📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
বাস্তবতা হলো, এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহের সঙ্গে ইমাম আজম এবং হানাফি উলামায়ে কেরামের বিরোধ তাত্ত্বিক, মৌলিক নয়। আর এটাই স্বাভাবিক। ঈমানের মতো মৌলিক বিষয় এবং দ্বীনের ভিত্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের ইমামদের মাঝে কোনো মৌলিক পার্থক্য থাকবে এটা অচিন্তনীয়। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে বিভিন্ন ফিরকা পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। যেমন-জাহমিয়্যাদের মতে ঈমান হলো স্রেফ জানার নাম। জানার বাইরে মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন ও আত্মসমর্পণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, ভয়, ভরসা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল—এগুলোর কোনোকিছুই ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের মতে, কুফর হলো স্রেফ আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতা! এটা জঘন্য আকিদা। কারণ, এর মাধ্যমে জগতের অধিকাংশ কাফের মুমিন হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, কেউ আল্লাহ বলতে একজন আছেন এটুকু জানলেই মুমিন হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাস কিংবা আমল তাদের কাছে একেবারেই নিরর্থক ও নিষ্প্রয়োজন। ভ্রান্ত কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায় মনে করে, ঈমান হলো স্রেফ মুখের স্বীকৃতি। অন্তরের সত্যায়ন ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়, আমল তো নয়ই। এটাও জঘন্য আকিদা। এর মাধ্যমে মুনাফিকরাও মুমিন হয়ে যাচ্ছে। অথচ মুনাফিকরা কুরআন-সুন্নাহমতে জঘন্য পর্যায়ের কাফের। তাদের অবস্থান হবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আল্লাহ তাআলা বলেন : إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا
‘মুনাফিকরা থাকবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তাদের জন্য আপনি কখনো কোনো সহায় পাবেন না।’ [নিসা : ১৪৫]
এভাবে আমলকে ঈমানের সংজ্ঞার্থের বহির্ভূত ধরার ক্ষেত্রে জাহমিয়্যাহ ও কাররামিয়্যাহ, অন্যকথায় বৃহত্তর মুরজিয়াদের সঙ্গে হানাফি মাযহাবের বাহ্যিক সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু এ সাদৃশ্য সত্ত্বেও তারা কখনোই এসব গোমরাহ ফিরকার অন্তর্ভুক্ত নয়। কিংবা তাদের আকিদা আর গোমরাহ ফিরকাগুলোর আকিদা এক নয়। কারণ, তারা আমলকে মৌলিকভাবেই ঈমান থেকে খারিজ করে দেয়। বিপরীতে ইমাম আজম এবং হানাফি উলামায়ে কেরাম আমলকে ঈমানের সংজ্ঞার্থ থেকে বাইরে রাখেন, মূল ঈমানের বাইরে রাখেন না। বরং, যেমনটা আমরা পিছনে দেখেছি, তাদের মতে ঈমান ও ইসলাম এক। আর জমহুরও এ ব্যাপারে একমত যে, ঈমান হলো বিশ্বাসগত বিষয়, ইসলাম হলো বাহ্যিক আমলগত বিষয়। ফলে আংশিক সাদৃশ্যের কারণে হানাফিদের এসব গোমরাহ ফিরকার মতো মনে করা ভ্রান্তি, ঠিক যেমন আংশিক সাদৃশ্যের কারণে জমহুর মুহাদ্দিসিনকে খারেজি ও মুতাযিলাদের মতো মনে করা ভ্রান্তি। কারণ, ঈমানের সংজ্ঞার্থের ক্ষেত্রে খারেজি ও মুতাযিলাদের মতাদর্শ মুহাদ্দিসিনের মতাদর্শসদৃশ। তাদের মতে মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল তিনটিই ঈমান। তিন ইমাম এবং মুহাদ্দিসদের মতেও ঈমান তিনটির সমন্বয়। কিন্তু তাদের আর গোমরাহ ফিরকাগুলোর মাঝে পার্থক্য হলো, এসব ফিরকা সবগুলো বিষয়কে একটি একক মনে করে। ফলে সামান্য নষ্ট হলে পুরোটা নষ্ট ধরে। এ কারণে তারা ঈমান শুদ্ধ হওয়ার জন্য কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার শর্ত দেয়। কারণ, কবিরা গুনাহ করার অর্থ হলো আমলের ক্ষেত্রে বিচ্যুতি আসা। আর আমল যেহেতু ঈমানের অঙ্গ এবং ঈমান যেহেতু তাদের কাছে একটি একক, ফলে খারেজিদের মতে কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি কাফের। অথচ আহলে সুন্নাত এমন ব্যক্তিকে কাফের বলেন না। বোঝা গেল, আংশিক সাদৃশ্যের কারণে তাদের এক ভাবার সুযোগ নেই।
মোটকথা, ঈমানকে সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত কি না এ বিষয়ে ইমাম আজম এবং জমহুর ফুকাহা-মুহাদ্দিসদের মাঝে যে মতপার্থক্য, সেটা নিতান্তই শাব্দিক ও পারিভাষিক। এমন কোনো মৌলিক পার্থক্য নয়, যার ফলে ঈমানের ক্ষেত্রে কিংবা আমলের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য দেখা দেয় কিংবা বিচ্যুতি আসে। হানাফি উলামায়ে কেরাম এবং বাকি তিন মাযহাবের উলামায়ে কেরাম সকলে আমলের প্রতি সমান যত্নবান, সম্পূর্ণ একমত। তাদের কেউ কবিরা গুনাহকারীকে এবং আমল পরিত্যাগকারীকে কাফের না বলার ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ একমত। সুতরাং প্রকৃত অর্থেও তাদের সকলের বক্তব্য সঠিক। ঈমানকে স্রেফ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার কারণে সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ফলাফলে কোনো পার্থক্য নেই। বরং ইমাম আজমের বিভিন্ন বক্তব্যও খোদ জমহুরের বক্তব্যের মতো—সম্পূর্ণ এক ও অভিন্ন। ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থে ইমাম বলেন, ঈমান হলো, ‘সত্যায়ন করা (তাসদিক), জানা (মারিফাত), ইয়াকিন রাখা, মুখে স্বীকার করা (ইকরার) করা এবং আত্মসমর্পণ করা (ইসলাম)।’ এখানে ইমাম আজম ঈমানের অর্থের মাঝে ‘ইসলাম’-কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর ইসলাম হলো বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল। যেমন— নামায, রোযা ইত্যাদি। ফলে তাত্ত্বিকভাবে তিনি আমলকে আলাদা করলেও প্রায়োগিকভাবে ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল তিনটির সমন্বিত রূপ মনে করেন। এতে তাঁর বক্তব্যের মাঝে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের বক্তব্যের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না। মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ইবনে যিয়াদ থেকে বর্ণিত, আবু হানিফা রহ. বলেন, ঈমান হলো ‘কথা’ (তথা হৃদয়ের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি), আর আমল হলো ঈমানের জন্য আবশ্যক বিষয় (الإيمان قول والعمل موظف عليه)।
উপরন্তু সংজ্ঞার্থের বিভিন্নতার বিষয়টির ক্ষেত্রেও আমরা যদি গভীরে যাই, তবে দেখব, ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্য অধিক যৌক্তিক। আমলকে ঈমানের সংজ্ঞায়নের অন্তর্ভুক্ত না করাই মৌলিক, অন্তর্ভুক্ত করা নতিজা ও ফলাফলভিত্তিক। কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন নস এ কথার প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সকল নবি-রাসুলকে দ্বীন কায়েম করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, শَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّيْنِ مَا وَصَّى بِهِ نُوْحًا وَ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَ عِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوْا فِيْهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوْهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَنْ يَشَاءُ وَ يَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ يُنِيْبُ অর্থ : ‘তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন সেই দ্বীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নুহকে। আর যা আমি ওহি করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাকে এই বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং এতে মতভেদ করো না। আপনি মুশরিকদের যার প্রতি আহ্বান করছেন, সেটা এদের নিকট দুর্বহ মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী তাকে দ্বীনের দিকে পরিচালিত করেন।’ [শুরা : ১৩]
উপরের আয়াতে দ্বীন বলতে ইসলাম ধর্ম উদ্দেশ্য। আর আমরা জানি, প্রত্যেক নবি-রাসুলের ধর্ম ইসলাম হলেও তাদের শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল। শরিয়তে মুহাম্মাদি আসার পর তাদের সেসব শরিয়তের অনেককিছু রহিত হয়ে গেছে। বরং কুরআনেরও বিভিন্ন বিধান রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় রহিত হয়ে গিয়েছে। এক ফরযের জায়গায় অন্য বিষয় ফরয হয়েছে। যদি আমলকেও ঈমান বলতে হয়, তাহলে কোনো নবির উম্মতের ঈমান কম আর কোনো নবির উম্মতের ঈমান বেশি বলতে হবে। ঈমানের কিছু অংশ রহিত হয়ে নতুন অংশ জন্মানোর কথা বলতে হবে। অথচ ঈমান এক। জগতের সকল নবি-রাসুলের ঈমানের প্রতি দাওয়াতের মূল কথা এক। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নবুওতের প্রথম যুগে মানুষকে ঈমানের প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিধিবিধান অবতীর্ণ হয়েছে। তাহলে বলতে হবে, তিনি অপূর্ণ দ্বীনের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। তা ছাড়া, তিনি হাদিসে বলেছেন, ‘আমি মানুষের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...। যখন তারা এটা বলবে, তখন তাদের রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ হয়ে যাবে। তাদের হিসাব থাকবে আল্লাহর উপর।’ এখানেও আমল ছাড়া কেবল সাক্ষ্যকেই ঈমান সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহর রাসুল আরও বলেন, “তোমরা বলো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, সফল হয়ে যাবে।” এখানেও মুখের বলার সঙ্গে সাফল্য সংযুক্ত করেছেন; আমলের সঙ্গে নয়। তা ছাড়া, আল্লাহর রাসুল সবাইকে আমলের আগে ঈমানের নির্দেশ দিতেন। যদি আমলকে ঈমানের মূল বিষয় ধরা হয়, তবে নওমুসলিমকে ‘ত্রুটিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী’ বলতে হবে, অথচ তার ঈমানে কোনো ত্রুটি নেই।
টিকাঃ
৩১৩. দেখুন: মাকালাতুল ইসলামিয়িান (১/১১৪-১১৫)। শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, মুফতি যাদাহ (৩২)। আল- মিলাল ওয়ান নিহাল (১/১১৩)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৭৬)।
৩১৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৩)।
৩১৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১০৫)।
৩১৬. বুখারি (কিতাবুল ঈমান : ২৫)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ২০)।
৩১৭. মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল ঈমান: ৩৯)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুত তারিখ: ৬৫৬২)। দারাকুতনি (কিতাবুল বুয়ু: ২৯৭৬)।
📄 একটি সংশয় নিরসন
প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে বিভিন্ন হাদিসে আমলকে ঈমানের অংশ কেন বলা হয়েছে? বিভিন্নভাবে এর উত্তর দেওয়া যেতে পারে:
এক. ঈমানের শাখাগত বিষয় এবং নতিজা হিসেবে বলা হয়েছে, মৌলিক অংশ হিসেবে নয়। এ জন্য সেগুলোর নামও দেওয়া হয়েছে ‘ঈমানের শাখা’, মূল নয়। আবুল ইউসর বাযদাবি লিখেন, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতে, ঈমানের শাব্দিক অর্থ সত্যায়ন। পরিভাষায় ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি। অর্থাৎ, অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ ছাড়া উলুহিয়্যাতের উপযুক্ত কেউ নেই। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমরা আল্লাহর সকল সিফাতে বিশ্বাস রাখি। নবিগণ তাঁর পক্ষ থেকে যা-কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলোতে ঈমান রাখি। ইসলামের সকল রুকনে বিশ্বাস রাখি। মুখে সেগুলোর স্বীকৃতি দিই। ফলে ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন। মুরজিয়াদের মতে ঈমান স্রেফ জানা। কাররামিয়্যাহদের মতে স্রেফ মুখের স্বীকৃতি। আশআরিদের নিকট স্রেফ অন্তরের সত্যায়ন। বিপরীতে শাফেয়ি এবং একদল মুহাদ্দিসের কাছে আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। ফলে তাদের কাছে ঈমানের সংজ্ঞা হলো কথা ও কাজ (আমল)। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও তারা আমল ছাড়া ঈমানকে বিশুদ্ধ গণ্য করেছেন। আমল ছেড়ে দেওয়ার কারণে কাউকে কাফের বলেননি। ফলে তাদের বক্তব্যের মর্মার্থ যেন : আমল ঈমানের ফলাফলস্বরূপ এর অন্তর্ভুক্ত। এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত (তথা হানাফিদেরও) বক্তব্য। ফলে দুটোর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।
দুই. বিপরীত অবস্থা তথা কুফরের সঙ্গে তুলনা করে; অর্থাৎ, সত্যায়ন ছাড়া যা-কিছু রয়েছে, যেমন—আল্লাহর বিভিন্ন আনুগত্য, ইবাদত—এগুলো ‘কুফরের বিপরীত ঈমান’ এই অর্থে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু স্বাভাবিক ও সামগ্রিক অর্থে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
৩১৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৪৮-১৪৯)।
৩১৯. দেখুন: জুমাল মিন উসুলিদ্দিন (২৭)।
📄 ঈমান ভয় ও আশার মাঝে
ঈমানের অবস্থান ভয় ও আশার মাঝে। একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভর করে পরিণতি সম্পর্কে একেবারে গা-ছাড়া ও নির্ভয় হয়ে যাওয়া বৈধ নয়। কারণ, তার জানা নেই শেষ পরিণতি কী অবস্থার উপর হবে— ঈমান নাকি কুফর অবস্থায় মৃত্যু হবে। এ জন্য এ ব্যাপারে সবসময় আল্লাহকে ভয় করা উচিত। ইমাম আজম বলেন, ‘অনেক মানুষ মৃত্যুর সময় ঈমানহারা হয়ে মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি শেষ পরিণতির ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় না করবে, সে মুরজিয়া-জাবরিয়্যাহদের অন্তর্ভুক্ত। ’
কুরআনের বিভিন্ন আয়াত দ্বারা ঈমানের এই হাকিকত (বাস্তবতা) প্রমাণিত। (فَلَا يَأْمَنُ مَّكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَسِرُونَ) অর্থ : ‘তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে ভয় করে না? বস্তুত ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ব্যতীত কেউ আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হয় না।’ [আরাফ : ৯৯]
একইভাবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়াও বৈধ নয়। এটা খারেজিদের মাযহাব। ফলে জগতের সকল গুনাহ করার পরও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। কারণ, আল্লাহর রহমত থেকে নৈরাশ্যকে কুফর বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইয়াকুব আ.-এর ভাষায় বলেন, يَا بَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِن يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَايْئَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَا يْنَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقُلُومُ الْكَافِرُونَ ‘(ইয়াকুব বলেন) হে আমার পুত্রগণ, তোমরা যাও ইউসুফ আর তার সহোদরের অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। কারণ, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে কেউই নিরাশ হয় না, কাফের সম্প্রদায় ব্যতীত।’ [ইউসুফ : ৮৭] আরও বলেন, قُلْ يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُসেهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ অর্থ : ‘আপনি বলে দিন, হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ [যুমার : ৫৩] সুতরাং গুনাহ করার পর কোনো ব্যক্তি তাওবা ছাড়া মারা গেলেও আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন, অথবা গুনাহ অনুযায়ী শাস্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। ফলে নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই।
ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ইবাদতের মর্ম কী? তিনি বললেন, ‘ইবাদত হলো আনুগত্য, আশা, ভয়, আল্লাহর রবুবিয়্যাতের স্বীকারোক্তি—সবগুলোর সমন্বিত নাম। ফলে বান্দা যখন আল্লাহর আনুগত্য করে, তাতে আল্লাহর প্রতি তার ঈমান, ভয় ও আশা তিনটি বিষয়ই থাকে। এই তিনটি বিষয়কে নিয়েই ইবাদত। ফলে ভয় ও আশা ছাড়া কেউ মুমিন হতে পারে না। হ্যাঁ, আল্লাহর প্রতি কারও ভয় বেশি হয়, আর কারও কম হয়; কিন্তু একেবারে নির্ভয় হলে মুমিন হওয়া যায় না। সুতরাং কোনো মানুষ যদি পুণ্যের আশা কিংবা শাস্তির ভয়ে অন্য কোনো মানুষের আনুগত্য করে, তবে সে যেন তার ইবাদত করল। কিন্তু ভয় ও আশা ছাড়া স্রেফ আনুগত্য ইবাদত হবে না। কারণ, স্রেফ আনুগত্যকে ইবাদত বলা হলে দুনিয়ার সবাইকেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদতকারী বলতে হবে।’
কুরআনে ভয় ও আশার মাঝে অবস্থান নবি-রাসুল এবং খাঁটি মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, أَمَّنْ هُوَ قَيْنِتُ ءَانَاءَ الَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُوا رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوى الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الْأَلْبَابِ অর্থ : ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা সিজদাবনত হয়ে এবং দাঁড়িয়ে ইবাদতে মগ্ন থাকে, আখেরাতকে ভয় করে এবং তাঁর প্রতিপালকের অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান যে তা করে না? বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।’ [যুমার : ৯] তিনি আরও বলেন, تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَ مِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنْفِقُوْনَ অর্থ : ‘(রাতে) তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়ে যায়। তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় ও আশা সহকারে ডাকে। আর আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।’ [সাজদা: ১৬]
এই ভয় ও আশার ভারসাম্য তৈরি হবে আমলের মধ্য দিয়ে। আমলবিহীন ভয়ের মাঝে থাকা অর্থহীন। আবার আমলহীন আশার মাঝে থাকাও প্রবঞ্চনা। বরং আল্লাহর প্রতি আশা নিয়ে ভালো কাজ করে যেতে হবে। তাঁর ভয়ে মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। মন্দ কাজ সংঘটিত হয়ে গেলে ভয় ও আশা দুটোর মাধ্যমে তাওবা করতে হবে। ইমাম গাযালি বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ সুস্থ থাকে, ততক্ষণ ভয় বেশি থাকা উচিত। আর যখন অসুস্থ হয়ে যায় (অথবা বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে যায়), তখন আশা বেশি থাকা উচিত।’ সম্ভবত এদিকেই ইঙ্গিত করে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা ব্যতীত মৃতুবরণ না করে।’ অর্থাৎ, বার্ধক্য অবস্থায় আমলের ক্ষেত্রে মানুষের সাধারণত ত্রুটিবিচ্যুতি তৈরি হয়, তাই তখন যথাসাধ্য ইবাদত করে আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা, তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশা নিয়ে মৃত্যুবরণ করা উচিত।
ইমাম আজম বলেন, “তবে আশা কিংবা ভয়ে আনুগত্য করলেই ঢালাওভাবে ইবাদত করেছে এমন বলা যাবে না। বরং এটা দুটি স্তরে বিভক্ত। যদি কেউ আশা বা ভয়ে অন্যের আনুগত্য করে এই বিশ্বাস নিয়ে যে, আল্লাহ ছাড়া সে ব্যক্তি তাকে উপকার-অপকার করতে সক্ষম, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। বিপরীতে কেউ যদি এই বিশ্বাসে অন্যকে ভয় করে বা অন্য কারও কাছে আশা করে যে, উপকার- অপকারের মূল মালিক আল্লাহ তায়ালা, তবে আল্লাহর অনুমতিতে সে ব্যক্তির হাতে এগুলো ঘটতে পারে কিংবা সে তার উপকার-অপকারের কারণ হতে পারে, তবে এমন ভয় ও আশাকে কুফর বলা যাবে না। কেননা, পিতা তার সন্তানের উপকার প্রত্যাশা করে। ঘোড়ার মালিক ঘোড়ার কাছ থেকে উপকার প্রত্যাশা করে। মানুষ তার প্রতিবেশীর সদাচরণের আকাঙ্ক্ষা করে, শাসকের কাছ থেকে সুরক্ষা প্রত্যাশা করে। এগুলো কুফর নয়। কারণ, আল্লাহ এগুলোকে পার্থিব জগতের কার্যকারণ ও উপকরণ হিসেবে তৈরি করেছেন। নবিদের জীবনেও আমরা এমন ঘটনা দেখতে পাই। যেমন—আল্লাহ তায়ালা মুসা আ.-কে নবি হিসেবে নির্বাচিত করেছেন; নিজের সঙ্গে কথা বলার জন্য মনোনীত করেছেন; তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। এতকিছু সত্ত্বেও মুসা আ. বলেছেন, ﴾فَأَخَافُ أَن يَقْتُلُونِ অর্থ : ‘আমার আশঙ্কা হয় তারা আমাকে হত্যা করে ফেলবে।’ [শুরা : ১৪] একইভাবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা থেকে পালিয়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। এগুলো কুফর নয়। কারণ, এসব ভয় মূলত সাময়িক ও শর্তসাপেক্ষ। কিন্তু মুমিনগণ আল্লাহকে ভয় করে শর্তহীনভাবে, সদা-সর্বদা, প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে।”
ঈমান ভয় ও আশার নাম। তাই প্রত্যেকে আল্লাহর আনুগত্য এবং গুনাহ পরিত্যাগের ভিত্তিতে ভয় ও আশার কাছাকাছি অবস্থান করে। ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, হত্যাকারী এবং নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি একবার দৃষ্টিপাতকারী দুজন কি সমান? ইমাম বললেন, ‘না, কখনোই নয়। হ্যাঁ, দুটোই গুনাহ, কিন্তু দুই গুনাহের স্তর ও পরিণাম এক নয়। অন্যায়ের প্রতি দৃষ্টিপাতকারী হত্যাকারীর চেয়ে ক্ষমার বেশি কাছাকাছি। কারণ, প্রথমজনের অপরাধ দ্বিতীয়জনের অপরাধের চেয়ে লঘু, যদিও দুটোই অপরাধ। এর উদাহরণ সেই দুই ব্যক্তির মতো যাদের একজন সমুদ্রে নেমেছে আরেকজন ছোট্ট নদীতে নেমেছে। দুজনই ডুবে যেতে পারে। তবে সমুদ্রে নামা ব্যক্তির ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা নদীতে নামা ব্যক্তির ডুবে যাওয়ার আশঙ্কার চেয়ে অনেক বেশি। একইভাবে নদীতে নামা ব্যক্তির সমুদ্রে নামা ব্যক্তির চেয়ে নিরাপদে কূলে ফেরার আশা বেশি। এভাবেই আমি লঘু গুনাহকারীর ব্যাপারে বড় গুনাহকারীর চেয়ে ক্ষমার অধিক আশাবাদী, যদিও দুজনের জন্যই আমি ক্ষমার আশা করি, দুজনের ব্যাপারেই শাস্তির ভয় করি।
টিকাঃ
৩২০. আস-সাওয়াদুল আজম (৫৪-৫৫)।
৩২১. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৮)।
৩২২. আল-আরাফুশ শাযি, কাশ্মীরি (২/৩০৬)।
৩২৩. মুসলিম (কিতাবুল জান্নাহ: ২৮৭৭)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু জাবের ইবনে আবদিল্লাহ : ১৪৩৪১)।
৩২৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৮-২৯)।
৩২৫. প্রাগুক্ত (১৭)।
৩২৬. আল-আকিদাহ আর-রুকনিয়্যাহ (৪৭)।