📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মাযহাব

📄 সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মাযহাব


আহলে সুন্নাতের সকল ইমামের মতে, ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি ও আমল দুটোর নাম। অর্থাৎ, একজন মুমিন-মুসলিম কেবল মুখে কালিমা পড়বে, সেটা জীবনে বাস্তবায়ন করবে না- এমন হতে পারে না। ইসলাম ধর্ম কেবল তাত্ত্বিকতার নাম নয়; বিশ্বাস ও কাজের সমন্বিত নাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো— ‘ঈমান’ অর্থ যেহেতু বিশ্বাস, আর বিশ্বাসটা সাধারণত অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সুতরাং ঈমানের তাত্ত্বিক সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে আমলের অবস্থান কী? অন্যকথায়, আমল ঈমানের সংজ্ঞার্থের অন্তর্ভুক্ত কি না।

পিছনে এ ব্যাপারে সংক্ষেপে কিছু কথা বলা হয়েছে। সেটা হলো, জমহুর (সংখ্যাগরিষ্ঠ) ফকিহ ও মুহাদ্দিস মনে করেন আমল ঈমানের সংজ্ঞার্থের অন্তর্ভুক্ত। বিপরীতে ইমাম আজম রহ. মনে করেন আমল জরুরি, কিন্তু সেটা ঈমানের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। এভাবে ইমাম আজম এবং অন্য ইমামদের মাঝে তাত্ত্বিক ও পারিভাষিক দিক থেকে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, যদিও উভয় বক্তব্যের মাঝে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। নিচে আমরা এটা আরও বিস্তারিত বর্ণনা করছি।

ইবনে ওয়াহাব থেকে বর্ণিত, ইমাম মালেককে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন : ‘ঈমান হলো (মুখের) কথা ও (অন্তর ও অঙ্গের) কাজ (قول وعمل)। এ ধরনের একই বক্তব্য সালাফের বিভিন্ন ইমাম থেকে বর্ণিত।’

আশহাব ইবনে আবদুল আযিয থেকে বর্ণিত, (নবিজির যুগে) মুসলমানগণ ষোলো মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাদের মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফিরিয়ে নামায আদায়ের নির্দেশ দেন। আল্লাহ বলেন, وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُوْনَ الرَّسُوْلُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا وَمَا جَعَلْنَا الْقিবْلَةَ الَّتِي كُنْتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يَتَّبِعُ الرَّسُوْلَ مِمَّনْ يَنْقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ وَإِنْ كَانَتْ لَكَبِيرَة إِلَّا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللهُ وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضিيعَ إِيمَانَكُمْ إِنَّ اللهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوْفٌ

অর্থ : ‘এভাবে আমি তোমাদের এক মধ্যপন্থি জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হও আর রাসুল তোমাদের জন্য সাক্ষী হন। (হে রাসুল) আপনি এ যাবৎ যে কিবলা অনুসরণ করছিলেন, একে আমি এ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যাতে জানতে পারি কে রাসুলের অনুসরণ করে আর কে ফিরে যায়। আল্লাহ যাদের সৎপথে পরিচালিত করেছেন, তারা ব্যতীত অপরের নিকট তা নিশ্চয়ই কঠিন। আল্লাহ এরূপ নন যে, তিনি তোমাদের ঈমানকে নষ্ট করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়ার্দ্র, পরম করুণাময়।’ [বাকারা : ১৪৩] আয়াতে ‘ঈমান নষ্ট না করা’ বলতে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে তোমাদের পড়া নামাযগুলো নষ্ট করবেন না বোঝানো হয়েছে। মালেক বলেন, ‘এ প্রসঙ্গে আমার মুরজিয়াদের বক্তব্য মনে পড়ে, তারা বলে, নামায ঈমানের অংশ নয়।’

রবি (ইবনে সুলাইমান) বলেন, আমি শাফেয়িকে বলতে শুনেছি, “ঈমান হলো: (মুখের) কথা, কাজ (আমল) এবং অন্তরের বিশ্বাস। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে আমল তথা বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে সাহাবাদের নামাযকে ‘আমল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। [বাকারা : ১৪৩] সুতরাং ঈমান হলো কথা, কাজ ও বিশ্বাস।” ইমাম আহমদ রহ. বলেন, ‘ঈমান হলো (মুখের) কথা, আমল এবং (অন্তরের) বিশুদ্ধ নিয়ত।’

এটা কেবল তিন ইমামের বক্তব্য নয়; জমহুর আহলে সুন্নাতের ইমামদের বক্তব্যও এক ও অভিন্ন। ইমাম বুখারি বলেন: ‘আমি হিজায, মক্কা, মদিনা, কুফা, ওয়াসেত, ইরাক, বাগদাদ, শাম এবং মিশরের হাজারের অধিক আলেমের সাক্ষাৎ পেয়েছি। তাদের কয়েকজন হলেন মক্কি ইবনে ইবরাহিম, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, কুতাইবা ইবনে সাইদ, শিহাব ইবনে মা’মার, মুহাম্মাদ আল-ফিরয়াবি, ইয়াহইয়া ইবনে কাসির, আবু সালেহ, নুআইম ইবনে হাম্মাদ, হুমাইদি, মুতাররিফ ইবনে আবদুল্লাহ, ইবরাহিম ইবনুল মুনযির, যাহহাক ইবনে মাখলাদ, হিশাম ইবনে আবদুল মালিক, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম, ইসহাক ইবনে ইবরাহিম হানযালি... (আরও অনেক নাম উল্লেখ করে বলেন) তাদের কাউকে এই বিষয়ে আমি মতভেদ করতে দেখিনি যে, দ্বীন (তথা ঈমান) হলো মুখের স্বীকারোক্তি ও আমল (الدين قول وعمل)।

তারা কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসের বাহ্যিক অর্থ দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। যেমন—আল্লাহ তায়ালা বলেন, فَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُم مَّন يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ ءَامَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ

‘যখনই কোনো সুরা অবতীর্ণ হয়, তাদের কেউ কেউ বলে, এটা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান বৃদ্ধি করল? যারা মুমিন, এটা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে আর তারা আনন্দিত হয়।’ [তাওবা : ১২৪] অন্যত্র বলেন, هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ وَلِلَّهِ جُنُودُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا

‘তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন, তাদের ঈমানের সঙ্গে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর বাহিনীসমূহ আল্লাহরই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ [ফাতাহ : ৪] আরেক জায়গায় বলেন, إِنَّ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

‘মুমিন তারা যাদের আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে।’ [আনফাল: ২] আরেক জায়গায় বলেন,

وَمَا جَعَلْنَا أَصْحَبَ الكثَارِ إِلَّا مَلَتَكَةً وَمَا جَعَلْنَا عِدَّتَهُمْ إِلَّا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا لِيَسْتَيْقِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ وَيَزْدَادَ الَّذِينَ ءَامَنُواْ إِيمَنَا وَلَا يَرْتَابَ الَّذِينَ অুতূ الْكِتَبَ وَالْمُؤْمِنُونَ وَلِيَقُولَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم মَّরَضٌ وَالكَفُرُونَ مَاذَا أَرَادَ اللهُ بِهَذَا মَثَلاً كَذَلِكَ يُضِلُّ اللهُ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِى মَن يَشَاءُ وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ وَمَا هِيَ إِلَّا ذِكْرَى لِلبَشر

অর্থ : “আমি জাহান্নামের প্রহরী হিসেবে কেবল ফেরেশতাদের মনোনীত করেছি। কাফেরদের পরীক্ষাস্বরূপই আমি তাদের এই সংখ্যা (তথা উনিশ) উল্লেখ করেছি যাতে কিতাবিদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মায়, মুমিনদের ঈমান বর্ধিত হয় এবং বিশ্বাসীগণ ও কতাবগণ সন্দেহ পোষণ না করে। এটার ফলে যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তারা ও কাফেররা বলবে, ‘আল্লাহ এই অভিনব উক্তি দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন?’ এইভাবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ দেখান। আপনার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। জাহান্নামের এই বর্ণনা তো মানুষের জন্য সাবধান বাণী।” [মুদ্দাসসির : ৩১] এখানকার সবগুলো আয়াতে ঈমান বাড়ার কথা বলা হয়েছে। কুরআনের কোথাও সরাসরি ঈমান কমার কথা বলা হয়নি। তবে—তাদের মতে—যে বস্তু বাড়ে বোঝা যায়, সেটা কমেও। এমন যুক্তিতে তারা ঈমানের বৃদ্ধি ও হ্রাস দুটোর কথাই বলেছেন।

বিভিন্ন হাদিসেও ‘আমল’-কে ঈমান বা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে বোঝা যায়। যেমন—প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে। সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা। আর সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। লজ্জা ঈমানের অংশ।” প্রসিদ্ধ আবদুল কায়সের প্রতিনিধি দল-সম্পর্কিত হাদিসে এসেছে, তারা ইসলাম গ্রহণের পরে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদের বললেন, ‘তোমরা এক আল্লাহর উপর ঈমান আনবে। তোমরা কি জানো এক আল্লাহর উপর ঈমান কী?’ তারা বলল, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসুল—এ সাক্ষ্য দেওয়া, নামায আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের রোযা রাখা এবং গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ দান করা।’ এখানে খোদ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ঈমানকে বিশ্বাস ও আমল দুটোর মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ফলে আমল যে ঈমানের অংশ সেটা বলা বাহুল্য।

টিকাঃ
২৯৯. আল-ইনতিকা, ইবনে আবদিল বার (৬৯)।
৩০০. প্রাগুক্ত (৭১)।
৩০১. প্রাগুক্ত (১৩৫)।
৩০২. আস-সুন্নাহ, খাল্লাল (৩/৫৮০)।
৩০৩. উসুলু ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১/১৯৩)।
৩০৪. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৩৫)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ : ৪৬৭৬)।
৩০৫. বুখারি (কিতাবুল ঈমান : ৫৩)। সহিহ ইবনে হিব্বান (কিতাবুল ঈমান : ১৭২)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ইমাম আজমের মাযহাব

📄 ইমাম আজমের মাযহাব


তাত্ত্বিকভাবে ইমাম আজম রহ. আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন না। কারণ, তাঁর কাছে ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইমাম তাঁর ওসিয়তে বলেন, ‘ঈমান আমল নয়, আমলও ঈমান নয়। এর স্বপক্ষে দলিল হলো—অনেক সময় আল্লাহ বান্দাকে বিভিন্ন আমল থেকে অব্যাহতি দেন, কিন্তু ঈমান থেকে দেন না। উদাহরণস্বরূপ হায়েয-নেফাসরত নারীদের আল্লাহ নামায-রোযা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন, কিন্তু ঈমান থেকে অব্যাহতি দেননি। যদি আমল ঈমানের অংশ হতো, তবে আমল থেকে অব্যাহতির মাধ্যমে তারা ঈমান থেকেও অব্যাহতি পেয়ে যেত। তখন আমলহীন অবস্থায় তাদের মুমিন বলা যেত না। কিন্তু শরিয়ত তাদের মুমিন বলে।

একইভাবে আমল বাড়ে-কমে, অথচ ঈমান বাড়ে-কমে না। যেমন—যেসব বিষয়ে ঈমান আনা জরুরি, সেসব বিষয়ে জীবনের প্রথম দিন থেকে শুরু করে শেষ দিন পর্যন্ত ঈমান রাখতে হয়। কোনো কমবেশ হয় না। অথচ আমলের ক্ষেত্রে কমবেশ হয়। যেমন—কেউ পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, কেউ এগুলো পড়ার ক্ষেত্রে ত্রুটি করে। সুতরাং কেউ যদি কম নামায পড়ে, তার গুনাহ হবে, কিন্তু আদায়কৃত নামাযগুলো বাতিল হয়ে যাবে না। একইভাবে কেউ যদি রমযানের অর্ধেক রোযা রাখে, তার বড় গুনাহ হবে, কিন্তু রোযা বাতিল হবে না। ফলে আমল কমে যাওয়া স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। ঈমান কমার সঙ্গে এর সম্পৃক্ততা নেই। কারণ, ঈমানের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে ঈমান এনে অন্য বিষয় ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বোঝা গেল, আমল ঈমানের চেয়ে ভিন্ন বিষয়।

উসমান বাত্তির কাছে লেখা চিঠিতে ইমাম বলেন, “...আল্লাহর রাসুল (ﷺ)-এর আগমনের আগে মানুষ মুশরিক ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এসে তাদের ইসলামের দিকে ডাকেন, কালিমায়ে শাহাদাতের দিকে ডাকেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-কিছু নিয়ে এসেছেন সেগুলোতে বিশ্বাস করার দিকে ডাকেন। যারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয়, তারা শিরক থেকে মুক্ত হয়ে মুমিন হিসেবে পরিচিতি পায়। তাদের সম্পদ ও প্রাণ সুরক্ষিত হয়ে যায়। কিন্তু যারা তাঁর ডাকে সাড়া না দেয়, তারা বেঈমান ও কাফের হিসেবে পরিচিতি পায়। তাদের সম্পদ ও প্রাণ হালাল হয়ে যায়। হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে (যেমন আহলে কিতাব) আল্লাহ ‘জিযিয়া’র বিকল্প সুযোগও উন্মুক্ত রাখেন। অতঃপর সত্যায়নকারীদের উপর আল্লাহ বিভিন্ন ফরয ইবাদত ধার্য করেন। সেগুলো ঈমানের পরে আমল হিসেবে পরিগণিত হয়, যেমনটা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ﴿وَالَّذِيْنَ اٰমَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰতِ ﴾ অর্থ : ‘যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে।’ [বাকারা: ৮২] তিনি অন্যত্র বলেছেন, ﴿ وَمَنْ يُّؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَيَعْمَلْ صَالِحًا ﴾ অর্থ : ‘আর যে আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে।’ [তাগাবুন : ৯] কুরআনে এমন আয়াত অসংখ্য। এভাবে তারা আমলের আগেই মুমিন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। যদি আমলকেও ঈমান বলা হয়, তবে এসব ইবাদত আসার আগে তারা মুমিন অভিধা পেতেন না। মোটকথা, সত্যায়ন (ঈমান) ও আমলের রূপরেখা ভিন্ন। কেউ আমল নষ্ট করলে তার ঈমানও নষ্ট হয়ে যাবে এমন নয়। কারণ, ঈমান আনার সময় আমল ছিলই না, আমল ছাড়াও ঈমান ছিল। তা ছাড়া, আমলে বিচ্যুতির কারণে যদি ঈমানেও বিচ্যুতি অনিবার্য হয়, তবে কেউ আমলে ত্রুটি করলেই ঈমান থেকে বেরিয়ে কাফের ও মুশরিক হয়ে যাওয়ার কথা, অথচ সেটা কেউ বলবে না। কারণ, ঈমানের ক্ষেত্রে মানুষের মাঝে কোনো স্তরভেদ নেই। হ্যাঁ, আমলের ক্ষেত্রে স্তরভেদ রয়েছে। ঈমানের ক্ষেত্রে কমবেশ নেই। ফরয ইবাদতের ক্ষেত্রে কমবেশ রয়েছে। পৃথিবীর সকল রাসুল এবং সকল মানুষের দ্বীন একটাই। আমরা বলি জালেম মুমিন, পাপী মুমিন, বিচ্যুত মুমিন, অবাধ্য মুমিন, অসৎ মুমিন ইত্যাদি। অথচ পাপ, বিচ্যুতি, অবাধ্যতা, অসততা—সবগুলোই অপরাধ, আমল বিনষ্টকারী। আমল আর ঈমান যদি এক হতো, তবে এসব অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিদের তো মুমিনই বলা হতো না।”

ইমাম আজম অন্যত্র বলেন, ‘যদি কেউ তাওহিদ থেকে দূরের কোনো শিরকের ভূখণ্ডে থেকেও আল্লাহর উপর ঈমান রাখে, ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো স্বীকার করে, কিন্তু শরিয়তের কোনো বিধান তার জানা না থাকে, তবুও সে মুমিন হিসেবে গণ্য হবে।’ এখানে লক্ষণীয়, এই ব্যক্তির আকিদা ছাড়া আর কিছু জানা নেই, কোনো আমল নেই, তবুও সে মুমিন। যদি আমল ঈমানের মৌলিক অংশ হতো, তাহলে আমলবিহীন এই ব্যক্তিকে মুমিন বলা যেত না। এক্ষেত্রে ইমামের সঙ্গে জমহুর একমত। ফলে দেখা যায়, সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে যদিও তারা আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করেন, তথাপি কার্যত তারা আমলকে ঈমান থেকে ভিন্ন সত্তাই মনে করেন এবং এটা করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথও নেই।

ইমাম আজম আরও একটি ভাবে তাঁর মাযহাবের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেন। তিনি বলেন, ‘শরিয়ত দ্বীনের পরের স্তরে। কেউ ঈমান এনে দ্বীন গ্রহণ করার পরেই শরিয়তের বিধিবিধান তাঁর উপর প্রযোজ্য হয়। আল্লাহ বলেন, قُل لِّعِبَادِيَ الَّذِينَ آمَنُوا يُقِيمُوا الصَّلُوة অর্থ : ‘আপনি আমার মুমিন বান্দাদের নামায পড়তে বলুন।’ [ইবরাহিম : ৩১] আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর নিহতের ক্ষেত্রে কিসাস অপরিহার্য করা হয়েছে।’ [বাকারা : ১৭৮] এসব আয়াতে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা ইবাদত করার আগেই মুমিন হিসেবে সম্বোধন করছেন। যদি এসব ফরয ইবাদত ঈমান গণ্য হতো, তবে এগুলো করার আগে তাদের মুমিন বলা হতো না। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا সَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ অর্থ : যে ব্যক্তি আখেরাত প্রত্যাশা করে এবং তার জন্য চেষ্টা করে, এই অবস্থায় যে সে মুমিন...। [ইসরা : ১৯] এখানে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ঈমান ও আমলের ভিতরে পার্থক্য করেছেন। পরকালের জন্য বিভিন্ন চেষ্টা-প্রচেষ্টা তথা আমলকে ঈমান থেকে আলাদা করেছেন। তা ছাড়া, মুমিনরা আল্লাহর উপর ঈমান আনার কারণেই নামায পড়ে, রোযা রাখে, যাকাত দেয়। বিপরীতটা নয়। অর্থাৎ, নামায পড়ার কারণে, রোযা রাখার কারণেই আল্লাহর উপর ঈমান আনে না। বরং প্রথমে ঈমান আনে, এর পর ফরয বিধিবিধান মানে। তাহলে আমল ঈমানের ফলাফল হিসেবে সামনে এলো, ঈমান আমলের ফলাফল নয়। যেমন—কারও উপর ঋণ থাকলে প্রথমে ঋণের কথা স্বীকার করে, এর পর ঋণ আদায় করে। স্বীকার করার আগে আদায় করে না। কারণ, স্বীকার না করলে আদায় করার প্রশ্নও উঠত না। একইভাবে কেউ কারও গোলাম হলে প্রথমে গোলামির কথা স্বীকার করে। এর পর তার আনুগত্য করে এবং তার জন্য কাজ করে। কিন্তু কারও জন্য কাজ করলেই তার গোলাম হয়ে যায় না। অথচ গোলামির স্বীকৃতি দিলে কাজ না করলেও গোলাম গণ্য হয়।

টিকাঃ
৩০৬. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৩৩-৩৪)।
৩০৭. দেখুন : শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১৫০-১৫১)।
৩০৮. রিসালাতু আবি হানিফা ইলা উসমান আল-বাত্তি (৩৪-৩৮)।
৩০৯. আল-ফিকহুল আবসাত (৪২)।
৩১০. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১২-১৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অধমের পর্যবেক্ষণ

📄 অধমের পর্যবেক্ষণ


বাস্তবতা হলো, এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহের সঙ্গে ইমাম আজম এবং হানাফি উলামায়ে কেরামের বিরোধ তাত্ত্বিক, মৌলিক নয়। আর এটাই স্বাভাবিক। ঈমানের মতো মৌলিক বিষয় এবং দ্বীনের ভিত্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের ইমামদের মাঝে কোনো মৌলিক পার্থক্য থাকবে এটা অচিন্তনীয়। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে বিভিন্ন ফিরকা পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। যেমন-জাহমিয়্যাদের মতে ঈমান হলো স্রেফ জানার নাম। জানার বাইরে মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন ও আত্মসমর্পণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, ভয়, ভরসা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল—এগুলোর কোনোকিছুই ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের মতে, কুফর হলো স্রেফ আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতা! এটা জঘন্য আকিদা। কারণ, এর মাধ্যমে জগতের অধিকাংশ কাফের মুমিন হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, কেউ আল্লাহ বলতে একজন আছেন এটুকু জানলেই মুমিন হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাস কিংবা আমল তাদের কাছে একেবারেই নিরর্থক ও নিষ্প্রয়োজন। ভ্রান্ত কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায় মনে করে, ঈমান হলো স্রেফ মুখের স্বীকৃতি। অন্তরের সত্যায়ন ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়, আমল তো নয়ই। এটাও জঘন্য আকিদা। এর মাধ্যমে মুনাফিকরাও মুমিন হয়ে যাচ্ছে। অথচ মুনাফিকরা কুরআন-সুন্নাহমতে জঘন্য পর্যায়ের কাফের। তাদের অবস্থান হবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আল্লাহ তাআলা বলেন : إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا

‘মুনাফিকরা থাকবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তাদের জন্য আপনি কখনো কোনো সহায় পাবেন না।’ [নিসা : ১৪৫]

এভাবে আমলকে ঈমানের সংজ্ঞার্থের বহির্ভূত ধরার ক্ষেত্রে জাহমিয়্যাহ ও কাররামিয়্যাহ, অন্যকথায় বৃহত্তর মুরজিয়াদের সঙ্গে হানাফি মাযহাবের বাহ্যিক সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু এ সাদৃশ্য সত্ত্বেও তারা কখনোই এসব গোমরাহ ফিরকার অন্তর্ভুক্ত নয়। কিংবা তাদের আকিদা আর গোমরাহ ফিরকাগুলোর আকিদা এক নয়। কারণ, তারা আমলকে মৌলিকভাবেই ঈমান থেকে খারিজ করে দেয়। বিপরীতে ইমাম আজম এবং হানাফি উলামায়ে কেরাম আমলকে ঈমানের সংজ্ঞার্থ থেকে বাইরে রাখেন, মূল ঈমানের বাইরে রাখেন না। বরং, যেমনটা আমরা পিছনে দেখেছি, তাদের মতে ঈমান ও ইসলাম এক। আর জমহুরও এ ব্যাপারে একমত যে, ঈমান হলো বিশ্বাসগত বিষয়, ইসলাম হলো বাহ্যিক আমলগত বিষয়। ফলে আংশিক সাদৃশ্যের কারণে হানাফিদের এসব গোমরাহ ফিরকার মতো মনে করা ভ্রান্তি, ঠিক যেমন আংশিক সাদৃশ্যের কারণে জমহুর মুহাদ্দিসিনকে খারেজি ও মুতাযিলাদের মতো মনে করা ভ্রান্তি। কারণ, ঈমানের সংজ্ঞার্থের ক্ষেত্রে খারেজি ও মুতাযিলাদের মতাদর্শ মুহাদ্দিসিনের মতাদর্শসদৃশ। তাদের মতে মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল তিনটিই ঈমান। তিন ইমাম এবং মুহাদ্দিসদের মতেও ঈমান তিনটির সমন্বয়। কিন্তু তাদের আর গোমরাহ ফিরকাগুলোর মাঝে পার্থক্য হলো, এসব ফিরকা সবগুলো বিষয়কে একটি একক মনে করে। ফলে সামান্য নষ্ট হলে পুরোটা নষ্ট ধরে। এ কারণে তারা ঈমান শুদ্ধ হওয়ার জন্য কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার শর্ত দেয়। কারণ, কবিরা গুনাহ করার অর্থ হলো আমলের ক্ষেত্রে বিচ্যুতি আসা। আর আমল যেহেতু ঈমানের অঙ্গ এবং ঈমান যেহেতু তাদের কাছে একটি একক, ফলে খারেজিদের মতে কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি কাফের। অথচ আহলে সুন্নাত এমন ব্যক্তিকে কাফের বলেন না। বোঝা গেল, আংশিক সাদৃশ্যের কারণে তাদের এক ভাবার সুযোগ নেই।

মোটকথা, ঈমানকে সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত কি না এ বিষয়ে ইমাম আজম এবং জমহুর ফুকাহা-মুহাদ্দিসদের মাঝে যে মতপার্থক্য, সেটা নিতান্তই শাব্দিক ও পারিভাষিক। এমন কোনো মৌলিক পার্থক্য নয়, যার ফলে ঈমানের ক্ষেত্রে কিংবা আমলের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য দেখা দেয় কিংবা বিচ্যুতি আসে। হানাফি উলামায়ে কেরাম এবং বাকি তিন মাযহাবের উলামায়ে কেরাম সকলে আমলের প্রতি সমান যত্নবান, সম্পূর্ণ একমত। তাদের কেউ কবিরা গুনাহকারীকে এবং আমল পরিত্যাগকারীকে কাফের না বলার ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ একমত। সুতরাং প্রকৃত অর্থেও তাদের সকলের বক্তব্য সঠিক। ঈমানকে স্রেফ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার কারণে সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ফলাফলে কোনো পার্থক্য নেই। বরং ইমাম আজমের বিভিন্ন বক্তব্যও খোদ জমহুরের বক্তব্যের মতো—সম্পূর্ণ এক ও অভিন্ন। ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থে ইমাম বলেন, ঈমান হলো, ‘সত্যায়ন করা (তাসদিক), জানা (মারিফাত), ইয়াকিন রাখা, মুখে স্বীকার করা (ইকরার) করা এবং আত্মসমর্পণ করা (ইসলাম)।’ এখানে ইমাম আজম ঈমানের অর্থের মাঝে ‘ইসলাম’-কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর ইসলাম হলো বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল। যেমন— নামায, রোযা ইত্যাদি। ফলে তাত্ত্বিকভাবে তিনি আমলকে আলাদা করলেও প্রায়োগিকভাবে ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল তিনটির সমন্বিত রূপ মনে করেন। এতে তাঁর বক্তব্যের মাঝে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের বক্তব্যের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না। মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ইবনে যিয়াদ থেকে বর্ণিত, আবু হানিফা রহ. বলেন, ঈমান হলো ‘কথা’ (তথা হৃদয়ের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি), আর আমল হলো ঈমানের জন্য আবশ্যক বিষয় (الإيمان قول والعمل موظف عليه)।

উপরন্তু সংজ্ঞার্থের বিভিন্নতার বিষয়টির ক্ষেত্রেও আমরা যদি গভীরে যাই, তবে দেখব, ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্য অধিক যৌক্তিক। আমলকে ঈমানের সংজ্ঞায়নের অন্তর্ভুক্ত না করাই মৌলিক, অন্তর্ভুক্ত করা নতিজা ও ফলাফলভিত্তিক। কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন নস এ কথার প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সকল নবি-রাসুলকে দ্বীন কায়েম করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, শَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّيْنِ مَا وَصَّى بِهِ نُوْحًا وَ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَ عِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوْا فِيْهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوْهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَنْ يَشَاءُ وَ يَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ يُنِيْبُ অর্থ : ‘তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন সেই দ্বীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নুহকে। আর যা আমি ওহি করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাকে এই বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং এতে মতভেদ করো না। আপনি মুশরিকদের যার প্রতি আহ্বান করছেন, সেটা এদের নিকট দুর্বহ মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী তাকে দ্বীনের দিকে পরিচালিত করেন।’ [শুরা : ১৩]

উপরের আয়াতে দ্বীন বলতে ইসলাম ধর্ম উদ্দেশ্য। আর আমরা জানি, প্রত্যেক নবি-রাসুলের ধর্ম ইসলাম হলেও তাদের শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল। শরিয়তে মুহাম্মাদি আসার পর তাদের সেসব শরিয়তের অনেককিছু রহিত হয়ে গেছে। বরং কুরআনেরও বিভিন্ন বিধান রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় রহিত হয়ে গিয়েছে। এক ফরযের জায়গায় অন্য বিষয় ফরয হয়েছে। যদি আমলকেও ঈমান বলতে হয়, তাহলে কোনো নবির উম্মতের ঈমান কম আর কোনো নবির উম্মতের ঈমান বেশি বলতে হবে। ঈমানের কিছু অংশ রহিত হয়ে নতুন অংশ জন্মানোর কথা বলতে হবে। অথচ ঈমান এক। জগতের সকল নবি-রাসুলের ঈমানের প্রতি দাওয়াতের মূল কথা এক। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নবুওতের প্রথম যুগে মানুষকে ঈমানের প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিধিবিধান অবতীর্ণ হয়েছে। তাহলে বলতে হবে, তিনি অপূর্ণ দ্বীনের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। তা ছাড়া, তিনি হাদিসে বলেছেন, ‘আমি মানুষের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...। যখন তারা এটা বলবে, তখন তাদের রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ হয়ে যাবে। তাদের হিসাব থাকবে আল্লাহর উপর।’ এখানেও আমল ছাড়া কেবল সাক্ষ্যকেই ঈমান সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহর রাসুল আরও বলেন, “তোমরা বলো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, সফল হয়ে যাবে।” এখানেও মুখের বলার সঙ্গে সাফল্য সংযুক্ত করেছেন; আমলের সঙ্গে নয়। তা ছাড়া, আল্লাহর রাসুল সবাইকে আমলের আগে ঈমানের নির্দেশ দিতেন। যদি আমলকে ঈমানের মূল বিষয় ধরা হয়, তবে নওমুসলিমকে ‘ত্রুটিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী’ বলতে হবে, অথচ তার ঈমানে কোনো ত্রুটি নেই।

টিকাঃ
৩১৩. দেখুন: মাকালাতুল ইসলামিয়িান (১/১১৪-১১৫)। শরহুল ওয়াসিয়‍্যাহ, মুফতি যাদাহ (৩২)। আল- মিলাল ওয়ান নিহাল (১/১১৩)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৭৬)।
৩১৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৩)।
৩১৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১০৫)।
৩১৬. বুখারি (কিতাবুল ঈমান : ২৫)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ২০)।
৩১৭. মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল ঈমান: ৩৯)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুত তারিখ: ৬৫৬২)। দারাকুতনি (কিতাবুল বুয়ু: ২৯৭৬)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 একটি সংশয় নিরসন

📄 একটি সংশয় নিরসন


প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে বিভিন্ন হাদিসে আমলকে ঈমানের অংশ কেন বলা হয়েছে? বিভিন্নভাবে এর উত্তর দেওয়া যেতে পারে:

এক. ঈমানের শাখাগত বিষয় এবং নতিজা হিসেবে বলা হয়েছে, মৌলিক অংশ হিসেবে নয়। এ জন্য সেগুলোর নামও দেওয়া হয়েছে ‘ঈমানের শাখা’, মূল নয়। আবুল ইউসর বাযদাবি লিখেন, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতে, ঈমানের শাব্দিক অর্থ সত্যায়ন। পরিভাষায় ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি। অর্থাৎ, অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ ছাড়া উলুহিয়্যাতের উপযুক্ত কেউ নেই। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমরা আল্লাহর সকল সিফাতে বিশ্বাস রাখি। নবিগণ তাঁর পক্ষ থেকে যা-কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলোতে ঈমান রাখি। ইসলামের সকল রুকনে বিশ্বাস রাখি। মুখে সেগুলোর স্বীকৃতি দিই। ফলে ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন। মুরজিয়াদের মতে ঈমান স্রেফ জানা। কাররামিয়্যাহদের মতে স্রেফ মুখের স্বীকৃতি। আশআরিদের নিকট স্রেফ অন্তরের সত্যায়ন। বিপরীতে শাফেয়ি এবং একদল মুহাদ্দিসের কাছে আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। ফলে তাদের কাছে ঈমানের সংজ্ঞা হলো কথা ও কাজ (আমল)। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও তারা আমল ছাড়া ঈমানকে বিশুদ্ধ গণ্য করেছেন। আমল ছেড়ে দেওয়ার কারণে কাউকে কাফের বলেননি। ফলে তাদের বক্তব্যের মর্মার্থ যেন : আমল ঈমানের ফলাফলস্বরূপ এর অন্তর্ভুক্ত। এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত (তথা হানাফিদেরও) বক্তব্য। ফলে দুটোর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

দুই. বিপরীত অবস্থা তথা কুফরের সঙ্গে তুলনা করে; অর্থাৎ, সত্যায়ন ছাড়া যা-কিছু রয়েছে, যেমন—আল্লাহর বিভিন্ন আনুগত্য, ইবাদত—এগুলো ‘কুফরের বিপরীত ঈমান’ এই অর্থে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু স্বাভাবিক ও সামগ্রিক অর্থে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।

টিকাঃ
৩১৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৪৮-১৪৯)।
৩১৯. দেখুন: জুমাল মিন উসুলিদ্দিন (২৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00