📄 মুরজিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম আজমের সংগ্রাম
ভ্রান্ত আকিদা থেকে সৃষ্ট সকল অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে ইমাম আজম সবসময় সরব ছিলেন। সত্যপ্রকাশ এবং বিশুদ্ধ আকিদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি জালেমের জুলুম কিংবা শাসকের উৎপীড়নকে ভয় করতেন না। মুরজিয়াদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মূলত মুরজিয়াদের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম। এ ছাড়াও ইমাম আজম তাঁর আকিদাবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে ঈমান ও ইরজা, ঈমান ও আমল ইত্যাদি সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে মুরজিয়াদের নানান ধারার সকল ভ্রান্তি খণ্ডনপূর্বক এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের বিশুদ্ধ আকিদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
খারেজি ও মুরজিয়া উভয়ের খণ্ডনে ইমাম বলেন, 'মুমিনের পিছনে—চাই সে পুণ্যবান হোক কিংবা পাপী হোক—নামায আদায় করা জায়েয। তবে আমরা এ কথা বলি না যে, পাপ মুমিনের কোনো ক্ষতি করে না। এটাও বলি না যে, সে একেবারেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আবার এটাও বলি না যে, সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হিসেবে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, হোক সেটা ফাসেক অবস্থায়ও। মুরজিয়াদের মতো এটাও বলি না যে, তাঁর পুণ্যসমূহ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে আর তার পাপসমূহ মার্জিত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা বলি: যে ব্যক্তি সব ধরনের শর্ত মেনে ত্রুটিমুক্ত কোনো নেক আমল করবে, কুফর ও ধর্মত্যাগ থেকে দূরাবস্থান করে মুমিন অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তার আমল নষ্ট করবেন না; বরং কবুল করে নেবেন এবং তাকে প্রতিদান দেবেন। আর যে ব্যক্তি শিরক ও কুফর ছাড়া অন্য কোনো গুনাহ করে, এর পর তাওবা না করেই ফাসেক মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি ক্ষমা করে দেবেন, চাইলে জাহান্নামের শাস্তি দেবেন। তবে চিরস্থায়ী শাস্তি দেবেন না।'³⁹⁰ এটা আহলে সুন্নাতের সকল ইমামের আকিদা।
ইমাম আজম আল-ওয়াসিয়্যাহ গ্রন্থেও মুরজিয়াদের বিচ্যুতি খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন, “কেবল জানার নামই ঈমান নয়। এমন হলে আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা সবাই মুমিন গণ্য হতো। কারণ, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন, ‘যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা আপনাকে সেভাবে চেনে যেভাবে চেনে নিজের সন্তানদের।’ [বাকারা : ১৪৬] তবুও তারা মুমিন নয়। কারণ, তারা চিনলে ও জানলেও স্বীকৃতি দেয় না।”³⁹¹
ইমাম আরও বলেন, “কেবল জানা যথেষ্ট নয়, মুখে স্বীকার করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, 'তোমরা বলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তাহলে সফলকাম হবে।' তিনি আরও বলেছেন, 'যে ব্যক্তি বলবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন।' ফলে কেবল জানলেই হবে না, মুখে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।”³⁹²
তহাবি রহ. বলেন, 'আমরা সৎকর্মশীল মুমিনদের জন্য আল্লাহর কাছে আশা করি তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন। স্বীয় অনুগ্রহে তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। কিন্তু আমরা তাদের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত-নিরাপদ হয়ে যাই না। কারও ব্যাপারে জান্নাতের সাক্ষ্য দিই না। আর গুনাহগার মুমিনদের জন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করি, তাদের ব্যাপারে আশঙ্কা করি, কিন্তু নিরাশ করি না। (ভবিষ্যৎ পরিণতি থেকে) নিশ্চিন্তভাব কিংবা নিরাশা দুটোর কোনোটাই মিল্লাতে ইসলামিয়্যাতে সমর্থিত নয়। কিবলার অনুসারীদের হকের পথ হচ্ছে এই দুটোর মাঝামাঝি।'³⁹³
টিকাঃ
৩৯০. আল-ফিকহুল আকবার, আবু হানিফা (৫)।
৩৯১. আল-ওয়াসিয়্যাহ, আবু হানিফা (২৭-২৮)।
৩৯২. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৩১-৩২)।
৩৯৩. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২১)।
📄 ইমামের চোখে ইরজার উৎস ও প্রকৃতি
ইরজার ইতিহাস ও সূত্রপাত কোত্থেকে? এ ব্যাপারে ইমাম আজমের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যাখ্যা রয়েছে। তিনি মনে করেন, “ইরজার সূচনা হয়েছিল ফেরেশতাদের মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা যখন ফেরেশতাদের সামনে বিভিন্ন সৃষ্টি রেখে সেগুলোর নাম জিজ্ঞাসা করলেন, তখন ফেরেশতারা না জেনে আন্দাজে জবাব দেওয়ার সাহস করলেন না। কারণ, তাতে অনধিকার চর্চা হবে। ফলে তারা নীরবতা অবলম্বন করে বললেন, ‘আপনি মহা পবিত্র। নিশ্চয়ই আমাদের যা শিখিয়েছেন সেগুলো ছাড়া আর কিছু জানি না।’ [বাকারা : ৩২] সুতরাং ফেরেশতাদের এই কর্মপন্থা ছিল সঠিক কর্মপন্থা। তারা ওই ব্যক্তির মতো ছিলেন না যাকে তার অজানা একটা বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো আর সে না জেনেই যা ইচ্ছা বলে গেল। এই লোক যদি ভুল বলে, তাহলে সে অপরাধী বিবেচিত হবে। যদি সৌভাগ্যক্রমে সঠিকটা বলতে পারে, তবুও ধন্যবাদ পাওয়ার উপযুক্ত হবে না। কারণ, সে অনধিকার চর্চা করেছে। না জেনে কথা বলেছে। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা নবিজি (সা.)-এর উদ্দেশে বলেছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সেটার পিছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও হৃদয় এগুলোর প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।’ [ইসরা : ৩৬] যেখানে রাসুল (সা.)-কেও না জেনে কেবল ধারণার বশবর্তী হয়ে কারও ব্যাপারে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে, সেখানে সাধারণ মানুষের ব্যাপারে কীই-বা বলার থাকে?”³⁹⁴
ইমাম আরও বলেন, “ইরজার ব্যাখ্যা হলো : ধরো তুমি একটা কওমের মাঝে ছিলে। তখন তারা হক ও সত্যের উপর ছিল। এর পর ওই অবস্থায় তাদের কাছ থেকে চলে গেলে। একটা সময় তোমার কাছে সংবাদ পৌঁছল যে, তারা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তখন তুমি তাদের কাছে গেলে। গিয়ে দেখলে এখনও তারা সেই হকের উপরই আছে। এ অবস্থাতেই নিজেদের একদল আরেক দলকে হত্যা করেছে। তাদের তুমি কারণ জিজ্ঞাসা করলে। উভয় দলের লোকেরাই তোমাকে বলল যে, তারা মজলুম। কিন্তু তাদের পক্ষে বা বিপক্ষে তৃতীয় পক্ষের কোনো প্রমাণ নেই। হয়তো নিজেও তাদের খুনাখুনি দেখলে, কিন্তু যে জালেম আর কে মজলুম সেটা বোঝার কোনো সুযোগ পেলে না। তাদের দুই দলের পরস্পরের বিরুদ্ধে দেওয়া সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য নয়। এখন তুমি কী করবে? তখন তোমার এটা চিন্তা করতে হবে যে, তাদের দুই দলের উভয়েই সঠিক হতে পারে না। হয়তো দুই দলেরই ভুল আছে। অথবা একদল সঠিক, অন্যদল বেঠিক। এই ক্ষেত্রে তুমি 'ইরজা'র আশ্রয় নেবে। তুমি বলবে, যারা গুনাহ করেছে তারা জাহান্নামিও নয় আবার জান্নাতিও নয়। কারণ, মানুষ তিন ধরনের। এক. নবি-রাসুলগণ এবং তারা জান্নাতি। দুই. নবি-রাসুলগণ যাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন তারা। এই দুই দলের বিপরীতে মুশরিকদের অবস্থান এবং তারা সকলে জাহান্নামি। তিন. সাধারণ মুমিনগণ, যাদের ব্যাপারে জান্নাত বা জাহান্নাম কোনোটা সাক্ষ্য দেওয়া যাবে না। তবে আমরা তাদের ব্যাপারে ভালোর প্রত্যাশা করব, মন্দের আশঙ্কা করব। আমরা তাদের ব্যাপারে সেটা বলব যেটা আল্লাহ বলেছেন: ‘আর কোনো কোনো লোক রয়েছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেককাজ এবং অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই আল্লাহ হয়তো তাদের ক্ষমা করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়।’ [তাওবা : ১০২] সুতরাং আমরা তাদের ব্যাপারে ক্ষমার আশা করব। কারণ, আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন, তিনি শিরক ব্যতীত বাকি সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।”³⁹⁵
টিকাঃ
৩৯৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২২-২৩)।
৩৯৫. প্রাগুক্ত (২৩)।
📄 ইমাম আজমকে মুরজিয়া বলা এক ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক সংকট
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যিনি সারা জীবন মুরজিয়াদের ভ্রান্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলেন, শেষ পর্যন্ত তাকেই 'মুরজিয়া' অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হলো। এটা তাঁর জীবদ্দশাতেই ঘটেছিল। বিষয়ের গুরুতরতার প্রতি লক্ষ রেখে এবার আমরা একটু সেদিকে দৃষ্টি দেবো। এই অভিযোগের কারণ, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা তলিয়ে দেখব।
প্রথমেই যেটা মনে রাখতে হবে সেটা হলো, ইমামকে মুরজিয়া বলার পিছনে সবার যুক্তি ও উদ্দেশ্য এক ছিল না। বরং বলা যায়, ইমামের উপর মুরজিয়া অভিযোগটি সর্বসাকুল্যে তিনটি দিক থেকে এসেছে।
এক. আহলে সুন্নাতের আলেমগণের পক্ষ থেকে। তারা তাঁর বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ ধরে তাকে মুরজিয়া বলেছেন। অর্থাৎ, ইমাম আজম রহ. যেহেতু আমলকে ঈমান গণ্য করেন না, ঈমানের সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে তিনি আমলকে তাত্ত্বিকভাবে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন না, বরং আলাদা (ইরজা) করেন। ফলে শাব্দিকভাবে তাঁর মতকে 'ইরজা' এবং তাকে 'মুরজিয়া' বলা যেতে পারে। খুব সম্ভবত এ অর্থেই কোনো কোনো মুহাদ্দিস ইমাম আজমের উপর 'মুরজিয়া' শব্দ প্রয়োগ করেছেন। ইমাম তাঁর মতাদর্শ স্পষ্ট করাতে তারা তাদের অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন এবং ইমামকে মুরজিয়া ডাকা বন্ধ করেছেন।
দুই. ভ্রান্ত মুরজিয়ারা তাদের নিজস্ব মতাদর্শ বিকানোর উদ্দেশ্যে ইমামের নাম ব্যবহার করে তাকে মুরজিয়া বলত। এরা আবার বিপরীতমুখী শ্রেণিতে বিভক্ত। এক শ্রেণি হলো চরমপন্থি খারেজি। ইমাম আজম রহ. তাদের মতো কবিরা গুনাহকারীকে কাফের না বলায় তারা ইমামকে মুরজিয়া বলে অপবাদ দেয়। আরেক শ্রেণি হলো মুরজিয়া-জাহমিয়্যাহ। তারা ইমামের নাম ব্যবহার করে তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্যে ইমামকে মুরজিয়া আখ্যা দেয়। শাহরাস্তানি এই দুই গ্রুপের ব্যাপারে লিখেন, 'আশ্চর্যের বিষয় হলো, (মুরজিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত গাসসানিয়্যাহ দলের নেতা) গাসসান আবু হানিফা থেকে তার মতাদর্শসদৃশ মতামত বর্ণনা করত এবং তাকে মুরজিয়া বলত। এটা তাঁর উপর মিথ্যাচার। তাকে মুরজিয়া বলার আরেকটি রহস্য আছে। তা হলো, তাঁর যুগে যারাই মুতাযিলা ও খারেজিদের বিরোধিতা করত, তারা তাকে মুরজিয়া হিসেবে আখ্যা দিত। ফলে সম্ভবত তারাই তাকে মুরজিয়া আখ্যা দিয়েছে।’³⁹⁶
তিন. পরবর্তী সময়ের একদল আহলে হাদিস তথা মুহাদ্দিসগণ, যাদের সঙ্গে ইমামের মতাদর্শিক দূরত্ব ছিল। ফলে তারা ইমাম আজমকে বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। কখনো তাঁকে ভুল বুঝেছেন। তাঁর বক্তব্য না বুঝে তাঁর সমালোচনা করেছেন। আবার কখনো তাকে লঘু পাপে গুরু দণ্ড দিয়েছেন। অর্থাৎ, তাদের নিজেদের মতাদর্শের বিপরীত হওয়ায় ইমামের বিভিন্ন বক্তব্যকে তারা স্রেফ ভুল বলেই ক্ষান্ত হননি; বরং কাফের, মুশরিক, বিদআতি, জাহমিসহ এমন কোনো অভিধা নেই যা তাঁর উপর প্রয়োগ করেননি। তাকে মুরজিয়া বলাও এই সিলসিলার নতিজা। আবার কখনো হিংসা ও ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে তাঁর উপর ভিত্তিহীন অপবাদ আরোপ করেছেন। আল্লাহ তাদের সবাইকে ক্ষমা করুন।
ইমাম আজম তাঁর জীবদ্দশাতেই যখন তাকে মুরজিয়া আখ্যা দেওয়ার ঘটনা শুনতে পান, সেটা থেকে নিজেকে পবিত্র ঘোষণা করেন। ইমামের আকিদাসংক্রান্ত কিতাবগুলোর বিভিন্ন জায়গায় ইরজাসম্পর্কিত বিস্তৃত আলোচনার খুব সম্ভবত অন্যতম কারণ নিজেকে মুরজিয়া অপবাদ থেকে মুক্ত করা। বরং তিনি এ ব্যাপারে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বিভিন্ন আলেমকে চিঠিও লিখেছেন। এ ধরনের একটি ঐতিহাসিক চিঠি হলো বসরার বিখ্যাত মুজতাহিদ আলেম উসমান আল-বাত্তির কাছে লেখা। এ চিঠিতে ইমাম তাঁর উপর আরোপিত মুরজিয়া অপবাদ খণ্ডন করেছেন। তিনি তাতে এ-সম্পর্কিত তাঁর যেসব আকিদা লিখেছেন, সেগুলো মূলত সকল সাহাবি ও তাবেয়ির আকিদা। বিষয়টির চূড়ান্ত গুরুত্বের দিকে লক্ষ করে সেই ঐতিহাসিক চিঠিটির সারমর্ম আমরা পাঠকের জন্য নিচে তুলে ধরছি:
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। এক আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি আপনাকে আল্লাহর ভয় ও আনুগত্যের ওসিয়ত করছি। আপনার চিঠি আমার কাছে পৌঁছেছে। আপনি লিখেছেন, আপনার কাছে নাকি সংবাদ পৌঁছেছে যে, আমি মুরজিয়া। কুরআন ও রাসুলুল্লাহর (সা.) সুন্নাহর বাইরে মুক্তির কোনো পথ নেই। এর বাইরে যা-কিছু আছে সব ভ্রষ্টতা ও বিদআত। তাই আমার বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করুন। মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে সতর্ক থাকুন। আমি আল্লাহর কাছে আমার নিজের জন্য এবং আপনার জন্য রহমত ও তৌফিক কামনা করছি।”
"পরকথা : আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর আগমনের আগে মানুষ মুশরিক ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) এসে তাদের ইসলামের দিকে ডাকেন, কালিমায়ে শাহাদাতের দিকে ডাকেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-কিছু নিয়ে এসেছেন সেগুলোতে বিশ্বাস করার দিকে ডাকেন। যারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয়, তারা শিরক থেকে মুক্ত মুমিন হিসেবে পরিচিতি পায়। তাদের সম্পদ ও প্রাণ সুরক্ষিত হয়ে যায়। যারা তাঁর ডাকে সাড়া না দেয়, তারা বেঈমান ও কাফের হিসেবে পরিচিতি পায়। তাদের সম্পদ ও প্রাণ অরক্ষিত হয়ে যায়। হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে (যেমন আহলে কিতাবের জন্য) আল্লাহ জিযিয়ার বিকল্প সুযোগও উন্মুক্ত রাখেন। অতঃপর সত্যায়নকারীদের উপর আল্লাহ বিভিন্ন ফরয ইবাদত ধার্য করেন। সেগুলো ঈমানের পরে আমল হিসেবে পরিগণিত হয়, যেমনটা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে।’ [বাকারা: ৮২] তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘আর যে আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং নেক আমল করে।’ [তাগাবুন: ৯] কুরআনে এমন আয়াত অসংখ্য। এভাবে তারা আমলের আগেই মুমিন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। যদি আমলকেও ঈমান বলা হয়, তবে এসব ইবাদত আসার আগে তারা মুমিন অভিধা পেতেন না।”
“মোটকথা, সত্যায়ন (ঈমান) ও আমলের হাকিকত ভিন্ন। কেউ আমল নষ্ট করলে তার ঈমানও নষ্ট হয়ে যাবে এমন নয়। কারণ, ঈমান আনার সময় আমল ছিলই না। আমল ছাড়াও ঈমান ছিল। তা ছাড়া, আমলে বিচ্যুতির কারণে যদি ঈমানেও বিচ্যুতি অনিবার্য হয়, তবে কেউ আমলে ত্রুটি করলেই ঈমান থেকে বেরিয়ে কাফের বা মুশরিক হয়ে যাওয়ার কথা; অথচ সেটা কেউ বলবে না। কারণ, ঈমানের ক্ষেত্রে মানুষের মাঝে কোনো স্তরভেদ নেই। হ্যাঁ, আমলের ক্ষেত্রে স্তরভেদ রয়েছে। ঈমানের ক্ষেত্রে কমবেশ নেই। হ্যাঁ, ফরয ইবাদতের ক্ষেত্রে কমবেশ রয়েছে। পৃথিবীর সকল রাসুল এবং সকল মানুষের দ্বীন একটাই। আমরা বলি, জালেম মুমিন, পাপী মুমিন, বিচ্যুত মুমিন, অবাধ্য মুমিন এবং অসৎ মুমিন ইত্যাদি। অথচ পাপ, বিচ্যুতি, অবাধ্যতা, অসততা সবগুলোই অপরাধ, আমল বিনষ্টকারী। আমল আর ঈমান যদি এক হতো, তবে এসব অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিদের তো মুমিনই বলা হতো না।”
“খুলাফায়ে রাশেদিন, যেমন: উমর ও আলি, আমিরুল মুমিনিন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সকল মুমিনই কি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ইবাদতের উপর ছিল? একইভাবে আলি রাযি. যখন শামের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, তাদের মুমিন হিসেবে সম্বোধন করেছেন। তারা যদি পূর্ণাঙ্গ (আমলসহ) মুমিনই হতো, তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন? একইভাবে রাসুলুল্লাহর (সা.) সাহাবাগণ পরস্পরের বিরুদ্ধে বিগ্রহে লিপ্ত হয়েছেন। পৃথিবীতে হত্যা ও হানাহানির চেয়ে মারাত্মক কোনো অপরাধ আছে? তাদের উভয় দলই কি সঠিক ছিল? ছিল না। তবুও তাদের উভয় দলই মুমিন ছিল। কারণ, ঈমান এগুলোর ঊর্ধ্বে।”
“সুতরাং আমার বক্তব্য হলো, আহলে কিবলার সকলে মুমিন। ফরয ইবাদতের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতির কারণে আমি কাউকে ঈমান থেকে বের করে দিই না। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সঙ্গে সকল ফরয বিধান মেনে চলবে, সে আমাদের কাছে ‘জান্নাতের অধিকারী’ হিসেবে বিবেচিত হবে। যে ব্যক্তি ঈমান ও আমল দুটোই ছেড়ে দেবে, সে জাহান্নামের অধিবাসী কাফের বিবেচিত হবে। আর যে ঈমানকে ঠিক রেখে ফরযের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতি করবে, সে আমাদের কাছে গুনাহগার মুমিন হিসেবে গণ্য হবে। পরকালে সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি শাস্তি দেবেন, চাইলে বিনা শাস্তিতে ক্ষমা করে দেবেন।”
চিঠির শেষে ইমাম তাঁর মুরজিয়া হওয়াকে গোমরাহ ফিরকাগুলোর পক্ষ থেকে অপবাদ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, “এক সম্প্রদায় ইনসাফের সঙ্গে কথা বলেছে; কিন্তু বিদআতিরা তাদের মুরজিয়া আখ্যা দিয়েছে, অথচ তারা মুরজিয়া নয়; বরং তারা ইনসাফের পতাকাবাহী আহলে সুন্নাত। বিদ্বেষবশত সেসব সম্প্রদায় তাদের এই অপবাদ দিয়েছে।”³⁹⁷
এই ঐতিহাসিক চিঠির মাধ্যমে স্পষ্ট যে, ইমাম সব ধরনের 'ইরজা' থেকে মুক্ত। কোনো অর্থেই তাকে 'মুরজিয়া' তিনি পছন্দ করতেন না। আর আহলে সুন্নাতের পক্ষ থেকে তাকে 'মুরজিয়া' বলার ঘটনা সম্ভবত পরবর্তী সময়ে ঘটেছে। তাঁর জীবদ্দশায় সর্বপ্রথম তাঁর উপর ইরজার অপবাদ দিয়েছে ভ্রান্ত সম্প্রদায়গুলো, যেমনটা ইমাম নিজে বলেছেন, 'এক সম্প্রদায় ইনসাফের সঙ্গে কথা বলেছে; কিন্তু বিদআতিরা তাদের মুরজিয়া আখ্যা দিয়েছে।' ফলে সম্ভবত আহলে সুন্নাতের মুহাদ্দিসিন এবং অন্য ফকিহদের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ সত্ত্বেও তারা ইনসাফের সঙ্গে নিয়েছেন। তাঁকে মুরজিয়া আখ্যা দেননি।
কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ইমামের সমকালীন মানুষরা তাকে ইনসাফ করতে পারলেও, নিজের পক্ষ থেকে এত স্পষ্টভাবে ওয়াজাহাত করা সত্ত্বেও আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত একদল আলেম মতাদর্শিক এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন কারণে ইনসাফের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। তারা তাঁকে মুরজিয়া বলা অব্যাহত রেখেছেন। ইমাম বুখারি তাঁর 'আত-তারিখুল কাবির'-এ সনদ যাচাই ছাড়া লিখেন, 'তিনি মুরজিয়া ছিলেন।'³⁹⁸ ইমাম মুসলিম তাঁর 'কিতাবুত তাময়িয' গ্রন্থে শক্তিশালী সনদ ছাড়াই ইমাম আজমকে 'মুরজিয়া' সাব্যস্ত করেন এবং ক্ষুব্ধভাবে তাঁর সমালোচনা করেন।³⁹⁹ ইমাম ইবনে হিব্বান লিখেন, 'তিনি ইরজা (তথা মুরজিয়া মাযহাব)-এর দিকে দাওয়াত দিতেন।⁴⁰⁰ এভাবে এসব ইমাম তাদের হাদিসের গ্রন্থগুলোতে বিশুদ্ধতার সর্বোচ্চ মাত্রা সংরক্ষণের চেষ্টা করলেও ইমাম আজমের সমালোচনার ক্ষেত্রে সনদ কিংবা বিশুদ্ধতার প্রতি ন্যূনতম লক্ষ রাখেননি। ফলে সত্য-মিথ্যা বর্ণনা তুলে ধরেছেন নির্বিচারে।
এসব অভিযোগের একটি জবাব এভাবে দেওয়া যেতে পারে যে, তাত্ত্বিক সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে ইমাম আজম রহ.-এর সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য থাকার কারণে শাব্দিক অর্থের দিকে লক্ষ করে তারা তাকে মুরজিয়া বলেছেন। যদি এমন ব্যাখ্যা করা হয়, তবে সেটাকে অন্যায় বলার সুযোগ নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলো, তাদের কেউ কেউ ইতিবাচক অর্থে নয়, বরং নেতিবাচক তথা বিদআতি অর্থেই ইমামকে মুরজিয়া বলেছেন! ফলে এক্ষেত্রে ইনসাফ ধরে রাখতে পারেননি। বরং ইমামের মতকে জাহমিয়্যাহ ও কাররামিয়্যাহদের মতো বিদআতি মতাদর্শ আখ্যা দিয়ে তাকেও পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছেন! ইমাম আজমের নামে বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ যাচাই-বাছাই ছাড়া তাদের গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। যেমন—ইবনে হিব্বান ইমামের বক্তব্যকে 'বিদআত' আখ্যা দিয়ে তাকে বিদআতের দিকে আহ্বানকারী বলেছেন।⁴⁰¹ আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করুন। ইমাম আজম এ ধরনের অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
ইমাম আবুল হাসান আশআরিও (আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন) ইমাম আজমের উপর একাধিক ভিত্তিহীন অভিযোগ আরোপ করেছেন। অন্ততপক্ষে সেগুলো নিজ গ্রন্থে মন্তব্যহীনভাবে উল্লেখ করেছেন যা তার সম্মতির পরিচায়ক হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি ইমামের উপর 'কুরআন মাখলুক' (সৃষ্ট) বলার অভিযোগ করেছেন, যেমনটা সামনে দেখব। তিনি ইমামের উপর 'ইরজা'র অভিযোগও দিয়েছেন এবং এক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যা বর্ণনার মাঝে ফারাক করেননি। হকপন্থিদের 'ইরজা' এবং বাতিল 'ইরজা'র মাঝে পার্থক্য করেননি। আশআরি লিখেন, '(মুরজিয়াদের) নবম ফিরকা হলো আবু হানিফা এবং তাঁর সঙ্গীরা। তাদের ধারণা, ঈমান হলো আল্লাহকে চেনা এবং মুখে স্বীকৃতি দেওয়া। একইভাবে রাসুলকে চেনা এবং তিনি যা-কিছু নিয়ে এসেছেন সংক্ষেপে সেগুলোর স্বীকৃতি দেওয়া। উমর ইবনে আবু উসমান আবু হানিফাকে মক্কায় জিজ্ঞাসা করেন, সে ব্যক্তির বিধান কী যে বিশ্বাস করে আল্লাহ শূকর হারাম করেছেন, কিন্তু সেটা পরিচিত শূকর কি না সে জানে না! তিনি বললেন, সে মুমিন! উমর জিজ্ঞাসা করেন, সে ব্যক্তির বিধান কী যে বিশ্বাস করে আল্লাহ কাবার হজ ফরয করেছেন, কিন্তু সে মক্কার কাবার ব্যাপারে নিশ্চিত নয়, বরং অন্য কোথাও কাবা হতে পারে। আবু হানিফা বললেন, সেও মুমিন! উমর জিজ্ঞাসা করলেন, যদি কেউ বলে, আমি মুহাম্মাদ (সা.)-কে আল্লাহর রাসুল মানি, কিন্তু তিনি আফ্রিকানও হতে পারেন! আবু হানিফা বললেন, সেও মুমিন।⁴⁰২
আমরা পিছনে দেখেছি, আবু হানিফা ও হানাফিদের কাছে ঈমান কেবল চেনা নয়, বরং অন্তরে সত্যায়ন করা এবং মুখে স্বীকৃতি দেওয়া দুটোই। পাশাপাশি আমল তাত্ত্বিকভাবে ঈমানের অংশ না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য ফল। এ সম্পর্কিত বক্তব্যে ইমামের আকিদার গ্রন্থগুলো ভরপুর। উপরন্তু উপরের ঘটনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ঐতিহাসিক কোনো প্রমাণ নেই। নির্ভরযোগ্য সনদ নেই। বরং সনদ দ্বারা প্রমাণিত হলেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এসব বাজে কথা ইমাম আবু হানিফা এবং হানাফি মাযহাবের উসুল (তথা মূলনীতির) সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইমামের মাযহাব অনুযায়ী উক্ত ব্যক্তি নিঃসন্দেহে কাফের। বরং ইবনে আবিল আওয়াম বর্ণনা করেন, আবু ইউসুফ ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কাবা ছাড়া অন্য কোনো দিকে ফিরে নামায পড়ে, ঘটনাক্রমে সেটা কাবার দিকে হয়ে গেলেও উক্ত ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে।⁴⁰³ কারণ, সে কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধান অস্বীকার করেছে।
বেদনাদায়ক ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, পরবর্তীকালে সময় যত গিয়েছে, ইমামের উপর আহলে সুন্নাতের অন্তর্গত তাঁর প্রতিপক্ষের আক্রমণ তত বেড়েছে। বরং তারা ইমামকে স্রেফ মুরজিয়া বলেই ক্ষান্ত হননি, এটার 'ইলযাম' (দাবি) দাঁড় করিয়ে তাঁর ব্যাপারে এমন অনেক বিষয় বর্ণনা করেছেন, যা শুনলে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। তাঁর মুখে এমন অনেক বক্তব্য চালিয়ে দিয়েছেন, যা ইমাম তো দূরের কথা, কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বলতে পারে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছেন আবু বকর খতিবে বাগদাদি তার 'তারিখে বাগদাদ' এবং ইমাম আহমদ পুত্র আবদুল্লাহ তাঁর 'আস-সুন্নাহ' গ্রন্থে। তাদের সঙ্গে আছেন ইবনে হিব্বান এবং ইবনে আদি প্রমুখ। তারা বিভিন্ন লোকের বরাতে ইমাম আজমের নামে শত শত পৃষ্ঠা কুৎসা লিখেছেন। তাঁর উপর এমন জঘন্য অপবাদ আরোপ করেছেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত কেউ কারও নামে করেনি! এগুলোতে এসেছে, ইমাম নাকি বলেছেন, যদি কেউ আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে জুতা-স্যান্ডেলের পূজা করে, তাতেও সমস্যা নেই।⁴⁰৪ আরও এসেছে, ইমাম নাকি বলেছেন, যদি কেউ তাঁর বাবাকে হত্যা করে তার খুলির মাঝে মদ পান করে, মাকে বিবাহ করে নেয়, তবুও নাকি ইমাম তাকে মুমিন বলেন।⁴⁰৫ অন্যত্র তার নামে বলা হয়েছে, তিনি নাকি বলেছেন, যদি কেউ অন্তর দ্বারা আল্লাহকে চেনে, কিন্তু জুতার পূজা করে, তবুও সে মুমিন।⁴⁰৬ আরেকজনের মতে, তিনি বলেছেন, আবু বকরের ঈমান আর ইবলিসের ঈমান এক।⁴⁰⁷
নাউযুবিল্লাহ! ইমামকে মুরজিয়া সাজাতে এভাবে একশ্রেণির লোক কতটা নিচে নেমেছিল সেটা এসব বর্ণনা থেকে সহজেই অনুমেয়। তাদের কাছে ইমামের 'অপরাধ' ছিল তিনি আমলকে ঈমানের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করতেন না। ফলে পৃথিবীর সব কুৎসিত ও কুফরি কাজ করেও তার মাযহাব অনুযায়ী কেউ মুমিন থাকবে—সেটা প্রমাণের জন্য এবং নিজেদের মাযহাবকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে তারা ইমামের নামে এসব মিথ্যাচার করেছেন। অথচ ইমামের মাযহাব না থাকলে আমলের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতিতে লিপ্ত পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিমকে কাফের বলতে হতো।⁴⁰⁸ যে মানুষটার রাতের সিজদার কান্নার আওয়াজ শুনে আশপাশের প্রতিবেশীদের মায়া হতো,⁴⁰⁹ তাঁর নামে এমন জঘন্য মতাদর্শ প্রচার কারও বিবেকে বাধল না!
টিকাঃ
৩৯৬. আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, আবদুল করিম শাহরাস্তানি (১/১৪১)।
৩৯৭. রিসালাতু আবি হানিফা ইলা উসমান আল-বাত্তি (৩৪-৩৮)।
৩৯৮. দেখুন : আত-তারিখুল কাবির (৮/৮১)।
৩৯৯. দেখুন: কিতাবুত তাময়িয (২৩)।
৪০০. দেখুন: আল-মাজরূহিন (১১২৫ নং জীবনী)।
৪০১. পূর্বোক্ত সূত্র দেখুন।
৪০২. মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, আশআরি (১/১১৯)। খতিবও তারিখে বাগদাদে উক্ত বক্তব্য নকল করেছেন (১৫/৫০৭)।
৪০৩. ফাযায়িলু আবি হানিফা (৩৬৯)।
৪০৪. খতিবে বাগদাদি (১৫/৫০৯)।
৪০৫. প্রাগুক্ত (১৫/৫১০)।
৪০৬. প্রাগুক্ত (১৫/৫১০)।
৪০৭. আল-মুনতাযাম, ইবনুল জাওযি (৮/১৩৩)।
৪০৮. এসব মিথ্যাচার ও প্রলাপের ইলমি খণ্ডন পড়ুন আবু মুজাফফর ঈসা (আল-মালিকুল মুআজজাম)-এর 'আর-রাদ্দু আলা আবি বকর খতিব আল-বাগদাদি', আবদুল হাই লাখনৌভির 'আর-রাফউ ওয়াত-তাকমিল' এবং আল্লামা কাওসারির 'তানিবুল খতিব' গ্রন্থে।
৪০৯. আল-খাইরাতুল হিসান (৯৬)।
📄 আবদুল কাদের জিলানি ইমাম আজমকে মুরজিয়া বলেননি
প্রশ্ন হতে পারে, শায়খ আবদুল কাদের জিলানি 'আল-গুনইয়া' গ্রন্থে আবু হানিফা রহ.-কে মুরজিয়া বলেছেন। সুতরাং তাকে মুরজিয়া বলা ভুল হবে কেন? প্রথমে আমরা শায়খের বক্তব্য দেখব, এর পর সেটার উপর আমাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরব।
শায়খ জিলানি আল-গুনইয়াতে মুরজিয়াদের বিভিন্ন ফিরকার ব্যাপারে আলোচনার সময় বলেন, (মুরজিয়াদের) 'আরেকটি ফিরকা হলো হানাফিয়্যাহ। আবু হানিফা নুমান ইবনে সাবেতের শিষ্য-অনুসারীরা। তাদের মতে, ঈমান হলো স্রেফ জানা (মারেফাত) এবং আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-কিছু নিয়ে এসেছেন সেটার সামগ্রিক স্বীকৃতি দেওয়া' (الإيمان هو المعرفة والإقرار بالله ورসوله وبما جاء من عنده جملة)।⁴¹⁹
উপরের বক্তব্যটি বারাহুতি নামক অখ্যাত-অজ্ঞাত এক ব্যক্তির 'আশ-শাজারাহ' নামক কিতাব থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ উক্ত লেখক এবং এমন বইয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। এমন অজ্ঞাত লেখক ও লেখার উপর নির্ভর করে এ ধরনের স্পর্শকাতর একটি বক্তব্য দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? তাই অধমের ধারণা, শায়খ আবদুল কাদের জিলানি রহ. এ ধরনের বক্তব্য দেননি; বরং এটা তার বক্তব্য বিকৃত করে পরবর্তীকালে অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে। এ কারণে আমাদের হাতে বিদ্যমান আল-গুনইয়ার কোনো কোনো নুসখাতে আলোচ্য জায়গার পুরো বক্তব্যটা থাকলেও কেবল হানাফিদের জায়গায় 'গাসসানিয়্যাহ' নামটি রয়েছে আর আবু হানিফার জায়গায় 'গাসসান কুফি'র নাম রয়েছে।⁴²⁰ এটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ, গাসসানিয়্যাহদের মুরজিয়া হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই এবং উপর্যুক্ত আকিদা তাদেরই আকিদা, ইমাম আজমের নয়। ইমাম আজম কখনোই ঈমানকে স্রেফ মারিফাত (জানা) বলেননি।
তর্কের খাতিরে যদি এটা শায়খ জিলানির বক্তব্য হিসেবে মেনে নেওয়াও হয়, তবে এর একটি জোরালো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এই যে, গাসসানিয়্যাহরা যেহেতু ইমাম আজমের অনুসারী 'হানাফি' দাবিদার ছিল এবং তারা এসব ভ্রান্ত আকিদা ইমামের নামে প্রচার করত, এ জন্য জিলানি রহ. তাদের 'হানাফি' শব্দে ব্যক্ত করেছেন; ইমাম আবু হানিফা কিংবা সাধারণ হানাফিরা উদ্দেশ্য নয়। কারণ, খোদ জিলানি রহ. উক্ত গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গাতে ইমামদের মতভেদ নিয়ে আলোচনাপ্রসঙ্গে তিনি ইমামের পাশাপাশি ইমাম আজমের নাম উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর শানে বিভিন্ন জায়গায় 'ইমাম আজম' শব্দ ব্যবহার করেছেন। যদি তিনি ইমামকে ভ্রান্ত মুরজিয়া মনে করতেন, তবে তাঁর ব্যাপারে সম্মানসূচক 'ইমাম আজম' শব্দ ব্যবহার করতেন না। ফলে উক্ত নুসখার বর্ণনা সঠিক ধরা হলেও তিনি এখানে ইমাম আজমের সমালোচনা করেননি, বরং হানাফি পরিচয় দেওয়া একদল ভ্রান্ত মুরজিয়ার সমালোচনা করেছেন।
টিকাঃ
৪১৯. দেখুন: আল-গুনইয়াহ, জিলানি (৮০) [আল-মাতবাআতুল মিসরিয়্যাহ]।
৪২০. দেখুন: আল-গুনইয়াহ, জিলানি (১/১৮৬) [দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ]।