📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অধমের পর্যবেক্ষণ

📄 অধমের পর্যবেক্ষণ


বাস্তবতা হলো, এটাও একটা তাত্ত্বিক মতপার্থক্য। ফলে আহলে সুন্নাতের অন্যান্য ইমামের মতো হানাফি ইমামগণও নাকচ করেননি। তাদের মতে, যদি কেউ বলে, 'আমি আগামীকাল মুমিন হব, ইনশাআল্লাহ', অথবা 'আমি মুমিন অবস্থায় মারা যাব, ইনশাআল্লাহ', অথবা 'আল্লাহর কাছে আমার ঈমান কবুল হবে, ইনশাআল্লাহ।'—এটা কেবল বৈধই নয়, বরং উত্তম। কারণ, 'ইনশাআল্লাহ'টা তখন মূল ঈমানের ক্ষেত্রে নয়; বরং ঈমানের উপর অটল ও অবিচল থাকার ক্ষেত্রে হচ্ছে। এটা আহলে সুন্নাতের অন্য ইমামগণের বক্তব্যেরও সারবত্তা। ফলে এক্ষেত্রে কোনো বিরোধ থাকল না।³⁷৮

বিভিন্ন আলেম এই মতবিরোধ মৌলিক না হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আবু হাফস লিখেন, “কেউ যদি বলে, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ'কে কোন অর্থে নিচ্ছে সেটা দেখতে হবে। সে যদি বলে, 'গতকাল আমি মুমিন ছিলাম, ইনশাআল্লাহ।'-এটা অর্থহীন বক্তব্য। আর যদি বলে, 'বর্তমানে মুমিন আছি, ইনশাআল্লাহ', তবে এটা সন্দেহ। আর যদি ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য করে বলে, 'আগামীকালও মুমিন থাকব, ইনশাআল্লাহ', তবে এ ধরনের ইনশাআল্লাহ বৈধ হবে।”³⁷৯

আবু ইসহাক সাফফার লিখেন, “ঈমানের ক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' বলা যাবে না; বরং পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেকে মুমিন ঘোষণা করতে হবে। হ্যাঁ, যদি কেউ ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য করে শেষ পরিণতি বিবেচনায় 'ইনশাআল্লাহ' বলে, সেটা বৈধ হবে।”³⁸⁰

আবু শাকুর সালেমি লিখেন, 'ইমাম আবু হানিফার বিশুদ্ধ মাযহাব হলো, মানুষ ও ফেরেশতাদের দিক বিবেচনায় ইনশাআল্লাহ বলা যাবে না। কিন্তু লাওহে মাহফুজ এবং আল্লাহর জ্ঞানে কী বিদ্যমান সেটা অজ্ঞাত থাকার কারণে ইনশাআল্লাহ বলা যাবে।'³⁸¹

কামাল ইবনুল হুমাম বলেন, “কোনো মুসলিম সন্দেহবশত 'ইনশাআল্লাহ, আমি মুমিন'-এমন বলতে পারে না। বরং মৃত্যুর অবস্থার দিকে তাকিয়ে 'ইনশাআল্লাহ' বলতে পারে।”³⁸²

আলি কারি লিখেন, 'যদি কেউ সন্দেহবশত 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ’ বলে, তবে সে নিশ্চিত কাফের। আর যদি আল্লাহর প্রতি আদব দেখিয়ে, সবকিছু আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে, ভবিষ্যতে কী হবে সে ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে অথবা আল্লাহর নামের বরকত নিতে কিংবা আত্মতুষ্টি ও নিজের ব্যাপারে নিজে বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দেওয়া থেকে মুক্ত থাকাসহ বিভিন্ন কারণে 'ইনশাআল্লাহ' বলে, তবে সমস্যা নেই। কিন্তু তবুও না বলাই ভালো। কারণ, তাতে—তাদের মতে—সন্দেহের অবকাশ থাকে। এ কারণে 'তামহিদ' ও 'কিফায়াহ' গ্রন্থকার এ ধরনের বক্তব্যকে কুফর বলেছেন। অনেকে হারাম বলেছেন। তাদের যুক্তি—'আমি জীবিত, ইনশাআল্লাহ', 'আমি পুরুষ, ইনশাআল্লাহ।'-এ ধরনের বক্তব্য যেমন অর্থহীন, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ' বলাও অর্থহীন। তাই ঈমানের ক্ষেত্রে অর্থহীন বক্তব্য পরিহার করা আবশ্যক। তবে তাদের কেউ কেউ এটাও বলেছেন, এখানে কুফরের কোনো কারণ নেই। বরং অনেক সালাফ-সাহাবা-তাবেয়িন এভাবে বলা বৈধ বলেছেন। ইমাম শাফেয়ি এবং তাঁর শাগরেদদের থেকে এমন বর্ণনা পাওয়া যায়। কারণ, একদিকে যেমন বিনয়ের কারণে এটা বলা যায়, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞতার ভিত্তিতেও বলা যায়।³⁸৩

ফলে দেখা যাচ্ছে, হানাফি উলামায়ে কেরামের কাছে যদিও স্বাভাবিকভাবে 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ'-এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু তারা এটাকে সম্পূর্ণরূপে নাকচ করেন না। সন্দেহমূলক হলে নাকচ করেন। বিপরীতে (আল্লাহ নামের) বরকত গ্রহণ বা শেষ পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা অন্যান্য প্রেক্ষিতে তাদের মতেও 'ইনশাআল্লাহ' বলা 'উত্তম' না হলেও বৈধ ও অনুমোদিত। বরং হানাফিদের কেউ কেউ 'ইনশাআল্লাহ' বলা উত্তমও বলেন।

জামালুদ্দিন গযনবি লিখেন, “যদি কেউ—আমি মুমিন ইনশাআল্লাহ—বলতে 'আমি মুমিন অবস্থায় মারা যাব, ইনশাআল্লাহ' বলে, তবে তার ঈমান গ্রহণযোগ্য, বরং এটা অধিকতর সুন্দর। কেননা, শেষ পরিণতির ব্যাপারে প্রত্যেক মুমিনকে ভয় ও আশার মাঝে থাকা উচিত। আর এটা জানা নেই যে, শেষ পরিণতি ঈমান নাকি কুফরের উপর হবে। এদিকে লক্ষ করে 'ইনশাআল্লাহ' বলা বরং জরুরি।”³⁸⁴

যেমনটা পিছনে বলা হয়েছে, অন্যান্য ইমাম ও মুহাদ্দিসের মতামতও তা-ই। তারাও মূলত 'ইনশাআল্লাহ' বলেন আত্মতুষ্টি থেকে দূরে থাকতে, শেষ পরিণতির প্রতি লক্ষ করে। সন্দেহমূলক 'ইনশাআল্লাহ' বলা তাদের কাছেও নিষিদ্ধ।

ইমাম আজমের পৌত্র উমর ইবনে হাম্মাদ ইমাম মালেক রহ.-কে বলেন, ইমাম আজম ঈমানের ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহের পক্ষপাতী ছিলেন না, বরং সন্দেহ করাকে বিচ্যুতি মনে করতেন। মালেক বললেন, 'কোন ধরনের সন্দেহ?' উমর বললেন, একদল লোক আছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনে। এর পর বিভিন্ন গুনাহ করার পরে ভাবে সম্ভবত তারা ঈমান থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। তাই যখন কেউ তাদের জিজ্ঞাসা করে, তুমি কি মুমিন? তারা বলে, ইনশাআল্লাহ। এটাকে তিনি অপছন্দ করতেন।³⁸৫

টিকাঃ
৩৭৮. দেখুন: আল-জাওহারাতুল মুনিফাহ, মোল্লা হুসাইন হানাফি (৫৬)।
৩৭৯. আস-সাওয়াদুল আজম (২, ৬-৭)।
৩৮০. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭১৮-৭২১)।
৩৮১. আত-তামহিদ (১১৩)।
৩৮২, ফাতহুল কাদির (১/৪৩৬; ৩/২৩১)।
৩৮৩. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (১২৭)।
৩৮৪. উসুলুদ্দিন, গযনবি (২৬৪)।
৩৮৫. দেখুন: আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১১৩-১১৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00