📄 মুকাল্লিদ কি গুনাহগার?
মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ—এটাই মুসলমানদের সকল ধারার গ্রহণযোগ্য মত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দলিল-প্রমাণ পরিত্যাগের কারণে সে গুনাহগার হবে কি? আশআরি ধারার আলেমগণ মনে করেন, সে গুনাহগার হবে। অধিকাংশ হানাফি মুতাকাল্লিম তাদের অনুসরণে মনে করেন, মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ হলেও সে দলিল পরিত্যাগের কারণে গুনাহগার হবে।⁴৯৮
মাইমুন নাসাফি বলেন, 'কেউ অন্তরে সত্যায়ন করলেই মুমিন গণ্য হবে। সেটা দলিলভিত্তিক হোক কিংবা দলিলবিহীন হোক। ফলে মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ। তাঁর ঈবাদত সঠিক। পরকালে সে জান্নাতি।' তবে নাসাফি দলিল-প্রমাণ পরিত্যাগের কারণে তাকে গুনাহগার ও অবাধ্য সাব্যস্ত করেন। এটাকে তিনি ইমাম আজমসহ চার ইমামের মাযহাব বলেন।⁴৯৯ সাবুনি লিখেন, 'ইমাম আবু হানিফা, সুফিয়ান সাওরি, মালেক, আওযায়ি এবং অধিকাংশ ফকিহ ও মুহিদ্দিসের বক্তব্য হলো, মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ। হ্যাঁ, (যদি কোনো যৌক্তিক কারণ ব্যতীত) ঈমানের দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তবে সে অবাধ্য গণ্য হবে। এটাই সঠিক বক্তব্য।’⁵⁰⁰ রুকনুদ্দিন সমরকন্দি বলেন, 'বিশুদ্ধ মাযহাব অনুযায়ী মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ। তবে দলিল পরিত্যাগ করলে গুনাহগার হবে।⁵⁰¹ হাফিজুদ্দিন নাসাফিও মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ স্বীকার করার পরে দলিল পরিত্যাগ করার কারণে গুনাহগার আখ্যা দিয়েছেন, তাকে 'ফাসিকুল মিল্লাহ' (পাপী মুসলিম) বলেছেন। শেষে এটাকে আবু হানিফা, সুফিয়ান সাওরি, মালেক, শাফেয়ি, আওযায়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল প্রমুখের মাযহাব বলেছেন। ⁵⁰²
যদি তারা এসব ইমামের মাযহাব বলতে স্রেফ 'মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ' অংশটুকু বোঝান, তবে তাদের বক্তব্য সঠিক। কিন্তু তারা যদি 'মুকাল্লিদ গুনাহগার' অংশটুকু বোঝান, তবে এমন দাবি সঠিক নয়, বরং ভিত্তিহীন পরিগণিত হবে। ইমাম আজম, শাফেয়ি, মালেক ও আহমদ ইবনে হাম্বলরা কখনো মুকাল্লিদকে গুনাহগার বলেননি। ইমাম আজম থেকেও এ ধরনের কোনো বক্তব্য নেই। হ্যাঁ, যদি কারও সুযোগ থাকে, তবে তাওহিদের দলিলগুলো জেনে নেওয়াই উত্তম, যাতে সন্দেহের মুখে পা ফসকে না যায়। কিন্তু মুকাল্লিদকে কালামি দলিল পরিত্যাগের কারণে গুনাহগার বলা মুতাযিলা এবং মুতাযিলা-প্রভাবিত পরবর্তী সময়ের একদল মুতাকাল্লিমের বক্তব্য। সালাফে সালেহিন এ ধরনের কোনো আকিদা রাখতেন না। প্রথম যুগের হানাফি আলেমগণও এমন বক্তব্য দেননি, যা পিছনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাযি সদরুল ইসলাম বাযদাবি বলেন, 'আহলে সুন্নাতের বক্তব্য হলো- মুকাল্লিদ প্রকৃত অর্থেই মুমিন। মুতাযিলাদের কাছে সে মুমিন নয়। আশআরিদের প্রতিষ্ঠিত মত অনুযায়ীও সে মুমিন। এটাই উম্মাহর অধিকাংশ মানুষের আকিদা। সাহাবায়ে কেরামের মতাদর্শ। এর বিরোধিতা করা গোমরাহি ও বিদআত। যুক্তিও তা-ই বলে। পথ চলার উদ্দেশ্য হলো গন্তব্যে পৌঁছানো। যদি কেউ গাইড নিয়ে (মুকাল্লিদ) মক্কায় পৌঁছয়, আর যদি কেউ গাইড ছাড়া (গাইরে মুকাল্লিদ) মক্কায় পৌঁছয়, দুজনেই মক্কায় পৌঁছেছে ধর্তব্য হবে। দুজনেই গন্তব্যে পৌঁছেছে। কারও সহায়তায় পৌঁছল নাকি সহায়তা ছাড়া, সেটা মুখ্য নয়। '⁵⁰³
গাযালি লিখেন, 'আল্লাহর উপর ঈমান রাখা, আল্লাহ ও রাসুলকে সত্যায়ন করা, হকের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, ইবাদতে মগ্ন থাকাই যথেষ্ট। কেননা, নবিজি (সা.) যখন দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, তখন মানুষের কাছ থেকে সত্যায়ন (তথা ঈমান) ছাড়া আর কিছু চাননি। এই ঈমান কারও তাকলিদ করে নাকি দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে, আল্লাহর রাসুল সে পার্থক্য খোঁজেননি। বরং যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ঈমান আনবে সে-ই মুমিন। এরচেয়ে বেশি কোনোকিছু নিয়ে তাকে উত্ত্যক্ত না করা চাই। দলিল খুঁজতে গেলে অনেক সময় তাদের মনের মাঝে উলটো বিভিন্ন সংশয়-সন্দেহ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম এসবের মাঝে প্রবেশ করেননি; দাওয়াত ও ইবাদতের মাঝে সময় কাটিয়েছেন। দ্বীন ও দুনিয়ায় মানুষের কী করে কল্যাণ হবে, সবাইকে সে পথে ডেকেছেন। ⁵⁰⁴
কাসানি লিখেছেন, 'মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ। দৃঢ়ভাবে ঈমান আনলেই সে ঈমান তার দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য উপকারী হবে। এর জন্য আকলি দলিল নিষ্প্রয়োজন। ⁵⁰৫ খোদ হানাফি মুতাকাল্লিমিনের মাঝে জামালুদ্দিন গযনবি (৫৯৩ হি.) লিখেন, 'মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ। ফলে কেউ যদি আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর চিরন্তনতা ও তাওহিদকে স্বীকার করে, তাঁর সকল গুণাবলি, নবি-রাসুল, আসমানি কিতাব ইত্যাদির প্রতি অনড় ও সন্দেহাতীত বিশ্বাস রাখে, তবে সে মুমিন এবং দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় জাহানে তার ঈমান বিশুদ্ধ। আলাদা করে আকলি দলিল-প্রমাণ নিষ্প্রয়োজন। ⁵⁰৬
টিকাঃ
৪৯৮. দেখুন : শরহুল মাকাসিদ, তাফতাযানি (২/২৬৫)। লুবাবুল কালাম (৩৮)। জামেউল মুতুন, গুমুশখানভি (২৮)। শরহুল ফিকহিল আকবার, বাহাউদ্দিন যাদাহ (৩১-৩২)।
৪৯৯. দেখুন : তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/১৫৪-১৫৫, ১৫৭-১৫৮)।
৫০০. আল-বিদায়াহ মিনাল কিফায়াহ (১৫৪)।
৫০১. আল-আকিদাহ আর-রুকনিয়্যাহ (পাণ্ডুলিপি) (২, ৪৫-৪৬)।
৫০২. দেখুন: আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৩৮৫)।
৫০৩. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৫৫)।
৫০৪. আল-ইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ (১৯)।
৫০৫. আল মুতামাদ ফিল মুতাকাদ (১৪)।
৫০৬. উসুলুদ্দিন (২৫৯-২৬০)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
সামগ্রিকভাবে মুকাল্লিদের ঈমান শুদ্ধ-অশুদ্ধ এবং মুকাল্লিদ গুনাহগার কিংবা গুনাহগার নয়—এ বিষয়ে সালাফে সালেহিন ও মুতাকাল্লিমদের মতপার্থক্য অধমের মতে শাব্দিক, তাত্ত্বিক, সংজ্ঞায়ন ও স্তর নির্ধারণের ক্ষেত্রে জটিলতাভিত্তিক। মৌলিক ও বাস্তবিক কোনো মতপার্থক্য নয়।
অর্থাৎ, অধিকাংশ মুতাকাল্লিম তাকলিদের পরিবর্তে ঈমানের জন্য পর্যবেক্ষণ (নজর) এবং যৌক্তিক পর্যালোচনার (ইসতিদলাল) যে শর্ত করেছেন, সেটা বাস্তবায়নের জন্য আলাদাভাবে কালাম কিংবা মানতিক শেখা নিষ্প্রয়োজন। বরং প্রত্যেক সচেতন ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী কালিমা পাঠকারীর ভিতরে সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যমান থাকে। শাহাদাহ দানের মাঝেই সেই ন্যূনতম পর্যবেক্ষণ উপস্থিত থাকে। ফলে প্রত্যেক মুমিনই সে ভিত্তিতে 'গাইরে মুকাল্লিদ' হয়ে থাকে এবং তার ঈমান বিশুদ্ধ হয়। এভাবে প্রত্যেকেই গুনাহ থেকেও বেঁচে যায়। কারণ, ফিতরতিভাবে কেউই 'মুকাল্লিদ' থাকে না। হ্যাঁ, যে ব্যক্তি ঈমানের প্রতি একেবারেই ভ্রুক্ষেপ করে না, কিংবা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সন্দেহের দোলাচলে দুলতে থাকে, এমন ব্যক্তির পদস্খলনের আশঙ্কা অস্বীকার করার সুযোগ নেই এবং তাকে ত্রুটিপূর্ণ মুমিন বলাও অযৌক্তিক নয়।