📄 ঈমানের জন্য মুখের স্বীকৃতি আবশ্যক
ঈমানের জন্য মুখের স্বীকৃতি আবশ্যক: মোটকথা, ইমাম আজমের একাধিক গ্রন্থের অগণিত বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত যে, তাঁর কাছে ঈমান মানে অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই। বরং মুখের স্বীকৃতির অধিক গুরুত্ব বোঝাতে তিনি এটাকে সর্বত্র অন্তরের সত্যায়নের আগে উল্লেখ করেছেন। প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে এই আলোচনার শুরুর দিকে উদ্ধৃত ইমামের বক্তব্য— ‘ঈমান হৃদয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে কোনো ব্যক্তি যদি মুখে ঈমান আনে কিন্তু হৃদয়ে ঈমান না আনে, তবে সে আল্লাহর কাছে মুমিন হিসেবে গণ্য হবে না। বিপরীতে যে ব্যক্তি হৃদয়ে বিশ্বাস করে কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ না করে, আল্লাহর কাছে সে মুমিন বলে গণ্য হবে।’-এর ব্যাখ্যা কী? এর দ্বারা তো স্পষ্টভাবে বোঝা যায় মুখের স্বীকৃতি মূল ঈমানের জন্য নিষ্প্রয়োজন।
আমরা বলব—হ্যাঁ, এখানকার বক্তব্য দ্বারা তা-ই বোঝা যায়। কিন্তু এই একটা বক্তব্য দ্বারাই ‘ইমাম মৌখিক স্বীকৃতিকে ঈমানের রুকন মনে করতেন না।’—এ ধরনের দাবি করা যায় না। কারণ, অন্যান্য বক্তব্য দেখলে বুঝে আসবে, এটা স্বাভাবিক অবস্থায় নয়। বরং তিনি ‘আমল’ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয় সেটা বোঝাতে গিয়ে বলেছেন যে, মুখে স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়াও মুমিন হওয়ার পথ রয়েছে। অর্থাৎ, যেভাবে আমল ছাড়া ঈমান সংঘটিত হয়, একইভাবে স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়াও ঈমান সংঘটিত হবে। কিন্তু সেটা সর্বাবস্থায় নয়, বরং বিশেষ প্রয়োজন-সাপেক্ষে—স্বীকৃতির পথে প্রতিবন্ধকতা থাকা অবস্থাতে। যেমন—কেউ স্বীকৃতি দেওয়ার আগেই মারা গেল। অথবা অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য ওজরের কারণে মুখে স্বীকৃতি দিতে পারল না। তার জন্য কেবল অন্তরের সত্যায়ন দ্বারা ই ঈমান সংঘটিত হয়ে যাবে। মানুষের কাছে কাফের থাকলেও আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে। কারণ, তিনি অন্তর্যামী। এক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের কারও দ্বিমত নেই।
কিন্তু সুযোগ ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মুখের স্বীকৃতি পরিত্যাগ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সকল ইমামের মতো ইমাম আজমের মতেও আল্লাহর কাছেও মুমিন গণ্য হবে না। কারণ, সে ঈমানের রুকন ভঙ্গ করেছে। আমাদের দাবির দলিল খোদ ইমামের বক্তব্য। তিনি বলেন (আবু ইউসুফের বর্ণনা অনুযায়ী) : (وَإِنْ عُرِفَ الله وصدق به، ومات قبل أن يقر بلسانه مع إمكانه فهو كافر، لأن الله تعالى جعل الإيمان في كتابه بجارحة القلب واللسان) অর্থাৎ, ‘এটা হলো তাদের ক্ষেত্রে যাদের মুখে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব না হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তির পক্ষে মুখে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হওয়ার পরও যদি মুখে স্বীকৃতি না দেয়, তবে তার অন্তরের ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না এবং সে মৃত্যুবরণ করলে কাফের হিসেবে মৃত্যুবরণ করবে। কেননা, ঈমান অন্তরের বিশ্বাস এবং মুখের স্বীকারোক্তি দুটোই। ইমাম এক্ষেত্রে কিছু দলিল পেশ করে বলেন,
‘তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মুসা, ঈসা, অন্যান্য নবিকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে সবকিছুর উপর। আমরা তাদের মাঝে ভেদাভেদ করি না। আমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণকারী। অতএব, তারা যদি ঈমান আনে তোমাদের ঈমান আনার মতো, তবে তারা সুপথ পাবে।’ [বাকারা : ১৩৬-১৩৭] আরও বলেন, ﴾وَأَلْزَمَهُمْ كَلِمَةَ Тَقْوَى﴿ অর্থ : ‘তাদের উপর তাকওয়ার কালিমা (মুখের স্বীকৃতি) অপরিহার্য করে দিলেন।’ [ফাতাহ : ২৬]
আরও বলেন, ﴾ وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا ﴿ অর্থ : ‘তারা অন্যায় ও অহংকারবশত (আমার) নিদর্শনাবলিকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে চিনেছিল।’ [নামল : ১৪]
অন্যত্র বলেন, ‘আমি যাদের কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে যেমন চেনে নিজেদের সন্তানকে।’ [বাকারা : ১৪৬] অন্তরের বিশ্বাস ও চেনা সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা তাদের মুমিন বলেননি (কারণ, তারা সত্যায়ন ও স্বীকৃতি দেয়নি)। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা বলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তাহলে সফলকাম হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বলবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন।’ ফলে কেবল জানলেই হবে না, মুখে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
উল্লিখিত কুরআনের আয়াত ও হাদিসগুলোতে সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ঈমানকে মুখেও ‘স্বীকৃতি দিতে’ বলা হচ্ছে। বোঝা গেল, মুখের স্বীকৃতি স্রেফ বাহ্যিক বিধিবিধানের জন্য শর্ত নয়, বরং এটা ঈমানের রুকন। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্যও অন্তরের সত্যায়নের পাশাপাশি মুখের স্বীকৃতি প্রয়োজন। কারণ, তিনি নিজেই এটাকে প্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করেছেন। হ্যাঁ, কেউ বিশেষ পরিস্থিতিতে মুখে স্বীকৃতি না দিতে পারলে তখন অন্তরের ঈমান আল্লাহর কাছে মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে, ইনশাআল্লাহ, যেমনটা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘কেউ ঈমান আনার পরে আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরের জন্য হৃদয় উন্মুক্ত করলে তার উপর আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হবে এবং তার জন্য আছে মহা শাস্তি। তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফর করতে বাধ্য করা হয় এবং তার চিত্ত ঈমানে অবিচল থাকে।’ [নাহল : ১০৬] কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া স্বীকৃতি ছেড়ে দিলে ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে মুখের স্বীকৃতি ইমাম আজমের কাছে ঈমানের রুকন; কিন্তু অবস্থার প্রেক্ষিতে কখনো কখনো তাতে ‘রুখসত’ (ছাড়) দেওয়ার সুযোগ আছে।
ফলে ইমামের মাযহাব স্পষ্ট। বিশেষ প্রয়োজনে মুখের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় মুখের স্বীকৃতি রুকন গণ্য হবে এবং মুখের স্বীকৃতি ছাড়া আল্লাহর কাছেও ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। জাহম ইবনে সাফওয়ানের সঙ্গে ইমামের আলোচনার মাঝেও এটার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। পিছনে আমরা সবিস্তারে এটা উল্লেখ করেছি। সেখানে দেখেছি, জাহম ইমামকে জিজ্ঞাসা করেন, মুখের স্বীকৃতি ছাড়া কেবল অন্তরের জানাশোনা (মারিফাত) দ্বারা কেউ মুমিন হবে কি না? ইমাম তার জবাবে বলেন, ‘যদি অন্তরের জানা মুখে স্বীকার না করে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে কাফের।’ জাহম প্রশ্ন করেন, আল্লাহর সকল সিফাত জানার পরেও মুমিন হবে না কীভাবে? ইমাম আজম তখন তার সামনে কুরআন ও সুন্নাহর একাধিক দলিল উপস্থাপন করেন, যেখানে মুখের স্বীকৃতির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ঈমানকে হৃদয় ও মুখ দুটোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা রাসুলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যখন শোনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রুসিক্ত দেখতে পাবেন। এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব, আমাদেরও সাক্ষ্যদাতাদের তালিকাভুক্ত করে নিন। আল্লাহ এবং আমাদের কাছে আগত সত্যে আমাদের ঈমান না আনার কী কারণ থাকতে পারে যখন আমরা প্রত্যাশা করি, আল্লাহ আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের তালিকাভুক্ত করুন? সুতরাং তাদের এ কথার কারণে আল্লাহ তাদের এমন সব উদ্যান দান করবেন যার তলদেশে নহর প্রবহমান থাকবে। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান।’ [মায়িদা : ৮৩-৮৫] ফলে জান্নাতে যাওয়ার জন্য অন্তরের জানা এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই জরুরি। আল্লাহ তায়ালা
‘তোমরা বলে দাও যে, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সেই বাণীর প্রতি যা আমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে আর যা ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাদের সন্তানের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা দেওয়া হয়েছিল মুসা ও ঈসাকে, যা অন্যান্য নবিকে তাঁদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। আমরা নবিগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই অনুগত। অতএব, তারা যদি ঈমান আনে যেভাবে তোমরা ঈমান এনেছ, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।’ [বাকারা : ১৩৬-১৩৭]
ইমাম আরও বলেন—আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা বলো লা ইলাহা ইলাল্লাহ, তাহলে সফলতা লাভ করবে।’ ফলে মুখের স্বীকৃতি ছাড়া কেবল অন্তরে জানলে কেউ মমিন হবে না। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “জাহান্নাম থেকে সে ব্যক্তি বের হয়ে আসবে যে বলত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, আর যার অন্তরে দানাপরিমাণ ঈমান থাকবে।” রাসুলুল্লাহ (স) এটা বলেননি যে, আল্লাহকে চিনত; বরং ঈমান যদি স্বীকৃতির পরিবর্তে কেবল জানার নামই হতো, তবে ঈমান প্রত্যাখ্যানকারী প্রত্যেককে মুমিন বলা হতো। এই যুক্তিতে ইবলিসও মুমিন হতো। কেননা, সে আল্লাহকে চেনে ও জানে। তাকে স্রষ্টা, রিযিকদাতা, জীবন ও মৃত্যুদাতা হিসেবে চেনে। ...বরং এতে সকল কাফের মুখে অস্বীকার করা সত্ত্বেও
‘তারা অন্যায় ও অহংকার করে নিদর্শনাবলিকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে নিশ্চিত জেনেছিল।’ [নামল : ১৪] এখানে তাদের অন্তরের নিশ্চিত জানা (ইয়াকিন) সত্ত্বেও তাদের মুমিন বলা হয়নি। কারণ, তারা মুখে অস্বীকার করেছে। আল্লাহ আরও বলেন, ‘তারা আল্লাহর নেয়ামত চেনার পরও অস্বীকার করে। তাদের অধিকাংশই অকৃতজ্ঞ।’ [নাহল : ৮৩] আল্লাহ আরও বলেন, “আপনি জিজ্ঞাসা করুন, কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে জীবনোপকরণ সরবরাহ করেন? শোনা ও দেখা কার কর্তৃত্বাধীন? জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করেন, আর মৃতকে জীবিত থেকে কে বের করেন? এবং সকল বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন? তখন তারা বলবে, ‘আল্লাহ’। বলো, তবুও কি তোমরা (তাকে) ভয় পাবে না?” [ইউনুস : ৩১] এখানেও দেখো, কেবল অন্তরের জানাশোনা কোনো কাজে আসেনি। মুখে অস্বীকার করার কারণে অন্তরে নবিজিকে নিজেদের সন্তানের মতো চিনেও তারা মুমিন হতে পারেনি।
এটা কেবল ইমাম আজমের নয়, জমহুর আহলে সুন্নাতের ইমামদের বক্তব্যও এক ও অভিন্ন। ইমাম বুখারি বলেন, ‘আমি হিজায, মক্কা, মদিনা, কুফা, ওয়াসেত, ইরাক, বাগদাদ, শাম ও মিশরের হাজারের অধিক আলেমের সাক্ষাৎ পেয়েছি। তাদের কয়েকজন হলেন মক্কি ইবনে ইবরাহিম, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, কুতাইবা ইবনে সাইদ, শিহাব ইবনে মা'মার, মুহাম্মাদ আল-ফিরয়াবি, ইয়াহইয়া ইবনে কাসির, আবু সালেহ, নুআইম ইবনে হাম্মাদ, হুমাইদি, মুতাররিফ ইবনে আবদুল্লাহ, ইবরাহিম ইবনুল মুনযির, যাহহাক ইবনে মাখলাদ, হিশাম ইবনে আবদুল মালিক, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম, ইসহাক ইবনে ইবরাহিম হানযালি... (আরও অনেক নাম উল্লেখ করে বলেন), তাদের কাউকে এই বিষয়ে আমি মতভেদ করতে দেখিনি যে, দ্বীন (তথা ঈমান) হলো মুখের স্বীকারোক্তি ও আমল (অন্তরের সত্যায়ন এবং বাহ্যিক আমল) (الدين قول وعمل)।
টিকাঃ
২৬২. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৩১-৩২)।
২৬৩. দেখুন: মানাকিব, মক্কি (১২৪-১২৬)। মানাকিব, বাযযাযি (২০১-২০২)।
📄 মুহাক্কিক হানাফি ইমামগণের মতামত
মুহাক্কিক হানাফি ইমামগণের মতামত: প্রথম যুগের হানাফি ইমামদের মতামতও জমহুর আহলে সুন্নাত এবং ইমাম আজমের মতামতের মতোই। বিষয়টির গুরুত্বের প্রতি লক্ষ রেখে এ সম্পর্কে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিছু ইমামের বক্তব্য আমরা নিচে তুলে ধরছি :
* ইবরাহিম ইবনে তাহমান (১৬৩ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো গোপনে ও প্রকাশ্যে সত্যায়ন করা।’ উল্লেখ্য, প্রকাশ্যে সত্যায়ন হলো স্বীকৃতি। ইমামের শাগরেদ হাফস ইবনে আবদুর রহমান (১৯৯ হি.) বলেন, ‘আমাদের কাছে ঈমান হলো স্বীকৃতি ও সত্যায়ন।’ ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-এর ছাত্র মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল আর-রাযি (২৪৮ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো স্বীকৃতি ও সত্যায়ন।’ ইমাম মাতুরিদির শায়খ নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া বলখি (২৬৮ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো অন্তরে স্বীকৃতি দেওয়া, মুখে সেটার সত্যায়ন করা’ (اقرار بالقلب وتصديق باللسان)। ইমাম আজমের শাগরেদ হাফস ইবনে আবদুর রহমানের ছাত্র আহমদ ইবনে হরব (২৩৪ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো সত্যায়ন ও স্বীকৃতি। ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধি নেই। আমল হচ্ছে শরিয়ত।’ হাফস ইবনে আবদুর রহমানের আরেক ছাত্র আইয়ুব নিশাপুরি (২৫১ হি.) বলেন, ‘আমাদের কাছে ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন। আমল হচ্ছে শরিয়ত। ঈমানের হ্রাসবৃদ্ধি নেই; আমলের হ্রাসবৃদ্ধি আছে।’ এখানে দেখা যাচ্ছে স্বয়ং ইমাম আজম, তাঁর সরাসরি শাগরেদগণ, তাঁর শাগরেদগণের শাগরেদ সকলের মতে, ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন। প্রথম যুগের কেউ এ ব্যাপারে দ্বিমত করেননি।
* অতঃপর এলেন আহলে সুন্নাতের আকিদার ইমাম আবু জাফর তহাবি। ঈমানের পরিচয়ে তিনি বলেন, ‘ঈমান হলো: মুখে স্বীকার করা, অন্তরে সত্যায়ন (الإيمان هو الإقرار باللسান والتصديق بالجنان)।’ এখানে ইমাম তহাবি মুখের স্বীকারোক্তিকে বরং অন্তরের সত্যায়নের আগে এনেছেন। এর মাধ্যমে তিনি যেন ঈমানকে স্রেফ ‘সত্যায়ন’ মনে করার ধারণার খণ্ডন করলেন আর ইমাম আজম এবং তাঁর শীর্ষ দুই শাগরেদ আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের আকিদা যে ঈমান দুটোর সমন্বয়ে সেটা প্রমাণ করলেন।
* আবু হাফস বুখারি লিখেন, ‘আহলে সুন্নাতের বৈশিষ্ট্য হলো এই আকিদা রাখা যে, ঈমান দুটো অঙ্গের মাধ্যমে সংঘটিত হয় : এক. অন্তর (সত্যায়ন), দুই মুখ (স্বীকৃতি)। সুতরাং কেউ অন্তরে আল্লাহকে জানা সত্ত্বেও যদি মুখে স্বীকৃতি না দেয়, তবে সে কাফের। আবার কেউ মুখে স্বীকৃতি দেওয়া সত্ত্বেও যদি অন্তরে বিশ্বাস না করে, তবে সে মুনাফিক। হ্যাঁ, যদি কোনো ওজরের কারণে মুখে স্বীকৃতি দিতে না পারে, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু ওজর ছাড়া স্বীকৃতি না দিলে সে আল্লাহর কাছেও কাফের গণ্য হবে।’ এটা কেবল আবু হাফস নয়, আহলে সমরকন্দের বিপরীতে বুখারার সকল মাশায়েখের মত।
* আবুল লাইস সমরকন্দি (৩৭৫ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো মুখের স্বীকারোক্তি এবং অন্তরের সত্যায়ন। সুতরাং কেউ যখন অন্তর দিয়ে সত্যায়ন করবে এবং মুখে স্বীকার করবে, সে মুমিন গণ্য হবে। কিন্তু কেউ যদি অন্তরে সত্যায়ন করে, কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মুখে স্বীকার না করে, তবে সে মুমিন গণ্য হবে না (وإذا صدقه بقلبه ولم يقر بلسانه وهو في الإمكان من الإقرار فإنه لا يصير مؤمنا)। একইভাবে কেউ যদি মুখে স্বীকার করে কিন্তু অন্তরে সত্যায়ন না করে, তবে সেও মুমিন গণ্য হবে না।’
* মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি (৪১৯ হি.) বলেন, ‘ঈমান হলো মুখে স্বীকৃতি দেওয়া, অন্তরে সত্যায়ন করা—আল্লাহ তায়ালা এক। তাঁর কোনো শরিক নেই। তাঁর সকল সিফাত মেনে নেওয়া। আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবি-রাসুল, পরকাল, পুনরুত্থান, তাকদিরের ভালোমন্দ, জান্নাত-জাহান্নাম এবং আল্লাহর সকল বিধানের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।’ বলখি আরও লিখেন, ‘ঈমান দুটো অঙ্গের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়: এক. অন্তর, দুই. মুখ... ফলে যে ব্যক্তি বলবে ঈমান মুখের নয়, স্রেফ অন্তরের বিষয়, সে খবিস জাহমি’ (ومن قال بأن الإيمان بالقلب دون اللسان فهو جهمي خبيث)।
* আবু শাকুর সালেমি (৪৬০ হি.) বলেন, (ঈমানের সংজ্ঞার্থের ক্ষেত্রে) ‘সবচেয়ে বিশুদ্ধ কথা হলো—মুখের স্বীকৃতি এবং অন্তরের সত্যায়ন ঈমানের রুকন। এটা ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর বক্তব্য’ (والأصح أن نقول إن ركن الإيمان الإقرار باللسان والتصديق بالقلب وهو قول أبي حنيفة)।
* শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি (৪৮৩ হি.) বলেন, ‘ঈমানের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো অন্তরের সত্যায়ন। এটা কোনো অবস্থাতেই ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি ঈমান ছাড়তে কেউ বাধ্য করলেও অন্তরের সত্যায়ন পরিত্যাগ করা যাবে না (কারণ, অন্তরের সত্যায়ন পরিত্যাগে কাউকে বাধ্য করা যায় না)। সুতরাং এমন অবস্থাতেও যদি কেউ অন্তরের সত্যায়ন পরিত্যাগ করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। অন্তরের সত্যায়নের সঙ্গে মুখের স্বীকৃতিও ঈমানের একটি রুকন। (والإقرار باللسان ركن فيه مع التصديق بالقلب في أحكام الدنيا والآخرة جميعا) অর্থাৎ, অন্তরের সত্যায়ন সত্ত্বেও যদি মুখের স্বীকৃতি পরিত্যাগ করা হয়, তবে মানুষের দৃষ্টিতে যেমন কাফের হবে, আল্লাহর কাছেও কাফের গণ্য হবে।’
* ফখরুল ইসলাম বাযদাবি (৪৮২ হি.) একই কথা লিখেছেন, ‘ঈমানের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় রয়েছে : এক. অন্তরের সত্যায়ন। এটা কখনোই ছাড়ার সুযোগ নেই। সুতরাং অন্তরের সত্যায়ন না থাকলে কুফর অনিবার্য। দুই. মুখের স্বীকৃতি। এটা সংযুক্ত রুকন। ওজরের কারণে এক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে। ফলে কেউ যদি বাধ্য হয়ে মুখের স্বীকৃতি না দেয়, তবে সেটা কুফর হবে না। কেননা, মুখ সত্যায়নের কেন্দ্র নয়। তবে বাধ্য হওয়া ছাড়া মুখের স্বীকৃতি পরিত্যাগ অন্তরের সত্যায়নের অনুপস্থিতি বোঝায়। সুতরাং প্রথমটার পরে এটাও রুকন হিসেবে সাব্যস্ত হবে। তাই যে ব্যক্তি অন্তরে সত্যায়ন করবে কিন্তু কোনো ওজর ব্যতীত মুখের স্বীকৃতি (فمن صدق بقلبه وترك البيان من غير عذر لم يكن مؤمنا) বর্জন করবে, সে মুমিন হবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি মুখের স্বীকৃতি দেওয়ার সময় না পায় কিন্তু অন্তরে সত্যায়ন থাকে, তবে সে মুমিন গণ্য হবে।’
* সদরুল ইসলাম বাযদাবি (৪৯৩ হি.) একই কথা লিখেছেন। তাঁর কথা সারমর্ম হলো : ‘ঈমানের শাব্দিক অর্থ সত্যায়ন। কিন্তু শরিয়তে ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের সত্যায়ন দুটোই বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ﴾ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴿ অর্থ : ‘তাঁর মতো কিছু নেই। তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন।’ [শুরা : ১১] সুতরাং আমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর সকল গুণে বিশ্বাস করি। আমরা নবিদেরকে তাঁদের নবুওতের ক্ষেত্রে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলোতে সত্যায়ন করি। ইসলামের সকল রুকনে বিশ্বাস রাখি। এ সবকিছু (মুখে) স্বীকার করি। ফলে ঈমানের অর্থ দাঁড়ায়: মুখের স্বীকৃতি এবং অন্তরের সত্যায়ন।’ তিনি অন্যত্র বলেন, ‘আহলে সুন্নাতের কাছে ঈমান অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি৷ দুটোর প্রত্যেকটিই ভিত্তি (রুকন)। হ্যাঁ, যদি কোনো অক্ষমতা থাকে, যেমন বোবা থাকে কিংবা মুখে কুফরের উপর বাধ্য করা হয়, তবুও মুমিন থাকবে।’
* আবু ইসহাক সাফফার (৫৩৪ হি.) ঈমানের হাকিকতের ক্ষেত্রে ইমাম রহ.-এর বিশুদ্ধ মাযহাব অত্যন্ত জোরালোভাবে এবং একাধিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি ঈমানকে কেবল ‘সত্যায়ন’ বলা আশআরিদের মাযহাব হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং সেটার খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঈমান আনার জন্য অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি জরুরি। এটা ইমাম আবু হানিফার বক্তব্য। ইমাম আবু আবদুল্লাহ এবং মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের বর্ণনাতেও আবু হানিফা থেকে এটা প্রমাণিত। জাহম ইবনে সাফওয়ানের বিরুদ্ধে ইমাম আজমের মুনাযারা থেকেও এটা প্রমাণিত। আমি আমার দাদা আবু নসর সাফফারের লেখা দেখেছি: ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, সালাফের ফুকাহা সকলের মাযহাব ছিল-ঈমান অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি।’ অতঃপর লেখক এ ব্যাপারে কুরআন থেকে বিস্তারিত দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করেন।
* আবু হাফস উমর নাসাফি (৫৩৭ হি.) তাঁর বিখ্যাত আকায়েদ গ্রন্থেও ঈমানের সংজ্ঞায় অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই উল্লেখ করেছেন।
* আল্লামা কাসানি (৫৮৭ হি.) লিখেন, ‘অন্তরের সত্যায়ন ঈমানের মৌলিক শর্ত। ফলে এটা ছাড়া কেউ মুখে স্বীকৃতি দিলে মুমিন হবে না। কিন্তু মুখের স্বীকৃতি রুকন কি না এ ব্যাপারে আলেমগণ মতবিরোধ করেছেন। অধিকাংশ মাশায়েখের কাছে (অন্তরের সত্যায়নের মতো) এটাও রুকন। কেউ কেউ এটাকে রুকন হিসেবে মানেননি। ... যথা-ইমাম মাতুরিদি এবং একদল মুতাকাল্লিম।’
* আবুল মুনতাহা মাগনিসাভি (১০০০ হি) লিখেন, ‘মুখের স্বীকৃতি ঈমানের রুকন। কারণ ঈমানের মূল কথা হলো স্বীকৃতি ও সত্যায়ন দু'টোই’ (الإقرار ركن في الإيمان، لأن أصل الإيمان الإقرار والتصديق)।
* মোল্লা আলি কারি (১০১৪ হি.) লিখেছেন, ‘ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি। তবে এক্ষেত্রে তাসদিক তথা সত্যায়নটা হলো মূল রুকন—কখনো ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বিপরীতে স্বীকৃতি হলো শর্ত অথবা সংযুক্ত রুকন—বাধ্যবাধকতা কিংবা ওজর থাকলে ছেড়ে দেওয়া যায়। ফলে যদি ওজর ছাড়া স্বীকৃতি না দেয়, তবে কাফের হয়ে যাবে। আর যদি ওজর থাকে, তবে কাফের হবে না। ...শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি সকল ক্ষেত্রে স্বীকৃতিকে ঈমানের রুকন বলেন। বিপরীতে আবদুল্লাহ নাসাফি স্বীকৃতিকে স্রেফ দুনিয়ার বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত বলেন। এটা আশআরিদের কাছে গ্রহণযোগ্য বক্তব্য। আবু মনসুর মাতুরিদির মতও এটাই।’
* মোল্লা হুসাইন ইবনে ইস্কান্দার হানাফি (১০৮৪ হি.) লিখেন, ‘ঈমানের শাব্দিক অর্থ সত্যায়ন। আর শরিয়তের পরিভাষায় ঈমান হলো, মুখে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং অন্তরে সেটা সত্যায়ন করা’। (الإيمان شرعا إقرار باللسان وتصديق بالقلب بوحدانية الله)
* আবু সাইদ খাদেমি (১১৭৬ হি.) লিখেন, ‘ঈমান সত্যায়ন ও স্বীকৃতির সমন্বয়। এটাই ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মাযহাব।’
* বরং নাসাফি যিনি তাঁর ‘তামহিদ’ ও ‘তাবসিরাহ’-তে ঈমানকে স্রেফ অন্তরের সত্যায়নের কথা বলেছেন, তিনিই ‘বাহরুল কালাম’-এ ভিন্ন আলোচনা করেছেন আর সেটাই অধিকতর নির্ভরযোগ্য এবং তাঁর সর্বশেষ সিদ্ধান্তের দলিল। তিনি লিখেন, ‘অধিকাংশ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কাছে ঈমান হলো (الإيمان هو الإقرار باللسান والتصديق بالقلب عند أكثر أهل السنة والجماعة)। শাফেয়ি রহ.-এর কাছে ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল। কাররামিয়্যাহদের মতে, ঈমান হলো স্রেফ স্বীকৃতি; অন্তরের সত্যায়ন নয়। আবু মনসুর মাতুরিদির কাছে ঈমান হলো স্রেফ সত্যায়ন (مجرد التصديق)।’
টিকাঃ
২৬৪. উসুল ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১/১৯৩)।
২৬৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১০৬-১০৮)।
২৬৬. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২১)।
২৬৭. আস-সাওয়াদুল আজম (৫,৭, ৩৮-৩৯)।
২৬৮. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার (আবসাত), সমরকন্দি (১৪-১৫)।
২৬৯. আল-ইতিকাদ, বলখি (৯৮)।
২৭০. আত-তামহিদ, সালেমি (১০২)।
২৭১. উসুলুস সারাখসি (২/২৯০)।
২৭২. উসুলুল বাযদাবি (৩৪)।
২৭৩. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৪৮)।
২৭৪. প্রাগুক্ত (১৫১)।
২৭৫. তালখিসুল আদিল্লাহ (৭০০-৭০২)।
২৭৬. দেখুন : শরহুল আকায়েদ (২৯১)।
২৭৭. আল মুতামাদ ফিল মুতাকাদ, (১২)।
২৭৮. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১০৪)।
২৭৯. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৮৫-৮৬)।
২৮০. আল-জাওহারাতুল মুনিফাহ ফি শরহি ওয়াসিয়্যাতিল ইমাম আবি হানিফা, হুসাইন ইবনে ইস্কান্দার হানাফি (৫২)।
২৮১. শরহুল ওয়াসিয়্যাহ (১৫৬)।
২৮২. বাহরুল কালাম, নাসাফি (৫৮, ৬৫, ১৫১-১৫২)।
📄 মতপার্থক্যের ফলাফল
আলাউদ্দিন বুখারি (৭৩০ হি.) উসলুল বাযদাবির ব্যাখ্যাতে ইমাম আজমসহ হানাফি মাযহাবের প্রথম যুগের ইমামদের বক্তব্য এবং পরবর্তী যুগের আলেমদের বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেন, ‘আমাদের মুহাক্কিকদের মাযহাব হচ্ছে—ঈমান মূলত অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি হলো পৃথিবীর বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত। ফলে কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মুখে স্বীকৃতি না দিলেও কেবল অন্তরে সত্যায়ন করলেই আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে। হ্যাঁ, পৃথিবীর নিয়মে মুমিন গণ্য হবে না। ...বিপরীতে আমাদের অনেক আলেমদের মত হলো, ঈমান হচ্ছে অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই। তবে পার্থক্য হলো, অন্তরের সত্যায়ন মূল রুকন, আর মুখের স্বীকৃতি অতিরিক্ত রুকন। প্রথমটাতে কোনো অবস্থাতেই ছাড়ের সুযোগ নেই। দ্বিতীয়টা বাধ্যবাধকতার পরিস্থিতিতে ছাড়ের সুযোগ আছে। ফলে তাদের মতে, কেউ যদি অন্তরে সত্যায়ন করে, কিন্তু কোনো ওজর ব্যতীত মুখে স্বীকৃতি না দেয়, তবে আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে না এবং তার পরিণতি হবে জাহান্নাম। এটা শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি এবং অনেক ফকিহের মত। এক্ষেত্রে তাদের দলিল হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন বাহ্যিক আয়াত। যেমন-রাসুলুল্লাহ () এর হাদিস: ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর। সর্বপ্রথম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র সাক্ষ্য দেওয়া। আর সে সাক্ষ্যই হলো মুখের স্বীকৃতি।
এরপর আলাউদ্দিন বুখারি বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে পরবর্তী যুগের আলেমদের মতামতকে অগ্রাধিকার দেন। কেবল তিনি নন, অসংখ্য মুতাআখখিরিন তথা পরবর্তী যুগের হানাফি ফকিহদের বক্তব্য এটা। আলাউদ্দিন উসমান্দি লিখেন, ‘মূল ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি মানুষকে জানানোর জন্য, বাহ্যিক বিধান প্রয়োগের জন্য।’
হাসকাফি লিখেন, ‘ঈমান কেবল অন্তরের সত্যায়ন, নাকি মুখেরও স্বীকৃতি? বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। অধিকাংশ হানাফির মত হলো, এটা অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই। কিন্তু মুহাক্কিকদের মত হলো, এটা স্রেফ অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি দুনিয়ার বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত।’ হাসকাফি মুহাক্কিক বলতে সম্ভবত পরবর্তী সময়ের মুতাকাল্লিমদের উদ্দেশ্য নিয়েছেন। নতুবা ইমাম আজম থেকে শুরু করে আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, ইবরাহিম ইবনে তাহমান, মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযি, আবু হাফস বুখারি, আবু জাফর তহাবি, আবুল লাইস সমরকন্দি, মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি, আবু শাকুর সালেমি, শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি, ফখরুল ইসলাম এবং সদরুল বাযদাবি-সহ প্রথম যুগের সকল হানাফি ফকিহের মত এক ও অভিন্ন, যা আমরা পিছনে দেখিয়েছি। তারা মুহাক্কিক না হলে আর কে মুহাক্কিক হবেন? এজন্য তাফতাযানি লিখেন, ‘ঈমানের আরেকটি অর্থ হলো, অন্তর ও মুখের কর্মের সমন্বয়। অর্থাৎ, অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি। এটাই অসংখ্য মুহাক্কিকের মত। আবু হানিফা রহ. থেকে এটাই বর্ণিত।’ স্রেফ প্রথম যুগের নয়, পরবর্তী যুগের মুহাক্কিকদের মতামতও তা-ই যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এটাই হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত।
মতপার্থক্যের ফলাফল: প্রশ্ন হতে পারে, এই পার্থক্যের ফলাফল কী? উত্তরে বলা যেতে পারে, একদিক থেকে ফলাফল আছে, অন্যদিক থেকে নেই। যেদিক থেকে ফলাফল নেই সেটা হলো: উভয় মত অনুযায়ী, কেউ মুখে ঈমানের স্বীকৃতি দিলেই তাকে মুমিন মানতে হবে। ভিতরে সে মুনাফিক হলেও বাহ্যিক অবস্থা অনুযায়ী ফয়সালা করে আমাদেরকে তার জানাযা ও কাফন-দাফন করতে হবে। কারণ, ভিতরের অবস্থা আমাদের জানা নেই, যেমনটা ইমাম আজম রহ. নিজে বলেছেন, ‘আমরা মানুষেরা মানুষকে মুমিন ও কাফের সাব্যস্ত করব বাহ্যিক স্বীকারোক্তি, মিথ্যাচার, পোশাক-আশাক ও ইবাদত দেখে।...কারণ, মানুষের অন্তরের খবর রাখা আমাদের দায়িত্ব নয়। আমাদের কেবল বাহ্যিক অবস্থার উপর ভিত্তি করেই কাউকে মুমিন কিংবা কাফের বলা, ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তরের খবর রাখবেন আল্লাহ তায়ালা।’ বিপরীতে (কোনো ওজর ছাড়া) মুখের স্বীকৃতি পরিত্যাগ করলে উভয়ের মত অনুযায়ীই দুনিয়ার ক্ষেত্রে তার সঙ্গে কাফেরের আচরণ করা হবে। ফলে এক্ষেত্রেও মতভেদের কোনো ফলাফল নেই। রইল অন্তরের সত্যায়ন এবং আল্লাহর কাছে মুমিন থাকার বিষয়টা। এটা সকল ক্ষেত্রেই আমাদের অজ্ঞাত। মুখে স্বীকৃতি দিলেও ভিতরে মুনাফিক হয়ে জাহান্নামে যেতে পারে; আবার (ওজর কিংবা সামর্থ্যের অভাবে) মুখে স্বীকৃতি না দিয়েও ভিতরের সত্যায়নের কারণে জান্নাতে যেতে পারে। ফলে এটা আল্লাহর কাছে থাকবে। কে অন্তরে সত্যায়ন করে আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হলো, আর কে সত্যায়ন না করে আল্লাহর কাছে মুনাফিক গণ্য হলো, সেটা আমাদের পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। ফলে ইমাম আজম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের কথা মানলেও আমাদের বাহ্যিক অবস্থা তথা মুখের স্বীকৃতির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আবার ইমাম মাতুরিদি এবং তাঁর মতের অনুসারী আলেমদের কথা মানলেও মুখের স্বীকৃতির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্তরের বিষয়টা উভয় অবস্থাতে আল্লাহর কাছেই সমর্পিত থাকছে। এ হিসেবে তাদের মতপার্থক্যের ফলাফল নেই। ইমাম আজম এটা স্পষ্ট করেন আবু মুকাতিল সমরকন্দির প্রশ্নের জবাবে। তিনি লিখেন, ‘সত্যায়নের ক্ষেত্রে মানুষ তিন প্রকারের: একদল আল্লাহকে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-কিছু এসেছে সবকিছু মুখে এবং অন্তরে উভয়ভাবেই সত্যায়ন করে। তারা আল্লাহ এবং মানুষ সবার কাছেই মুমিন হিসেবে গণ্য। আরেক দল মুখে সত্যায়ন করে, কিন্তু অন্তরে প্রত্যাখ্যান করে। তারা আল্লাহর কাছে কাফের, কিন্তু মানুষের কাছ মুমিন হিসেবে গণ্য। কারণ, মানুষ তাদের অন্তরের খবর জানে না। আর সেটা জানা জরুরিও না। মানুষের কাজ বাহ্যিক অবস্থা দেখে ফয়সালা করা। আরেক দল অন্তরে সত্যায়ন করে, কিন্তু তাকিয়্যাহ (তথা ওজরের কারণে) মুখে প্রত্যাখ্যান করে। এরা আল্লাহর কাছে মুমিন হিসেবে গণ্য, কিন্তু বাহ্যিক কুফরির কারণে মানুষের কাছে কাফের হিসেবে গণ্য।’
কিন্তু দিয়ানাতান (অর্থাৎ আখেরাতকেন্দ্রিক) ফলাফল আছে। একজন মানুষ যখন জানবে মুখের স্বীকৃতি রুকন—এটা ছাড়া ঈমান আল্লাহর কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে না, তখন সে ঈমান আনার সময় যেভাবেই হোক মুখের স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করবে। বিপরীতে যখন সে ধরে নেবে মুখের স্বীকৃতি দেওয়া ঈমানের রুকন নয়, আখেরাতের দিক থেকে এটা দেওয়া না-দেওয়া সমান, তখন সে হয়তো সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করবে না। এভাবে (প্রথম মত বিশুদ্ধ হওয়ার ফলে) সে পরকালে ঈমান ও মুক্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বরং স্বীকৃতির অভাবে পৃথিবীতেও বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে। এটা কখনো কখনো পার্থিব ক্ষেত্রেও প্রভাবক হতে পারে। বাহ্যিক স্বীকৃতিকে ঈমানের কেবল শর্ত মনে করে পরিত্যাগ করাতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জানাযা, দোয়া এবং মুসলমানদের দাফন থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রে নানা সংকটের সম্মুখীন হতে পারে। ফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাহ্যিক স্বীকৃতি না দেওয়া মূলত জীবনের নানা জটিলতা ও সংকটকে জিইয়ে রাখা, যা শেষ পর্যন্ত আখেরাতকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তা ছাড়া, এই মতপার্থক্যের আরেকটি মারাত্মক ক্ষতি হলো সালাফের সম্মিলিত মাযহাব পরিত্যক্ত হয়ে খালাফের ব্যক্তিগত ইজতিহাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়া, যেমন আমরা পিছনে দেখেছি আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের মতে, ঈমান অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের সমন্বিত রূপ। তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে ইমাম আজম রহ. যদিও তাত্ত্বিকভাবে আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন না (প্রায়োগিকভাবে করেন), কিন্তু মুখের স্বীকৃতিকে তিনি কখনোই নাকচ করেননি। ফলে তিনি আল-ফিকহুল আকবার, আল-ফিকহুল আবসাত এবং আল-ওয়াসিয়্যাহ-সবগুলো গ্রন্থে ঈমানের সংজ্ঞার্থে মুখের স্বীকৃতির কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। বরং প্রত্যেকটি জায়গায় তিনি মুখের স্বীকৃতিতে অন্তরের সত্যায়নের আগে উল্লেখ করেছেন যাতে কেউ এটাকে ছোট মনে না করে। অতঃপর ইমামের সরাসরি ছাত্রগণ, ছাত্রগণের ছাত্র সকলে একই পথে একই মতে ছিলেন। কেউ এ ব্যাপারে ইমামের বক্তব্যের বিরোধিতা করেননি। এরপর আসেন ইমাম তহাবি। তিনিও তাঁর ওস্তাদগণের অনুসরণে সুস্পষ্ট ভাষায় ঈমানকে মুখের স্বীকৃতি আর অন্তরের সত্যায়ন বলেছেন এবং তিনিও ইমামের অনুসরণে মুখের স্বীকৃতিকে আগে রেখেছেন। পরবর্তীকালে সমরকন্দি, সারাখসি ও বাযদাবির মতো মুহাক্কিকগণ একই পথে হেঁটেছেন। এই বিশাল জামাত এবং প্রথম যুগের সম্মানিত ইমামগণের মতের বিপরীতে ক্ষুদ্র একদল হানাফি মুতাকাল্লিম ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তাদের মধ্যে যারা মুখের স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করেছেন, সেটা অন্তরের সত্যায়নের পরে নিয়ে গিয়েছেন। আরেক দল মুখের স্বীকৃতিকে সম্পূর্ণ উহ্য করে ফেলেছেন। ঈমান বলতে স্রেফ ‘সত্যায়ন’ (তাসদিক) বলেছেন। অথচ এটা ইমাম আজমসহ সালাফের সকলের মাযহাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে মতপার্থক্যের ফলাফল স্পষ্ট।
মোটকথা, মুখের স্বীকৃতিকে রুকন বলা হোক কিংবা শর্ত বলা হোক সেটা গৌণ বিষয়, জরুরি হলো এটাকে সর্বাবস্থায় ঈমানের সংজ্ঞার্থের অন্তর্ভুক্ত করা। ঈমানকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে ইমাম আজমের বক্তব্য সুরক্ষিত রাখা এবং এর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা।
টিকাঃ
২৮৩. কাশফুল আসরার, আলাউদ্দিন আবদুল আযিয বুখারি (১/১৮৫)।
২৮৪. দেখুন: লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি: ৭৫-৭৬)।
২৮৫. রদ্দুল মুহতার (৪/২২১)।
২৮৬. শরহুল মাকাসিদ (২/২৪৮)।
২৮৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২২)।
২৮৮. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৩)।
📄 মুসলিম হওয়ার জন্য কালিমা পড়া জরুরি কি না?
একজন অমুসলিম যখন মুসলিম হতে চাইবে, তার ইসলাম গ্রহণের প্রক্রিয়া কী হবে? তাকে মুখে কী সাক্ষ্য দিতে হবে এবং কীভাবে দিতে হবে?
এক্ষেত্রে ইমাম আজমের সরাসরি কোনো বক্তব্য নেই। তবে ফুকাহায়ে আহনাফের লম্বা আলোচনা রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি মনে রাখতে পারলে পুরো বিষয়টা ক্ষুদ্রাকারে বোঝা সহজ। সেটা হলো : সকলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাক্ষ্য এক নয়। বরং ব্যক্তির অবস্থাভেদে, অস্বীকৃতি ও অবিশ্বাসের মাত্রাভেদে সাক্ষ্যদান এবং তার পূর্ব বিভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্নতার ঘোষণার উপর নির্ভরশীল হবে।
নাস্তিক্যবাদ থেকে মুসলিম হওয়া : কেউ যদি আল্লাহ ও রাসুল দুজনকেই অস্বীকার করে, যথা—নাস্তিক, তার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ তথা সম্পূর্ণ কালিমার শাহাদাহ (সাক্ষ্য) দিতে হবে, কিংবা কালিমার প্রথমাংশ অথবা শেষাংশের সাক্ষ্য দিলেও যথেষ্ট হবে। কারণ, সে তাওহিদ ও রিসালাত দুটোকেই অস্বীকার করে। ফলে যেকোনো একটার স্বীকৃতির মাধ্যমে বোঝা যাবে অন্যটারও স্বীকৃতি দিয়েছে।
পৌত্তলিকতা থেকে মুসলিম হওয়া : যদি কেউ আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করে কিন্তু তার তাওহিদকে অস্বীকার করে, যথা—পৌত্তলিক ও অগ্নিপূজারী সম্প্রদায়, তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সাক্ষ্য দিলে মুসলিম হয়ে যাবে। রিসালাতের সাক্ষ্য ‘যিমনান’ (তাওহিদের সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে) আদায় হয়ে যাবে। কারণ, এমন ব্যক্তি যখন তাওহিদের সাক্ষ্য দিলো, বোঝা গেল, রিসালাতের সাক্ষ্যও রয়েছে তার কাছে।
নবুওত অস্বীকার থেকে মুসলিম হওয়া : যারা আল্লাহকে স্বীকার করে এবং তাওহিদে বিশ্বাস রাখে, কিন্তু নবুওতকে অস্বীকার করে, তাদের মুসলিম হওয়ার জন্য ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ তথা নবিজির নবুওত ও রিসালাতের সাক্ষ্য দিতে হবে।
ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মুসলিম হওয়া : যারা মোটাদাগে আল্লাহর একত্ববাদ, নবিদের নবুওত ও রিসালাতে বিশ্বাস রাখে, কিন্তু আমাদের রাসুল (ﷺ)-কে অস্বীকার করে, যথা—ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়, তাদের স্রেফ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ সাক্ষ্য দিলেই হবে না, বরং নিজেদের ভ্রান্ত ধর্ম থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা করতে হবে। কেননা, তাদের অনেকে আল্লাহকে মানে, রাসুলুল্লাহর (স) রিসালাতও সত্য মনে করে। কিন্তু তাদের ধারণা—তিনি কেবল আরবদের নবি। ফলে এমন ধারণা বর্জন করতে হবে। এ কারণ ইমাম আজম রহ. থেকে বর্ণিত আছে, “যদি কোনো ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান বলে, ‘আমি মুসলিম’, তবে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মুসলিম বলা হবে না। বরং জিজ্ঞাসা করতে হবে, তোমার উদ্দেশ্য কী? যদি বলে ‘আমার উদ্দেশ্য ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলামে প্রবেশ করা’, তবে সে মুসলিম। আর যদি উদ্দেশ্য থাকে তার নিজের ধর্মকে আল্লাহর মনোনীত ইসলাম ঘোষণা করা, তবে সে মুসলিম নয়।” তবে এই জিজ্ঞাসাবাদ পার্থিব বিধিবিধান প্রয়োগের জন্য। নতুবা কেউ যদি নিজেকে মুসলিম ঘোষণা করে, এটুকুই যথেষ্ট। তার অন্তরের হিসাব আল্লাহ তায়ালার উপর থাকবে।
এটা মুখের ঘোষণার ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক মূলনীতি। সাধারণভাবে কালিমা শাহাদাহ পড়েই ইসলামে প্রবেশ করা যায়। বরং ক্ষেত্রবিশেষে মুখে শাহাদাহ ছাড়াও ইসলামে প্রবেশ করা সম্ভব। অর্থাৎ, এমন কোনো কাজের মাধ্যমেও মুসলিম হওয়া যায় যেটা শাহাদাহর প্রমাণ। যেমন—কোনো ব্যক্তি যদি মুসলমানদের জামাতের নামাযে শরিক হয়, তবে তাকে মুসলিম গণ্য করা হবে। কারণ, নামাযে বারবার তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দিতে হয়। পাশাপাশি নামায আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর মনোনীত দ্বীনের ভিত্তি। ফলে সে মুসলিম না হলে জামাতে নামায পড়ত না। নামায পড়াই প্রমাণ করে, সে মুসলিম। হয়তো কোনো অক্ষমতার কারণে মুখে স্বীকৃতি দিতে পারছে না। রাসুলুল্লাহ (স) থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসও এ কথার সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের জানাযায় শরিক হবে, আমাদের কিবলা অভিমুখী হবে, আমাদের যবাই করা পশু খাবে, তার জন্য তোমরা ঈমানের সাক্ষ্য দাও।’
টিকাঃ
২৮৯. দেখুন: বাদায়েউস সানায়ে, কাসানি (৭/১০০-১০৪)। রদ্দুল মুহতার (৪/২২৬-২২৯)। হাদিসটি দেখুন : বুখারি (কিতাবুস সালাত: ৩৯১)।