📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ঈমান ও ইসলামের আন্তঃসম্পর্ক

📄 ঈমান ও ইসলামের আন্তঃসম্পর্ক


ঈমান শব্দের শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস করা, সত্যায়ন করা। অপরদিকে ইসলাম অর্থ হলো আত্মসমর্পণ করা, আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য করা। অন্যকথায়, ইসলাম অর্থ হলো—আল্লাহর সকল বিধান, হালাল-হারাম, ফরয-ওয়াজিবের প্রতি সন্তুষ্ট ও অনুগত থাকা; আল্লাহর শরিয়তের উপর কোনো আপত্তি না থাকা। এ হিসেবে ইসলাম ও ঈমানের মাঝে পার্থক্য আছে। একইভাবে ঈমানের জায়গা হলো হৃদয়। মুখ সেটার মুখপাত্র। অন্যদিকে ইসলামের জায়গা মানুষের হৃদয়, মুখ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবকিছু। এ হিসেবেও দুটোর মাঝে পার্থক্য আছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বেদুইনরা বলে, আমরা ঈমান আনলাম। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো, আমরা (বাহ্যিক) আত্মসমর্পণ করেছি। কারণ, ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।’ [হুজুরাত : ১৪] প্রসিদ্ধ হাদিসে জিবরিলে রাসুলুল্লাহ (সা)-কে জিবরাইল আ. ঈমান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ঈমান হলো আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসুল, পরকাল এবং তাকদিরের ভালোমন্দে বিশ্বাস করা। ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলে রাসুল বললেন, ইসলাম হলো, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। ’-এ সাক্ষ্য দেওয়া, নামায কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের রোযা রাখা এবং সামর্থ্য থাকলে বাইতুল্লাহর হজ করা।

এসব আয়াত ও হাদিসের ভিত্তিতে ভ্রান্ত মুতাযিলা ও রাফেযি সম্প্রদায় মনে করে ঈমান ও ইসলাম আলাদা। ফলে তাদের কাছে কবিরা গুনাহকারী মুসলিম, কিন্তু মুমিন নয়। তাই কেউ যদি দরিদ্র ‘মুমিনদের’ সদকা দেওয়ার ওসিয়ত করে, তবে তাদের মতেকবিরা গুনাহকারী কিংবা আহলে সুন্নাতের লোকজন অন্তর্ভুক্ত হবে না। তারা সদকা পাবে না! কেবল শিয়া ও মুতাযিলারা পাবে। বিপরীতে যদি দরিদ্র মুসলমানদের সদকা দেওয়ার ওসিয়ত করে, তবে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত সবাই পাবে।

এটা গলত বক্তব্য। কারণ, উপরের আয়াত ও হাদিসে ঈমান ও ইসলামের মাঝে পার্থক্য বোঝা গেলেও এবং তাত্ত্বিকভাবে পার্থক্য থাকলেও কার্যত ও মৌলিক পার্থক্য নেই। আল্লাহ তায়ালার বাণী : ‘সে জনপদে যারা মুমিন ছিল, আমি তাদের উদ্ধার করেছিলাম। তবে সেখানে একটি ঘর ব্যতীত আর কোনো মুসলিম আমি পাইনি।’ [যারিয়াত : ৩৫-৩৬] এখানে একটি ঘর তথা লুত আ. এবং তাঁর পরিবারকে একবার মুমিন আবার তাদেরকেই মুসলিম বলা হয়েছে। বোঝা গেল, মুসলিম ও মুমিন অভিন্ন বিষয়।

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা মুসা আ.-এর ভাষায় বলেন, ‘মুসা বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাকো, তবে তোমরা তাঁরই উপর নির্ভর করো যদি তোমরা মুসলিম হয়ে থাকো।’ [ইউনুস : ৮৪] এখানেও মুমিন ও মুসলিম ভিন্ন অর্থে বোঝালেও মৌলিকভাবে এক বলা হয়েছে। আল্লাহ আরও বলেন, ‘তারা ইসলাম গ্রহণ করে আপনার উপকার করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে আমার উপকার করোনি; বরং আল্লাহ ঈমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদের অনুগ্রহ করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকো।’ [হুজুরাত : ১৭] এখানেও ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক বানানো হয়েছে।

‘তোমরা বলে দাও যে, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সেই বাণীর প্রতি যা আমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে, আর যা ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাদের সন্তানদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা দেওয়া হয়েছিল মুসা ও ঈসাকে, যা অন্যান্য নবিকে তাঁদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। আমরা নবিগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই অনুগত (মুসলিম)।’ [বাকারা : ১৩৬] এখানেও যারা মুমিন, তারাই মুসলিম।

আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষকে কেবল দুই ভাগে ভাগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদের কেউ কাফের হয়েছে, কেউ মুমিন। তোমরা যা করো আল্লাহ সব দেখেন।’ [তাগাবুন : ২] আল্লাহ আরও বলেন, ‘যারা আমার আয়াতসমূহে ঈমান আনে, আর যারা মুসলিম।’ [যুখরুফ : ৬৯] আরও বলেন, ‘আপনি অন্ধদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে সুপথে আনতে পারবেন না। আপনি শোনাতে পারবেন কেবল তাদের যারা আমার নিদর্শনাবলিতে বিশ্বাস করে। আর তারাই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)।’ [নামল : ৮১]

মৌলিকভাবে ঈমান ও ইসলাম একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে—যেমনটা ইমাম বলেছেন— ‘ইসলাম ছাড়া ঈমান হয় না, আবার ঈমান ছাড়া ইসলাম পাওয়া যায় না। উভয়ে যেন একই (মুদ্রার) এপিঠ-ওপিঠ।’ কারণ, ঈমান হলো অন্তরে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি ও উলুহিয়্যাহর সত্যায়ন করা এবং মুখে সেটার স্বীকৃতি দেওয়া। কেউ যখন এটা করবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে আল্লাহর বিধিবিধানের প্রতি আত্মসমর্পিত এবং তাঁর শরিয়তের সামনে নতশির হয়ে যাবে। আবার কেউ আল্লাহর বিধানের প্রতি তখনই নতশির ও শ্রদ্ধাশীল হয়, যখন তার মনে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, সত্যায়ন ও স্বীকৃতি থাকে। ফলে মুসলিম হওয়া ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না, মুমিন হওয়া ছাড়া মুসলিম হওয়া যায় না।

এটা কেবল ইমাম আজম নয়, সালাফের অনেক বড় বড় ইমামেরও বক্তব্য। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ইমাম বুখারি। তিনি ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক মনে করতেন। ইমাম আজমের মতো তাঁরও বক্তব্য হলো, ঈমান ও ইসলামের সমন্বয়ে দ্বীন গঠিত। হাদিসে জিবরিল, আবদুল কায়সের প্রতিনিধি দল-সংক্রান্ত বর্ণনাসহ বিভিন্ন হাদিসে ঈমান ও ইসলামের সমার্থক হওয়া এবং একটার জায়গায় অন্যটার ব্যবহার লক্ষণীয়। অর্থাৎ, হাদিসে জিবরিলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বিশ্বাস-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে ঈমান এবং আমলসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে ইসলাম বললেও আবদুল কায়সের প্রতিনিধি দলকে ঈমানের কথা বলার সময় নামায, রোযা, যাকাত ও গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর পথে দেওয়াকেও ঈমানের সংজ্ঞার্থে উল্লেখ করেছেন। আর এটা বোঝা সহজ। কারণ, মুহাদ্দিসদের কাছে আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আর ইসলাম হলো আমলের নাম। ফলে ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক বলাই স্বাভাবিক। কেবল বুখারি নন, মালেক, শাফেয়ি, মুহাম্মাদ ইবনে নসর আল-মারওয়াযি, ইবনে মানদাহ, ইবনে আবি শাইবাসহ আহলে সুন্নাতের অসংখ্য বড় বড় ইমাম থেকে দুটোর সমার্থক হওয়ার বক্তব্য প্রমাণিত।

ইমাম আজম রহ. এবং সালাফের অনুসরণে সকল হানাফি আলেম একই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাদের সকলের মতে, ঈমান ও ইসলামের মাঝে মৌলিক পার্থক্য নেই। দুটো একই বস্তু। ভিন্ন ভিন্ন নাম, কিন্তু মৌলিকভাবে সমার্থক কাছাকাছি শব্দ। প্রত্যেক মুমিন মুসলিম, আবার প্রত্যেক মুসলিম মুমিন। কারণ আল্লাহর একত্ববাদের পূর্ণ সাক্ষ্য, আল্লাহর নির্দেশ ও বিধিবিধানের প্রতি আনুগত্য, আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ দাসত্ব-এ সবকিছু দুটোর মাঝে অন্তর্ভুক্ত।

মাতুরিদি লিখেন, “আমাদের মতে উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ রেখে ঈমান ও ইসলাম এক। হ্যাঁ, মুখের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটোর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। যেমন কাফেরকে ‘মুসলিম’ বললে তারা মেনে নেয় না, কিন্তু ‘বিশ্বাসী’ (মুমিন) বললে মেনে নেয়। স্বাভাবিক ইসলাম বললে দ্বীন বোঝায়, ঈমান বললে সেটা বোঝায় না। এ জন্য ‘দার’-এর প্রকরণে ‘দারুল ইসলাম’ বলা হয়, ‘দারুল ঈমান নয়’। কিন্তু উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ, ঈমান হচ্ছে আল্লাহর একত্ববাদ, কর্তৃত্ব, ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, তাঁর লা শরিক ইলাহত্বকে মেনে নেওয়া; ইসলামও হলো তাঁর প্রতি পূর্ণ সমর্পিত হওয়া। ফলে দুটোর উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক।”

মোটকথা, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর উম্মত হওয়ার জন্য মুমিন ও মুসলিম দুটোই হতে হবে। কেউ ইসলাম পরিত্যাগ করে মুমিন হতে পারবে না; আবার কেউ ঈমান পরিত্যাগ করে মুসলিম হতে পারবে না। যে ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহকে বিশ্বাস ও আমল দুটোর মাধ্যমেই গ্রহণ করবে, সে মুমিন ও মুসলিম দুটোই। ইমাম আজম বলেন, “aunque এগুলোর নাম ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু মূলকথা এক (أسماء مختلفة ومعناها واحد), আর তা হলো ঈমান। মানুষকে যেমন ‘রাজুল’, ‘ইনসান’, ফুলান’ বিভিন্ন নামে বোঝানো যায়, ঈমানকেও বিভিন্ন নামে বোঝানো হয়।” মাতুরিদি লিখেন, “বাস্তব ফলাফলের ক্ষেত্রে দুটোর মাঝে পার্থক্য নেই। ‘ইনসান’ (মানুষ), ‘ইবনে আদম’ (আদম সন্তান), ‘রাজুল’ (লোক), ‘ফুলান’ (জনৈক ব্যক্তি)-এর সম্পর্ক যেমন, ‘ঈমান’ ও ‘ইসলাম’-এর সম্পর্ক তেমন। বাহ্যিক অর্থে পার্থক্য আছে, মূল উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে অভিন্ন। একটি পাওয়া গেলে অন্যটিও পাওয়া যায়। একটি না থাকলে অন্যটিও থাকে না।”

এ ব্যাপারে অধমের বক্তব্য হলো-ঈমান ও ইসলাম দুটো শাব্দিকভাবে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র শব্দ। অর্থাৎ, শাব্দিকভাবে দুটোর অস্তিত্ব ভিন্ন। অর্থের ক্ষেত্রেও মৌলিকভাবে দুটোর অর্থ ভিন্ন। ফলে এ দুটোর ভিন্নতা অনস্বীকার্য। তবে শরিয়তে এ দুটোকে কোথাও ভিন্নার্থে, আবার কোথাও সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বেদুইনরা বলে, আমরা ঈমান আনলাম। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো, আমরা (বাহ্যিক) আত্মসমর্পণ (ইসলাম গ্রহণ) করেছি। কারণ, ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।’ [হুজুরাত : ১৪] এখানে ঈমান ও ইসলামকে আলাদা করা হয়েছে। অথচ অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সে জনপদে যারা মুমিন ছিল আমি তাদের উদ্ধার করেছিলাম। সেখানে একটি ঘর ব্যতীত আর কোনো মুসলিম আমি পাইনি।’ [যারিয়াত : ৩৫- ৩৬] এখানে দুটোকে এক ও অভিন্ন বলা হয়েছে। একইভাবে ‘হাদিসে জিবরিলে’ দুটোকে আলাদা অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ ‘আবদুল কায়সের প্রতিনিধি দলের’ হাদিসে দুটোকে এক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, দুটো পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। একটি অপরটির পরিপূরক। দুটোর সমন্বয়ে দ্বীন। ফলে প্রসঙ্গ দেখে এর অর্থ নির্ধারিত হবে। মূল অর্থের দিকে তাকালে দুটোকে আলাদা বলতে হবে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে দ্বীনের সকল বিষয় বোঝানোর জন্য একটাকে ব্যবহার করলে অন্যটাও অন্তর্ভুক্ত হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, ইমাম আজম রহ. এবং হানাফি আলেমদের ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক বলা জমহুর তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের সঙ্গে ঈমানের সংজ্ঞার্থে তাদের মৌলিক মতপার্থক্য না থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অর্থাৎ, জমহুরের কাছে আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আর বাহ্যিক আমলকে কুরআন-সুন্নাহতে ইসলাম বলা হয়েছে। সুতরাং যখন ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক বলা হলো, তখন তারাও আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন প্রমাণিত হলো। এভাবে তাদের মাঝে আর জমহুরের মাঝে মৌলিক বিরোধ থাকল না।

টিকাঃ
২৯০. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ৮)। বুখারি (কিতাবুল ঈমান : ৫০)।
২৯১. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৫৭)।
২৯২. আল-ফিকহুল আকবার (৬)।
২৯৩. বুখারি (কিতাবুল ঈমান : ৫৩)।
২৯৪. দেখুন: আত-তামহিদ, ইবনে আবদিল বার (৫/২৪৭)। ফাতহুল বারি (১/১১৫)।
২৯৫. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৯৫)।
২৯৬. আত-তাওহিদ (২৮৪)।
২৯৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৪)।
২৯৮. দেখুন: আত-তাওহিদ (২৮৫)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২২৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00