📄 ইমাম আজম তথা আহলে সুন্নাতের মাযহাব
ইমাম আজমসহ সকল আহলে সুন্নাতের অবস্থান হলো দুটোর মাঝামাঝি। কবিরা গুনাহকারীকে তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামি বলেন না। আবার কবিরা গুনাহকারীর পরিণতির ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্তও হয়ে যান না, বরং ভয় ও আশার মাঝে থাকেন। অর্থাৎ, কোনো মুসলমান হালাল মনে করা কিংবা অবজ্ঞাবশত নয়, বরং প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে যদি কোনো কবিরা গুনাহ করে ফেলে, অতঃপর তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তবে তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামি বলা যাবে না; বরং সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি নিজ অনুগ্রহে কিংবা শাফায়াতকারীদের শাফায়াতে তাকে সরাসরি ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাত দান করবেন, অথবা তার কর্মফলস্বরূপ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। যতদিন ইচ্ছা তাকে শাস্তি দেবেন। অতঃপর নিজ অনুগ্রহে কিংবা শাফায়াতের মাধ্যমে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাত দান করবেন। মোটকথা, কবিরা গুনাহের শাস্তি কখনোই চিরস্থায়ী জাহান্নাম নয়। আর সগিরা গুনাহ অন্যান্য পুণ্য ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই পুণ্য পাপকে মিটিয়ে দেয়।’ [হুদ : ১১৪]⁴³⁹
আল্লাহ তায়ালা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে মুমিন সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাকো তখন নামাযের কাছেও যেয়ো না, যতক্ষণ না যা মুখে বলো সেটা বুঝতে পারো।’ [নিসা : ৪৩] মদ্যপান কবিরা গুনাহ। অথচ মদ্যপানকারীকে এখানে মুমিন বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘মুসলিমদের দুটি দল আত্মকলহে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর তাদের একটি দল যদি অন্যদলের উপর বাড়াবাড়ি করে, তবে যে দল বাড়াবাড়ি করছে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যে যাবৎ না তারা আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। সুতরাং যদি ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে মীমাংসা করে দাও এবং ইনসাফ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন।’ [হুজুরাত : ৯] মুমিনদের আন্তঃকলহ কবিরা গুনাহ। অথচ এখানে দুই দলকেই মুমিন বলা হয়েছে। আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর নিহতের ক্ষেত্রে কিসাস অপরিহার্য করা হয়েছে।’ [বাকারা : ১৭৮] মানুষ হত্যা করা মারাত্মক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ। অথচ আল্লাহ এখানে হত্যাকারীদের ও মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত করে মুমিন সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর নিকট খাঁটি তাওবা করো, তাহলে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলি মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবহমান।’ [তাহরিম : ৮] এখানে তাওবার জন্য মুমিন বলে ডেকেছেন। তাওবা তো সাধারণত গুনাহগারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে আল্লাহ কবিরা গুনাহকারীকেই মুমিন বলে সম্বোধন করেছেন। যদি গুনাহের মাধ্যমে মানুষ কাফের হয়ে যেত, তবে তাদের মুমিন বলে সম্বোধন করতেন না।⁴⁴⁰
এ জন্য ইমাম আজম বলেন, 'তাওহিদ এবং রাসুলুল্লাহর রিসালাতের অনুসারীদের মাঝে যারা গুনাহগার, তারা (গুনাহ সত্ত্বেও) নিঃসন্দেহে মুমিন। তারা সন্দেহাতীতভাবেই কুফর থেকে মুক্ত।⁴⁴¹ তিনি আরও বলেন, “শিরক ছাড়া আহলে কিবলা কোনো মুমিনের অন্য কোনো অপরাধের ব্যাপারে এ কথা বলা যাবে না যে, আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই তাকে শাস্তি দেবেন। কারণ, শিরক ছাড়া আল্লাহ যেকোনো গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। হ্যাঁ, আমরা জানি না আল্লাহ কোনটা ক্ষমা করবেন, কোনটা করবেন না। আল্লাহ বলেন, ‘যা তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে যদি তোমরা সেসব বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারো, তবে আমি তোমাদের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেবো এবং সম্মানজনক স্থানে তোমাদের প্রবেশ করাব।’ [নিসা: ৩১] তবে আল্লাহ চাইলে শিরক ছাড়া সকল গুনাহই ক্ষমা করে দিতে পারেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না যে লোক তাঁর সাথে শরিক করে। এ ছাড়া তিনি যার জন্য চান সবকিছু ক্ষমা করেন।’ [নিসা : ৪৮] উক্ত আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়, আল্লাহ যার জন্য চাইবেন শিরক ছাড়া তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তবে কার জন্য চাইবেন আর কার জন্য চাইবেন না, সেটা আমাদের জানা নেই।”⁴⁴² ফলে কবিরা গুনাহকারীর ব্যাপারে সুনিশ্চিত কোনো ফয়সালা দেওয়ার সুযোগ নেই।
আল-ফিকহুল আকবারে ইমাম বলেন, “যে ব্যক্তি সব ধরনের শর্ত মেনে ত্রুটিমুক্ত কোনো নেক আমল করবে, কুফর ও ধর্মত্যাগ থেকে দূরাবস্থান করে মুমিন অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তার সে আমলকে নষ্ট করবেন না; বরং কবুল করে নেবেন এবং তাকে প্রতিদান দেবেন। আর যে ব্যক্তি শিরক ও কুফর ছাড়া অন্য কোনো গুনাহ করে, এর পর তাওবা না করেই ফাসেক মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে আল্লাহর এখতিয়ারাধীন থাকবে—চাইলে তিনি ক্ষমা করে দেবেন, চাইলে জাহান্নামের শাস্তি দেবেন। তবে চিরস্থায়ী শাস্তি দেবেন না।”⁴⁴³
ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কিছু (খারেজি) লোক নবি কারিম (সা.) থেকে এ মর্মে হাদিস বর্ণনা করে যে, যখন কোনো মুমিন যিনা করে, তখন তার মাথা থেকে ঈমান এমনভাবে বেরিয়ে যায় যেমন জামা খোলার সময় মাথা থেকে বেরিরে যায়। অতঃপর যখন তাওবা করে, তখন ঈমানও আবার ফিরে আসে।' আপনি কি এ কথায় বিশ্বাস করেন, নাকি সন্দেহ করেন? যদি বিশ্বাস করেন, তবে এটা তো খারেজিদের বক্তব্য; আর যদি সন্দেহ করেন, তবে খারেজিদের ব্যাপারে অকারণে আপনি সন্দেহ করলেন এবং ইনসাফের পথ থেকে সরে গেলেন। আর যদি এটাকে মিথ্যা বলেন, তবে আপনি নবিজির হাদিসকে মিথ্যা বললেন। কারণ, তারা এটা নবিজি থেকে বর্ণনা করে। ইমাম বললেন, "তারা মিথ্যা বলেছে। আমি তাদের মিথ্যাপ্রতিপন্ন করছি। এর দ্বারা অবশ্যই নবিজিকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা হচ্ছে না। নবিজি (সা.)-কে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা হবে তখন যখন কেউ বলবে, 'আমি নবিজিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছি।' কিন্তু কেউ যদি বলে, 'আমি নবিজি (সা.) যা যা বলেছেন সবকিছু সত্য বলে মানি, ঈমান রাখি; কিন্তু নবিজি (সা.) কুরআনের বিরোধিতা করতে পারেন না, অন্যায় কথা বলতে পারেন না', তবে তার এ কথা মূলত নবিজি ও কুরআনকে সত্যায়ন করাই, তিনি কুরআনের বিরুদ্ধে বলতে পারেন না এ স্বীকৃতি দেওয়াই। কারণ, নবিজি (সা.) যদি মিথ্যা বলতেন, নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিতেন, তবে আল্লাহ তাকে এক মুহূর্তের জন্য ছাড় দিতেন না। তাঁর শাহরগ কেটে দিতেন, যেমনটা তিনি কুরআনে বলেছেন, ‘তিনি যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করতেন, তবে আমি তাঁর দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম। অতঃপর কেটে দিতাম তাঁর গলা। তোমাদের কেউ তাঁকে রক্ষা করতে পারতে না।’ [হাক্কাহ: ৪৪-৪৭] সুতরাং আল্লাহর নবি কুরআনের বিরোধিতা করতে পারেন না। কুরআনের বিরোধিতাকারী নবি হতে পারে না। উপরে তারা যে কথা বলেছে, সেটা কুরআনের সুস্পষ্ট বিরোধী।
কারণ, কুরআন বলছে, ‘ব্যভিচারী পুরুষ এবং ব্যভিচারিণী নারী।’ [নুর : ২] তাদের ব্যাপারে এটা বলেনি যে, তারা মুমিন নয়। কুরআন আরও বলছে, ‘তোমাদের মধ্য থেকে যে দুইজন এতে লিপ্ত হয়েছে।’ [নিসা : ১৬] এখানে ‘তোমাদের মধ্য থেকে’ দ্বারা ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান উদ্দেশ্য নয়, বরং মুসলমানগণ উদ্দেশ্য। সুতরাং কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো হাদিস বর্ণনাকারীকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা নবিজিকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা নয়, বরং নবিজির নামে যে মিথ্যা বলে, তাকে প্রতিহত করা। এক্ষেত্রে অপরাধী নবিজি নন, বরং যে নবির নামে মিথ্যা বলে, সে অপরাধী। নবিজি (সা.) যা বলেছেন, সেটা আমরা শুনে থাকি আর না শুনে থাকি, সবকিছু আমাদের শিরোধার্য। তাতে আমরা ঈমান রাখি। সত্য বলে স্বীকৃতি দিই।”⁴⁴⁴
'গুনাহ কুফর' খারেজি-মুতাযিলাদের খণ্ডনে ইমাম কুরআনে বর্ণিত নবিদের ঘটনাবলি দিয়েও দলিল দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যেমন আল্লাহ তায়ালা ইউনুস আ. সম্পর্কে বলেছেন, ‘আর স্মরণ করুন মৎসওয়ালার কথা। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন আর মনে করেছিলেন যে, আমি তাঁকে ধরতে পারব না। পরে তিনি অন্ধকারের মধ্যে ডাকলেন, 'আপনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; আপনি পবিত্র, আমি জালেম।' [আম্বিয়া: ৮৭] এখানে ইউনুস আ.-কে জালেম মুমিন বলা হয়েছে; কাফের বা মুনাফিক বলা হয়নি। একইভাবে ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা যখন তাদের পিতা ইয়াকুবের কাছে আল্লাহর সমীপে ইস্তিগফার করতে বললেন, ‘তারা বলল, হে পিতা, আমাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। নিঃসন্দেহে আমরা অপরাধী ছিলাম।’ [ইউসুফ : ১৭] উক্ত আয়াত দিয়েও বোঝা যায়, তারা গুনাহগার ছিলেন; কাফের নয়। একইভাবে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ‘যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন আর আপনার প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেন এবং আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।’ [ফাতাহ : ২] এখানেও আল্লাহ ত্রুটির কথা বলেছেন, কুফরের কথা নয়। একইভাবে মুসা আ. যখন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন, এর মাধ্যমে তিনি গুনাহগার হয়েছিলেন, কাফের নন।”⁴⁴⁵
আল-ফিকহুল আবসাতে ইমাম রহ. বলেন, “আমাদের আকিদা হচ্ছে, গুনাহের কারণে কোনো আহলে কিবলাকে আমরা কাফের বলব না। গুনাহের ফলে কারও ঈমানকে আমরা নাকচ করব না। আমরা সৎকাজের আদেশ দেবো, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করব।”⁴⁴⁶ ইমাম আরও বলেন, “অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, চুরি করা, ডাকাতি করা, অন্যায়-অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া, ব্যভিচার করা, মদ্যপান করা কুফর নয়; ফিসক (পাপাচার)। সুতরাং কোনো মুমিন এসবে জড়িয়ে পড়লে সে পাপী ও অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে, কাফের নয়। আল্লাহ চাইলে তাকে এ পাপের জন্য জাহান্নামের শাস্তি দিতে পারেন। পরে ঈমানের কারণে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন।”⁴⁴⁷
ইমাম আরও বলেন, "যে ব্যক্তি স্রেফ ঈমান আনে, কিন্তু নামায পড়ে না, রোযা রাখে না, ইসলামের অন্য কোনো আমল করে না, সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি তাকে শাস্তি দেবেন, চাইলে অনুগ্রহ করবেন। কারণ, যতক্ষণ না কেউ আল্লাহর কিতাবের কোনো কিছু অস্বীকার করে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন গণ্য হবে।”⁴⁴⁸
কবিরা গুনাহের ব্যাপারে ইমাম আজম রহ. ও সালাফের এই মানহাজ নিজেদের মনগড়া নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরাম রাযি. থেকে গৃহীত। কুরআনের কিছু আয়াত পিছনে উল্লেখ করা হয়েছে। এবার এ ব্যাপারে আমরা কিছু হাদিস এবং সাহাবাদের বক্তব্য উল্লেখ করব যেগুলো ইমাম আজম রহ. নিজস্ব সনদে বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো :
ওয়াসেল ইবনে হিব্বান থেকে আবু যর রাযি. সূত্রে তিনি বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' আবু যর বলেন, আমি বললাম চুরি-ব্যভিচার ইত্যাদি করা সত্ত্বেও? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।'
তিনি জাবের রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, জাবের রাযি. রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, এমন কি কোনো গুনাহ আছে যা কুফরের পর্যায়ে? রাসুল বললেন, 'না। তবে শিরক।⁴⁴⁹
তিনি (হারেস ইবনে আবদুর রহমান আবু মুসলিম খাওলানি সূত্রে) মুআজ বিন জাবাল রাযি.-এর বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন, 'মুআজ রাযি. যখন (শামের) হিমস শহরে আসেন, তখন কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করে, জনৈক ব্যক্তি নামায পড়ে, রোযা রাখে, বাইতুল্লাহর হজ করে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে, গোলাম আযাদ করে, যাকাত প্রদান করে। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ব্যাপারে সন্দেহ রাখে, তার বিধান কী? তিনি বললেন, তার স্থান জাহান্নাম। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আর যে ব্যক্তি নামায পড়ে না, রোযা রাখে না, হজ করে না, যাকাত আদায় করে না, কিন্তু সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান রাখে, তার বিধান কী? তিনি বললেন, আমি তার ব্যাপারে আশা করি, আবার ভয়ও করি।⁴⁵⁰
ইমাম রহ. মুআয রাযি. থেকে আরও বর্ণনা করেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর ব্যাপারে সন্দেহ করবে, তার সকল আমল বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি কেউ ইমান আনে কিন্তু অন্যায় করে, তবে তার জন্য আল্লাহর ক্ষমার আশা করা হবে এবং শাস্তির ভয় করা হবে।⁴⁵¹
উসমান বাত্তির কাছে লেখা চিঠিতে ইমাম বলেন, 'মোটকথা, সত্যায়ন (ঈমান) ও আমলের স্বরূপ ভিন্ন। কেউ আমল নষ্ট করলে তার ঈমানও নষ্ট হয়ে যাবে এমন নয়। ... আমরা বলি জালেম মুমিন, পাপী মুমিন, বিচ্যুত মুমিন, অবাধ্য মুমিন, অসৎ মুমিন ইত্যাদি।' কবিরা গুনাহকারী গুনাহের পরেও মুমিন থাকে এটা প্রমাণ করতে ইমাম যুক্তি দেখান: 'খুলাফায়ে রাশেদিন, যেমন উমর ও আলি, আমিরুল মুমিনিন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সকল মুমিনই কি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ইবাদতের উপর ছিল? একইভাবে আলি রাযি. যখন শামের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, তাদের মুমিন হিসেবে সম্বোধন করেছেন। তারা যদি পূর্ণাঙ্গ (আমলসহ) মুমিনই হতো, তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন? একইভাবে রাসুলুল্লাহর (সা.) সাহাবাগণ পরস্পরের বিরুদ্ধে বিগ্রহে জড়িয়ে পড়েছেন। পৃথিবীতে হত্যা ও হানাহানির চেয়ে মারাত্মক কোনো অপরাধ আছে? তাদের উভয় দলই কি সঠিক ছিল? ছিল না। তবুও তাদের উভয় দলই মুমিন ছিল। ...সুতরাং আমার বক্তব্য হলো, আহলে কিবলার সকলে মুমিন। ফরয ইবাদতের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতির কারণে আমি কাউকে ঈমান থেকে বের করে দিই না। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সঙ্গে সকল ফরয বিধান মেনে চলবে, সে আমাদের কাছে 'জান্নাতের অধিকারী' বিবেচিত হবে। যে ব্যক্তি ঈমান ও আমল দুটোই ছেড়ে দেবে, সে জাহান্নামের অধিবাসী কাফের বিবেচিত হবে। আর যে ঈমানকে ঠিক রেখে ফরযের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতি করবে, সে আমাদের কাছে গুনাহগার মুমিন গণ্য হবে। পরকালে সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি শাস্তি দেবেন, চাইলে বিনা শাস্তিতে ক্ষমা করে দেবেন।⁴⁵² এভাবে ইমাম আজম ইতিহাস ও যুক্তির মাধ্যমেও খারেজিদের ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন করেন।
ইমাম আজম রহ.-এর পৌত্র উমর ইবনে হাম্মাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদিনাতে মালেক ইবনে আনাস রহ.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। কিছুদিন তাঁর সঙ্গে অবস্থান করি, তাঁর সান্নিধ্যে থাকি, তাঁর নৈকট্য অর্জন করি। বিদায় নেওয়ার সময় তাঁকে আমি বলি, আমার আশঙ্কা হিংসুক ও বিদ্বেষভরা লোকজন আবু হানিফার ব্যাপারে আপনাকে এমনকিছু বলে থাকবে যেমন তিনি ছিলেন না। এ কারণে আমি নিজে তাঁর কিছু বক্তব্য আপনাকে শোনাতে চাই। যদি আপনি সেগুলো সঠিক মনে করেন, তবে আমি সে মোতাবেক আমল করব। আর যদি আপনার কাছে সেগুলোর চেয়ে উত্তম কিছু থাকে, তবে সেগুলো গ্রহণ করব।
মালেক বললেন, বলো। আমি তাঁকে বললাম, আবু হানিফা বলতেন, 'আমি গুনাহের কারণে কোনো আহলে কিবলাকে কাফের বলি না।' মালেক বললেন, তিনি ঠিক বলেছেন। আমি বললাম তিনি আরও বলতেন, 'যদি কেউ কবিরা গুনাহ করে, তবুও আমি তাকে কাফের বলি না।' মালেক বললেন, ঠিক বলেছেন। আমি বললাম, তিনি আরও বলতেন, 'যদি কেউ ইচ্ছাকৃত ও অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে, তবুও আমি তাকে কাফের বলি না।' মালেক বললেন, তিনি ঠিকই বলেছেন। আমি বললাম, এটাই তাঁর বক্তব্য। সুতরাং কেউ যদি এর বিপরীত কিছু আপনাকে বলে, তবে আপনি সেটা সত্যায়ন করবেন না।⁴⁵³ সুতরাং প্রমাণিত হলো, এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা, মালেকসহ আহলে সুন্নাতের সকল আলেমের আকিদা এক ও অভিন্ন।
ইমাম আজমের অনুসরণে ইমাম তহাবি রহ. বলেন, 'মুহাম্মাদ (সা.)-এর উম্মতের মাঝে কবিরা গুনাহকারীরা তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করলে জাহান্নামে যাবে। কিন্তু তাওহিদের উপর মৃত্যু হওয়ায় জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না, বরং আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখা অবস্থায় মৃত্যুর ফলে তারা আল্লাহর এখতিয়ারাধীন থাকবে—চাইলে তিনি তাদের নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেবেন যেমনটা তিনি বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা তাঁর সঙ্গে কৃত শিরককে ক্ষমা করবেন না, শিরক ছাড়া বাকি সবকিছু ক্ষমা করে দেবেন।' চাইলে তিনি ইনসাফপূর্বক তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এর পর নিজ অনুগ্রহে এবং তাঁর বাধ্য বান্দাদের সুপারিশে সেখান থেকে বের করে জান্নাতে পাঠাবেন। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তাঁর মারিফাতপ্রাপ্ত বান্দাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ফলে তারা তাদের মতো হতে পারে না যারা তাকে চেনে না, তার হেদায়াত থেকে বিমুখ হয়েছে এবং তাঁর বন্ধুত্ব থেকে বঞ্চিত থেকেছে।”⁴⁵⁴
মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি বলেন, 'কবিরা গুনাহকারী ফিসক তথা পাপাচারিতা সত্ত্বেও মুমিন গণ্য হবে। তাকে ঈমান থেকে বের করে দেয়া যাবে না (এটা খারেজিরা দেয়)। আবার ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি রাখা যাবে না, যেমনটা মুতাযিলাদের বক্তব্য।⁴⁵⁵
টিকাঃ
৪৩৯. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৩৫)। আত-তামহিদ, নাসাফি (১৩৬-১৩৭)। আত-তামহিদ, লামিশি (১২১)।
৪৪০. আস-সাওয়াদুল আজম (৯)।
৪৪১. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৩১)।
৪৪২. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৬)।
৪৪৩. আল-ফিকহুল আকবার (৫)।
৪৪৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৯)।
৪৪৫. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৫-৫৬)।
৪৪৬. আল-ফিকহুল আবসাত (৪০)।
৪৪৭. প্রাগুক্ত (৪৭)।
৪৪৮. প্রাগুক্ত (৪৭)।
৪৪৯. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৪৩)।
৪৫০. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৭)।
৪৫১. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৬)।
৪৫২. রিসালাতু আবি হানিফা ইলা উসমান আল-বাত্তি (৩৭-৩৮)।
৪৫৩. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১১৩-১১৪)।
৪৫৪. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২২-২৩)।
৪৫৫. আল-ইতিকাদ, বলখি (১০৫)।
📄 ‘পাপ’ সম্পর্কে ইমাম আজমের দুটো বিস্ময়কর দিক-নির্দেশনা
‘পাপ’ সম্পর্কে ইমাম আজমের দুটো বিস্ময়কর দিক-নির্দেশনা
📄 পাপীকে অভিশাপ না দেওয়া
ইমামকে প্রশ্ন করা হলো, 'কবিরা গুনাহকারীর জন্য ইস্তিগফার করা উত্তম, নাকি তার উপর লানত করা উত্তম? নাকি দুটোর ভিতরে যেটা খুশি করা যাবে?' ইমাম বলেন, “শিরক ছাড়া গুনাহ দুই প্রকার। একটা হলো আল্লাহ-সম্পর্কিত গুনাহ (আল্লাহর হক), আরেকটা হলো বান্দা-সম্পর্কিত গুনাহ (বান্দার হক)। উভয় ক্ষেত্রেই লানতের চেয়ে ইস্তিগফারের দোয়া করা উত্তম। তবে লানত করলেও গুনাহ হবে না। সুতরাং যদি কেউ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো গুনাহ করে (উদাহরণস্বরূপ: হক নষ্ট করা), কিন্তু সে ওটা ক্ষমা করে দেয়, লানত না করে, তবে সেটা তো উত্তম। যদি আল্লাহ-সম্পর্কিত কোনো গুনাহ করে এবং সেটা শিরক না হয়, তবে সে ক্ষেত্রেও কালিমার সম্মানের দিকে তাকিয়ে তার জন্য ইস্তিগফারের দোয়া করা উত্তম। তবে যদি ধ্বংসের দোয়া করা করা হয়, যেমন—'হে আল্লাহ, তাকে তার গুনাহের কারণে ধ্বংস করে দিন', তাতে পাপ হবে না। তবে গুনাহ ছাড়া এভাবে ধ্বংসের দোয়া করলে উলটো বদদোয়াকারীর পাপ হবে। সারকথা হচ্ছে, উভয়ক্ষেত্রেই বদদোয়া না দিয়ে ইস্তিগফার ও দোয়া উত্তম। কারণ, একদিকে সে মুমিন, অপরদিকে কারও জানা নেই যে, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন কি না। কারণ, সেটা যদি জানাই থাকত (যেমন কাফেরকে আল্লাহ শাস্তি দেবেন), সে ক্ষেত্রে দোয়া করা তো নিষিদ্ধ। কারণ, কাফিরের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অর্থ হলো আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা। একইভাবে মুমিনের জন্য শাস্তির দোয়া করাও আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা। কারণ, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন কি না সেটা সুস্পষ্ট জানা নেই। হতে পারে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার ফয়সালা করেছেন, অথচ মানুষ তাকে শাস্তি দেওয়ার দোয়া করছে! কারণ, কালিমার চেয়ে বড় পুণ্যের কাজ আর কিছু হতে পারে না। সাত আকাশ, সাত জমিন এবং এগুলোর মাঝের জায়গার তুলনায় একটা ডিমের পরিমাণ যেমন, কালিমার তুলনায় সকল ফরয ইবাদতের পরিমাণ তারচেয়েও নগণ্য। বিপরীতে সকল গুনাহের মাঝে শিরক সবচেয়ে জঘন্য। আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিলেও শিরক ক্ষমা করবেন না। তিনি কুরআনে এটাকে সবচেয়ে বড় জুলুম আখ্যা দিয়েছেন: ‘নিশ্চয়ই শিরক মহা অপরাধ’ [লুকমান: ১৩]। সুতরাং কোনো ব্যক্তি কালিমা পড়ার পরে গুনাহ করে ফেললেও শিরক থেকে বেঁচে থাকার কারণে এবং কালিমার মর্যাদার দিকে তাকিয়ে তার জন্য অভিশাপের পরিবর্তে দোয়া করা উচিত।”⁴⁵⁶
টিকাঃ
৪৫৬. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৭-১৮)।
📄 পাপীমাত্রই আল্লাহর দুশমন নয়
ইমাম আজম রহ.-কে প্রশ্ন করা হলো, কবিরা গুনাহকারী কি আল্লাহর দুশমন বলে বিবেচিত হবে? ইমাম বললেন, “যদি তাওহিদ পরিত্যাগ না করে, তবে সব ধরনের কবিরা গুনাহ করার পরেও মানুষ আল্লাহর দুশমন হিসেবে বিবেচিত হবে না। কেননা, দুশমন দুশমনের প্রতি বিদ্বেষ রাখে, ক্ষতি করার চেষ্টা করে। অথচ মুমিন ব্যক্তি বড় কোনো গুনাহ করে ফেললেও আল্লাহ তায়ালাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। এর প্রমাণ হলো, যদি তাকে বলা হয় যে, হয়তো সে আল্লাহর উপর অন্তর থেকে মিথ্যা অপবাদ দেবে, নতুবা তাকে আগুনে ফেলা হবে। সে আগুনে ঝাঁপ দিতেই রাজি হবে।”⁴⁵⁷
ইমামের এই বক্তব্য মানুষের প্রকৃতি পাঠের ক্ষেত্রে তাঁর প্রতি আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টি দানের প্রমাণ। সাধারণ মানুষ আল্লাহ ও বিশ্বাসী মানুষের মাঝে সম্পর্কের এ বিরল ও অবিচ্ছেদ্য বন্ধন আবিষ্কার করতে পারে না। কারণ, খোলা চোখে এ বন্ধন দেখা যায় না। মানবজীবনের গভীরে গেলে চোখে পড়ে। সহজে বললে এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এমন : মানুষ প্রত্যেক গুনাহের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বিরোধিতার ইচ্ছা করে না। বরং অনেক সময় শাহওয়াত তথা প্রবৃত্তিকে তৃপ্ত করার জন্য মানুষ গুনাহ করে ফেলে। ফলে সে আল্লাহর ইচ্ছার বিরোধিতার উদ্দেশ্যে গুনাহ করে না, নফসের খাহিশাত মেটাতে গুনাহ করে। অন্যকথায়, তার গুনাহটা কর্মের, বিশ্বাসের নয়। সে আল্লাহকে রব বলে স্বীকার করে, তাকে মেনে চলে, কিন্তু প্রবৃত্তির প্রতারণার ফলে প্রবৃত্তির ডাকে সাড়া দেয় এবং গুনাহ করে ফেলে। এ কারণে আহলে সুন্নাতের মতে, কোনো মুমিনকে আল্লাহর দুশমন বলা উচিত নয়। বরং গুনাহ সত্ত্বেও সে আল্লাহকে ভালোবাসে, আল্লাহর দ্বীনের জন্য তার প্রাণ কাঁদে, সে নিজের জানের বিনিময়ে আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকে। কুরআনে আমরা দেখি, গুনাহ সত্ত্বেও আল্লাহ মহব্বতকে গ্রহণ করছেন এবং গুনাহ ক্ষমার ঘোষণা করছেন। আল্লাহ বলেন, ‘(হে রাসুল!) আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন; তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল, দয়াময়।’ [আলে ইমরান : ৩১] এ আয়াতে গুনাহ সত্ত্বেও আল্লাহকে ভালোবাসা এবং তাঁর ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব বলা হয়েছে। খোদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও কর্ম দ্বারাও এর প্রমাণ মেলে। একজন সাহাবিকে মদ্যপান করার দরুন কয়েকবার শাস্তি দেওয়া হয়। একবার শাস্তির জন্য তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে আসা হলে কোনো কোনো সাহাবি তাকে ভর্ৎসনা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) শুনে বলেন, 'তোমরা তাকে অভিশাপ দিয়ো না। সে আল্লাহ ও রাসুলকে ভালোবাসে।'⁴⁵⁸ অর্থাৎ, মদ্যপান তার রোগ। কিন্তু অন্তরে সে আল্লাহ ও রাসুলকে ভালোবাসে! বোঝা গেল, গুনাহ ও আল্লাহর ভালোবাসা একসঙ্গে বিদ্যমান থাকা উত্তম না হলেও অসম্ভব নয়। এটা আমাদের বাস্তব জীবনেও অনুভব করব। অনেক মানুষকে দেখব, যারা শয়তান ও প্রবৃত্তির প্ররোচনায় নানান গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। তথাপি আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল এবং ইসলামকে তারা হৃদয় থেকে ভালোবাসে。
প্রশ্ন হতে পারে, যদি আল্লাহকে ভালোই বাসে, তবে তাঁর অবাধ্য হয় কী করে? ইমাম বললেন, 'হ্যাঁ, ভালোবাসার পরেও কারও অবাধ্য হওয়া সম্ভব। সন্তান পিতাকে ভালোবাসে। কিন্তু মাঝে মাঝে পিতার অবাধ্য হয়। তেমনই মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হলেও আল্লাহই তার কাছের সবার চেয়ে প্রিয় থাকেন। অবাধ্যতা সংঘটিত হয় প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে।'⁴⁵⁹
প্রশ্ন হয়, শাস্তি হবে জেনেও মানুষ অপরাধ করে কীভাবে? ইমাম বললেন, 'শাস্তি হবে জেনেও দুটি কারণে মানুষ অপরাধ করে—হয়তো আল্লাহর কাছে ক্ষমার আশা করে, নতুবা মৃত্যুর আগে তাওবা করবে এমন চিন্তা করে।'⁴⁶⁰
টিকাঃ
৪৫৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৮)।
৪৫৮. মুসনাদে বাযযার (মুসনাদু উমর ইবনুল খাত্তাব: ২৬৯)। মুসান্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুত তালাক: ১৩৫৫২)।
৪৫৯. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৪-২৫)।
৪৬০. প্রাগুক্ত (১৯)।