📄 তাওহিদের প্রকারভেদের ক্ষেত্রে খালাফের অতিরঞ্জন
কিন্তু খালাফ তথা পরবর্তী সময়ে মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন ধারার আলেমগণ তাওহিদের প্রকারভেদের ক্ষেত্রে এই 'তাওকিফ' (কুরআন-সুন্নাহ নির্ভরতা)-এর উপর অবিচল থাকেননি, সালাফে সালেহিনের মানহাজ ধরে রাখতে পারেননি। বরং তারা কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফের বক্তব্যের বাইরে গিয়ে ইজতিহাদের মাধ্যমে তাওহিদের বেশ কিছু প্রকার নির্ধারণ করেছেন। কেউ তিন প্রকার, কেউ-বা দুই প্রকার, আবার কেউ চার প্রকার।
প্রশ্ন হতে পারে, যদি এক্ষেত্রে তারা কুরআন-সুন্নাহ ইজতিহাদ করে এসব প্রকার বের করে থাকেন এবং এগুলো ইসলামি আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তাহলে জটিলতার তো কিছু নেই। হ্যাঁ, এ কথার সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত হওয়া সম্ভব। যেহেতু বিষয়গুলো ইজতিহাদি এবং শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, তাই তাওহিদকে সহজভাবে বোঝার জন্য উদ্ভাবিত এই প্রকারভেদগুলোতে বড় ধরনের কোনো জটিলতা থাকার কথা ছিল না। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয়ে গিয়েছে অন্য একাধিক কারণে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো :
এক. যন্নি (ধারণামূলক) প্রকারভেদকে কাতয়ি (চূড়ান্ত ও সুনিশ্চিত)-এর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। ফলে প্রত্যেক ধারা নিজেদের প্রকারভেদকে চূড়ান্ত ও অনিবার্য গণ্য করেছে, অন্যদের প্রকারভেদের সমালোচনা করেছে। প্রত্যেকে নিজেদের প্রকারভেদকে কুরআনের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা এবং সালাফে সালেহিনের মানহাজের একমাত্র সঠিক প্রতিনিধি দাবি করেছে; অন্যদেরটা বিভিন্ন যুক্তিতে বাতিল করে দিয়েছে। ফলাফল হলো, এমন একটা বিষয় যা কুরআন-সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়নি, সালাফে সালেহিন যে ব্যাপারে কথা বলেননি, একসময় সেটাই মুসলিম উম্মাহর ভেদাভেদের হাতিয়ার হয়ে গেল।
দুই. তাওহিদকেন্দ্রিক ভারসাম্যহীনতা। এই প্রকারভেদ থেকে তৈরি হওয়া আরেকটি বড় জটিলতা হলো তাওহিদকেন্দ্রিক ভারসাম্যহীনতা, বিশেষত কুরআনি তাওহিদের গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রকার ‘রবুবিয়্যাহ’ ও ‘উলুহিয়্যাহ’র মাঝে ভারসাম্য বিধানের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হওয়া। কুরআনে রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহ তাওহিদের অবিচ্ছেদ্য দুই ভিত্তি। ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে কুরআন যেখানে রবুবিয়্যাহর কথা বলেছে, সেখানেই উলুহিয়্যাহ রয়েছে; যেখানে উলুহিয়্যাহর কথা বলেছে, সেখানেই রবুবিয়্যাহ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আম্মান ইউজীবুল মুদত্বাররা ইযা দাআহু ওয়া ইয়াকশিফুস সুআ ওয়া ইয়াজআলুকুম খুলাফাউল আরদ্বি আইলাহুম মাআল্লাহি কলিলান মা তাযাক্কারুন ‘তবে কে তিনি যিনি অসহায়-আর্তের ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদাপদ দূরীভূত করেন, আর পৃথিবীতে তোমাদেরকে প্রতিনিধি করেন। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহ আছে কি? তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।’ [নামল : ৬২] এখানে দেখুন কীভাবে আল্লাহর রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহকে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যিনি রব তিনিই ইলাহ হওয়ার উপযুক্ত। যিনি প্রকৃত ইলাহ তিনি প্রকৃত রবও। আল্লাহ বলেন, মা লা ইয়াখলুকুনা শাইআও ওয়াহুম ইউখলাকুনা ওয়ালা ইয়াসতাতিউনা লাহুম নাসরাও ওয়ালা আনফুসাহুম ইয়ানসুরুনা। (আল্লাহর সঙ্গে) এমন কিছু শরিক করে, যা কোনোকিছু সৃষ্টি করতে পারে না? বরং খোদ তারাই সৃষ্টি। আর না তাদের সাহায্য করতে পারে, বরং নিজেদের সাহায্যও করতে পারে না।’ [আরাফ: ১৯১-১৯২] এখানে রবের সঙ্গে শিরককে ভর্ৎসনা করা হয়েছে। কারণ, যিনি রব তিনিই ইলাহ। একজনকে প্রকৃত অর্থে রব মেনে অন্যজনকে ইলাহ বানানো নির্বুদ্ধিতা ও অসুস্থতা। আল্লাহ আরও বলেন, ক্বুল আরাআইতুম ইন জাআলাল্লাহু আলাইকুমুন নাহার সামাদান ইলা ইয়াওমিল কিয়ামাতি মান ইলাহুন গাইরুল্লাহি ইয়াতিকুম বিলাইলিন তাসকুনুনা ফিহি আফালা তুবসিরুন অর্থ : “বলুন, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি দিবসকে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করেন, আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন ইলাহ আছে, যে তোমাদের জন্য রাত্রি এনে দেবে, যাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পারো? তবুও কি তোমরা চোখ মেলে দেখবে না।” [কাসাস : ৭২] এখানে ‘ইলাহ’-কে মূলত ‘রব’-এর জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে। রবের গুণাবলি ইলাহের উপর প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ, রব ও ইলাহ অবিচ্ছেদ্য, ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
প্রথম যুগের ইমামগণ কুরআনের আয়াতগুলোকে এই ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজেই ব্যাখ্যা করেছেন। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ইমাম তাবারির (৩১০ হি.) তাফসির। এ গ্রন্থে রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহকে অঙ্গাঙ্গিভাবে পেশ করা হয়েছে।
যেমন—ইমাম তাবারি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ [বাকারা : ১৬৩]-এর তাফসির প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রদান যে, তিনি ছাড়া বিশ্বজগতের আর কোনো প্রতিপালক নেই। তিনি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নেই।’৫১৭ আরেক আয়াতে তিনি আল্লাহর সামনে সৃষ্টির নতশির হওয়ার বর্ণনা (আলে ইমরান : ৮৩) দিতে গিয়ে বলেন, ‘আকাশ ও যমিনের সবাই তাঁকে মাবুদ বলে স্বীকার করে, তাঁকে একমাত্র রব মেনে তাঁর সামনে মাথা নত করে।’৫১৮
কুরআনের আয়াত : ﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا﴾ অর্থ : ‘আর তোমরা আল্লাহর উপাসনা করো। তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক করো না।’ [নিসা : ৩৬]– এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ইমাম তাবারি লিখেন, ‘তোমরা আল্লাহর রবুবিয়্যাহ ও ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকে শরিক করো না।’৫১৯ তাবারি আল্লাহ তায়ালার বাণী : ক্বুল ইন্নামা আনা বাশারুম মিসলুকুম ইউহা ইলাইয়া আন্নামা ইলাহুকুম ইলাহুন ওয়াহিদ ফামান কানা ইয়ারজু লিকাআ রব্বিহি ফালিয়া'মাল আমালান সলিহাও ওয়ালা তুশরিক বি ইবাদাতি রব্বিহি আহাদা অর্থ : ‘আপনি বলুন, আমি তোমাদের মতোই মানুষ। আমার কাছে ওহি আসে যে, তোমাদের ইলাহ একজন ইলাহ। সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁর রবের সাক্ষাৎ প্রত্যাশ্যা করে, সে যেন পুণ্য করে, আর তাঁর রবের ইবাদতের সঙ্গে কাউকে শরিক না করে।’ [কাহাফ : ১১০]-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘যেন একমাত্র তাঁর ইবাদত করে। একমাত্র তাঁর জন্য রবুবিয়্যাহ সাব্যস্ত করে।’৫২০ এগুলো স্রেফ উদাহরণ। নতুবা পুরো তাফসিরে তাবারি একই কর্মপদ্ধতির উপর প্রতিষ্ঠিত 'রবুবিয়্যাহ' ও 'উলুহিয়্যাহ' দুটোর অবিচ্ছেদ্যতা ও ভারসাম্যের দলিল।
এটাই কুরআনের মর্মকথা, সকল সালাফের কর্মপন্থা। এ কারণে ইমাম আবু হানিফা থেকে শুরু করে তহাবি পর্যন্ত—যেমনটা পিছনে দেখানো হয়েছে—সবাই সামগ্রিক তাওহিদের কথা বলেছেন, যেখানে তাওহিদকে প্রকারভেদের মারপ্যাঁচে ফেলে অঙ্গহানি করা হয়নি। সকল দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ একত্ববাদের বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত প্রকারভেদের জটিলতায় তাওহিদের এই ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। একদল উলুহিয়্যাহকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে রবুবিয়্যাহকে গৌণ করে দিয়েছেন; আরেক দল রবুবিয়্যাহকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে উলুহিয়্যাহকে গৌণ করে ফেলেছেন। অথচ দুটো মিলেই তাওহিদ। দুটো তাওহিদের অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি।
তিন. তাওহিদের পরবর্তী প্রকারভেদ থেকে সৃষ্ট সবচেয়ে বড় জটিলতা এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ফলাফল হলো—তাওহিদের মর্ম অনুধাবনের ক্ষেত্রে বিচ্যুতি। এ এমন এক বিচ্যুতি, সালাফে সালেহিনের যুগে সম্ভবত কেউ কল্পনাও করেননি। এ প্রকারভেদ তাওহিদের এমন অর্থ এনে দিয়েছে, যে অর্থ সালাফের কেউ করেননি; এমন সমীকরণ টেনেছে, যা ইসলাম ও কুরআনি মেযাজের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
সে বিচ্যুতি হলো রবুবিয়্যাহর মর্মের বিকৃতিসাধন, কাফের-মুশরিকদের মুওয়াহহিদ তথা তাওহিদবাদী সাব্যস্তকরণ। অর্থাৎ, তাওহিদের বিভিন্ন প্রকারভেদ করতে গিয়ে একদল লোক তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ বলতে আল্লাহকে স্রেফ পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা (এবং ক্ষেত্রবিশেষে পালনকর্তা) বুঝেছে। ফলে তারা ঘোষণা করেছে, মক্কার মুশরিকরা তাওহিদুর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাসী ছিল। কেবল মক্কার মুশরিকরা নয়, বরং দুনিয়ার অধিকাংশ মুশরিকই তাওহিদুর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাসী। রবুবিয়্যাহ অস্বীকারকারী লোক পৃথিবীতে নগণ্য। নবিগণ রবুবিয়্যাহ প্রতিষ্ঠার জন্য আসেননি, বরং তারা স্রেফ উলুহিয়্যাহ প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছেন। রবুবিয়্যাহর বিশেষ কোনো মূল্য নেই, উলুহিয়্যাহই আসল ইত্যাদি।
অথচ এগুলো তাওহিদের মর্মের বিকৃতি। 'রবুবিয়্যাহ' মানে আল্লাহ স্রেফ সৃষ্টিকর্তা নয়। তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ মানে: সৃষ্টি, রিযিক, প্রতিপালন, রক্ষণাবেক্ষণ, জীবন ও মৃত্যুদান, যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণকরণ, উপকার-অপকারের ক্ষমতা, জগৎ পরিচালনা, ইহকাল ও পরকালের মালিকানা, গোটা সৃষ্টির উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য, আল্লাহর লা-শরিক সত্তা, নামসমূহ ও গুণাবলি সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। ফলে কেউ যদি স্রেফ বলে, 'আল্লাহ বলতে একজন আছেন', অথবা 'সৃষ্টিকর্তা আছেন', অথবা শুধু 'উপরওয়ালা আছেন' ইত্যাদি, তাতেই সে একত্ববাদী হয়ে যাবে—এমনটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। বরং সর্বোচ্চ বলা যায়, সে তাওহিদের একটা ক্ষুদ্রতম অংশে বিশ্বাস করে।
কিন্তু তারা তাওহিদের প্রকারভেদ নির্ধারণ এবং প্রতিপক্ষকে খণ্ডন করতে গিয়ে ভয়ানক বিকৃতির শিকার হয়েছেন। একদিকে জগতের অধিকাংশ কাফেরকে একত্ববাদী বানিয়ে ফেলেছেন, অপরদিকে মুসলমানদের চোখে রবুবিয়্যাহকে গুরুত্বহীন করে দিয়েছেন। রবুবিয়্যাহকে মুক্তির সনদ হওয়ার ক্ষেত্রে অকার্যকর ও অর্থহীন ঘোষণা করেছেন! অথচ রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহ দুটোর সম্মিলিত রূপই সকল নবির দাওয়াতের সারকথা। ইহকাল ও পরকালের সাফল্য দুটোর উপর সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত। কুরআনের মাধ্যমে আমরা জেনেছি, আমাদের রুহের জগতে আল্লাহ প্রশ্ন করেছিলেন। আল্লাহ বলেন : ওয়া ইয আখাযা রব্বুকা মিন বনি আদামা মিন যুহুরিহিম যুররিয়্যাতাহুম ওয়া আশহাদাহুম আলা আনফুসিহিম আলাসতু বি রব্বিকুম কালু বালা শাহিনদা আন তাকুলু ইয়াওমাল কিয়ামাতি ইন্না কুন্না আন হাযা গাফিলিন অর্থ : "আর যখন আপনার রব বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদের বের করলেন এবং নিজের উপর তাদের প্রতিজ্ঞা করালেন, 'আমি কি তোমাদের রব নই?' তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। 'আবার না কিয়ামতের দিন বলতে শুরু করো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।” [আরাফ : ১৭২] এখানে শুধু 'রব' উল্লেখ করার অর্থ এটা নয় যে, তিনি কেবল প্রভু হওয়ার ওয়াদা নিয়েছেন, বরং তিনি একইভাবে মাবুদ হওয়ারও অঙ্গীকার নিয়েছেন। কিন্তু রবুবিয়্যাহ যেহেতু উলুহিয়্যাহকেও অন্তর্ভুক্ত করে, এ জন্য আলাদাভাবে 'ইলাহ' কি না সে প্রশ্ন করা হয়নি। একইভাবে কবরের তিনটি প্রশ্নের একটির ব্যাপারে হাদিসে বলা হয়েছে, 'তোমার রব কে?'৫২১ 'তোমার ইলাহ কে?' বলা হয়নি। তাহলে কি এটা বলা যাবে যে, উলুহিয়্যাহ নিষ্প্রয়োজন? না, মোটেই এমন নয়। বরং 'তোমার রব কে' প্রশ্নের মাঝে 'তোমার ইলাহ কে' এমন অর্থও বিদ্যমান। বরং হাদিসের একাধিক বর্ণনায় 'তোমার রব কে' এটা 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই' শব্দে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ৫২২ ফলে কুরআন-সুন্নাহর যত জায়গাতে 'রব' বলা হয়েছে, সর্বত্র 'ইলাহ'ও অন্তর্ভুক্ত; আবার যত জায়গাতে 'ইলাহ' বলা হয়েছে, সর্বত্র 'রব' অন্তর্ভুক্ত। কাফের-মুশরিকরা কোনো প্রকারের তাওহিদেই বিশ্বাসী নয়।
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে মক্কার মুশরিকরা যে আল্লাহকে জানত ও চিনত এর ব্যখা কী? ইমাম আজম জবাবে বলেন, 'তারা যদিও বলত আমাদের রব, কিন্তু তারা এ কথার তাৎপর্য বুঝত না। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেন, ওয়া লাইঁ সাআলতাহুম মান খলাকাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা লাইয়াকুলুন্নাল্লাহু কুলিল হামদুলিল্লাহি বাল আকসারুহুম লা ইয়া'লামুন যদি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, কে সৃষ্টি করেছেন আকাশসমূহ এবং পৃথিবী? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ তায়ালা। আপনি বলুন, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। তাদের অধিকাংশেই জানে না।।' [লুকমান : ২৫] এখানে আল্লাহর বাণী 'তাদের অধিকাংশেই জানে না'-এর মর্ম হলো, তারা যদিও মুখে বলে আল্লাহ তায়ালা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, কিন্তু এটা তারা না বুঝেই বলে। এক্ষেত্রে তাদের উদাহরণ হলো জন্মান্ধ বাচ্চার মতো, যে দিন ও রাতের ব্যাপারে শোনে, লাল ও হলুদ রঙের নাম জানে, কিন্তু এর রূপরেখা সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। কাফেরদের অবস্থাও ঠিক তা-ই। তারা মুমিনদের কাছ থেকে আল্লাহর নাম শুনে নিজেরাও মুখে বলে, কিন্তু আল্লাহকে তারা বিলকুল চেনে না। আর এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ইলাহুকুম ইলাহুন ওয়াহিদ ফাল্লাযিনা লা ইউ'মিনুনা বিল আখিরাতি কুলুবুহুম মুনকিরাতুও ওয়াহুম মুসতাকবিরুন অর্থ: 'তোমাদের ইলাহ একক ইলাহ। যারা পরজীবনে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্যবিমুখ এবং তারা দাম্ভিক।'৫২৩ [নাহল : ২২]
ইমাম আজম তাঁর শেষ জীবনের ওসিয়তেও উপরের বিচ্যুতিকে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন, “কেবল জানার নামই ঈমান নয়। এমন হলে আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা সবাই মুমিন হিসেবে গণ্য হতো। কারণ, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন, আল্লাযিনা আতাইনাহুমুল কিতাবা ইয়া'রিফুনাহু কামা ইয়া'রিফুনা আবনাআহুম অর্থ : 'যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা আপনাকে সেভাবে চেনে যেভাবে নিজের সন্তানদের চেনে।' [বাকারা: ১৪৬] তবুও তারা মুমিন নয়। কারণ, তারা জানলেও স্বীকৃতি দেয় না।”৫২৪
টিকাঃ
৫১৭. তাফসিরে তাবারি (২/৭৪৬)।
৫১৮. তাফসিরে তাবারি (৫/৫৪৯)।
৫১৯. তাফসিরে তাবারি (৭/৫)।
৫২০. তাফসিরে তাবারি (১৫/৪৩৯)।
৫২১. মুসলিম (কিতাবুল জান্নাহ : ২৮৭১)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ : ৪৭৫৩)।
৫২২. বুখারি (কিতাবুল জানায়িয: ১৩৬৯)। মুসলিম (২৮৭১)।
৫২৩. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (৩১)।
৫২৪. আল-ওয়াসিয়্যাহ, আবু হানিফা (২৭-২৮)।
📄 আল্লাহর আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলি)
মহান আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য সুন্দর নামের অধিকারী। তিনি বলেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا অর্থ: 'আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। কাজেই তোমরা তাঁকে সেসব নামে ডাকো।' [আরাফ: ১৮০] হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি সেগুলো আত্মস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' ৫৩৭
আর ভাষার ক্ষেত্রে যেহেতু মূল হলো 'তাওকিফ' তথা আল্লাহপ্রদত্ত, যেমনটা وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِعُونِي بِأَسْمَاءِ هَٰؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ অর্থ : “তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন। তারপর সেই সমুদয় ফেরেশতাদের সামনে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, ‘এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও যদি তোমরা সত্যবাদী হও'।” [বাকারা : ৩১] এ কারণে আহলে সুন্নাতের মতে, আল্লাহর তায়ালার নামগুলো ‘তাওকিফিয়্যাহ’; অর্থাৎ, আল্লাহ নিজের উপর প্রয়োগ করেননি অথবা রাসুল (সা.) বলেননি এমন কোনো নাম মানুষের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য নির্ধারণ করা বৈধ নয়।
ফলে সমার্থক হলেও কুরআন-সুন্নাহতে আসেনি এমন নাম আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যাবে না। যেমন 'জাওয়াদ' (দাতা) ও ‘আলেম' (জ্ঞানী) আল্লাহর নাম। কিন্তু এর পরিবর্তে 'সাখি' (দাতা), 'ফাযিল' (জ্ঞানী) ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে ‘রহিম' (দয়ালু) আল্লাহর নাম। কিন্তু এর জায়গায় ‘শফিক' (দয়ালু) ব্যবহার করা যাবে না। মোটকথা, অর্থ ঠিক থাকলেই আল্লাহর নাম সাব্যস্ত করা যাবে না, কিংবা এক নামের জায়গায় সমার্থক শব্দকে নাম বানানো যাবে না। কুরআনে ব্যবহৃত আল্লাহর গুণবাচক শব্দ অভিধানে খুঁজে সেসব অর্থ আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যাবে না। পুরো ব্যাপারটা শতভাগ কুরআন-সুন্নাহর উপর নির্ভরশীল থাকবে।
আল্লাহর নামসমূহের সঙ্গে সৃষ্টির নামের কোনো তুলনা নেই। বাহ্যিক সাদৃশ্য থাকলেও অর্থের গভীরতা ও বাস্তবতার সঙ্গে সৃষ্টির সাদৃশ্য নেই। ফলে আল্লাহর নামগুলোর আল্লাহর ক্ষেত্রে যে অর্থ থাকবে, সৃষ্টির ক্ষেত্রে সে অর্থ থাকবে না। যেমন—আল্লাহর নাম ‘খালিক’ তথা সৃষ্টিকর্তা, স্রষ্টা। আল্লাহর নাম ‘রহিম’ তথা দয়ালু, ‘কারিম' তথা মেহেরবান, ‘আলিম' তথা জ্ঞানী। এসব নাম সৃষ্টির উপরও প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে এগুলোর যে গভীর ও মৌলিক অর্থ থাকে, সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেটা কখনোই বিশ্বাস রাখা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, وَرَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا ۚ অর্থ : ‘তিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং তাদের অন্তর্বর্তী যা-কিছু রয়েছে তার প্রতিপালক। সুতরাং তাঁরই বন্দেগি করো এবং তাতে অবিচল থাকো। তুমি কি তাঁর সমনাম কাউকে জানো।' [মারইয়াম : ৬৫] অথচ বাস্তবে দেখা যায়, তাঁর নামের মতো নাম অনেক মানুষেরও আছে। ফলে আয়াতের মর্ম হলো, যদিও মানুষ সেসব নাম ধারণ করে, কিন্তু সেটা রূপক অর্থে। সেসব নাম পূর্ণাঙ্গ অর্থে ধারণ করার একমাত্র অধিকারী আল্লাহ তায়ালা। তাঁর শানেই সেগুলো শোভনীয়। ৫৪০
একইভাবে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য সুন্দর গুণের অধিকারী। সেগুলোকে সাতটি কিংবা কোনো বিশেষ সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করা সঠিক নয়। বরং যাবতীয় সকল জামাল ও কামাল তথা সৌন্দর্য ও পূর্ণাঙ্গতার আধার তিনি। তাঁর সত্তার মতো তাঁর গুণাবলিও চিরন্তন, চিরস্থায়ী। তিনি শুরু থেকেই এসব গুণে গুণান্বিত। সবসময় গুণান্বিত থাকবেন। সৃষ্টির কোনোকিছু যেমন তাঁর সত্তার সাদৃশ্য রাখে না, তেমনই সৃষ্টির কোনো গুণ তাঁর গুণের সাদৃশ্য রাখে না। আল্লাহর গুণকে সৃষ্টির গুণের সঙ্গে সাদৃশ্য করা কুফর। তেমনই কুরআন ও সুন্নাহতে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত আল্লাহর গুণগুলো অস্বীকার করাও কুফর।
আল্লাহর নাম ও গুণাবলিকেন্দ্রিক বিভিন্ন বিভ্রান্তির কারণেই আমাদের ইমামগণ এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেন; এক্ষেত্রে সৃষ্ট বিচ্যুতি খণ্ডন করেছেন। ৫৪১
ইমাম আজম রহ. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি। কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। তিনি তাঁর সৃষ্টির কোনো বস্তুর মতো নন। তাঁর সৃষ্টির কোনো বস্তুও তাঁর মতো নয়।' ৫৪২ এটা মূলত কুরআনের সুরা ইখলাসের ব্যাখ্যা।
ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কেউ যদি বলে, আমি আল্লাহকে মানি, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তাঁর সন্তান আছে। তখন কী হবে? ইমাম বললেন : 'সুবহানাল্লাহ! এটা কীভাবে সম্ভব? এগুলো তো সব বেহুদা প্রশ্ন। মৃত ব্যক্তির কি স্বপ্নদোষ হয়? যদি মৃত ব্যক্তির স্বপ্নদোষ হয় এমন বলা না যায়, তবে কোনো একত্ববাদীর পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে।' ৫৪৩
আমরা যদি সিফাতের ক্ষেত্রে ইমামের মানহাজের দিকে তাকাই, তবে দেখব, সেটা সালাফে সালেহিনের মানহাজ। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িন যে আকিদার উপর ছিলেন, ইমাম আজম রহ. একজন তাবেয়ি হিসেবে সেই আকিদার উপরই ছিলেন। তারা আল্লাহর সিফাতগুলোকে সাব্যস্ত করার নামে আল্লাহকে মানুষের মতো কল্পনা করেননি, আবার সরাসরি কিংবা অপব্যাখ্যার মাধ্যমে সেগুলো নাকচও করে দেননি; বরং কুরআন সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে সেভাবেই রেখে দিয়েছেন। ইমাম বলেন, 'আমরা আল্লাহকে সেভাবে চিনি যেভাবে তাঁকে চেনা উচিত, যাবতীয় গুণসহ যেভাবে তিনি নিজেকে স্বীয় কিতাবে বর্ণনা করেছেন।' ৫৪৪
আল্লাহর সিফাতের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো চিরন্তন, অনাদি (আযালি), পরবর্তীকালে তৈরি হওয়া নয়। ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালার গুণসমূহ চিরন্তন। পরবর্তীকালে অস্তিত্বে এসেছে এমন নয়, সৃষ্টও নয়। সুতরাং যে বলবে, আল্লাহর গুণসমূহ সৃষ্ট, কিংবা পরবর্তীকালে অস্তিত্বে এসেছে, কিংবা এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা অবলম্বন করবে অথবা সন্দেহ করবে, সে যেন আল্লাহ তায়ালাকেই অস্বীকার (কুফর) করল।' ৫৪৫
ইমাম আজম বলেন, “আল্লাহ তায়ালা তাঁর নামসমূহ এবং তাঁর সত্তাগত ও কর্মগত গুণাবলিতে সতত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাঁর কোনো নাম বা গুণ পরবর্তীকালে অস্তিত্বে আসেনি। তাঁর সত্তাগত গুণাবলি হচ্ছে: 'হায়াত' (জীবন), 'কুদরত' (শক্তি), 'ইলম' (জ্ঞান), 'কালাম' (বাণী), 'সাম্' (শ্রবণ), 'বাসার' (দর্শন) এবং 'ইরাদা' (ইচ্ছা)। আর তাঁর কর্মগত গুণাবলি হচ্ছে: 'তাখলিক' (সৃষ্টি করা), 'তারযিক' (রিযিক দেওয়া), 'ইনশা' (সূচনা করা), 'ইবদা' (উদ্ভাবন করা) ও 'সুনউ' (তৈরি করা) ইত্যাদি।” ৫৪৭ এসব সিফাতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো :
'হায়াত' (জীবন) হলো আল্লাহর অনাদি ও অনন্ত শাশ্বত একটি সিফাত। তিনি সর্বদা এ গুণে গুণান্বিত ছিলেন ও থাকবেন। তিনি চিরঞ্জীব-চিরস্থায়ী। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴾اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ﴿ অর্থ : 'আল্লাহ। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব। সদা বিদ্যমান রক্ষাকর্তা (কাইয়ুম)।' [বাকারা : ২৫৫] আল্লাহ আরও বলেন, ﴾وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ﴿ অর্থ : 'আর আপনি ভরসা করুন সেই চিরঞ্জীব সত্তার উপর যিনি মৃত্যুবরণ করবেন না।' [ফুরকান: ৫৮]
'কুদরত' (শক্তি-সামর্থ্য) আল্লাহ তায়ালার একটি চিরন্তন সিফাত। তিনি সবকিছু করতে সক্ষম। সর্বশক্তিমান। তিনি যখন কিছু করেন, তখন তাঁর চিরন্তন 'কুদরত'-এর মাধ্যমে করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴾إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ﴿ অর্থ : 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান।' [বাকারা : ২০] অন্যত্র বলেন, 'বলুন, তিনি (আল্লাহ) সম্পূর্ণ ক্ষমতাবান, তোমাদের উপর কোনো শাস্তি উপর দিক থেকে, অথবা তোমাদের পদতল থেকে প্রেরণ করবেন...' [আনআম : ৬৫]
'ইলম' (জ্ঞান) আল্লাহ তায়ালার অবিনশ্বর সিফাত (গুণ)। তিনি সবকিছু জানেন। গোপন ও প্রকাশ্য, বিদ্যমান ও অবিদ্যমান, সম্ভব ও অসম্ভব—সবকিছু সম্পর্কে সবিস্তার জানেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা হতে। এরপর শুক্রবিন্দু হতে। এরপর তোমাদের করেছেন যুগল! আল্লাহর অজ্ঞাতসারে কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং প্রসবও করে না... নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর জন্য সহজ।' [ফাতির : ১১] আরও বলেন, 'তিনি (আল্লাহ) তাদের সামনে ও পশ্চাতে যা-কিছু আছে সবকিছু সম্পর্কে অবগত। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা ব্যাতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না।' [বাকারা : ২৫৫]
'কালাম' আল্লাহ তায়ালার একটি চিরন্তন সত্তাগত গুণ। আল্লাহ তায়ালা শুরু থেকেই কথা বলেন। কিন্তু তাঁর কথা সৃষ্টির কথার সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না। আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা মুসা আ.-এর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন।' [নিসা: ১৬৪]
'সাম্' তথা শ্রবণ আল্লাহ তায়ালার একটি চিরন্তন গুণ। তিনি সেই চিরন্তন গুণের মাধ্যমে সকল আওয়াজ ও কথা শোনেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তাঁর মতো কিছু নেই। তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন।' [শুরা : ১১] আল্লাহ আরও বলেন, 'আল্লাহ অবশ্যই শুনেছেন সে নারীর কথা যে তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সঙ্গে বাদানুবাদ করছিল... আল্লাহ আপনাদের কথোপকথন শোনেন।' [মুজাদালাহ : ১]
'বাসার' তথা দর্শনও আল্লাহর চিরন্তন গুণ। তিনি সেই চিরন্তন গুণের মাধ্যমে সকল আকার-আকৃতি ও রং-রূপ দেখতে পান। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি (নামাযে) দণ্ডায়মান হন; আর দেখেন সিজদাকারীদের সঙ্গে আপনার ওঠাবসা।' [শুরা : ২১৮-২১৯] আল্লাহ আরও বলেন, 'আপনি বলুন, তোমরা আমল করতে থাকো। আল্লাহ তোমাদের আমল দেখবেন...' [তাওবা : ১০৫]
'ইরাদা' আল্লাহর একটি সত্তাগত চিরন্তন গুণ। ফলে তিনি ইচ্ছা তা-ই করেন, তা-ই নির্দেশ দেন। আল্লাহ বলেন, 'তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন।' [বুরূজ: ১৬] তিনি যা ইচ্ছা করেন তা-ই হয়। যা ইচ্ছা করেন না, তা হয় না। আল্লাহ বলেন, 'তোমরা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত ইচ্ছা করো না।' [তাকভির : ২৯]
ইমামের বক্তব্যে উল্লিখিত আল্লাহর তিনটি কর্মগত সিফাত তথা 'তাখলিক', 'ইনশা', 'সুনউ' সমার্থক শব্দ। সবগুলোর অর্থ সামগ্রিকভাবে সৃষ্টি করা। 'তাখলিক' হলো সাধারণভাবে সৃষ্টি করা। আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ সমস্ত কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর কর্মবিধায়ক।' [যুমার : ৬২] 'সুনউ' বলা হয় সুনিপুণ ও সুপরিকল্পিত সৃষ্টি। আল্লাহ বলেন, 'এটা আল্লাহরই সৃষ্টিনিপুণতা, যিনি সমস্ত কিছুকে করেছেন সুসংহত।' [নামল : ৮৮] আর 'ইনশা' হলো সর্বপ্রথম সৃষ্টি করা।
টিকাঃ
৫৩৭. বুখারি (২৭৩৬)। মুসলিম (২৬৭৭)।
৫৪০. তালখিসুল আদিল্লাহ (৩৪১-৩৪২)।
৫৪১. লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি: ৪৮)।
৫৪২. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
৫৪৩. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২১)।
৫৪৪. আল-ফিকহুল আকবার (৬)।
৫৪৫. আল-ফিকহুল আকবার (১-২)।
৫৪৭. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
📄 সত্তাগত সিফাত ও কর্মগত সিফাতের মাঝে পার্থক্য কী?
হানাফি উলামায়ে কেরাম এই দুই প্রকারের সিফাত সহজে বোঝার জন্য কিছু মূলনীতি তৈরি করেছেন। তারা লিখেন, যে সিফাতের বিপরীত সিফাতটিও আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যায়, সেটা কর্মগত সিফাত। আর যে সিফাতের বিপরীতটা আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যায় না, সেটা সত্তাগত সিফাত। উদাহরণস্বরূপ সৃষ্টি করা, বিপরীত হলো ধ্বংস করা। সন্তুষ্ট হওয়া, বিপরীতটা হলো অসন্তুষ্ট বা ক্রুদ্ধ হওয়া। দয়া করা, বিপরীতটা হলো শাস্তি দেওয়া। সবগুলোই আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যায়। ফলে এগুলো সত্তাগত নয়; কর্মগত সিফাত। বিপরীতে জীবন, ইজ্জত (সম্মান) ও জ্ঞান। এগুলোর বিপরীত হলো মৃত্যু, অসম্মান ও মূর্খতা, যা আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যায় না। সুতরাং জীবন, সম্মান ও জ্ঞান সত্তাগত সিফাত।
উলামায়ে কেরাম আরও লিখেন, আল্লাহর সত্তাগত ও কর্মগত সিফাতের মাঝে আরেকটি পার্থক্য হলো, সত্তাগত সিফাত দিয়ে শপথ (কসম) করলে সেটা বিশুদ্ধ হবে। কারণ, এর বিপরীত নেই। যেমন—আল্লাহর ইজ্জত তথা সম্মানের মাধ্যমে শপথ করা বৈধ। কিন্তু কর্মগত সিফাত দিয়ে শপথ বিশুদ্ধ নয়। যেমন—আল্লাহর ক্রোধের নামে শপথ করলে সেটা শপথ হবে না। কারণ, ক্রোধের বিপরীতে আল্লাহর রহমত রয়েছে। ৫৫৫
টিকাঃ
৫৫৫. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১০৮)। আলি কারি (২০)।
📄 আল্লাহর নাম ও গুণাবলির মর্যাদার তারতম্য
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সিফাতের মাঝে প্রকারভেদ করা গেলেও এগুলো আল্লাহর সিফাত হওয়ার ক্ষেত্রে মূলত সবই সমান। এ কারণে ইমাম বলেন, “আল্লাহর সকল নাম ও গুণ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে সমান। এগুলোর ভিতরে কোনো পার্থক্য নেই।” ৫৫৬ ইমামের এ বক্তব্য সিফাত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, এগুলো আল্লাহর নাম ও তাঁর গুণ এ হিসেবে সবগুলো সমান। কিন্তু মর্যাদার দিক থেকে এসব নামের মাঝে তারতম্য রয়েছে।
বিশেষত 'আল্লাহ' নামটি তাঁর সকল নামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। খোদ ইমাম আজম রহ. থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর এ নামটি অনন্য, দৃষ্টান্তহীন। এটা সর্বশ্রেষ্ঠ নাম, অর্থগতভাবে এবং শাব্দিকভাবেও। ফলে, তাঁর মতে, এ শব্দটি নিজেই পরিপূর্ণ। অন্য কোনো শব্দ থেকে এটা উদ্ভূত হয়নি, 'রহমান' যেমন 'রহমত' থেকে উদ্ভূত, 'রব' যেমন 'রবুবিয়্যাহ' থেকে নির্গত; 'আল্লাহ' নামটি নিজেই পরিপূর্ণ। ফলে ঈমান আনার ক্ষেত্রেও 'আল্লাহ' নামটি জানা ও বলাই যথেষ্ট। আর কোনো নামের প্রয়োজন নেই। 'আল্লাহ' নামের অর্থ : উপাস্য, মাবুদ, ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত ইত্যাদি। ৫৫৭
গাযালি রহ. লিখেন, 'আল্লাহ' নামটি আল্লাহর নিরানব্বই নামের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ। কারণ, এটা আল্লাহর সকল গুণের নির্দেশক। আল্লাহর অন্য নামগুলো ভিন্ন ভিন্ন গুণ, অর্থ ও মর্যাদা বহন করে। যেমন 'আলিম' নামটি জ্ঞানের কথা বোঝায়, 'কাদির' নামটি শক্তির নির্দেশক ইত্যাদি। বিপরীতে এ নামটি তাঁর সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্যের আধার। তা ছাড়া, এটা একমাত্র তাঁর জন্যই নির্ধারিত। ফলে 'আলিম', 'কাদির', 'রহিম' ইত্যাদি সৃষ্টির উপর প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু 'আল্লাহ' নামটি শাব্দিক বা রূপক কোনো অর্থেই কোনোভাবেই তিনি ছাড়া আর কারও উপর প্রয়োগ করা যায় না। ৫৫৮
টিকাঃ
৫৫৬. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
৫৫৭. দেখুন : তালখিসুল আদিল্লাহ (৩৮২, ৩৯৮)।
৫৫৮. দেখুন: আল-মাকসিদুল আসনা ফি শরহি মাআনি আসমায়িল্লাহিল হুসনা (৬১)।