📄 ঈমান ও আকলের সম্পর্ক
ঈমান ও আকলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একাধিক সম্প্রদায় বিচ্যুতির শিকার হয়েছে, অনেকে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির শিকার হয়েছে। বাড়াবাড়ির শিকার হয়েছে মুতাযিলা সম্প্রদায়। আকলকে উপরে তুলতে তুলতে তারা এর পূজা করা শুরু করেছে। কুরআন-সুন্নাহ ও শরিয়াহর বিকল্প মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে আকলের ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য হলো, আকল যেটা ভালো বলবে সেটাই চূড়ান্ত ভালো ও ওয়াজিব; আকল যেটাকে মন্দ বলবে সেটা নিশ্চিত মন্দ ও হারাম। অর্থাৎ, শরিয়ত যদি না থাকত, তবুও আকলের ভিত্তিতে হালাল-হারাম বোঝা যেত, মানা আবশ্যক হতো। অথচ এটা কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব হলেও সর্বক্ষেত্রে নয়। আকল সর্বত্র হালাল-হারাম ও ভালোমন্দের পার্থক্য করতে সক্ষম নয়। কিন্তু তারা আকলের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে সেটাকেই মুখ্য আর শরিয়তকে গৌণ বানিয়ে দিয়েছে। বরং শরিয়তকেও আকলের মানদণ্ডে গ্রহণ করেছে। যা আকলসিদ্ধ মনে করেছে সেটাকে গ্রহণ করেছে, যা আকলবিরোধী মনে হয়েছে সেটার প্রতি বিশ্বাস বর্জন করেছে! এটাই ছিল তাদের বিভ্রান্তির মূল কারণ।
মুতাযিলা সম্প্রদায়ের বিপরীত প্রান্তে অবস্থান করছেন আশআরি আলেমগণ। তাদের মতের সারকথা হলো, আকলের কোনো মূল্য নেই, সবকিছুই শরিয়াহর ভিত্তিতে হবে। অর্থাৎ, হালাল-হারাম নির্ধারণে আকলের কোনো ভূমিকা নেই। একটা পর্যায় পর্যন্ত এটা বাস্তবসম্মত ও সঠিক কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের কেউ এতটাই বাড়াবাড়ি করেছেন যে, তাদের মতে কোনো বাচ্চা ঈমান আনলে তার ঈমানই শুদ্ধ হবে না। কারণ, বাচ্চা আকলের মাধ্যমে ঈমান এনেছে, শরিয়ত তাকে ঈমানের নির্দেশ দেয়নি (বালেগ হওয়ার পূর্বে মুকাল্লাফ নয় এই মূলনীতি অনুসারে)! আর যে ব্যক্তির কাছে দাওয়াত না পৌঁছয়, তার ব্যাপারে আশআরি আলেমদের বক্তব্য হলো, যদি সে ঈমান ও কুফর দুটোর একটাও গ্রহণ না করে (গাফেল) থাকে, তবে সে মাযুর গণ্য হবে। তাদের কারও মতে, যদি দাওয়াত না পৌঁছয়, সে অবস্থায় শিরক করলেও মাযুর হবে।⁴⁶²
এক্ষেত্রে সঠিক কথা হলো, আকল আল্লাহ তায়ালার বড় একটি নেয়ামত। কিন্তু এটা শরিয়ত ছাড়াই হালাল-হারাম সাব্যস্ত করতে পারে না, যেমনটা প্রথম দল মনে করে। আবার এটা অর্থহীনও নয়, যেমনটা দ্বিতীয় দল মনে করে। ফলে শিশুর উপর ঈমান ওয়াজিব না হলেও সে যদি ঈমান আনে, তবে সেটা বিশুদ্ধ। একইভাবে বড় ব্যক্তির কাছে যদি দাওয়াত না পৌঁছয়, তবে কেবল আকলের কারণে তার উপর ঈমান ওয়াজিব হবে না, যেমনটা মুতাযিলারা মনে করে। ফলে যদি সে ঈমান ও কুফর দুটো থেকেই গাফেল থাকে, তবে মাযুর গণ্য হবে (আহলে ফাতরাহ হিসেবে)। কিন্তু যদি শিরকে জড়িয়ে পড়ে, তবে মাযুর গণ্য হবে না, যেমনটা একদল আশআরি মনে করে; বরং শিরক ও কুফরের কারণে জাহান্নামে যাবে। কারণ, আকলকে যদি তাওহিদের প্রণোদক না মানা হয়, এটা নিদেনপক্ষে শিরকের প্রতিবন্ধক। ফলে তাওহিদ গ্রহণ না করলেও মাযুর গণ্য হবে। কিন্তু শিরকে জড়ালে মাযুর গণ্য হবে না।⁴⁶³
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, وَلَوْ أَنَّا أَهْلَكْنَاهُم بِعَذَابٍ مِّن قَبْلِهِ لَقَالُوا رَبَّনَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَنَتَّبِعَ ءَايَتِكَ مِن قَبْلِ أَن نَّذِلَّ وَنَخْزَىٰ অর্থ : 'যদি আমি এদের ইতঃপূর্বে কোনো শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম, তবে এরা বলত, হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি আমাদের কাছে একজন রাসুল প্রেরণ করলেন না কেন? তাহলে তো আমরা অপমানিত ও লাঞ্ছিত হওয়ার পূর্বেই আপনার আয়াতসমূহ মেনে চলতাম।' [তহা : ১৩৪] অন্য আয়াতে বলেন, وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا অর্থ : 'আমি রাসুল পাঠানোর আগ পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না।' [ইসরা: ১৫] এখানে আল্লাহ তায়ালার বক্তব্য সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। ভিন্নভাবে এটা ব্যাখ্যার অবকাশ নেই। যেহেতু আল্লাহ নিজেই বলছেন রাসুল পাঠানো ছাড়া তিনি শাস্তি দেননা, তাহলে স্রেফ আকলকে ভিত্তি বানিয়ে রাসুল পাঠানো ছাড়াও শাস্তিযোগ্য বলা সঠিক নয়; বরং কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্য। আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে বলেন, ‘ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে। যখনই তাতে কোনো সম্প্রদায় নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তাদের তার প্রহরীরা জিজ্ঞাসা করবে : তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আগমন করেনি? তারা বলবে, হ্যাঁ, আমাদের কাছে সতর্ককারী আগমন করেছিল। কিন্তু আমরা মিথ্যারোপ করেছিলাম এবং বলেছিলাম : আল্লাহ তায়ালা কোনোকিছু নাযিল করেননি। তোমরা মহা বিভ্রান্তিতে পড়ে রয়েছ।' [মুলক: ৮-৯] এখানেও স্পষ্ট যে, জাহান্নামের ফেরেশতারাও জানেন, নবি-রাসুল পাঠানো ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া হবে না।
টিকাঃ
৪৬২. দেখুন: কাশফুল আসরার (৪/৩২৪-৩৩০)। দেখুন: আল-কিফায়াহ, সাবুনি (৩৪৬-৩৪৭)। আর রাওযাতুল বাহিয়্যাহ (৩৪-৩৫)।
৪৬৩. দেখুন: কাশফুল আসরার (৪/৩৩০)।
📄 নবি-রাসূল না এলেও কি ঈমান আনা আবশ্যক হতো?
লক্ষণীয় হলো, এক্ষেত্রে খোদ ইমাম আজমের এমন কিছু বক্তব্য রয়েছে, যা উন্মুক্তভাবে গ্রহণ করা দুরূহ, যা পরবর্তীকালে হানাফি উলামায়ে কেরাম এবং আহলে সুন্নাতের অন্যান্য ধারার মাঝে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করেছে, বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রথমে আমরা ইমাম আজমের বক্তব্য দেখে সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জটিলতা নিরসনের চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
ইমাম আজম রহ. মনে করতেন, "আল্লাহর উপর ঈমান আনার জন্য নবি-রাসুল পাঠানো জরুরি নয়, বরং মানুষের বিবেক দ্বারাই সেটা সম্ভব। ফলে আল্লাহ যদি কোনো নবি-রাসুল না পাঠাতেন, তবুও বিবেকের কারণে মানুষের উপর তাঁর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব হতো। হ্যাঁ, শরিয়তের বিধিবিধান জানা অপরিহার্য হতো না। কিন্তু আকাশ ও যমিনে বিদ্যমান এত এত নিদর্শন থাকার পরও কেউ যদি এগুলোর সৃষ্টিকর্তাকে স্বীকৃতি না দেয়, তবে নবি-রাসুল না পাঠানো সত্ত্বেও সে রেহাই পাবে না।”⁴⁶⁴
সাবুনিসহ অন্য হানাফি উলামায়ে কেরাম হাকেম শহিদের 'আল-মুনতাকা'⁴⁶⁵ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন, আবু হানিফা রহ. বলেছেন, 'অজ্ঞতার কারণে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কারণ, আকাশ ও যমিনে এবং মানুষের নিজের ও অন্যান্য সৃষ্টির মাঝে সৃষ্টিকর্তার যেসব নিদর্শন রয়েছে ঈমানের জন্য সেগুলোই যথেষ্ট।' আল্লাহ তায়ালা নবিদের ভাষায় কুরআনে বলেন,
قَالَتْ رُسُلُهُمْ أَفِي اللَّهِ شَكٌّ فَاطِرِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ يَدْعُوكُمْ لِيَغْفِرَ لَكُم مِّن ذُنُوبِكُمْ وَيُؤَخِّرَكُمْ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ۚ قَالُوا إِنْ أَنتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُنَا تُرِيدُونَ أَن تَصُدُّونَا عَمَّا كَانَ يَعْبُدُ ءَابَاؤُنَا فَأْتُونَا بِسُلْطَانٍ مُّبِينٍ
'নবিগণ বলেছিলেন : আল্লাহ সম্পর্কে কি কোনো সন্দেহ আছে, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্রষ্টা? তিনি তোমাদের আহ্বান করেন তোমাদের পাপ মার্জনা করার জন্য এবং নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদের অবকাশ দেওয়ার জন্য। তারা বলল : তোমরা তো আমাদের মতোই মানুষ! তোমরা আমাদের সেসব উপাস্য থেকে বিরত রাখতে চাও যেসবের উপাসনা আমাদের পিতৃপুরুষগণ করত। অতএব, তোমরা কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ আনয়ন করো।' [ইবরাহিম : ১০] আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ! বলুন : আলহামদুলিল্লাহ! তা সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশ লোকই জ্ঞান রাখে না।' [লুকমান : ২৫] রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'প্রত্যেক নবজাতক ইসলামের ফিতরতের উপর জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীকালে তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, নাসারা ও অগ্নিপূজারী বানায়।' এটাই আমাদের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মাশায়েখের মত। ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদি বিবেকবান ছোট বাচ্চার ক্ষেত্রে বলেছেন, তার উপর আল্লাহকে জানা ওয়াজিব।'⁴⁶⁶
নাসাফি লিখেন, 'প্রত্যেক বিবেকবান (আকেল) ব্যক্তির জন্য ইবরাহিম আলাইহিস সালামের মতো আকল দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ বের করা আবশ্যক। ... সুতরাং যার কাছে ওহি পৌঁছবে না (ঈমান না আনলে), তাকেও মাযুর মনে করা হবে না।'⁴⁶⁷ রুকনুদ্দিন সমরকন্দিও আবু হানিফার উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, 'আকেল ও বালেগ ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে (ওহি ছাড়াও) অজ্ঞ থাকলে তাকে মাযুর ধরা হবে না।'⁴⁶⁸
উপরের বক্তব্যগুলোর অর্থ হলো, প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের জন্য ঈমান আনা আবশ্যক, চাই তাঁর কাছে দাওয়াত পৌঁছুক কিংবা না পৌঁছুক! নবি আসুক কিংবা না আসুক! অর্থাৎ, কেউ যদি এমন কোনো ভূখণ্ডে এমন কোনো সময়ে থাকে যার কাছে ইসলামের কোনো দাওয়াত পৌঁছয় না, চাই সেটা আগের যুগে হোক কিংবা বর্তমান যুগে হোক, ইসলাম কিংবা ইসলামের নবি সম্পর্কে জানার জন্য কোনো মাধ্যমই যার কাছে বিদ্যমান না থাকে, কিন্তু সে মানসিকভাবে সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেকবান হয়, তবে তার জন্য ঈমান আনা জরুরি, আল্লাহকে বিশ্বাস করা জরুরি। যদি সে ঈমান না আনে, তবে পরকালে তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। নবি না আসা কিংবা দাওয়াত না পৌঁছাকে ওজর হিসেবে গ্রহণ করা হবে না! কারণ, আল্লাহ তাকে বিবেক দিয়েছেন। আসমান ও যমিনের সর্বত্র আল্লাহ নিজের অস্তিত্বের অসংখ্য নিদর্শন রেখে দিয়েছেন। ফলে নবি আসা কিংবা দাওয়াত পৌঁছা শরিয়তের তফসিলি বিধিবিধানের সঙ্গে সম্পৃক্ত, মূল ঈমানের সঙ্গে নয়।
পাঠক, নিশ্চয়ই খেয়াল করবেন, এখানে হানাফি আলেমদের বক্তব্য প্রথম পক্ষ তথা মুতাযিলাদের বক্তব্যের সঙ্গে ব্যাপক সাদৃশ্য রাখে। তারা আকলকে স্বতন্ত্রভাবে ঈমান অপরিহার্যকারী মনে করে। ইমাম আজমের বক্তব্যের ফলাফলও তাই। বরং কাযি সদর বাযদাবি আরও স্পষ্ট করে লিখেন, 'এক্ষেত্রে আবু মনসুর মাতুরিদির বক্তব্য (ইমাম আজমের অনুসরণে) মুতাযিলাদের বক্তব্যের মতো এক ও অভিন্ন। সমরকন্দের অধিকাংশ আলেম এবং ইরাকে আমাদের (হানাফি) একদল আলেমের বক্তব্যও তা-ই।'⁴⁶৯
তাহলে মুতাযিলা আর ইমাম আজম এবং তাঁর অনুসারী হানাফি আলেমদের বক্তব্যের মাঝে ফারাক কী? কুরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং বিভিন্ন হাদিসে যেখানে 'আহলে ফাতরাহ' (দাওয়াত পৌঁছয়নি) এমন লোকদের শাস্তি না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা কী?
প্রথম কথা হলো, এ বিষয়ে মুতাযিলা ও হানাফি আলেমগণ, বিশেষত ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্য সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হলেও এক নয়। বরং দুটোর মাঝে কিছু উসুলি (মৌলিক) পার্থক্য রয়েছে, যে পার্থক্যের কারণে মুতাযিলাদের কথা ভ্রান্ত, কিন্তু ইমাম আজমের কথা সঠিক। নিচে পয়েন্ট আকারে পার্থক্যগুলো স্পষ্ট করা হচ্ছে :
এক. আকলকে জ্ঞানের উপকরণ গণ্য করা। মুতাযিলারা আকলকেই স্বাধীনভাবে ঈমানের আবশ্যক মনে করে। আর ইমাম (আবু হানিফা) বলেন, মূল আবশ্যকতা আল্লাহর পক্ষ থেকে। কিন্তু সেটা জানা যাবে আকলের মাধ্যমে। অর্থাৎ, আকলের মাধ্যমে ঈমান আবশ্যক নয়। মূল আবশ্যককারী (موجب) আল্লাহ তায়ালা (রাসুল পাঠানোর মাধ্যমে)। আকল সেটা উপলব্ধিকারী, শরিয়তের আবশ্যকতা বাস্তবায়নকারী। অন্যকথায়, আকল হলো ভালোমন্দ চেনার একটি উপকরণ। এটা মৌলিকভাবে কোনো জিনিস অপরিহার্য করে না; কিন্তু মাধ্যম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।⁴⁷⁰
দুই. নবিদের আগমনের পরে আবশ্যক বলা। অর্থাৎ, আকলের মাধ্যমে ঈমান আনা ওয়াজিব। কিন্তু নবি-রাসুল না এলে সে আকল গাফেল থাকে। দুনিয়ায় নিমজ্জিত এবং আখেরাত থেকে বেঘোর-বেখবর থাকে। নবি-রাসুল এসে যখন তাকে সজাগ করেন, তখন সে আল্লাহ ও আখেরাত নিয়ে ভাবতে থাকে। জগতের পরতে পরতে আল্লাহর নানান নিদর্শন তার বিবেকের চোখে ধরা পড়ে। ফলে ‘নবি-রাসুল ছাড়াই আকলের মাধ্যমে ঈমান ওয়াজিব’—এটাও নবি-রাসুল পাঠানোর পরেই; আগে নয়।⁴⁷¹
তিন. ঔচিত্য অর্থে গ্রহণ করা। অর্থাৎ, ইমাম রহ.-এর বক্তব্য এখানে বাহ্যিক অর্থের উপর গ্রহণ করা যাবে না, বরং তিনি এটা নাস্তিক্যবাদ এবং আল্লাহতে অবিশ্বাসীদের খণ্ডনে বলেছেন। অর্থাৎ, আমরা যে কেবল কুরআন ও নবির দাওয়াতে বিশ্বাস করে মুমিন হয়েছি এমন নয়, ঈমান অন্ধ বিশ্বাসের ফলাফল নয়। বরং আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে এত পরিমাণ নিদর্শন রেখেছেন, তিনি আমাদের এত গভীর ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বিবেক দিয়েছেন, যার ফলে কুরআন ও নবি না এলেও আল্লাহতে বিশ্বাস করা কঠিন কিছু নয়। বরং এটুকু ঈমান আনা আবশ্যক হওয়া উচিত। কিন্তু আল্লাহর স্বাভাবিক নীতি ও অনুগ্রহ হলো, তিনি নবি পাঠানো ব্যতীত কাউকে শাস্তি দেন না। কারণ, এমন হলে মানুষ আল্লাহর বিরুদ্ধে জুলুমের অভিযোগ করবে। অথচ আল্লাহ জুলুম থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাই তিনি নবি-রাসুল পাঠানোর মাধ্যমে মানুষের অজুহাতের পথ বন্ধ করে দেন (অর্থাৎ হুজ্জত কায়েম করেন), অতঃপর যারা অবাধ্য তাদের শাস্তি দেন। এ বক্তব্য আমাদের মনগড়া ব্যাখ্যা নয়। বুখারার অসংখ্য আলেমের বক্তব্য এটা। কামাল ইবনুল হুমাম রহ. ইবনে আইনিদ দাওলার উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন, 'আবশ্যক হওয়া উচিত'।⁴⁷²
আরেকটু তাফসিল করে এভাবে বলা যায়, আকলের মাধ্যমে ঈমান আনা ওয়াজিব এবং কুফর হারাম—এ কথার অর্থ শরয়ি ওয়াজিব ও হারাম নয়। ফলে এর মাধ্যমে পুরস্কার ও তিরস্কারের উপযুক্ত হবে না কেউ। কেননা, পুরস্কার ও তিরস্কার (সওয়াব ও ইকাব) নির্ধারিত হয় শরিয়তের ভিত্তিতে। আকলের মাধ্যমে সেটা জানা সম্ভব নয়। সুতরাং এখানে আকলের মাধ্যমে ঈমান ওয়াজিব হওয়ার অর্থ হলো, সুস্থ আকলের মাঝে স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর উপর ঈমান আনা, বিশ্বের স্রষ্টার তাওহিদের স্বীকৃতি দেওয়ার একটা সুপ্ত প্রণোদনা থাকে। একইভাবে কুফর হারাম হওয়ার অর্থ হলো, এই মহাবিশ্বের বড় বড় নিদর্শন দেখার পরে আল্লাহকে অস্বীকার করা, এগুলোর স্রষ্টা ও পালনকর্তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করার প্রতি সুস্থ মানুষের বিবেকের মাঝে একটা সুপ্ত বিকর্ষণ থাকে। বিবেক নষ্ট না হয়ে থাকলে প্রত্যেকটা সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ এটা অনুভব করার কথা। ফলে শরিয়ত না এলেই যে ঈমান ও কুফর, হালাল ও হারাম সমান—এমন নয়। বরং কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, কোনটা উচিত কোনটা অনুচিত—একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সেটা বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ মানুষের মাঝে প্রাকৃতিকভাবেই দিয়ে রেখেছেন। এটাকে 'ফিতরত' বলা হয়। নবিদের দাওয়াত সেই কাজটাকেই সহজ করে দেয়। বিপরীতে মুতাযিলারা মনে করে, সব ধরনের ভালোমন্দ আকল অনুভব করতে পারে। শরিয়ত নিষ্প্রয়োজন। এখানেই তাদের চিন্তাধারা আর ইমাম আজমের পার্থক্য।
হাফিজুদ্দিন নাসাফি বলেন, 'আমাদের (হানাফিদের) আর মুতাযিলাদের বক্তব্যের মাঝে পার্থক্য হলো, মুতাযিলারা আকলকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে ঈমান আবশ্যককারী মনে করে। বিপরীতে আমাদের কাছে, আকল একটি মাধ্যম। মূল আবশ্যককারী আল্লাহ তায়ালা। আকল সেটা জানার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যদিও আবু হানিফা বলেছেন, 'আসমান-যমিন ও সৃষ্টির মাঝে এত নিদর্শন বিদ্যমান থাকার কারণে আল্লাহ সম্পর্কে কেউ গাফেল থাকলে মাফুর ধরা হবে না।' তাঁর থেকে আরও বর্ণিত আছে, 'যদি আল্লাহ তায়ালা নবি-রাসুল না পাঠাতেন, তবুও আকলের মাধ্যমে সৃষ্টির উপর তাকে জানা আবশ্যক ছিল।' এটা আমাদের অনেক মাশায়েখের বক্তব্য। ...কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, নবি-রাসুল না পাঠানো হলেও স্রেফ আকলের মাধ্যমে ঈমান আনা জরুরি হবে। ঈমান পরিত্যাগ করলে শাস্তির উপুক্ত হবে—আমরা এমন বলি না। বরং আমরা বলি, পুরস্কার ও তিরস্কার শরিয়ত ও নবি-রাসুল পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু আকল সে কাজটা সহজ করে দেয়, এগিয়ে দেয়। আকলের কাছে ঈমান আনা ও না আনা, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস সমান নয়; বরং বিশ্বাস আকলের কাছে প্রশংসনীয়, অবিশ্বাস নিন্দনীয়। কেবল ঈমান নয়, সত্যের প্রতি অনুরাগ, মিথ্যার প্রতি ঘৃণা ও বিরাগসহ এসব ফিতরতি ব্যাপার মানুষের আকলের গভীরে প্রোথিত। শরিয়ত আসার আগেই মানুষ এগুলো অনুভব করতে পারে।⁴⁷³
সুতরাং দেখা গেল, হানাফিদের বক্তব্য আর আহলে সুন্নাতের অন্য আলেমদের বক্তব্যের মাঝে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারার লোকজন যেটাকে ‘ফিতরত’ (স্বভাবজাত) দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, হানাফি আলেমগণ সেটাকে একরকম ‘আকল’ (বিবেকবোধ) দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। প্রত্যেকের কথার সারমর্ম হলো, আল্লাহ মানুষের মাঝে এমন প্রকৃতি দিয়ে রেখেছেন, যদি তা বিকৃতির শিকার না হয়, তবে ইসলামের দাওয়াত না পেলেও আল্লাহর দিকে ঝুঁকতে বাধ্য। একইভাবে আল্লাহ মানুষের মাঝে এমন বিবেক দিয়ে রেখেছেন, যদি সেটা বিকৃতির শিকার না হয়, তবে নবি-রাসুল না এলেও সৃষ্টির নির্দশনাবলি দেখে একজন সৃষ্টিকর্তা ও উপাস্যের উপস্থিতি স্বীকার করতে বাধ্য। কিন্তু এগুলো যেহেতু পূর্ণাঙ্গতা দেয় না, ফিতরত কিংবা বিবেকের মাধ্যমে আল্লাহকে সম্যক উপলব্ধি করা যায় না, তাওহিদ ও শিরক, আল্লাহর সকল গুণ ইত্যাদি সম্পর্কে ইয়াকিনি জ্ঞান লাভ হয় না, এ জন্য আল্লাহ এগুলোর ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করবেন না। নবি-রাসুল না পাঠিয়ে, দাওয়াত না পৌঁছিয়ে কাউকে শাস্তি দেবেন না। ফলে ফিতরত ও আকলের বিদ্যমানতা সহায়ক হবে, মূল আবশ্যককারী হবে না।
টিকাঃ
৪৬৪. দেখুন: কারখির 'মুখতাসার'-এর উদ্ধৃতিতে উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২১৪)। আল-উসুলুল মুনিফাহ, বায়াযি (১২)। হাকেম শহিদের আল-মুনতাকার উদ্ধৃতিতে আলি কারি, শরহুল ফিকহিল আকবার (১২৬)।
৪৬৫. তিনি মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ মারওয়াযি সুলামি। বুখারার কাযি। বিখ্যাত হানাফি ফকিহ ও মুহাদ্দিস ইমাম। ৩৩৪ হিজরিতে শহিদি মৃত্যু বরণ করেন। এজন্য 'হাকেম শহিদ' নামে প্রসিদ্ধ হয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হলো 'আল-কাফি', 'আল-মুনতাকা' ইত্যাদি, যা হানাফি মাযহাবের মৌলিক গ্রন্থগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
৪৬৬. দেখুন : আল-কিফায়াহ (৩৪৮)। শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, বাবিরতি (৫৫)।
৪৬৭. বাহরুল কালাম (৬৫, ৮২)।
৪৬৮. আল-আকিদাহ আর রুকনিয়্যাহ (৪৫)।
৪৬৯. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২১৪)।
৪৭০. দেখুন: কাশফুল আসরার (৪/৩৩০)। আল-বিদায়াহ মিনাল কিফায়াহ (১৫০)। শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, মুফতি যাদাহ (৭০)। ইশারাতুল মারাম (৭৫)।
৪৭১. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২১৭)।
৪৭২. আত-তাহরির ফি উসুলিল ফিকহ (২২৫)।
৪৭৩. আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৩৬২-৩৬৭)।
📄 ঈমানের ক্ষেত্রে কি তাকলিদ বৈধ?
উপরের মাসআলাটি আরেকটি মাসআলার দিকে নিয়ে যায়। সেটা হলো, ঈমানের ক্ষেত্রে কি অন্যকে অনুসরণ করা যাবে, নাকি নিজের আকলের মাধ্যমে দলিল-প্রমাণ খুঁজে এর পর বিশ্বাস করতে হবে? বিষয়টি যতটা সরল মনে হয় ততটা সরল থাকেনি। এটা নিয়ে উম্মাহর মাঝে লম্বা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে এ ব্যাপারে কিছু কথা বলা জরুরি মনে করছি।
📄 তাকলিদের পরিচয়
'তাকলিদ' (التقليد) শব্দের অর্থ হলো অনুসরণ করা, অনুকরণ করা; কারও প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখে নিজেকে তাঁর প্রতি সঁপে দেওয়া। অজ্ঞতা ও অক্ষমতা কিংবা অন্য কোনো কারণে নিজে দলিল-প্রমাণ না খুঁজে অন্যের দলিল-প্রমাণের উপর ভরসা রেখে তাকে অনুসরণ করার নাম তাকলিদ। ঈমানের ক্ষেত্রে তাকলিদ হলো আল্লাহ, ফেরেশতা, পরকাল ইত্যাদির মতো ঈমানের মৌলিক রুকনগুলো দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে না জেনে বিশ্বাস করা।
অন্যকথায়, দলিল-প্রমাণবিহীন বিশ্বাসকে ঈমানের ক্ষেত্রে তাকলিদ কিংবা মুকাল্লিদের ঈমান বলা হয়। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। একজন অমুসলিমকে বলা হলো, ইসলাম সত্য ধর্ম। সুতরাং আপনি বলুন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।' সে বলল। এক্ষেত্রে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই সে ঈমান আনল। তাকে যদি আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে বলা হয়, কিংবা কুরআন আল্লাহর অবতীর্ণ সত্য গ্রন্থ—এর দলিল চাওয়া হয়, সে কিন্তু দিতে পারবে না। তবুও সে নিজেকে মুমিন বলে দাবি করছে। এমন লোককে বলা হয় 'মুকাল্লিদ।'
প্রশ্ন হলো, এমন ব্যক্তির ঈমান গ্রহণযোগ্য কি না। এমন ব্যক্তি মুমিন হবে কি না? ঈমানের জন্য দলিল-প্রমাণ জরুরি, নাকি অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসই যথেষ্ট? অন্যের অনুসরণপূর্বক ঈমান আনা হলে সেটা গৃহীত হবে কি না? নাকি দলিল-প্রমাণ না থাকার কারণে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসকে 'সন্দেহ' বিবেচনা করে প্রত্যাখ্যান করা হবে?
বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের কাছে ঈমানের জন্য অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসই যথেষ্ট। সেটা দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে হোক, কিংবা কারও তাকলিদ বা অনুসরণপূর্বক হোক, সেটা মুখ্য নয়। ফলে আলেম হোক কিংবা জাহেল হোক, অনুসরণীয় হোক কিংবা অনুসারী হোক, প্রত্যেক মুমিনের ঈমান গ্রহণযোগ্য। বিপরীতে একদল মুতাকাল্লিম মনে করেন, ঈমানের ক্ষেত্রে তাকলিদ বৈধ নয়। ফলে যদি কেউ দলিল-প্রমাণ না জেনে স্রেফ অন্যদের 'হাঁ'-তে 'হাঁ' মিলিয়ে, অন্ধ অনুসরণে ঈমান আনে, তবে এমন ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। অন্ধ মুকাল্লিদ মুমিন বিবেচিত হবে না!
উভয় পক্ষের মাঝে কোন পক্ষের কথা বিশুদ্ধ? বাস্তব কথা হলো, উভয় পক্ষের কথাই বিশুদ্ধ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, উপরের মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে 'তাকলিদ'-এর স্তরভেদ নির্ধারণের কারণে। 'তাকলিদ' বলতে ঠিক কোন পর্যায়ের তাকলিদ, আর দলিল-প্রমাণ বলতে ঠিক কোন পর্যায়ের দলিল-প্রমাণ, সেটা নির্ধারণে জটিলতার কারণে বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। নতুবা উভয় পক্ষের বক্তব্যের মাঝে মৌলিক কোনো মতবিরোধ নেই। সামনের পৃষ্ঠাগুলোতে আমরা ইমাম আজমের বক্তব্যসহ দু-পক্ষের মতামতের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা বিশ্লেষণের চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।