📄 সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ ও মুহাদ্দিসের মাযহাব
আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের কাছে ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি ও আমল দুটোর নাম। অন্যকথায়, তাদের কাছে আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আমল যেহেতু বাড়ে ও কমে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঈমানের ক্ষেত্রেও তাদের মাযহাব হলো ঈমান বাড়ে ও কমে। এটা বিভিন্ন সাহাবির বক্তব্য হিসেবেও পাওয়া যায়। মুজাহিদ রহ. সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবুদ দারদা ও আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, তারা বলেন, 'ঈমান বাড়ে ও কমে।'³²⁷
আবদুর রাযযাক ইবনে হাম্মাম বলেন: আমি ইবনে জুরাইজ, সুফিয়ান সাওরি, মা'মার ইবনে রাশেদ, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ এবং মালেক ইবনে আনাস সবাইকে বলতে শুনেছি: 'ঈমান হলো কথা ও কাজ; বাড়ে ও কমে।'³²⁸ আবদুল্লাহ ইবনে নাফে' থেকে বর্ণিত, ইমাম মালেক বলতেন, 'ঈমান হলো কথা ও কাজ; বাড়ে ও কমে।'³²⁹
রবি বলেন, আমি শাফেয়িকে বলতে শুনেছি, 'ঈমান বাড়ে ও কমে।'³³⁰ শাফেয়ি বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা কুরআনে অন্তর, চোখ, কান, হাত ও পা-সহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে যেসব ইবাদতের কথা বলেছেন, সেগুলোকে তিনি ঈমান আখ্যায়িত করেছেন। পবিত্রতা ও নামাযকে ঈমান আখ্যা দিয়েছেন। সুতরাং যারা এসব ইবাদত পরিপূর্ণরূপে আদায় করবে, তারা পূর্ণ ঈমানদার গণ্য হবে। আর যারা এগুলো ইচ্ছাকৃত ছেড়ে দেবে, তাদের ঈমান অসম্পূর্ণ গণ্য হবে। বোঝা গেল, ঈমান বাড়ে ও কমে। কারণ, ঈমানে যদি হ্রাসবৃদ্ধি না থাকত, তবে সকল মানুষ সমান হয়ে যেত। সবার মর্যাদা এক হয়ে যেত। পরস্পরের শ্রেষ্ঠত্ব বাতিল গণ্য হতো। কিন্তু এটা সঠিক নয়। বরং মানুষ তিনভাবে বিভক্ত। যারা ঈমান (ও আমলের) সব হক আদায় করে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। যাদের ঈমান যত বেশি থাকবে, জান্নাতে তাদের মর্যাদা তত বেশি হবে। আর যাদের ঈমানে ত্রুটিবিচ্যুতি থাকবে, আল্লাহ তাদের জাহান্নামের শাস্তি দেবেন।'³³¹
ইমাম আহমদ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ঈমান হলো কথা ও কাজ; বাড়ে ও কমে।'³³² সুলাইমান ইবনুল আশআস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইমাম আহমদ বলেছেন, 'নামায, যাকাত, হজ, সৎকাজ—এগুলো সব ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর অবাধ্যতা ঈমানকে কমিয়ে দেয়।'³³³ পুত্র আবদুল্লাহর বর্ণনায় এসেছে, ইমাম আহমদ বলেন, 'ঈমান বাড়ে ও কমে। যখন কেউ ব্যভিচার করে অথবা মদপান করে, তার ঈমান কমে যায়।'³³⁴
আবু ইসহাক সাফফার লিখেন, ‘মালেক, আওযায়ি, শাফেয়ি, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ, আহমদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ ফকিহ ও মুহাদ্দিসের মতে, ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল। ফলে তাদের কাছে ফরয ও নফল আমলের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়, গুনাহের মাধ্যমে হ্রাস পায়। আবুল হাসান আশআরির কাছে ঈমান অন্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট; অন্যকথায়, সত্যায়ন ও জানা। তার মতে, ভালো কাজের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়, কিন্তু গুনাহের কারণে হ্রাস পায় না।'³³⁵
ইমাম নববি আবদুর রাযযাক থেকে বর্ণনা করেন, 'আমি আমার সকল মাশায়েখ তথা সুফিয়ান সাওরি, মালেক ইবনে আনাস, উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর, আওযায়ি, মা'মার ইবনে রাশেদ, ইবনে জুরাইজ, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ সকলকে বলতে শুনেছি—ঈমান হলো কথা ও কাজ; বাড়ে ও কমে। আর এটা ইবনে মাসউদ, হুযাইফা, নাখায়ি, হাসান বসরি, আতা, তাউস, মুজাহিদ এবং আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকেরও বক্তব্য।'³³⁶
তারা সকলে কুরআন কারিম ও সুন্নাহর বিভিন্ন বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। যেমন—আল্লাহ তায়ালা বলেন,
فَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُم مَّن يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ ءَامَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ
'যখনই কোনো সুরা অবতীর্ণ হয়, তাদের কেউ কেউ বলে, এটা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান বৃদ্ধি করল? যারা মুমিন, এটা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে আর তারা আনন্দিত হয়।' [তাওবা : ১২৪]
অন্যত্র বলেন,
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ وَلِلَّهِ جُنُودُ السَّমَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَكَানَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
'তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন, তাদের ঈমানের সঙ্গে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর বাহিনীসমূহ আল্লাহরই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' [ফাতাহ : ৪]
আরেক জায়গায় বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
'মুমিন তারাই, যাদের অন্তর আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে আর তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই নির্ভর করে।' [আনফাল: ২]
আরেক জায়গায় বলেন,
وَمَا جَعَلْنَا أَصْحَبَ النَّارِ إِلَّا مَلَائِكَةً وَمَا جَعَلْنَا عِدَّتَهُمْ إِلَّا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا لِيَسْتَيْقِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ وَيَزْدَادَ الَّذِينَ ءَامَنُوا إِيمَانًا وَلَا يَرْتَابَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ وَالْمُؤْمِنُونَ وَلِيَقُولَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ وَالْكَافِرُونَ مَاذَا أَرَادَ اللَّهُ بِهَذَا مَثَلًا كَذَلِكَ يُضِلُّ اللَّهُ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ وَمَا هِيَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْبَشَرِ
অর্থ : “আমি জাহান্নামের প্রহরী হিসেবে কেবল ফেরেশতাদের মনোনীত করেছি। কাফেরদের পরীক্ষাস্বরূপই আমি তাদের এই সংখ্যা (তথা উনিশ) উল্লেখ করেছি যাতে কিতাবিদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মায়, মুমিনদের ঈমান বর্ধিত হয় এবং বিশ্বাসীগণ ও কিতাবিগণ সন্দেহ পোষণ না করে। এটার ফলে যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তারা ও কাফেররা বলবে, 'আল্লাহ এই অভিনব উক্তি দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন?' এইভাবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ দেখান। আপনার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। জাহান্নামের এই বর্ণনা তো মানুষের জন্য সাবধান বাণী।” [মুদ্দাসসির : ৩১]
এখানকার সবগুলো আয়াতে ঈমান বাড়ার কথা বলা হয়েছে। কুরআনের কোথাও সরাসরি ঈমান কমার কথা বলা হয়নি। তবে—তাদের মতে—যে বস্তু বাড়ে বোঝা যায়, সেটা কমেও। এমন যুক্তিতে তারা ঈমানের বৃদ্ধি ও হ্রাস দুটোর কথাই বলেছেন।
টিকাঃ
৩২৭. ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ৭৪, ৭৫)।
৩২৮. আল-ইনতিকা, ইবনে আবদিল বার (৭১)।
৩২৯. হিলইয়াতুল আউলিয়া, আস্ফাহানি (৬/৩২৭)।
৩৩০. আল-ইনতিকা (১৩৫)।
৩৩১. মানাকিবুশ শাফেয়ি, বাইহাকি (১/৩৯১-৩৯৩)।
৩৩২. মানাকিবে আহমদ, ইবনুল জাওযি (২২৩)।
৩৩৩. আস-সুন্নাহ, রিওয়াইয়াতু খাল্লাল (৩/৫৮৪)।
৩৩৪. আস-সুন্নাহ, আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ (২৬৫-২৬৬)।
৩৩৫. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭২২-৭২৩, ৭২৪)।
৩৩৬. শরহে মুসলিম, নববি (১/১৪৬)।
📄 ইমাম আজমের মাযহাব
ইমাম আজম রহ. মনে করেন, 'ঈমান হলো (মুখে) স্বীকার ও (অন্তরে) সত্যায়ন করা। বিশ্বাসকৃত বিষয় হিসেবে আকাশ ও পৃথিবীর কারও ঈমান বাড়ে বা কমে না। তবে ইয়াকিন ও সত্যায়নের ক্ষেত্রে বাড়ে-কমে। ঈমান ও তাওহিদের ক্ষেত্রে সকল মুমিন বরাবর। আমলের ক্ষেত্রে স্তরভেদ হয়।'³³⁷
কারণ, যেসব বিষয়ে ঈমান আনা জরুরি জাহেল-আলেম, বৃদ্ধ-যুবক, নারী-পুরুষ সবাইকে সেসব বিষয়ে ঈমান আনতে হয়। কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে কমবেশি ও সকলের মাঝে তারতম্য স্পষ্ট। এ কারণে ইমাম আজমের মতে, 'ঈমানের ক্ষেত্রে হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে না। কেননা, ঈমান কমতে হলে কুফর বাড়তে হবে, ঈমান বাড়তে হলে কুফর কমতে হবে। ফলে একই সময়ে এক ব্যক্তির মাঝে ঈমান ও কুফর দুটোই বিদ্যমান থাকতে হবে। অথচ এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। সুতরাং ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধিও সম্ভব নয়।'³³⁸ ইমাম আরও বলেন, 'সকল মুমিন আল্লাহর মারিফাত (পরিচয়), ইয়াকিন (বিশ্বাস), তাওয়াক্কুল (ভরসা), মহব্বত, সন্তুষ্টি, ভীতি, আশা এবং সেসবের প্রতি ঈমানের ক্ষেত্রে সমান। তাদের মাঝে স্তরভেদ হচ্ছে সেগুলোর ঈমান-পরবর্তী (আমলের) ক্ষেত্রে।'³³⁹
ইমাম আজমের মতো সকল হানাফি আলেমের মতে, ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে না। কারণ, ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি। আর সত্যায়ন ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে হ্রাসবৃদ্ধি নেই। সবাইকে সমান বিষয় সত্যায়ন করতে হয়। মুমিন হওয়ার জন্য সবাইকে একই বিষয়ের স্বীকৃতি দিতে হয়। ফলে ঈমানের মাঝে হ্রাসবৃদ্ধি নেই। হ্যাঁ, সত্যায়ন, মারিফাত, ইয়াকিন, তাওয়াক্কুল, মহব্বত, সন্তুষ্টি, ভয়, আশা ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্তরভেদ রয়েছে; এগুলো কমবেশি হয়।³⁴⁰
টিকাঃ
৩৩৭. আল-ফিকহুল আকবার (৬)।
৩৩৮. আল-ওয়াসিয়্যাহ (২৯-৩০)।
৩৩৯. আল-ফিকহুল আকবার (৬)।
৩৪০. দেখুন: আস-সাওয়াদুল আজম (৫)। ইতিকাদ, বলখি (১৯)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৮৭)। বাহরুল কালাম (১৫৬)। জামেউল মুতুন (২৩)।
ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর এই গভীর বক্তব্য অনেকে বুঝতে না পেরে বাহ্যিক অবস্থার উপর ফয়সালা দিয়েছেন। তারা এটাকে ভ্রান্ত মুরজিয়াদের মতাদর্শ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের কথা, আবু হানিফার দাবি, 'আমাদের ঈমান ফেরেশতাদের ঈমানের মতো।' এটা মুরজিয়াদের বক্তব্য! এই সন্দেহের কারণ হলো, তারা কেবল বাহ্যিকভাবে ইমামের বক্তব্য বিচার করেছেন, গভীরে যাননি। অথচ ইমাম নিজে এ সংশয়ের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমাদের ঈমান নবিদের ঈমানের মতো। কারণ, তারা যেসব বিষয়ে ঈমান এনেছেন, আমরাও সেসব বিষয়ে ঈমান এনেছি। এরপর রইল সওয়াবের কথা। ঈমানের সওয়াব এবং সকল ইবাদতের সওয়াবের ক্ষেত্রে তারা আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কেননা, তারা নবুওতপ্রাপ্ত। পাশাপাশি তাদের চালচলন, কথাবার্তা, ইবাদত-বন্দেগি সবকিছু আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সবকিছুতে তারা আমাদের চেয়ে মর্যাদাবান।'³⁵²
প্রশ্ন হতে পারে, আমাদের ঈমান ফেরেশতাদের ঈমানের মতো হলে ফেরেশতারা আমাদের চেয়ে আল্লাহর অধিক অনুগত কেন? তা ছাড়া, আমাদের কেউ ভুল করে ফেললে তাকে আমরা দুর্বল ঈমানের লোক বলি কেন? এর মাধ্যমে কি প্রমাণিত হয় না যে, ফেরেশতাদের ঈমান আমাদের ঈমানের চেয়ে শক্তিশালী? ইমাম বলেন, 'যারা এসব কথা বলে, তারা ঈমান ও ইয়াকিনের সংজ্ঞার্থ সম্পর্কে বেখবর। ইয়াকিন হচ্ছে কোনো বিষয়ে সন্দেহাতীত বিশ্বাস রাখা। শাহাদাতপন্থি কোনো মুসলমানই আল্লাহ তায়ালা, তাঁর কিতাব কিংবা তাঁর প্রেরিত নবি-রাসুলের মাঝে সন্দেহ করে না, যদিও আমলের ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি হয়ে থাকে। বিষয়টি আমাদের নিজেদের সঙ্গে তুলনা করেও দেখতে পারি। অনেক সময় আমাদের পদস্খলন ঘটে। আমরা ভয় পেয়ে যাই। দুশমনের সামনে আমরা ঘাবড়ে যাই। কিন্তু এর অর্থ কি আমরা আল্লাহ ও রাসুলের ক্ষেত্রে সন্দেহ করি? না। সুতরাং অন্যদের ক্ষেত্রেও একই ধারণা রাখতে হবে।'³⁵³
ইমামকে প্রশ্ন করা হলো, আমাদের ঈমান ও ইয়াকিন ফেরেশতাদের ঈমান ও ইয়াকিনের মতো হয় কী করে, অথচ তারা আমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করে? ইমাম বলেন, 'হ্যাঁ, এটা সম্ভব। এর উদাহরণ দুজন সাঁতারুর মধ্যে। সাঁতারের কলাকৌশল সমানভাবে রপ্ত তাদের। একটা প্রচন্ড স্রোতঃস্বিনী নদীর পাশে গেল দুজনে। একজনে নদীতে সঙ্গে সঙ্গে ঝাপ দিলো। আরেকজন ভয় পেল কিংবা ইতস্তত করল। দুজনের জানা সমান। কিন্তু কাজের গতি ভিন্ন। অথবা অন্য একটি উদাহরণ দেখুন। দুই ব্যক্তি। দুজনে একই রোগে আক্রান্ত। ঔষধ তিতা। একজনে দ্রুত পান করল, আরেকজন ধীরে করল।'³⁵⁴
ইমাম আরও বলেন, 'আমল ঈমানের অংশ নয়। আমলের ক্ষেত্রে ফেরেশতারা আমাদের চেয়ে ঊর্ধ্বে হলেও ঈমানের দিক থেকে সমান। কীভাবে? কারণ আল্লাহর তাওহিদ, রবুবিয়্যাত, কুদরতসহ তাঁর পক্ষ থেকে আসা যেসকল বিষয়ে ফেরেশতারা ঈমান এনেছেন, আমরাও ঠিক সেসব বিষয়েই ঈমান এনেছি। নবি-রাসুলগণও ঠিক সেসব বিষয়ই সত্যায়ন করেছেন। এ কারণেই আমরা বলেছি যে, আমাদের ঈমান ফেরেশতাদের ঈমানের মতো। কারণ, তারা যেসব বিষয়ে ঈমান এনেছেন, আমরাও সেসব বিষয়ে ঈমান এনেছি।'³⁵⁵
আমাদের ঈমান এবং ফেরেশতাদের ঈমানের উদাহরণও তেমন। মূল বিষয় দুজনের কাছেই সমান। দুজনেই সমান ও অভিন্ন বিষয়ের উপর ঈমান রাখি। কিন্তু সেটার প্রকাশ, প্রভাব, ফলাফল, শক্তি, স্তর, মান সবকিছু ভিন্ন। এভাবে বুঝলে আর ইমামের কথার উপর আপত্তি থাকে না। তথাপি এ ধরনের কথা না বলা উচিত। কারণ, তাতে ভুল বোঝার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য ইমাম থেকে বর্ণনা করা হয় যে, তিনি বলেন, 'আমার ঈমান ফেরেশতা জিবরিলের ঈমানের মতো।'- এই কথা বলা আমি অপছন্দ করি। বরং বলবে, জিবরিল যেসব বিষয়ে ঈমান রাখেন আমিও সেসব বিষয়ে ঈমান রাখি।³⁵⁶
উপরের আলোচনাতে স্পষ্ট যে, ইমাম আজম 'আমার ঈমান ফেরেশতাদের ঈমানের মতো।'-এমন কথা বলা অপছন্দ করতেন। যদিও কোনো কোনো বর্ণনায় তাঁর থেকে এমন বক্তব্য পাওয়া যায় যেমনটা 'আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিমে'র উদ্ধৃতিতে উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি ইমাম আজম থেকে এ ধরনের বক্তব্য চূড়ান্ত প্রমাণিত মেনে নেওয়া হয়, তথাপি এটা উপযুক্ত অর্থে বাস্তবসম্মত বক্তব্য এবং তাতে কোনো জটিলতা নেই। কারণ, এমন অর্থ সম্পূর্ণ সঠিক। তথাপি ইমাম আজমের প্রতিপক্ষের লোকেরা এটাকে তাঁর সমালোচনার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং এ বক্তব্যের কারণে তাঁকে মুরজিয়া আখ্যা দিয়ে তাঁর কঠোর সমালোচনা করে। আহলে সুন্নাতের অনেক ইমামও প্রতিপক্ষের প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত হয়ে ইমামের সমালোচনা করেন। অথচ ইমামের প্রকৃত ও বিস্তারিত বক্তব্য যদি তারা জানতেন, দেখতেন ইমামের বক্তব্য হুবহু আহলে সুন্নাতের বক্তব্য। এ ধরনের বক্তব্যের জন্য তাকে মুরজিয়া বলা অন্যায়। আমরা সামনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা দেখব, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তায়ালা ইমাম মালেক রহ.-কে রহম করুন। তিনি কানকথার উপর ভিত্তি করে ইমাম আজমকে গোমরাহ বলেননি; বরং তিনি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য মানুষের কাছ থেকে ইমামের বক্তব্য শুনতে চাইতেন। যেমন-ইমামের পৌত্র উমর ইবনে হাম্মাদকে ইমাম মালেক রহ. বলেন, আমি শুনেছি আবু হানিফা বলতেন, তার ঈমান জিবরিলের ঈমানের মতো। উমর বলেন, 'আপনার কাছে বাতিল সংবাদ পৌঁছেছে। বরং তিনি বলতেন, আল্লাহ তায়ালা জিবরিলকে রাসুল হিসেবে নবিজির কাছে পাঠিয়েছেন। তার আগে অন্য সকল নবির কাছে পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং রিসালাতের সত্যায়নের প্রতি দাওয়াত দিতে বলেছেন। সকল নবি এবং তাদের অনুসারীদের ঈমানের বিষয়গুলো ছিল এক, কেবল শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল। এ জন্য আমি বলি না, তাঁর ঈমান আমার ঈমানের মতো নয়। কারণ, সেটা বললে ঈমান একাধিক হয়ে যাবে। অথচ নবিগণ একই ঈমানের প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন। তাদের শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল...' এ কথা শুনে মালেক মুচকি হাসলেন, কিন্তু কিছু বললেন না।³⁵⁷ খুব সম্ভবত মালেক এ যুক্তির সঙ্গে একমত হতে পারেননি। সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু ইমাম আজমকে উক্ত বক্তব্যের কারণে মুরজিয়া কিংবা বিচ্যুত বলা যে বিচ্যুতি, সেটা উক্ত কথোপকথনে স্পষ্ট।
আবু হাফস বুখারি এ ধরনের বক্তব্যের ব্যবহারের বৈধতা দেখিয়ে বলেন, 'আমাদের ঈমান, জিবরাইল ও মিকাইলসহ ফেরেশতাদের ঈমান এবং সকল নবি-রাসুলের ঈমান এক। কেননা, আমরা ঈমানের যা যা সাক্ষ্য দিই, ফেরেশতারা সেসব বিষয় সাক্ষ্য দেন, বেশি কিছু সাক্ষ্য দেন না। সুতরাং যে বলবে ফেরেশতারা আমাদের চেয়ে বেশি কিছু সাক্ষ্য দেন, সে বিদআতি। একইভাবে মানুষ ফেরেশতাদের চেয়ে কম কিছুর সাক্ষ্য দেবে, সেটাও অসম্ভব। যেহেতু মানুষ ও ফেরেশতা উভয়ের সত্যায়িত বিষয় এক ও অভিন্ন, বোঝা গেল, মৌলিকভাবে দুজনের ঈমান সমান। হ্যাঁ, আমলের ক্ষেত্রে ফেরেশতারা আমাদের ঊর্ধ্বে।'³⁵⁸
ইমাম তহাবি রহ. বলেন, 'ঈমান একটি একক। মূল ঈমানের ক্ষেত্রে সকল মুমিন অভিন্ন স্তরে। তবে তাদের মাঝে স্তরভেদ ঘটে আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সর্বাবস্থায় উত্তম পন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে। সকল মুমিন দয়াময় আল্লাহর বন্ধু। আর তাদের মাঝে সে সর্বোত্তম যে আল্লাহর সবচেয়ে বেশি অনুগত, সবচেয়ে বেশি কুরআনের কাছে সমর্পিত।'³⁵⁹
সদরুল ইসলাম বাযদাবি বলেন, 'এক দৃষ্টিতে ঈমান বাড়ে বা কমে না। আরেক দৃষ্টিতে বাড়ে-কমে। অর্থাৎ, মৌলিক ঈমানের ক্ষেত্রে হ্রাসবৃদ্ধি নেই। সবাইকে সমান বিষয়ে বিশ্বাস রাখতে এবং স্বীকৃতি দিতে হয়। ফলে ঈমানের মূল সত্তায় হ্রাসবৃদ্ধি হয় না। হ্রাসবৃদ্ধি হয় ঈমানের গুণাবলিতে। ফলে কারও ঈমান অন্যদের ঈমানের চেয়ে অধিকতর পূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রেই মুমিনদের মাঝে স্তরভেদ ঘটে। এ জন্য ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, 'আমার ঈমান ফেরেশতাদের ঈমান সদৃশ; ফেরেশতাদের ঈমানের সমান নয়।'³⁶⁰
টিকাঃ
৩৫২. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৬)।
৩৫৩. প্রাগুক্ত (১৫)।
৩৫৪. প্রাগুক্ত (১৫)।
৩৫৫. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৪)। আল-ফিকহুল আবসাত (৪৬)।
৩৫৬. দেখুন: খোলাসাসূত্রে রদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদিন (৩/২৭৪)।
৩৫৭. দেখুন: আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১১৩-১১৪)।
৩৫৮. আস-সাওয়াদুল আজম (৪২)।
৩৫৯. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২২)।
৩৬০. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৫৬)।
📄 ইমাম আজমের কথার মর্ম
তবে এর অর্থ এই নয় যে, হানাফিদের কাছে ঈমান মোটেই বাড়ে-কমে না; বরং এটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। অর্থাৎ, যে জিনিসগুলোর উপর ঈমান আনতে হয়, সে হিসেবে ঈমানে হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে না। যেমন—ঈমানের ছয়টি রুকন। নবি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সকলেরই এগুলোতে বিশ্বাস করতে হয়। একজন ফেরেশতা যেমন বলেন, আমি ঈমান আনলাম আল্লাহর উপর, ফেরেশতার উপর, কিতাবের উপর, রাসুলগণের উপর, পরকালের উপর, তাকদিরের ভালোমন্দের উপর, তেমনই একজন সাধারণ মানুষ কিংবা জিনকেও একই ঘোষণা করতে হয়। সবাইকে বলতে হয়, আমি ঈমান আনলাম আল্লাহর উপর এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-কিছু এসেছে সবকিছুর উপর। আমি ঈমান আনলাম রাসুলুল্লাহর উপর এবং রাসুলুল্লাহর পক্ষ থেকে আগত সবকিছুর উপর। এক্ষেত্রে যদি কিছু মানে আর কিছু অস্বীকার করে, তবে সে মুমিন গণ্য হবে না। যেমন—কেউ আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি কিতাবর উপর ঈমান আনল, কিন্তু পরকালে ঈমান আনল না, তবে এমন ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। আবার কেউ আল্লাহ ও রাসুলের উপর ঈমান আনল, কিন্তু অন্য কোনো বিষয়ে ঈমান আনল না, তবে সেও কাফের হয়ে যাবে। ফলে এখানে ঈমানে কমবেশি করা সম্ভব নয়।
কিন্তু ইয়াকিনের স্তর এবং সত্যায়নের দৃঢ়তার ক্ষেত্রে কমবেশি হয়। ফলে এদিক থেকে ঈমান বাড়ে-কমে বলা যায়।³⁴¹
শামসুদ্দিন সমরকন্দি লিখেন, 'বাস্তব কথা হলো, ঈমান বাড়ে ও কমে, সেটা আমলের অর্থে ধরা হোক অথবা সত্যায়নের অর্থে। কারণ, সত্যায়ন তথা বিশ্বাসটাও কখনো দুর্বল হয় কখনো শক্তিশালী হয়।'³⁴²
এই অর্থেই বুঝতে হবে আবু বকর রাযি.-এর ঈমানের ব্যাপারে বর্ণিত উমর রাযি.-এর বক্তব্য। উমর বলেন, 'যদি আবু বকরের ঈমান গোটা জগদবাসীর ঈমানের সঙ্গে ওজন করা হয়, তবে তাঁর ঈমান ভারি হবে।'³⁴³ এটা আধ্যাত্মিকতা, ঈমানের শক্তি, ইয়াকিনের দৃঢ়তা, মারিফাতের আলো। আবু বকর রাযি. সেসব বিষয়েই বিশ্বাস রাখতেন, যেগুলোতে সব মানুষ বিশ্বাস রাখে; অথচ তাঁর ঈমানের শক্তি ও জ্যোতি, তাঁর ইয়াকিনের স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তার ধারেকাছেও নেই কেউ। ফলে ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধি বলা হোক কিংবা ঈমানি শক্তির হ্রাসবৃদ্ধি বলা হোক, ফলাফল সমান। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর একটি হাদিস দ্বারাও বিষয়টি প্রমাণিত হয়। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহর কাছে শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং অধিকতর পছন্দনীয়। তবে দুজনের মাঝেই কল্যাণ রয়েছে।'³⁴⁴ এখানে রাসুল (ﷺ) মুমিনকে দুর্বল ও শক্তিশালী শব্দে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ, তাদের আমল ও বিশ্বাসের মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বাসকৃত বিষয়ের ক্ষেত্রে দুজনই অভিন্ন মুমিন।
টিকাঃ
৩৪১. এ ব্যাপারে হানাফি আলেমদের স্বীকৃতি দেখুন: আস-সাওয়াদুল আজম (৪৮-৪৯)। শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১৪৯)।
৩৪২. আস-সাহায়িফুল ইলাহিয়্যাহ (৪৫৫)।
৩৪৩. আস-সুন্নাহ, খাল্লাল (৪/৪৪)।
৩৪৪. মুসলিম (কিতাবুল কদর : ২৬৬৪)। সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ : ৭৯)।
📄 প্রথম পক্ষের খণ্ডন
সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম কুরআনের আয়াত- هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ وَلِلَّهِ جُنُودُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا অর্থ : 'তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন, তাদের ঈমানের সঙ্গে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর বাহিনীসমূহ আল্লাহরই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' [ফাতাহ : ৪] দিয়ে ঈমান বৃদ্ধির দলিল দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস, আলি, জাফর ইবনে মুহাম্মাদ, হাসান বসরি প্রমুখ থেকে এখানে ঈমানকে 'ইয়াকিন' অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কেউ এটাকে 'সত্যায়ন' অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। আর ইয়াকিন ও সত্যায়নের ক্ষেত্রে বেশকম হয়, ঈমানের ক্ষেত্রে হয় না।
তা ছাড়া, কুরআনের সবকিছু আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَسْتَلِ الْقَرْيَةَ الَّتِي كُنَّا فِيهَا এ আয়াতের শাব্দিক অর্থ 'যে জনপদে আমরা ছিলাম সে জনপদকে জিজ্ঞাসা করুন।' কিন্তু আমরা অর্থ নিচ্ছি 'জনপদবাসীকে জিজ্ঞাসা করুন'। একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী : وَاسْتَمَنْ فِي السَّمَاءِ এর শাব্দিক অর্থ : 'তোমরা কি যিনি আকাশে আছেন তাঁর থেকে নিরাপদ হয়ে গেছ?' [মুলক : ১৬] এখানে বাহ্যিক অর্থে বোঝা যায়, আল্লাহ আকাশের মাঝে আছেন। অথচ আল্লাহ আকাশের মাঝে অবস্থান থেকে পবিত্র।
একইভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী : وَأَرْسَلْنَا السَّمَاء عَلَيْهِم مِدْرَارًا এর শাব্দিক অর্থ হলো : 'আমি তাদের উপর আকাশকে মুষলধারে পাঠিয়েছি।' [আনআম : ৬] অথচ প্রকৃত অর্থ হলো, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করা, আকাশ পাঠানো নয়।
আল্লাহ তায়ালার বাণী : وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا এর শাব্দিক অর্থ হলো : 'মাথা জ্বলে সাদা হয়ে গেছে।' [মারইয়াম : ৪] অথচ বাস্তব অর্থ হলো, বার্ধক্যে মাথার চুল সধ্র হয়েছে। একইভাবে কুরআনে বর্ণিত 'ঈমান বৃদ্ধির' উদ্দিষ্ট মর্ম হলো ঈমানের জ্যোতি ও শক্তি বৃদ্ধি পাওয়া।
কেউ বলতে পারেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) একটি হাদিসে বলেছেন, 'যার অন্তরে এক দানা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।' অর্থাৎ, তাতে চিরস্থায়ী হবে না। এ হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, ঈমান কম হয়। আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করব, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' তথা কালিমার নিচে ঈমান আছে কি না? সে যদি বলে, না। আমরা বলব, কালিমা বড় নাকি একটি দানা বড়? অথচ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যদি কালিমাকে একটি পাল্লায় রাখা হয় আর সাত আকাশ ও সাত যমিন এক পাল্লায় রাখা হয়, তবে কালিমা ভারী হয়ে যাবে।' তাহলে বোঝা গেল, এখানে এক দানা বলতে আক্ষরিক পরিমাণ বোঝানো হয়নি। বরং একেবারে আমলহীন ও ন্যূনতম ঈমান বোঝানো হয়েছে।³⁴⁵
ইমাম রাযি বলেন, “মূল সত্যায়নের ক্ষেত্রে ঈমান বাড়ে-কমে না। কিন্তু ইয়াকিনের ক্ষেত্রে বাড়ে-কমে। কেননা, ইয়াকিনের ক্ষেত্রে ঈমানের স্তরভেদ স্বীকৃত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَىٰ قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِن ۖ قَالَ بَلَىٰ وَلَٰكِن لِّيَطْمَئِنَّ قَلْبِي অর্থ : যখন ইবরাহিম বললেন, হে আমার প্রতিপালক, কীভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন আমাকে দেখান। আল্লাহ বললেন, 'তুমি কি বিশ্বাস করো না?' তিনি বললেন, হ্যাঁ, করি; তবে এটা কেবল আমার চিত্তের প্রশান্তির জন্য।” [বাকারা : ২৬০] এখানে স্পষ্ট যে, 'ইলমুল ইয়াকিন' (জেনে বিশ্বাস)-এর স্তরের চেয়ে 'আইনুল ইয়াকিন' (দেখে বিশ্বাস) আরও ঊর্ধ্বে (ফলে ইয়াকিনের ক্ষেত্রে ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে; মূল ঈমানে নয়)।”³⁴⁶
টিকাঃ
৩৪৫. দেখুন: আস-সাওয়াদুল আজম (৫০)।
৩৪৬. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৭৭)।