📄 তাকলিদের পরিচয়
'তাকলিদ' (التقليد) শব্দের অর্থ হলো অনুসরণ করা, অনুকরণ করা; কারও প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখে নিজেকে তাঁর প্রতি সঁপে দেওয়া। অজ্ঞতা ও অক্ষমতা কিংবা অন্য কোনো কারণে নিজে দলিল-প্রমাণ না খুঁজে অন্যের দলিল-প্রমাণের উপর ভরসা রেখে তাকে অনুসরণ করার নাম তাকলিদ। ঈমানের ক্ষেত্রে তাকলিদ হলো আল্লাহ, ফেরেশতা, পরকাল ইত্যাদির মতো ঈমানের মৌলিক রুকনগুলো দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে না জেনে বিশ্বাস করা।
অন্যকথায়, দলিল-প্রমাণবিহীন বিশ্বাসকে ঈমানের ক্ষেত্রে তাকলিদ কিংবা মুকাল্লিদের ঈমান বলা হয়। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। একজন অমুসলিমকে বলা হলো, ইসলাম সত্য ধর্ম। সুতরাং আপনি বলুন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।' সে বলল। এক্ষেত্রে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই সে ঈমান আনল। তাকে যদি আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে বলা হয়, কিংবা কুরআন আল্লাহর অবতীর্ণ সত্য গ্রন্থ—এর দলিল চাওয়া হয়, সে কিন্তু দিতে পারবে না। তবুও সে নিজেকে মুমিন বলে দাবি করছে। এমন লোককে বলা হয় 'মুকাল্লিদ।'
প্রশ্ন হলো, এমন ব্যক্তির ঈমান গ্রহণযোগ্য কি না। এমন ব্যক্তি মুমিন হবে কি না? ঈমানের জন্য দলিল-প্রমাণ জরুরি, নাকি অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসই যথেষ্ট? অন্যের অনুসরণপূর্বক ঈমান আনা হলে সেটা গৃহীত হবে কি না? নাকি দলিল-প্রমাণ না থাকার কারণে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসকে 'সন্দেহ' বিবেচনা করে প্রত্যাখ্যান করা হবে?
বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের কাছে ঈমানের জন্য অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসই যথেষ্ট। সেটা দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে হোক, কিংবা কারও তাকলিদ বা অনুসরণপূর্বক হোক, সেটা মুখ্য নয়। ফলে আলেম হোক কিংবা জাহেল হোক, অনুসরণীয় হোক কিংবা অনুসারী হোক, প্রত্যেক মুমিনের ঈমান গ্রহণযোগ্য। বিপরীতে একদল মুতাকাল্লিম মনে করেন, ঈমানের ক্ষেত্রে তাকলিদ বৈধ নয়। ফলে যদি কেউ দলিল-প্রমাণ না জেনে স্রেফ অন্যদের 'হাঁ'-তে 'হাঁ' মিলিয়ে, অন্ধ অনুসরণে ঈমান আনে, তবে এমন ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। অন্ধ মুকাল্লিদ মুমিন বিবেচিত হবে না!
উভয় পক্ষের মাঝে কোন পক্ষের কথা বিশুদ্ধ? বাস্তব কথা হলো, উভয় পক্ষের কথাই বিশুদ্ধ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, উপরের মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে 'তাকলিদ'-এর স্তরভেদ নির্ধারণের কারণে। 'তাকলিদ' বলতে ঠিক কোন পর্যায়ের তাকলিদ, আর দলিল-প্রমাণ বলতে ঠিক কোন পর্যায়ের দলিল-প্রমাণ, সেটা নির্ধারণে জটিলতার কারণে বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। নতুবা উভয় পক্ষের বক্তব্যের মাঝে মৌলিক কোনো মতবিরোধ নেই। সামনের পৃষ্ঠাগুলোতে আমরা ইমাম আজমের বক্তব্যসহ দু-পক্ষের মতামতের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা বিশ্লেষণের চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
📄 মুতাকাল্লিমিন (কালামপন্থি) আলেমদের মত
আকলের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত বুদ্ধিজীবী মুতাযিলাদের মতে, মুকাল্লিদের ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ঈমানের ক্ষেত্রে মুকাল্লিদ মুমিন নয়, কাফের। তাদের মতে, ঈমানের প্রত্যেকটি মাসআলা যদি কেউ দলিলভিত্তিক না জানে এবং যেকোনো সময় মনে সৃষ্ট সংশয় দূর করার ক্ষমতা না রাখে, তবে তার ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না।⁴⁷৪
ইমাম আবুল হাসান আশআরি ও আশআরিদের মত নির্ধারণে একটু জটিলতা ও মতপার্থক্য রয়েছে। কারও মতে, তাদের আর মুতাযিলাদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। লামিশি লিখেন, 'আশআরির প্রসিদ্ধ মাযহাবমতে মুকাল্লিদের ইমান বিশুদ্ধ নয়।'⁴⁷৫ আরেক দল আলেম এটা অস্বীকার করেছেন এবং এ বক্তব্যকে তাঁর উপর অপবাদ বলেছেন। এক্ষেত্রে বাস্তব কথা হলো, আশআরি মাযহাব বিবর্তনের শিকার হয়েছে। তাদের একদলের মতে, মুকাল্লিদের ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে তাদের আর মুতাযিলাদের বক্তব্যের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু আবুল হাসান আশআরিসহ মুহাক্কিক আশআরি আলেমদের মতে দলিল-প্রমাণবিহীন ঈমান একেবারে প্রত্যাখ্যাত কিংবা মুকাল্লিদ কাফের—এমন নয়, বরং মুকাল্লিদ মুমিন। কিন্তু দলিল-প্রমাণ না থাকার কারণে সে গুনাহগার হবে এবং আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দেবেন, চাইলে ক্ষমা করে দেবেন।⁴⁷৬
তাফতাযানি লিখেন, 'ইজমালি দলিলের মাধ্যমে তাকলিদের বাইরে এসে আল্লাহকে চেনা ফরজে আইন। প্রত্যেকের উপর ফরয। আর তফসিলি দলিল যার মাধ্যমে সন্দেহ-সংশয় দূর করা সম্ভব হয়, বিরুদ্ধবাদীদের খণ্ডন করা যায়, মানুষকে পথ দেখানো যায়—এটা ফরজে কিফায়া।'⁴⁷৭ আবুল হাসান আশআরি, আবু বকর বাকেল্লানি, আবু ইসহাক ইসফারায়েনি, ইমামুল হারামাইন জুয়াইনিসহ সকলের মত এটা। লাক্কানির শরহুল জাওহারাহ, সানুসির উম্মুল বারাহিন সর্বত্র এটা লেখা আছে।⁴⁷৮
হানাফিদের মাঝে ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদির মতে, 'জগতের প্রত্যেক মানুষ বিভিন্ন দ্বীন ও মতাদর্শের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যেকে নিজেকে হক দাবি করে, অন্যেরটা বাতিল বলে। সুতরাং বোঝা গেল, এক্ষেত্রে অন্যের অনুসরণ (তাকলিদ) গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, প্রত্যেকেই তাকলিদ করে নিজেরটা হক বলবে। তাই এক্ষেত্রে নিজেরটা হক এবং অন্যেরটা বাতিল বলতে সামঈ ও আকলি (শরিয়ত ও যুক্তিনির্ভর) দলিল-প্রমাণ প্রয়োজন।'⁴⁷৯ উক্ত বক্তব্য তিনি 'কিতাবুত তাওহিদ'-এ দিয়েছেন। এ বক্তব্য দ্বারা মনে হয়, তিনিও মুতাযিলা এবং একদল আশআরির মতো ঈমান দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে গ্রহণের শর্ত করেন, অন্যের অনুকরণে ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তাঁর আরও কিছু বক্তব্য পাওয়া যায়, যা একরকম সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সমার্থক।
টিকাঃ
৪৭৪. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/১৬০)। হিদায়াতুল মুরিদ, লাক্কানি (১/১৯৭-২০৩)।
৪৭৫. দেখুন : আত-তামহিদ, লামিশি (১৩৭)।
৪৭৬. আর রাওযাতুল বাহিয়্যাহ (২১)।
৪৭৭. শরহুল মাকাসিদ (১/৪৬)।
৪৭৮. দেখুন: নাজমুল ফারায়েদ (৪০)।
৪৭৯. আত-তাওহিদ, মাতুরিদি (৬)।
📄 ইমাম আজম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ-মুহাদ্দিসের মত
ইমাম আজম রহ.-এর মতে ঈমানের ক্ষেত্রে তাকলিদ বৈধ। এটা কেবল ইমাম আজম নন, সুফিয়ান সাওরি, মালেক, আওযায়ি, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বলসহ মুসলিম উম্মাহর সকল ফকিহ ও মুহাদ্দিসের মত। তাদের মতে, ঈমান গ্রহণের জন্য বিশ্বাস ও সাক্ষ্যই যথেষ্ট, হোক সেটা তাকলিদভিত্তিক। ফিতরত ও আকলের দাবিও এটা। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ ءَامَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ عَلَيْنَا وَمَا أُنزلَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَىٰ وَعِيسَىٰ وَالنَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
অর্থ : ‘বলো আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা-কিছু অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের উপর, ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাঁদের সন্তানবর্গের উপর, আর যা-কিছু দেওয়া হয়েছে মুসা ও ঈসা এবং অন্য নবি-রাসুলগণকে তাঁদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আমরা তাঁদের কারও মধ্যে পার্থক্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত।' [আলে ইমরান : ৮৪] এখানে স্রেফ ঈমান আনার শর্ত করা হয়েছে, কোনো দলিল-প্রমাণ তালাশ করতে বলা হয়নি।
শুধু এ আয়াত নয়, কুরআন কারিমের সকল আয়াত স্রেফ ঈমান ও বিশ্বাসের নির্দেশ দিয়েছে, দলিল-প্রমাণকে ঈমানের শর্ত করা হয়নি। হ্যাঁ, দলিল-প্রমাণ পেশ করা হয়েছে, আসমান ও যমিনের নিদর্শনাবলি, মানুষের নিজেদের দেহের মাঝে বিদ্যমান নিদর্শনাবলি দেখার এবং এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো ঈমান মজবুত ও দৃঢ় করার জন্য, মানসিক তৃপ্তিলাভের জন্য। এগুলোকে ঈমান কবুলের শর্ত করা হয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আমি মানুষের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয়, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ', আর নামায কায়েম এবং যাকাত প্রদান করে। যখন তারা এটুকু করবে, তাদের জানমাল নিরাপদ হয়ে যাবে। আর তাদের হিসাব থাকবে আল্লাহর উপর।”⁴⁸⁰ উক্ত হাদিসে কেবল সাক্ষ্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দলিলসহ সবিস্তারে জানার কথা বলা হয়নি। তা ছাড়া, পৃথিবীর সবার জন্য ঈমানের পক্ষে দলিল-প্রমাণ জানা সম্ভবও নয়। কেউ সত্যকে যেকোনো পদ্ধতিতে জানুক, তাকে সত্য সম্পর্কে জ্ঞাতই বলা হবে। সুতরাং ঈমান আনাটাই মুখ্য ও যথেষ্ট। দলিল-প্রমাণ আছে কি না সেটা মুখ্য নয়।
ইমাম আজম বলেন, “কেউ যদি বলে, আল্লাহ নামায, রোযা ও যাকাত ফরয করেছেন কি না আমার জানা নেই, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, কুরআনে আল্লাহ নামায কায়েম এবং যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ অর্থ : 'আর তোমরা নামায কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো।' [বাকারা : ৪৩] অন্যত্র বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتিবَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ : ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে।' [বাকারা : ১৮৩] [এগুলো ইসলামের মূল বিষয়। সুতরাং ইচ্ছাকৃত কেউ এগুলো সম্পর্কে গাফেল থাকলে সে কাফের হয়ে যাবে।] হ্যাঁ, যদি কেউ বলে, আমি এগুলোতে ঈমান রাখি, কিন্তু এগুলোর ব্যাখ্যা জানি না, তবে সে কাফের হবে না। কেননা, মূল কুরআনে সে ঈমান রাখে, কেবল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিচ্যুতির শিকার।⁴⁸¹ ইমামের আজমের কথায় স্পষ্ট যে, নামায-রোযার বিষয়গুলো এ ব্যক্তি নিজে দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে জানেনি, সেভাবে জানলে 'ব্যাখ্যা জানি না' বলত না। তবুও ইমাম তার ঈমান গ্রহণযোগ্য বলেছেন। কারণ, ইমাম আজমের মতে মুকাল্লিদের ঈমান গ্রহণযোগ্য, দলিল-প্রমাণ আবশ্যক নয়।
ইমাম আরও স্পষ্ট করে বলেন, “কেউ যদি ইসলামের কোনো বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তবে তাকে কাফের বলা হবে না। যেমন—ইসলাম ও মুসলিমের কেন্দ্রভূমি থেকে দূরে কেউ যদি শিরকে নিমজ্জিত কোনো ভূখণ্ডে থাকে, সে কারণে তার কাছে ইসলামের দাওয়াত না পৌঁছয় এবং ইসলামি শরিয়াহর ফরয ও ওয়াজিব বিধিবিধান সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান না থাকে, কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে তার বিশ্বাস থাকে আর এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে সে ব্যক্তি মুমিন গণ্য হবে।”⁴⁸২ ইমাম আরও বিস্তারিত বলেন, “মানুষ মুমিন গণ্য হয় আল্লাহকে চেনা ও স্বীকার করার মাধ্যমে। একইভাবে কাফের হয় আল্লাহকে অস্বীকার করার মাধ্যমে। ফলে কেউ যখন আল্লাহকে প্রতিপালক (রব) ও উপাস্য (ইলাহ) হিসেবে স্বীকার করবে, তাওহিদকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করবে, আল্লাহর কাছ থেকে আগত সবকিছু মেনে নেবে। তার জন্য ঈমান কিংবা কুফরের সংজ্ঞার্থ জানা থাকা জরুরি নয়। কারণ, সে জানে ঈমান ভালো আর কুফর মন্দ; ঈমান কল্যাণ আর কুফর অকল্যাণ। ফলে এটুকু জানা ও মানাই যথেষ্ট। যেমন—কেউ মধু ও মাকাল ফল দুটোই মুখে দিয়ে পরীক্ষা করে মধুর মিষ্টতা আর মাকালের তিক্ততা অনুভব করল। তার জন্য মধু কিংবা মাকালের নাম বা সংজ্ঞার্থ জানা জরুরি নয়। তার ব্যাপারে এ কথাও বলা যাবে না যে, সে মিষ্টতা বা তিক্ততা চেনে না। বেশির চেয়ে বেশি এটুকু বলা যাবে যে, সে এগুলোর সংজ্ঞার্থ জানে না। একই কথা ঈমান ও কুফরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য—যখন কেউ জানবে যে, ঈমান ভালো আর কুফর মন্দ, এটুকু জেনে মানলেই যথেষ্ট হবে। আলাদা করে ঈমান ও কুফরের সংজ্ঞার্থ জানার দরকার নেই। কেউ এই সংজ্ঞার্থ না জানলেই তাকে আল্লাহ অস্বীকারকারী বলা যাবে না।⁴⁸³
ফলে আল্লাহকে চেনা ও স্বীকার করার মাধ্যমেই ঈমান সংঘটিত হয়। সেটার জন্য ঈমানের সংজ্ঞার্থ জানা এবং দলিল থাকা জরুরি নয়, বরং কারও অনুসরণ করার মাধ্যমেও ঈমান সংঘটিত হতে পারে। ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্যের অনুসরণে ইমাম মাতুরিদিকেও আমরা একই বক্তব্য দিতে দেখি। লাক্কানি জাওহারার ব্যাখ্যায় বলেন, আবু মনসুর মাতুরিদি বলেন, আমাদের উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, সাধারণ মানুষ মুমিন, আল্লাহর মারিফাতের অধিকারী। তারাও জান্নাতের উপযুক্ত, যেমনটা হাদিসে এসেছে এবং এর উপর ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে। হ্যাঁ, কেউ কেউ আকিদার ক্ষেত্রে আকলি তথা বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা ও দলিলের কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা প্রাকৃতিকভাবেই হয়ে যায়। কারণ, মানুষের ফিতরত সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদ, তাঁর অবিনশ্বরতা এবং সৃষ্টির নশ্বরতা এগুলোর উপর গঠিত। ফলে তারা মুখে মুতাকাল্লিমদের ভাষায় সেটা প্রকাশ করতে না পারলেও এ বিশ্বাস তাদের অন্তরের গভীরে প্রোথিত। আর এটা স্পষ্ট যে, এটা মুখে প্রকাশ করা জরুরি নয়।⁴⁸৪
ইমাম আজমের অনুসরণে হানাফি আলেমগণ ‘মুকাল্লিদের ঈমান সঠিক’ বলে মতামত প্রকাশ করেছেন। ফলে এক্ষেত্রে তারা মুতাযিলা ও আশআরিদের বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ ও মুহাদ্দিসের সঙ্গে একমত। কাযি সদর বাযদাবি বলেন, ‘আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো—মুকাল্লিদ প্রকৃত অর্থেই মুমিন। ফলে কেউ যদি ইসলামের সকল মৌলিক রুকন অন্তরে সত্যায়ন করে এবং মুখে স্বীকৃতি দেয়, তবে সে মুমিন। এর জন্য দলিল-প্রমাণ দরকার নেই।’⁴⁸⁵ সাবুনিও মুকাল্লিদের ঈমানকে সহিহ বলে মত দিয়েছেন এবং এটাকে ইমাম আবু হানিফা, মালেক, আওযায়ি, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, আবদুল্লাহ ইবনে সাইদ আল-কাত্তান, হারেস মুহাসেবি, আবদুল্লাহ আল-মক্কির মত বলে স্বীকার করেছেন।⁴⁸⁶
সিরাজুদ্দিন উশি লিখেন, 'মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ। ফলে কেউ যদি দলিল-প্রমাণ ছাড়াও ঈমান আনে সে মুমিন গণ্য হবে।'⁴⁸৭ আবু ইসহাক সাফফার এ বিষয়ে অনেক সুন্দর কথা লিখেছেন। তিনি লিখেন, 'সত্যকে যেকোনো পদ্ধতিতে জানলেই হলো। এর জন্য দলিল জরুরি নয়। এটাই ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর শাগরেদদের মত। এটাই সাহাবা ও তাবেয়িনসহ গোটা সালাফে সালেহিনের মানহাজ। কারণ, দলিল ছাড়া জানা কোনো জিনিস দলিলসহ জানার দ্বারা বদলে যায় না। সুতরাং দলিল ছাড়া জানলেও যা থাকে দলিলসহ জানলেও তা-ই থাকে। এটা হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত। যেমন—ইমাম আজম রহ. বর্ণনা করেছেন, "আল্লাহর রাসুল বলেন, 'তোমরা বলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তাহলে সফল হয়ে যাবে।' অন্য হাদিসে তিনি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'আমি মানুষের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...।' এখানে কেবল স্বীকৃতিকেই ঈমান বলা হয়েছে। দলিলসহ সবিস্তারে জানার কথা বলা হয়নি। সুতরাং কেউ সত্যকে যেকোনো পদ্ধতিতে জানুক, তাকে সত্য সম্পর্কে জ্ঞাতই বলা হবে।”⁴⁸৮
টিকাঃ
৪৮০. বুখারি (কিতাবুল ঈমান: ২৫)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ২০)।
৪৮১. আল-ফিকহুল আবসাত (৪১-৪২)।
৪৮২. প্রাগুক্ত (৪১-৪২)।
৪৮৩. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৯)।
৪৮৪. হিদায়াতুল মুরিদ, লাক্কানি (১/২০২)।
৪৮৫. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৫৫)।
৪৮৬. দেখুন: আল-কিফায়াহ (৩৫৭-৩৫৯)।
৪৮৭. ফাতাওয়া সিরাজিয়্যাহ (৩০৭)।
৪৮৮. তালখিসুল আদিল্লাহ (৩৭-৩৮)। মুসনাদে আবি হানিফা, হারেসির বর্ণনা (২৮)।
📄 মুতাকাল্লিমদের বক্তব্যের পর্যালোচনা
প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মুতাযিলা ও আশআরি উলামায়ে কেরাম 'মুকাল্লিদের ঈমান'-এর সমালোচনা এবং দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে আল্লাহকে জানার যে শর্ত করেছেন, অন্যকথায়, তারা মুকাল্লিদের ঈমান গ্রহণযোগ্য নয় বলে বিশুদ্ধ ঈমানের জন্য দলিল-প্রমাণের যে শর্ত করেছেন, সেটা কি সর্বতোভাবেই ভুল ও বিচ্যুতি?
মুতাযিলাদের বক্তব্য সুস্পষ্টভাবেই ভুল। তারা কেবল উক্ত মাসআলায় নয়, ঈমানের অধিকাংশ মাসআলাতেই আকলকে নকল (তথা যুক্তিকে কুরআন-সুন্নাহর) আগে রাখতে গিয়ে কোনো-না-কোনো বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। ফলে এটাও তাদের বিভ্রান্তি। ঈমানের জন্য অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি ও আত্মসমর্পণই যথেষ্ট। অন্য কারও অনুসরণে ঈমান আনাই যথেষ্ট। এমন ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়, এমন মুমিন কাফের—এ ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য। কারণ, এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষকে প্রকারান্তরে কাফের বানিয়ে ফেলে। এটা রিসালাত ও নবুওতের ক্ষেত্রে আল্লাহর হিকমত (তথা প্রজ্ঞার) সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আল্লাহ তায়ালা মানুষের কাছে ইসলাম পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদি ইসলাম পেশ ও গ্রহণের মধ্য দিয়ে ঈমান সংঘটিত না হয়, তবে তাঁর মিশনের উদ্দেশ্যই পূর্ণ হবে না। হ্যাঁ, দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে আল্লাহকে চেনার মূল্য নিঃসন্দেহে কেবল অনুসরণমূলক (তাকলিদি) ঈমানের চেয়ে অনেক বেশি দামি। তাই বলে সাধারণ মুমিনদের ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করা এবং তাদের কাফের বলার সুযোগ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম, খুলাফায়ে রাশেদিন এবং মুসলমানদের ইমামের কেউ এটা করেননি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন একটি সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরিত হন, যাদের কাছে দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান ছিল না। তারা আল্লাহর রাসুলের রিসালাতকে স্বীকৃতি দেয়, মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে, পরকালে ঈমান আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের ঈমান কবুল করে নেন। একইভাবে আবু বকর (রা.) দলিল-প্রমাণ ছাড়াই মুরতাদদের ইসলাম কবুল করেন। উমর রাযি.-এর যুগে যেসব বিজিত এলাকার মানুষজন মুসলিম হয়, তাদেরও উমর রাযি. দলিল-প্রমাণের শর্ত ছাড়াই গ্রহণ করেছেন। তিনি তাদের বলেননি, আগে ঈমানের দলিল শেখো, এর পর ঈমান কবুল করা হবে। কিংবা তাদের ঈমানের দলিল-প্রমাণ শেখানোর জন্য কোনো লোক নিয়োগ দেননি। আমাদের সালাফে সালেহিন, বুযর্গানে দ্বীন ও মুবাল্লিগিনে ইসলাম পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে মানুষকে কালিমার দাওয়াত দিয়েছেন। সমাজের খেটে খাওয়া, অক্ষরজ্ঞান-বর্জিত, দীনহীন মানুষরা দলে দলে তাদের হাতে হাত রেখে কালিমা পড়ে ঈমানে দাখিল হয়েছে, তাদের কারও কাছে যুক্তিনির্ভর দলিল-প্রমাণ চাওয়া হয়নি, চাওয়া হলেও তারা জবাব দিতে পারত না। বোঝা গেল, বিশ্বাসটাই যথেষ্ট। বরং এভাবে ঈমানকে যথেষ্ট না বলে যদি দলিল-প্রমাণের উপর নির্ভশরীল বলা হয়, তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুরো নবুওতি জীবনকে গলত বলতে হবে, দলিল-প্রমাণ ছাড়া মানুষকে মুমিন সাব্যস্ত করাকে ভুল বলতে হবে। এটা তো সুস্পষ্ট বিচ্যুতি।
প্রশ্ন হলো, তাহলে আশআরি উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে কী বক্তব্য? তাদের ব্যাপারেও কি মুতাযিলাদের ব্যাপারে লেখা উপরের কথাগুলো প্রযোজ্য? বিষয়টি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। মুতাকাল্লিমদের মধ্য থেকে একদল আলেম মুতাযিলাদের পথ অনসরণ করেছেন। তারাও আকলের ব্যাপারে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়ে আকলকেই সবকিছুর মূল ধরেছেন। কুরআন-সুন্নাহের পরিবর্তে তর্কশাস্ত্রকে আকিদার ভিত্তি বানিয়ে ফেলেছেন। ফলে কালামশাস্ত্রের আলোকে দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে কেউ ইমান না আনলে তার ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাকে কাফের বলেছেন। তাদের ব্যাপারে উপরের কথাই প্রযোজ্য।
এ কারণে খোদ মুহাক্কিক আশআরিগণ তাদের সমালোচনা করেছেন। শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারিতে সিমনানি থেকে বর্ণনা করেন, 'এটা মুতাযিলাদের মতাদর্শ। দুঃখজনকভাবে আমাদের মাযহাবে রয়ে গেছে। আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।'⁴⁸⁹ হুজ্জাতুল ইসলাম গাযালি এই মতাদর্শের সমালোচনা করে লিখেছেন, 'এক সম্প্রদায় বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করেছে। তারা মুসলিম আমজনতাকে কাফের সাব্যস্ত করেছে। তাদের ধারণা, যে ব্যক্তি তাদের লেখা দলিলসহ আকিদা শিখবে না, সে কাফের! এভাবে তারা আল্লাহর বিস্তৃত রহমতকে সংকীর্ণ করে ফেলেছে। আল্লাহর জান্নাতকে কেবল একদল ক্ষুদ্র মুতাকাল্লিমের জন্য সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে।⁴⁹⁰ ইমামুল হারামাইন জুয়াইনি লিখেন, 'আহলে সুন্নাতের সাধারণ মানুষের ঈমান বিশুদ্ধ। এর জন্য দলিল-প্রমাণ দরকার নেই। কেবল সাধারণ মানুষ কেন, যারা ইমাম হিসেবে পরিচিত, তাদের জিজ্ঞাসা করা হলেও একটি মাসআলার দলিল দিতে গিয়ে পেরেশান হয়ে পড়বে। বোঝা গেল, সাধারণ মানুষের আকিদা দলিল-প্রমাণভিত্তিক নয়, বরং হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত বিশ্বাস। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর স্বরূপ জানার নির্দেশ দেননি। এ কারণেই আমাদের সালাফে সালেহিন দলিলের পিছনে পড়েননি। বরং মজবুত বিশ্বাস, শাহাদাত (সাক্ষ্য) ও আমলই যথেষ্ট ছিল (অর্থাৎ ঈমানের তিনটি রুকন : অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল)। যে ব্যক্তি এই আকিদার উপর অটল থাকবে, সে মুক্তি পাবে, সাফল্য লাভ করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার সর্বশেষ কথা হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কারণ, পৃথিবীতে গবেষণা করতে পারে এমন মানুষ কম। সাধারণভাবে বিশ্বাসী মানুষ বেশি।⁴৯¹
মুতাযিলা-প্রভাবিত মুতাকাল্লিমদের বিপরীতে আহলে সুন্নাতের মুতাকাল্লিমগণের বক্তব্য মুতাযিলাদের বক্তব্য থেকে ভিন্ন। তাদের বক্তব্য আর মুতাযিলাদের বক্তব্যের মাঝে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। অনেকে সেটা ধরতে না পারার কারণে তাদেরও মুতাযিলাদের সঙ্গে একত্রে ফেলে বিচার করেছেন; অথচ এটা সঠিক নয়। সে পার্থক্য হলো দলিল-প্রমাণের ধরন ও প্রকৃতি। মুতাযিলারা মুকাল্লিদের ঈমানকে একবাক্যে নাকচ করে দেয়। কালামি ও ফালসাফি স্টাইলে দলিল-প্রমাণের শর্ত করে। বিপরীতে আহলে সুন্নাতের মুতাকাল্লিমগণ শাস্ত্রীয় দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে ঈমান আনার শর্ত করেন না, বরং আল্লাহ যে বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন, সেটার ন্যূনতম ব্যবহারপূর্বক যেসব বিষয়ে ঈমান আনছে, সেগুলোকে ন্যূনতম পর্যায়ে পরখ করা, সত্য ও মিথ্যার সর্বনিম্ন পার্থক্য ধরতে পারার শর্ত করেন, আমরা যেটাকে 'ফিতরতি' প্রমাণ হিসেবে আখ্যা দিতে পারি, যেটুকু পার্থক্য ছাড়া মানুষকে 'বুদ্ধিমান' এবং সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায় না।⁴⁹²
সুবকি বলেন, 'আশআরিদের মতেও মুকাল্লিদের ঈমান বিশুদ্ধ। তারা এক্ষেত্রে যে দলিল-প্রমাণ এবং যুক্তিসহ চিন্তাভাবনার শর্ত দেন, সেটা ঈমান আনার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়ে যায়। '⁴৯৩ অর্থাৎ, একজন মানুষ কালিমা পড়ার সময় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অনুভব করে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। পৃথিবীতে দুজন সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক থাকা সম্ভব নয়। এই যে স্বতঃস্ফূর্ত অনুভব এবং সুস্থ বিবেকের সাক্ষ্য, এটুকুই দলিল-প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। এমন ব্যক্তির শাহাদাত ও ঈমান গ্রহণযোগ্য। কিন্তু কেউ যদি কালিমা পড়ার সময় কী পড়ছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে, তাওহিদের সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তাওহিদের মর্ম ও তাৎপর্য সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই না থাকে, ইসলাম অন্যান্য ধর্ম থেকে আলাদা নাকি ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতোই একটা ধর্ম—এ ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র জানাশোনা কিংবা আগ্রহ না থাকে, এক কথায়, ইসলাম সম্পর্কে তাঁর হৃদয় ও মন বিলকুল গাফেল ও ভ্রুক্ষেপহীন থাকে, এমন ব্যক্তির ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়।
জামালুদ্দিন খাব্বাযি (৬৯২ হি.) লিখেন, 'হ্যাঁ, দলিল-প্রমাণ বলতে যদি ফিতরতি জ্ঞান ও প্রকৃতিগতভাবে আল্লাহর অস্তিত্বের অনুভব উদ্দেশ্য হয়, তবে সেটা ঠিক আছে।⁴৯৪ বায়াযি (১০৯৮ হি.) লিখেন, 'প্রত্যেকের জন্য দলিল-প্রমাণের স্তর তার অবস্থার প্রেক্ষিতে নির্ধারিত হবে। সবার জন্য মুতাকাল্লিমদের দলিল জানা জরুরি নয়।⁴৯৫ অর্থাৎ, যারা আলেম, তারা অন্য কারও তাকলিদ করে ভ্রুক্ষেপহীনভাবে ঈমান আনবেন না, বরং তারা জেনেবুঝে ঈমান আনবেন। বিপরীতে সাধারণ মানুষ ফিতরতিভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব ও হক্কানিয়্যাতের অনুভব থেকে ঈমান আনবে। তাদের জন্য দলিল-প্রমাণ জানা জরুরি নয়।
কামাল ইবনুল হুমাম লিখেন, 'বিশুদ্ধ মত হলো, ঈমান সঠিক হওয়ার জন্য দলিল-প্রমাণ জানা জরুরি নয়। কারণ, সাধারণ মানুষের কাছেও দলিল-প্রমাণ থাকে। বাজার-ঘাটে কথা বলার সময় তারাও কত ধরনের দলিল পেশ করতে পারে। স্রেফ তাকলিদ কেউ করে না। তাই দলিল-প্রমাণ পরিত্যাগের কারণে কাউকে গুনাহগার বলা যাবে না।'⁴৯৬ আবু শাকুর সালেমি লিখেন, “কেউ যদি এটুকু জানে যে, তার একজন প্রতিপালক রয়েছেন, যিনি আসমান-যমিনেরও প্রতিপালক—এটুকুতেই 'নজর' (পর্যবেক্ষণ) প্রমাণিত হবে এবং সে 'তাকলিদ'-এর সীমারেখা থেকে বাইরে চলে যাবে। অর্থাৎ, কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার সৃষ্টিকর্তা কে এবং সে জবাবে বলে, 'আল্লাহ' অথবা 'আসমান ও যমিনের সৃষ্টিকর্তা', এটুকুইতেই তার ঈমান বিশুদ্ধ হবে। বিপরীতে 'মুকাল্লিদের ঈমান শুদ্ধ নয়'—এ কথার অর্থ হলো, সে ব্যক্তির ঈমান শুদ্ধ নয় যে এটুকুও জানে না যে, আল্লাহ তার ও আসমান-যমিনের সৃষ্টিকর্তা।”⁴৯৭
উক্ত বক্তব্যের মাঝে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের বক্তব্যের মাঝে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। কারণ, যিনি কালিমা পড়ছেন, তার স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এতটুকু জানা হয়ে যায়। আর যে কী পড়ছে সেটাই জানে না, এমন ব্যক্তির ঈমান কারও মতেই বিশুদ্ধ নয়। এটা যৌক্তিকও নয়। ঈমানের নামে তামাশা এটা। একব্যক্তি পরিবারসূত্রে মুসলমান। সে ইসলামের কিছুই বোঝে না, কিছুই জানে না। আল্লাহর উপর কেন বিশ্বাস রাখে—এ ব্যাপারে তার কোনো ধারণাই নেই। তার বাপ-দাদা রাখত, এ জন্য সেও রাখে। আহলে সুন্নাতের মুতাকাল্লিমগণ মূলত এ ধরনের তাকলিদেরই সমালোচনা করেছেন। আর এমন তাকলিদ কেবল মুতাকাল্লিমিন নয়; সকল আলেমদের কাছে প্রত্যাখ্যাত ও নিন্দাযোগ্য। ফলে গভীরে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ ও মুহাদ্দিস আর আহলে সুন্নাতের মুতাকাল্লিমদের মাঝে মৌলিক কোনো মতবিরোধ চোখে পড়বে না।
মোটকথা, উক্ত বক্তব্য আর সালাফের বক্তব্যের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ, এটুকু জ্ঞান প্রত্যেক মুমিনের জন্য আবশ্যক এবং তা কালিমার মাঝেই বিদ্যমান। কেউ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়ল, অথচ আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকর্তা কিংবা তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এটা জানল না, তাহলে সে কী পড়ল? এমন ব্যক্তি কীসের ভিত্তিতে মুমিন গণ্য হবে? তার মাঝে আর একজন কাফেরের মাঝে ফারাক কী? তাই ইসলাম ও ঈমান সম্পর্কে তফসিলি জ্ঞান আবশ্যক নয়। নির্দিষ্ট শব্দে ইসলাম ও ঈমানের সংজ্ঞায়নও আবশ্যক নয়। কিন্তু ইসলাম সত্য অন্যান্য ধর্ম মিথ্যা, ইসলাম অন্যান্য ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ধর্ম, বরং একমাত্র সত্য ও আল্লাহর মনোনীত দ্বীন—এটুকু বিশ্বাস যেকোনো কালিমা পাঠকারীর থাকতে হবে। মুখে প্রকাশ করতে পারা জরুরি নয়। ইমাম আজম থেকেও এটা বর্ণিত আছে।
টিকাঃ
৪৮৯. দেখুন: ফাতহুল বারি (১/৭০-৭১)।
৪৯০. প্রাগুক্ত (১৩/৩৪৯)।
৪৯১. আল-আকিদাহ নিযামিয়্যাহ, জুয়াইনি (২৬৭-২৬৮)।
৪৯২, দেখুন: হিদায়াতুল মুরিদ (১/২০১)। আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (১০২)।
৪৯৩. আস-সাইফুল মাশহুর (৪১)।
৪৯৪. আল-হাদি ফি উসুলিদ্দিন (২৭৪, ২৭৯-২৮০)।
৪৯৫. ইশারাতুল মারাম (৮৪)।
৪৯৬. আল-মুসায়ারাহ (১৭৭)।
৪৯৭. দেখুন: আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (১০০-১০১)।