📄 কবিরা গুনাহের সংখ্যা
কবিরা ও সগিরার সংজ্ঞার্থ নিয়ে যেহেতু মতবিরোধ রয়েছে, ফলে স্বাভাবিকভাবে সংখ্যা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। কারও মতে, কবিরা গুনাহ চারটা যা রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত : 'আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, মিথ্যা শপথ করা।' কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে—'মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।'⁴²⁸ তবে বিভিন্ন বর্ণনায় এগুলোকে 'সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ' বলা হয়েছে। সুতরাং কবিরা গুনাহ কেবল এই চারটা এমন নয়। আবু হুরাইরা রাযি.-এর হাদিসে সাতটা বিষয়কে ধ্বংসাত্মক বলা হয়েছে। সেগুলো হলো: আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধের দিন পলায়ন করা, সচ্চরিত্র নিষ্কলঙ্ক মুমিন নারীকে অপবাদ দেওয়া।⁴²৯ এগুলোও বড় পর্যায়ের কবিরা গুনাহ যাকে 'ফাহেশা'ও বলা হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কবিরা গুনাহ কেবল এই সাতটার মাঝে সীমাবদ্ধ। বরং যেসব গুনাহের অনিষ্ট এগুলোর সমপর্যায়ের হবে, সেগুলোও কবিরা গুনাহ বিবেচিত হবে।⁴³⁰
মোটকথা, কবিরা গুনাহের সংখ্যা নির্ধারিত নয়, বরং উপরের সংজ্ঞার্থের ভিত্তিতে কবিরা ও সগিরার সংখ্যা নির্ধারিত হবে। কোনো কোনো আলেম কবিরা গুনাহকে ৭০টা পর্যন্ত গণনা করেছেন। কেউ আরও কম বা বেশি। তবে সংখ্যার বিষয়টা যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ নয়, ফলে আমরা সেটাকে এখানে উল্লেখ করছি না। আমাদের জন্য যেটুকু জানা আবশ্যক তা হলো—কবিরা হোক সগিরা হোক, কোনো গুনাহকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বরং মানুষ যেন সগিরাকে ছোট মনে না করে, কবিরা হয়ে যাওয়ার ভয়ে যেন সকল প্রকারের গুনাহ থেকে দূরে থাকে, এ জন্য হয়তো আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল কবিরা ও সগিরা গুনাহের মাঝে সুস্পষ্ট কোনো সীমারেখা টেনে দেননি। যেমন—লাইলাতুল কদরকে তিনি গোপন রেখেছেন যাতে মানুষ রমযানের সকল রাতে কদরের সন্ধানে ইবাদত করে। একইভাবে তিনি জুমার দিন দোয়া কবুলের সময়টুকু গোপন রেখেছেন যাতে মানুষ পুরো সময়টা দোয়ার মধ্য দিয়ে কাটায়। সেভাবে তিনি কবিরা ও সগিরা গুনাহের পার্থক্যও গোপন রেখেছেন যাতে মানুষ কবিরা হওয়ার আশঙ্কায় কবিরা ও সগিরা সব ধরনের গুনাহ থেকে দূরে থাকে। ফলে একজন মুসলিমের কবিরা নাকি সগিরা এই পার্থক্য খোঁজার চেয়ে সকল ধরনের গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা উচিত। কারণ, গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা না হলে, গুনাহকে হালকা মনে করলে, তার জন্য চূড়ান্ত পরিণামে সগিরা ও কবিরা গুনাহের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকবে না। এটা উমর ও ইবনে আব্বাসসহ বিভিন্ন সাহাবির বক্তব্য। তারা বলেছেন, 'ইস্তিগফারের সঙ্গে কোনো গুনাহ কবিরা থাকে না। আর বারবার করলে কোনো গুনাহ সগিরা থাকে না।' অর্থাৎ, ইস্তিগফার করলে আল্লাহ যেহেতু সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন, সুতরাং কবিরা গুনাহও ক্ষমা হয়ে যায়। বিপরীতে সগিরা গুনাহের জন্য যদিও ইস্তিগফার ও তাওবা দরকার নেই, কিন্তু সগিরা গুনাহ বারবার করতে থাকলে সেটা কবিরাতে পরিণত হয়ে যায়। কারণ, তখন সেটা ব্যক্তির দ্বীনের প্রতি গাফলতি ও অবজ্ঞার মানসিকতা তুলে ধরে, যা কবিরা গুনাহ। ফলে সংজ্ঞার্থের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো গুনাহের প্রতি মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অন্তরের অবস্থা। এটার উপর ভিত্তি করেই তার আমলের পাল্লায় সগিরা ও কবিরা গুনাহ বিদ্যমান থাকবে। নফসের ধোঁকায় পড়ে কবিরা গুনাহ করার পরও আল্লাহর প্রতি ভয়, লজ্জা, অন্তরের মনস্তাপ ইত্যাদি কারণে কবিরা সগিরাতে রূপান্তরিত হয়ে যায় কিংবা একেবারে নাই হয়ে যায়। আবার অন্তরের গাফলতি, অবজ্ঞা এবং বারবার অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ার দরুন সগিরা কবিরাতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
টিকাঃ
৪২৮. বুখারি (কিতাবুশ শাহাদাত : ২৬৫৩)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৮৭)।
৪২৯. বুখারি (কিতাবুল ওয়াসায়া : ২৭৬৬)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৮৯)।
৪৩০. দেখুন: শরহুল আকায়েদ, তাফতাযানি (২৬৩)।
📄 কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির বিধান
কবিরা গুনাহে লিপ্ত মুসলিমের বিধান কী—এ ব্যাপারে মুসলিম জাতি তিন ভাগে বিভক্ত। এক. কবিরা গুনাহে লিপ্ত হলে কোনো সমস্যা নেই, শাস্তি নেই। এটা ভ্রান্ত চরমপন্থি মুরজিয়াদের বক্তব্য। দুই. কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিত এবং চিরস্থায়ী জাহান্নাম। এটা ভ্রান্ত খারেজি ও মুতাযিলাদের বক্তব্য। তিন. ক্ষমা অথবা শাস্তি দুটোর একটারও নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না। এমন ব্যক্তি তাওবা করলে ক্ষমা পাবে। তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি সাময়িক শাস্তি দেবেন, আর চাইলে ক্ষমা করে দেবেন। এটা ইমাম আজম আবু হানিফাসহ আহলে সুন্নাতের সকল আলেমের বক্তব্য এবং একমাত্র সঠিক বক্তব্য। নিচে আমরা প্রত্যেকটি মাযহাব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি।
📄 খারেজিদের মাযহাব
খারেজিদের মতে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো ধরনের কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়, তবে সে কাফের হয়ে যাবে, তার ঈমান চলে যাবে। বরং তাদের কিছু মত দেখলে বোঝা যায়, কেবল কবিরা গুনাহ নয়, আল্লাহর যেকোনো নির্দেশের অবাধ্য হলে, হোক সেটা কবিরা কিংবা সগিরা, এমন ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে।⁴³¹ তারা মনে করে, পবিত্র কুরআনের এ বাণী তাদের দলিল:
‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হবে জাহান্নাম; সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হন। তাকে লানত করেন। তার জন্য মহা শাস্তি প্রস্তুত করেন।’ [নিসা : ৯৩]
তাদের যুক্তি হলো, আল্লাহ তায়ালা এখানে হত্যাকারী তথা কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে চিরতরে জাহান্নামে নিক্ষেপের কথা বলেছেন। আর এটা হচ্ছে কাফেরদের জন্য নির্ধারিত শাস্তি। বোঝা গেল, কবিরা গুনাহকারী কাফের।
আবুল লাইস সমরকন্দি তাদের খণ্ডনে বলেন, এটা গলত বক্তব্য, বিদআতি তাফসির। কারণ, এক. কুরআনের আয়াতের এমন তাফসির সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িন তথা উম্মাহর কেউ করেননি; বরং তাদের সকলের ঐকমত্যে এখানে হত্যা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হালাল মনে করা। অর্থাৎ, যদি কেউ হত্যাকে হালাল মনে করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। হালাল মনে না করে হত্যা করলে কাফের হবে না। ইবনে আব্বাস রাযি.-এর মত এটাই। দুই. আয়াতের আরেকটা অর্থ হলো, এখানে 'চিরস্থায়ী' বলতে দীর্ঘ সময় বোঝানো হয়েছে। হত্যার শাস্তির ভয়াবহতা বোঝাতে এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। চিরস্থায়ী বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। কুরআনের এ ধরনের বর্ণনাপদ্ধতি বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। তিন. তা ছাড়া, কুরআনের বিভিন্ন আয়াত দেখলে স্পষ্ট হয় যে, খোদ কুরআনেও কবিরা গুনাহকারীকে কাফের না বলে ফাসেক বলা হয়েছে। যেমন—আল্লাহ তায়ালা একটি আয়াতে ইরশাদ করেন : ‘হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে সেটা যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হয়ে নাও।’ [হুজুরাত : ৬] এখানে ফাসেক (পাপী) বলতে মিথ্যাবাদী বোঝানো হয়েছে। অন্যকথায়, মিথ্যাবাদীকে ফাসেক বলা হয়েছে। যদি মিথ্যা বলা কুফর হতো, তবে ফাসেক না বলে কাফের বলা হতো। চার. সাহাবি মায়েয ইবনে মালেক রাযি. ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে স্বীকারোক্তি দেন। কবিরা গুনাহ যদি কুফর হতো, তবে নবিজি তাকে মুরতাদ হিসেবে হত্যা করতেন অথবা তাকে ঈমানে ফিরে আসতে বলতেন; অথচ এমন কিছু ঘটেনি।⁴³²
ইমাম মাতুরিদি বলেন, “আল্লাহ তায়ালা কুরআনে রাসুলুল্লাহকে নিজের জন্য এবং মুমিনদের জন্য ইস্তিগফার করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং (হে রাসুল) জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার এবং মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন।’ [মুহাম্মাদ : ১৯] আবার অন্যদিকে তাকে এবং মুমিনদেরকে মুশরিকদের জন্য ইস্তিগফার করতে নিষেধ করেছেন। ‘আত্মীয়স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবি ও মুমিনদের জন্য সংগত নয় যখন সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা নিশ্চিতই জাহান্নামি।’ [তাওবা : ১১৩] বোঝা গেল, গুনাহগার হওয়া সত্ত্বেও মুমিনরা মুমিনই থাকে। তাদের উপর 'কুফর' শব্দ প্রয়োগ করা যায় না। এসব আয়াত খারেজি ও মুতাযিলা উভয় সম্প্রদায়ের খণ্ডন।”⁴³³
তারা আরও বিভিন্ন আয়াত দিয়ে দলিল দেয়। যেমন-আল্লাহর বাণী: ‘যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা তো তাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। তারা অচিরেই দোযখের জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।’ [নিসা: ১০] তাদের বক্তব্য হলো, এখানে জাহান্নামে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বের হওয়ার কথা বলা হয়নি! বোঝা গেল, তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে! একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী : ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্য হবে এবং আল্লাহর সীমা অতিক্রম করবে, তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। সে তথায় চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।’ [নিসা: ১৪] এখানে তো জাহান্নামে চিরস্থায়ী থাকা স্পষ্ট। সুতরাং কোনো ব্যক্তি মুমিন থাকার পরে যদি কবিরা গুনাহ করে, তাহলে সে স্থায়ীরূপে জাহান্নামে থাকবে।
আহলে সুন্নাতের বক্তব্য হলো, কোনো বিষয়ে কুরআনের কোনো একটি আয়াত দেখেই হুট করে স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না; বরং অন্যান্য আয়াত থেকে সেটার তাফসির গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো যাতে সফলকাম হও।’ [নুর: ৩১] আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর নিকট খাঁটি তাওবা করো, তাহলে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলি মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের দাখিল করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবহমান।’ [তাহরিম : ৮] এসব আয়াতে একসঙ্গে তাদের মুমিন হিসেবে সম্বোধন করছেন, আবার তাওবা করতেও বলছেন। বোঝা গেল, গুনাহ কুফর নয়। কবিরা গুনাহের কারণে মানুষ ঈমান থেকে বের হয় না। কবিরা গুনাহের মাধ্যমে কেউ কাফের হয় না। তা ছাড়া, এসব আয়াতে কোথাও চিরস্থায়ী হওয়ার কথা নেই, বরং সর্বোচ্চ 'খুলুদ'-এর কথা আছে। আর 'খুলুদ' লম্বা সময়ের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। চিরস্থায়ী হওয়া জরুরি নয়।⁴³⁴
হত্যার শাস্তির ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে ভুলে হত্যা করে ফেলবে, তাকে 'দিয়ত' (রক্তপণ) ও কাফফারা দিতে হবে। আর যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তবে তাকেও 'কিসাস'-স্বরূপ হত্যা করা হবে। কিন্তু তাতে সে কাফের হবে না। যদি তাওবা করে মারা যায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আর যদি তাওবা ছাড়া মারা যায়, তবে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি তাকে নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেবেন, আর চাইলে ইনসাফপূর্বক অপরাধ অনুপাতে শাস্তি দেবেন। অতঃপর তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাত দান করবেন। এটাই সঠিক কথা। সুতরাং কেউ যদি বলে, হত্যাকারী চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, সে বিদআতি ও বিভ্রান্ত। কেননা, মুমিনকে হত্যার মাধ্যমে কোনো মুমিন কাফের হয় না। আর জাহান্নামে কাফের ছাড়া অন্য কেউ স্থায়ীরূপে থাকবে না।⁴³⁵
টিকাঃ
৪৩১. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৫)। আত-তামহিদ, নাসাফি (১৩৪)।
৪৩২. দেখুন : শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৬)।
৪৩৩. আত-তাওহিদ (২৩৬-২৩৭)।
৪৩৪. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৩৮)।
৪৩৫. দেখুন: আস-সাওয়াদুল আজম (১৩)।
📄 মুতাযিলা ও কাদারিয়্যাহদের মাযহাব
মুতাযিলা ও কাদারিয়্যাহদের মতে, কবিরা গুনাহকারী ঈমান থেকে বেরিয়ে যাবে, কিন্তু কুফরের মাঝে প্রবেশ করবে না; বরং ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি অবস্থান করবে। তাদের কেউ কেউ এমন ব্যক্তিকে মুনাফিকও সাব্যস্ত করেছে। যদি মৃত্যুর আগে তাওবা করে ঈমানে প্রবেশ করে, তবে বেঁচে যাবে। আর যদি তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তবে পরকালে চিরস্থায়ীরূপে জাহান্নামে থাকবে। আল্লাহর জন্য তাকে ক্ষমা করা বৈধ হবে না! তবে তাদের শাস্তি অবাধ্য মুমিনদের মতো হবে; কাফেরদের মতো শাস্তি হবে না। এক্ষেত্রে তারা সেসব দলিল দিয়ে তাদের মাযহাব প্রমাণিত করার চেষ্টা করে, খারেজিরা যেগুলো তাদের মাযহাবের দলিল হিসেবে পেশ করে।⁴³⁶
তারা বলে, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্য হবে এবং আল্লাহর সীমা অতিক্রম করবে, তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। সে তথায় চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।’ [নিসা: ১৪] নামায, রোযা, হজ, যাকাত ইত্যাদি পরিত্যাগ করা মূলত আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করা। আর এগুলো ছেড়ে দেওয়া কবিরা গুনাহ। সুতরাং বোঝা গেল, কবিরা গুনাহকারী পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে!
তারা আরও একটি আয়াত দিয়ে দলিল দেয় : ‘যে তার প্রতিপালকের নিকট অপরাধী হয়ে উপস্থিত হবে, তার জন্য আছে জাহান্নাম। সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।’ [তহা : ৭৪] এখানে অপরাধী বলতে ব্যাপক। কাফেরের সঙ্গে কবিরা গুনাহকারীও অন্তর্ভুক্ত হবে। আর এখানে তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের ঘোষণা করা হয়েছে।
সেসব দলিলই তাদের খণ্ডন খারেজিদের খণ্ডনে যেসব দলিল উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, পার্থিব জীবনের বিধানের ক্ষেত্রে তাদের ও খারেজিদের মাঝে সামান্য ব্যবধান থাকলেও পরকালীন পরিণতির ক্ষেত্রে উভয় সম্প্রদায়ের বক্তব্য এক ও অভিন্ন। আর আয়াতে 'মরবেও না বাঁচবেও না বলে' চিরস্থায়ী জাহান্নামি বোঝানো হয়নি, বরং এটা দুঃসহ জীবনের বেদনার ব্যাপারে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, জান্নাত কিংবা জাহান্নামের কেউ কখনো মরবে না এটা তো স্পষ্ট। 'বাঁচবে না' অর্থ হলো, জাহান্নামের প্রচণ্ড শাস্তির মাঝে বেঁচে থেকেও বেঁচে না থাকার মতো থাকবে। এটা এমন জীবন যাকে বেঁচে থাকা বলে না。
টিকাঃ
৪৩৬. দেখুন : শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৬)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৩৫)। আত-তামহিদ, নাসাফি (১৩৪)। আল-কিফায়াহ, সাবুনি (৩২৫)।