📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কবিরা ও সগিরা গুনাহের পরিচয়

📄 কবিরা ও সগিরা গুনাহের পরিচয়


উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের মতে গুনাহ দুই ভাগে বিভক্ত। এক. সগিরা তথা ছোট গুনাহ; দুই. কবিরা তথা বড় গুনাহ। এটা মুসলিম উম্মাহর মুহাক্কিক আলেমদের প্রতিষ্ঠিত বক্তব্য। কিন্তু এই দুটোর সংজ্ঞার্থ যেহেতু কুরআন-সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, ফলে উম্মাহর মাঝে এ দুটোর সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।

একদল আলেম মনে করেন, আল্লাহর কোনো নির্দেশ লঙ্ঘন করাই কবিরা গুনাহ। আরেক দল বলেন, যেকোনো গুনাহের উপর বাড়াবাড়ি করা এবং একাধিকবার করাই কবিরা গুনাহ। আর যে গুনাহ করার পরে সাথে সাথে তাওবা-ইস্তিগফার করা হয়, সেটা সগিরা হয়ে যায়। তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস দ্বারা দলিল দেওয়ার চেষ্টা করেন যেখানে তিনি বলেছেন, 'বারবার করলে কোনো গুনাহ সগিরা থাকে না, ইস্তিগফার করলে কোনো কবিরা থাকে না।' কিন্তু এটা তাদের মতের পক্ষে দলিল নয়। প্রথমত এটা মারফু হিসেবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়; বরং ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বক্তব্য হিসেবে প্রমাণিত।⁴²¹ দ্বিতীয়ত এর মাধ্যমে কবিরা ও সগিরা গুনাহের অস্তিত্ব ও প্রকৃতিকে নাকচ করা হয় না। বাড়াবাড়ি করলে সগিরার পাপ কবিরাতে রূপান্তরিত হয় এবং ইস্তিগফার করলে কবিরা গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন—এগুলো সত্য, কিন্তু তাতে সগিরা ও কবিরা নামক দুই প্রকারের গুনাহের প্রকৃতির অস্তিত্ব নাকচ হয়ে যায় না।

এ জন্য আহলে সুন্নাত বলেন, সগিরা ও কবিরা দুই প্রকারের গুনাহ। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর উপস্থিত করা হবে আমলনামা এবং এতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে আপনি অপরাধীদের দেখবেন আতঙ্কগ্রস্ত এবং এরা বলবে, হায়, দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! তা তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয় না, বরং সবকিছু হিসেব রেখেছে। এরা এদের কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে; আপনার প্রতিপালক কারও উপর জুলুম করেন না।’ [কাহাফ : ৪৯] আরও বলেন, ‘তোমাদের যা নিষেধ করা হয়েছে, তার মধ্যে যা গুরুতর (কবিরা) তা থেকে বিরত থাকলে তোমাদের পাপগুলো মোচন করব আর তোমাদের সম্মানজনক স্থানে দাখিল করব।’⁴²² [নিসা : ৩১] উপরের আয়াতগুলোতে সগিরা ও কবিরা নামে দুই প্রকারের গুনাহের অস্তিত্ব থাকা সুস্পষ্ট।

আরেক দল মনে করেন, কবিরা ও সগিরা গুনাহ আপেক্ষিক। অর্থাৎ, স্বতন্ত্রভাবে কবিরা (বড়) বা সগিরা (ছোট) বলার সুযোগ নেই। বরং অন্যের সঙ্গে তুলনায় কবিরা-সগিরা নির্ধারিত হবে। ফলে অনেক গুনাহ সে গুনাহের চেয়ে ছোট গুনাহের তুলনায় কবিরা বিবেচিত হবে। আবার বড় গুনাহের তুলনায় সগিরা বিবেচিত হবে। যেমন—বেগানা নারীকে যৌন উত্তেজনাসহ স্পর্শ করার বিধান। এটা ব্যভিচারের তুলনায় সগিরা গুনাহ, কিন্তু উত্তেজনাসহ তাকানোর তুলনায় কবিরা গুনাহ।⁴²³ কিন্তু এই মতামতও সঠিক নয়। নারীকে যৌন উত্তেজনা সহকারে স্পর্শ করা হারাম ও কবিরা গুনাহ, সগিরা নয়। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.) এটাকেও প্রকারান্তরে 'ব্যভিচার' (যিনা) আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'চোখ ব্যভিচার করে; চোখের ব্যভিচার হলো তাকানো। হাত ব্যভিচার করে; হাতের ব্যভিচার হলো স্পর্শ। মুখ ব্যভিচার করে; মুখের ব্যভিচার হলো কথা।'⁴²⁴ তাই এটাও একপ্রকারের ব্যভিচার ও কবিরা গুনাহ। কিন্তু বাস্তব ব্যভিচার হলো কবিরা গুনাহের মাঝে জঘন্য প্রকারের গুনাহ (ফাহিশা)। একটাকে ছোট বলতে গিয়ে কবিরা গুনাহের সীমা থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। সদরুশ শরিয়াহ বলেন, 'কবিরা গুনাহ দুই প্রকারের। এক. ফাহিশা তথা অশ্লীল কাজ। যেমন—সমকামিতা, বাবার স্ত্রীকে বিয়ে করা ইত্যাদি। দুই. সে সকল গুনাহ কুরআন-সুন্নাহতে যে ব্যাপারে দুনিয়া ও আখেরাতে শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে।'⁴²⁵ 'ফাহেশা' হলো : কবিরা গুনাহের মাঝে আরও বড় ধরনের অনৈতিক ও অন্যায় গুনাহ। যেমন—হত্যা করা, ব্যভিচার করা, সমকামিতায় লিপ্ত হওয়া, চুরি করা, কাউকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, যাদু করা, যুদ্ধ থেকে পলায়ন করা, পরনিন্দা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের মাল ভক্ষণ করা, জুলুম করা, পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।⁴²⁶

উপরের আলোচনাতে স্পষ্ট যে, কবিরা ও সগিরা নামক দুই প্রকারের গুনাহের অস্তিত্ব অনিবার্য সত্য। যারা এটাকে নাকচ করেন তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। তবে কবিরা ও সগিরা গুনাহের সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে যে মতপার্থক্য, এক্ষেত্রে সবচেয়ে সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে বিজ্ঞ সাহাবি ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে। তাঁর থেকে বর্ণিত : 'কবিরা গুনাহ হলো, আল্লাহ তায়ালা যে গুনাহের কারণে জাহান্নামের শাস্তির হুমকি দিয়েছেন; নিজের অসন্তুষ্টি, অভিশাপ ইত্যাদির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।' কেউ কেউ এগুলোর সঙ্গে সেসব গুনাহকেও কবিরা হিসেবে যুক্ত করেছেন, যেগুলোর জন্য শরিয়তে নির্ধারিত শাস্তি (হদ) রয়েছে। আর সগিরা হলো এগুলোর চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের সাধারণ গুনাহ, শরিয়তে যে জন্য কোনো শাস্তি নেই, আল্লাহ তায়ালা যেসব গুনাহের কারণে অসন্তুষ্টি কিংবা পরকালে শাস্তির হুমকি দেননি। কবিরা ও সগিরা গুনাহের বিদ্যমান সংজ্ঞার্থগুলোর মাঝে এটাই বেশি পূর্ণাঙ্গ।⁴²⁷

টিকাঃ
৪২১. শুআবুল ঈমান, বাইহাকী (৯/৪০৬)।
৪২২. দেখুন: আল-কিফায়াহ, সাবুনি (৩৩৯-৩৪০)। শরহুল আকায়েদ, তাফতাযানি (২৬৩)।
৪২৩. আল-কিফায়াহ, সাবুনি (৩৪০-৩৪১)।
৪২৪. শরহু মুশকিলিল আসার, তহাবি (৯৮)।
৪২৫. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১৪০)।
৪২৬. আল-ফিকহুল আকবার, আলি কারি (৫৪)।
৪২৭. দেখুন : শরহে মুসলিম, নববি (২/৮৫)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কবিরা গুনাহের সংখ্যা

📄 কবিরা গুনাহের সংখ্যা


কবিরা ও সগিরার সংজ্ঞার্থ নিয়ে যেহেতু মতবিরোধ রয়েছে, ফলে স্বাভাবিকভাবে সংখ্যা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। কারও মতে, কবিরা গুনাহ চারটা যা রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত : 'আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, মিথ্যা শপথ করা।' কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে—'মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।'⁴²⁸ তবে বিভিন্ন বর্ণনায় এগুলোকে 'সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ' বলা হয়েছে। সুতরাং কবিরা গুনাহ কেবল এই চারটা এমন নয়। আবু হুরাইরা রাযি.-এর হাদিসে সাতটা বিষয়কে ধ্বংসাত্মক বলা হয়েছে। সেগুলো হলো: আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধের দিন পলায়ন করা, সচ্চরিত্র নিষ্কলঙ্ক মুমিন নারীকে অপবাদ দেওয়া।⁴²৯ এগুলোও বড় পর্যায়ের কবিরা গুনাহ যাকে 'ফাহেশা'ও বলা হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কবিরা গুনাহ কেবল এই সাতটার মাঝে সীমাবদ্ধ। বরং যেসব গুনাহের অনিষ্ট এগুলোর সমপর্যায়ের হবে, সেগুলোও কবিরা গুনাহ বিবেচিত হবে।⁴³⁰

মোটকথা, কবিরা গুনাহের সংখ্যা নির্ধারিত নয়, বরং উপরের সংজ্ঞার্থের ভিত্তিতে কবিরা ও সগিরার সংখ্যা নির্ধারিত হবে। কোনো কোনো আলেম কবিরা গুনাহকে ৭০টা পর্যন্ত গণনা করেছেন। কেউ আরও কম বা বেশি। তবে সংখ্যার বিষয়টা যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ নয়, ফলে আমরা সেটাকে এখানে উল্লেখ করছি না। আমাদের জন্য যেটুকু জানা আবশ্যক তা হলো—কবিরা হোক সগিরা হোক, কোনো গুনাহকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বরং মানুষ যেন সগিরাকে ছোট মনে না করে, কবিরা হয়ে যাওয়ার ভয়ে যেন সকল প্রকারের গুনাহ থেকে দূরে থাকে, এ জন্য হয়তো আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল কবিরা ও সগিরা গুনাহের মাঝে সুস্পষ্ট কোনো সীমারেখা টেনে দেননি। যেমন—লাইলাতুল কদরকে তিনি গোপন রেখেছেন যাতে মানুষ রমযানের সকল রাতে কদরের সন্ধানে ইবাদত করে। একইভাবে তিনি জুমার দিন দোয়া কবুলের সময়টুকু গোপন রেখেছেন যাতে মানুষ পুরো সময়টা দোয়ার মধ্য দিয়ে কাটায়। সেভাবে তিনি কবিরা ও সগিরা গুনাহের পার্থক্যও গোপন রেখেছেন যাতে মানুষ কবিরা হওয়ার আশঙ্কায় কবিরা ও সগিরা সব ধরনের গুনাহ থেকে দূরে থাকে। ফলে একজন মুসলিমের কবিরা নাকি সগিরা এই পার্থক্য খোঁজার চেয়ে সকল ধরনের গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা উচিত। কারণ, গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা না হলে, গুনাহকে হালকা মনে করলে, তার জন্য চূড়ান্ত পরিণামে সগিরা ও কবিরা গুনাহের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকবে না। এটা উমর ও ইবনে আব্বাসসহ বিভিন্ন সাহাবির বক্তব্য। তারা বলেছেন, 'ইস্তিগফারের সঙ্গে কোনো গুনাহ কবিরা থাকে না। আর বারবার করলে কোনো গুনাহ সগিরা থাকে না।' অর্থাৎ, ইস্তিগফার করলে আল্লাহ যেহেতু সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন, সুতরাং কবিরা গুনাহও ক্ষমা হয়ে যায়। বিপরীতে সগিরা গুনাহের জন্য যদিও ইস্তিগফার ও তাওবা দরকার নেই, কিন্তু সগিরা গুনাহ বারবার করতে থাকলে সেটা কবিরাতে পরিণত হয়ে যায়। কারণ, তখন সেটা ব্যক্তির দ্বীনের প্রতি গাফলতি ও অবজ্ঞার মানসিকতা তুলে ধরে, যা কবিরা গুনাহ। ফলে সংজ্ঞার্থের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো গুনাহের প্রতি মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অন্তরের অবস্থা। এটার উপর ভিত্তি করেই তার আমলের পাল্লায় সগিরা ও কবিরা গুনাহ বিদ্যমান থাকবে। নফসের ধোঁকায় পড়ে কবিরা গুনাহ করার পরও আল্লাহর প্রতি ভয়, লজ্জা, অন্তরের মনস্তাপ ইত্যাদি কারণে কবিরা সগিরাতে রূপান্তরিত হয়ে যায় কিংবা একেবারে নাই হয়ে যায়। আবার অন্তরের গাফলতি, অবজ্ঞা এবং বারবার অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ার দরুন সগিরা কবিরাতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

টিকাঃ
৪২৮. বুখারি (কিতাবুশ শাহাদাত : ২৬৫৩)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৮৭)।
৪২৯. বুখারি (কিতাবুল ওয়াসায়া : ২৭৬৬)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৮৯)।
৪৩০. দেখুন: শরহুল আকায়েদ, তাফতাযানি (২৬৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির বিধান

📄 কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির বিধান


কবিরা গুনাহে লিপ্ত মুসলিমের বিধান কী—এ ব্যাপারে মুসলিম জাতি তিন ভাগে বিভক্ত। এক. কবিরা গুনাহে লিপ্ত হলে কোনো সমস্যা নেই, শাস্তি নেই। এটা ভ্রান্ত চরমপন্থি মুরজিয়াদের বক্তব্য। দুই. কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিত এবং চিরস্থায়ী জাহান্নাম। এটা ভ্রান্ত খারেজি ও মুতাযিলাদের বক্তব্য। তিন. ক্ষমা অথবা শাস্তি দুটোর একটারও নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না। এমন ব্যক্তি তাওবা করলে ক্ষমা পাবে। তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি সাময়িক শাস্তি দেবেন, আর চাইলে ক্ষমা করে দেবেন। এটা ইমাম আজম আবু হানিফাসহ আহলে সুন্নাতের সকল আলেমের বক্তব্য এবং একমাত্র সঠিক বক্তব্য। নিচে আমরা প্রত্যেকটি মাযহাব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 খারেজিদের মাযহাব

📄 খারেজিদের মাযহাব


খারেজিদের মতে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো ধরনের কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়, তবে সে কাফের হয়ে যাবে, তার ঈমান চলে যাবে। বরং তাদের কিছু মত দেখলে বোঝা যায়, কেবল কবিরা গুনাহ নয়, আল্লাহর যেকোনো নির্দেশের অবাধ্য হলে, হোক সেটা কবিরা কিংবা সগিরা, এমন ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে।⁴³¹ তারা মনে করে, পবিত্র কুরআনের এ বাণী তাদের দলিল:

‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হবে জাহান্নাম; সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হন। তাকে লানত করেন। তার জন্য মহা শাস্তি প্রস্তুত করেন।’ [নিসা : ৯৩]

তাদের যুক্তি হলো, আল্লাহ তায়ালা এখানে হত্যাকারী তথা কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে চিরতরে জাহান্নামে নিক্ষেপের কথা বলেছেন। আর এটা হচ্ছে কাফেরদের জন্য নির্ধারিত শাস্তি। বোঝা গেল, কবিরা গুনাহকারী কাফের।

আবুল লাইস সমরকন্দি তাদের খণ্ডনে বলেন, এটা গলত বক্তব্য, বিদআতি তাফসির। কারণ, এক. কুরআনের আয়াতের এমন তাফসির সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িন তথা উম্মাহর কেউ করেননি; বরং তাদের সকলের ঐকমত্যে এখানে হত্যা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হালাল মনে করা। অর্থাৎ, যদি কেউ হত্যাকে হালাল মনে করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। হালাল মনে না করে হত্যা করলে কাফের হবে না। ইবনে আব্বাস রাযি.-এর মত এটাই। দুই. আয়াতের আরেকটা অর্থ হলো, এখানে 'চিরস্থায়ী' বলতে দীর্ঘ সময় বোঝানো হয়েছে। হত্যার শাস্তির ভয়াবহতা বোঝাতে এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। চিরস্থায়ী বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। কুরআনের এ ধরনের বর্ণনাপদ্ধতি বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। তিন. তা ছাড়া, কুরআনের বিভিন্ন আয়াত দেখলে স্পষ্ট হয় যে, খোদ কুরআনেও কবিরা গুনাহকারীকে কাফের না বলে ফাসেক বলা হয়েছে। যেমন—আল্লাহ তায়ালা একটি আয়াতে ইরশাদ করেন : ‘হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে সেটা যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হয়ে নাও।’ [হুজুরাত : ৬] এখানে ফাসেক (পাপী) বলতে মিথ্যাবাদী বোঝানো হয়েছে। অন্যকথায়, মিথ্যাবাদীকে ফাসেক বলা হয়েছে। যদি মিথ্যা বলা কুফর হতো, তবে ফাসেক না বলে কাফের বলা হতো। চার. সাহাবি মায়েয ইবনে মালেক রাযি. ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে স্বীকারোক্তি দেন। কবিরা গুনাহ যদি কুফর হতো, তবে নবিজি তাকে মুরতাদ হিসেবে হত্যা করতেন অথবা তাকে ঈমানে ফিরে আসতে বলতেন; অথচ এমন কিছু ঘটেনি।⁴³²

ইমাম মাতুরিদি বলেন, “আল্লাহ তায়ালা কুরআনে রাসুলুল্লাহকে নিজের জন্য এবং মুমিনদের জন্য ইস্তিগফার করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং (হে রাসুল) জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার এবং মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন।’ [মুহাম্মাদ : ১৯] আবার অন্যদিকে তাকে এবং মুমিনদেরকে মুশরিকদের জন্য ইস্তিগফার করতে নিষেধ করেছেন। ‘আত্মীয়স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবি ও মুমিনদের জন্য সংগত নয় যখন সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা নিশ্চিতই জাহান্নামি।’ [তাওবা : ১১৩] বোঝা গেল, গুনাহগার হওয়া সত্ত্বেও মুমিনরা মুমিনই থাকে। তাদের উপর 'কুফর' শব্দ প্রয়োগ করা যায় না। এসব আয়াত খারেজি ও মুতাযিলা উভয় সম্প্রদায়ের খণ্ডন।”⁴³³

তারা আরও বিভিন্ন আয়াত দিয়ে দলিল দেয়। যেমন-আল্লাহর বাণী: ‘যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা তো তাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। তারা অচিরেই দোযখের জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।’ [নিসা: ১০] তাদের বক্তব্য হলো, এখানে জাহান্নামে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বের হওয়ার কথা বলা হয়নি! বোঝা গেল, তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে! একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী : ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্য হবে এবং আল্লাহর সীমা অতিক্রম করবে, তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। সে তথায় চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।’ [নিসা: ১৪] এখানে তো জাহান্নামে চিরস্থায়ী থাকা স্পষ্ট। সুতরাং কোনো ব্যক্তি মুমিন থাকার পরে যদি কবিরা গুনাহ করে, তাহলে সে স্থায়ীরূপে জাহান্নামে থাকবে।

আহলে সুন্নাতের বক্তব্য হলো, কোনো বিষয়ে কুরআনের কোনো একটি আয়াত দেখেই হুট করে স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না; বরং অন্যান্য আয়াত থেকে সেটার তাফসির গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো যাতে সফলকাম হও।’ [নুর: ৩১] আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর নিকট খাঁটি তাওবা করো, তাহলে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলি মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের দাখিল করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবহমান।’ [তাহরিম : ৮] এসব আয়াতে একসঙ্গে তাদের মুমিন হিসেবে সম্বোধন করছেন, আবার তাওবা করতেও বলছেন। বোঝা গেল, গুনাহ কুফর নয়। কবিরা গুনাহের কারণে মানুষ ঈমান থেকে বের হয় না। কবিরা গুনাহের মাধ্যমে কেউ কাফের হয় না। তা ছাড়া, এসব আয়াতে কোথাও চিরস্থায়ী হওয়ার কথা নেই, বরং সর্বোচ্চ 'খুলুদ'-এর কথা আছে। আর 'খুলুদ' লম্বা সময়ের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। চিরস্থায়ী হওয়া জরুরি নয়।⁴³⁴

হত্যার শাস্তির ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে ভুলে হত্যা করে ফেলবে, তাকে 'দিয়ত' (রক্তপণ) ও কাফফারা দিতে হবে। আর যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তবে তাকেও 'কিসাস'-স্বরূপ হত্যা করা হবে। কিন্তু তাতে সে কাফের হবে না। যদি তাওবা করে মারা যায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আর যদি তাওবা ছাড়া মারা যায়, তবে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি তাকে নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেবেন, আর চাইলে ইনসাফপূর্বক অপরাধ অনুপাতে শাস্তি দেবেন। অতঃপর তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাত দান করবেন। এটাই সঠিক কথা। সুতরাং কেউ যদি বলে, হত্যাকারী চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, সে বিদআতি ও বিভ্রান্ত। কেননা, মুমিনকে হত্যার মাধ্যমে কোনো মুমিন কাফের হয় না। আর জাহান্নামে কাফের ছাড়া অন্য কেউ স্থায়ীরূপে থাকবে না।⁴³⁵

টিকাঃ
৪৩১. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৫)। আত-তামহিদ, নাসাফি (১৩৪)।
৪৩২. দেখুন : শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৬)।
৪৩৩. আত-তাওহিদ (২৩৬-২৩৭)।
৪৩৪. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৩৮)।
৪৩৫. দেখুন: আস-সাওয়াদুল আজম (১৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00