📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আল্লাহর সিফাতকে সংখ্যাবদ্ধ না করা

📄 আল্লাহর সিফাতকে সংখ্যাবদ্ধ না করা


কুরআন-সুন্নাহতে আল্লাহর নাম ও গুণাবলির কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। বরং কুরআনে আল্লাহর অসংখ্য সুন্দর নামের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ﴾وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا﴿ অর্থ: 'আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। কাজেই তোমরা তাঁকে সেসব নামে ডাকো।' [আরাফ: ১৮০] যদিও হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি সেগুলো আত্মস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' ৫৫৯ তথাপি এর দ্বারা এটাকে নিরানব্বইয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়। কারণ, বিভিন্ন হাদিস দেখলে বোঝা যায়, আল্লাহর আরও অনেক নাম আছে যা তিনি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন, সৃষ্টিকে জানাননি। ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি বেদনা-ভারাক্রান্ত অবস্থায় নিম্নোক্ত দোয়া পড়বে, আল্লাহ তার দুঃখ-বেদনা দূর করে দেবেন। দোয়াটি হলো :
(اللَّهُمَّ إِنِي عَبْدُكَ ابْنُ عَبْدِكَ ابْنُ أَمَتِكَ ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ ، مَاضٍ فِيَّ حُكْمُكَ ، عَدْلٌ فِيَّ قَضَاؤُكَ ، أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ ، سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ ، أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ ، أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ ، أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ ، أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي ، وَنُورَ بَصَرِي ، وَجَلَاءَ حُزْنِي ، وَذَهَابَ هَمَّي)
'হে আল্লাহ, আমি আপনার বান্দা। আপনার বান্দা ও বান্দির সন্তান। আমার সবকিছু আপনার হাতে। আপনার নির্দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন আমি। আপনার ইনসাফপ্রাপ্ত। আমি আপনার সকল নামের উসিলায়—যেসব নাম আপনি আপনার জন্য রেখেছেন, অথবা কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন, অথবা সৃষ্টির কাউকে শিখিয়েছেন, অথবা গায়েবের জগতে আপনার কাছে রেখে দিয়েছেন—আপনি কুরআনকে আমার হৃদয়ের বসন্ত, আমার চোখের আলো, আমার দুঃখের উপশম এবং আমার পেরেশানির প্রতিষেধক করুন।' সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের কি এই দোয়াটা শেখা উচিত? তিনি বললেন, হ্যাঁ। যে ব্যক্তিই এই দোয়াটির কথা শুনবে, তার এটা মুখস্থ করা উচিত হবে। ৫৬০ মোটকথা, আল্লাহর নামের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা আমাদের জানা নেই। ফলে তাঁর জন্য সুনির্দিষ্ট সংখ্যার নাম দাবি করা সঠিক নয়।

একই কথা আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) হাদিসে আল্লাহর অসংখ্য সিফাতের কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা কিংবা রাসুল (ﷺ) অথবা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, সালাফে সালেহিন আল্লাহর এসব সিফাতকে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার মাঝে সীমাবদ্ধ করেননি। এমনকি ইমাম আজমও আল্লাহর সিফাতকে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করেননি।

পাশাপাশি কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত আল্লাহর অসংখ্য সিফাতের আলোচনাও যেহেতু একসঙ্গে আনা কঠিন, এ জন্য তিনি তাঁর আকিদার কিতাবগুলোতে উদাহরণস্বরূপ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিফাত উল্লেখ করেছেন, সেটাও সংখ্যার মাঝে সীমাবদ্ধকরণ ব্যতীত।

ইমামের বিভিন্ন গ্রন্থে আমরা প্রায় বিশটির মতো সিফাত পেয়েছি। সেগুলো হলো আল্লাহর 'হায়াত' (জীবন), 'কুদরত' (শক্তি), 'ইলম' (জ্ঞান), 'কালাম' (বাণী), 'সাম্' (শ্রবণ), 'বাসার' (দর্শন), 'ইরাদা' (ইচ্ছা), 'তাখলিক' (সৃষ্টি করা), 'তারযিক' (রিযিক দেওয়া), 'ইনশা' (সূচনা করা), 'ইবদা' (উদ্ভাবন করা) ও 'সুনউ' (তৈরি করা), আল্লাহর 'ইয়াদ' (হাত), 'ওয়াজহ' (চেহারা), 'নফস' (সত্তা), 'ইস্তিওয়া' (অধিষ্ঠান), 'নুযুল' (অবতরণ), 'গযব' (ক্রোধ), 'রিযা' (সন্তুষ্টি) ও 'মুহাব্বত' (ভালোবাসা)। কিন্তু এর মানে এটা নয় যে, আল্লাহর সিফাত এই বিশটিতে সীমাবদ্ধ। বরং সেগুলোর প্রকৃত সংখ্যা আমাদের অজ্ঞাত। এগুলো স্রেফ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো উল্লেখ করার পরে ইমাম নিজেও বলেছেন, (وَغير ذَلِك من صِفَاتِ الْفِعْل) অর্থাৎ 'অন্যান্য কর্মগত আরও যত সিফাত রয়েছে।' ৫৬১ ইমাম তহাবি রহ. আকিদাহ তহাবিয়্যাহতে আরও একাধিক সিফাত উল্লেখ করেছেন। তাই আল্লাহর সিফাতকে সাতটি বা আটটি কিংবা যেকোনো সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করা সালাফের মানহাজ থেকে বিচ্যুতি গণ্য হবে। নাসাফি লিখেন, 'আল্লাহর এমন অনেক সিফাত ও আসমা (গুণ ও নাম) থাকতে পারে, যা আমাদের জানা নেই।' ৫৬২ আবু শাকুর সালেমি লিখেন, 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো, আল্লাহর সিফাতকে সংখ্যাবদ্ধ করা যাবে না।' ৫৬৩ আলাউদ্দিন মুহাম্মাদ বুখারি (৮৪১ হি.) লিখেন, 'সালাফের কাছে আল্লাহর সাতটি সিফাতের বাইরেও অন্যান্য সিফাত রয়েছে।' ৫৬৪

টিকাঃ
৫৫৯. বুখারি (২৭৩৬)। মুসলিম (২৬৭৭)।
৫৬০. ইবনে হিব্বান (৯৭২)। মুসনাদে আহমদ (৪৪0৪)।
৫৬১. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
৫৬২. আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (১৭৮)।
৫৬৩. আত-তামহিদ (৫৯)।
৫৬৪. মুলজিমাতুল মুজাসসিমাহ (৬৬)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কুরআন-সুন্নাহর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা

📄 কুরআন-সুন্নাহর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা


সিফাতের ক্ষেত্রে ইমাম আজমসহ সকল সালাফে সালেহিনের কর্মপন্থা ছিল কুরআন এবং বিশুদ্ধ সুন্নাহর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা, নিজেদের পক্ষ থেকে কোনোকিছু সংযোজন-বিয়োজন না করা। ইমাম বলেন, "কারও জন্য তার নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহর ব্যাপারে কিছু বলা বৈধ নয়। বরং মানুষের কর্তব্য হলো, আল্লাহর জন্য সেগুলোই সাব্যস্ত করা, যা তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন। তাঁর ব্যাপারে মনগড়া কোনো বক্তব্য না দেওয়া। বড় মহান বরকতময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা।” ৫৬৫ ইমাম আরও বলেন, “কুরআন যা নিয়ে এসেছে এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যা-কিছুর দাওয়াত দিয়েছেন, সেটা ছাড়া আর কিছু (বলার) সুযোগ নেই। সাহাবায়ে কেরাম এর উপরই ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে মানুষ বিচ্ছিন্ন-বিভক্ত হয়ে যায়। সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহ ছাড়া সবকিছু নব-আবিষ্কৃত, বিদআত।” ৫৬৬ ইমামকে আল্লাহর সিফাত বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, "আল্লাহ তায়ালা কুরআনে যা-কিছু বলেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে যা-কিছু বর্ণিত, আমি তা-ই বলি।” ৫৬৭

টিকাঃ
৫৬৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (৮৯)। আল-উসুলুল মুনিফাহ (১৫)।
৫৬৬. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (৯১)।
৫৬৭. প্রাগুক্ত (৯২)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আল্লাহর উপর মনগড়া কিছু প্রয়োগ না করা

📄 আল্লাহর উপর মনগড়া কিছু প্রয়োগ না করা


তাই কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্য এবং সালাফের অনুসরণ ছাড়া সিফাত সাব্যস্তের নামে আল্লাহর উপর এমন কোনো শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না, যা কুরআন-সুন্নাহতে নেই কিংবা সালাফ করেননি। ইমাম বলেন, “তিনি 'শাইউন' (বস্তু), কিন্তু অন্যান্য বস্তুর মতো নন। আর 'শাইউন'-এর অর্থ হলো 'জিসম' (দেহ), 'জাওহার' (মৌল), 'আরাজ' (বাহ্যিক রূপ-রং)-বিহীন বিদ্যমান সত্তা। তাঁর কোনো 'হদ' (সীমা) নেই, প্রতিপক্ষ নেই, সমকক্ষ নেই। তাঁর মতো কিছু নেই।” ৫৬৮

পরবর্তী হানাফি ইমামগণও ইমাম আজমের অনুসরণে আল্লাহর উপর 'জিসম', 'জাওহার', 'আরাজ', 'হদ', 'সুরত' (আকার-আকৃতি) ইত্যাদি শব্দের প্রয়োগ কঠোরভাবে নাকচ করেছেন। ৫৬৯
আবু হাফস বুখারি বলেন, “যে ব্যক্তি বলবে, আল্লাহর 'হাত', 'জিহা', 'জিসম' ইত্যাদি (তথা সৃষ্টির মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ) রয়েছে, সে কাফের।” ৫৭০
মুহাম্মাদ ইবুনল ফযল বলখি বলেন, “কেউ যদি বলে, আল্লাহ জিসম (দেহবিশিষ্ট), কিন্তু অন্যান্য জিসমের মতো নন, তবে সে (ভ্রান্ত) কাররামিয়্যাহদের অন্তর্ভুক্ত।” ৫৭১
আবু মনসুর মাতুরিদি বলেন, “'জিসম'-এর দুটো অর্থ আছে। এক. এমন বস্তু যার দিক আছে, শেষ আছে, গঠন ও অবয়ব আছে। এ অর্থে 'জিসম' আল্লাহর উপর প্রয়োগ বৈধ নয়। কারণ, এগুলো সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য; আল্লাহ এসব থেকে পবিত্র। তাঁর মতো কিছু নেই। এ কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে আল্লাহর উপর এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ করা হয়নি। এটা তাঁর নাম কিংবা গুণের অংশ নয়। সুতরাং আল্লাহর উপর এটা প্রয়োগের সুযোগ নেই। দুই. এটার কোনো স্বরূপ (মাহিয়‍্যাত) থাকবে না। স্রেফ আল্লাহর উপর 'ইতিবাচক' অর্থে প্রয়োগ করা হবে। এটাও আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা বৈধ নয়।” ৫৭২ তিনি অন্যত্র আরও স্পষ্ট করে বলেন, "'জিসম' হলো প্রত্যেক সীমাবদ্ধ বস্তুর নাম। বিপরীতে 'শাইউন' হলো স্রেফ (অস্তিত্ব) সাব্যস্তকরণ। কারণ, 'লা-শাইউন' মানে অস্তিত্বহীন। ফলে আল্লাহকে 'লা-শাইউন' বললে তিনি অনস্তিত্ব হয়ে যান।” (অথচ 'লা-জিসম' বললে অস্তিত্ব নাকচ হয় না)। ৫৭৩
আবু সালামা সমরকন্দি বলেন, “আল্লাহ সকল কল্পনা-জল্পনা (তাসাওউর)-এর ঊর্ধ্বে। আর কল্পনা (তাসাওউর) করতে যেহেতু 'সুরত' লাগে, সুতরাং আল্লাহ সুরত (তথা আকার-আকৃতি) ও জিসম (শরীরের) ঊর্ধ্বে।” ৫৭৪
লামিশি লিখেন, “আল্লাহর উপর যেভাবে 'জিসম' শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না, একইভাবে তাঁর উপর 'সুরত' (আকার-আকৃতি) শব্দও প্রয়োগ করা যাবে না। কারণ শারীরিক অবকাঠামো ব্যতীত সুরতের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।” ৫৭৫
খাব্বাযি বলেন, “আল্লাহর উপর 'জিসম', 'সুরত' ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগ করা বৈধ নয়।” ৫৭৬
বাযদাবি বলেন, 'আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো, আল্লাহ এক। তাঁর কোনো শরিক নেই। তাঁর মতো কিছু নেই। তিনি শরীর (জিসম) নন, জাওহার নন...।' ৫৭৭
রুকনুদ্দিন সমরকন্দি লিখেন, “আল্লাহর উপর 'জাওহার', 'জিসম' এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ বৈধ নয়। আল্লাহকে তাঁর বলা ব্যতীত কোনো নাম দেওয়া বৈধ নয়। ফলে আল্লাহ সবচেয়ে বড় চিকিৎসক হলেও তাঁকে 'তবিব' (ডাক্তার) বলা যায় না, সবচেয়ে বড় জ্ঞানী সত্ত্বেও তাঁকে 'ফকিহ' বলা যায় না।” ৫৭৮
আবুল মুঈন নাসাফি লিখেন, “ইহুদি, রাফেজা, কারামিয়্যাহ, হিশামিয়্যাহ এবং একদল হাম্বলি আল্লাহর জন্য 'জিসম' সাব্যস্ত করে। তারা এর মাধ্যমে আল্লাহকে বিভিন্ন অংশের সমন্বয়ে গঠিত অবকাঠামো মনে করে। এটা বিচ্যুতি। কেননা, এ ধরনের জিসম সৃষ্টির গুণ। আল্লাহ তায়ালা এর ঊর্ধ্বে। হ্যাঁ, যদি কেউ 'জিসম' বলে সত্তা বোঝায়, সেটা ঠিক আছে। তথাপি এ ধরনের শব্দ আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা বৈধ নয়। তাই সেটাও ভুল গণ্য হবে। কারণ, এই যুক্তিতে কেউ আল্লাহকে 'পুরুষ' বলে বলবে, 'আমি সত্তা উদ্দেশ্য নিয়েছি'! আল্লাহ সকল রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে অবগত। এই যুক্তিতে কেউ তাঁকে 'ডাক্তার' বলবে। আল্লাহ দ্বীন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত, এই যুক্তিতে কেউ তাঁকে 'ফকিহ' বলবে। অথচ আমরা এসব বলতে পারি না। কারণ, আল্লাহর শানে শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর উপর নির্ভর করা আবশ্যক।” ৫৭৯
নুরুদ্দিন সাবুনি লিখেন, “আল্লাহর উপর 'জিসম' (দেহ) বা 'সুরত' (আকার-আকৃতি) এ ধরনের কথা বলা অসম্ভব। ইহুদি, চরমপন্থি রাফেজা, মুশাব্বিহাহ ও কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায় আল্লাহকে 'জিসম' মনে করেছে। (শিয়া নেতা) হিশাম ইবনুল হাকাম এবং তার অনুসারীরা আল্লাহকে 'আকার-আকৃতি'-সম্পন্ন বলেছে। কিন্তু আমাদের কথা হলো, আল্লাহর উপর 'জাওহার', 'জিসম' এ ধরনের কোনো শব্দ প্রয়োগ করা বৈধ নয়। ... তাদের কেউ কেউ 'আল্লাহর জিসম কিন্তু অন্যান্য জিসমের মতো নয়' এ ধরনের কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটাও সঠিক নয়। কারণ, তিনি 'জিসম'ই নন; অন্যান্য জিসমের কথা তো অপ্রাসঙ্গিক। বিপরীতে আল্লাহর উপর 'শাইউন', 'নফস' এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ করা বৈধ। কারণ, আল্লাহ নিজে করেছেন।” ৫৮০
কাসানি লিখেন, 'আল্লাহর কোনো আকার-আকৃতি (সুরত) নেই। মানুষের কল্পনা-জল্পনাতে যত আকার-আকৃতি আছে, সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহর সঙ্গে সৃষ্টির কোনো সাদৃশ্য নেই।' ৫৮১
আবু হাফস উমর নাসাফি (৫৩৭ হি.) লিখেন, “আল্লাহ 'জাওহার' নন, 'আরাজ' নন। আকার-আকৃতিবিশিষ্ট নন। তাফতাযানি এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, জাওহার জায়গায় সীমাবদ্ধ এবং শরীরী। আল্লাহ এর ঊর্ধ্বে। আল্লাহ 'আরাজ' নন। কারণ, 'আরাজ' নিজে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; অন্যের অস্তিত্বের মুখাপেক্ষী। আল্লাহ 'মুসাওয়ার' তথা আকার-আকৃতিবিশিষ্ট নন; কারণ, এটা শরীরের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ দিক কিংবা সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নন।” ৫৮২
কামাল ইবনুল হুমাম লিখেন, “আল্লাহ জাওহার নন। কোনো স্থানে সীমাবদ্ধ নন। জিসম নন। আল্লাহর জিসিম (শরীর) আছে, কিন্তু অন্যদের জিসমের মতো নয়—এমন কথা বলাও গলত। আল্লাহর জন্য 'আরাজ' (রূপ-রং-আকার-আকৃতি) ইত্যাদি সাব্যস্ত করাও ভুল। কেননা, কুরআন-সুন্নাহতে আল্লাহর উপর এসব শব্দ প্রয়োগ করা হয়নি। আল্লাহ কোনো দিকে নন; কেননা দিকসমূহ আল্লাহর সৃষ্টি। প্রথমে ছিল না, পরে অস্তিত্বে এসেছে। অথচ আল্লাহ সবসময় ছিলেন।” ৫৮৩ ইবনুল হুমাম ফাতহুল কাদিরে লিখেন, “যদি কেউ বলে, আল্লাহর মানুষের মতো হাত ও পা আছে, তবে সে অভিশপ্ত কাফের। আর যদি বলে, তাঁর (জিসম) দেহ আছে কিন্তু অন্যান্য দেহের মতো নয়, তবে সে বিদআতি। কেননা, আল্লাহর উপর এমন শব্দ প্রয়োগ করা যায় না।” ৫৮৪
মাগনিসাভি লিখেন, “গোটা সৃষ্টিজগতের কোনো বস্তু তাঁর সাদৃশ্য রাখে না। তিনি 'জিসম' (দেহ) নন। ফলে তাকে মাপা যায় না, অনুমান করা যায় না। কল্পনার পাতায় আঁকা যায় না। ভাগ করা যায় না। তিনি 'জাওহার' নন। ফলে তার উপর 'আরাজ' তথা রং-রূপ আরোপ করা যায় না। তিনি 'রং-রূপ' নন। ফলে কোনো মৌলের মাঝে প্রবেশ করেন না। এককথায়, সৃষ্টিজগতের কোনোকিছু তাঁর সাদৃশ্য রাখে না। অস্তিত্বের ক্ষেত্রে সাদৃশ্য রাখে না। গুণাবলির ক্ষেত্রেও না।” ৫৮৫
সাফফার লিখেন, “আল্লাহ তায়ালা গোটা সৃষ্টি থেকে আলাদা। তিনি সদা বিদ্যমান। সবসময় ছিলেন, সবসময় থাকবেন। তিনি অনাদি, অনন্ত। তাঁর শুরু নেই, শেষ নেই। কোনো কল্পনা-জল্পনা তাঁর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। তিনি সকল আকার-আকৃতি, গঠন, পরিমাণ, অবকাঠামো, ধরন থেকে ঊর্ধ্বে। ফলে তিনি কেমন? তিনি কীভাবে? তিনি কত? (তাঁকে কোনো স্থানে কল্পনা করে) তিনি কোথায়? তাঁর আকৃতি কেমন?—এ ধরনের কথা বলা যাবে না।” ৫৮৬

টিকাঃ
৫৬৮. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
৫৬৯. লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি: ৪৬)। উসুলুদ্দিন, গযনবি (৬৭)। আত-তামহিদ, লামিশি (৫৫)।
৫৭০. আস-সাওয়াদুল আজম (৩৯)।
৫৭১. আল-ইতিকাদ, বলখি (১০৬)।
৫৭২. আত-তাওহিদ (৩৩)।
৫৭৩. আত-তাওহিদ (৭৮)।
৫৭৪. জুমাল মিন উসুলিদ্দিন (১৯-২০)।
৫৭৫. আত-তামহিদ (৬০)।
৫৭৬. আল-হাদিস ফি উসুলিদ্দিন (৪৫-৪৬)।
৫৭৭. উসুলুদ্দিন (২৫০-২৫১)।
৫৭৮. আল-আকিদাহ আর রুকনিয়্যাহ (৫)।
৫৭৯. আত-তামহিদ (২৭-২৯)।
৫৮০. আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (৭১-৭৪)। আল-বিদায়াহ মিনাল কিফায়াহ (৪৪)।
৫৮১. আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ (৮)।
৫৮২. শরহুল আকায়েদ (১১৫-১২০)।
৫৮৩. আল-মুসায়ারাহ (১৩-১৭)।
৫৮৪. ফাতহুল কাদির (১/৩৫০)।
৫৮৫. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১০৭)।
৫৮৬. তালখিসুল আদিল্লাহ (১৫৫)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আল্লাহর উপর ‘শাইউন’ শব্দ প্রয়োগ

📄 আল্লাহর উপর ‘শাইউন’ শব্দ প্রয়োগ


প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহর উপর মনগড়া কোনো শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না বলে খোদ ইমামই আল্লাহর উপর 'শাইউন' (বস্তু) শব্দ প্রয়োগ করলেন। এটা কি বৈধ?

আমরা বলব, আল্লাহকে 'শাইউন' বলার অর্থ হলো, তিনি সত্তা ও গুণাবলিসহ বিদ্যমান। কিন্তু তাঁর সত্তা কিংবা গুণাবলি সৃষ্টির কোনো বস্তুর মতো নয়। এটা আল্লাহর উপর মনগড়া শব্দ প্রয়োগ নয়, বরং সৃষ্টি থেকে সাদৃশ্য নাকচ করতে স্বয়ং আল্লাহ এটা প্রয়োগ করেছেন, ﴾لَيْসَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ অর্থ : 'তাঁর মতো কোনো বস্তু (শাইউন) নেই। তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন।' [শুরা : ১১] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, قُلْ أَيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَدَةٌ قُلِ اللَّهُ شَهِيدٌ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ অর্থ : 'আপনি জিজ্ঞেস করুন সর্ববৃহৎ সাক্ষ্যদাতা কে (শাইউন)? বলে দিন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী।' [আনআম : ১৯] ৫৮৭

মাতুরিদি বলেন, “কেউ বলতে পারে—'আল্লাহর উপর 'জিসম' শব্দ প্রয়োগ অবৈধ হলে 'শাইউন' প্রয়োগ কেন অবৈধ হবে না? অথবা 'আল্লাহ বস্তু কিন্তু অন্যান্য বস্তুর মতো নন' এমন বলা গেলে 'আল্লাহ শরীর কিন্তু অন্যান্য শরীরের মতো নন' এটুকু বলতে কী সমস্যা? আমরা বলব, 'জিসম' আর 'শাইউন' এক বিষয় নয়। জিসমের (তথা শরীরের) জন্য যা আবশ্যক, 'শাইউন' (তথা বস্তু বা বিষয়ের) জন্য তা আবশ্যক নয়। কারণ, 'শাইউন' হলেই সেটার 'জিসম' থাকতে হবে এটা জরুরি নয়। অনেক 'শাইউন' (যেমন গুণ)-এর 'জিসম' তথা শরীর নেই। (উদাহরণস্বরূপ আমরা বললাম, আল্লাহর দিদার এমন একটা 'বিষয়' [শাইউন] যা এই পৃথিবীতে সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়। এখানে দিদার শব্দের উপর 'শাইউন' প্রয়োগ করা হলো, অথচ এটার জিসম বা শরীর নেই)। সুতরাং আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দ প্রয়োগ করা গেলেও 'জিসম' প্রয়োগ করা যাবে না। এ কারণে কুরআনে আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দের প্রয়োগ দেখা যায় : ﴾ لَيْসَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ অর্থ : 'তাঁর মতো কোনো বস্তু (শাইউন) নেই।' [শুরা : ১১] আল্লাহ আরও বলেন, ﴾قُلْ أَيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَدَةً قُلِ اللَّهُ شَهِيدٌ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ﴿ অর্থ : 'আপনি জিজ্ঞেস করুন সর্ববৃহৎ সাক্ষ্যদাতা কে? বলে দিন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী।' [আনআম : ১৯] বোঝা গেল, আল্লাহর উপর এটা প্রয়োগ করা বৈধ।” ৫৮৮

আবুল ইউসর বাযদাবি লিখেন, “কাররামিয়্যাহরা আল্লাহর উপর 'জিসম' শব্দ প্রয়োগ করে। তারা বলে, আল্লাহ জিসম, কিন্তু অন্যান্য জিসমের মতো নয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের... মতে আল্লাহ জিসম নন। কারণ, জিসমের মাঝে এমন কিছু বিদ্যমান, যা আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য নয়। তা ছাড়া, আল্লাহ কুরআনে কিংবা রাসুলুল্লাহ সুন্নাহতে আল্লাহর জন্য জিসম সাব্যস্ত করেননি। ফলে তাঁর উপর এটা প্রয়োগ করা যাবে না। বিপরীতে আহলে সুন্নাতের মতে, আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দ প্রয়োগ করা যাবে, 'নফস' শব্দ প্রয়োগ করা যাবে। কারণ, আল্লাহ তাঁর নিজের উপর 'নফস' শব্দ প্রয়োগ করেছেন [মায়িদা : ১১৬]। আল্লাহ নিজের উপর 'শাইউন' শব্দ প্রয়োগ করেছেন [শুরা : ১১]।” ৫৮৯

'শাইউন' শব্দটি আরবিতে 'মাফউল' তথা ক্রিয়ার কর্ম হিসেবে যেমন ব্যবহৃত হয়, তেমনই 'ফায়েল' তথা কর্তা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। 'মাফউল' হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ, যেমন: আল্লাহ তায়ালার বাণী, وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ অর্থ : 'আল্লাহ সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান।' [বাকারা: ২৮৪] এ অর্থে 'শাইউন' শব্দের প্রয়োগ আল্লাহর উপর বৈধ নয়। 'ফায়েল' অর্থে ব্যবহারের উদাহরণ, যেমন: আল্লাহ তায়ালার বাণী, قُلْ أيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَادَةً قُلِ اللَّهُ شَهِدُ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ অর্থ : 'আপনি জিজ্ঞেস করুন, সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে কোন বস্তু সর্ববৃহৎ? বলে দিন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী।' [আনআম : ১৯] এ অর্থে আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দের প্রয়োগ বৈধ। আবার কখনো কখনো 'শাইউন' শব্দটি সাধারণ বিদ্যমানতার উপর প্রয়োগ করা হয়। আল্লাহর ক্ষেত্রে এই বিদ্যমানতা চিরন্তন, অবিনশ্বর, অপরিহার্য। ফলে তাঁর ক্ষেত্রে এটার ব্যবহার অধিক যথাযথ। ৫৯০

উপরন্তু ইমাম আজম কর্তৃক আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দ স্বতন্ত্রভাবে প্রয়োগ এবং আকিদার গ্রন্থগুলোতে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য আছে। সেটা হলো জাহম ইবনে সাফওয়ানের খণ্ডন। অর্থাৎ, জাহম বলত, আল্লাহর উপর 'শাইউন' শব্দের প্রয়োগ বৈধ নয়। ৫৯১ জাহম যেহেতু সব ধরনের সিফাত অস্বীকার করত, ফলে সেগুলোর সঙ্গে 'শাইউন'ও অস্বীকারের ফলে আদতে আল্লাহ অস্তিত্বহীন হয়ে যান। জাহমের এই বিভ্রান্তি খণ্ডনে ইমাম বলেন, আল্লাহ নিজের উপর শাইউন শব্দ প্রয়োগ করেছেন, আর এটা তাঁর উপর প্রয়োগ অবৈধ নয়। বরং এটা অস্বীকারের মাধ্যমে অন্যান্য সিফাত অস্বীকারের পথ উন্মুক্ত করা অবৈধ। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে আল্লাহর উপর এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ নিষ্প্রয়োজন।

টিকাঃ
৫৮৭. দেখুন : তালখিসুল আদিল্লাহ (৩৭৩)। বাহরুল কালাম (১০০)।
৫৮৮. আত-তাওহিদ (৩৪-৩৫)।
৫৮৯. উসুলুদ্দিন (৩৪-৩৬)।
৫৯০. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৩৪)।
৫৯১. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/৩১৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00