📄 প্রথম পক্ষের খণ্ডন
সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম কুরআনের আয়াত- هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ وَلِلَّهِ جُنُودُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا অর্থ : 'তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন, তাদের ঈমানের সঙ্গে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর বাহিনীসমূহ আল্লাহরই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' [ফাতাহ : ৪] দিয়ে ঈমান বৃদ্ধির দলিল দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস, আলি, জাফর ইবনে মুহাম্মাদ, হাসান বসরি প্রমুখ থেকে এখানে ঈমানকে 'ইয়াকিন' অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কেউ এটাকে 'সত্যায়ন' অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। আর ইয়াকিন ও সত্যায়নের ক্ষেত্রে বেশকম হয়, ঈমানের ক্ষেত্রে হয় না।
তা ছাড়া, কুরআনের সবকিছু আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَسْتَلِ الْقَرْيَةَ الَّتِي كُنَّا فِيهَا এ আয়াতের শাব্দিক অর্থ 'যে জনপদে আমরা ছিলাম সে জনপদকে জিজ্ঞাসা করুন।' কিন্তু আমরা অর্থ নিচ্ছি 'জনপদবাসীকে জিজ্ঞাসা করুন'। একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী : وَاسْتَمَنْ فِي السَّمَاءِ এর শাব্দিক অর্থ : 'তোমরা কি যিনি আকাশে আছেন তাঁর থেকে নিরাপদ হয়ে গেছ?' [মুলক : ১৬] এখানে বাহ্যিক অর্থে বোঝা যায়, আল্লাহ আকাশের মাঝে আছেন। অথচ আল্লাহ আকাশের মাঝে অবস্থান থেকে পবিত্র।
একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী : وَأَرْسَلْنَا السَّمَاء عَلَيْهِم مِدْرَارًا এর শাব্দিক অর্থ হলো : 'আমি তাদের উপর আকাশকে মুষলধারে পাঠিয়েছি।' [আনআম : ৬] অথচ প্রকৃত অর্থ হলো, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করা, আকাশ পাঠানো নয়।
আল্লাহ তায়ালার বাণী : وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا এর শাব্দিক অর্থ হলো : 'মাথা জ্বলে সাদা হয়ে গেছে।' [মারইয়াম : ৪] অথচ বাস্তব অর্থ হলো, বার্ধক্যে মাথার চুল সধ্র হয়েছে। একইভাবে কুরআনে বর্ণিত 'ঈমান বৃদ্ধির' উদ্দিষ্ট মর্ম হলো ঈমানের জ্যোতি ও শক্তি বৃদ্ধি পাওয়া।
কেউ বলতে পারেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) একটি হাদিসে বলেছেন, 'যার অন্তরে এক দানা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।' অর্থাৎ, তাতে চিরস্থায়ী হবে না। এ হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, ঈমান কম হয়। আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করব, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' তথা কালিমার নিচে ঈমান আছে কি না? সে যদি বলে, না। আমরা বলব, কালিমা বড় নাকি একটি দানা বড়? অথচ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যদি কালিমাকে একটি পাল্লায় রাখা হয় আর সাত আকাশ ও সাত যমিন এক পাল্লায় রাখা হয়, তবে কালিমা ভারী হয়ে যাবে।' তাহলে বোঝা গেল, এখানে এক দানা বলতে আক্ষরিক পরিমাণ বোঝানো হয়নি। বরং একেবারে আমলহীন ও ন্যূনতম ঈমান বোঝানো হয়েছে।³⁴⁵
ইমাম রাযি বলেন, “মূল সত্যায়নের ক্ষেত্রে ঈমান বাড়ে-কমে না। কিন্তু ইয়াকিনের ক্ষেত্রে বাড়ে-কমে। কেননা, ইয়াকিনের ক্ষেত্রে ঈমানের স্তরভেদ স্বীকৃত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَىٰ قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِن ۖ قَالَ بَلَىٰ وَلَٰكِن لِّيَطْمَئِنَّ قَلْبِي অর্থ : যখন ইবরাহিম বললেন, হে আমার প্রতিপালক, কীভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন আমাকে দেখান। আল্লাহ বললেন, 'তুমি কি বিশ্বাস করো না?' তিনি বললেন, হ্যাঁ, করি; তবে এটা কেবল আমার চিত্তের প্রশান্তির জন্য।” [বাকারা : ২৬০] এখানে স্পষ্ট যে, 'ইলমুল ইয়াকিন' (জেনে বিশ্বাস)-এর স্তরের চেয়ে 'আইনুল ইয়াকিন' (দেখে বিশ্বাস) আরও ঊর্ধ্বে (ফলে ইয়াকিনের ক্ষেত্রে ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে; মূল ঈমানে নয়)।”³⁴⁶
টিকাঃ
৩৪৫. দেখুন: আস-সাওয়াদুল আজম (৫০)।
৩৪৬. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৭৭)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
বাস্তবতা হলো, এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহের সঙ্গে ইমাম আজম এবং হানাফি আলেমদের বিরোধ তাত্ত্বিক, মৌলিক নয়। অর্থাৎ, মৌলিকভাবে তাদের কাছেও মূল ঈমান বাড়ে না, বাড়ে আমলের নুর ও শক্তি। কারণ, ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো, যেগুলোতে বিশ্বাস করা ঈমানের জন্য অপরিহার্য, সেগুলোর কোনো একটাতেও যদি কেউ বিশ্বাস পরিত্যাগ করে, তবে তারাও এ কথা বলবেন না যে, তার ঈমান কমে যাবে। বরং বলবেন, সে কাফের হয়ে যাবে। আবার মুমিনদের কেউ এমন কোনো বিষয়ে বিশ্বাস রাখে না যাতে অন্য মুমিনরা না রাখে। উদাহরণস্বরূপ, যেসব মুহাদ্দিস ও ফকিহ ঈমান বৃদ্ধির প্রবক্তা, তারা এমন কোনো বিশেষ বিষয়ে ঈমান রাখেন না ইমাম আজম কিংবা তাঁর অনুসারীরা যাতে ঈমান না রাখেন! বরং প্রত্যেকেই সমান ও অভিন্ন বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস রাখেন, স্বীকৃতি দেন। ফলে মূলত ঈমানের ক্ষেত্রে হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে না। হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে ঈমানের নূর ও শক্তিতে। নবি-রাসুল, ওলি-আউলিয়া ও পুণ্যবানদের ঈমানে যে শক্তি ও নুর থাকে, সাধারণ মানুষ কিংবা গুনাহগারদের ঈমানে সে নুর ও শক্তি থাকে না! হিজরি সপ্তম শতাব্দের হানাফি আলেম রুকনুদ্দিন সমরকন্দি (৭০১ হি.) লিখেন, 'মাহিয়্যাতুল ঈমান' তথা মূল ঈমান বাড়ে বা কমে না। কিন্তু ঈমানের গুণাবলি ও নুর বাড়ে-কমে।³⁴⁷
বস্তুত সালাফের যেসব ইমাম ঈমান বাড়া ও কমার কথা বলেছেন, সেটা মূলত নস তথা কুরআন-সুন্নাহর বাহ্যিক ও আক্ষরিক বক্তব্যের প্রতি সম্মান দেখিয়ে। অর্থাৎ, কুরআন-সুন্নাহতে যেহেতু বাড়া ও কমার কথা বোঝা যায়, এ জন্য তারা বলেছেন। নতুবা মূল মর্মের ক্ষেত্রে তাদের মাযহাব আর ইমাম আজমের মাযহাবের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। অর্থাৎ, মূল ঈমানের ক্ষেত্রে হ্রাসবৃদ্ধি নেই। এ কারণে সালাফের ইমামদের কেউ কেউ বরং কুরআনে যতটুক এসেছে এর বাইরেও যেতে চাননি। যেমন—ইবনে ওয়াহাব থেকে বর্ণিত, তিনি ইমাম মালেককে জিজ্ঞাসা করলেন, ঈমান কি বাড়ে? মালেক বললেন, 'কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ ঈমান বাড়ার কথা বলেছেন।' ইবনে ওয়াহাব বললেন, কমে? ইমাম বললেন, 'এ বিষয়ে কথা বলা বাদ দাও।'³⁴⁸ অর্থাৎ, যেহেতু আল্লাহ তায়ালা ঈমান বাড়ার কথা বলেছেন, এ কারণে মালেক ঈমান বাড়ার কথা বলেছেন। বিপরীতে আল্লাহ তায়ালা যেহেতু কমার কথা বলেননি, কেউ কেউ বাড়ার উপর ভিত্তি করে কমার কথা বললেও ইমাম মালেক সেটা করতে চাননি। কুরআনে যেহেতু এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি, তাই তিনি চুপ থাকতে বলেছেন। এই ছিল আমাদের সালাফের কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ। তবে অন্যান্য বর্ণনাতে-যেমনটা পিছনে উল্লেখ করা হয়েছে-বোঝা যায়, তিনি বিভিন্ন হাদিস এবং সাহাবাদের বক্তব্য দেখে কমার কথাও বলতেন।
ঈমানের এই হ্রাসবৃদ্ধির হাকিকত সাহাবিদের বক্তব্য থেকেও বোঝা সম্ভব। যেমন-ইবনে আবি শাইবা রাসুলুল্লাহর সাহাবি উমাইর ইবনে হাবিব ইবনে খুমাশাহ থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন, 'ঈমান বাড়ে ও কমে।' তাকে বলা হলো, কীভাবে? তিনি বললেন, 'যখন আল্লাহকে স্মরণ করি, তাকে ভয় করি, সেটা ঈমান বৃদ্ধি; আর যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে যাই, তাকে ভুলে যাই, সেটা ঈমানের কমতি।'³⁴⁹
এখানে দেখুন, ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত আমলের সঙ্গেই সম্পৃক্ত করা হলো। আর হানাফি ইমামগণও আমলের হ্রাসবৃদ্ধির কথা বলেন। এ জন্য ইবনে জারির তাবারি লিখেন, 'যারা ঈমান কমা ও বাড়ার কথা বলেছেন তারা মূলত জানা (মারিফাত), স্বীকৃতি (কওল) ও আমলের প্রতি লক্ষ রেখে বলেছেন। কারণ, মানুষ আমলের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন স্তরে বিভক্ত। ফলে যে আল্লাহর যত অনুগত, তার ঈমান তত বেশি। যে আল্লাহর যত কম অনুগত, তার ঈমান তত কম।'³⁵⁰ উক্ত বক্তব্যে স্পষ্ট যে, শেষ পর্যন্ত তারা (অন্টার ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের) আমলের দিকে লক্ষ করেই ঈমান হাসবৃদ্ধির কথা বলেছেন। এটা ইমাম আজম এবং হানাফি আলেমদেরও মাযহাব। ফলে অন্য আলেমদের সঙ্গে ইমাম আজমের মতপার্থক্য মৌলিক নয়, বরং শাব্দিক। হযরত রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি রহ.-সহ আকাবিরে দেওবন্দের মত এটাই।³⁵¹
টিকাঃ
৩৪৭. আল-আকিদাতুর রুকনিয়্যাহ (পাণ্ডুলিপি) (২)।
৩৪৮. আল-ইনতিকা, ইবনে আবদিল বার (৬৯)।
৩৪৯. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (কিতাবুল ঈমান : ৩০৯৬৩)।
৩৫০. দেখুন : আত-তাবসির ফি মাআলিমিদ দ্বীন (১৯৫)।
৩৫১. ফাতাওয়ায়ে রশিদিয়া (১০৫)।