📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সত্তাগত সিফাত ও কর্মগত সিফাতের মাঝে পার্থক্য কী?

📄 সত্তাগত সিফাত ও কর্মগত সিফাতের মাঝে পার্থক্য কী?


হানাফি উলামায়ে কেরাম এই দুই প্রকারের সিফাত সহজে বোঝার জন্য কিছু মূলনীতি তৈরি করেছেন। তারা লিখেন, যে সিফাতের বিপরীত সিফাতটিও আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যায়, সেটা কর্মগত সিফাত। আর যে সিফাতের বিপরীতটা আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যায় না, সেটা সত্তাগত সিফাত। উদাহরণস্বরূপ সৃষ্টি করা, বিপরীত হলো ধ্বংস করা। সন্তুষ্ট হওয়া, বিপরীতটা হলো অসন্তুষ্ট বা ক্রুদ্ধ হওয়া। দয়া করা, বিপরীতটা হলো শাস্তি দেওয়া। সবগুলোই আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যায়। ফলে এগুলো সত্তাগত নয়; কর্মগত সিফাত। বিপরীতে জীবন, ইজ্জত (সম্মান) ও জ্ঞান। এগুলোর বিপরীত হলো মৃত্যু, অসম্মান ও মূর্খতা, যা আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যায় না। সুতরাং জীবন, সম্মান ও জ্ঞান সত্তাগত সিফাত।

উলামায়ে কেরাম আরও লিখেন, আল্লাহর সত্তাগত ও কর্মগত সিফাতের মাঝে আরেকটি পার্থক্য হলো, সত্তাগত সিফাত দিয়ে শপথ (কসম) করলে সেটা বিশুদ্ধ হবে। কারণ, এর বিপরীত নেই। যেমন—আল্লাহর ইজ্জত তথা সম্মানের মাধ্যমে শপথ করা বৈধ। কিন্তু কর্মগত সিফাত দিয়ে শপথ বিশুদ্ধ নয়। যেমন—আল্লাহর ক্রোধের নামে শপথ করলে সেটা শপথ হবে না। কারণ, ক্রোধের বিপরীতে আল্লাহর রহমত রয়েছে। ৫৫৫

টিকাঃ
৫৫৫. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১০৮)। আলি কারি (২০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আল্লাহর নাম ও গুণাবলির মর্যাদার তারতম্য

📄 আল্লাহর নাম ও গুণাবলির মর্যাদার তারতম্য


বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সিফাতের মাঝে প্রকারভেদ করা গেলেও এগুলো আল্লাহর সিফাত হওয়ার ক্ষেত্রে মূলত সবই সমান। এ কারণে ইমাম বলেন, “আল্লাহর সকল নাম ও গুণ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে সমান। এগুলোর ভিতরে কোনো পার্থক্য নেই।” ৫৫৬ ইমামের এ বক্তব্য সিফাত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, এগুলো আল্লাহর নাম ও তাঁর গুণ এ হিসেবে সবগুলো সমান। কিন্তু মর্যাদার দিক থেকে এসব নামের মাঝে তারতম্য রয়েছে।

বিশেষত 'আল্লাহ' নামটি তাঁর সকল নামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। খোদ ইমাম আজম রহ. থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর এ নামটি অনন্য, দৃষ্টান্তহীন। এটা সর্বশ্রেষ্ঠ নাম, অর্থগতভাবে এবং শাব্দিকভাবেও। ফলে, তাঁর মতে, এ শব্দটি নিজেই পরিপূর্ণ। অন্য কোনো শব্দ থেকে এটা উদ্ভূত হয়নি, 'রহমান' যেমন 'রহমত' থেকে উদ্ভূত, 'রব' যেমন 'রবুবিয়্যাহ' থেকে নির্গত; 'আল্লাহ' নামটি নিজেই পরিপূর্ণ। ফলে ঈমান আনার ক্ষেত্রেও 'আল্লাহ' নামটি জানা ও বলাই যথেষ্ট। আর কোনো নামের প্রয়োজন নেই। 'আল্লাহ' নামের অর্থ : উপাস্য, মাবুদ, ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত ইত্যাদি। ৫৫৭

গাযালি রহ. লিখেন, 'আল্লাহ' নামটি আল্লাহর নিরানব্বই নামের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ। কারণ, এটা আল্লাহর সকল গুণের নির্দেশক। আল্লাহর অন্য নামগুলো ভিন্ন ভিন্ন গুণ, অর্থ ও মর্যাদা বহন করে। যেমন 'আলিম' নামটি জ্ঞানের কথা বোঝায়, 'কাদির' নামটি শক্তির নির্দেশক ইত্যাদি। বিপরীতে এ নামটি তাঁর সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্যের আধার। তা ছাড়া, এটা একমাত্র তাঁর জন্যই নির্ধারিত। ফলে 'আলিম', 'কাদির', 'রহিম' ইত্যাদি সৃষ্টির উপর প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু 'আল্লাহ' নামটি শাব্দিক বা রূপক কোনো অর্থেই কোনোভাবেই তিনি ছাড়া আর কারও উপর প্রয়োগ করা যায় না। ৫৫৮

টিকাঃ
৫৫৬. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
৫৫৭. দেখুন : তালখিসুল আদিল্লাহ (৩৮২, ৩৯৮)।
৫৫৮. দেখুন: আল-মাকসিদুল আসনা ফি শরহি মাআনি আসমায়িল্লাহিল হুসনা (৬১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 তাশবিহ ও তাতিলের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজ

📄 তাশবিহ ও তাতিলের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজ


সিফাতের ক্ষেত্রে আবু হানিফা রহ. এবং সালাফে সালেহিনের মানহাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, তাশবিহ (সাদৃশ্য) ও তাতিল (নাকচ)-এর মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজ। ফলে তারা কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত সিফাতগুলোকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করলেও সেগুলো সাব্যস্তের নামে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহকে সৃষ্টিসদৃশ বানিয়ে দেননি, যেমনটা দেহবাদী ও সাদৃশ্যবাদীরা করেছে। আবার তারা সৃষ্টির সঙ্গে আল্লাহর সাদৃশ্যের ভয়ে সিফাতকে নাকচ করেননি, যেমনটা জাহমিয়‍্যাহ ও মুতাযিলারা করেছে। বরং তারা এর বাস্তবতা ও মৌলিকত্বের উপর বিশ্বাস রাখেন। কিন্তু নিগূঢ় মর্ম, ধরন ও স্বরূপ আল্লাহর কাছে সঁপে দেন। অন্যকথায়, তারা সিফাতকে যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দেন। এগুলোতে বিশ্বাস রাখেন, গ্রহণ করেন। কিন্তু এগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি অপছন্দ করেন। এটাই সালাফে সালেহিনের প্রতিষ্ঠিত মানহাজ। ইমাম আজম রহ. থেকে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন: “আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো 'তাশবিহ' ও 'তাতিল'-মুক্ত বিশুদ্ধ তাওহিদ।” ৫৯৫

তিরমিযি আল্লাহর সিফাতসংক্রান্ত হাদিসের আলোচনায় বলেন, “সুফিয়ান সাওরি, মালেক ইবন আনাস, ইবনুল মুবারক, ইবনে উয়াইনাহ, ওয়াকিসহ এ ব্যাপারে সকল ইমামের মাযহাব হলো: এসব হাদিস বর্ণনা করা হবে। আমরা এগুলোতে ঈমান রাখব। কিন্তু 'কীভাবে' এমন প্রশ্ন করা যাবে না। সকল মুহাদ্দিসের মতামতও তা-ই—এসব হাদিস যেভাবে এসেছে সেভাবে বর্ণনা করা হবে। এগুলোর উপর ঈমান আনতে হবে। কিন্তু এগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে না। অনুমান করা যাবে না। 'কীভাবে' এমন প্রশ্ন করা যাবে না।” ৫৯৬

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা নিজের ব্যাপারে কুরআনে যা বলেছেন, সেগুলা পড়াই তার তাফসির। আরবি কিংবা ফারসিতে সেগুলা ব্যাখ্যা করা কারও জন্য বৈধ নয়।' ৫৯৭

ইমাম আজম রহ. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালার সকল সিফাত (গুণ) মাখলুকের সিফাতের (গুণ) চেয়ে ভিন্ন। তিনি জানেন; কিন্তু আমাদের জানার মতো নয়। তিনি শক্তি রাখেন; কিন্তু আমাদের শক্তির মতো নয়। তিনি দেখেন; তবে আমাদের দেখার মতো নয়। তিনি কথা বলেন; তবে আমাদের কথা বলার মতো নয়। তিনি শোনেন; তবে আমাদের শোনার মতো নয়।' ৫৮৮

অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালার (সত্তাগত ও কর্মগত) সকল গুণ সৃষ্টি থেকে আলাদা। 'তিনি জানেন; কিন্তু আমাদের জানার মতো নয়।' কারণ, আমাদের জ্ঞান নবসৃষ্ট; ধারণা, অনুমান ও কল্পনানির্ভর; উপার্জিত। অপরদিকে আল্লাহর জ্ঞান চিরন্তন; মহাসত্য ও চূড়ান্ত। সবকিছু তাঁর সামনে উদ্ভাসিত। 'তিনি শক্তি রাখেন; কিন্তু আমাদের শক্তির মতো নয়।' কারণ, আল্লাহর শক্তি চিরন্তন, স্থায়ী। আমাদেরটা নবসৃষ্ট, অস্থায়ী। আমাদের ক্ষমতা সীমিত। তাও বিভিন্ন উপায়-উপকরণ, সহায়-সাহায্য ও যন্ত্রপাতিনির্ভর। আল্লাহর ক্ষমতা এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সকল উপায়-উপকরণ ও সাহায্যসহযোগিতার অমুখাপেক্ষী। 'তিনি দেখেন; তবে আমাদের দেখার মতো নয়।' কারণ, আমাদের দেখতে হলে উপকরণ লাগে, অনুকূল পরিস্থিতি লাগে। উপরন্তু আমাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ। অথচ আল্লাহ তায়ালা সবকিছু দেখেন। তাঁর দেখতে কোনো উপকরণ লাগে না, স্থান-কালের আনুকূল্য লাগে না। দিক ও মুখোমুখি হওয়া লাগে না। 'তিনি কথা বলেন; তবে আমাদের কথা বলার মতো নয়।' এক্ষেত্রে পার্থক্য স্বয়ং ইমাম আজম নিজেই উল্লেখ করেছেন। এভাবে যখন প্রত্যেকটা সিফাতকে বোঝা হবে, তখন বিতর্ক হয় না। বিচ্যুতি আসে না। সাদৃশ্যের ভয়ে তাবিল (রূপক ব্যাখ্যা) কিংবা তাহরিফ (বিকৃতিসাধন) করতে হয় না।

সাদৃশ্যের কথা চিন্তা করতে গেলে এমন অনেক সিফাতই মানুষের সঙ্গে মিলে যায়। তাই বলে সেগুলো অস্বীকার কিংবা তাবিল করা যাবে? না, করা যাবে না। কারণ, সাদৃশ্যটা স্রেফ শাব্দিক; মৌলিক সাদৃশ্য নয়। তাই সাদৃশ্যের অজুহাতে সিফাতগুলো নাকচ করা যাবে না, আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল বলেননি এমন কোনো শব্দে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বরং যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দিতে হবে।

ইমাম সিফাতের ক্ষেত্রে জাহমিয়্যাহদের বিকৃতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। জারুদ ইবনে ইয়াযিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হানিফা রহ.-কে বলতে শুনেছি, “জাহম সব সিফাতকে অস্বীকার করেছে। ফলে একপর্যায়ে আল্লাহকে 'কিছু না' (লা শাইউন) বানিয়ে দিয়েছে! কুরআনের উপর রাগ দেখিয়েছে (তাতে আল্লাহর সিফাত থাকার কারণে)!” জারুদ ইমামকে বললেন, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী? তিনি বললেন, "আল্লাহ তায়ালা কুরআনে যা-কিছু বলেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে যা-কিছু বর্ণিত, আমি তা-ই বলি।” ৫৯৯

তাশবিহ ও তাতিলের মাঝে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় ইমাম বলেন, 'সৃষ্টির কোনো বৈশিষ্ট্য (তথা সিফাত)-কে আল্লাহর উপর আরোপ করা যাবে না। তাঁকে সৃষ্টির কোনো বিশেষণে বিশেষিত করা যাবে না। তাঁর ক্রোধ ও সন্তুষ্টি তাঁর দুটো সিফাত। কোনো ধরন বা স্বরূপ ছাড়াই সেটা বিশ্বাস করতে হবে। এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা। আল্লাহ ক্রুদ্ধ হন এবং সন্তুষ্ট হন। তাঁর ক্রোধকে শাস্তি এবং সন্তুষ্টিকে পুরস্কার ইত্যাদি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বরং তিনি নিজের ব্যাপারে যা বলেছেন আমরাও তা-ই বলব। তিনি অমুখাপেক্ষী। সবাই তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি। কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি চিরঞ্জীব। চিরজাগ্রত তত্ত্বাবধায়ক। তিনি সবকিছু শোনেন। সবকিছু দেখেন। সবকিছু জানেন। বান্দার হাতের উপর আল্লাহর হাত (ইয়াদ) রয়েছে। কিন্তু সেগুলা সৃষ্টির হাতের মতো নয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয়। কারণ, তিনি সকল হাতের সৃষ্টিকর্তা। একইভাবে তাঁর চেহারাও (ওয়াজহ) সৃষ্টির কোনো চেহারার মতো নয়। কারণ, তিনিই সকল চেহারার সৃষ্টিকর্তা। তাঁর নফস সৃষ্টির কোনো নফসের মতো নয়। কারণ, তিনি সকল নফসের সৃষ্টিকর্তা। তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা। সর্বদ্রষ্টা। ৬০০

ইমাম রহ. আল-ফিকহুল আকবারেও বিষয়টির প্রতি তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ তায়ালার 'ইয়াদ' (হাত), 'ওয়াজহ' (চেহারা) এবং 'নফস' (সত্তা) রয়েছে, যেভাবে কুরআনে এসেছে সেভাবে। এটা বলা যাবে না যে, তাঁর 'ইয়াদ' (হাত) তাঁর কুদরত ও নেয়ামত। কারণ, এভাবে বললে তাঁর সিফাতকে বাতিল করে দেওয়া হয়। আর এটা কাদারিয়্যা ও মুতাযিলাদের বক্তব্য। বরং 'ইয়াদ' (হাত) তাঁর একটি সিফাত, ধরন নেই। 'গাযাব' (ক্রোধ) ও 'রিযা' (সন্তুষ্টি) আল্লাহর দুটি সিফাত, ধরন নেই।” ৬০১ ইমাম তহাবি রহ. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা রাগ করেন। তিনি সন্তুষ্ট হন; কিন্তু তাঁর রাগ ও সন্তুষ্টি সৃষ্টিজীবের মতো নয়।' ৬০২

বরং তাবিল নাকচ এবং সর্বোচ্চ তানযিহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইমাম আজম রহ. আল্লাহর কিছু সিফাতের অনুবাদ করতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, “উলামায়ে কেরাম ফারসি ভাষায় আল্লাহর যেসব সিফাতের উল্লেখ করেছেন, সেগুলা বলা বৈধ। ব্যতিক্রম 'ইয়াদ' (হাত)। ফারসিতে এটার অনুবাদ করা যাবে না। ফলে 'বরুয়ে খোদা' (আল্লাহর চেহারা) বলা যাবে। সাদৃশ্য ও ধরন বর্ণনা ব্যতিরেকে।” ৬১০

টিকাঃ
৫৯৫. তালখিসুল আদিল্লাহ (৩৯৯-৪০০)।
৫৯৬. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল জান্নাহ : ২৫৫৭ হাদিসসংক্রান্ত আলোচনা)।
৫৯৭. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৭০)।
৫৯৯. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (৯২)।
৬০০. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৬-৫৭)। ইতিকাদ, নিশাপুরি (৯০)।
৬০১. আল-ফিকহুল আকবার (৩)।
৬০২. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৫)।
৬১০. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ‘ইয়াদ’ কি আসলেই অনুবাদ করা যাবে না?

📄 ‘ইয়াদ’ কি আসলেই অনুবাদ করা যাবে না?


প্রশ্ন হলো, বাস্তবেই কি 'ইয়াদ' শব্দ ফারসি তথা অনারবি ভাষায় অনুবাদ করা যায় না? অন্যকথায়, আমরা আল্লাহর 'ওয়াজহ'-কে 'চেহারা', 'কাদাম'-কে 'পা', 'নফস'-কে 'সত্তা' হিসেবে অনুবাদ করতে পারলেও 'ইয়াদ'-কে 'হাত' হিসেবে অনুবাদ করতে পারব না?

বিষয়টি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। বিভিন্ন আলেম বিভিন্নভাবে উত্তর দিয়েছেন। হাফিজুদ্দিন নাসাফি বলেন, 'ওয়াজহ', 'ইয়াদ', 'আইন'... ইত্যাদির কোনোটাই তাবিল ব্যতীত ফারসি (তথা অনারবি ভাষায় অনুবাদ করে) আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা বৈধ নয়।৬১১ কিন্তু উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, অন্য ভাষায় কুরআনের অনুবাদ করতে গেলে শাব্দিক অর্থ অনুবাদের বিকল্প নেই।

মোল্লা আলি কারি বলেন, 'ইয়াদ' তাবিল না করার ব্যাপারে সালাফ একমত হয়েছেন। যেহেতু ইমাম মনে করতেন, যদি অন্যান্য সিফাতের মতো এটাকেও অন্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়, তবে তানযিহ লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, তাশবিহ ও তাবিল ঢুকে যেতে পারে, তাই তিনি এটাকে অনুবাদ করতেও নিষেধ করেছেন।৬১২ সালাফ ইয়াদের তাবিল করতে নিষেধ করেছেন—এটা সঠিক বক্তব্য। কিন্তু তানযিহ লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা স্রেফ ইয়াদের ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য সিফাতের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। ফলে সেগুলোর অনুবাদও অবৈধ হওয়ার কথা।

বায়াযি লিখেছেন, ফারসিতে 'ইয়াদ' রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয় না, স্রেফ অঙ্গ অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু 'ওয়াজহ'সহ অন্যান্য শব্দ রূপক অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এ জন্য তিনি 'ইয়াদ' অনুবাদ করতে নিষেধ করেছেন।৬১৩ এটাও বাস্তবানুগ বক্তব্য নয়। ফারসিসহ অন্যান্য ভাষায় 'হাত' রূপক অর্থে আরবির মতোই ব্যবহৃত হয়, স্রেফ অঙ্গের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।

আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, 'ইয়াদ', 'আইন' এসব সিফাত অনারবি ভাষায় প্রয়োগ করা যাবে কি না? আহলে সুন্নাতের একদল আলেমের মতে, অঙ্গ না ভাবার শর্তে প্রয়োগ করা বৈধ। আরেক দল সতর্কতাবশত অবৈধ বলেছেন। (আমার কাছে) এটাই বিশুদ্ধ।৬১৪ কিন্তু উক্ত বক্তব্যের উপর আপত্তি করা যায়। কারণ, আরবিতে 'ইয়াদ' বলে যদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয় এমন বলতে হয় (যেটা আহলে সুন্নাতের সবাই বলেন, খোদ বাযদাবিও বলেছেন), এটাকে বাংলায় স্রেফ 'ইয়াদ'-এর বাংলা প্রতিশব্দ 'হাত' হিসেবে অনুবাদ করে 'অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয়' এমন সতর্কবাণী যোগ করে দিলেই হয়। ফলে আরবিতে যদি এটা বলা যায়, বাংলাসহ অন্যান্য ভাষায়ও অনুবাদ করতে পারা উচিত।

এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ কথা হলো, 'ইয়াদ'-কে 'হাত' বলার দ্বারা কেউ আল্লাহর ক্ষেত্রে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মনে করতে পারে এমন আশঙ্কা থাকলে তো প্রথমেই সেটা পরিত্যাজ্য। এমন আশঙ্কা থাকলে কেবল 'ইয়াদ' নয়, 'ওয়াজহ'-এর অনুবাদও নিষিদ্ধ। তবুও ইমাম স্বতন্ত্রভাবে 'ইয়াদ'-এর অনুবাদ নিষিদ্ধ করেছেন। খুব সম্ভবত এর একটি কারণ এমন হবে যে, ইমাম 'ইয়াদ'-এর ফারসি বা অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ হওয়ার পরে কিছু বিচ্যুতি (তাশবিহ/তাজসিম) দেখে থাকবেন। আরেকটা কারণ হতে পারে—যেমনটা আমরা পিছনে দেখেছি, সামনেও দেখব—বিভিন্ন সিফাতের ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিন থেকে একাধিক বক্তব্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সকল সিফাতে সকল সালাফের কর্মপদ্ধতি এক ছিল না। বিভিন্ন সিফাত তারা অর্থসহ ইসবাত (অর্থ সাব্যস্ত) করেছেন। অনেকে সিফাত তাফবিজ (অর্থ ও ধরন দুটোই আল্লাহর কাছে সমর্পণ) করেছেন। আবার কোনো কোনো সিফাত তাবিল (রূপকার্থে ব্যাখ্যা) করেছেন। কিন্তু 'ইয়াদ'-এর ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিন সবার বক্তব্য এক—এটাকে যেভাবে এসেছে সেভাবে রেখে দিতে হবে। কেউ এটার কোনো তাবিল করেননি। ফলে সর্বোচ্চ তানযিহ (বিশুদ্ধ তাওহিদ) বাস্তবায়নের জন্য ইমাম এটার অনুবাদও নিষেধ করে দেন, যাতে তাশবিহ বা তাবিলের সকল পথ বন্ধ হয়ে যায়। একই কথা অনেক আলেম 'ইস্তিওয়া', 'নুযুল' ইত্যাদির ক্ষেত্রেও বলেছেন। উদ্দেশ্য কুরআনি শব্দের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা, সর্বোচ্চ তানযিহ বাস্তবায়ন করা। কারণ, সালাফ এসব সিফাত ভিন্ন ভাষায় উচ্চারণ করেননি। প্রয়োজন ছাড়া সেটা দরকারও নেই।

ফলে ইমাম আজম 'ইয়াদ'-এর অনুবাদ নিষেধ করেছেন বিশেষ প্রেক্ষাপটে, শর্তসাপেক্ষে। তাঁর বক্তব্য উন্মুক্ত ধরা যাবে না। কেউ আরবি ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় 'ইয়াদ'-এর অনুবাদ করলেই সেটা নিষিদ্ধ হবে এমন বোঝা যাবে না। বরং তাশবিহ-তাতিল নাকচ করে যেকোনো ভাষায় আল্লাহর সিফাতগুলোর অনুবাদ বৈধ। তবে উত্তম হলো কুরআনি শব্দের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা।

টিকাঃ
৬১১. আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৪৭৩)।
৬১২. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৯৩)। আদ-দুররুল আযহার (৫৯)।
৬১৩. ইশারাতুল মারাম (১৯১)।
৬১৪. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৩৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00