📄 ফিতরত আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষী
আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে ফিতরতের উপর সৃষ্টি করেছেন। ‘ফিতরত’ শব্দের অর্থ হলো ‘বিশেষ স্বভাব-প্রকৃতি’র উপর মানুষের সৃষ্টি। এটা মানুষের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ। ফলে মানুষের প্রকৃতি বিকৃতির শিকার না হলে ভালোর প্রতি তাঁর সহজাত আকর্ষণ থাকে, মন্দের প্রতি বিকর্ষণ থাকে। ঈমানের প্রতি অনুরাগ থাকে, কুফরের প্রতি বিরাগ থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ অর্থ : 'তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি (ফিতরত) যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।' [রুম : ৩০] রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'প্রত্যেক নবজাতক ফিতরতের উপর জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীকালে তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা অগ্নিপূজক বানায়।'
এখানে হাদিসের অর্থ এটা নয় যে, প্রত্যেক শিশু ইসলাম ধর্মের উপর জন্মগ্রহণ করে, বরং প্রত্যেকে সুস্থ ও সুনির্মল প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহতে ঈমানের প্রতি স্বভাবজাত আকর্ষণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। মাতা-পিতা মুমিন হলে সেও ধীরে ধীরে মুমিন হিসেবে গড়ে ওঠে, আর মাতা-পিতা কাফের হলে তাদের এবং পারিপার্শ্বিক প্রভাবে সেই শিশুর 'ফিতরত' বিকৃতির শিকার হয়। একসময় সে অন্য ধর্মের অনুসারী হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন আসতে পারে, যদি প্রতিটি শিশু শেষ পর্যন্ত মাতা-পিতার অনুসারীই হয়, তাহলে ফিতরত থাকার উপকারিতা কী? জবাব হলো, ফিতরতের উপর সৃষ্টি মানুষের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ। আল্লাহ যদি মানুষকে সরাসরি ঈমান বা কুফরের উপর সৃষ্টি করতেন, তবে সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার মাঝে তাঁর পরীক্ষার 'হিকমত' বিদ্যমান থাকত না। জগতের সকল মানুষ যদি মুমিন হয়ে জন্ম নিত, তবে নবি-রাসুল পাঠানো এবং কিতাব পাঠানোর অর্থ থাকত না; সত্য-মিথ্যার সংগ্রাম থাকত না; তাওহিদ ও শিরকের সংঘাত থাকত না; ঈমানের জন্য পরীক্ষা দিতে হতো না। ফলে চূড়ান্তভাবে জান্নাত পাওয়ারও উপযোগিতা থাকত না। কারণ, ঈমানটা তার অর্জন নয়, আল্লাহর দান পরিগণিত হতো। একইভাবে জগতের সকল মানুষ যদি কাফের হয়ে জন্ম নিত, তবে জাহান্নামের উপযুক্তও হতো না। কারণ, কুফরটা তার অর্জন নয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া। ফলে সেটা আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের হুজ্জত (দলিল) গণ্য হতো।
আর যদি আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কুফর ও মন্দের প্রতি স্বভাবজাত আকর্ষণ দিয়ে সৃষ্টি করতেন, তবে পৃথিবী মানবতাশূন্য হয়ে পড়ত, পাশবিক আচরণে পূর্ণ হয়ে যেত। মানুষের প্রতি মানুষের দরদ থাকত না, মানবিকতা থাকত না। ভালো, সত্য, ইনসাফ ও আমানতের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতা থাকত না। পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ত। শয়তানের ধোঁকা ও প্রতারণা ছাড়াই মানুষ জাহান্নামের পথে ছুটে যেত। ফলে এটা এক ধরনের 'জাবর' তথা অন্যায়ের প্রতি বাধ্যকরণের পর্যায়ে পড়ত।
বাকি থাকল ভালোমন্দ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যমুক্ত একেবারে 'নিরপেক্ষ' ও 'সাদা ফলকের' মতো তৈরি করা; অথবা ভালোর প্রতি, সত্যের প্রতি আকর্ষণ দিয়ে সৃষ্টি করা। দুটোর প্রত্যেকটাই আল্লাহর ইনসাফপূর্ণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু মানুষের জন্য দুটো সমান ছিল না। কারণ, নিরপেক্ষভাবে তৈরি করলে সত্য ও ভালোর পথে চলা মানুষের জন্য কঠিন হয়ে যেত। ন্যায় ও ইনসাফ বোঝা মানুষের জন্য দুরূহ হয়ে পড়ত। তাই আল্লাহ মানুষকে সত্যের কাছাকাছি রাখতে, সত্য গ্রহণের পথ সহজ করতে, ইনসাফ ও অনুগ্রহের মাঝে সমন্বয় বিধান করতে মানুষকে 'ফিতরত' তথা ঈমান ও কল্যাণের প্রতি স্বভাবজাত আকর্ষণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এটা আল্লাহর করুণা, আবার ইনসাফের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক নয়।
ইমাম আজম রহ. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা আদম সন্তানকে তাঁর (আদমের) পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করেছেন। তাদের জ্ঞান দান করেছেন। তাদের সম্বোধন করে ঈমানের নির্দেশ দিয়েছেন। কুফরি থেকে বারণ করেছেন। তখন তারা আল্লাহর রবুবিয়্যাতকে স্বীকার করে নিয়েছিল। আর এভাবেই তারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিল। পরবর্তীকালে আদম সন্তান সেই ফিতরত (ঈমানের প্রস্তুতির) উপরই জন্মলাভ করে। সুতরাং পরে যে কুফরি করল, সে মূলত (তার প্রতিশ্রুতি) বদলে ফেলল। আর যে ঈমান আনল এবং সত্যায়ন করল, সে (প্রতিশ্রুতির উপর) অটল ও অবিচল রইল। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কাউকে কুফর বা ঈমানের উপর বাধ্য করেননি। কিংবা কাউকে মুমিন বা কাফের হিসেবে সৃষ্টি করেননি। বরং সবাইকে সৃষ্টি করেছেন মানুষ হিসেবে। ৫২৭ অর্থাৎ, আল্লাহ কাউকে মুমিন কিংবা কাফের অবস্থায় সৃষ্টি করেননি। কিন্তু স্বাভাবিক ফিতরতের উপর থাকলে মানুষ মুমিন হয়। আর যদি ফিতরত বিকৃতির শিকার হয়, তখন সে মানুষ ঈমানের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
টিকাঃ
৫২৫. দেখুন: আল-মুফরাদাত ফি গরিবিল কুরআন, রাগেব আস্ফাহানি (৬৪০)।
৫২৬. বুখারি (কিতাবুল জানায়েয: ১৩৮৫)। মুসলিম (কিতাবুল কদর: ২৬৫৮)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ : ৪৭১৪)।
৫২৭. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪)।
📄 আকল (বিবেক-বোধ) আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষী
ঈমান ও কুফর জানার ক্ষেত্রে আকলের ভূমিকা অপরিসীম। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে তাঁর অস্তিত্বের উপর আকলি দলিল দিয়েছেন। আল্লাহকে অনুভবের জন্য, কুফর বর্জনের জন্য মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ أَمْ خَلَقُوا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ بَل لَّا يُوقِنُونَ অর্থ : ‘তারা কি এমনি এমনি সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই সৃষ্টিকর্তা? নাকি তারা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং তারা তো অবিশ্বাসী।' [তুর: ৩৫-৩৬]
আরও বলেন, ‘বলো তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বর্ষণ করেছেন পানি; অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম বাগান সৃষ্টি করেছি। তাতে বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার শক্তিই তোমাদের নেই। আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? বরং তারা সত্যবিচ্যুত সম্প্রদায়। বলো তো কে পৃথিবীকে বাসোপযোগী করেছেন এবং তার মাঝে মাঝে নদনদী প্রবাহিত করেছেন আর তাকে স্থির রাখার জন্য পর্বত স্থাপন করেছেন এবং দুই সমুদ্রের মাঝখানে অন্তরায় রেখেছেন। আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না। বলো তো কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন আর পৃথিবীতে তোমাদের পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন। আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই স্মরণ করো। বলো তো কে তোমাদের জলে ও স্থলে অন্ধকারে পথ দেখান এবং কে তাঁর অনুগ্রহের পূর্বে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন? আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? তারা যাকে শরিক করে, আল্লাহ তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। বলো তো কে প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন এবং কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দান করেন। আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? বলুন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত করো।' [নামল: ৬০-৬৪]
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 'তিনি আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত। তোমরা সেটা দেখছ। তিনিই পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, যাতে এটা তোমাদের নিয়ে হেলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বপ্রকারের জীবজন্তু। আমিই আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে এতে উদ্গত করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ। এটা আল্লাহর সৃষ্টি! তিনি ব্যতীত অন্যরা কী সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও! সীমালঙ্ঘনকারীরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।' [লুকমান: ১০-১১]
এই কুরআনি হেদায়াত অনুসরণ করে ইমাম আজমও আকল তথা সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষত নাস্তিক ও অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে তিনি আকলি তথা বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল-প্রমাণের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল ছিলেন, অভিজ্ঞ ছিলেন। বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের মাধ্যমে তিনি অসংখ্যবার বিভিন্ন নাস্তিক-অবিশ্বাসীকে পরাজিত করেছেন। ঈমানের পথে এনেছেন। এটা সে যুগেও যেমন বাস্তবসম্মত ছিল, আজকের যুগেও বাস্তবসম্মত। সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর বিস্ময়কর নিদর্শনাবলি, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রমাণিত তথ্য-উপাত্ত (ফ্যাক্ট) বিশ্লেষণের মাধ্যমে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করা, নাস্তিক্যবাদের উপর ঈমানের যৌক্তিকতা তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি কাজ; ইসলামের দাওয়াতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইমাম আজম রহ. বলেন, 'আল্লাহর উপর ঈমান আনার জন্য নবি-রাসুল পাঠানো জরুরি নয়, বরং মানুষের বিবেক দ্বারাও সেটা সম্ভব। ফলে আল্লাহ যদি কোনো নবি-রাসুল না পাঠাতেন, তবুও বিবেকের কারণে মানুষের উপর তাঁর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব হতো। হ্যাঁ, শরিয়তের বিধিবিধান জানা অপরিহার্য হতো না। কিন্তু আকাশ ও যমিনে বিদ্যমান এত এত নিদর্শন থাকার পরও কেউ যদি এগুলোর সৃষ্টিকর্তাকে স্বীকৃতি না দিত, তবে নবি-রাসুল না পাঠানো সত্ত্বেও সে রেহাই পেত না।' ৫২৮
কেবল কুরআন সুন্নাহ নয়, যুক্তির আলোকে ইমাম আজম রহ. আল্লাহর অস্তিত্বের আবশ্যকতা সাব্যস্ত করতেন এবং সন্দেহবাদীদের খণ্ডন করতেন। আবু ইউসুফ রহ.-এর বর্ণনায় এসেছে, ইমাম বলেন, 'উত্তাল তরঙ্গোদুবেল ও ঝোড়ো সমুদ্রে মালবোঝাই এক জাহাজ কি নাবিক ছাড়া সোজা পথে চলতে পারে? পৃথিবীর যেকোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ বলবে, এটা সম্ভব নয়। নাবিক ছাড়া ঝোড়ো হাওয়ায় মাতাল সমুদ্রে জাহাজ নিজ পথে চলতে পারবে না, ডানে বামে বেঁকে যাবে। ইমাম বলেন, তাহলে এটা কী করে সম্ভব যে, এই পৃথিবীর সবকিছু একজন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া চলবে? এখানে নিত্যনতুন আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়। দুনিয়ার রূপ বদলায়। নানা বৈচিত্র্যের এই পৃথিবী কী করে একজন সৃষ্টিকর্তা ও রক্ষাকর্তা ছাড়া টিকে থাকতে পারে? একটি শিশু মায়ের পেট থেকে কোনো তারকা কিংবা প্রকৃতির শক্তিতে বের হয়ে আসে না, বরং পরম প্রজ্ঞাময় সৃষ্টিকর্তার আদেশ ও নির্ধারণে বের হয়ে আসে। পৃথিবীর এত রূপ ও বৈচিত্র্য এত পরিবর্তন এমনিতেই হয় না। এর জন্য একজন পরিবর্তনকারী দরকার। আর তিনিই হলেন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা। উন্মুক্ত খাঁখাঁ শূন্য প্রান্তরে হঠাৎ একদিন একটি বিশাল গগনচুম্বী অট্টালিকা দেখলে যেমন বোঝা যায় এটা কেউ বানিয়েছে, এই পৃথিবীর সবকিছুই বুঝিয়ে দেয় এগুলোরও একজন স্রষ্টা রয়েছেন।' ৫২৯
বর্ণিত আছে, একদল লোক ইমাম আজমের সঙ্গে আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক করতে চাইল। ইমাম তাদের বলেন, 'বিতর্ক শুরুর আগে তোমরা আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও : দজলা নদীতে একটি জাহাজ এলো। নিজে নিজেই খাদ্যশস্যে পূর্ণ হলো। অতঃপর নিজে নিজেই গন্তব্যে যাত্রা করল। কারও সাহায্য ও পরিচালনা ছাড়াই জাহাজটি এসব কাজ নিজে নিজে করল। এটা কী করে সম্ভব?' তারা বলল, এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। ইমাম বললেন, 'যদি একটা জাহাজের বেলায় এটা সম্ভব না হয়, এত বিশাল পৃথিবীর ব্যাপারে কী করে সম্ভব?' ৫৩০
কামালুদ্দিন বায়াযি আবু মুহাম্মাদ হারেসির 'আল-কাশফ', আতা জুযজানির 'শরহুল ফিকহিল আবসাত', বাযযাযির 'আল-মানাকিবুস সুগরা' ও সারিমুদ্দিন মিসরির 'নাজমুল জুমান' সূত্রে বর্ণনা করেছেন, 'ইমাম আজম রহ. আল্লাহর অস্তিত্বের আরেকটি যুক্তি দেন এভাবে—পৃথিবীতে বিদ্যমান 'জাওহার' (মৌল) ও 'আরাজ' (অমৌল; রূপ-রং) সহ সকল বস্তু এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় নিত্য পরিবর্তনশীল। অথচ প্রত্যেকটি পরিবর্তনের জন্য একজন পরিবর্তনকারী আবশ্যক। আর পৃথিবীর সেই পরিবর্তনকারী হলেন পৃথিবীর স্রষ্টা। ৫৩১
বায়াযি আবু শাকুর সালেমির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন, 'ইমাম আজম রহ. আল্লাহর অস্তিত্বের পক্ষে আরও একটি যুক্তি দিয়েছেন গর্ভস্থ ভ্রূণের মাধ্যমে। ইমামের মতে, মায়ের গর্ভে একটি ভ্রূণের পূর্ণ অবয়ব লাভ এবং পরবর্তীকালে সুন্দর আকৃতিতে পৃথিবীতে তার আগমন তারকা কিংবা প্রকৃতির প্রভাবে হতে পারে না। বরং এর পিছনে একজন সর্বজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিনৈপুণ্য রয়েছে। ৫৩২
আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বিশ্বজগতের প্রত্যেকটি সৃষ্টিতে এত বিস্ময়কর নিদর্শন দেখাচ্ছে, যা সন্দেহাতীতভাবে একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে। এলোপাতাড়ি কিংবা হঠাৎ বিস্ফোরণের ফল স্রেফ বিশৃঙ্খলা। অথচ গোটা মহাবিশ্বের ভাঁজে ভাঁজে এক অদ্ভুত শৃঙ্খলা ও নিপুণতার সমুজ্জ্বল ছাপ সুস্পষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান থেকে। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাটবদ্ধ রক্তপিণ্ডরূপে সৃষ্টি করি। অতঃপর রক্তকে মাংসপিণ্ডরূপে সৃষ্টি করি। অতঃপর সেই মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করি। অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করি। অবশেষে তাকে নতুন রূপে দাঁড় করাই। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ মহা কল্যাণময়।' [মুমিনুন : ১২-১৪]
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে বলেন, 'তোমাদের প্রত্যেককে মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন পর্যন্ত (সৃষ্টির উপাদানরূপে) সংগৃহীত করা হয়। অতঃপর তা রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়। অতঃপর মাংসপিণ্ডে। এরপর আল্লাহ তার কাছে চারটি বিষয়ের নির্দেশ দিয়ে একজন ফেরেশতা পাঠান। ফেরেশতা তার আমল, জীবনকাল, রিযিক এবং সে সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা, সেটা লিখে রাখেন। অতঃপর তার মাঝে রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়।' ৫৩৩
ইমাম আল্লাহর অস্তিত্বের আরও একটি প্রমাণ দিচ্ছেন, “পৃথিবীতে আল্লাহ অসংখ্য নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন মানুষের কাছে তাঁকে চেনানোর জন্য, তাঁর সঙ্গে মেলানোর জন্য। ফলে পৃথিবীতে এসে তারা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডেকেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নবি-রাসুলের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে চেনেনি, বরং আল্লাহর মাধ্যমে নবি রাসুল চিনেছে। কারণ, যখন নবি-রাসুলগণ এসে মানুষের কাছে আল্লাহর কথা তুলে ধরেন, তখন তাদের কথা সত্য নাকি মিথ্যা সেটা মানুষের বোঝার সাধ্য ছিল না। আল্লাহই মানুষের হৃদয়ে নবিদের প্রতি ঈমান ও সত্যায়ন ঢেলে দিয়েছেন, ফলে মানুষ ঈমান এনেছে। আল্লাহ বলেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِى مَنْ يَشَاءُ ۖ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ অর্থ : 'আপনি যাকে পছন্দ করেন তাকে হেদায়াত দিতে পারবেন না, বরং আল্লাহ তায়ালাই যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন। কে হেদায়াত পাবে সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।” [কাসাস : ৫৬] ৫৩৪
টিকাঃ
৫২৮. আল-উসুলুল মুনিফাহ, বায়াযি (১২)।
৫২৯. আল-উসুলুল মুনিফাহ (১২)।
৫৩০. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৮)।
৫৩১. ইশারাতুল মারাম (৯৩)।
৫৩২. ইশারাতুল মারাম (৯২)।
৫৩৩. বুখারি (কিতাবুত তাওহিদ: ৭৪৫২)। মুসলিম (কিতাবুল কদর: ২৬৪৩)।
৫৩৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (৩১-৩২)।
📄 নাস্তিকদের সঙ্গে ইমামের বিতর্ক
ইমাম বিভিন্ন সময় নাস্তিকদের সঙ্গে বিতর্ক করতেন। যুক্তির মাধ্যমে তাদের পরাস্ত করতেন। এমন একটি ঘটনা সমরকন্দি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, একবার ইমাম আবু হানিফা রহ. এক নাস্তিক (দাহরি) লোকের সাথে বিতর্কে বসলেন। নাস্তিক বলল, পৃথিবীতে যাবতীয় বস্তুর পরিবর্তন স্রষ্টার কারণে নয়, বরং এর চারটি মৌল প্রকৃতি তথা আর্দ্রতা, শুষ্কতা, শীতলতা ও তাপের কারণে হয়। যখন এই চারটি মৌল পদার্থ বরাবর ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে, তখন সেই ব্যক্তি বা বস্তুও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। যখন একটি পদার্থ অন্যগুলোর উপর বিজয়ী হয় (ছাড়িয়ে যায়), তখন ভারসাম্য নষ্ট হয়। ইমাম আবু হানিফা রহ. বললেন, 'স্রষ্টাকে অস্বীকার করতে গিয়ে তোমার এ কথার মাধ্যমে নিজেই স্রষ্টা ও সৃষ্টি দুটোকেই প্রমাণ করে দিলে। কারণ, তুমি স্বীকার করলে, একটি পদার্থ অন্যগুলোর উপর বিজয়ী হয়। অন্যগুলো পরাজিত হয়। এর মানে, পৃথিবীতে জয়ী ও পরাজিতের অস্তিত্ব আছে। একইভাবে গোটা পৃথিবীর উপর একজন জয়ী আছেন। আর তিনি হলেন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। এ কথা শুনে নাস্তিক ঈমান গ্রহণ করল। ৫৩৫
বরং নাস্তিক্যবাদ ও নাস্তিকদের (দাহরিয়িয়নের) বিরুদ্ধে তাঁর অব্যাহত সংগ্রামের কারণে তিনি তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হন। তারা তাঁকে হত্যার সুযোগ খুঁজতে থাকে। ঘটনাক্রমে একদিন ইমাম তাঁর মসজিদে একা ছিলেন। তখন একদল দাহরিয়্যিন তাঁর উপর তরবারি ও ছুরি নিয়ে আক্রমণ করে। তারা তাঁকে হত্যার উপক্রম করে। তখন ইমাম তাদের বলেন, 'একটু সবর করো! আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিয়ে যা মন চায় করো।' তারা বলল, কী প্রশ্ন? তিনি বললেন, 'সে ব্যক্তির ব্যাপারে তোমাদের কী বক্তব্য যে বলে, আমি তরঙ্গোদবেল সমুদ্রে একটি মালবোঝাই জাহাজ দেখেছি যেটা সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ ও ঝোড়ো হাওয়ার মাঝেও ডানে-বামে না গিয়ে সোজা ধীর-স্থিরভাবে চলছে। অথচ তাতে কোনো মাঝিমাল্লা নেই। পাল-মাস্তুল নেই। এই কথা কি বিশ্বাসযোগ্য?' তারা বলল, কখনো নয়। এটা কোনো যৌক্তিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক কথা নয়। ইমাম বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! মাঝিমাল্লাবিহীন একটি নৌকা যদি সমুদ্রে সোজাভাবে চলতে না পারে, তবে এই বিশাল পৃথিবী, পৃথিবীতে বিদ্যমান এত রং ও রূপ, এত সৃষ্টি ও বৈচিত্র্য—এগুলো সব কোনো সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এমনিতেই অস্তিত্বে চলে এসেছে? কোনো রক্ষাকর্তা ছাড়া এমনিতেই বিদ্যমান রয়েছে?' ইমামের কথা হামলাকারীদের মনে দারুণ প্রভাব ফেলল। তারা সকলে কাঁদতে কাঁদতে ইমামকে বলল, আপনি সত্য বলেছেন। অতঃপর তারা অস্ত্র ফেলে দিয়ে ইমামের হাতে তাদের গোমরাহি থেকে তাওবা করল। ৫৩৬
টিকাঃ
৫৩৫. শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৪৪)।
৫৩৬. মানাকিব, মক্কি (১৫১)।