📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ‘ইয়াদ’ কি আসলেই অনুবাদ করা যাবে না?

📄 ‘ইয়াদ’ কি আসলেই অনুবাদ করা যাবে না?


প্রশ্ন হলো, বাস্তবেই কি 'ইয়াদ' শব্দ ফারসি তথা অনারবি ভাষায় অনুবাদ করা যায় না? অন্যকথায়, আমরা আল্লাহর 'ওয়াজহ'-কে 'চেহারা', 'কাদাম'-কে 'পা', 'নফস'-কে 'সত্তা' হিসেবে অনুবাদ করতে পারলেও 'ইয়াদ'-কে 'হাত' হিসেবে অনুবাদ করতে পারব না?

বিষয়টি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। বিভিন্ন আলেম বিভিন্নভাবে উত্তর দিয়েছেন। হাফিজুদ্দিন নাসাফি বলেন, 'ওয়াজহ', 'ইয়াদ', 'আইন'... ইত্যাদির কোনোটাই তাবিল ব্যতীত ফারসি (তথা অনারবি ভাষায় অনুবাদ করে) আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা বৈধ নয়।৬১১ কিন্তু উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, অন্য ভাষায় কুরআনের অনুবাদ করতে গেলে শাব্দিক অর্থ অনুবাদের বিকল্প নেই।

মোল্লা আলি কারি বলেন, 'ইয়াদ' তাবিল না করার ব্যাপারে সালাফ একমত হয়েছেন। যেহেতু ইমাম মনে করতেন, যদি অন্যান্য সিফাতের মতো এটাকেও অন্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়, তবে তানযিহ লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, তাশবিহ ও তাবিল ঢুকে যেতে পারে, তাই তিনি এটাকে অনুবাদ করতেও নিষেধ করেছেন।৬১২ সালাফ ইয়াদের তাবিল করতে নিষেধ করেছেন—এটা সঠিক বক্তব্য। কিন্তু তানযিহ লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা স্রেফ ইয়াদের ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য সিফাতের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। ফলে সেগুলোর অনুবাদও অবৈধ হওয়ার কথা।

বায়াযি লিখেছেন, ফারসিতে 'ইয়াদ' রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয় না, স্রেফ অঙ্গ অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু 'ওয়াজহ'সহ অন্যান্য শব্দ রূপক অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এ জন্য তিনি 'ইয়াদ' অনুবাদ করতে নিষেধ করেছেন।৬১৩ এটাও বাস্তবানুগ বক্তব্য নয়। ফারসিসহ অন্যান্য ভাষায় 'হাত' রূপক অর্থে আরবির মতোই ব্যবহৃত হয়, স্রেফ অঙ্গের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।

আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, 'ইয়াদ', 'আইন' এসব সিফাত অনারবি ভাষায় প্রয়োগ করা যাবে কি না? আহলে সুন্নাতের একদল আলেমের মতে, অঙ্গ না ভাবার শর্তে প্রয়োগ করা বৈধ। আরেক দল সতর্কতাবশত অবৈধ বলেছেন। (আমার কাছে) এটাই বিশুদ্ধ।৬১৪ কিন্তু উক্ত বক্তব্যের উপর আপত্তি করা যায়। কারণ, আরবিতে 'ইয়াদ' বলে যদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয় এমন বলতে হয় (যেটা আহলে সুন্নাতের সবাই বলেন, খোদ বাযদাবিও বলেছেন), এটাকে বাংলায় স্রেফ 'ইয়াদ'-এর বাংলা প্রতিশব্দ 'হাত' হিসেবে অনুবাদ করে 'অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয়' এমন সতর্কবাণী যোগ করে দিলেই হয়। ফলে আরবিতে যদি এটা বলা যায়, বাংলাসহ অন্যান্য ভাষায়ও অনুবাদ করতে পারা উচিত।

এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ কথা হলো, 'ইয়াদ'-কে 'হাত' বলার দ্বারা কেউ আল্লাহর ক্ষেত্রে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মনে করতে পারে এমন আশঙ্কা থাকলে তো প্রথমেই সেটা পরিত্যাজ্য। এমন আশঙ্কা থাকলে কেবল 'ইয়াদ' নয়, 'ওয়াজহ'-এর অনুবাদও নিষিদ্ধ। তবুও ইমাম স্বতন্ত্রভাবে 'ইয়াদ'-এর অনুবাদ নিষিদ্ধ করেছেন। খুব সম্ভবত এর একটি কারণ এমন হবে যে, ইমাম 'ইয়াদ'-এর ফারসি বা অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ হওয়ার পরে কিছু বিচ্যুতি (তাশবিহ/তাজসিম) দেখে থাকবেন। আরেকটা কারণ হতে পারে—যেমনটা আমরা পিছনে দেখেছি, সামনেও দেখব—বিভিন্ন সিফাতের ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিন থেকে একাধিক বক্তব্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সকল সিফাতে সকল সালাফের কর্মপদ্ধতি এক ছিল না। বিভিন্ন সিফাত তারা অর্থসহ ইসবাত (অর্থ সাব্যস্ত) করেছেন। অনেকে সিফাত তাফবিজ (অর্থ ও ধরন দুটোই আল্লাহর কাছে সমর্পণ) করেছেন। আবার কোনো কোনো সিফাত তাবিল (রূপকার্থে ব্যাখ্যা) করেছেন। কিন্তু 'ইয়াদ'-এর ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিন সবার বক্তব্য এক—এটাকে যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দিতে হবে। কেউ এটার কোনো তাবিল করেননি। ফলে সর্বোচ্চ তানযিহ (বিশুদ্ধ তাওহিদ) বাস্তবায়নের জন্য ইমাম এটার অনুবাদও নিষেধ করে দেন, যাতে তাশবিহ বা তাবিলের সকল পথ বন্ধ হয়ে যায়। একই কথা অনেক আলেম 'ইস্তিওয়া', 'নুযুল' ইত্যাদির ক্ষেত্রেও বলেছেন। উদ্দেশ্য কুরআনি শব্দের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা, সর্বোচ্চ তানযিহ বাস্তবায়ন করা। কারণ, সালাফ এসব সিফাত ভিন্ন ভাষায় উচ্চারণ করেননি। প্রয়োজন ছাড়া সেটা দরকারও নেই।

ফলে ইমাম আজম 'ইয়াদ'-এর অনুবাদ নিষেধ করেছেন বিশেষ প্রেক্ষাপটে, শর্তসাপেক্ষে। তাঁর বক্তব্য উন্মুক্ত ধরা যাবে না। কেউ আরবি ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় 'ইয়াদ'-এর অনুবাদ করলেই সেটা নিষিদ্ধ হবে এমন বোঝা যাবে না। বরং তাশবিহ-তাতিল নাকচ করে যেকোনো ভাষায় আল্লাহর সিফাতগুলোর অনুবাদ বৈধ। তবে উত্তম হলো কুরআনি শব্দের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা।

টিকাঃ
৬১১. আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৪৭৩)।
৬১২. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৯৩)। আদ-দুররুল আযহার (৫৯)।
৬১৩. ইশারাতুল মারাম (১৯১)।
৬১৪. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৩৯)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বের তাৎপর্য

📄 আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বের তাৎপর্য


ইমাম আজম রহ. বলেন, 'আল্লাহর নৈকট্য বা দূরত্ব (বস্তুগত) কাছে বা দূরে থাকার ভিত্তিতে নয়; এটা মর্যাদা ও অপমানের ভিত্তিতে। অনুগত বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী, ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে। আর অবাধ্য আল্লাহ থেকে দূরবর্তী, ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে। একইভাবে জান্নাতে আল্লাহর পাশে থাকা ধরন ব্যতিরেকে। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো ধরন ব্যতিরেকে।'৬১৫ ইমামের অনুসরণে মাতুরিদি বলেন, 'আল্লাহর নৈকট্য দূরত্ব ও জায়গার পরিমাপভিত্তিক নয়। কারণ, সেটা সীমারেখা ও স্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অথচ আল্লাহ তখন ছিলেন যখন স্থান ছিল না। তিনি এখনও তেমন আছেন। তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে। সকল স্থান, কাল, সীমারেখা তাঁর সৃষ্টি।'৬১৬

এখানেও ইমাম আজম রহ.-এর তানযিহের মানহাজ সুস্পষ্ট। তিনি এগুলোর 'বাহ্যিক' অর্থ গ্রহণের কথা বলে হিসসি/আক্ষরিক অর্থের উপর প্রয়োগ করেননি। মানুষ নৈকট্য ও দূরত্বের বিষয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে যেভাবে বোঝে, সেভাবে তিনি বোঝেননি। কেবল তিনি নন; সালাফের সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহর 'নৈকট্য' ও 'দূরত্ব' স্থানগত কিংবা দেহগত নয়; বরং জ্ঞান, ক্ষমতা, তত্ত্বাবধান, সওয়াব, অনুগ্রহ, মর্যাদা এমন নানা অর্থে প্রযোজ্য। মালেক, সুফিয়ান সাওরি, আহমদ ইবনে হাম্বল, তাবারি, ইবনুল জাওযি, বাগাভি, ইবনে আব্দিল বার, যাহাবি থেকে এসব অর্থ বর্ণিত হয়েছে।৬১৭

একদল লোক আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছেন। ফলে তারা মনে করেন, 'আল্লাহ আরশের উপর অবস্থান করছেন। যে যত উপরের দিকে উঠবে, সে দৈহিকভাবে তত আল্লাহর কাছে যেতে পারবে। ফলে ফেরেশতাগণ আল্লাহর সবচেয়ে কাছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মিরাজের রাতে যখন ঊর্ধ্বজগতে গিয়েছিলেন, তখন আল্লাহর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন।' এমন আকিদা সঠিক নয়। কারণ, এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণ করলে আল্লাহর শানে অনেক অশোভন বিষয় প্রয়োগ করতে হয়, যা বৈধ নয়। প্রসিদ্ধ হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন : 'ফরয ইবাদতের চেয়ে অন্য কিছুর মাধ্যমে বান্দা আমার কাছাকাছি আসতে পারে না। তবে বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার কাছে আসতে থাকে, একপর্যায়ে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।'৬১৮ এখানে খেয়াল করুন, কেউ নফল ইবাদত করলে উপরের দিকে উঠে যায় এমন নয়। বরং ইবাদতকারী ব্যক্তি কিংবা ইবাদত থেকে গাফেল ব্যক্তি উভয়েই একই পৃথিবীতে একই দূরত্বে থাকে। বোঝা গেল, নৈকট্য-দূরত্ব অর্থ আক্ষরিক নয়।

আরেকটি হাদিসে এসেছে, 'বান্দা সিজদা অবস্থায় আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। সুতরাং তোমরা সে সময়ে বেশি দোয়া করো।'৬১৯ অন্য হাদিসে এসেছে, 'বান্দা যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক বিঘত এগিয়ে যাই। সে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে এলে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। সে আমার দিকে হেঁটে এলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।'৬২০ এখানেও এক বিঘত এবং এক হাত এগিয়ে আসা, দৌড়ানো ইত্যাদি শব্দ মহান আল্লাহর উপর আক্ষরিক অর্থে প্রয়োগ করা হবে না। কারণ, তিনি সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে পবিত্র। বরং এগুলো আধ্যাত্মিক নৈকট্য, বান্দার প্রতি আল্লাহর মনোযোগ ও অনুগ্রহ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

মোটকথা, আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্ব আক্ষরিক ও শারীরিক অর্থে নয়। কারণ, ইমাম আজমসহ সালাফ এগুলোর আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করেননি। আবার এসব শব্দ সর্বত্র উন্মুক্ত তাবিলও করা যাবে না। কারণ বিভিন্ন হাদিসে আল্লাহর 'নৈকট্য' অত্যন্ত নিগূঢ় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যার তাৎপর্য উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য। উদাহরণত হাদিসে এসেছে, 'শেষ রাতে আল্লাহ বান্দার সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসেন'৬২১, আরেক হাদিসে এসেছে, 'আরাফার দিন তিনি বান্দাদের কাছে চলে আসেন'৬২২, অন্য হাদিসে এসেছে, 'তোমাদের কেউ নামাযে দাঁড়িয়ে যেন সামনের দিকে থুতু না ফেলে। কারণ নামাযের সময় আল্লাহ সামনের দিকে থাকেন'!৬২৩ আরেক হাদিসে এসেছে, 'কিয়ামতের দিন মুমিনকে আল্লাহর কাছে আনা হবে...'।৬২৪ এসব হাদিসে আল্লাহর নৈকট্যকে পূর্বোক্ত নির্দিষ্ট কোনো (রূপক) অর্থে প্রয়োগ করা কঠিন। বরং এগুলো নিগূঢ় মর্ম তিনিই ভালো জানেন। এ জন্য ইমাম আশআরি রহ. লিখেছেন, 'আল্লাহ বান্দার কাছাকাছি আসেন যেভাবে ইচ্ছা করেন। ধরন ব্যতিরেকে' (বিলা কাইফিন)।৬২৫ ইমাম আজমেরও একই বক্তব্য। তাঁর ব্যবহৃত ‘ধরন ব্যতিরেকে' (বিলা কাইফিন) শব্দটা এর গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

টিকাঃ
৬১৫. আল-ফিকহুল আকবার (৭-৮)।
৬১৬. আত-তাওহিদ (৭৯)।
৬১৭. দেখুন: তাফসিরে তাবারি (২১/৪২২)। আল-আরবাঈন, যাহাবি (৬৫)।
৬১৮. বুখারি (৬৫০২)। মুসনাদে আহমদ (২৬৮৩৪)।
৬১৯. মুসলিম (৪৮২)। আবু দাউদ (৮৭৫)।
৬২০. বুখারি (৭৫৩৬)। মুসলিম (২৬৭৫)।
৬২১. তিরমিযি (৩৫৭৯)। নাসায়ি (৭/৫৭১)।
৬২২. মুসলিম (১৩৪৮)। ইবনে মাজা (৩০১৪)।
৬২৩. বুখারি (৪০৬)। মুসলিম (৫৪৭)।
৬২৪. বুখারি (৪৬৮৫)। মুসলিম (২৭৬৮)।
৬২৫. আল-ইবানাহ, আশআরি (৩০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সিফাতের ক্ষেত্রে খালাফ তথা পরবর্তীদের বিচ্যুতি

📄 সিফাতের ক্ষেত্রে খালাফ তথা পরবর্তীদের বিচ্যুতি


সিফাতের ক্ষেত্রে ইমামের মাযহাব সুস্পষ্ট। এর সারমর্ম হলো : এগুলোকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য দেওয়া যাবে না। আবার কল্পিত সাদৃশ্যের দোহাই দিয়ে অস্বীকারও করা যাবে না। ইমাম আজম রহ. এই দুই প্রান্তিকতা এবং এগুলোর পতাকাবাহী তথা জাহম ইবনে সাফওয়ান ও মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা জাহম ইবনে সাফওয়ান ও মুকাতিল ইবনে সুলাইমানকে ধ্বংস করে দিন। প্রথমটা অস্বীকারের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে, দ্বিতীয়টা সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে।'৬২৬ অন্য বর্ণনায় এসেছে, ইমাম বলেন, 'মুকাতিল সিফাত সাব্যস্তের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহকে সৃষ্টির মতো বানিয়ে দিয়েছে।'৬২৭ যাহাবির বর্ণনামতে, ইমাম আজম বলেছেন, 'প্রাচ্য থেকে আমাদের কাছে দুটো নিকৃষ্ট মতবাদ এসেছে—এক. সিফাত অস্বীকারকারী জাহম, দুই. সাদৃশ্যবাদী মুকাতিল।'৬২৮ অন্য বর্ণনায় বলেন, ‘আমরা জাহমের মতো আল্লাহর সিফাত থেকে পলায়ন করি না; আবার মুকাতিল আল্লাহর ব্যাপারে যা বলেছে তা বলি না।'৬২৯ ফলে ইমামের মাযহাব এই দুটোর মাঝামাঝি। এটাই আহলে সুন্নাতের মাযহাব।

ইমামের অনুসরণে তহাবি বলেন, 'দ্বীনের ক্ষেত্রে সে ব্যক্তিই নিরাপদে থাকে, যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি আত্মসমর্পণ করে এবং যা জানে না (সে ব্যাপারে কথা বলা পরিত্যাগ করে) যিনি জানেন তাঁর জন্যই ছেড়ে দেয়।' অন্যত্র বলেন, 'আল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয় বোঝার একমাত্র বিশুদ্ধ পন্থা হচ্ছে, অপব্যাখ্যা (তাবিল) বর্জন এবং আত্মসমর্পণ। এই আত্মসমর্পণের উপরই দাঁড়িয়ে আছে সকল রাসুলের দ্বীন, নবির শরিয়ত এবং মুসলমানের দ্বীনদারি। সুতরাং যে ব্যক্তি এসব ক্ষেত্রে অস্বীকার কিংবা (সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার) সাদৃশ্যকরণ থেকে বেঁচে না থাকবে, তার পদস্খলন ঘটবে এবং বিশুদ্ধ তাওহিদ (তানযিহ) পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। কারণ, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের একত্ববাদের গুণে গুণান্বিত, অদ্বিতীয়ের বিশেষণে বিশেষিত, সৃষ্টির কেউ সেসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়।' অন্যত্র ইমাম তহাবি বলেন, 'আত্মসমর্পণ এবং বশ্যতা স্বীকার ব্যতীত ইসলামে কারও অবস্থান অবিচল হতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন বিষয় জানতে যাবে যেগুলো জানা তার পক্ষে সম্ভব নয় এবং এক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করে তুষ্ট থাকবে না, সে নির্ভেজাল তাওহিদ, সুনির্মল জ্ঞান এবং বিশুদ্ধ ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে। কুফর ও ঈমান, সত্যায়ন ও মিথ্যায়ন, স্বীকার ও অস্বীকৃতির দোলাচলে দোদুল্যমান থাকবে। সন্দেহ নিয়ে পথভ্রষ্টের মতো উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকবে; না হবে সত্যায়নকারী মুমিন, না মিথ্যা প্রতিপন্নকারী কাফের।'৬৩০

টিকাঃ
৬২৬. ফাযায়িলু আবি হানিফা (১২৪)। আল-জাওয়াহিরুল মুযিআহ (১/৩১)।
৬২৭. মিযানুল ইতিদাল (৪/৩৭৫)।
৬২৮. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/২০২)।
৬২৯. আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (১০৭)।
৬৩০. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১৩, ১৪, ১৫)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সালাফের তাবিল আর খালাফের তাবিলের মাঝে পার্থক্য কী?

📄 সালাফের তাবিল আর খালাফের তাবিলের মাঝে পার্থক্য কী?


প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কি তাবিল পুরোপুরি নিষিদ্ধ? আমরা বলব, কখনোই নয়। সালাফে সালেহিন থেকে একাধিক সিফাতের তাবিল পাওয়া গিয়েছে। কারণ, যেসব জায়গায় তাবিল করা সম্ভব, সেখানে তারা তাবিল করেছেন। যেখানে সম্ভব নয় কিংবা অনুমোদিত নয়, সেখানে করেননি। বরং অনেক জায়গায় তাবিল করতে সরাসরি নিষেধ করেছেন। তাই পরবর্তী লোকদের কর্তব্য হলো সালাফে সালেহিনের পথে থাকা। যেখানে তারা তাবিল করেছেন, সেখানে করা। তারা যেখানে করেননি, সেখানে না করা। বিষয়টি আরেকটু খুলে বলা যাক।

কুরআনের কিছু কিছু শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করার ব্যাপারে সকল সালাফ একমত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴿ নَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ ﴾ অর্থ : 'তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, আল্লাহও তাদের ভুলে গেছেন।' [তাওবা : ৬৭] এখানে আল্লাহর ভুলে যাওয়ার অর্থ হলো তাদের পরিত্যাগ করা, নিজেদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেওয়া; মানুষের মতো ভুলে যাওয়া নয়। আল্লাহর বাণী, 'তোমরা তাদের হত্যা করোনি, বরং আল্লাহ তাদের হত্যা করেছেন। (হে রাসুল) আপনি যখন নিক্ষেপ করেছেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি, বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন।' [আনফল : ১৭] এখানে আল্লাহ বলছেন, (বদরযুদ্ধে) তিনি কাফেরদের হত্যা করেছেন; মুসলমানরা করেনি। তিনি মাটি নিক্ষেপ করেছেন; রাসুলুল্লাহ (ﷺ) করেননি। অথচ সকল মুফাসসির এ ব্যাপারে একমত যে, মুসলমানরাই হত্যা করেছেন, আল্লাহ নিজে করেননি। রাসুলুল্লাহই হাতে মাটি নিয়ে কাফেরদের দিকে ছুড়েছেন; আল্লাহ তায়ালা নিজে ছোড়েননি। হ্যাঁ, যেহেতু এগুলা সম্পন্ন হয়েছে আল্লাহর শক্তি ও তৌফিকে, তাই তাঁর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী : 'জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যবর্তী হয়ে যান।' [আনফাল : ২৪]৬৯২ এখানে সর্বসম্মতিক্রমে এর অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অবস্থান নেন, বরং মানুষের হৃদয় আল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে বোঝানো উদ্দেশ্য।৬৯৩

'আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি অপেক্ষাও নিকটতর।' [কাফ : ১৬] এখানে মানুষের ঘাড়ের কাছে সত্তাগতভাবে আল্লাহর থাকা উদ্দেশ্য নয়; সবকিছু সম্পর্কে অবগতি ও নিয়ন্ত্রণ উদ্দেশ্য। একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী, 'তিনি আকাশে ইলাহ, যমিনেও ইলাহ।' [যুখরুফ : ৮৪] এখানে আকাশ ও যমিনে আল্লাহর সত্তাগত বিদ্যমানতা উদ্দেশ্য নয়; বরং আকাশ ও যমিনের সর্বত্র তাঁর উলুহিয়্যাত এবং তিনিই যে ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত সে চিরসত্য ঘোষণা করা উদ্দেশ্য।৬৯৩

'স্মরণ করুন সেই দিনের কথা, যেদিন পায়ের গোছা উন্মোচিত করা হবে। সেদিন এদের আহ্বান করা হবে সিজদা করার জন্য। কিন্তু এরা সক্ষম হবে না।' [কলম : ৪২] এখানে ইবনে আব্বাস রাযি., মুজাহিদ, যাহহাক, সাইদ ইবনে যুবাইর, কাতাদাসহ উম্মাহর প্রথম সারির সাহাবি ও তাবেয়ি ব্যাখ্যাতাদের মতে, আল্লাহর 'পায়ের গোছা' উদ্দেশ্য নয়; বরং কিয়ামতের ভয়াবহতা উদ্দেশ্য।৬৯৪ একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী, 'আপনার পালনকর্তা আর ফেরেশতারা আসবেন কাতারে কাতারে।' [ফজর: ২২] ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত আছে, তিনি এখানে 'আল্লাহর আগমন'-কে 'সওয়াব আগমন' দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন। ইমাম বাইহাকি বলেন, এটার সনদে কোনো অস্পষ্টতা নেই।৬৯৫ আল্লাহ তায়ালার বাণী, 'তারা কি এ জন্য অপেক্ষা করছে যে, তাদের কাছে ফেরেশতারা এসে পড়বে। কিংবা আপনার পালনকর্তা আসবেন অথবা তাঁর কিছু নিদর্শন এসে পড়বে?' [আনআম : ১৫৮] ইবনে আব্বাস ও যাহহাকের মতে, এখানে 'আল্লাহর আগমন' বলতে তাঁর নির্দেশ আগমন উদ্দেশ্য।৬৯৬ একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী, 'তাঁর কুরসি আকাশমণ্ডলী ও জমিন পরিবেষ্টন করে রয়েছে।' [বাকারা: ২৫৫] এখানে ইবনে আব্বাস, সাইদ ইবনে যুবাইর থেকে 'কুরসি'র তাবিল বর্ণিত আছে, 'ইলম' তথা জ্ঞান। অর্থাৎ, তিনি সর্বজ্ঞানী। সবকিছু জানেন।৬৯৭

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর দোয়া 'হে আল্লাহ, আপনি আমার গুনাহগুলো পানি, বরফ ও শিলা দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।'৬৯৮ এখানে সর্বসম্মতিক্রমে হাদিসের উদ্দেশ্য প্রকৃত অর্থেই ধোয়া নয়; বরং ক্ষমা করা। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর অন্য একটি হাদিসে এসেছে, (আল্লাহ তায়ালা বলেন) ‘যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’ তিরমিযি উক্ত হাদিসটি বর্ণনার পর বলেন, ‘আ’মাশ থেকে উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘ক্ষমা’ ও ‘অনুগ্রহ’ দিয়ে। অন্য আলেমরাও উক্ত হাদিসকে এভাবে ব্যাখ্যা (তাফসির) করেছেন। তাদের মতে, (এগিয়ে আসা বা কাছাকাছি আসার) অর্থ হলো, ‘বান্দা যখন ইবাদত ও আমার নির্দেশ পালনের মাধ্যমে আমার কাছাকাছি আসে, আমি দ্রুত তাকে ক্ষমা করে দিই এবং অনুগ্রহ করি’ (অর্থাৎ বস্তুগত নৈকট্য ও দূরত্ব উদ্দেশ্য নয়)।৬৯৯

বরং আল্লাহর নুযুল যা ইমাম আজম থেকেও যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, ইমাম মালেক ও ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর সেটার তাবিল করেছেন।৭০০ এমনকি খোদ ইমাম আজম রহ. আল্লাহর ‘নফস’, ‘ইয়াদ’, ‘ওয়াজহ’, ‘ইস্তিওয়া’ ও ‘নুযুল’ ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাবিল না করলেও আমরা দেখব আল্লাহর ‘নৈকট্য’ (কুরব) এবং ‘দূরত্ব’ (বুদ) ইত্যাদির কিছু ক্ষেত্রে একরকম রূপক ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর নৈকট্য বা দূরত্ব (বস্তুগত) কাছে বা দূরে থাকার ভিত্তিতে নয়। এটা মর্যাদা ও অপমানের ভিত্তিতে। অনুগত বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী, ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে। অবাধ্য আল্লাহ থেকে দূরবর্তী, ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে। একইভাবে জান্নাতে আল্লাহর পাশে থাকা ধরন ব্যতিরেকে। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো ধরন ব্যতিরেকে।’৭০১

ফলে তাবিলকে একবাক্যে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে যে বিষয়টি খুব ভালোভাবে বোঝা আবশ্যক সেটা হলো—ইমাম আজম ও সালাফে সালেহিন থেকে বর্ণিত এসব তাবিলের সংখ্যা খুবই সীমিত। কারণ, সালাফ উন্মুক্তভাবে সকল সিফাতের তাবিল করেননি। এ কারণে ইমাম আজম রহ. এবং হানাফি মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় ইমামদের থেকেও বর্ণিত তাবিল সংখ্যা নিতান্তই কম। হাতেগোনা কয়েকটা। এটা বৃদ্ধি পায় পরবর্তী সময়ে। মাহমুদ ইবনে যায়েদ লামিশি (৫২২ হি.) লিখেন, 'আমাদের অসংখ্য বড় মাশায়েখ থেকে বর্ণিত আছে—আমরা (আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে) সেগুলা যেভাবে এসেছে সেভাবে বিশ্বাস রাখব। তাবিলে লিপ্ত হব না। আর কিছু কিছু মাশায়েখ থেকে বর্ণিত আছে—শব্দের জন্য প্রযোজ্য কোনো তাবিল করা।'৭০২ সুতরাং কিছু মাশায়েখের পথ ছেড়ে প্রথম যুগের অসংখ্য ও বড় মাশায়েখের পথে চলা যে উত্তম, সেটা বলা বাহুল্য। তা ছাড়া, পিছনেও যেটা বলা হয়েছে—এ দরজা উন্মুক্ত রাখলে এর গন্তব্য নেই, শেষ মঞ্জিল নেই। ফলে এটাকে শুরুতেই রুদ্ধ রাখতে হবে। আর সেটার সীমারেখা হলো সালাফের মাযহাব। তারা যতটুকুতে সীমাবদ্ধ থেকেছেন আমরাও ততটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকব। তারা যেখানে তাবিল করেছেন, আমরা সেখানে করব। তারা যেখানে করেননি বা নিষেধ করেছেন, আমরা সেখানে করব না। সালাফের অনুসারী দাবির প্রতি এটা ন্যূনতম সুবিচার। ইমাম আজম বলেন, 'কারও জন্য তার নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহর ব্যাপারে কিছু বলা বৈধ নয়। বরং মানুষের কর্তব্য হলো, আল্লাহর জন্য সেগুলাই সাব্যস্ত করা যা তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন; তাঁর ব্যাপারে মনগড়া কোনো বক্তব্য না দেওয়া। বড় মহান বরকতময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা।'৭০৩

টিকাঃ
৬৯২. তাফসিরে তাবারি (১৩/৪৭১)।
৬৯৩. প্রাগুক্ত (১৬/১২১)।
৬৯৪. তাফসিরে তাবারি (২৩/৫৫৫)।
৬৯৫. দেখুন: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১৪/৩৮৬)।
৬৯৬. তাফসিরে কুরতুবি (৭/১৪৪)।
৬৯৭. তাফসিরে তাবারি (৫/৩৯৭)।
৬৯৮. বুখারি (কিতাবুল আজান: ৭৪৪)। ইবনে মাজা (আবওয়াবু ইকামাতিস সালাত: ৮০৫)।
৬৯৯. তিরমিযি (আবওয়াবুদ দা‘আওয়াত আন রাসুলিল্লাহ : ৩৯৩০)।
৭০০. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৮/১০৫)।
৭০১. আল-ফিকহুল আকবার (৭-৮)।
৭০২. আত-তামহিদ (৫৮-৫৯, ৮৪-)।
৭০৩. দেখুন: আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (৮৯)। আল-উসুলুল মুনিফাহ (১৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00