📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 তাশবিহ ও তাতিলের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজ

📄 তাশবিহ ও তাতিলের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজ


সিফাতের ক্ষেত্রে আবু হানিফা রহ. এবং সালাফে সালেহিনের মানহাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, তাশবিহ (সাদৃশ্য) ও তাতিল (নাকচ)-এর মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজ। ফলে তারা কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত সিফাতগুলোকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করলেও সেগুলো সাব্যস্তের নামে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহকে সৃষ্টিসদৃশ বানিয়ে দেননি, যেমনটা দেহবাদী ও সাদৃশ্যবাদীরা করেছে। আবার তারা সৃষ্টির সঙ্গে আল্লাহর সাদৃশ্যের ভয়ে সিফাতকে নাকচ করেননি, যেমনটা জাহমিয়‍্যাহ ও মুতাযিলারা করেছে। বরং তারা এর বাস্তবতা ও মৌলিকত্বের উপর বিশ্বাস রাখেন। কিন্তু নিগূঢ় মর্ম, ধরন ও স্বরূপ আল্লাহর কাছে সঁপে দেন। অন্যকথায়, তারা সিফাতকে যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দেন। এগুলোতে বিশ্বাস রাখেন, গ্রহণ করেন। কিন্তু এগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি অপছন্দ করেন। এটাই সালাফে সালেহিনের প্রতিষ্ঠিত মানহাজ। ইমাম আজম রহ. থেকে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন: “আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো 'তাশবিহ' ও 'তাতিল'-মুক্ত বিশুদ্ধ তাওহিদ।” ৫৯৫

তিরমিযি আল্লাহর সিফাতসংক্রান্ত হাদিসের আলোচনায় বলেন, “সুফিয়ান সাওরি, মালেক ইবন আনাস, ইবনুল মুবারক, ইবনে উয়াইনাহ, ওয়াকিসহ এ ব্যাপারে সকল ইমামের মাযহাব হলো: এসব হাদিস বর্ণনা করা হবে। আমরা এগুলোতে ঈমান রাখব। কিন্তু 'কীভাবে' এমন প্রশ্ন করা যাবে না। সকল মুহাদ্দিসের মতামতও তা-ই—এসব হাদিস যেভাবে এসেছে সেভাবে বর্ণনা করা হবে। এগুলোর উপর ঈমান আনতে হবে। কিন্তু এগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে না। অনুমান করা যাবে না। 'কীভাবে' এমন প্রশ্ন করা যাবে না।” ৫৯৬

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা নিজের ব্যাপারে কুরআনে যা বলেছেন, সেগুলা পড়াই তার তাফসির। আরবি কিংবা ফারসিতে সেগুলা ব্যাখ্যা করা কারও জন্য বৈধ নয়।' ৫৯৭

ইমাম আজম রহ. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালার সকল সিফাত (গুণ) মাখলুকের সিফাতের (গুণ) চেয়ে ভিন্ন। তিনি জানেন; কিন্তু আমাদের জানার মতো নয়। তিনি শক্তি রাখেন; কিন্তু আমাদের শক্তির মতো নয়। তিনি দেখেন; তবে আমাদের দেখার মতো নয়। তিনি কথা বলেন; তবে আমাদের কথা বলার মতো নয়। তিনি শোনেন; তবে আমাদের শোনার মতো নয়।' ৫৮৮

অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালার (সত্তাগত ও কর্মগত) সকল গুণ সৃষ্টি থেকে আলাদা। 'তিনি জানেন; কিন্তু আমাদের জানার মতো নয়।' কারণ, আমাদের জ্ঞান নবসৃষ্ট; ধারণা, অনুমান ও কল্পনানির্ভর; উপার্জিত। অপরদিকে আল্লাহর জ্ঞান চিরন্তন; মহাসত্য ও চূড়ান্ত। সবকিছু তাঁর সামনে উদ্ভাসিত। 'তিনি শক্তি রাখেন; কিন্তু আমাদের শক্তির মতো নয়।' কারণ, আল্লাহর শক্তি চিরন্তন, স্থায়ী। আমাদেরটা নবসৃষ্ট, অস্থায়ী। আমাদের ক্ষমতা সীমিত। তাও বিভিন্ন উপায়-উপকরণ, সহায়-সাহায্য ও যন্ত্রপাতিনির্ভর। আল্লাহর ক্ষমতা এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সকল উপায়-উপকরণ ও সাহায্যসহযোগিতার অমুখাপেক্ষী। 'তিনি দেখেন; তবে আমাদের দেখার মতো নয়।' কারণ, আমাদের দেখতে হলে উপকরণ লাগে, অনুকূল পরিস্থিতি লাগে। উপরন্তু আমাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ। অথচ আল্লাহ তায়ালা সবকিছু দেখেন। তাঁর দেখতে কোনো উপকরণ লাগে না, স্থান-কালের আনুকূল্য লাগে না। দিক ও মুখোমুখি হওয়া লাগে না। 'তিনি কথা বলেন; তবে আমাদের কথা বলার মতো নয়।' এক্ষেত্রে পার্থক্য স্বয়ং ইমাম আজম নিজেই উল্লেখ করেছেন। এভাবে যখন প্রত্যেকটা সিফাতকে বোঝা হবে, তখন বিতর্ক হয় না। বিচ্যুতি আসে না। সাদৃশ্যের ভয়ে তাবিল (রূপক ব্যাখ্যা) কিংবা তাহরিফ (বিকৃতিসাধন) করতে হয় না।

সাদৃশ্যের কথা চিন্তা করতে গেলে এমন অনেক সিফাতই মানুষের সঙ্গে মিলে যায়। তাই বলে সেগুলো অস্বীকার কিংবা তাবিল করা যাবে? না, করা যাবে না। কারণ, সাদৃশ্যটা স্রেফ শাব্দিক; মৌলিক সাদৃশ্য নয়। তাই সাদৃশ্যের অজুহাতে সিফাতগুলো নাকচ করা যাবে না, আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল বলেননি এমন কোনো শব্দে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বরং যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দিতে হবে।

ইমাম সিফাতের ক্ষেত্রে জাহমিয়্যাহদের বিকৃতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। জারুদ ইবনে ইয়াযিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হানিফা রহ.-কে বলতে শুনেছি, “জাহম সব সিফাতকে অস্বীকার করেছে। ফলে একপর্যায়ে আল্লাহকে 'কিছু না' (লা শাইউন) বানিয়ে দিয়েছে! কুরআনের উপর রাগ দেখিয়েছে (তাতে আল্লাহর সিফাত থাকার কারণে)!” জারুদ ইমামকে বললেন, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী? তিনি বললেন, "আল্লাহ তায়ালা কুরআনে যা-কিছু বলেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে যা-কিছু বর্ণিত, আমি তা-ই বলি।” ৫৯৯

তাশবিহ ও তাতিলের মাঝে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় ইমাম বলেন, 'সৃষ্টির কোনো বৈশিষ্ট্য (তথা সিফাত)-কে আল্লাহর উপর আরোপ করা যাবে না। তাঁকে সৃষ্টির কোনো বিশেষণে বিশেষিত করা যাবে না। তাঁর ক্রোধ ও সন্তুষ্টি তাঁর দুটো সিফাত। কোনো ধরন বা স্বরূপ ছাড়াই সেটা বিশ্বাস করতে হবে। এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা। আল্লাহ ক্রুদ্ধ হন এবং সন্তুষ্ট হন। তাঁর ক্রোধকে শাস্তি এবং সন্তুষ্টিকে পুরস্কার ইত্যাদি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বরং তিনি নিজের ব্যাপারে যা বলেছেন আমরাও তা-ই বলব। তিনি অমুখাপেক্ষী। সবাই তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি। কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি চিরঞ্জীব। চিরজাগ্রত তত্ত্বাবধায়ক। তিনি সবকিছু শোনেন। সবকিছু দেখেন। সবকিছু জানেন। বান্দার হাতের উপর আল্লাহর হাত (ইয়াদ) রয়েছে। কিন্তু সেগুলা সৃষ্টির হাতের মতো নয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয়। কারণ, তিনি সকল হাতের সৃষ্টিকর্তা। একইভাবে তাঁর চেহারাও (ওয়াজহ) সৃষ্টির কোনো চেহারার মতো নয়। কারণ, তিনিই সকল চেহারার সৃষ্টিকর্তা। তাঁর নফস সৃষ্টির কোনো নফসের মতো নয়। কারণ, তিনি সকল নফসের সৃষ্টিকর্তা। তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা। সর্বদ্রষ্টা। ৬০০

ইমাম রহ. আল-ফিকহুল আকবারেও বিষয়টির প্রতি তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ তায়ালার 'ইয়াদ' (হাত), 'ওয়াজহ' (চেহারা) এবং 'নফস' (সত্তা) রয়েছে, যেভাবে কুরআনে এসেছে সেভাবে। এটা বলা যাবে না যে, তাঁর 'ইয়াদ' (হাত) তাঁর কুদরত ও নেয়ামত। কারণ, এভাবে বললে তাঁর সিফাতকে বাতিল করে দেওয়া হয়। আর এটা কাদারিয়্যা ও মুতাযিলাদের বক্তব্য। বরং 'ইয়াদ' (হাত) তাঁর একটি সিফাত, ধরন নেই। 'গাযাব' (ক্রোধ) ও 'রিযা' (সন্তুষ্টি) আল্লাহর দুটি সিফাত, ধরন নেই।” ৬০১ ইমাম তহাবি রহ. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা রাগ করেন। তিনি সন্তুষ্ট হন; কিন্তু তাঁর রাগ ও সন্তুষ্টি সৃষ্টিজীবের মতো নয়।' ৬০২

বরং তাবিল নাকচ এবং সর্বোচ্চ তানযিহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইমাম আজম রহ. আল্লাহর কিছু সিফাতের অনুবাদ করতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, “উলামায়ে কেরাম ফারসি ভাষায় আল্লাহর যেসব সিফাতের উল্লেখ করেছেন, সেগুলা বলা বৈধ। ব্যতিক্রম 'ইয়াদ' (হাত)। ফারসিতে এটার অনুবাদ করা যাবে না। ফলে 'বরুয়ে খোদা' (আল্লাহর চেহারা) বলা যাবে। সাদৃশ্য ও ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে।” ৬১০

টিকাঃ
৫৯৫. তালখিসুল আদিল্লাহ (৩৯৯-৪০০)।
৫৯৬. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল জান্নাহ : ২৫৫৭ হাদিসসংক্রান্ত আলোচনা)।
৫৯৭. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৭০)।
৫৯৯. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (৯২)।
৬০০. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৬-৫৭)। ইতিকাদ, নিশাপুরি (৯০)।
৬০১. আল-ফিকহুল আকবার (৩)।
৬০২. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৫)।
৬১০. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ‘ইয়াদ’ কি আসলেই অনুবাদ করা যাবে না?

📄 ‘ইয়াদ’ কি আসলেই অনুবাদ করা যাবে না?


প্রশ্ন হলো, বাস্তবেই কি 'ইয়াদ' শব্দ ফারসি তথা অনারবি ভাষায় অনুবাদ করা যায় না? অন্যকথায়, আমরা আল্লাহর 'ওয়াজহ'-কে 'চেহারা', 'কাদাম'-কে 'পা', 'নফস'-কে 'সত্তা' হিসেবে অনুবাদ করতে পারলেও 'ইয়াদ'-কে 'হাত' হিসেবে অনুবাদ করতে পারব না?

বিষয়টি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। বিভিন্ন আলেম বিভিন্নভাবে উত্তর দিয়েছেন। হাফিজুদ্দিন নাসাফি বলেন, 'ওয়াজহ', 'ইয়াদ', 'আইন'... ইত্যাদির কোনোটাই তাবিল ব্যতীত ফারসি (তথা অনারবি ভাষায় অনুবাদ করে) আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা বৈধ নয়।৬১১ কিন্তু উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, অন্য ভাষায় কুরআনের অনুবাদ করতে গেলে শাব্দিক অর্থ অনুবাদের বিকল্প নেই।

মোল্লা আলি কারি বলেন, 'ইয়াদ' তাবিল না করার ব্যাপারে সালাফ একমত হয়েছেন। যেহেতু ইমাম মনে করতেন, যদি অন্যান্য সিফাতের মতো এটাকেও অন্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়, তবে তানযিহ লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, তাশবিহ ও তাবিল ঢুকে যেতে পারে, তাই তিনি এটাকে অনুবাদ করতেও নিষেধ করেছেন।৬১২ সালাফ ইয়াদের তাবিল করতে নিষেধ করেছেন—এটা সঠিক বক্তব্য। কিন্তু তানযিহ লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা স্রেফ ইয়াদের ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য সিফাতের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। ফলে সেগুলোর অনুবাদও অবৈধ হওয়ার কথা।

বায়াযি লিখেছেন, ফারসিতে 'ইয়াদ' রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয় না, স্রেফ অঙ্গ অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু 'ওয়াজহ'সহ অন্যান্য শব্দ রূপক অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এ জন্য তিনি 'ইয়াদ' অনুবাদ করতে নিষেধ করেছেন।৬১৩ এটাও বাস্তবানুগ বক্তব্য নয়। ফারসিসহ অন্যান্য ভাষায় 'হাত' রূপক অর্থে আরবির মতোই ব্যবহৃত হয়, স্রেফ অঙ্গের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।

আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, 'ইয়াদ', 'আইন' এসব সিফাত অনারবি ভাষায় প্রয়োগ করা যাবে কি না? আহলে সুন্নাতের একদল আলেমের মতে, অঙ্গ না ভাবার শর্তে প্রয়োগ করা বৈধ। আরেক দল সতর্কতাবশত অবৈধ বলেছেন। (আমার কাছে) এটাই বিশুদ্ধ।৬১৪ কিন্তু উক্ত বক্তব্যের উপর আপত্তি করা যায়। কারণ, আরবিতে 'ইয়াদ' বলে যদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয় এমন বলতে হয় (যেটা আহলে সুন্নাতের সবাই বলেন, খোদ বাযদাবিও বলেছেন), এটাকে বাংলায় স্রেফ 'ইয়াদ'-এর বাংলা প্রতিশব্দ 'হাত' হিসেবে অনুবাদ করে 'অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয়' এমন সতর্কবাণী যোগ করে দিলেই হয়। ফলে আরবিতে যদি এটা বলা যায়, বাংলাসহ অন্যান্য ভাষায়ও অনুবাদ করতে পারা উচিত।

এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ কথা হলো, 'ইয়াদ'-কে 'হাত' বলার দ্বারা কেউ আল্লাহর ক্ষেত্রে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মনে করতে পারে এমন আশঙ্কা থাকলে তো প্রথমেই সেটা পরিত্যাজ্য। এমন আশঙ্কা থাকলে কেবল 'ইয়াদ' নয়, 'ওয়াজহ'-এর অনুবাদও নিষিদ্ধ। তবুও ইমাম স্বতন্ত্রভাবে 'ইয়াদ'-এর অনুবাদ নিষিদ্ধ করেছেন। খুব সম্ভবত এর একটি কারণ এমন হবে যে, ইমাম 'ইয়াদ'-এর ফারসি বা অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ হওয়ার পরে কিছু বিচ্যুতি (তাশবিহ/তাজসিম) দেখে থাকবেন। আরেকটা কারণ হতে পারে—যেমনটা আমরা পিছনে দেখেছি, সামনেও দেখব—বিভিন্ন সিফাতের ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিন থেকে একাধিক বক্তব্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সকল সিফাতে সকল সালাফের কর্মপদ্ধতি এক ছিল না। বিভিন্ন সিফাত তারা অর্থসহ ইসবাত (অর্থ সাব্যস্ত) করেছেন। অনেকে সিফাত তাফবিজ (অর্থ ও ধরন দুটোই আল্লাহর কাছে সমর্পণ) করেছেন। আবার কোনো কোনো সিফাত তাবিল (রূপকার্থে ব্যাখ্যা) করেছেন। কিন্তু 'ইয়াদ'-এর ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিন সবার বক্তব্য এক—এটাকে যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দিতে হবে। কেউ এটার কোনো তাবিল করেননি। ফলে সর্বোচ্চ তানযিহ (বিশুদ্ধ তাওহিদ) বাস্তবায়নের জন্য ইমাম এটার অনুবাদও নিষেধ করে দেন, যাতে তাশবিহ বা তাবিলের সকল পথ বন্ধ হয়ে যায়। একই কথা অনেক আলেম 'ইস্তিওয়া', 'নুযুল' ইত্যাদির ক্ষেত্রেও বলেছেন। উদ্দেশ্য কুরআনি শব্দের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা, সর্বোচ্চ তানযিহ বাস্তবায়ন করা। কারণ, সালাফ এসব সিফাত ভিন্ন ভাষায় উচ্চারণ করেননি। প্রয়োজন ছাড়া সেটা দরকারও নেই।

ফলে ইমাম আজম 'ইয়াদ'-এর অনুবাদ নিষেধ করেছেন বিশেষ প্রেক্ষাপটে, শর্তসাপেক্ষে। তাঁর বক্তব্য উন্মুক্ত ধরা যাবে না। কেউ আরবি ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় 'ইয়াদ'-এর অনুবাদ করলেই সেটা নিষিদ্ধ হবে এমন বোঝা যাবে না। বরং তাশবিহ-তাতিল নাকচ করে যেকোনো ভাষায় আল্লাহর সিফাতগুলোর অনুবাদ বৈধ। তবে উত্তম হলো কুরআনি শব্দের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা।

টিকাঃ
৬১১. আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৪৭৩)।
৬১২. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৯৩)। আদ-দুররুল আযহার (৫৯)।
৬১৩. ইশারাতুল মারাম (১৯১)।
৬১৪. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৩৯)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বের তাৎপর্য

📄 আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বের তাৎপর্য


ইমাম আজম রহ. বলেন, 'আল্লাহর নৈকট্য বা দূরত্ব (বস্তুগত) কাছে বা দূরে থাকার ভিত্তিতে নয়; এটা মর্যাদা ও অপমানের ভিত্তিতে। অনুগত বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী, ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে। আর অবাধ্য আল্লাহ থেকে দূরবর্তী, ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে। একইভাবে জান্নাতে আল্লাহর পাশে থাকা ধরন ব্যতিরেকে। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো ধরন ব্যতিরেকে।'৬১৫ ইমামের অনুসরণে মাতুরিদি বলেন, 'আল্লাহর নৈকট্য দূরত্ব ও জায়গার পরিমাপভিত্তিক নয়। কারণ, সেটা সীমারেখা ও স্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অথচ আল্লাহ তখন ছিলেন যখন স্থান ছিল না। তিনি এখনও তেমন আছেন। তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে। সকল স্থান, কাল, সীমারেখা তাঁর সৃষ্টি।'৬১৬

এখানেও ইমাম আজম রহ.-এর তানযিহের মানহাজ সুস্পষ্ট। তিনি এগুলোর 'বাহ্যিক' অর্থ গ্রহণের কথা বলে হিসসি/আক্ষরিক অর্থের উপর প্রয়োগ করেননি। মানুষ নৈকট্য ও দূরত্বের বিষয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে যেভাবে বোঝে, সেভাবে তিনি বোঝেননি। কেবল তিনি নন; সালাফের সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহর 'নৈকট্য' ও 'দূরত্ব' স্থানগত কিংবা দেহগত নয়; বরং জ্ঞান, ক্ষমতা, তত্ত্বাবধান, সওয়াব, অনুগ্রহ, মর্যাদা এমন নানা অর্থে প্রযোজ্য। মালেক, সুফিয়ান সাওরি, আহমদ ইবনে হাম্বল, তাবারি, ইবনুল জাওযি, বাগাভি, ইবনে আব্দিল বার, যাহাবি থেকে এসব অর্থ বর্ণিত হয়েছে।৬১৭

একদল লোক আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছেন। ফলে তারা মনে করেন, 'আল্লাহ আরশের উপর অবস্থান করছেন। যে যত উপরের দিকে উঠবে, সে দৈহিকভাবে তত আল্লাহর কাছে যেতে পারবে। ফলে ফেরেশতাগণ আল্লাহর সবচেয়ে কাছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মিরাজের রাতে যখন ঊর্ধ্বজগতে গিয়েছিলেন, তখন আল্লাহর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন।' এমন আকিদা সঠিক নয়। কারণ, এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণ করলে আল্লাহর শানে অনেক অশোভন বিষয় প্রয়োগ করতে হয়, যা বৈধ নয়। প্রসিদ্ধ হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন : 'ফরয ইবাদতের চেয়ে অন্য কিছুর মাধ্যমে বান্দা আমার কাছাকাছি আসতে পারে না। তবে বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার কাছে আসতে থাকে, একপর্যায়ে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।'৬১৮ এখানে খেয়াল করুন, কেউ নফল ইবাদত করলে উপরের দিকে উঠে যায় এমন নয়। বরং ইবাদতকারী ব্যক্তি কিংবা ইবাদত থেকে গাফেল ব্যক্তি উভয়েই একই পৃথিবীতে একই দূরত্বে থাকে। বোঝা গেল, নৈকট্য-দূরত্ব অর্থ আক্ষরিক নয়।

আরেকটি হাদিসে এসেছে, 'বান্দা সিজদা অবস্থায় আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। সুতরাং তোমরা সে সময়ে বেশি দোয়া করো।'৬১৯ অন্য হাদিসে এসেছে, 'বান্দা যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক বিঘত এগিয়ে যাই। সে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে এলে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। সে আমার দিকে হেঁটে এলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।'৬২০ এখানেও এক বিঘত এবং এক হাত এগিয়ে আসা, দৌড়ানো ইত্যাদি শব্দ মহান আল্লাহর উপর আক্ষরিক অর্থে প্রয়োগ করা হবে না। কারণ, তিনি সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে পবিত্র। বরং এগুলো আধ্যাত্মিক নৈকট্য, বান্দার প্রতি আল্লাহর মনোযোগ ও অনুগ্রহ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

মোটকথা, আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্ব আক্ষরিক ও শারীরিক অর্থে নয়। কারণ, ইমাম আজমসহ সালাফ এগুলোর আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করেননি। আবার এসব শব্দ সর্বত্র উন্মুক্ত তাবিলও করা যাবে না। কারণ বিভিন্ন হাদিসে আল্লাহর 'নৈকট্য' অত্যন্ত নিগূঢ় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যার তাৎপর্য উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য। উদাহরণত হাদিসে এসেছে, 'শেষ রাতে আল্লাহ বান্দার সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসেন'৬২১, আরেক হাদিসে এসেছে, 'আরাফার দিন তিনি বান্দাদের কাছে চলে আসেন'৬২২, অন্য হাদিসে এসেছে, 'তোমাদের কেউ নামাযে দাঁড়িয়ে যেন সামনের দিকে থুতু না ফেলে। কারণ নামাযের সময় আল্লাহ সামনের দিকে থাকেন'!৬২৩ আরেক হাদিসে এসেছে, 'কিয়ামতের দিন মুমিনকে আল্লাহর কাছে আনা হবে...'।৬২৪ এসব হাদিসে আল্লাহর নৈকট্যকে পূর্বোক্ত নির্দিষ্ট কোনো (রূপক) অর্থে প্রয়োগ করা কঠিন। বরং এগুলো নিগূঢ় মর্ম তিনিই ভালো জানেন। এ জন্য ইমাম আশআরি রহ. লিখেছেন, 'আল্লাহ বান্দার কাছাকাছি আসেন যেভাবে ইচ্ছা করেন। ধরন ব্যতিরেকে' (বিলা কাইফিন)।৬২৫ ইমাম আজমেরও একই বক্তব্য। তাঁর ব্যবহৃত ‘ধরন ব্যতিরেকে' (বিলা কাইফিন) শব্দটা এর গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

টিকাঃ
৬১৫. আল-ফিকহুল আকবার (৭-৮)।
৬১৬. আত-তাওহিদ (৭৯)।
৬১৭. দেখুন: তাফসিরে তাবারি (২১/৪২২)। আল-আরবাঈন, যাহাবি (৬৫)।
৬১৮. বুখারি (৬৫০২)। মুসনাদে আহমদ (২৬৮৩৪)।
৬১৯. মুসলিম (৪৮২)। আবু দাউদ (৮৭৫)।
৬২০. বুখারি (৭৫৩৬)। মুসলিম (২৬৭৫)।
৬২১. তিরমিযি (৩৫৭৯)। নাসায়ি (৭/৫৭১)।
৬২২. মুসলিম (১৩৪৮)। ইবনে মাজা (৩০১৪)।
৬২৩. বুখারি (৪০৬)। মুসলিম (৫৪৭)।
৬২৪. বুখারি (৪৬৮৫)। মুসলিম (২৭৬৮)।
৬২৫. আল-ইবানাহ, আশআরি (৩০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সিফাতের ক্ষেত্রে খালাফ তথা পরবর্তীদের বিচ্যুতি

📄 সিফাতের ক্ষেত্রে খালাফ তথা পরবর্তীদের বিচ্যুতি


সিফাতের ক্ষেত্রে ইমামের মাযহাব সুস্পষ্ট। এর সারমর্ম হলো : এগুলোকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য দেওয়া যাবে না। আবার কল্পিত সাদৃশ্যের দোহাই দিয়ে অস্বীকারও করা যাবে না। ইমাম আজম রহ. এই দুই প্রান্তিকতা এবং এগুলোর পতাকাবাহী তথা জাহম ইবনে সাফওয়ান ও মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা জাহম ইবনে সাফওয়ান ও মুকাতিল ইবনে সুলাইমানকে ধ্বংস করে দিন। প্রথমটা অস্বীকারের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে, দ্বিতীয়টা সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে।'৬২৬ অন্য বর্ণনায় এসেছে, ইমাম বলেন, 'মুকাতিল সিফাত সাব্যস্তের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহকে সৃষ্টির মতো বানিয়ে দিয়েছে।'৬২৭ যাহাবির বর্ণনামতে, ইমাম আজম বলেছেন, 'প্রাচ্য থেকে আমাদের কাছে দুটো নিকৃষ্ট মতবাদ এসেছে—এক. সিফাত অস্বীকারকারী জাহম, দুই. সাদৃশ্যবাদী মুকাতিল।'৬২৮ অন্য বর্ণনায় বলেন, ‘আমরা জাহমের মতো আল্লাহর সিফাত থেকে পলায়ন করি না; আবার মুকাতিল আল্লাহর ব্যাপারে যা বলেছে তা বলি না।'৬২৯ ফলে ইমামের মাযহাব এই দুটোর মাঝামাঝি। এটাই আহলে সুন্নাতের মাযহাব।

ইমামের অনুসরণে তহাবি বলেন, 'দ্বীনের ক্ষেত্রে সে ব্যক্তিই নিরাপদে থাকে, যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি আত্মসমর্পণ করে এবং যা জানে না (সে ব্যাপারে কথা বলা পরিত্যাগ করে) যিনি জানেন তাঁর জন্যই ছেড়ে দেয়।' অন্যত্র বলেন, 'আল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয় বোঝার একমাত্র বিশুদ্ধ পন্থা হচ্ছে, অপব্যাখ্যা (তাবিল) বর্জন এবং আত্মসমর্পণ। এই আত্মসমর্পণের উপরই দাঁড়িয়ে আছে সকল রাসুলের দ্বীন, নবির শরিয়ত এবং মুসলমানের দ্বীনদারি। সুতরাং যে ব্যক্তি এসব ক্ষেত্রে অস্বীকার কিংবা (সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার) সাদৃশ্যকরণ থেকে বেঁচে না থাকবে, তার পদস্খলন ঘটবে এবং বিশুদ্ধ তাওহিদ (তানযিহ) পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। কারণ, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের একত্ববাদের গুণে গুণান্বিত, অদ্বিতীয়ের বিশেষণে বিশেষিত, সৃষ্টির কেউ সেসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়।' অন্যত্র ইমাম তহাবি বলেন, 'আত্মসমর্পণ এবং বশ্যতা স্বীকার ব্যতীত ইসলামে কারও অবস্থান অবিচল হতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন বিষয় জানতে যাবে যেগুলো জানা তার পক্ষে সম্ভব নয় এবং এক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করে তুষ্ট থাকবে না, সে নির্ভেজাল তাওহিদ, সুনির্মল জ্ঞান এবং বিশুদ্ধ ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে। কুফর ও ঈমান, সত্যায়ন ও মিথ্যায়ন, স্বীকার ও অস্বীকৃতির দোলাচলে দোদুল্যমান থাকবে। সন্দেহ নিয়ে পথভ্রষ্টের মতো উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকবে; না হবে সত্যায়নকারী মুমিন, না মিথ্যা প্রতিপন্নকারী কাফের।'৬৩০

টিকাঃ
৬২৬. ফাযায়িলু আবি হানিফা (১২৪)। আল-জাওয়াহিরুল মুযিআহ (১/৩১)।
৬২৭. মিযানুল ইতিদাল (৪/৩৭৫)।
৬২৮. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/২০২)।
৬২৯. আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (১০৭)।
৬৩০. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১৩, ১৪, ১৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00