📄 উলামায়ে কেরামের মাযহাব
সূচনা যেভাবেই হোক, ধীরে ধীরে এই বিতর্ক সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। মুরজিয়া ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় 'ইনশাআল্লাহ' বলাকে হারাম মনে করে। বিপরীতে কুল্লাবিয়্যাহ সম্প্রদায় 'ইনশাআল্লাহ' বলা আবশ্যক (ওয়াজিব) করে দেয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, পরবর্তী সময়ে খোদ আহলে সুন্নাতের ইমামগণ নিজেরা পারস্পরিক মতভেদে জড়িয়ে পড়েন। একদল বলেন, 'আমি মুমিন ইনশাআল্লাহ', আরেক দল ইনশাআল্লাহ ছাড়া স্রেফ 'আমি মুমিন' বলাকে উত্তম মনে করেন। এই অর্থহীন বিতর্কের অনেক কুফল ছিল। অন্যতম হলো, আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারার মাঝে দূরত্ব তৈরি হওয়া, উম্মাহর ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হওয়া। আজও তা সমান তবিয়তে এবং সমান কুফল নিয়ে বহাল রয়েছে।
মোটকথা, একদল ফকিহ ও মুহাদ্দিসের দৃষ্টিতে ঈমানের ক্ষেত্রে ইস্তিসনা তথা 'আমি মুমিন ইনশাআল্লাহ' বলা বৈধ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি ইয়াহইয়া ইবনে সাইদকে বলতে শুনেছি, 'আমরা সকল আলেমকে ইস্তিসনা করতে দেখেছি'।”³⁶¹ আলকামাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি কি মুমিন? তিনি বললেন, 'আশা করি, ইনশাআল্লাহ।'³⁶² আবুল হাসান আশআরিও ইস্তিসনার পক্ষে ছিলেন।³⁶³
টিকাঃ
৩৬১. আশ-শরিয়াহ, আজুররি (২/৬৬০)।
৩৬২. আল-ঈমান, আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম (৩৮)।
৩৬৩. দেখুন: আর-রাওযাতুল বাহিয়্যাহ, আবু আযবাহ (৬)।
📄 ইমাম আজমের মাযহাব
বিপরীতে ইমাম আজমসহ একদল আলেমের মত হলো এক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' পরিত্যাগ করা। ইমাম রহ. মনে করেন প্রত্যেকে বলবে, 'আমি অবশ্যই মুমিন।' ঈমান নিয়ে সন্দেহ করবে না। কারও আমলে ত্রুটি থাকলেও সে অবশ্যই মুমিন। কারণ, ঈমানের ক্ষেত্রে তার কোনো সন্দেহ নেই। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন হারেসা রাযি.-কে প্রশ্ন করলেন, কীভাবে সকাল করেছ? তিনি বললেন, অবশ্যই মুমিন হিসেবে...। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, যদি কারও এমন ব্যক্তি দেখতে মন চায় যার অন্তঃকরণকে আল্লাহর নুর পূর্ণ করে দিয়েছেন, সে যেন হারেসাকে দেখে।³⁶⁴
ইমাম আজম বলেন, “কুফরের মাঝে যেমন কোনো সন্দেহের জায়গা নেই, ঈমানের মাঝেও তেমন সন্দেহের জায়গা নেই। বরং যে মুমিন, সে প্রকৃত অর্থেই নিঃসন্দেহে মুমিন। আবার যে কাফের, সে প্রকৃত অর্থেই নিঃসন্দেহে কাফের, যেমনটা আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, أُوْلَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا অর্থ : 'তারাই প্রকৃত মুমিন।' [আনফাল : ৭৪] আবার তিনি বলেন, أُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا : 'তারাই প্রকৃত কাফের।' [নিসা : ১৫১] ফলে তাওহিদ ও রাসুলুল্লাহর রিসালাতের অনুসারীদের মাঝে যারা গুনাহগার, তারা (গুনাহ সত্ত্বেও) নিঃসন্দেহে মুমিন। তারা সন্দেহাতীতভাবেই কুফর থেকে মুক্ত।”³⁶⁵
ইমাম আজম বলেন, “যদি কেউ বলে, 'আমি মুমিন ইনশাআল্লাহ', তবে তাকে বলা হবে, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَসَلِّمُوا تَسْلِيمًا অর্থ : 'আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবির প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ, তোমরা নবির জন্য রহমতের দোয়া করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো।' [আহযাব: ৫৬] সুতরাং তুমি যদি মুমিন হয়ে থাকো, তবে তাঁর উপর সালাম পাঠ করো। আর যদি মুমিন না হয়ে থাকো, তবে সালাম পাঠের দরকার নেই। একইভাবে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا নূদীয়ালি লিস সালাতি মিঁই ইয়াওমিল জুমুয়াতি ফাসআও ইলা জিকরিল্লাহি ওয়া জারুল বাইআ জালিলিকুম খাইরুল লাকুম ইন কুনতুম তালামুন অর্থ : 'হে মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন নামাযের আযান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত ছুটে যাও এবং বেচাকেনা বন্ধ করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা অনুভব করো।' [জুমুআহ: ৯] সুতরাং তুমি যদি মুমিন হয়ে থাকো, তবে আযানের ডাকে সাড়া দাও। আর যদি মুমিন না হয়ে থাকো, তবে সাড়া দেওয়ার দরকার নেই।”³⁶⁶
কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায়ের একটি দল ইমাম আজমের কাছে এসে বলল, আপনি কি মুমিন? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ'। তারা বলল, আপনি কি আল্লাহর কাছেও মুমিন (মানে আপনি যে নিশ্চিত মুমিন সেটা জানলেন কী করে)? তিনি বললেন, 'তোমরা কি আমার জানার থাকা কথা জানতে চাইছ, নাকি আল্লাহর কাছে যেটা আছে সেটা?' তারা বলল, আপনার যেটা জানা সেটা বলুন, আল্লাহরটা নয়। তিনি বললেন, 'আমি যেটা জানি সেটা হলো, আমি মুমিন। আল্লাহর কাছে কী আছে সেটা আমার জানা দরকার নেই।'³⁶⁷
ইমাম আজমের মতো সকল হানাফি আলেমের মত ইমাম আজমের মতোই। এ ব্যাপারে তাদের মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই। ফলে তাদের মতে, 'আমি মুমিন ইনশাআল্লাহ'—এ ধরনের কথা বিশুদ্ধ নয়; বরং 'আমি মুমিন' অথবা 'আমি অবশ্যই মুমিন'—এভাবে বলতে হবে। উক্ত মতের সমর্থনে তারা একাধিক দলিল পেশ করেন:
এক. ঈমানের মাঝে কোনো সন্দেহ-সংশয় বৈধ নয়। ঈমান হলো সুদৃঢ় বিশ্বাস এবং দ্ব্যর্থহীন স্বীকৃতির নাম, আর 'ইনশাআল্লাহ' সেই দৃঢ়তার প্রতিবন্ধক। কারণ, 'ইনশাআল্লাহ' বলা বর্তমানে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণতা বোঝায়। এটা ভবিষ্যতের প্রতি ঈঙ্গিতবাহী। আল্লাহর ইচ্ছা আছে কি নেই সেটা বান্দার জানার উপায় নেই। তা ছাড়া, এটা বান্দার দায়িত্বও নয়। বান্দার দায়িত্ব হচ্ছে নিজের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ও সন্দেহাতীত ঘোষণা করা। ইমাম মাতুরিদি বলেন, “আমাদের মূলনীতি হলো সন্দেহাতীতভাবে ঈমানের সাক্ষ্য দেওয়া, 'ইস্তিসনা' পরিত্যাগ করা। কেননা, ঈমান পূর্ণ হওয়ার জন্য যেসব বিষয়ে বিশ্বাস রাখা জরুরি, সেখান থেকে কোনো জিনিস আলাদা (ইস্তিসনা) করলে ঈমান পূর্ণই হয় না। ফলে ঈমানের ক্ষেত্রে ইস্তিসনার উদাহরণ হবে এমন বলা যে, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, ইনশাআল্লাহ', অথবা 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, ইনশাআল্লাহ।' অথচ এটা কেউ বলবে না। ফলে 'ইস্তিসনা' না করা আহলে সুন্নাতের আকিদা। বিপরীত আকিদা রাখে মুতাযিলা, খাওয়ারেজ ও হাশাবিয়্যাহ সম্প্রদায়। তারা ঈমানের ক্ষেত্রে ইস্তিসনা করে।”
দুই. কুরআন দ্বারাও ঈমানের ক্ষেত্রে 'ইস্তিসনা' পরিত্যাগ সাব্যস্ত হয়। কারণ, কুরআনের কোথাও আমরা ঈমানের ক্ষেত্রে ইস্তিসনা (তথা ইনশাআল্লাহ) বলার প্রমাণ পাই না। আল্লাহ তায়ালা যখন ইবরাহিম আ.-কে বললেন, রব্বুহু আসলিম ক্বলা আসলামতু লিরব্বিল আলামিন অর্থাৎ, 'তুমি আত্মসমর্পণ করো। তিনি বললেন, আমি বিশ্বজগতের পালনকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।' [বাকারা : ১৩১] তিনি ইনশাআল্লাহ বলেননি। একইভাবে ফিরাউনের যাদুকরদের ঈমান আনার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ক্বলা আমান্না বিরব্বিল আলামিন অর্থাৎ, 'তারা বলল, আমরা বিশ্বজগতের পালনকর্তার উপর ঈমান আনলাম।' [আরাফ : ১২১] এখানেও 'ইনশাআল্লাহ' নেই। আল্লাহ অন্যত্র মুমিনদের ব্যাপারে বলেন, ওয়াল্লাজিনা আমানু ওয়া হাজারু ওয়া জাহাদু ফি সাবিলিল্লাহি ওয়াল্লাজিনা আওউ ওয়া নাসারু উলাইকা হুমুল মুমিনুনা হাক্বক্ব লাহুম মাগফিরাতু ওয়া রিজকুন কারিম : 'যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে আর যারা আশ্রয় দান করেছে এবং সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন; তাদের জন্য ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা রয়েছে।' [আনফাল : ৭৪] কাফেরদের ব্যাপারেও বলেন, উলাইকা হুমুল কাফিরুনা হাক্বক্ব ওয়া আতাদনা লিল কাফিরিনা আজাবাম মুহিনা কাফের এবং কাফেরদের জন্য আমি লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি।' [নিসা : ১৫১] বিপরীতে মুনাফিকদের ব্যাপারে বলেন, মুজাবজাবিনা বাইনা জালিকা লা ইলা হাউলা ওয়া লা ইলা হাউলা ওয়া মাই ইউদলিলিল্লাহু ফালান তাজিদা লাহু সাবিলা অর্থ : 'তারা দোটানায় দোদুল্যমান—না এদের দিকে, না ওদের দিকে। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন আপনি তার জন্য কখনো কোনো পথ পাবেন না।' [নিসা : ১৪৩] চতুর্থ কোনো পর্যায় নেই। সুতরাং ঈমানের ক্ষেত্রে ইস্তিসনা (ইনশাআল্লাহ বলা) যাবে না। হ্যাঁ, জাগতিক বিষয়ে ইনশাআল্লাহ বলা যাবে, কিন্তু ঈমানের ক্ষেত্রে নয়। কারণ, ঈমানের ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ-দোদুল্যমানতা বৈধ নয়। এটা নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করতে হয়।
তিন. খোদ সাহাবাদের মানহাজ হলো ঈমানের ক্ষেত্রে 'ইস্তিসনা' তথা ইনশাআল্লাহ বলা পরিত্যাগ করা। সাহাবাগণ যেটা করেননি, সেটা করা নিষ্প্রয়োজন; বরং সেটা পরিত্যাজ্য, যেমন ইবনে আব্বাস রাযি.-এর ঘটনা। একব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের কাছে এসে বলল, ইবনে আব্বাস, আমি কি বলব, 'আমি সত্যিই মুমিন', নাকি বলব, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ'? ইবনে আব্বাস তাকে বললেন, তুমি কি আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে যা-কিছু এসেছে তাতে বিশ্বাস রাখো? সে বলল, হ্যাঁ। ইবনে আব্বাস বলেন, তাহলে বলবে, 'আমি সত্যিই মুমিন।' আবু হাফস বলেন, “এটাই যৌক্তিক। কেউ যদি তার দাসকে বলে, তুমি স্বাধীন ইনশাআল্লাহ, কিংবা কেনাবেচার সময় বলে, আমি ক্রেতা বা বিক্রেতা ইনশাআল্লাহ, তবে তাদের কোনো চুক্তি শুদ্ধ হবে না। একইভাবে যদি বলে, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ', তবে ঈমান শুদ্ধ হবে না।”
ইমাম আজম সূত্রে ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি একবার একটি বকরি যবাই দেওয়ার জন্য রাস্তায় বের হলেন। এক ব্যক্তিকে দেখে (যবাইয়ে সহায়তা চাওয়ার উদ্দেশ্যে) বললেন, 'তুমি কি মুমিন?' সে বলল, 'ইনশাআল্লাহ।' ইবনে উমর বললেন, 'যে তার ঈমানে সন্দেহ করে, তাকে দিয়ে যবাই দেওয়া যাবে না।' একটু পরে আরেক লোক এলে তাকে বলেন, 'তুমি কি মুমিন?' সে বলে, হ্যাঁ। তখন তিনি তাকে যবাইয়ের অনুমতি দেন। এর দ্বারা বোঝা যায়, ইবনে উমর ঈমানের ক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' বলাকে সন্দেহ হিসেবে দেখতেন।
সাফফার বলেন, 'সালাফের এই সুস্পষ্ট মাযহাবের কারণে যে ব্যক্তি ঈমানের ক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' বলত, ইমাম আজম রহ. তার পিছনে নামায পড়তেন না। সুফিয়ান সাওরি প্রথমে ইস্তিসনার কথা বললেও পরবর্তীকালে এ মত থেকে ইমামের মতে ফিরে আসেন। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলতেন, 'যে ব্যক্তি ঈমানের ক্ষেত্রে সন্দেহ করবে (অর্থাৎ ইনশাআল্লাহ বলবে), সে মুমিন নয়।'³⁷²
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি প্রথমে 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ' বলতেন। পরবর্তীকালে ঈমানের ক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' বলা পরিত্যাগ করেন। তাকে একব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে মানুষ তিন ভাগে বিভক্ত ছিল—ভিতরে ও বাইরে মুমিন, ভিতরে ও বাইরে কাফের, বাইরে মুমিন ভিতরে কাফের (তথা মুনাফিক)—এ কথা আপনি জানেন কি? ইবনে মাসউদ বললেন, 'হ্যাঁ, জানি।' লোকটি তাকে বলল, আমি আল্লাহর নামে জিজ্ঞাসা করছি, আপনি কোন দলে? তিনি বললেন, 'আমি ভিতরে ও বাইরে মুমিনদের দলে। আমি মুমিন (أنا مؤمن)।'
সাইদ ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণিত, উমর রাযি.-এর কাছে এ মর্মে সংবাদ গেল যে, শামের একব্যক্তি নিজেকে বলে, 'আমি মুমিন' (ইনশাআল্লাহ বলা ছাড়া)। উমর তাকে মদিনায় হাজির করার নির্দেশ দেন। উমরের সামনে এলে উমর তাকে বলেন, তুমি কি নিজেকে মুমিন দাবি করো? লোকটি বলল, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে তো মানুষ স্রেফ তিন গ্রুপে বিভক্ত ছিল। মুমিন, কাফের ও মুনাফিক। আল্লাহর শপথ! আমি কাফের নই, আমি মুনাফিকও নই। উমর জবাব শুনে খুশি হয়ে বললেন, 'তোমার হাতটা বাড়িয়ে দাও।'
তাবেয়ি ইবরাহিম আত-তাইমি (৯২ হি.) বলেন, "কেউ যদি বলে, 'আমি মুমিন' (ইনশাআল্লাহ ছাড়া), তবে কোনো ক্ষতি নেই। কারণ, সে যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ তাকে সত্য বলার জন্য শাস্তি দেবেন না নিশ্চয়ই। আর যদি মিথ্যা হয়ে থাকে, তবে কুফরের চেয়ে তো আর বেশি মারাত্মক না।”
ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তোমরা বিভ্রান্ত ও তর্কপ্রিয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিতর্ক করো না। চারটি বিষয় মনে রাখতে পারলে তোমরা এই উম্মতের প্রথম প্রজন্ম যে পথে ছিল সে পথে থাকতে পারবে: (এক.) তাকদিরের ভালোমন্দ সবকিছুতে বিশ্বাস রাখবে (দুই.) গুনাহের কারণে কোনো মুসলিমকে কাফের বলবে না (তিন.) নিজেদের ঈমানের মাঝে সন্দেহ করবে না (অর্থাৎ, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ' বলবে না) (চার.) আল্লাহর রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা করবে না।”
ইবনে হিব্বান (৩৫৪ হি.) তাঁর সহিহতে বলেন, অতীতের ক্ষেত্রে 'ইস্তিসনা' (তথা ইনশাআল্লাহ) বলার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতের কিছু ক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' বলা বৈধ, কিছু ক্ষেত্রে বৈধ নয়; বরং সেসব ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ বললে মানুষ কাফের হয়ে যাবে। যেমন—কাউকে জিজ্ঞাসা করা হলো: তুমি কি আল্লাহ, ফেরেশতা, নবি-রাসুল, কিতাব, জান্নাত-জাহান্নামে বিশ্বাসী? তখন জবাবে বলতে হবে : 'হ্যাঁ, আমি অবশ্যই বিশ্বাসী।' যদি বলে, 'ইনশাআল্লাহ, আমি বিশ্বাসী' তবে সেটা কুফর গণ্য হবে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, 'তুমি কি সেসব বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত যারা নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, সকল অর্থহীন কাজ থেকে দূরে থাকে?' তখন সে জবাবে বলতে পারে, 'ইনশাআল্লাহ, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত।' যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তুমি কি জান্নাতি? তখন জবাবে বলতে পারে, 'ইনশাআল্লাহ, আমি জান্নাতি।' ইবনে হিব্বানের উক্ত বক্তব্য মূলত ইমাম আজম রহ.-এর মাযহাবই। ফলে ইবনে হিব্বানও মনে করতেন, ঈমানের ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ বলা সন্দেহের মতো, যা বৈধ নয়। বিপরীতে ভবিষ্যৎ পরিণতির ব্যাপারে 'ইনশাআল্লাহ' বলা বৈধ।³⁷⁷
টিকাঃ
৩৬৪. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৬)। আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১১০)।
৩৬৫. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৩১)।
৩৬৬. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৬)।
৩৬৭. আল-ইনতিকা (৩১৬)।
৩৭২. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭১৮-৭২১)।
৩৭৭. সহিহ ইবনে হিব্বান (কিতাবুত তাহারাত: ১০৪৬ নং হাদিস সংশ্লিষ্ট আলোচনা)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
বাস্তবতা হলো, এটাও একটা তাত্ত্বিক মতপার্থক্য। ফলে আহলে সুন্নাতের অন্যান্য ইমামের মতো হানাফি ইমামগণও নাকচ করেননি। তাদের মতে, যদি কেউ বলে, 'আমি আগামীকাল মুমিন হব, ইনশাআল্লাহ', অথবা 'আমি মুমিন অবস্থায় মারা যাব, ইনশাআল্লাহ', অথবা 'আল্লাহর কাছে আমার ঈমান কবুল হবে, ইনশাআল্লাহ।'—এটা কেবল বৈধই নয়, বরং উত্তম। কারণ, 'ইনশাআল্লাহ'টা তখন মূল ঈমানের ক্ষেত্রে নয়; বরং ঈমানের উপর অটল ও অবিচল থাকার ক্ষেত্রে হচ্ছে। এটা আহলে সুন্নাতের অন্য ইমামগণের বক্তব্যেরও সারবত্তা। ফলে এক্ষেত্রে কোনো বিরোধ থাকল না।³⁷৮
বিভিন্ন আলেম এই মতবিরোধ মৌলিক না হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আবু হাফস লিখেন, “কেউ যদি বলে, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ'কে কোন অর্থে নিচ্ছে সেটা দেখতে হবে। সে যদি বলে, 'গতকাল আমি মুমিন ছিলাম, ইনশাআল্লাহ।'-এটা অর্থহীন বক্তব্য। আর যদি বলে, 'বর্তমানে মুমিন আছি, ইনশাআল্লাহ', তবে এটা সন্দেহ। আর যদি ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য করে বলে, 'আগামীকালও মুমিন থাকব, ইনশাআল্লাহ', তবে এ ধরনের ইনশাআল্লাহ বৈধ হবে।”³⁷৯
আবু ইসহাক সাফফার লিখেন, “ঈমানের ক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' বলা যাবে না; বরং পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেকে মুমিন ঘোষণা করতে হবে। হ্যাঁ, যদি কেউ ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য করে শেষ পরিণতি বিবেচনায় 'ইনশাআল্লাহ' বলে, সেটা বৈধ হবে।”³⁸⁰
আবু শাকুর সালেমি লিখেন, 'ইমাম আবু হানিফার বিশুদ্ধ মাযহাব হলো, মানুষ ও ফেরেশতাদের দিক বিবেচনায় ইনশাআল্লাহ বলা যাবে না। কিন্তু লাওহে মাহফুজ এবং আল্লাহর জ্ঞানে কী বিদ্যমান সেটা অজ্ঞাত থাকার কারণে ইনশাআল্লাহ বলা যাবে।'³⁸¹
কামাল ইবনুল হুমাম বলেন, “কোনো মুসলিম সন্দেহবশত 'ইনশাআল্লাহ, আমি মুমিন'-এমন বলতে পারে না। বরং মৃত্যুর অবস্থার দিকে তাকিয়ে 'ইনশাআল্লাহ' বলতে পারে।”³⁸²
আলি কারি লিখেন, 'যদি কেউ সন্দেহবশত 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ’ বলে, তবে সে নিশ্চিত কাফের। আর যদি আল্লাহর প্রতি আদব দেখিয়ে, সবকিছু আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে, ভবিষ্যতে কী হবে সে ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে অথবা আল্লাহর নামের বরকত নিতে কিংবা আত্মতুষ্টি ও নিজের ব্যাপারে নিজে বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দেওয়া থেকে মুক্ত থাকাসহ বিভিন্ন কারণে 'ইনশাআল্লাহ' বলে, তবে সমস্যা নেই। কিন্তু তবুও না বলাই ভালো। কারণ, তাতে—তাদের মতে—সন্দেহের অবকাশ থাকে। এ কারণে 'তামহিদ' ও 'কিফায়াহ' গ্রন্থকার এ ধরনের বক্তব্যকে কুফর বলেছেন। অনেকে হারাম বলেছেন। তাদের যুক্তি—'আমি জীবিত, ইনশাআল্লাহ', 'আমি পুরুষ, ইনশাআল্লাহ।'-এ ধরনের বক্তব্য যেমন অর্থহীন, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ' বলাও অর্থহীন। তাই ঈমানের ক্ষেত্রে অর্থহীন বক্তব্য পরিহার করা আবশ্যক। তবে তাদের কেউ কেউ এটাও বলেছেন, এখানে কুফরের কোনো কারণ নেই। বরং অনেক সালাফ-সাহাবা-তাবেয়িন এভাবে বলা বৈধ বলেছেন। ইমাম শাফেয়ি এবং তাঁর শাগরেদদের থেকে এমন বর্ণনা পাওয়া যায়। কারণ, একদিকে যেমন বিনয়ের কারণে এটা বলা যায়, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞতার ভিত্তিতেও বলা যায়।³⁸৩
ফলে দেখা যাচ্ছে, হানাফি উলামায়ে কেরামের কাছে যদিও স্বাভাবিকভাবে 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ'-এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু তারা এটাকে সম্পূর্ণরূপে নাকচ করেন না। সন্দেহমূলক হলে নাকচ করেন। বিপরীতে (আল্লাহ নামের) বরকত গ্রহণ বা শেষ পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা অন্যান্য প্রেক্ষিতে তাদের মতেও 'ইনশাআল্লাহ' বলা 'উত্তম' না হলেও বৈধ ও অনুমোদিত। বরং হানাফিদের কেউ কেউ 'ইনশাআল্লাহ' বলা উত্তমও বলেন।
জামালুদ্দিন গযনবি লিখেন, “যদি কেউ—আমি মুমিন ইনশাআল্লাহ—বলতে 'আমি মুমিন অবস্থায় মারা যাব, ইনশাআল্লাহ' বলে, তবে তার ঈমান গ্রহণযোগ্য, বরং এটা অধিকতর সুন্দর। কেননা, শেষ পরিণতির ব্যাপারে প্রত্যেক মুমিনকে ভয় ও আশার মাঝে থাকা উচিত। আর এটা জানা নেই যে, শেষ পরিণতি ঈমান নাকি কুফরের উপর হবে। এদিকে লক্ষ করে 'ইনশাআল্লাহ' বলা বরং জরুরি।”³⁸⁴
যেমনটা পিছনে বলা হয়েছে, অন্যান্য ইমাম ও মুহাদ্দিসের মতামতও তা-ই। তারাও মূলত 'ইনশাআল্লাহ' বলেন আত্মতুষ্টি থেকে দূরে থাকতে, শেষ পরিণতির প্রতি লক্ষ করে। সন্দেহমূলক 'ইনশাআল্লাহ' বলা তাদের কাছেও নিষিদ্ধ।
ইমাম আজমের পৌত্র উমর ইবনে হাম্মাদ ইমাম মালেক রহ.-কে বলেন, ইমাম আজম ঈমানের ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহের পক্ষপাতী ছিলেন না, বরং সন্দেহ করাকে বিচ্যুতি মনে করতেন। মালেক বললেন, 'কোন ধরনের সন্দেহ?' উমর বললেন, একদল লোক আছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনে। এর পর বিভিন্ন গুনাহ করার পরে ভাবে সম্ভবত তারা ঈমান থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। তাই যখন কেউ তাদের জিজ্ঞাসা করে, তুমি কি মুমিন? তারা বলে, ইনশাআল্লাহ। এটাকে তিনি অপছন্দ করতেন।³⁸৫
টিকাঃ
৩৭৮. দেখুন: আল-জাওহারাতুল মুনিফাহ, মোল্লা হুসাইন হানাফি (৫৬)।
৩৭৯. আস-সাওয়াদুল আজম (২, ৬-৭)।
৩৮০. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭১৮-৭২১)।
৩৮১. আত-তামহিদ (১১৩)।
৩৮২, ফাতহুল কাদির (১/৪৩৬; ৩/২৩১)।
৩৮৩. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (১২৭)।
৩৮৪. উসুলুদ্দিন, গযনবি (২৬৪)।
৩৮৫. দেখুন: আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১১৩-১১৪)।