📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আল্লাহর উপর ‘শাইউন’ শব্দ প্রয়োগ

📄 আল্লাহর উপর ‘শাইউন’ শব্দ প্রয়োগ


প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহর উপর মনগড়া কোনো শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না বলে খোদ ইমামই আল্লাহর উপর 'শাইউন' (বস্তু) শব্দ প্রয়োগ করলেন। এটা কি বৈধ?

আমরা বলব, আল্লাহকে 'শাইউন' বলার অর্থ হলো, তিনি সত্তা ও গুণাবলিসহ বিদ্যমান। কিন্তু তাঁর সত্তা কিংবা গুণাবলি সৃষ্টির কোনো বস্তুর মতো নয়। এটা আল্লাহর উপর মনগড়া শব্দ প্রয়োগ নয়, বরং সৃষ্টি থেকে সাদৃশ্য নাকচ করতে স্বয়ং আল্লাহ এটা প্রয়োগ করেছেন, ﴾لَيْসَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ অর্থ : 'তাঁর মতো কোনো বস্তু (শাইউন) নেই। তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন।' [শুরা : ১১] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, قُلْ أَيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَدَةٌ قُلِ اللَّهُ شَهِيدٌ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ অর্থ : 'আপনি জিজ্ঞেস করুন সর্ববৃহৎ সাক্ষ্যদাতা কে (শাইউন)? বলে দিন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী।' [আনআম : ১৯] ৫৮৭

মাতুরিদি বলেন, “কেউ বলতে পারে—'আল্লাহর উপর 'জিসম' শব্দ প্রয়োগ অবৈধ হলে 'শাইউন' প্রয়োগ কেন অবৈধ হবে না? অথবা 'আল্লাহ বস্তু কিন্তু অন্যান্য বস্তুর মতো নন' এমন বলা গেলে 'আল্লাহ শরীর কিন্তু অন্যান্য শরীরের মতো নন' এটুকু বলতে কী সমস্যা? আমরা বলব, 'জিসম' আর 'শাইউন' এক বিষয় নয়। জিসমের (তথা শরীরের) জন্য যা আবশ্যক, 'শাইউন' (তথা বস্তু বা বিষয়ের) জন্য তা আবশ্যক নয়। কারণ, 'শাইউন' হলেই সেটার 'জিসম' থাকতে হবে এটা জরুরি নয়। অনেক 'শাইউন' (যেমন গুণ)-এর 'জিসম' তথা শরীর নেই। (উদাহরণস্বরূপ আমরা বললাম, আল্লাহর দিদার এমন একটা 'বিষয়' [শাইউন] যা এই পৃথিবীতে সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়। এখানে দিদার শব্দের উপর 'শাইউন' প্রয়োগ করা হলো, অথচ এটার জিসম বা শরীর নেই)। সুতরাং আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দ প্রয়োগ করা গেলেও 'জিসম' প্রয়োগ করা যাবে না। এ কারণে কুরআনে আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দের প্রয়োগ দেখা যায় : ﴾ لَيْসَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ অর্থ : 'তাঁর মতো কোনো বস্তু (শাইউন) নেই।' [শুরা : ১১] আল্লাহ আরও বলেন, ﴾قُلْ أَيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَدَةً قُلِ اللَّهُ شَهِيدٌ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ﴿ অর্থ : 'আপনি জিজ্ঞেস করুন সর্ববৃহৎ সাক্ষ্যদাতা কে? বলে দিন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী।' [আনআম : ১৯] বোঝা গেল, আল্লাহর উপর এটা প্রয়োগ করা বৈধ।” ৫৮৮

আবুল ইউসর বাযদাবি লিখেন, “কাররামিয়্যাহরা আল্লাহর উপর 'জিসম' শব্দ প্রয়োগ করে। তারা বলে, আল্লাহ জিসম, কিন্তু অন্যান্য জিসমের মতো নয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের... মতে আল্লাহ জিসম নন। কারণ, জিসমের মাঝে এমন কিছু বিদ্যমান, যা আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য নয়। তা ছাড়া, আল্লাহ কুরআনে কিংবা রাসুলুল্লাহ সুন্নাহতে আল্লাহর জন্য জিসম সাব্যস্ত করেননি। ফলে তাঁর উপর এটা প্রয়োগ করা যাবে না। বিপরীতে আহলে সুন্নাতের মতে, আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দ প্রয়োগ করা যাবে, 'নফস' শব্দ প্রয়োগ করা যাবে। কারণ, আল্লাহ তাঁর নিজের উপর 'নফস' শব্দ প্রয়োগ করেছেন [মায়িদা : ১১৬]। আল্লাহ নিজের উপর 'শাইউন' শব্দ প্রয়োগ করেছেন [শুরা : ১১]।” ৫৮৯

'শাইউন' শব্দটি আরবিতে 'মাফউল' তথা ক্রিয়ার কর্ম হিসেবে যেমন ব্যবহৃত হয়, তেমনই 'ফায়েল' তথা কর্তা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। 'মাফউল' হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ, যেমন: আল্লাহ তায়ালার বাণী, وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ অর্থ : 'আল্লাহ সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান।' [বাকারা: ২৮৪] এ অর্থে 'শাইউন' শব্দের প্রয়োগ আল্লাহর উপর বৈধ নয়। 'ফায়েল' অর্থে ব্যবহারের উদাহরণ, যেমন: আল্লাহ তায়ালার বাণী, قُلْ أيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَادَةً قُلِ اللَّهُ شَهِدُ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ অর্থ : 'আপনি জিজ্ঞেস করুন, সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে কোন বস্তু সর্ববৃহৎ? বলে দিন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী।' [আনআম : ১৯] এ অর্থে আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দের প্রয়োগ বৈধ। আবার কখনো কখনো 'শাইউন' শব্দটি সাধারণ বিদ্যমানতার উপর প্রয়োগ করা হয়। আল্লাহর ক্ষেত্রে এই বিদ্যমানতা চিরন্তন, অবিনশ্বর, অপরিহার্য। ফলে তাঁর ক্ষেত্রে এটার ব্যবহার অধিক যথাযথ। ৫৯০

উপরন্তু ইমাম আজম কর্তৃক আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দ স্বতন্ত্রভাবে প্রয়োগ এবং আকিদার গ্রন্থগুলোতে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য আছে। সেটা হলো জাহম ইবনে সাফওয়ানের খণ্ডন। অর্থাৎ, জাহম বলত, আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দের প্রয়োগ বৈধ নয়। ৫৯১ জাহম যেহেতু সব ধরনের সিফাত অস্বীকার করত, ফলে সেগুলোর সঙ্গে 'শাইউন'ও অস্বীকারের ফলে আদতে আল্লাহ অস্তিত্বহীন হয়ে যান। জাহমের এই বিভ্রান্তি খণ্ডনে ইমাম বলেন, আল্লাহ নিজের উপর শাইউন শব্দ প্রয়োগ করেছেন, আর এটা তাঁর উপর প্রয়োগ অবৈধ নয়। বরং এটা অস্বীকারের মাধ্যমে অন্যান্য সিফাত অস্বীকারের পথ উন্মুক্ত করা অবৈধ। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে আল্লাহর উপর এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ নিষ্প্রয়োজন।

টিকাঃ
৫৮৭. দেখুন : তালখিসুল আদিল্লাহ (৩৭৩)। বাহরুল কালাম (১০০)।
৫৮৮. আত-তাওহিদ (৩৪-৩৫)।
৫৮৯. উসুলুদ্দিন (৩৪-৩৬)।
৫৯০. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৩৪)।
৫৯১. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/৩১৫)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আল্লাহর ব্যাপারে ‘জাওহার’ ও ‘আরাজ’ নাকচ করার রহস্য

📄 আল্লাহর ব্যাপারে ‘জাওহার’ ও ‘আরাজ’ নাকচ করার রহস্য


যদি আল্লাহর উপর মনগড়া কোনো শব্দ প্রয়োগ নিষিদ্ধ হয়, তবে ইমাম আজম এখানে 'জাওহার' ও 'আরাজ' ইত্যাদি নিয়ে কেন কথা বললেন? কেন আল্লাহর ব্যাপারে এগুলো নাকচ করলেন? অথচ এগুলো কুরআন-সুন্নাহর শব্দ নয়, সালাফ এগুলো বলেননি!

উত্তর হলো, এগুলো আকিদা 'তাকরির' তথা বর্ণনা ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আনেননি, বরং বিভ্রান্তি খণ্ডনের জন্য এনেছেন। আকিদার ক্ষেত্রে ইমাম আজমের মানহাজ হলো, কুরআন ও সুন্নাহতে যতটুকু এসেছে, ততটুকু বলা। মনগড়া শব্দ ব্যবহার পরিত্যাগ করা। এটা সাধারণ ক্ষেত্রে। কিন্তু বিপরীতে যখন বিভ্রান্ত লোকেরা আকিদার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ছড়াবে, আল্লাহর উপর মনগড়া শব্দ প্রয়োগ করবে, তখন সেটার প্রতিবাদ ও খণ্ডন আবশ্যক হবে। ইমাম আজম সেটাই করেছেন। অর্থাৎ, যখন খ্রিষ্টান ও কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায় আল্লাহর উপর 'জিসম', 'জাওহার', 'আরাজ' এসব শব্দ প্রয়োগ করতে লাগল, অথচ জিসম তথা দেহ হলো বিভিন্ন উপাদানে গঠিত এবং কোনো এক স্থানে সীমাবদ্ধ, যা থেকে আল্লাহ মুক্ত। একইভাবে জিসম নবসৃষ্ট, অথচ আল্লাহ চিরন্তন, অনাদি, অনন্ত। 'জাওহার'ও (মৌল) কোনো জায়গায় সীমাবদ্ধ এবং জিসমের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর 'আরাজ' (বাহ্যিক রূপ-রং) হলো জিসম ও জাওহারে বিদ্যমান অনিত্য গুণাবলি, যেমন : রং, স্বাদ, ঘ্রাণ ইত্যাদি, যা স্থায়ী নয়; অথচ আল্লাহর যাত ও সিফাত চিরন্তন ও চিরস্থায়ী। ৫৯২ এভাবে তারা যখন আল্লাহর উপর এসব মনগড়া শব্দ প্রয়োগ করতে লাগল, তখন ইমাম এগুলো নাকচ করলেন, তাদের খণ্ডন করলেন।

ইমাম আজমকে 'জিসম' ও 'আরাজ' সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, 'আমর ইবনে উবাইদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। সে মুসলমানদের উপর এটা নিয়ে বিতর্কের দরজা উন্মুক্ত করেছে।' ৫৯৩ অর্থাৎ, এগুলো নিয়ে কথা বলাই নিষিদ্ধ। কিন্তু যখন তারা অন্যায় কথা বলা শুরু করল, তখন তাদের খণ্ডন না করে উপায় নেই। নতুবা তাঁর এবং আহলে সুন্নাতের স্বাভাবিক নীতি হলো, যেমনটা হারাভি নিজস্ব সূত্রে নুহ আল-জামি থেকে বর্ণনা করেন, আমি আবু হানিফাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'জিসম', 'আরাজ' ইত্যাদি নিয়ে মানুষ যেসব নতুন কথা শুরু করেছে, সে ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী? তিনি বললেন, “এগুলো দার্শনিকদের কথা। 'আসার' তথা সুন্নাহ ও সালাফের অনুসরণ করো। প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, সেগুলো বিদআত।” ৫৯৪

টিকাঃ
৫৯২. উসুলুদ্দিন, গযনবি (৬৮-৬৯)।
৫৯৩. দেখুন : তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/২৬১-২৬২)। শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৩৪-৩৫)।
৫৯৪. যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি (৫/২০৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00