা রহ.-এর সাথে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমরা এক ব্যক্তিকে কুরআন নিয়ে বিতর্ক করতে দেখলাম। সে কুরআনের ব্যাপারে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কথা বলছিল আর তার প্রতিপক্ষের সমালোচনা করছিল। ইমাম তাকে ডেকে বললেন, 'যদি তুমি এটাকে সওয়াবের কাজ মনে করো (তাহলে সেটা ভুল)। কারণ, এতে কোনো সওয়াব নেই। বরং তোমার কর্তব্য হলো সালাফের পথে হাঁটা। আল্লাহকে নিয়ে কিংবা আল্লাহর সিফাতসমূহ নিয়ে বিতর্ক করো না (লা সিমারা ফিল্লাহি ওয়ালা ফি সিফতিহি)। এগুলাে বাদ দিয়ে অন্য কিছুতে মনোেযাগ দাও।' ৭৭৫
イবনে আবদিল বার, ইমামপুত্র হাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম বলেছেন: (আহলে সুন্নাত ওয়াল) 'জামাত হলো : ... গুনাহের কারণে কাউকে কাফের না বলা, প্রত্যেক মুমিনের জানাযা পড়া, প্রত্যেক মুমিনের পিছনে নামায পড়া। ...তাকদিরের ভালোমন্দ আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে কথা বলা পরিত্যাগ করা।' ৭৭৬
ইমাম তহাবি বলেন, 'আমরা আল্লাহর ব্যাপারে (অসমীচীন) চিন্তাভাবনায় নিজেদের ব্যাপৃত করি না; আল্লাহর দ্বীন নিয়ে বিবাদে জড়াই না।’ ৭৭৭
আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা দ্বীন (তথা উসুলুদ্দিন বা আকিদা) নিয়ে বিতর্ক ও বিবাদ বর্জন করো। সালাফে সালেহিন যতটুকু নিয়ে সন্তুষ্ট থেকেছেন ততটুকুতে সন্তুষ্ট থাকো। কারণ, তারা জেনেবুঝেই এসব বিষয়ে বিতর্ক থেকে বিরত থেকেছেন। যদি এর মাঝে কল্যাণকর কিছু থাকত, তবে তারাই সেদিকে সবার আগে যেতেন, সবার আগে সেসব রহস্য উন্মোচিত করতেন।' ৭৭৮
আবু ইউসুফ রহ. থেকে 'দ্বীন নিয়ে বিতর্ক নিষিদ্ধ' পুস্তিকাতে আরও এসেছে, আমার কাছে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস পৌঁছেছে। একদিন তিনি সাহাবাদের মাঝে বের হলেন। দেখলেন, তারা আল্লাহকে নিয়ে কথা বলছেন। রাসুলুল্লাহকে দেখে তারা থেমে গেলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, কী নিয়ে কথা বলছ? তারা জানালেন, আল্লাহ তায়ালাকে নিয়ে। রাসুল বললেন, আল্লাহকে নিয়ে চিন্তার দরকার নেই। কারণ, তোমরা তাঁকে উপলব্ধি করতে পারবে না। আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করো। কারণ, সেটা চিন্তার জায়গা। ৭৭৯
ইবনে উমর থেকেও বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: 'তোমরা আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করো। আল্লাহকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করো না।' ৭৮০
ইবনে আবিল আওয়াম বর্ণনা করেন, ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, 'তোমরা দ্বীন নিয়ে বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করো। কেননা দ্বীন স্পষ্ট। আল্লাহ তায়ালা কিছু ফরয বিধান দিয়েছেন, কিছু সুন্নাত দিয়েছেন। কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন। হালাল বলে দিয়েছেন, হারাম স্পষ্ট করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পূর্ণ করলাম। আর ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।’ [মায়িদা : ৩] সুতরাং কুরআনে যা হালাল করা হয়েছে সেটা হালাল হিসেবে গ্রহণ করো; কুরআনে যা হারাম করা হয়েছে সেগুলো হারাম মানো। কুরআনের স্পষ্ট বিষয়গুলোর উপর আমল করো; অস্পষ্ট (মুতাশাবিহ) বিষয়সমূহ থেকে দূরে থাকো। যদি দ্বীন নিয়ে বিতর্কের মাঝে আল্লাহর তাকওয়া থাকত, তবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁর পরে সাহাবায়ে কেরাম সবার আগে সেটা করতেন। তারা কি দ্বীন নিয়ে বিবাদ করেছেন? হ্যাঁ, তাঁরা ফিকহ নিয়ে মতবিরোধ করেছেন; ফারায়েজ নিয়ে মতভেদ করেছেন। নামায, হজ, হালাল-হারাম, তালাক ইত্যাদি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন; কিন্তু কেউ দ্বীন (তথা আকিদা) নিয়ে বিতর্ক করেননি। এ বিষয়ে বিবাদ করেননি। সুতরাং তোমরা তাকওয়ার উপর থাকো। সুন্নাতের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকো। এটুকুই যথেষ্ট হবে। পরবর্তী লোকেরা দ্বীন নিয়ে যেসব বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, যেগুলো নিয়ে বিবাদ-বিতর্কে জড়িয়েছে, সেগুলো থেকে দূরে থাকো। কারণ, সুন্নাতের অনুসরণের মাঝেই মুক্তি।' ৭৮১
মোটকথা, সর্বাবস্থায় সিফাত নিয়ে বিতর্ক পরিহার করতে হবে। কারণ, এ ব্যাপারে বিতর্ক সমাধানের চেয়ে সংকট আরও ঘনীভূত করে। এ জন্য সালাফে সালেহিন সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহর সিফাত নিয়ে বিতর্ক করতে নিষেধ করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযাইমাকে আল্লাহর আসমা ও সিফাত (তথা নাম ও গুণাবলি) নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'এটা বিদআতিদের আবিষ্কার করা একটা বিদআত। সাহাবা, তাবেয়িন, মাযহাবের বড় বড় ইমাম যথা মালেক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সাওরি, আওযায়ি, আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক হানযালি, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া—তাঁরা (আল্লাহর আসমা ও সিফাত নিয়ে) কথা বলতেন না। এগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে, এসব বিষয়ে বিদআতিদের গ্রন্থ পড়তে নিষেধ করতেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের ফেতনা থেকে রক্ষা করুন।' ৭৮২
মুসআব বলেন, মালেক ইবনে আনাস রহ. বলতেন, 'আমি দ্বীনের ব্যাপারে সব ধরনের বিতর্ক অপছন্দ করি। মদিনাবাসীও এটা অপছন্দ করে। তাকদির, জাহমের বিভ্রান্তিসমূহ এ ধরনের কোনোকিছু নিয়ে কথা বলা আমাদের পছন্দ নয়। বরং আমলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই এমন যেকোনো বিষয়ে কথা বলা আমি পছন্দ করি না। আর আল্লাহর ব্যাপারে কথা বলা থেকে সম্পূর্ণ নীরব থাকতে হবে। মদিনাবাসী (তথা মদিনার আলেমগণ) আমল ছাড়া দ্বীনের কোনো বিষয়ে কথা বলতে নিষেধ করতেন।' ৭৮৩
পরবর্তী সময়ে বিতর্ক যেহেতু শুরু হয়েছে, সে যুক্তিতে এখনও এটা অব্যাহত রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এক্ষেত্রে উম্মাহর একে অন্যকে ছাড় দিতে হবে। কারণ, আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ঘরানার মাঝে আল্লাহর সিফাতকেন্দ্রিক যেসব বিতর্ক ও মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো দ্বীনের কোনো মৌলিক বিষয় নয়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেননি। যেসব সাহাবা গ্রামীণ অঞ্চলে থাকতেন এবং একবার কেবল রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, আল্লাহর রাসুল তাদের এগুলো শেখাননি। বোঝা গেল, ঈমানের বিশুদ্ধতা এগুলো জানার উপর নির্ভরশীল নয়। এগুলোর ক্ষেত্রে ভুলবিচ্যুতি ঈমান ভঙ্গের কারণ নয়। যদি এগুলোর উপর ঈমানের বিশুদ্ধতা নির্ভর করত, কিংবা এক্ষেত্রে ভুলবিচ্যুতি কুফর হতো, তাহলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবাদের এগুলো সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে শিখিয়ে যেতেন। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কিংবা সাহাবায়ে কেরামের সময়ে কোনো যুগেই এগুলো নিয়ে বিতর্ক হয়নি। ফলে এগুলোর উপর ভিত্তি করে পরস্পরকে কাফের-মুশরিক বা গোমরাহ বলা কিংবা উম্মাহর ঈমানি ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে সর্বসম্মত ও মৌলিক বিষয়ের পরিবর্তে উম্মাহকে গৌণ বিষয়ে জড়িয়ে ফেলা মোটেই ইতিবাচক হবে না।
তা ছাড়া, যদি আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারার শাখাগত দ্বন্দ্বগুলো মিটিয়ে ফেলতে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়, তবুও মেটানো সম্ভব হবে না। হাজার বছর ধরে এ সম্পর্কে যত বই লেখা হয়েছে, যদি সবগুলো শরবত বানিয়ে খাইয়ে দেওয়া হয়, তবুও এ সমস্যার সমাধান হবে না। সহস্র বছরের অধিক সময়ের বিতর্ক, লক্ষ লক্ষ আলেমের মতামত, শতসহস্র বইয়ের ছড়াছড়ি। ফলে বিতর্কের পরিসরটা অকল্পনীয় রকমের বড়। আপনি যত দলিল-দস্তাবেজ জমা করেন, আপনার প্রতিপক্ষের কাছে সমান রকমের দলিল-দস্তাবেজ আছে। এখানে নতুন দেওয়ার কিছু নেই, আবিষ্কারের কিছু নেই। চর্বিতগুলোকে চর্বণ করাই এখানকার কাজ। যদি মনে করেন একটা মতকে অবিসংবাদিতভাবে প্রতিষ্ঠিত করবেন, তবে আপনি সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মাঝে আছেন। সেটা সম্ভব হলে হাজার বছর আগেই হয়ে যেত।
ঈমান ও কুফর প্রশ্নে হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলি আহলে সুন্নাতের সকল ধারা ঈমানের শিবিরে। ইসলাম ও মিশনারির সংঘাতে সবগুলো মানহাজ ইসলামের ঝান্ডাতলে। তাওহিদ ও পৌত্তলিকতার যুদ্ধে তারা সম্মিলিতভাবে তাওহিদের প্ল্যাটফরমে। আল্লাহর আইন এবং মানব রচিত আইনের দ্বন্দ্বে তারা আল্লাহর আইনের সঙ্গে। হিজবুল্লাহ ও হিজবুশ শয়তানের যুদ্ধে তারা সকলেই হিজবুল্লাহর বাহিনীতে। কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে তারা ঈমানি ভাই ভাই; শিয়াদের বিরুদ্ধে তারা সুন্নাহর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে; কবরপূজারীদের বিরুদ্ধে তারা এক শিবিরে। এভাবে সব জায়গায় তারা একসঙ্গে। অথচ গুটিকয়েক শাখাগত মাসআলাকে কেন্দ্র করে আজ তারা বিভিন্ন যুধ্যমান শিবিরে, রণ প্রস্তুতিতে। পৃথিবীর অন্যত্র থাকলেও উপমহাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের চিত্র আগে কখনো এতটা প্রকটভাবে দেখা যায়নি। প্রথমে আলেমরা তাতে জড়ালেন; এখন সাধারণ শিক্ষিতরাও জড়াতে চাচ্ছেন। সবাই চাচ্ছেন আকিদার শাখাগত এসব মাসআলা নিয়ে যুদ্ধের ফয়সালা আগে হোক, ঈমান ও কুফরের যুদ্ধ পরে দেখা যাবে। অথচ তাদের কেউ অনুভব করছেন না, তাদের এসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও ইসলামের শত্রুদের চোখে তারা সবাই সমান। সকলে তাদের শেষ করার জন্য একাট্টা। তাহলে তারা কি নিজেদের রক্ষার জন্যও এক হতে পারবেন না? তা ছাড়া, আকিদার এসব বিতর্ক এক অনিঃশেষ ও অনিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ। এখানে সে তত বড় বিজয়ী, যে এ যুদ্ধ থেকে যত দূরে।
ইবনে খুযাইমা বলেন, 'মুসলমানদের বড় বড় ইমাম এবং মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাগণ, যেমন—মালেক, সুফিয়ান, আওযায়ি, শাফেয়ি, আহমদ, ইসহাক, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, ইবনুল মুবারক, আবু হানিফা, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ও আবু ইউসুফ প্রমুখ—এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতেন না। তাঁরা তাঁদের শাগরেদদের এসবের মাঝে প্রবেশ করতে নিষেধ করতেন। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের কথা বলতেন।' ৭৮৪
ইমাম গাযালি লিখেন, ‘মিম্বর থেকে এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণমূলক কথা বলা বৈধ নয়। বরং সালাফ থেকে যতটুকু এসেছে, ততটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক। দেহবাদিতা ও সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে আল্লাহর পবিত্রতার উপর গুরুত্বারোপ করা জরুরি।' ৭৮৫
টিকাঃ
৭৭৪. ইবনে হিব্বান (৭৩)। মুসনাদে আহমদ (২৪৮৪৭)।
৭৭৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৩৩)।
৭৭৬. আল-ইনতিকা (৩১৫)।
৭৭৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।
৭৭৮. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৭৩)।
৭৭৯. হিলইয়াতুল আউলিয়া (৬/৬৬)। আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৯৭)।
৭Check০. শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৩/৫৮০)।
৭Check১. ফাযায়িলু আবি হানিফাহ, ইবনে আবিল আওয়াম (৩২৮-৩২৯)।
৭Check২. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৭৬-১৭৭)।
৭Check৩. শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১/১৬৮)।
৭Check৪. আকাউইলুস সিকাত, যায়নুদ্দিন হাম্বলি (৬২)।
৭Check৫. ইলজামুল আওয়াম আন ইলমিল কালাম (৬৪-৬৫)।