📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মুহাক্কিক হানাফি ইমামগণের মতামত

📄 মুহাক্কিক হানাফি ইমামগণের মতামত


মুহাক্কিক হানাফি ইমামগণের মতামত: প্রথম যুগের হানাফি ইমামদের মতামতও জমহুর আহলে সুন্নাত এবং ইমাম আজমের মতামতের মতোই। বিষয়টির গুরুত্বের প্রতি লক্ষ রেখে এ সম্পর্কে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিছু ইমামের বক্তব্য আমরা নিচে তুলে ধরছি :

* ইবরাহিম ইবনে তাহমান (১৬৩ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো গোপনে ও প্রকাশ্যে সত্যায়ন করা।’ উল্লেখ্য, প্রকাশ্যে সত্যায়ন হলো স্বীকৃতি। ইমামের শাগরেদ হাফস ইবনে আবদুর রহমান (১৯৯ হি.) বলেন, ‘আমাদের কাছে ঈমান হলো স্বীকৃতি ও সত্যায়ন।’ ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-এর ছাত্র মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল আর-রাযি (২৪৮ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো স্বীকৃতি ও সত্যায়ন।’ ইমাম মাতুরিদির শায়খ নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া বলখি (২৬৮ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো অন্তরে স্বীকৃতি দেওয়া, মুখে সেটার সত্যায়ন করা’ (اقرار بالقلب وتصديق باللسان)। ইমাম আজমের শাগরেদ হাফস ইবনে আবদুর রহমানের ছাত্র আহমদ ইবনে হরব (২৩৪ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো সত্যায়ন ও স্বীকৃতি। ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধি নেই। আমল হচ্ছে শরিয়ত।’ হাফস ইবনে আবদুর রহমানের আরেক ছাত্র আইয়ুব নিশাপুরি (২৫১ হি.) বলেন, ‘আমাদের কাছে ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন। আমল হচ্ছে শরিয়ত। ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধি নেই; আমলের হ্রাসবৃদ্ধি আছে।’ এখানে দেখা যাচ্ছে স্বয়ং ইমাম আজম, তাঁর সরাসরি শাগরেদগণ, তাঁর শাগরেদগণের শাগরেদ সকলের মতে, ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন। প্রথম যুগের কেউ এ ব্যাপারে দ্বিমত করেননি।

* অতঃপর এলেন আহলে সুন্নাতের আকিদার ইমাম আবু জাফর তহাবি। ঈমানের পরিচয়ে তিনি বলেন, ‘ঈমান হলো: মুখে স্বীকার করা, অন্তরে সত্যায়ন (الإيمان هو الإقرار باللسান والتصديق بالجنان)।’ এখানে ইমাম তহাবি মুখের স্বীকারোক্তিকে বরং অন্তরের সত্যায়নের আগে এনেছেন। এর মাধ্যমে তিনি যেন ঈমানকে স্রেফ ‘সত্যায়ন’ মনে করার ধারণার খণ্ডন করলেন আর ইমাম আজম এবং তাঁর শীর্ষ দুই শাগরেদ আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের আকিদা যে ঈমান দুটোর সমন্বয়ে সেটা প্রমাণ করলেন।

* আবু হাফস বুখারি লিখেন, ‘আহলে সুন্নাতের বৈশিষ্ট্য হলো এই আকিদা রাখা যে, ঈমান দুটো অঙ্গের মাধ্যমে সংঘটিত হয় : এক. অন্তর (সত্যায়ন), দুই মুখ (স্বীকৃতি)। সুতরাং কেউ অন্তরে আল্লাহকে জানা সত্ত্বেও যদি মুখে স্বীকৃতি না দেয়, তবে সে কাফের। আবার কেউ মুখে স্বীকৃতি দেওয়া সত্ত্বেও যদি অন্তরে বিশ্বাস না করে, তবে সে মুনাফিক। হ্যাঁ, যদি কোনো ওজরের কারণে মুখে স্বীকৃতি দিতে না পারে, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু ওজর ছাড়া স্বীকৃতি না দিলে সে আল্লাহর কাছেও কাফের গণ্য হবে।’ এটা কেবল আবু হাফস নয়, আহলে সমরকন্দের বিপরীতে বুখারার সকল মাশায়েখের মত।

* আবুল লাইস সমরকন্দি (৩৭৫ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো মুখের স্বীকারোক্তি এবং অন্তরের সত্যায়ন। সুতরাং কেউ যখন অন্তর দিয়ে সত্যায়ন করবে এবং মুখে স্বীকার করবে, সে মুমিন গণ্য হবে। কিন্তু কেউ যদি অন্তরে সত্যায়ন করে, কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মুখে স্বীকার না করে, তবে সে মুমিন গণ্য হবে না (وإذا صدقه بقلبه ولم يقر بلسانه وهو في الإمكان من الإقرار فإنه لا يصير مؤمنا)। একইভাবে কেউ যদি মুখে স্বীকার করে কিন্তু অন্তরে সত্যায়ন না করে, তবে সেও মুমিন গণ্য হবে না।’

* মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি (৪১৯ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো মুখে স্বীকৃতি দেওয়া, অন্তরে সত্যায়ন করা—আল্লাহ তায়ালা এক। তাঁর কোনো শরিক নেই। তাঁর সকল সিফাত মেনে নেওয়া। আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবি-রাসুল, পরকাল, পুনরুত্থান, তাকদিরের ভালোমন্দ, জান্নাত-জাহান্নাম এবং আল্লাহর সকল বিধানের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।’ বলখি আরও লিখেন, ‘ঈমান দুটো অঙ্গের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়: এক. অন্তর, দুই. মুখ... ফলে যে ব্যক্তি বলবে ঈমান মুখের নয়, স্রেফ অন্তরের বিষয়, সে খবিস জাহমি’ (ومن قال بأن الإيمان بالقلب دون اللسان فهو جهمي خبيث)।

* আবু শাকুর সালেমি (৪৬০ হি.) বলেন, (ঈমানের সংজ্ঞার্থের ক্ষেত্রে) ‘সবচেয়ে বিশুদ্ধ কথা হলো—মুখের স্বীকৃতি এবং অন্তরের সত্যায়ন ঈমানের রুকন। এটা ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর বক্তব্য’ (والأصح أن نقول إن ركن الإيمان الإقرار باللسان والتصديق بالقلب وهو قول أبي حنيفة)।

* শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি (৪৮৩ হি.) বলেন, ‘ঈমানের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো অন্তরের সত্যায়ন। এটা কোনো অবস্থাতেই ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি ঈমান ছাড়তে কেউ বাধ্য করলেও অন্তরের সত্যায়ন পরিত্যাগ করা যাবে না (কারণ, অন্তরের সত্যায়ন পরিত্যাগে কাউকে বাধ্য করা যায় না)। সুতরাং এমন অবস্থাতেও যদি কেউ অন্তরের সত্যায়ন পরিত্যাগ করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। অন্তরের সত্যায়নের সঙ্গে মুখের স্বীকৃতিও ঈমানের একটি রুকন। (والإقرار باللسان ركن فيه مع التصديق بالقلب في أحكام الدنيا والآخرة جميعا) অর্থাৎ, অন্তরের সত্যায়ন সত্ত্বেও যদি মুখের স্বীকৃতি পরিত্যাগ করা হয়, তবে মানুষের দৃষ্টিতে যেমন কাফের হবে, আল্লাহর কাছেও কাফের গণ্য হবে।’

* ফখরুল ইসলাম বাযদাবি (৪৮২ হি.) একই কথা লিখেছেন, ‘ঈমানের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় রয়েছে : এক. অন্তরের সত্যায়ন। এটা কখনোই ছাড়ার সুযোগ নেই। সুতরাং অন্তরের সত্যায়ন না থাকলে কুফর অনিবার্য। দুই. মুখের স্বীকৃতি। এটা সংযুক্ত রুকন। ওজরের কারণে এক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে। ফলে কেউ যদি বাধ্য হয়ে মুখের স্বীকৃতি না দেয়, তবে সেটা কুফর হবে না। কেননা, মুখ সত্যায়নের কেন্দ্র নয়। তবে বাধ্য হওয়া ছাড়া মুখের স্বীকৃতি পরিত্যাগ অন্তরের সত্যায়নের অনুপস্থিতি বোঝায়। সুতরাং প্রথমটার পরে এটাও রুকন হিসেবে সাব্যস্ত হবে। তাই যে ব্যক্তি অন্তরে সত্যায়ন করবে কিন্তু কোনো ওজর ব্যতীত মুখের স্বীকৃতি (فمن صدق بقلبه وترك البيان من غير عذر لم يكن مؤمنا) বর্জন করবে, সে মুমিন হবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি মুখের স্বীকৃতি দেওয়ার সময় না পায় কিন্তু অন্তরে সত্যায়ন থাকে, তবে সে মুমিন গণ্য হবে।’

* সদরুল ইসলাম বাযদাবি (৪৯৩ হি.) একই কথা লিখেছেন। তাঁর কথা সারমর্ম হলো : ‘ঈমানের শাব্দিক অর্থ সত্যায়ন। কিন্তু শরিয়তে ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের সত্যায়ন দুটোই বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ﴾ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴿ অর্থ : ‘তাঁর মতো কিছু নেই। তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন।’ [শুরা : ১১] সুতরাং আমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর সকল গুণে বিশ্বাস করি। আমরা নবিদেরকে তাঁদের নবুওতের ক্ষেত্রে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলোতে সত্যায়ন করি। ইসলামের সকল রুকনে বিশ্বাস রাখি। এ সবকিছু (মুখে) স্বীকার করি। ফলে ঈমানের অর্থ দাঁড়ায়: মুখের স্বীকৃতি এবং অন্তরের সত্যায়ন।’ তিনি অন্যত্র বলেন, ‘আহলে সুন্নাতের কাছে ঈমান অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি৷ দুটোর প্রত্যেকটিই ভিত্তি (রুকন)। হ্যাঁ, যদি কোনো অক্ষমতা থাকে, যেমন বোবা থাকে কিংবা মুখে কুফরের উপর বাধ্য করা হয়, তবুও মুমিন থাকবে।’

* আবু ইসহাক সাফফার (৫৩৪ হি.) ঈমানের হাকিকতের ক্ষেত্রে ইমাম রহ.-এর বিশুদ্ধ মাযহাব অত্যন্ত জোরালোভাবে এবং একাধিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি ঈমানকে কেবল ‘সত্যায়ন’ বলা আশআরিদের মাযহাব হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং সেটার খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঈমান আনার জন্য অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি জরুরি। এটা ইমাম আবু হানিফার বক্তব্য। ইমাম আবু আবদুল্লাহ এবং মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের বর্ণনাতেও আবু হানিফা থেকে এটা প্রমাণিত। জাহম ইবনে সাফওয়ানের বিরুদ্ধে ইমাম আজমের মুনাযারা থেকেও এটা প্রমাণিত। আমি আমার দাদা আবু নসর সাফফারের লেখা দেখেছি: ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, সালাফের ফুকাহা সকলের মাযহাব ছিল-ঈমান অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি।’ অতঃপর লেখক এ ব্যাপারে কুরআন থেকে বিস্তারিত দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করেন।

* আবু হাফস উমর নাসাফি (৫৩৭ হি.) তাঁর বিখ্যাত আকায়েদ গ্রন্থেও ঈমানের সংজ্ঞায় অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই উল্লেখ করেছেন।

* আল্লামা কাসানি (৫৮৭ হি.) লিখেন, ‘অন্তরের সত্যায়ন ঈমানের মৌলিক শর্ত। ফলে এটা ছাড়া কেউ মুখে স্বীকৃতি দিলে মুমিন হবে না। কিন্তু মুখের স্বীকৃতি রুকন কি না এ ব্যাপারে আলেমগণ মতবিরোধ করেছেন। অধিকাংশ মাশায়েখের কাছে (অন্তরের সত্যায়নের মতো) এটাও রুকন। কেউ কেউ এটাকে রুকন হিসেবে মানেননি। ... যথা-ইমাম মাতুরিদি এবং একদল মুতাকাল্লিম।’

* আবুল মুনতাহা মাগনিসাভি (১০০০ হি) লিখেন, ‘মুখের স্বীকৃতি ঈমানের রুকন। কারণ ঈমানের মূল কথা হলো স্বীকৃতি ও সত্যায়ন দু'টোই’ (الإقرار ركن في الإيمان، لأن أصل الإيمان الإقرار والتصديق)।

* মোল্লা আলি কারি (১০১৪ হি.) লিখেছেন, ‘ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি। তবে এক্ষেত্রে তাসদিক তথা সত্যায়নটা হলো মূল রুকন—কখনো ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বিপরীতে স্বীকৃতি হলো শর্ত অথবা সংযুক্ত রুকন—বাধ্যবাধকতা কিংবা ওজর থাকলে ছেড়ে দেওয়া যায়। ফলে যদি ওজর ছাড়া স্বীকৃতি না দেয়, তবে কাফের হয়ে যাবে। আর যদি ওজর থাকে, তবে কাফের হবে না। ...শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি সকল ক্ষেত্রে স্বীকৃতিকে ঈমানের রুকন বলেন। বিপরীতে আবদুল্লাহ নাসাফি স্বীকৃতিকে স্রেফ দুনিয়ার বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত বলেন। এটা আশআরিদের কাছে গ্রহণযোগ্য বক্তব্য। আবু মনসুর মাতুরিদির মতও এটাই।’

* মোল্লা হুসাইন ইবনে ইস্কান্দার হানাফি (১০৮৪ হি.) লিখেন, ‘ঈমানের শাব্দিক অর্থ সত্যায়ন। আর শরিয়তের পরিভাষায় ঈমান হলো, মুখে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং অন্তরে সেটা সত্যায়ন করা’। (الإيمان شرعا إقرار باللسان وتصديق بالقلب بوحدانية الله)

* আবু সাইদ খাদেমি (১১৭৬ হি.) লিখেন, ‘ঈমান সত্যায়ন ও স্বীকৃতির সমন্বয়। এটাই ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মাযহাব।’

* বরং নাসাফি যিনি তাঁর ‘তামহিদ’ ও ‘তাবসিরাহ’-তে ঈমানকে স্রেফ অন্তরের সত্যায়নের কথা বলেছেন, তিনিই ‘বাহরুল কালাম’-এ ভিন্ন আলোচনা করেছেন আর সেটাই অধিকতর নির্ভরযোগ্য এবং তাঁর সর্বশেষ সিদ্ধান্তের দলিল। তিনি লিখেন, ‘অধিকাংশ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কাছে ঈমান হলো (الإيمان هو الإقرار باللسান والتصديق بالقلب عند أكثر أهل السنة والجماعة)। শাফেয়ি রহ.-এর কাছে ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল। কাররামিয়্যাহদের মতে, ঈমান হলো স্রেফ স্বীকৃতি; অন্তরের সত্যায়ন নয়। আবু মনসুর মাতুরিদির কাছে ঈমান হলো স্রেফ সত্যায়ন (مجرد التصديق)।’

টিকাঃ
২৬৪. উসুল ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১/১৯৩)।
২৬৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১০৬-১০৮)।
২৬৬. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২১)।
২৬৭. আস-সাওয়াদুল আজম (৫,৭, ৩৮-৩৯)।
২৬৮. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার (আবসাত), সমরকন্দি (১৪-১৫)।
২৬৯. আল-ইতিকাদ, বলখি (৯৮)।
২৭০. আত-তামহিদ, সালেমি (১০২)।
২৭১. উসুলুস সারাখসি (২/২৯০)।
২৭২. উসুলুল বাযদাবি (৩৪)।
২৭৩. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৪৮)।
২৭৪. প্রাগুক্ত (১৫১)।
২৭৫. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭০০-৭০২)।
২৭৬. দেখুন : শরহুল আকায়েদ (২৯১)।
২৭৭. আল মুতামাদ ফিল মুতাকাদ, (১২)।
২৭৮. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১০৪)।
২৭৯. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৮৫-৮৬)।
২৮০. আল-জাওহারাতুল মুনিফাহ ফি শরহি ওয়াসিয়্যাতিল ইমাম আবি হানিফা, হুসাইন ইবনে ইস্কান্দার হানাফি (৫২)।
২৮১. শরহুল ওয়াসিয়‍্যাহ (১৫৬)।
২৮২. বাহরুল কালাম, নাসাফি (৫৮, ৬৫, ১৫১-১৫২)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মতপার্থক্যের ফলাফল

📄 মতপার্থক্যের ফলাফল


আলাউদ্দিন বুখারি (৭৩০ হি.) উসলুল বাযদাবির ব্যাখ্যাতে ইমাম আজমসহ হানাফি মাযহাবের প্রথম যুগের ইমামদের বক্তব্য এবং পরবর্তী যুগের আলেমদের বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেন, ‘আমাদের মুহাক্কিকদের মাযহাব হচ্ছে—ঈমান মূলত অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি হলো পৃথিবীর বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত। ফলে কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মুখে স্বীকৃতি না দিলেও কেবল অন্তরে সত্যায়ন করলেই আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে। হ্যাঁ, পৃথিবীর নিয়মে মুমিন গণ্য হবে না। ...বিপরীতে আমাদের অনেক আলেমদের মত হলো, ঈমান হচ্ছে অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই। তবে পার্থক্য হলো, অন্তরের সত্যায়ন মূল রুকন, আর মুখের স্বীকৃতি অতিরিক্ত রুকন। প্রথমটাতে কোনো অবস্থাতেই ছাড়ের সুযোগ নেই। দ্বিতীয়টা বাধ্যবাধকতার পরিস্থিতিতে ছাড়ের সুযোগ আছে। ফলে তাদের মতে, কেউ যদি অন্তরে সত্যায়ন করে, কিন্তু কোনো ওজর ব্যতীত মুখে স্বীকৃতি না দেয়, তবে আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে না এবং তার পরিণতি হবে জাহান্নাম। এটা শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি এবং অনেক ফকিহের মত। এক্ষেত্রে তাদের দলিল হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন বাহ্যিক আয়াত। যেমন-রাসুলুল্লাহ () এর হাদিস: ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর। সর্বপ্রথম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র সাক্ষ্য দেওয়া। আর সে সাক্ষ্যই হলো মুখের স্বীকৃতি।

এরপর আলাউদ্দিন বুখারি বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে পরবর্তী যুগের আলেমদের মতামতকে অগ্রাধিকার দেন। কেবল তিনি নন, অসংখ্য মুতাআখখিরিন তথা পরবর্তী যুগের হানাফি ফকিহদের বক্তব্য এটা। আলাউদ্দিন উসমান্দি লিখেন, ‘মূল ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি মানুষকে জানানোর জন্য, বাহ্যিক বিধান প্রয়োগের জন্য।’

হাসকাফি লিখেন, ‘ঈমান কেবল অন্তরের সত্যায়ন, নাকি মুখেরও স্বীকৃতি? বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। অধিকাংশ হানাফির মত হলো, এটা অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই। কিন্তু মুহাক্কিকদের মত হলো, এটা স্রেফ অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি দুনিয়ার বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত।’ হাসকাফি মুহাক্কিক বলতে সম্ভবত পরবর্তী সময়ের মুতাকাল্লিমদের উদ্দেশ্য নিয়েছেন। নতুবা ইমাম আজম থেকে শুরু করে আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, ইবরাহিম ইবনে তাহমান, মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযি, আবু হাফস বুখারি, আবু জাফর তহাবি, আবুল লাইস সমরকন্দি, মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি, আবু শাকুর সালেমি, শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি, ফখরুল ইসলাম এবং সদরুল বাযদাবি-সহ প্রথম যুগের সকল হানাফি ফকিহের মত এক ও অভিন্ন, যা আমরা পিছনে দেখিয়েছি। তারা মুহাক্কিক না হলে আর কে মুহাক্কিক হবেন? এজন্য তাফতাযানি লিখেন, ‘ঈমানের আরেকটি অর্থ হলো, অন্তর ও মুখের কর্মের সমন্বয়। অর্থাৎ, অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি। এটাই অসংখ্য মুহাক্কিকের মত। আবু হানিফা রহ. থেকে এটাই বর্ণিত।’ স্রেফ প্রথম যুগের নয়, পরবর্তী যুগের মুহাক্কিকদের মতামতও তা-ই যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এটাই হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত।

মতপার্থক্যের ফলাফল: প্রশ্ন হতে পারে, এই পার্থক্যের ফলাফল কী? উত্তরে বলা যেতে পারে, একদিক থেকে ফলাফল আছে, অন্যদিক থেকে নেই। যেদিক থেকে ফলাফল নেই সেটা হলো: উভয় মত অনুযায়ী, কেউ মুখে ঈমানের স্বীকৃতি দিলেই তাকে মুমিন মানতে হবে। ভিতরে সে মুনাফিক হলেও বাহ্যিক অবস্থা অনুযায়ী ফয়সালা করে আমাদেরকে তার জানাযা ও কাফন-দাফন করতে হবে। কারণ, ভিতরের অবস্থা আমাদের জানা নেই, যেমনটা ইমাম আজম রহ. নিজে বলেছেন, ‘আমরা মানুষেরা মানুষকে মুমিন ও কাফের সাব্যস্ত করব বাহ্যিক স্বীকারোক্তি, মিথ্যাচার, পোশাক-আশাক ও ইবাদত দেখে।...কারণ, মানুষের অন্তরের খবর রাখা আমাদের দায়িত্ব নয়। আমাদের কেবল বাহ্যিক অবস্থার উপর ভিত্তি করেই কাউকে মুমিন কিংবা কাফের বলা, ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তরের খবর রাখবেন আল্লাহ তায়ালা।’ বিপরীতে (কোনো ওজর ছাড়া) মুখের স্বীকৃতি পরিত্যাগ করলে উভয়ের মত অনুযায়ীই দুনিয়ার ক্ষেত্রে তার সঙ্গে কাফেরের আচরণ করা হবে। ফলে এক্ষেত্রেও মতভেদের কোনো ফলাফল নেই। রইল অন্তরের সত্যায়ন এবং আল্লাহর কাছে মুমিন থাকার বিষয়টা। এটা সকল ক্ষেত্রেই আমাদের অজ্ঞাত। মুখে স্বীকৃতি দিলেও ভিতরে মুনাফিক হয়ে জাহান্নামে যেতে পারে; আবার (ওজর কিংবা সামর্থ্যের অভাবে) মুখে স্বীকৃতি না দিয়েও ভিতরের সত্যায়নের কারণে জান্নাতে যেতে পারে। ফলে এটা আল্লাহর কাছে থাকবে। কে অন্তরে সত্যায়ন করে আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হলো, আর কে সত্যায়ন না করে আল্লাহর কাছে মুনাফিক গণ্য হলো, সেটা আমাদের পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। ফলে ইমাম আজম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের কথা মানলেও আমাদের বাহ্যিক অবস্থা তথা মুখের স্বীকৃতির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আবার ইমাম মাতুরিদি এবং তাঁর মতের অনুসারী আলেমদের কথা মানলেও মুখের স্বীকৃতির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্তরের বিষয়টা উভয় অবস্থাতে আল্লাহর কাছেই সমর্পিত থাকছে। এ হিসেবে তাদের মতপার্থক্যের ফলাফল নেই। ইমাম আজম এটা স্পষ্ট করেন আবু মুকাতিল সমরকন্দির প্রশ্নের জবাবে। তিনি লিখেন, ‘সত্যায়নের ক্ষেত্রে মানুষ তিন প্রকারের: একদল আল্লাহকে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-কিছু এসেছে সবকিছু মুখে এবং অন্তরে উভয়ভাবেই সত্যায়ন করে। তারা আল্লাহ এবং মানুষ সবার কাছেই মুমিন হিসেবে গণ্য। আরেক দল মুখে সত্যায়ন করে, কিন্তু অন্তরে প্রত্যাখ্যান করে। তারা আল্লাহর কাছে কাফের, কিন্তু মানুষের কাছ মুমিন হিসেবে গণ্য। কারণ, মানুষ তাদের অন্তরের খবর জানে না। আর সেটা জানা জরুরিও না। মানুষের কাজ বাহ্যিক অবস্থা দেখে ফয়সালা করা। আরেক দল অন্তরে সত্যায়ন করে, কিন্তু তাকিয়্যাহ (তথা ওজরের কারণে) মুখে প্রত্যাখ্যান করে। এরা আল্লাহর কাছে মুমিন হিসেবে গণ্য, কিন্তু বাহ্যিক কুফরির কারণে মানুষের কাছে কাফের হিসেবে গণ্য।’

কিন্তু দিয়ানাতান (অর্থাৎ আখেরাতকেন্দ্রিক) ফলাফল আছে। একজন মানুষ যখন জানবে মুখের স্বীকৃতি রুকন—এটা ছাড়া ঈমান আল্লাহর কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে না, তখন সে ঈমান আনার সময় যেভাবেই হোক মুখের স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করবে। বিপরীতে যখন সে ধরে নেবে মুখের স্বীকৃতি দেওয়া ঈমানের রুকন নয়, আখেরাতের দিক থেকে এটা দেওয়া না-দেওয়া সমান, তখন সে হয়তো সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করবে না। এভাবে (প্রথম মত বিশুদ্ধ হওয়ার ফলে) সে পরকালে ঈমান ও মুক্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বরং স্বীকৃতির অভাবে পৃথিবীতেও বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে। এটা কখনো কখনো পার্থিব ক্ষেত্রেও প্রভাবক হতে পারে। বাহ্যিক স্বীকৃতিকে ঈমানের কেবল শর্ত মনে করে পরিত্যাগ করাতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জানাযা, দোয়া এবং মুসলমানদের দাফন থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রে নানা সংকটের সম্মুখীন হতে পারে। ফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাহ্যিক স্বীকৃতি না দেওয়া মূলত জীবনের নানা জটিলতা ও সংকটকে জিইয়ে রাখা, যা শেষ পর্যন্ত আখেরাতকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তা ছাড়া, এই মতপার্থক্যের আরেকটি মারাত্মক ক্ষতি হলো সালাফের সম্মিলিত মাযহাব পরিত্যক্ত হয়ে খালাফের ব্যক্তিগত ইজতিহাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়া, যেমন আমরা পিছনে দেখেছি আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের মতে, ঈমান অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের সমন্বিত রূপ। তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে ইমাম আজম রহ. যদিও তাত্ত্বিকভাবে আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন না (প্রায়োগিকভাবে করেন), কিন্তু মুখের স্বীকৃতিকে তিনি কখনোই নাকচ করেননি। ফলে তিনি আল-ফিকহুল আকবার, আল-ফিকহুল আবসাত এবং আল-ওয়াসিয়্যাহ-সবগুলো গ্রন্থে ঈমানের সংজ্ঞার্থে মুখের স্বীকৃতির কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। বরং প্রত্যেকটি জায়গায় তিনি মুখের স্বীকৃতিতে অন্তরের সত্যায়নের আগে উল্লেখ করেছেন যাতে কেউ এটাকে ছোট মনে না করে। অতঃপর ইমামের সরাসরি ছাত্রগণ, ছাত্রগণের ছাত্র সকলে একই পথে একই মতে ছিলেন। কেউ এ ব্যাপারে ইমামের বক্তব্যের বিরোধিতা করেননি। এরপর আসেন ইমাম তহাবি। তিনিও তাঁর ওস্তাদগণের অনুসরণে সুস্পষ্ট ভাষায় ঈমানকে মুখের স্বীকৃতি আর অন্তরের সত্যায়ন বলেছেন এবং তিনিও ইমামের অনুসরণে মুখের স্বীকৃতিকে আগে রেখেছেন। পরবর্তীকালে সমরকন্দি, সারাখসি ও বাযদাবির মতো মুহাক্কিকগণ একই পথে হেঁটেছেন। এই বিশাল জামাত এবং প্রথম যুগের সম্মানিত ইমামগণের মতের বিপরীতে ক্ষুদ্র একদল হানাফি মুতাকাল্লিম ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তাদের মধ্যে যারা মুখের স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করেছেন, সেটা অন্তরের সত্যায়নের পরে নিয়ে গিয়েছেন। আরেক দল মুখের স্বীকৃতিকে সম্পূর্ণ উহ্য করে ফেলেছেন। ঈমান বলতে স্রেফ ‘সত্যায়ন’ (তাসদিক) বলেছেন। অথচ এটা ইমাম আজমসহ সালাফের সকলের মাযহাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে মতপার্থক্যের ফলাফল স্পষ্ট।

মোটকথা, মুখের স্বীকৃতিকে রুকন বলা হোক কিংবা শর্ত বলা হোক সেটা গৌণ বিষয়, জরুরি হলো এটাকে সর্বাবস্থায় ঈমানের সংজ্ঞার্থের অন্তর্ভুক্ত করা। ঈমানকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে ইমাম আজমের বক্তব্য সুরক্ষিত রাখা এবং এর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা।

টিকাঃ
২৮৩. কাশফুল আসরার, আলাউদ্দিন আবদুল আযিয বুখারি (১/১৮৫)।
২৮৪. দেখুন: লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি: ৭৫-৭৬)।
২৮৫. রদ্দুল মুহতার (৪/২২১)।
২৮৬. শরহুল মাকাসিদ (২/২৪৮)।
২৮৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২২)।
২৮৮. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মুসলিম হওয়ার জন্য কালিমা পড়া জরুরি কি না?

📄 মুসলিম হওয়ার জন্য কালিমা পড়া জরুরি কি না?


একজন অমুসলিম যখন মুসলিম হতে চাইবে, তার ইসলাম গ্রহণের প্রক্রিয়া কী হবে? তাকে মুখে কী সাক্ষ্য দিতে হবে এবং কীভাবে দিতে হবে?

এক্ষেত্রে ইমাম আজমের সরাসরি কোনো বক্তব্য নেই। তবে ফুকাহায়ে আহনাফের লম্বা আলোচনা রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি মনে রাখতে পারলে পুরো বিষয়টা ক্ষুদ্রাকারে বোঝা সহজ। সেটা হলো : সকলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাক্ষ্য এক নয়। বরং ব্যক্তির অবস্থাভেদে, অস্বীকৃতি ও অবিশ্বাসের মাত্রাভেদে সাক্ষ্যদান এবং তার পূর্ব বিভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্নতার ঘোষণার উপর নির্ভরশীল হবে।

নাস্তিক্যবাদ থেকে মুসলিম হওয়া : কেউ যদি আল্লাহ ও রাসুল দুজনকেই অস্বীকার করে, যথা—নাস্তিক, তার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ তথা সম্পূর্ণ কালিমার শাহাদাহ (সাক্ষ্য) দিতে হবে, কিংবা কালিমার প্রথমাংশ অথবা শেষাংশের সাক্ষ্য দিলেও যথেষ্ট হবে। কারণ, সে তাওহিদ ও রিসালাত দুটোকেই অস্বীকার করে। ফলে যেকোনো একটার স্বীকৃতির মাধ্যমে বোঝা যাবে অন্যটারও স্বীকৃতি দিয়েছে।

পৌত্তলিকতা থেকে মুসলিম হওয়া : যদি কেউ আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করে কিন্তু তার তাওহিদকে অস্বীকার করে, যথা—পৌত্তলিক ও অগ্নিপূজারী সম্প্রদায়, তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সাক্ষ্য দিলে মুসলিম হয়ে যাবে। রিসালাতের সাক্ষ্য ‘যিমনান’ (তাওহিদের সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে) আদায় হয়ে যাবে। কারণ, এমন ব্যক্তি যখন তাওহিদের সাক্ষ্য দিলো, বোঝা গেল, রিসালাতের সাক্ষ্যও রয়েছে তার কাছে।

নবুওত অস্বীকার থেকে মুসলিম হওয়া : যারা আল্লাহকে স্বীকার করে এবং তাওহিদে বিশ্বাস রাখে, কিন্তু নবুওতকে অস্বীকার করে, তাদের মুসলিম হওয়ার জন্য ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ তথা নবিজির নবুওত ও রিসালাতের সাক্ষ্য দিতে হবে।

ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মুসলিম হওয়া : যারা মোটাদাগে আল্লাহর একত্ববাদ, নবিদের নবুওত ও রিসালাতে বিশ্বাস রাখে, কিন্তু আমাদের রাসুল (ﷺ)-কে অস্বীকার করে, যথা—ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়, তাদের স্রেফ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ সাক্ষ্য দিলেই হবে না, বরং নিজেদের ভ্রান্ত ধর্ম থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা করতে হবে। কেননা, তাদের অনেকে আল্লাহকে মানে, রাসুলুল্লাহর (স) রিসালাতও সত্য মনে করে। কিন্তু তাদের ধারণা—তিনি কেবল আরবদের নবি। ফলে এমন ধারণা বর্জন করতে হবে। এ কারণ ইমাম আজম রহ. থেকে বর্ণিত আছে, “যদি কোনো ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান বলে, ‘আমি মুসলিম’, তবে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মুসলিম বলা হবে না। বরং জিজ্ঞাসা করতে হবে, তোমার উদ্দেশ্য কী? যদি বলে ‘আমার উদ্দেশ্য ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলামে প্রবেশ করা’, তবে সে মুসলিম। আর যদি উদ্দেশ্য থাকে তার নিজের ধর্মকে আল্লাহর মনোনীত ইসলাম ঘোষণা করা, তবে সে মুসলিম নয়।” তবে এই জিজ্ঞাসাবাদ পার্থিব বিধিবিধান প্রয়োগের জন্য। নতুবা কেউ যদি নিজেকে মুসলিম ঘোষণা করে, এটুকুই যথেষ্ট। তার অন্তরের হিসাব আল্লাহ তায়ালার উপর থাকবে।

এটা মুখের ঘোষণার ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক মূলনীতি। সাধারণভাবে কালিমা শাহাদাহ পড়েই ইসলামে প্রবেশ করা যায়। বরং ক্ষেত্রবিশেষে মুখে শাহাদাহ ছাড়াও ইসলামে প্রবেশ করা সম্ভব। অর্থাৎ, এমন কোনো কাজের মাধ্যমেও মুসলিম হওয়া যায় যেটা শাহাদাহর প্রমাণ। যেমন—কোনো ব্যক্তি যদি মুসলমানদের জামাতের নামাযে শরিক হয়, তবে তাকে মুসলিম গণ্য করা হবে। কারণ, নামাযে বারবার তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দিতে হয়। পাশাপাশি নামায আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর মনোনীত দ্বীনের ভিত্তি। ফলে সে মুসলিম না হলে জামাতে নামায পড়ত না। নামায পড়াই প্রমাণ করে, সে মুসলিম। হয়তো কোনো অক্ষমতার কারণে মুখে স্বীকৃতি দিতে পারছে না। রাসুলুল্লাহ (স) থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসও এ কথার সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের জানাযায় শরিক হবে, আমাদের কিবলা অভিমুখী হবে, আমাদের যবাই করা পশু খাবে, তার জন্য তোমরা ঈমানের সাক্ষ্য দাও।’

টিকাঃ
২৮৯. দেখুন: বাদায়েউস সানায়ে, কাসানি (৭/১০০-১০৪)। রদ্দুল মুহতার (৪/২২৬-২২৯)। হাদিসটি দেখুন : বুখারি (কিতাবুস সালাত: ৩৯১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ঈমান ও ইসলামের আন্তঃসম্পর্ক

📄 ঈমান ও ইসলামের আন্তঃসম্পর্ক


ঈমান শব্দের শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস করা, সত্যায়ন করা। অপরদিকে ইসলাম অর্থ হলো আত্মসমর্পণ করা, আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য করা। অন্যকথায়, ইসলাম অর্থ হলো—আল্লাহর সকল বিধান, হালাল-হারাম, ফরয-ওয়াজিবের প্রতি সন্তুষ্ট ও অনুগত থাকা; আল্লাহর শরিয়তের উপর কোনো আপত্তি না থাকা। এ হিসেবে ইসলাম ও ঈমানের মাঝে পার্থক্য আছে। একইভাবে ঈমানের জায়গা হলো হৃদয়। মুখ সেটার মুখপাত্র। অন্যদিকে ইসলামের জায়গা মানুষের হৃদয়, মুখ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবকিছু। এ হিসেবেও দুটোর মাঝে পার্থক্য আছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বেদুইনরা বলে, আমরা ঈমান আনলাম। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো, আমরা (বাহ্যিক) আত্মসমর্পণ করেছি। কারণ, ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।’ [হুজুরাত : ১৪] প্রসিদ্ধ হাদিসে জিবরিলে রাসুলুল্লাহ (সা)-কে জিবরাইল আ. ঈমান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ঈমান হলো আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসুল, পরকাল এবং তাকদিরের ভালোমন্দে বিশ্বাস করা। ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলে রাসুল বললেন, ইসলাম হলো, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। ’-এ সাক্ষ্য দেওয়া, নামায কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের রোযা রাখা এবং সামর্থ্য থাকলে বাইতুল্লাহর হজ করা।

এসব আয়াত ও হাদিসের ভিত্তিতে ভ্রান্ত মুতাযিলা ও রাফেযি সম্প্রদায় মনে করে ঈমান ও ইসলাম আলাদা। ফলে তাদের কাছে কবিরা গুনাহকারী মুসলিম, কিন্তু মুমিন নয়। তাই কেউ যদি দরিদ্র ‘মুমিনদের’ সদকা দেওয়ার ওসিয়ত করে, তবে তাদের মতেকবিরা গুনাহকারী কিংবা আহলে সুন্নাতের লোকজন অন্তর্ভুক্ত হবে না। তারা সদকা পাবে না! কেবল শিয়া ও মুতাযিলারা পাবে। বিপরীতে যদি দরিদ্র মুসলমানদের সদকা দেওয়ার ওসিয়ত করে, তবে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত সবাই পাবে।

এটা গলত বক্তব্য। কারণ, উপরের আয়াত ও হাদিসে ঈমান ও ইসলামের মাঝে পার্থক্য বোঝা গেলেও এবং তাত্ত্বিকভাবে পার্থক্য থাকলেও কার্যত ও মৌলিক পার্থক্য নেই। আল্লাহ তায়ালার বাণী : ‘সে জনপদে যারা মুমিন ছিল, আমি তাদের উদ্ধার করেছিলাম। তবে সেখানে একটি ঘর ব্যতীত আর কোনো মুসলিম আমি পাইনি।’ [যারিয়াত : ৩৫-৩৬] এখানে একটি ঘর তথা লুত আ. এবং তাঁর পরিবারকে একবার মুমিন আবার তাদেরকেই মুসলিম বলা হয়েছে। বোঝা গেল, মুসলিম ও মুমিন অভিন্ন বিষয়।

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা মুসা আ.-এর ভাষায় বলেন, ‘মুসা বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাকো, তবে তোমরা তাঁরই উপর নির্ভর করো যদি তোমরা মুসলিম হয়ে থাকো।’ [ইউনুস : ৮৪] এখানেও মুমিন ও মুসলিম ভিন্ন অর্থে বোঝালেও মৌলিকভাবে এক বলা হয়েছে। আল্লাহ আরও বলেন, ‘তারা ইসলাম গ্রহণ করে আপনার উপকার করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে আমার উপকার করোনি; বরং আল্লাহ ঈমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদের অনুগ্রহ করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকো।’ [হুজুরাত : ১৭] এখানেও ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক বানানো হয়েছে।

‘তোমরা বলে দাও যে, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সেই বাণীর প্রতি যা আমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে, আর যা ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাদের সন্তানদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা দেওয়া হয়েছিল মুসা ও ঈসাকে, যা অন্যান্য নবিকে তাঁদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। আমরা নবিগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই অনুগত (মুসলিম)।’ [বাকারা : ১৩৬] এখানেও যারা মুমিন, তারাই মুসলিম।

আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষকে কেবল দুই ভাগে ভাগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদের কেউ কাফের হয়েছে, কেউ মুমিন। তোমরা যা করো আল্লাহ সব দেখেন।’ [তাগাবুন : ২] আল্লাহ আরও বলেন, ‘যারা আমার আয়াতসমূহে ঈমান আনে, আর যারা মুসলিম।’ [যুখরুফ : ৬৯] আরও বলেন, ‘আপনি অন্ধদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে সুপথে আনতে পারবেন না। আপনি শোনাতে পারবেন কেবল তাদের যারা আমার নিদর্শনাবলিতে বিশ্বাস করে। আর তারাই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)।’ [নামল : ৮১]

মৌলিকভাবে ঈমান ও ইসলাম একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে—যেমনটা ইমাম বলেছেন— ‘ইসলাম ছাড়া ঈমান হয় না, আবার ঈমান ছাড়া ইসলাম পাওয়া যায় না। উভয়ে যেন একই (মুদ্রার) এপিঠ-ওপিঠ।’ কারণ, ঈমান হলো অন্তরে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি ও উলুহিয়্যাহর সত্যায়ন করা এবং মুখে সেটার স্বীকৃতি দেওয়া। কেউ যখন এটা করবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে আল্লাহর বিধিবিধানের প্রতি আত্মসমর্পিত এবং তাঁর শরিয়তের সামনে নতশির হয়ে যাবে। আবার কেউ আল্লাহর বিধানের প্রতি তখনই নতশির ও শ্রদ্ধাশীল হয়, যখন তার মনে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, সত্যায়ন ও স্বীকৃতি থাকে। ফলে মুসলিম হওয়া ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না, মুমিন হওয়া ছাড়া মুসলিম হওয়া যায় না।

এটা কেবল ইমাম আজম নয়, সালাফের অনেক বড় বড় ইমামেরও বক্তব্য। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ইমাম বুখারি। তিনি ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক মনে করতেন। ইমাম আজমের মতো তাঁরও বক্তব্য হলো, ঈমান ও ইসলামের সমন্বয়ে দ্বীন গঠিত। হাদিসে জিবরিল, আবদুল কায়সের প্রতিনিধি দল-সংক্রান্ত বর্ণনাসহ বিভিন্ন হাদিসে ঈমান ও ইসলামের সমার্থক হওয়া এবং একটার জায়গায় অন্যটার ব্যবহার লক্ষণীয়। অর্থাৎ, হাদিসে জিবরিলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বিশ্বাস-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে ঈমান এবং আমলসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে ইসলাম বললেও আবদুল কায়সের প্রতিনিধি দলকে ঈমানের কথা বলার সময় নামায, রোযা, যাকাত ও গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর পথে দেওয়াকেও ঈমানের সংজ্ঞার্থে উল্লেখ করেছেন। আর এটা বোঝা সহজ। কারণ, মুহাদ্দিসদের কাছে আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আর ইসলাম হলো আমলের নাম। ফলে ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক বলাই স্বাভাবিক। কেবল বুখারি নন, মালেক, শাফেয়ি, মুহাম্মাদ ইবনে নসর আল-মারওয়াযি, ইবনে মানদাহ, ইবনে আবি শাইবাসহ আহলে সুন্নাতের অসংখ্য বড় বড় ইমাম থেকে দুটোর সমার্থক হওয়ার বক্তব্য প্রমাণিত।

ইমাম আজম রহ. এবং সালাফের অনুসরণে সকল হানাফি আলেম একই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাদের সকলের মতে, ঈমান ও ইসলামের মাঝে মৌলিক পার্থক্য নেই। দুটো একই বস্তু। ভিন্ন ভিন্ন নাম, কিন্তু মৌলিকভাবে সমার্থক কাছাকাছি শব্দ। প্রত্যেক মুমিন মুসলিম, আবার প্রত্যেক মুসলিম মুমিন। কারণ আল্লাহর একত্ববাদের পূর্ণ সাক্ষ্য, আল্লাহর নির্দেশ ও বিধিবিধানের প্রতি আনুগত্য, আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ দাসত্ব-এ সবকিছু দুটোর মাঝে অন্তর্ভুক্ত।

মাতুরিদি লিখেন, “আমাদের মতে উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ রেখে ঈমান ও ইসলাম এক। হ্যাঁ, মুখের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটোর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। যেমন কাফেরকে ‘মুসলিম’ বললে তারা মেনে নেয় না, কিন্তু ‘বিশ্বাসী’ (মুমিন) বললে মেনে নেয়। স্বাভাবিক ইসলাম বললে দ্বীন বোঝায়, ঈমান বললে সেটা বোঝায় না। এ জন্য ‘দার’-এর প্রকরণে ‘দারুল ইসলাম’ বলা হয়, ‘দারুল ঈমান নয়’। কিন্তু উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ, ঈমান হচ্ছে আল্লাহর একত্ববাদ, কর্তৃত্ব, ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, তাঁর লা শরিক ইলাহত্বকে মেনে নেওয়া; ইসলামও হলো তাঁর প্রতি পূর্ণ সমর্পিত হওয়া। ফলে দুটোর উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক।”

মোটকথা, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর উম্মত হওয়ার জন্য মুমিন ও মুসলিম দুটোই হতে হবে। কেউ ইসলাম পরিত্যাগ করে মুমিন হতে পারবে না; আবার কেউ ঈমান পরিত্যাগ করে মুসলিম হতে পারবে না। যে ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহকে বিশ্বাস ও আমল দুটোর মাধ্যমেই গ্রহণ করবে, সে মুমিন ও মুসলিম দুটোই। ইমাম আজম বলেন, “aunque এগুলোর নাম ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু মূলকথা এক (أسماء مختلفة ومعناها واحد), আর তা হলো ঈমান। মানুষকে যেমন ‘রাজুল’, ‘ইনসান’, ফুলান’ বিভিন্ন নামে বোঝানো যায়, ঈমানকেও বিভিন্ন নামে বোঝানো হয়।” মাতুরিদি লিখেন, “বাস্তব ফলাফলের ক্ষেত্রে দুটোর মাঝে পার্থক্য নেই। ‘ইনসান’ (মানুষ), ‘ইবনে আদম’ (আদম সন্তান), ‘রাজুল’ (লোক), ‘ফুলান’ (জনৈক ব্যক্তি)-এর সম্পর্ক যেমন, ‘ঈমান’ ও ‘ইসলাম’-এর সম্পর্ক তেমন। বাহ্যিক অর্থে পার্থক্য আছে, মূল উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে অভিন্ন। একটি পাওয়া গেলে অন্যটিও পাওয়া যায়। একটি না থাকলে অন্যটিও থাকে না।”

এ ব্যাপারে অধমের বক্তব্য হলো-ঈমান ও ইসলাম দুটো শাব্দিকভাবে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র শব্দ। অর্থাৎ, শাব্দিকভাবে দুটোর অস্তিত্ব ভিন্ন। অর্থের ক্ষেত্রেও মৌলিকভাবে দুটোর অর্থ ভিন্ন। ফলে এ দুটোর ভিন্নতা অনস্বীকার্য। তবে শরিয়তে এ দুটোকে কোথাও ভিন্নার্থে, আবার কোথাও সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বেদুইনরা বলে, আমরা ঈমান আনলাম। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো, আমরা (বাহ্যিক) আত্মসমর্পণ (ইসলাম গ্রহণ) করেছি। কারণ, ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।’ [হুজুরাত : ১৪] এখানে ঈমান ও ইসলামকে আলাদা করা হয়েছে। অথচ অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সে জনপদে যারা মুমিন ছিল আমি তাদের উদ্ধার করেছিলাম। সেখানে একটি ঘর ব্যতীত আর কোনো মুসলিম আমি পাইনি।’ [যারিয়াত : ৩৫- ৩৬] এখানে দুটোকে এক ও অভিন্ন বলা হয়েছে। একইভাবে ‘হাদিসে জিবরিলে’ দুটোকে আলাদা অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ ‘আবদুল কায়সের প্রতিনিধি দলের’ হাদিসে দুটোকে এক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, দুটো পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। একটি অপরটির পরিপূরক। দুটোর সমন্বয়ে দ্বীন। ফলে প্রসঙ্গ দেখে এর অর্থ নির্ধারিত হবে। মূল অর্থের দিকে তাকালে দুটোকে আলাদা বলতে হবে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে দ্বীনের সকল বিষয় বোঝানোর জন্য একটাকে ব্যবহার করলে অন্যটাও অন্তর্ভুক্ত হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, ইমাম আজম রহ. এবং হানাফি আলেমদের ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক বলা জমহুর তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের সঙ্গে ঈমানের সংজ্ঞার্থে তাদের মৌলিক মতপার্থক্য না থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অর্থাৎ, জমহুরের কাছে আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আর বাহ্যিক আমলকে কুরআন-সুন্নাহতে ইসলাম বলা হয়েছে। সুতরাং যখন ঈমান ও ইসলামকে সমার্থক বলা হলো, তখন তারাও আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন প্রমাণিত হলো। এভাবে তাদের মাঝে আর জমহুরের মাঝে মৌলিক বিরোধ থাকল না।

টিকাঃ
২৯০. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ৮)। বুখারি (কিতাবুল ঈমান : ৫০)।
২৯১. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৫৭)।
২৯২. আল-ফিকহুল আকবার (৬)।
২৯৩. বুখারি (কিতাবুল ঈমান : ৫৩)।
২৯৪. দেখুন: আত-তামহিদ, ইবনে আবদিল বার (৫/২৪৭)। ফাতহুল বারি (১/১১৫)।
২৯৫. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৯৫)।
২৯৬. আত-তাওহিদ (২৮৪)।
২৯৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৪)।
২৯৮. দেখুন: আত-তাওহিদ (২৮৫)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২২৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00