📄 পাপীমাত্রই আল্লাহর দুশমন নয়
ইমাম আজম রহ.-কে প্রশ্ন করা হলো, কবিরা গুনাহকারী কি আল্লাহর দুশমন বলে বিবেচিত হবে? ইমাম বললেন, “যদি তাওহিদ পরিত্যাগ না করে, তবে সব ধরনের কবিরা গুনাহ করার পরেও মানুষ আল্লাহর দুশমন হিসেবে বিবেচিত হবে না। কেননা, দুশমন দুশমনের প্রতি বিদ্বেষ রাখে, ক্ষতি করার চেষ্টা করে। অথচ মুমিন ব্যক্তি বড় কোনো গুনাহ করে ফেললেও আল্লাহ তায়ালাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। এর প্রমাণ হলো, যদি তাকে বলা হয় যে, হয়তো সে আল্লাহর উপর অন্তর থেকে মিথ্যা অপবাদ দেবে, নতুবা তাকে আগুনে ফেলা হবে। সে আগুনে ঝাঁপ দিতেই রাজি হবে।”⁴⁵⁷
ইমামের এই বক্তব্য মানুষের প্রকৃতি পাঠের ক্ষেত্রে তাঁর প্রতি আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টি দানের প্রমাণ। সাধারণ মানুষ আল্লাহ ও বিশ্বাসী মানুষের মাঝে সম্পর্কের এ বিরল ও অবিচ্ছেদ্য বন্ধন আবিষ্কার করতে পারে না। কারণ, খোলা চোখে এ বন্ধন দেখা যায় না। মানবজীবনের গভীরে গেলে চোখে পড়ে। সহজে বললে এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এমন : মানুষ প্রত্যেক গুনাহের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বিরোধিতার ইচ্ছা করে না। বরং অনেক সময় শাহওয়াত তথা প্রবৃত্তিকে তৃপ্ত করার জন্য মানুষ গুনাহ করে ফেলে। ফলে সে আল্লাহর ইচ্ছার বিরোধিতার উদ্দেশ্যে গুনাহ করে না, নফসের খাহিশাত মেটাতে গুনাহ করে। অন্যকথায়, তার গুনাহটা কর্মের, বিশ্বাসের নয়। সে আল্লাহকে রব বলে স্বীকার করে, তাকে মেনে চলে, কিন্তু প্রবৃত্তির প্রতারণার ফলে প্রবৃত্তির ডাকে সাড়া দেয় এবং গুনাহ করে ফেলে। এ কারণে আহলে সুন্নাতের মতে, কোনো মুমিনকে আল্লাহর দুশমন বলা উচিত নয়। বরং গুনাহ সত্ত্বেও সে আল্লাহকে ভালোবাসে, আল্লাহর দ্বীনের জন্য তার প্রাণ কাঁদে, সে নিজের জানের বিনিময়ে আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকে। কুরআনে আমরা দেখি, গুনাহ সত্ত্বেও আল্লাহ মহব্বতকে গ্রহণ করছেন এবং গুনাহ ক্ষমার ঘোষণা করছেন। আল্লাহ বলেন, ‘(হে রাসুল!) আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন; তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল, দয়াময়।’ [আলে ইমরান : ৩১] এ আয়াতে গুনাহ সত্ত্বেও আল্লাহকে ভালোবাসা এবং তাঁর ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব বলা হয়েছে। খোদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও কর্ম দ্বারাও এর প্রমাণ মেলে। একজন সাহাবিকে মদ্যপান করার দরুন কয়েকবার শাস্তি দেওয়া হয়। একবার শাস্তির জন্য তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে আসা হলে কোনো কোনো সাহাবি তাকে ভর্ৎসনা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) শুনে বলেন, 'তোমরা তাকে অভিশাপ দিয়ো না। সে আল্লাহ ও রাসুলকে ভালোবাসে।'⁴⁵⁸ অর্থাৎ, মদ্যপান তার রোগ। কিন্তু অন্তরে সে আল্লাহ ও রাসুলকে ভালোবাসে! বোঝা গেল, গুনাহ ও আল্লাহর ভালোবাসা একসঙ্গে বিদ্যমান থাকা উত্তম না হলেও অসম্ভব নয়। এটা আমাদের বাস্তব জীবনেও অনুভব করব। অনেক মানুষকে দেখব, যারা শয়তান ও প্রবৃত্তির প্ররোচনায় নানান গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। তথাপি আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল এবং ইসলামকে তারা হৃদয় থেকে ভালোবাসে。
প্রশ্ন হতে পারে, যদি আল্লাহকে ভালোই বাসে, তবে তাঁর অবাধ্য হয় কী করে? ইমাম বললেন, 'হ্যাঁ, ভালোবাসার পরেও কারও অবাধ্য হওয়া সম্ভব। সন্তান পিতাকে ভালোবাসে। কিন্তু মাঝে মাঝে পিতার অবাধ্য হয়। তেমনই মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হলেও আল্লাহই তার কাছের সবার চেয়ে প্রিয় থাকেন। অবাধ্যতা সংঘটিত হয় প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে।'⁴⁵⁹
প্রশ্ন হয়, শাস্তি হবে জেনেও মানুষ অপরাধ করে কীভাবে? ইমাম বললেন, 'শাস্তি হবে জেনেও দুটি কারণে মানুষ অপরাধ করে—হয়তো আল্লাহর কাছে ক্ষমার আশা করে, নতুবা মৃত্যুর আগে তাওবা করবে এমন চিন্তা করে।'⁴⁶⁰
টিকাঃ
৪৫৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৮)।
৪৫৮. মুসনাদে বাযযার (মুসনাদু উমর ইবনুল খাত্তাব: ২৬৯)। মুসান্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুত তালাক: ১৩৫৫২)।
৪৫৯. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৪-২৫)।
৪৬০. প্রাগুক্ত (১৯)।
📄 মদ্যপানকারীর চল্লিশ দিনের নামায কবুল না হওয়ার রহস্য
একটি হাদিসে এসেছে—মদ্যপানকারীর চল্লিশ দিনের নামায কবুল করা হয় না। হাদিসটি একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে।⁴⁶¹ আবু মুকাতিল সমরকন্দি ইমামকে প্রশ্ন করেন, বলা হয়ে থাকে—যে ব্যক্তি মদ পান করবে, তার চল্লিশ দিনের আমল কবুল করা করা হবে না। এর কারণ কী? গুনাহ কীভাবে আমলকে এভাবে ধ্বংস করে দেয়? ইমাম প্রথমে বলেন, 'এটার কোনো ব্যাখ্যা আমার জানা নেই।' ইমামের বিনয় ও স্পষ্টভাষিতা দেখুন! হতে পারে হাদিসটি ইমাম আজম রহ.-এর কাছে না পৌঁছে থাকবে। এটা মোটেই অসম্ভব নয়। কোনো মুহাদ্দিস বা ফকিহের রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সকল হাদিস জানা থাকবে এটা জরুরি নয়। এটা তাদের শানের জন্য মানহানিকর এমনও নয়। খোদ সাহাবাদেরও অনেক হাদিস জানা ছিল না। এটা নিতান্তই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অকপটে সেটা স্বীকার করতে পারা সচরাচর ঘটনা ও স্বাভাবিক নয়। এর জন্য নিষ্ঠা, বিনয় ও অন্তরের স্বচ্ছতা জরুরি।
কিন্তু এখানে যে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ এবং ইমাম আজম রহ.-এর দূরদর্শিতা ও বিস্ময়কর জ্ঞানগত গভীরতার প্রমাণ সেটা হলো, তিনি এটাকে আপাতদৃষ্টিতে ইনসাফবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করেননি। তিনি বলেননি, 'এটা বিশুদ্ধ কথা নয়। কারণ, একবার মদ্যপান করা হয়ে গেলে সেজন্য চল্লিশ দিন তার নামায কবুল করা হবে না—এটা সঠিক নয়। বরং মদ্যপান মদ্যপানের জায়গাতে, নামায নামাযের জায়গাতে।' বরং তিনি উক্ত বক্তব্যকে অশুদ্ধ না বলে গুনাহের শাস্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার ইনসাফপূর্ণ শাশ্বত নীতি ব্যাখ্যা করেছেন। ইমাম বলেন, 'এটার কোনো ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। কিন্তু এ কথাকে আমি নাকচও করছি না। যতক্ষণ এটার আল্লাহর ইনসাফবিরোধী কোনো ব্যাখ্যা না করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এটাকে মিথ্যাপ্রতিপন্নও করব না। কারণ, আল্লাহর ইনসাফ হলো বান্দাকে তার গুনাহের কারণে হয়তো শাস্তি দেবেন অথবা ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু যে গুনাহ সে করেইনি সেটার কারণে তাকে শাস্তি দেবেন না। আর নেক আমল ও বদ আমলের আলাদা আলাদা হিসাব রয়েছে। অর্থাৎ, বান্দা যতটুক নেক আমল করবে আল্লাহ সেটার হিসাব রাখবেন। যতটুক মন্দ আমল করে সেটাও লিখে রাখবেন। যেমন—এক ব্যক্তি যাকাতবাবদ পঞ্চাশ দিরহাম আদায় করল, অথচ তার যাকাত ছিল আরও বেশি। তখন আল্লাহ সেই পঞ্চাশ দিরহাম হিসাব করে রাখবেন। বাকি সম্পত্তির জন্য তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করবেন। একই কথা নামায, রোযা, হজ সবকিছুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এগুলোর সওয়াব আল্লাহ লিখে রাখবেন। গুনাহের জায়গায় গুনাহও লিখবেন। এ কারণে আল্লাহ ইরশাদ করেন : ‘আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতীত চাপিয়ে দেন না। প্রত্যেকে যা (ভালো) করবে তার প্রতিদান পাবে। আর যা (মন্দ) করবে সেটা তার উপর বর্তাবে।’ [বাকারা: ২৮৬]
'আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নারী-পুরুষ কারও আমলকে নষ্ট করব না।’ [আলে ইমরান : ১৯৫] অন্য এক আয়াতে বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে আমি কোনো পুণ্যবানের প্রতিদানকে নষ্ট করব না।’ [কাহফ : ৩০] মানুষের প্রতিদান হবে আমলের ভিত্তিতে সে মর্মে আল্লাহ বলেন, ‘আজ তোমাদের কর্মের বিনিময় দেওয়া হবে তোমাদের।’ [জাসিয়া: ২৮] অন্যত্র বলেন, ‘আজ কাউকে বিন্দু পরিমাণ জুলুম করা হবে না। তোমাদের তো স্রেফ তোমাদের কর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে।’ [ইয়াসিন : ৫৪] কিয়ামতের দিন আল্লাহ সকলের প্রতি পূর্ণ ইনসাফ করবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের তুলাদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোনো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।’ [আম্বিয়া: ৪৭] আল্লাহ বান্দার প্রত্যেক কাজের বিনিময় দেবেন। ভালোমন্দ, ছোট-বড় কোনোকিছুই বাদ দেবেন না। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি এককণা পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে এককণা পরিমাণ খারাপ কাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।’ [যালযালাহ: ৭-৮]
উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট যে, আল্লাহ তায়ালা গুনাহের শাস্তির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। বান্দার গুনাহের চেয়ে অধিক শাস্তি প্রদান করেন না। ফলে কেউ যদি মদ্যপান করে, চল্লিশ দিন তার নামায কবুল না হওয়া জুলুম নয়, বরং এটাই ইনসাফ। কারণ, শাস্তির পরিমাণ তিনি আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। এর পর যদি কেউ সে পাপে লিপ্ত হয়, দায়ভারও তার বহন করতে হবে। যেমন—বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি হলো 'রজম' তথা প্রস্তর মেরে হত্যা। কতটুকু সময় সে হারাম উপভোগে মত্ত ছিল সেটা দেখার বিষয় নয়, বরং এ ধরনের জঘন্য অন্যায়ের শাস্তি হলো প্রাণবধ। সুতরাং এটা জেনেও যে এ ধরনের পাপে নিমজ্জিত হবে, তার এ শাস্তি গ্রহণ করতে হবে এবং মোটেই জুলুম হবে না। একই কথা মদ্যপানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে, চল্লিশ দিন তার নামায পড়ার প্রয়োজন নেই কিংবা নামায পড়তে পারবে না, বরং সেটা আরও জঘন্য গুনাহ হবে। বরং নামায পড়তে হবে। শাস্তির কারণে সে নামাযের পুণ্য থেকে বঞ্চিত থাকবে। এটা হচ্ছে তাওবা না করা অবস্থায়। কিন্তু যদি কেউ মদ্যপান করার পরে আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে তাওবা ও ইস্তিগফার করে, তবে আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। চাইলে তিনি তার নামাযগুলোও কবুল করবেন。
টিকাঃ
৪৬১. তিরমিযি (আবওয়াবুল আশরিবাহ: ১৮৬২)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল আশরিবাহ : ৩৩৭৭)। সুনানে নাসায়ি (কিতাবুল আশরিবাহ : ৫৬৮০)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল ইমামাহ : ৯৫১)।