📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 তাওহিদের প্রকারভেদ

📄 তাওহিদের প্রকারভেদ


তাওহিদ কত প্রকার? এটা বর্তমান সময়ে ইসলামি আকিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যতম বহুল প্রচলিত প্রশ্ন। যে-কেউ ইসলামি আকিদা নিয়ে পড়াশোনা করতে গেলে কিংবা কথা বলতে গেলে তাওহিদের পরিচয় ও প্রকারভেদ দিয়ে শুরু করেন। ফলে এ ব্যাপারে ইমাম আজমসহ সালাফে সালেহিনের মানহাজ তথা কর্মপদ্ধতি নিয়ে কিছু বিষয় আলোচনা জরুরি মনে করছি।

প্রথমেই একটা বিষয় পরিষ্কার করে নিতে হবে। সেটা হলো, কুরআন-সুন্নাহতে তাওহিদের সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকারভেদ নেই। সাহাবায়ে কেরাম তাওহিদের কোনো প্রকারভেদ করেননি, তাবেয়ি তাবে-তাবেয়িরাও করেননি। এ কারণে ইমাম আজম রহ. থেকেও তাওহিদের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকারভেদ পাওয়া যায় না। কারণ, তাওহিদ একটাই। এর বিভিন্ন প্রকাশ ও উদ্ভাস রয়েছে। সবগুলো প্রকাশ মিলে একক তাওহিদ বাস্তবায়িত হয়। আমরা যদি কুরআনের প্রতি দৃষ্টিপাত করি, আমরা দেখব, কুরআনে তাওহিদের একাধিক প্রকাশ ও প্রকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়।

'রবুবিয়্যাহ' তথা পৃথিবীর সৃষ্টি ও পরিচালনা-সংক্রান্ত তাওহিদ। 'রব' বলতে আল্লাহ পৃথিবীর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, পালনকর্তা, পরিচালক, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, একমাত্র অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রণকর্তা, একমাত্র আদেশ ও বিধানদাতা। অন্যকথায়, বিশ্বের সবকিছুর সবকিছু আল্লাহ তায়ালা। এ এমন এক চিরন্তন বাস্তবতা, যা মানুষ সহজাত সুস্থ বিবেকবোধের মাধ্যমেও অনুভব করতে পারে। কুরআনের প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ﴾ অর্থ: 'সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি জগৎসমূহের পালনকর্তা।' [ফাতিহা : ১] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ﴿قَالَتْ رُسُلُهُمْ أَفِي اللَّهِ শ্যাককুন فَاطِرِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ يَدْعُوكُمْ لِيَغْفِرَ لَكُمْ مِنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُؤَخِّرَكُمْ إِلَىٰ أَجَلٍ مُسَمًّى ۚ قَالُوا إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مִثْلُنَا تُرِيدُونَ أَنْ تَصُدُّونَا عَمَّا كَانَ يَعْبُدُ آبَاؤُنَا فَأْتُونَا بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ﴾ বলেছিলেন : আল্লাহ সম্পর্কে কি কোনো সন্দেহ আছে যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্রষ্টা? তিনি তোমাদের আহ্বান করেন তোমাদের পাপ মার্জনা করার জন্য এবং নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদের অবকাশ দেওয়ার জন্য। তারা বলল: তোমরা তো আমাদের মতোই মানুষ! তোমরা আমাদের সেসব উপাস্য থেকে বিরত রাখতে চাও, যেসবের উপাসনা আমাদের পিতৃপুরুষগণ করত। অতএব, তোমরা কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ আনয়ন করো।' [ইবরাহিম : ১০]

জীবন, মৃত্যু, পৃথিবী পরিচালনা ও দেখভাল সবকিছু আল্লাহর হাতে। আল্লাহ বলেন, ﴿قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّমْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ ۖ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ ۚ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ ۚ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ﴾ জিজ্ঞাসা করুন, কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে জীবনোপকরণ সরবরাহ করেন? শোনা ও দেখা কার কর্তৃত্বাধীন? জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করেন, আর মৃতকে জীবিত থেকে কে বের করেন? এবং সকল বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন? তখন তারা বলবে, 'আল্লাহ'। বলুন, তবুও কি তোমরা (তাকে) ভয় পাবে না?' [ইউনুস: ৩১] আল্লাহ আরও বলেন, ﴿إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِي تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنْفَعُ النَّاسَ وَمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِنْ مَاءٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فِيهَا مِنْ كُلِّ دَابَّةٍ وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخَّرِ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ ﴾ 'নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তনে যা মানুষের হিত সাধন করে তাসহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহে আল্লাহ আকাশ থেকে যে বারি বর্ষণের মাধ্যমে ধরিত্রীকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন, তাতে আর তার মধ্যে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তারণে বায়ুর দিক পরিবর্তনে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।' [বাকারা: ১৬৪] আল্লাহ আরও বলেন, اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ أَسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُسَمًّى يُدَبِّرُ الْأَمْرُ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُم بِلِقَاءِ رَبِّكُمْ تُوقِنُونَ) 'আল্লাহই ঊর্ধ্বদেশে আকাশমণ্ডলী স্থাপন করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। এর পর তিনি আরশের উপর 'ইস্তিওয়া' করেছেন। সূর্য ও চন্দ্রকে তাঁর আজ্ঞাধীন করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পারো।' [রাদ : ২]

পৃথিবীর সবকিছু একমাত্র আল্লাহর সৃষ্টি ঘোষণা করে মানুষের প্রতি আল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, خَلَقَ السَّمَوتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا وَالْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَাসِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ وَ بَثَّ فِيْهَا مِنْ كُلِّ دَابَّةٍ وَ اَنْزَلْنَا مِنَ السَّমَاءِ مَاءً فَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ كَرِيمٍ ﴿১০﴾ هُذَا خَلْقُ اللَّهِ فَأَرُونِي مَاذَا خَلَقَ الَّذِينَ مِنْ دُوْنِهِ بَلِ الظَّلِمُوْনَ فِي ضَلْلٍ مُّبِيْنٍ) 'তিনি আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। তিনিই পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, যাতে এটা তোমাদের নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বপ্রকার জীবজন্তু। এবং আমিই আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে এতে উদ্‌গত করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ। এটা আল্লাহর সৃষ্টি! তিনি ব্যতীত অন্যেরা কী সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও। সীমালঙ্ঘনকারীরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।' [লুকমান: ১০-১১]

তিনিই একমাত্র জীবিত করেন এবং মৃত্যু দেন। জীবিতকরণ ও মৃত্যু দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে আর কেউ শরিক নেই। আল্লাহ বলেন, هُوَ الَّذِي يُحْيِ، وَيُمِيتُ فَإِذَا فَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّমَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ অর্থ : “তিনিই জীবিত করেন এবং মৃত্যু দেন। যখন তিনি কোনো কাজের আদেশ করেন, তখন শুধু বলেন, 'হয়ে যাও', আর তা হয়ে যায়।" [গাফের: ৬৮] উপকার ও অপকারের একমাত্র কর্তা তিনি। ক্বুল লা আমলিকু লিনাফসি নাফআন ওয়ালা দ্বররান ইল্লা মা শাআল্লাহ, وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْথার্টু মিনাল খইরি ওয়ামা মাস্সানিয়াস সুউ ইন আনা ইল্লা নাযিরুন ওয়া বাশিরুন লিকাউমিন ইউমিনুন অর্থ : 'আপনি বলুন, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের ভালোমন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানতাম, তবে তো আমি প্রভৃত কল্যাণই লাভ করতাম, আর কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো শুধু মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা বই আর কিছু নই।' [আরাফ : ১৮৮]

'উলুহিয়্যাহ' তথা আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য স্বীকৃতি দেওয়া-সংক্রান্ত তাওহিদ। অন্যকথায়, একমাত্র তাঁর দাসত্ব এবং তাঁর ইবাদত করা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের নির্দেশ দিয়ে বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنزَلَ مِنَ السَّমَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَّكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَادًا وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ অর্থ : 'হে মানুষ, তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত করো যিনি তোমাদের এবং তোমাদের পূর্ববর্তী মানুষদের সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো, যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা এবং আকাশকে ছাদ করেছেন আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দিয়ে তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেন। সুতরাং তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না।' [বাকারা : ২১-২২] পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া আর যা-কিছুর পূজা করা হয়, সেগুলা পূজার উপযুক্ত নয়, বরং একমাত্র আল্লাহ উপাসনার উপযুক্ত। তিনি وَاتَّخَذُوا مِن دُونِهِ عَالِهَةً لَّا يَخْلُقُونَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَمْلِكُونَ لِأَنفُسِهِمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيَوَةً وَلَا نُشُورًا অর্থ : 'আর তারা তাঁকে ছেড়ে এমন সব মাবুদ গ্রহণ করে নিয়েছে, যারা কোনোকিছু সৃষ্টি করতে পারে না; বরং তারা নিজেরাই সৃষ্টি। তারা তাদের নিজেদের কোনো ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতাও রাখে না। আর না আছে কারও মৃত্যু ও জীবন দান কিংবা কাউকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা।' [ফুরকান : ৩] আল্লাহ আরও বলেন, يُولِجُ الْيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي الَّيْلِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُّসَمًّى ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ অর্থ : 'তিনি রাত্রিকে দিবসে প্রবিষ্ট করান এবং দিবসকে প্রবিষ্ট করান রাত্রিতে। তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে করেছেন নিয়মাধীন; প্রত্যেকে পরিভ্রমণ করে এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত। তিনিই আল্লাহ। তোমাদের প্রতিপালক। রাজত্ব তাঁরই। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাকো, তারা তো খর্জুর আঁটির আবরণেরও অধিকারী নয়। তোমরা তাদের ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শোনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শিরক অস্বীকার করবে। বস্তুত সর্বজ্ঞ (আল্লাহর) মতো তোমাকে কেউ অবহিত করতে পারবে না।' [ফাতির: ১৩-১৪]

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে একমাত্র তাঁর ইবাদত এবং তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّموتِ وَالْأَرْضِ وَ إِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ فَاعْبُدْهُ وَتَوَকَّلْ عَلَيْهِ وَمَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُوْনَ অর্থ : 'আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই এবং তাঁরই নিকট সমস্ত কিছুর প্রত্যাবর্তন। সুতরাং তুমি তাঁর ইবাদত করো এবং তাঁর উপর নির্ভর করো। তোমরা যা করো সে সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালক অনবহিত নন।' [হুদ : ১২৩] আরও বলেন, وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الجنب وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْسَالًا فَخُورًا অর্থ : 'আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতা, নিকটত্মীয়, এতিম-মিসকিন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, মুসাফির এবং নিজেদের দাস-দাসীর প্রতি সদ্ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক-উদ্ধতকে পছন্দ করেন না। [নিসা : ৩৬]

'আফআল' তথা আল্লাহর কর্মসমূহে তাকে একক ও অদ্বিতীয় ঘোষণা করা- সংক্রান্ত তাওহিদ। অর্থাৎ পিছনে রবুবিয়্যাহ-সংক্রান্ত যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলাও আল্লাহর কর্ম। কিন্তু এগুলোর বাইরেও আল্লাহর এমন কিছু 'কর্মগত' বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে কোনো সৃষ্টি তাঁর সঙ্গে অংশীদার নেই, সদৃশ নেই। যেমন-কুরআনে বলা হয়েছে আল্লাহ তায়ালা শোনেন, দেখেন, কথা বলেন। তিনি 'ক্রুদ্ধ' হন, 'সন্তুষ্ট' হন, 'ইস্তিওয়া' করেন', 'অবতরণ' করেন, 'আগমন' করেন, 'ভালোবাসেন', 'অপছন্দ' করেন ইত্যাদি। আল্লাহ তায়ালা جَزَاؤُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَ رَضُوْاعَنْهُ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّهُ অর্থ : 'তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত। তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্য যে তার পালনকর্তাকে ভয় করে।' [বায়ি‍্যনাহ: ৮] আরও وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةً وَلكِنْ كَرِهَ الله انْبِعَاثَهُمْ فَثَبَّطَهُمْ وَقِيلَا قْعُدُوا مَعَالْقَعِدِينَ, অর্থ: "তারা বের হতে ইচ্ছা করলে নিশ্চয়ই সে জন্য প্রস্তুতির ব্যবস্থা করত। কিন্তু তাদের অভিযাত্রা আল্লাহ অপছন্দ করেছেন। ফলে তিনি তাদের বিরত রাখেন এবং তাদের বলা হলো, 'যারা বসে আছে তাদের সঙ্গে বসে থাকো।” [তাওবা: ৪৬] অন্যত্র বলেন, وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ অর্থ : 'আর তোমরা ইনসাফ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।' [হুজুরাত : ৯] এগুলো যদিও শাব্দিক অর্থে মানুষের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে, কিন্তু মৌলিকভাবে কোনো সাদৃশ্য নেই। বরং এসব কর্মে আল্লাহ এক, অদ্বিতীয় ও অনন্য।

আল্লাহর 'আসমা' তথা নামসমূহের ক্ষেত্রে তাকে একক ঘোষণা করা, অন্য কাউকে এসব নামের প্রকৃত মর্মের অধিকারী মনে না করা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدЬهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا ) অর্থ : 'তিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং তাদের অন্তর্বর্তী যা-কিছু রয়েছে, তার প্রতিপালক। সুতরাং তাঁরই বন্দেগি করো এবং তাতে অবিচল থাকো। তুমি কি তাঁর সমনাম কাউকে জানো?' [মারইয়াম : ৬৫] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَيْهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ অর্থ: 'আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। কাজেই তোমরা তাঁকে সেসব নামে ডাকো। আর যারা তাঁর নামসমূহের ক্ষেত্রে বিকৃত-বক্র পথ অবলম্বন করে, তাদের বর্জন করো; তাদের কৃতকর্মের ফল তাদের দেওয়া হবে।' [আরাফ : ১৮০]

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নিজের বিভিন্ন নাম ঘোষণা করেছেন, যেগুলোর ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে আর কেউ শরিক নেই। আল্লাহ বলেন, هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ অর্থ: 'তিনিই প্রথম (আউয়াল)। তিনিই শেষ (আখির)। তিনিই প্রকাশিত (যাহির) তিনিই গুপ্ত (বাতিন)। তিনি সব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।' [হাদিদ : ৩] সুরা হাশরে আল্লাহ তাঁর বিভিন্ন সুন্দর নাম উল্লেখ করেন এভাবে : هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَدَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُশরিকুন * هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّমَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ অর্থ: 'তিনিই আল্লাহ। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাত। তিনি দয়াময় (রহমান), পরম দয়ালু (রহিম)। তিনিই আল্লাহ। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি (মালিক), তিনিই পবিত্র (কুদ্দুস), শান্তিদাতা (সালাম), নিরাপত্তাদাতা (মুমিন), তিনিই রক্ষাকর্তা (মুহাইমিন), তিনিই পরাক্রমশালী (আযিয), তিনি প্রবল ও অসহায়ের সহায় (জাব্বার), তিনিই অতীব মহিমান্বিত (মুতাকাব্বির)। তারা তাঁর সঙ্গে যা-কিছু শরিক স্থির করে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। তিনিই আল্লাহ। তিনি সৃষ্টিকর্তা (খালিক), অস্তিত্বদাতা (বারি), রূপদাতা (মুসাওয়ির)। তাঁরই সকল সুন্দর নাম। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে, সমস্তই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় [হাশর: ২২-২৪]

আল্লাহর 'সিফাত' তথা গুণাবলির ক্ষেত্রে তাঁকে অনন্য ও দৃষ্টান্তহীন বিশ্বাস করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, লাইসা কামিসলিহি শাইউন অর্থ : 'তাঁর মতো কিছু নেই।' [শুরা : ১১] কুরআন কারিমে আল্লাহ তায়ালার এমন অসংখ্য গুণ উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ছাড়া আর কেউ যেগুলোর অধিকারী নয়। আল্লাহ তায়ালা 'আয়াতুল কুরসি'তে বলেন, اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْখুযুহু সিনাতুও ওয়ালা নাউম লাহ মা ফিস সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্বি মান যাল্লাযি ইয়াশফাউ ইনদাহ ইল্লা বি ইযনিহি ইয়ালামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খলফাহুম ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইয়িম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শাআ অসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা ওয়াহুয়াল আলিয়্যুল আযিম অর্থ : 'আল্লাহ। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, নিয়ন্ত্রক ও রক্ষাকর্তা (কাইয়্যুম)। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে, সমস্ত তাঁরই। কে আছে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পশ্চাতে যা-কিছু আছে, সবকিছু সম্পর্কে তিনি অবগত। তিনি যা ইচ্ছা করেন, তা ব্যতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর 'কুরসি' আকাশ ও পৃথিবী পরিব্যাপ্ত করে আছে। এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি সবার ঊর্ধ্বে, সবার শ্রেষ্ঠ।' [বাকারা : ২৫৫]

জগতের সকল সংকট ও সমস্যার ক্ষেত্রে একমাত্র তাঁকেই সমাধানস্থল এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে কেবল তাঁকেই 'হাকিম' তথা বিধানদাতা মেনে নেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ অর্থ : 'বিধান কেবল আল্লাহরই।' [ইউসুফ : ৪০] আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য সকল বিধানকে আল্লাহ 'জাহেলিয়াত' আখ্যা দেন। আল্লাহ বলেন, أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُوْনَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوْقِنُونَ অর্থ : 'তারা কি জাহেলি বিধিবিধান কামনা করে? বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ অপেক্ষা কে উত্তম বিধায়ক হতে পারে?' [মায়িদা: ৫০] মানুষের মতভেদপূর্ণ সকল বিষয়েও সকল সমাধানদাতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তিনি বলেন, وَমَا اخْتَلَفَتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَيْهِ অর্থ : 'তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করো, তার ফয়সালা আল্লাহর নিকট।' [শুরা: ১০] আল্লাহ যেহেতু পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং একমাত্র তাঁর নির্দেশই চলবে পৃথিবীতে। তিনি বলেন, اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ অর্থ: 'সৃষ্টি ও নির্দেশ (বিধান) তাঁরই।' [আরাফ: ৫৪] আল্লাহর বিধান রেখে অন্য কোনো বিধান যারা পৃথিবীতে প্রয়োগ করবে, আল্লাহ তাদের জালেম, ফাসেক ও কাফের আখ্যা দিয়ে বলেন, وَمَنْ لَّমْ يَحْكُمْ بِمَآ أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَۘ অর্থ : 'আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা কাফের।' [মায়িদা : ৪৪] আরও বলেন, وَমَنْ لَّমْ يَحْكُمْ بِمَآ أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَۘ অর্থ : 'আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা জালেম।' [মায়িদা: ৪৫] আরও বলেন, وَমَنْ لَّমْ يَحْكُمْ بِمَآ অউনজালাল্লাহু ফাউলাইকা হুমুল ফাসিকুন অর্থ : আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা ফাসেক।' [মায়িদা : ৪৭]

এভাবে কুরআনে তাওহিদের একাধিক বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, যা আল্লাহর 'যাত' (সত্তাগত), 'আফআল (কর্মগত), 'আসমা' (নামগত), 'সিফাত' (গুণগত), 'রবুবিয়্যাহ' (সৃষ্টি ও পরিচালনাসংক্রান্ত), 'উলুহিয়্যাহ' (ইবাদত সংক্রান্ত), 'হাকিমিয়্যাহ' (বিধানসংক্রান্ত) সবগুলো ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা করে। তবে আমরা যদি এই সবগুলোকে আরও সংক্ষিপ্ত ও সম্মিলিতভাবে উপস্থাপন করতে যাই, তবে সেটা দুই প্রকারে সীমাবদ্ধ করতে পারি, যেমনটা ইমাম আজমসহ সালাফে সালেহিন করেছেন। এক. রবুবিয়্যাহ, যাতে আল্লাহর পৃথিবী সৃষ্টি, পরিচালনা, তাঁর একক সত্তা, কর্ম, নাম, গুণাবলি সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। দুই. উলুহিয়্যাহ, যাতে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং একমাত্র তাঁকে বিধানদাতা হিসেবে মেনে নেওয়া অন্তর্ভুক্ত। ফলে রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহ তাওহিদের সকল প্রকাশ ও উদ্ভাসের সারকথা। অন্যান্য সকল প্রকার এই দুটোর অন্তর্ভুক্ত।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সালাফে সালেহিনের কাছে তাওহিদ কত প্রকার?

📄 সালাফে সালেহিনের কাছে তাওহিদ কত প্রকার?


ইমাম আজম রহ.-এর আকিদা যেহেতু সালাফে সালেহিনের আকিদা, তিনি যেহেতু কুরআন-সুন্নাহ এবং সাহাবাদের আকিদার বিশ্বস্ত ভাষ্যকার, এ জন্য আমরা দেখব, তিনিও তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে সবগুলো তাওহিদ সম্পর্কে সাধারণ আলোচনা করেছেন। কুরআন-সুন্নাহর বাইরে গিয়ে কোনো বিশেষ প্রকারভেদের মাঝে তাওহিদকে সীমাবদ্ধ করেননি। আল-ফিকহুল আকবারে তাওহিদ সম্পর্কে ইমাম রহ. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি। কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। তিনি তাঁর সৃষ্টির কোনো বস্তুর মতো নন। আর তাঁর সৃষ্টির কোনো বস্তুও তাঁর মতো নয়।' (৫১২) এটা মূলত কুরআনের সুরা ইখলাসের ব্যাখ্যা। আল্লাহ বলেন, ক্বুল হুয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুস সামাদ। লাম ইয়ালিদ ওলাম ইউলাদ। ওলাম ইয়াকুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ। অর্থ : 'আপনি বলুন, আল্লাহ এক। তিনি অমুখাপেক্ষী। সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি। কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। [ইখলাস: ১-৪]

ইমাম আজম তাঁর আল-ফিকহুল আবসাতেও 'রবুবিয়্যাত' ও 'উলুহিয়্যাত'-এর কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাওহিদকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকারে আবদ্ধ করেননি। ৫১৩

সালাফে সালেহিনের এই নীতি পরের শতাব্দগুলোতেও অব্যাহত থাকে। ফলে আমরা তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দে এসেও ইমাম তহাবি রহ.-কে দেখতে পাই একই মানহাজের উপর অবিচল রয়েছেন। ইমাম তহাবি তাঁর আকিদাহ গ্রন্থে তাওহিদের পরিচয় এবং বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করলেও তাওহিদকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকারভেদের মাঝে সীমাবদ্ধ করেননি। তহাবি লিখেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা এক। তাঁর কোনো শরিক নেই। তাঁর মতো কিছুই নেই। কোনোকিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না। তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি সর্বদাই ছিলেন, তাঁর কোনো শুরু নেই। তিনি সর্বদাই থাকবেন, তাঁর কোনো শেষ নেই। তাঁর কোনো ক্ষয় নেই, লয় নেই। তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না। কোনো কল্পনাশক্তি তাঁর কাছে পৌঁছতে পারে না। বোধ-বুদ্ধি তাঁকে পরিব্যাপ্ত করতে পারে না। সৃষ্টির কোনোকিছুই তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না। তিনি সদা জীবিত, তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি সদা বিদ্যমান রক্ষাকর্তা, নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না। তিনি সৃষ্টিকর্তা, কিন্তু সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি রিযিকদাতা; রিযিকদানে কোনো কষ্ট-ক্লান্তি নেই তাঁর। তিনি মৃত্যুদানকারী, নির্ভয়ে মৃত্যু দান করেন। তিনি পুনরুত্থানকারী, বিনাক্লেশে সৃষ্টিকে পুনরুত্থিত করেন। ৫১৪

ইমাম তহাবি রহ. আরও বলেন, “সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার আগ থেকেই তিনি সকল গুণের অধিকারী। সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর মাঝে এমন কোনো গুণের সংযোজন ঘটেনি, যা আগে ছিল না। তিনি সর্বদাই নিজের গুণাবলি নিয়ে ছিলেন, সর্বদাই তেমন থাকবেন। তাই সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার পর থেকে তাঁর নাম 'খালিক' (সৃষ্টিকর্তা) হয়নি, জগৎকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনায় তাঁর নাম 'বারি' (উদ্ভাবক) হয়নি। প্রতিপালিত (সৃষ্টি) ছাড়াই তিনি প্রতিপালক, সৃষ্টিজগৎ ছাড়াই তিনি সৃষ্টিকর্তা। তিনি মৃতকে জীবনদানকারী: জীবনদানের আগেই তিনি এই নামের অধিকারী ছিলেন। তদ্রূপ সৃষ্টি করার আগেই তিনি সৃষ্টিকর্তা নামের অধিকারী ছিলেন। কারণ, তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাশালী। সবকিছু তাঁর মুখাপেক্ষী। সব বিষয় তাঁর জন্য সহজ। তিনি কোনোকিছুর মুখাপেক্ষী নন। তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সবকিছু শোনেন এবং সবকিছু দেখেন।”৫১৫

ইমাম তহাবির বক্তব্যে সামান্য মনোযোগ দিলেই স্পষ্টভাবে দেখা যাবে, তিনি এখানে আল্লাহর রবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত, তাঁর কর্ম, ইচ্ছা, ফয়সালা, নাম, গুণ— এক কথায়, আল্লাহ-সম্পর্কিত তাওহিদের সকল দিককেই অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বিশেষ কোনো প্রকারের মাঝে সীমাবদ্ধ করেননি। সালাফের সকল ইমাম একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। আমরা যদি কুরআনের প্রাচীনতম তাফসিরগ্রন্থ তাফসিরে তাবারিতে দৃষ্টিপাত করি, সেখানেও ইমাম তাবারিকে দেখব আল্লাহর রবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতকে একসঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে উল্লেখ করেছেন। সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকারভেদ করেননি।

আলি কারি আল-ফিকহুল আকবারের ব্যাখ্যায় লিখেন, 'তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহর চূড়ান্ত ফলাফল হলো আল্লাহর উবুদিয়্যাহ তথা দাসত্বের বাস্তবায়ন। আল্লাহকে চেনার পরে এটাই বান্দার সর্বপ্রথম দায়িত্ব। তাওহিদুল উলুহিয়্যাহ মেনে নিলে রবুবিয়্যাহ মেনে নেওয়া আবশ্যক। কারণ, ইবাদত কেবল তাঁর জন্যই করা হয় যার ব্যাপারে প্রভুত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিপরীতে রবুবিয়্যাহ মেনে নেওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় উলুহিয়্যাহ বাস্তবায়িত হয় না। কারণ, (শয়তানের ধোঁকা বা বিভিন্ন কারণে) মানুষ আল্লাহকে চেনা সত্ত্বেও অনেক সময় অন্য কিছুর পূজা করে! যেমন—আল্লাহ বলেন, ওয়া আল্লা লিল্লাহিদ দ্বীনুল খলিসু ওয়াল্লাযিনাত তাখাযু মিন দুনিহি আউলিয়া মা না'বুদুহুম ইল্লা লি ইউকররিবুনা ইলাল্লাহি যুলফা। অর্থ : 'জেনে রাখো, নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত আল্লাহরই প্রাপ্য। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে, তারা বলে যে, আমরা তাদের উপাসনা শুধু এ জন্যই করি যে, তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়।' [যুমার: ৩] অর্থাৎ, আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য জানার পরও তারা মূর্তিপূজাকে ওসিলাস্বরূপ গ্রহণ করে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়েছে। অন্যত্র ওয়ালাইঁ সাআলতাহুম মান খলাকাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা লাইয়াকুলুন্নাল্লাহু ক্বল আফারাইতুমা মা তাদউনা মিন দুনিল্লাহি ইন আরাদানিয়াল্লাহু বিদুররিন হাল হুন্না কাশিফাতু দুররিহি আউ আরাদানি বিরাহমাতিন হাল হুন্না মুমসিকাতু রাহমাতিহি কুল হাসবিয়াল্লাহু আলাইহি ইয়াতাওয়াক্কালুল মুতাওয়াক্কিলুন। অর্থ : ‘যদি আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আসমান ও যমিন কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ আমার ক্ষতি করার ইচ্ছা করেন, তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ডাকো তারা কি সে ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করলে তারা কি সে রহমত ব্যাহত করতে পারবে? বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। ভরসাকারীগণ তাঁরই উপর ভরসা করে।' [যুমার : ৩৮] মোটকথা, কুরআনের অধিকাংশ সুরা ও আয়াত উভয় প্রকারের তাওহিদকেই অন্তর্ভুক্ত করে। কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই দুই প্রকারের তাওহিদের বর্ণনা ও শানের বাস্তবায়ন।৫১৬

টিকাঃ
৫১২. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
৫১৩. দেখুন: আল-ফিকহুল আবসাত (৫১)।
৫১৪. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৭-৯)।
৫১৫. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৯-১০)।
৫১৬. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৮-৯)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 তাওহিদের প্রকারভেদের ক্ষেত্রে খালাফের অতিরঞ্জন

📄 তাওহিদের প্রকারভেদের ক্ষেত্রে খালাফের অতিরঞ্জন


কিন্তু খালাফ তথা পরবর্তী সময়ে মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন ধারার আলেমগণ তাওহিদের প্রকারভেদের ক্ষেত্রে এই 'তাওকিফ' (কুরআন-সুন্নাহ নির্ভরতা)-এর উপর অবিচল থাকেননি, সালাফে সালেহিনের মানহাজ ধরে রাখতে পারেননি। বরং তারা কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফের বক্তব্যের বাইরে গিয়ে ইজতিহাদের মাধ্যমে তাওহিদের বেশ কিছু প্রকার নির্ধারণ করেছেন। কেউ তিন প্রকার, কেউ-বা দুই প্রকার, আবার কেউ চার প্রকার।

প্রশ্ন হতে পারে, যদি এক্ষেত্রে তারা কুরআন-সুন্নাহ ইজতিহাদ করে এসব প্রকার বের করে থাকেন এবং এগুলো ইসলামি আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তাহলে জটিলতার তো কিছু নেই। হ্যাঁ, এ কথার সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত হওয়া সম্ভব। যেহেতু বিষয়গুলো ইজতিহাদি এবং শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, তাই তাওহিদকে সহজভাবে বোঝার জন্য উদ্ভাবিত এই প্রকারভেদগুলোতে বড় ধরনের কোনো জটিলতা থাকার কথা ছিল না। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয়ে গিয়েছে অন্য একাধিক কারণে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো :

এক. যন্নি (ধারণামূলক) প্রকারভেদকে কাতয়ি (চূড়ান্ত ও সুনিশ্চিত)-এর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। ফলে প্রত্যেক ধারা নিজেদের প্রকারভেদকে চূড়ান্ত ও অনিবার্য গণ্য করেছে, অন্যদের প্রকারভেদের সমালোচনা করেছে। প্রত্যেকে নিজেদের প্রকারভেদকে কুরআনের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা এবং সালাফে সালেহিনের মানহাজের একমাত্র সঠিক প্রতিনিধি দাবি করেছে; অন্যদেরটা বিভিন্ন যুক্তিতে বাতিল করে দিয়েছে। ফলাফল হলো, এমন একটা বিষয় যা কুরআন-সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়নি, সালাফে সালেহিন যে ব্যাপারে কথা বলেননি, একসময় সেটাই মুসলিম উম্মাহর ভেদাভেদের হাতিয়ার হয়ে গেল।

দুই. তাওহিদকেন্দ্রিক ভারসাম্যহীনতা। এই প্রকারভেদ থেকে তৈরি হওয়া আরেকটি বড় জটিলতা হলো তাওহিদকেন্দ্রিক ভারসাম্যহীনতা, বিশেষত কুরআনি তাওহিদের গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রকার ‘রবুবিয়্যাহ’ ও ‘উলুহিয়্যাহ’র মাঝে ভারসাম্য বিধানের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হওয়া। কুরআনে রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহ তাওহিদের অবিচ্ছেদ্য দুই ভিত্তি। ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে কুরআন যেখানে রবুবিয়্যাহর কথা বলেছে, সেখানেই উলুহিয়্যাহ রয়েছে; যেখানে উলুহিয়্যাহর কথা বলেছে, সেখানেই রবুবিয়্যাহ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আম্মান ইউজীবুল মুদত্বাররা ইযা দাআহু ওয়া ইয়াকশিফুস সুআ ওয়া ইয়াজআলুকুম খুলাফাউল আরদ্বি আইলাহুম মাআল্লাহি কলিলান মা তাযাক্কারুন ‘তবে কে তিনি যিনি অসহায়-আর্তের ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদাপদ দূরীভূত করেন, আর পৃথিবীতে তোমাদেরকে প্রতিনিধি করেন। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহ আছে কি? তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।’ [নামল : ৬২] এখানে দেখুন কীভাবে আল্লাহর রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহকে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যিনি রব তিনিই ইলাহ হওয়ার উপযুক্ত। যিনি প্রকৃত ইলাহ তিনি প্রকৃত রবও। আল্লাহ বলেন, মা লা ইয়াখলুকুনা শাইআও ওয়াহুম ইউখলাকুনা ওয়ালা ইয়াসতাতিউনা লাহুম নাসরাও ওয়ালা আনফুসাহুম ইয়ানসুরুনা। (আল্লাহর সঙ্গে) এমন কিছু শরিক করে, যা কোনোকিছু সৃষ্টি করতে পারে না? বরং খোদ তারাই সৃষ্টি। আর না তাদের সাহায্য করতে পারে, বরং নিজেদের সাহায্যও করতে পারে না।’ [আরাফ: ১৯১-১৯২] এখানে রবের সঙ্গে শিরককে ভর্ৎসনা করা হয়েছে। কারণ, যিনি রব তিনিই ইলাহ। একজনকে প্রকৃত অর্থে রব মেনে অন্যজনকে ইলাহ বানানো নির্বুদ্ধিতা ও অসুস্থতা। আল্লাহ আরও বলেন, ক্বুল আরাআইতুম ইন জাআলাল্লাহু আলাইকুমুন নাহার সামাদান ইলা ইয়াওমিল কিয়ামাতি মান ইলাহুন গাইরুল্লাহি ইয়াতিকুম বিলাইলিন তাসকুনুনা ফিহি আফালা তুবসিরুন অর্থ : “বলুন, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি দিবসকে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করেন, আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন ইলাহ আছে, যে তোমাদের জন্য রাত্রি এনে দেবে, যাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পারো? তবুও কি তোমরা চোখ মেলে দেখবে না।” [কাসাস : ৭২] এখানে ‘ইলাহ’-কে মূলত ‘রব’-এর জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে। রবের গুণাবলি ইলাহের উপর প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ, রব ও ইলাহ অবিচ্ছেদ্য, ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্রথম যুগের ইমামগণ কুরআনের আয়াতগুলোকে এই ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজেই ব্যাখ্যা করেছেন। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ইমাম তাবারির (৩১০ হি.) তাফসির। এ গ্রন্থে রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহকে অঙ্গাঙ্গিভাবে পেশ করা হয়েছে।

যেমন—ইমাম তাবারি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ [বাকারা : ১৬৩]-এর তাফসির প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রদান যে, তিনি ছাড়া বিশ্বজগতের আর কোনো প্রতিপালক নেই। তিনি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নেই।’৫১৭ আরেক আয়াতে তিনি আল্লাহর সামনে সৃষ্টির নতশির হওয়ার বর্ণনা (আলে ইমরান : ৮৩) দিতে গিয়ে বলেন, ‘আকাশ ও যমিনের সবাই তাঁকে মাবুদ বলে স্বীকার করে, তাঁকে একমাত্র রব মেনে তাঁর সামনে মাথা নত করে।’৫১৮

কুরআনের আয়াত : ﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا﴾ অর্থ : ‘আর তোমরা আল্লাহর উপাসনা করো। তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক করো না।’ [নিসা : ৩৬]– এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ইমাম তাবারি লিখেন, ‘তোমরা আল্লাহর রবুবিয়্যাহ ও ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকে শরিক করো না।’৫১৯ তাবারি আল্লাহ তায়ালার বাণী : ক্বুল ইন্নামা আনা বাশারুম মিসলুকুম ইউহা ইলাইয়া আন্নামা ইলাহুকুম ইলাহুন ওয়াহিদ ফামান কানা ইয়ারজু লিকাআ রব্বিহি ফালিয়া'মাল আমালান সলিহাও ওয়ালা তুশরিক বি ইবাদাতি রব্বিহি আহাদা অর্থ : ‘আপনি বলুন, আমি তোমাদের মতোই মানুষ। আমার কাছে ওহি আসে যে, তোমাদের ইলাহ একজন ইলাহ। সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁর রবের সাক্ষাৎ প্রত্যাশ্যা করে, সে যেন পুণ্য করে, আর তাঁর রবের ইবাদতের সঙ্গে কাউকে শরিক না করে।’ [কাহাফ : ১১০]-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘যেন একমাত্র তাঁর ইবাদত করে। একমাত্র তাঁর জন্য রবুবিয়্যাহ সাব্যস্ত করে।’৫২০ এগুলো স্রেফ উদাহরণ। নতুবা পুরো তাফসিরে তাবারি একই কর্মপদ্ধতির উপর প্রতিষ্ঠিত 'রবুবিয়্যাহ' ও 'উলুহিয়্যাহ' দুটোর অবিচ্ছেদ্যতা ও ভারসাম্যের দলিল।

এটাই কুরআনের মর্মকথা, সকল সালাফের কর্মপন্থা। এ কারণে ইমাম আবু হানিফা থেকে শুরু করে তহাবি পর্যন্ত—যেমনটা পিছনে দেখানো হয়েছে—সবাই সামগ্রিক তাওহিদের কথা বলেছেন, যেখানে তাওহিদকে প্রকারভেদের মারপ্যাঁচে ফেলে অঙ্গহানি করা হয়নি। সকল দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ একত্ববাদের বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত প্রকারভেদের জটিলতায় তাওহিদের এই ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। একদল উলুহিয়্যাহকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে রবুবিয়্যাহকে গৌণ করে দিয়েছেন; আরেক দল রবুবিয়্যাহকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে উলুহিয়্যাহকে গৌণ করে ফেলেছেন। অথচ দুটো মিলেই তাওহিদ। দুটো তাওহিদের অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি।

তিন. তাওহিদের পরবর্তী প্রকারভেদ থেকে সৃষ্ট সবচেয়ে বড় জটিলতা এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ফলাফল হলো—তাওহিদের মর্ম অনুধাবনের ক্ষেত্রে বিচ্যুতি। এ এমন এক বিচ্যুতি, সালাফে সালেহিনের যুগে সম্ভবত কেউ কল্পনাও করেননি। এ প্রকারভেদ তাওহিদের এমন অর্থ এনে দিয়েছে, যে অর্থ সালাফের কেউ করেননি; এমন সমীকরণ টেনেছে, যা ইসলাম ও কুরআনি মেযাজের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

সে বিচ্যুতি হলো রবুবিয়্যাহর মর্মের বিকৃতিসাধন, কাফের-মুশরিকদের মুওয়াহহিদ তথা তাওহিদবাদী সাব্যস্তকরণ। অর্থাৎ, তাওহিদের বিভিন্ন প্রকারভেদ করতে গিয়ে একদল লোক তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ বলতে আল্লাহকে স্রেফ পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা (এবং ক্ষেত্রবিশেষে পালনকর্তা) বুঝেছে। ফলে তারা ঘোষণা করেছে, মক্কার মুশরিকরা তাওহিদুর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাসী ছিল। কেবল মক্কার মুশরিকরা নয়, বরং দুনিয়ার অধিকাংশ মুশরিকই তাওহিদুর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাসী। রবুবিয়্যাহ অস্বীকারকারী লোক পৃথিবীতে নগণ্য। নবিগণ রবুবিয়্যাহ প্রতিষ্ঠার জন্য আসেননি, বরং তারা স্রেফ উলুহিয়্যাহ প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছেন। রবুবিয়্যাহর বিশেষ কোনো মূল্য নেই, উলুহিয়্যাহই আসল ইত্যাদি।

অথচ এগুলো তাওহিদের মর্মের বিকৃতি। 'রবুবিয়্যাহ' মানে আল্লাহ স্রেফ সৃষ্টিকর্তা নয়। তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ মানে: সৃষ্টি, রিযিক, প্রতিপালন, রক্ষণাবেক্ষণ, জীবন ও মৃত্যুদান, যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণকরণ, উপকার-অপকারের ক্ষমতা, জগৎ পরিচালনা, ইহকাল ও পরকালের মালিকানা, গোটা সৃষ্টির উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য, আল্লাহর লা-শরিক সত্তা, নামসমূহ ও গুণাবলি সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। ফলে কেউ যদি স্রেফ বলে, 'আল্লাহ বলতে একজন আছেন', অথবা 'সৃষ্টিকর্তা আছেন', অথবা শুধু 'উপরওয়ালা আছেন' ইত্যাদি, তাতেই সে একত্ববাদী হয়ে যাবে—এমনটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। বরং সর্বোচ্চ বলা যায়, সে তাওহিদের একটা ক্ষুদ্রতম অংশে বিশ্বাস করে।

কিন্তু তারা তাওহিদের প্রকারভেদ নির্ধারণ এবং প্রতিপক্ষকে খণ্ডন করতে গিয়ে ভয়ানক বিকৃতির শিকার হয়েছেন। একদিকে জগতের অধিকাংশ কাফেরকে একত্ববাদী বানিয়ে ফেলেছেন, অপরদিকে মুসলমানদের চোখে রবুবিয়্যাহকে গুরুত্বহীন করে দিয়েছেন। রবুবিয়্যাহকে মুক্তির সনদ হওয়ার ক্ষেত্রে অকার্যকর ও অর্থহীন ঘোষণা করেছেন! অথচ রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহ দুটোর সম্মিলিত রূপই সকল নবির দাওয়াতের সারকথা। ইহকাল ও পরকালের সাফল্য দুটোর উপর সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত। কুরআনের মাধ্যমে আমরা জেনেছি, আমাদের রুহের জগতে আল্লাহ প্রশ্ন করেছিলেন। আল্লাহ বলেন : ওয়া ইয আখাযা রব্বুকা মিন বনি আদামা মিন যুহুরিহিম যুররিয়্যাতাহুম ওয়া আশহাদাহুম আলা আনফুসিহিম আলাসতু বি রব্বিকুম কালু বালা শাহিনদা আন তাকুলু ইয়াওমাল কিয়ামাতি ইন্না কুন্না আন হাযা গাফিলিন অর্থ : "আর যখন আপনার রব বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদের বের করলেন এবং নিজের উপর তাদের প্রতিজ্ঞা করালেন, 'আমি কি তোমাদের রব নই?' তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। 'আবার না কিয়ামতের দিন বলতে শুরু করো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।” [আরাফ : ১৭২] এখানে শুধু 'রব' উল্লেখ করার অর্থ এটা নয় যে, তিনি কেবল প্রভু হওয়ার ওয়াদা নিয়েছেন, বরং তিনি একইভাবে মাবুদ হওয়ারও অঙ্গীকার নিয়েছেন। কিন্তু রবুবিয়্যাহ যেহেতু উলুহিয়্যাহকেও অন্তর্ভুক্ত করে, এ জন্য আলাদাভাবে 'ইলাহ' কি না সে প্রশ্ন করা হয়নি। একইভাবে কবরের তিনটি প্রশ্নের একটির ব্যাপারে হাদিসে বলা হয়েছে, 'তোমার রব কে?'৫২১ 'তোমার ইলাহ কে?' বলা হয়নি। তাহলে কি এটা বলা যাবে যে, উলুহিয়্যাহ নিষ্প্রয়োজন? না, মোটেই এমন নয়। বরং 'তোমার রব কে' প্রশ্নের মাঝে 'তোমার ইলাহ কে' এমন অর্থও বিদ্যমান। বরং হাদিসের একাধিক বর্ণনায় 'তোমার রব কে' এটা 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই' শব্দে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ৫২২ ফলে কুরআন-সুন্নাহর যত জায়গাতে 'রব' বলা হয়েছে, সর্বত্র 'ইলাহ'ও অন্তর্ভুক্ত; আবার যত জায়গাতে 'ইলাহ' বলা হয়েছে, সর্বত্র 'রব' অন্তর্ভুক্ত। কাফের-মুশরিকরা কোনো প্রকারের তাওহিদেই বিশ্বাসী নয়।

প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে মক্কার মুশরিকরা যে আল্লাহকে জানত ও চিনত এর ব্যখা কী? ইমাম আজম জবাবে বলেন, 'তারা যদিও বলত আমাদের রব, কিন্তু তারা এ কথার তাৎপর্য বুঝত না। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেন, ওয়া লাইঁ সাআলতাহুম মান খলাকাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা লাইয়াকুলুন্নাল্লাহু কুলিল হামদুলিল্লাহি বাল আকসারুহুম লা ইয়া'লামুন যদি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, কে সৃষ্টি করেছেন আকাশসমূহ এবং পৃথিবী? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ তায়ালা। আপনি বলুন, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। তাদের অধিকাংশেই জানে না।।' [লুকমান : ২৫] এখানে আল্লাহর বাণী 'তাদের অধিকাংশেই জানে না'-এর মর্ম হলো, তারা যদিও মুখে বলে আল্লাহ তায়ালা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, কিন্তু এটা তারা না বুঝেই বলে। এক্ষেত্রে তাদের উদাহরণ হলো জন্মান্ধ বাচ্চার মতো, যে দিন ও রাতের ব্যাপারে শোনে, লাল ও হলুদ রঙের নাম জানে, কিন্তু এর রূপরেখা সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। কাফেরদের অবস্থাও ঠিক তা-ই। তারা মুমিনদের কাছ থেকে আল্লাহর নাম শুনে নিজেরাও মুখে বলে, কিন্তু আল্লাহকে তারা বিলকুল চেনে না। আর এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ইলাহুকুম ইলাহুন ওয়াহিদ ফাল্লাযিনা লা ইউ'মিনুনা বিল আখিরাতি কুলুবুহুম মুনকিরাতুও ওয়াহুম মুসতাকবিরুন অর্থ: 'তোমাদের ইলাহ একক ইলাহ। যারা পরজীবনে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্যবিমুখ এবং তারা দাম্ভিক।'৫২৩ [নাহল : ২২]

ইমাম আজম তাঁর শেষ জীবনের ওসিয়তেও উপরের বিচ্যুতিকে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন, “কেবল জানার নামই ঈমান নয়। এমন হলে আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা সবাই মুমিন হিসেবে গণ্য হতো। কারণ, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন, আল্লাযিনা আতাইনাহুমুল কিতাবা ইয়া'রিফুনাহু কামা ইয়া'রিফুনা আবনাআহুম অর্থ : 'যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা আপনাকে সেভাবে চেনে যেভাবে নিজের সন্তানদের চেনে।' [বাকারা: ১৪৬] তবুও তারা মুমিন নয়। কারণ, তারা জানলেও স্বীকৃতি দেয় না।”৫২৪

টিকাঃ
৫১৭. তাফসিরে তাবারি (২/৭৪৬)।
৫১৮. তাফসিরে তাবারি (৫/৫৪৯)।
৫১৯. তাফসিরে তাবারি (৭/৫)।
৫২০. তাফসিরে তাবারি (১৫/৪৩৯)।
৫২১. মুসলিম (কিতাবুল জান্নাহ : ২৮৭১)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ : ৪৭৫৩)।
৫২২. বুখারি (কিতাবুল জানায়িয: ১৩৬৯)। মুসলিম (২৮৭১)।
৫২৩. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (৩১)।
৫২৪. আল-ওয়াসিয়্যাহ, আবু হানিফা (২৭-২৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আল্লাহর আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলি)

📄 আল্লাহর আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলি)


মহান আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য সুন্দর নামের অধিকারী। তিনি বলেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا অর্থ: 'আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। কাজেই তোমরা তাঁকে সেসব নামে ডাকো।' [আরাফ: ১৮০] হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি সেগুলো আত্মস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' ৫৩৭

আর ভাষার ক্ষেত্রে যেহেতু মূল হলো 'তাওকিফ' তথা আল্লাহপ্রদত্ত, যেমনটা وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِعُونِي بِأَسْمَاءِ هَٰؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ অর্থ : “তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন। তারপর সেই সমুদয় ফেরেশতাদের সামনে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, ‘এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও যদি তোমরা সত্যবাদী হও'।” [বাকারা : ৩১] এ কারণে আহলে সুন্নাতের মতে, আল্লাহর তায়ালার নামগুলো ‘তাওকিফিয়‍্যাহ’; অর্থাৎ, আল্লাহ নিজের উপর প্রয়োগ করেননি অথবা রাসুল (সা.) বলেননি এমন কোনো নাম মানুষের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য নির্ধারণ করা বৈধ নয়।

ফলে সমার্থক হলেও কুরআন-সুন্নাহতে আসেনি এমন নাম আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যাবে না। যেমন 'জাওয়াদ' (দাতা) ও ‘আলেম' (জ্ঞানী) আল্লাহর নাম। কিন্তু এর পরিবর্তে 'সাখি' (দাতা), 'ফাযিল' (জ্ঞানী) ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে ‘রহিম' (দয়ালু) আল্লাহর নাম। কিন্তু এর জায়গায় ‘শফিক' (দয়ালু) ব্যবহার করা যাবে না। মোটকথা, অর্থ ঠিক থাকলেই আল্লাহর নাম সাব্যস্ত করা যাবে না, কিংবা এক নামের জায়গায় সমার্থক শব্দকে নাম বানানো যাবে না। কুরআনে ব্যবহৃত আল্লাহর গুণবাচক শব্দ অভিধানে খুঁজে সেসব অর্থ আল্লাহর উপর প্রয়োগ করা যাবে না। পুরো ব্যাপারটা শতভাগ কুরআন-সুন্নাহর উপর নির্ভরশীল থাকবে।

আল্লাহর নামসমূহের সঙ্গে সৃষ্টির নামের কোনো তুলনা নেই। বাহ্যিক সাদৃশ্য থাকলেও অর্থের গভীরতা ও বাস্তবতার সঙ্গে সৃষ্টির সাদৃশ্য নেই। ফলে আল্লাহর নামগুলোর আল্লাহর ক্ষেত্রে যে অর্থ থাকবে, সৃষ্টির ক্ষেত্রে সে অর্থ থাকবে না। যেমন—আল্লাহর নাম ‘খালিক’ তথা সৃষ্টিকর্তা, স্রষ্টা। আল্লাহর নাম ‘রহিম’ তথা দয়ালু, ‘কারিম' তথা মেহেরবান, ‘আলিম' তথা জ্ঞানী। এসব নাম সৃষ্টির উপরও প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে এগুলোর যে গভীর ও মৌলিক অর্থ থাকে, সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেটা কখনোই বিশ্বাস রাখা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, وَرَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا ۚ অর্থ : ‘তিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং তাদের অন্তর্বর্তী যা-কিছু রয়েছে তার প্রতিপালক। সুতরাং তাঁরই বন্দেগি করো এবং তাতে অবিচল থাকো। তুমি কি তাঁর সমনাম কাউকে জানো।' [মারইয়াম : ৬৫] অথচ বাস্তবে দেখা যায়, তাঁর নামের মতো নাম অনেক মানুষেরও আছে। ফলে আয়াতের মর্ম হলো, যদিও মানুষ সেসব নাম ধারণ করে, কিন্তু সেটা রূপক অর্থে। সেসব নাম পূর্ণাঙ্গ অর্থে ধারণ করার একমাত্র অধিকারী আল্লাহ তায়ালা। তাঁর শানেই সেগুলো শোভনীয়। ৫৪০

একইভাবে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য সুন্দর গুণের অধিকারী। সেগুলোকে সাতটি কিংবা কোনো বিশেষ সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করা সঠিক নয়। বরং যাবতীয় সকল জামাল ও কামাল তথা সৌন্দর্য ও পূর্ণাঙ্গতার আধার তিনি। তাঁর সত্তার মতো তাঁর গুণাবলিও চিরন্তন, চিরস্থায়ী। তিনি শুরু থেকেই এসব গুণে গুণান্বিত। সবসময় গুণান্বিত থাকবেন। সৃষ্টির কোনোকিছু যেমন তাঁর সত্তার সাদৃশ্য রাখে না, তেমনই সৃষ্টির কোনো গুণ তাঁর গুণের সাদৃশ্য রাখে না। আল্লাহর গুণকে সৃষ্টির গুণের সঙ্গে সাদৃশ্য করা কুফর। তেমনই কুরআন ও সুন্নাহতে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত আল্লাহর গুণগুলো অস্বীকার করাও কুফর।

আল্লাহর নাম ও গুণাবলিকেন্দ্রিক বিভিন্ন বিভ্রান্তির কারণেই আমাদের ইমামগণ এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেন; এক্ষেত্রে সৃষ্ট বিচ্যুতি খণ্ডন করেছেন। ৫৪১

ইমাম আজম রহ. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি। কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। তিনি তাঁর সৃষ্টির কোনো বস্তুর মতো নন। তাঁর সৃষ্টির কোনো বস্তুও তাঁর মতো নয়।' ৫৪২ এটা মূলত কুরআনের সুরা ইখলাসের ব্যাখ্যা।

ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কেউ যদি বলে, আমি আল্লাহকে মানি, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তাঁর সন্তান আছে। তখন কী হবে? ইমাম বললেন : 'সুবহানাল্লাহ! এটা কীভাবে সম্ভব? এগুলো তো সব বেহুদা প্রশ্ন। মৃত ব্যক্তির কি স্বপ্নদোষ হয়? যদি মৃত ব্যক্তির স্বপ্নদোষ হয় এমন বলা না যায়, তবে কোনো একত্ববাদীর পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে।' ৫৪৩

আমরা যদি সিফাতের ক্ষেত্রে ইমামের মানহাজের দিকে তাকাই, তবে দেখব, সেটা সালাফে সালেহিনের মানহাজ। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িন যে আকিদার উপর ছিলেন, ইমাম আজম রহ. একজন তাবেয়ি হিসেবে সেই আকিদার উপরই ছিলেন। তারা আল্লাহর সিফাতগুলোকে সাব্যস্ত করার নামে আল্লাহকে মানুষের মতো কল্পনা করেননি, আবার সরাসরি কিংবা অপব্যাখ্যার মাধ্যমে সেগুলো নাকচও করে দেননি; বরং কুরআন সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে সেভাবেই রেখে দিয়েছেন। ইমাম বলেন, 'আমরা আল্লাহকে সেভাবে চিনি যেভাবে তাঁকে চেনা উচিত, যাবতীয় গুণসহ যেভাবে তিনি নিজেকে স্বীয় কিতাবে বর্ণনা করেছেন।' ৫৪৪

আল্লাহর সিফাতের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো চিরন্তন, অনাদি (আযালি), পরবর্তীকালে তৈরি হওয়া নয়। ইমাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালার গুণসমূহ চিরন্তন। পরবর্তীকালে অস্তিত্বে এসেছে এমন নয়, সৃষ্টও নয়। সুতরাং যে বলবে, আল্লাহর গুণসমূহ সৃষ্ট, কিংবা পরবর্তীকালে অস্তিত্বে এসেছে, কিংবা এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা অবলম্বন করবে অথবা সন্দেহ করবে, সে যেন আল্লাহ তায়ালাকেই অস্বীকার (কুফর) করল।' ৫৪৫

ইমাম আজম বলেন, “আল্লাহ তায়ালা তাঁর নামসমূহ এবং তাঁর সত্তাগত ও কর্মগত গুণাবলিতে সতত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাঁর কোনো নাম বা গুণ পরবর্তীকালে অস্তিত্বে আসেনি। তাঁর সত্তাগত গুণাবলি হচ্ছে: 'হায়াত' (জীবন), 'কুদরত' (শক্তি), 'ইলম' (জ্ঞান), 'কালাম' (বাণী), 'সাম্' (শ্রবণ), 'বাসার' (দর্শন) এবং 'ইরাদা' (ইচ্ছা)। আর তাঁর কর্মগত গুণাবলি হচ্ছে: 'তাখলিক' (সৃষ্টি করা), 'তারযিক' (রিযিক দেওয়া), 'ইনশা' (সূচনা করা), 'ইবদা' (উদ্ভাবন করা) ও 'সুনউ' (তৈরি করা) ইত্যাদি।” ৫৪৭ এসব সিফাতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো :

'হায়াত' (জীবন) হলো আল্লাহর অনাদি ও অনন্ত শাশ্বত একটি সিফাত। তিনি সর্বদা এ গুণে গুণান্বিত ছিলেন ও থাকবেন। তিনি চিরঞ্জীব-চিরস্থায়ী। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴾اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ﴿ অর্থ : 'আল্লাহ। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব। সদা বিদ্যমান রক্ষাকর্তা (কাইয়ুম)।' [বাকারা : ২৫৫] আল্লাহ আরও বলেন, ﴾وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ﴿ অর্থ : 'আর আপনি ভরসা করুন সেই চিরঞ্জীব সত্তার উপর যিনি মৃত্যুবরণ করবেন না।' [ফুরকান: ৫৮]

'কুদরত' (শক্তি-সামর্থ্য) আল্লাহ তায়ালার একটি চিরন্তন সিফাত। তিনি সবকিছু করতে সক্ষম। সর্বশক্তিমান। তিনি যখন কিছু করেন, তখন তাঁর চিরন্তন 'কুদরত'-এর মাধ্যমে করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴾إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ﴿ অর্থ : 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান।' [বাকারা : ২০] অন্যত্র বলেন, 'বলুন, তিনি (আল্লাহ) সম্পূর্ণ ক্ষমতাবান, তোমাদের উপর কোনো শাস্তি উপর দিক থেকে, অথবা তোমাদের পদতল থেকে প্রেরণ করবেন...' [আনআম : ৬৫]

'ইলম' (জ্ঞান) আল্লাহ তায়ালার অবিনশ্বর সিফাত (গুণ)। তিনি সবকিছু জানেন। গোপন ও প্রকাশ্য, বিদ্যমান ও অবিদ্যমান, সম্ভব ও অসম্ভব—সবকিছু সম্পর্কে সবিস্তার জানেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা হতে। এরপর শুক্রবিন্দু হতে। এরপর তোমাদের করেছেন যুগল! আল্লাহর অজ্ঞাতসারে কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং প্রসবও করে না... নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর জন্য সহজ।' [ফাতির : ১১] আরও বলেন, 'তিনি (আল্লাহ) তাদের সামনে ও পশ্চাতে যা-কিছু আছে সবকিছু সম্পর্কে অবগত। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা ব্যাতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না।' [বাকারা : ২৫৫]

'কালাম' আল্লাহ তায়ালার একটি চিরন্তন সত্তাগত গুণ। আল্লাহ তায়ালা শুরু থেকেই কথা বলেন। কিন্তু তাঁর কথা সৃষ্টির কথার সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না। আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা মুসা আ.-এর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন।' [নিসা: ১৬৪]

'সাম্' তথা শ্রবণ আল্লাহ তায়ালার একটি চিরন্তন গুণ। তিনি সেই চিরন্তন গুণের মাধ্যমে সকল আওয়াজ ও কথা শোনেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তাঁর মতো কিছু নেই। তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন।' [শুরা : ১১] আল্লাহ আরও বলেন, 'আল্লাহ অবশ্যই শুনেছেন সে নারীর কথা যে তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সঙ্গে বাদানুবাদ করছিল... আল্লাহ আপনাদের কথোপকথন শোনেন।' [মুজাদালাহ : ১]

'বাসার' তথা দর্শনও আল্লাহর চিরন্তন গুণ। তিনি সেই চিরন্তন গুণের মাধ্যমে সকল আকার-আকৃতি ও রং-রূপ দেখতে পান। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি (নামাযে) দণ্ডায়মান হন; আর দেখেন সিজদাকারীদের সঙ্গে আপনার ওঠাবসা।' [শুরা : ২১৮-২১৯] আল্লাহ আরও বলেন, 'আপনি বলুন, তোমরা আমল করতে থাকো। আল্লাহ তোমাদের আমল দেখবেন...' [তাওবা : ১০৫]

'ইরাদা' আল্লাহর একটি সত্তাগত চিরন্তন গুণ। ফলে তিনি ইচ্ছা তা-ই করেন, তা-ই নির্দেশ দেন। আল্লাহ বলেন, 'তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন।' [বুরূজ: ১৬] তিনি যা ইচ্ছা করেন তা-ই হয়। যা ইচ্ছা করেন না, তা হয় না। আল্লাহ বলেন, 'তোমরা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত ইচ্ছা করো না।' [তাকভির : ২৯]

ইমামের বক্তব্যে উল্লিখিত আল্লাহর তিনটি কর্মগত সিফাত তথা 'তাখলিক', 'ইনশা', 'সুনউ' সমার্থক শব্দ। সবগুলোর অর্থ সামগ্রিকভাবে সৃষ্টি করা। 'তাখলিক' হলো সাধারণভাবে সৃষ্টি করা। আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ সমস্ত কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর কর্মবিধায়ক।' [যুমার : ৬২] 'সুনউ' বলা হয় সুনিপুণ ও সুপরিকল্পিত সৃষ্টি। আল্লাহ বলেন, 'এটা আল্লাহরই সৃষ্টিনিপুণতা, যিনি সমস্ত কিছুকে করেছেন সুসংহত।' [নামল : ৮৮] আর 'ইনশা' হলো সর্বপ্রথম সৃষ্টি করা।

টিকাঃ
৫৩৭. বুখারি (২৭৩৬)। মুসলিম (২৬৭৭)।
৫৪০. তালখিসুল আদিল্লাহ (৩৪১-৩৪২)।
৫৪১. লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি: ৪৮)।
৫৪২. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
৫৪৩. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২১)।
৫৪৪. আল-ফিকহুল আকবার (৬)।
৫৪৫. আল-ফিকহুল আকবার (১-২)।
৫৪৭. আল-ফিকহুল আকবার (১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00