📄 ঈমানের জন্য কি মুখের স্বীকৃতি (ইকরার) জরুরি?
ইমাম আজম রহ.-এর কাছে ঈমান অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতিসহ একাধিক অনুষঙ্গ নিয়ে গঠিত হলেও মূল ‘ঈমান হৃদয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে কোনো ব্যক্তি যদি মুখে ঈমান আনে, কিন্তু হৃদয়ে ঈমান না আনে, তবে সে আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে না। বিপরীতে যে ব্যক্তি হৃদয়ে বিশ্বাস করে, কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ না করে, আল্লাহর কাছে সে মুমিন গণ্য হবে।’ ইমাম আরও বলেন, ‘ঈমানের মূল জায়গা অন্তর। এর শাখা-প্রশাখা শরীরে বিস্তৃত।’
এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি-এক. আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়া, দুই. মানুষের কাছে গৃহীত হওয়া। ইমাম আজম রহ. মনে করেন, আল্লাহর কাছে ঈমানকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য মূলত অন্তরের সত্যায়নই যথেষ্ট। কারণ, তিনি অন্তর্যামী। ফলে কেউ যদি অন্তরে অন্তরে তাঁর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে সে তাঁর কাছে মুমিন গণ্য হবে। মুখে প্রকাশ করা কিংবা সর্বত্র জানান দেওয়া শর্ত নয়। কিন্তু আমরা মানুষ তো সেটা জানতে পারব না। কারণ, আমাদের কারও হৃদয়ের ভিতরের কথা জানার সুযোগ নেই। তাই আমরা কেবল বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে ফয়সালা করব-মুখে স্বীকৃতি দিলে তাকে মুমিন গণ্য করব; মুখে স্বীকৃতি না দিলে মুমিন গণ্য করব না।
ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা মুমিন ও কাফের সাব্যস্ত করেন অন্তরের অবস্থার ভিত্তিতে। কারণ, তিনি অন্তর্যামী। কিন্তু আমরা মানুষেরা মানুষকে মুমিন ও কাফের সাব্যস্ত করব বাহ্যিক স্বীকারোক্তি, মিথ্যাচার, পোশাক-আশাক ও ইবাদত দেখে। উদাহরণস্বরূপ আমরা যদি অপরিচিত কোনো এলাকায় গিয়ে একদল মানুষকে মসজিদে কিবলামুখী হয়ে নামায আদায় করতে দেখি, তবে আমরা তাদের মুসলিম বলব; অথচ হতে পারে তারা ইহুদি বা খ্রিষ্টান! কিন্তু এ কারণ আল্লাহ আমাদের পাকড়াও করবেন না। কারণ, মানুষের অন্তরের খবর রাখা আমাদের দায়িত্ব নয়। আমাদের কেবল বাহ্যিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে কাউকে মুমিন কিংবা কাফের বলা, ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তরের খবর রাখবেন আল্লাহ তায়ালা।’
টিকাঃ
২৩৮. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১০)।
২৩৯. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৭)।
২৪০. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২২)।
📄 মুখের স্বীকৃতি যেভাবে বাদ পড়ে যায়
উপরের আলোচনা দ্বারা বাহ্যিকভাবে মনে হয়, ইমাম আজমের কাছে মূল ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি কেবল বাহ্যিক বিচারের জন্য, মানুষকে জানানোর জন্য। ফলে এটা ঈমানের মৌলিক বিষয় (রুকন) নয়। এটাকে এভাবেই বুঝেছেন পরবর্তী যুগের অনেক হানাফি আলেম। তারা বলেছেন, ইমামের মাযহাব হলো— মুখের স্বীকৃতি সর্বাবস্থায় কেবলই বাহ্যিক বিধিবিধান প্রয়োগের জন্য। এটা ঈমানের রুকন নয়, বরং শর্ত। এটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকলেও বড় জটিলতা ছিল না। কিন্তু বড় জটিলতা হলো, কেউ কেউ আরও সামনে এগিয়ে একপর্যায়ে স্বীকৃতিকে ঈমানের সংজ্ঞার্থ থেকে খারিজ করে দেন। ঈমানের আলোচনায় মৌখিক স্বীকৃতির বিষয়টি পুরোপুরি গায়েব করে দেন, যা ইমাম আজমের বিশুদ্ধ মত নয়। বরং এটা পরবর্তী সময়ের আশআরি মাযহাবের মত।
ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি (৩৩৩ হি.) ‘আত-তাওহিদ’-এ বলেন, ‘একদল লোক (কাররামিয়্যাহ) দাবি করেছে—ঈমান কেবল মুখের স্বীকৃতি; অন্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু আমরা বলি, ঈমানের মূল পাত্র হলো অন্তর। ... অন্তরে ঈমান থাকা অবস্থায় মুখের কুফরকে আল্লাহ কুফর বলেননি। বোঝা গেল, ঈমানের মূল জায়গা অন্তর। ...কেউ বলতে পারে—হাদিসে যে শাহাদাহ দেওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার কথা বলা হয়েছে, সেটার ব্যাখ্যা কী? আসলে এর মাধ্যমে এটা বোঝায় না যে, শাহাদাহটাই ঈমান কিংবা ঈমান অন্তরের বিষয় নয়; বরং এটা (শাহাদাহ তথা বাহ্যিক স্বীকৃতি) ঈমানের নির্দেশক ও পরিচায়ক। ফলে পার্থিব বিধিবিধানের ক্ষেত্রে আমাদের এটা গ্রহণ করা ছাড়া উপায় নেই। পৃথিবীর সব কাজেই এমন করতে হয়—বাহ্যিক অবস্থা দেখে ফয়সালা করতে হয়। ভিতরের বাস্তবতা সেটার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এমনটা জরুরি নয়...।’ ইমাম মাতুরিদি তাঁর তাফসিরের বিভিন্ন জায়গাতেও কাছাকাছি, বরং আরও স্পষ্ট মত ব্যক্ত করেছেন। যেমন—তিনি সূরা মায়িদার ৪১ নং আয়াতের তাফসিরে লিখেন, ‘এর দ্বারা বোঝা যায়, মুখের স্বীকৃতি ঈমানের শর্ত নয়; বরং ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। মুখ দ্বারা স্রেফ অন্তরের সত্যায়নটা প্রকাশ করা হয়।’ তিনি অন্যত্র লিখেন, ‘ঈমান স্রেফ সত্যায়ন; অন্যকিছু নয়।’ মাইমুন নাসাফি (৫০৮ হি.) বলেন, ‘আবু মনসুর আল-মাতুরিদির কাছে ঈমান হচ্ছে স্রেফ সত্যায়ন (الإيمان مجرد التصديق)।’ তাঁর অনুসরণে আবু সালামাহ সমরকন্দিও লিখেন, ‘ঈমান হলো সত্যায়ন।’
নাসাফি বলেন, ‘ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। এটাই আবু মনসুর মাতুরিদির মত। আবু হানিফা থেকেও এটা বর্ণিত।’ নাসাফি তাঁর ‘আত-তামহিদ’-এ লিখেন, ‘ঈমানের শাব্দিক অর্থ সত্যায়ন করা। এই শাব্দিক অর্থ তথা অন্তরের সত্যায়নই ঈমানের হাকিকত। এটুকুই বান্দার উপর ওয়াজিব। সুতরাং কেউ যখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যা-কিছু নিয়ে এসেছেন সেগুলোকে সত্যায়ন করে, তবে আল্লাহর কাছে সে মুমিন গণ্য হবে। তবে মুখের স্বীকৃতি হচ্ছে মানুষকে জানানোর জন্য, (ব্যক্তির উপর) ইসলামের বিধিবিধান প্রয়োগের জন্য।’ জামালুদ্দিন আহমদ গযনবিও একই কথা লিখেছেন।
নুরুদ্দিন সাবুনি (৫৮০ হি.) লিখেন, ‘আমাদের মুহাক্কিকদের মাযহাব হলো, ঈমান স্রেফ অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি দুনিয়ার বিধিবিধানের জন্য। ফলে কেউ অন্তরে সত্যায়নের পরে মুখে স্বীকৃতি না দিলেও আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে। ...এটা ইমাম আবু হানিফা এবং আবু মনসুর মাতুরিদির বক্তব্য। ফলে মূল ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি কিংবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ, যেহেতু অন্তরের সত্যায়ন বাইরের কারও জানার সুযোগ নেই, তাই এর আলামতস্বরূপ কাজ করবে মুখের স্বীকৃতি। দুনিয়ার বিধিবিধান সে আলোকে নির্ধারিত হবে।’
মাহমুদ ইবনে যায়েদ লামিশি (৫২২ হি.) লিখেন, ‘অধিকাংশ আহলে সুন্নাতের কাছে ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি এবং অন্তরের সত্যায়ন দুটোর সমন্বয়। ফলে একদিকে অন্তরের সত্যায়ন করতে হবে, অন্যদিকে ঈমানের বিধান প্রয়োগের জন্য মুখে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিপরীতে আবু হানিফা রহ. থেকে বর্ণিত আছে, ঈমান কেবল অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি রুকন নয়, বরং ঈমানের নির্দেশক। এটা আবুল হাসান আশআরি এবং আবু মনসুর মাতুরিদিসহ একদল মুতাকাল্লিমের বক্তব্য।’
আবু বারাকাত নাসাফি (৭১০ হি.) ‘আল-ইতিমাদ’-এ লিখেন, ‘ঈমান হচ্ছে তাসদিক তথা অন্তরের সত্যায়ন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসুল (ﷺ) যা-কিছু তাঁর পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন সেগুলোকে সত্যায়ন করবে, আল্লাহর কাছে সে মুমিন গণ্য হবে। মুখের স্বীকৃতি ইসলামের বিধিবিধান প্রয়োগের জন্য। এটাই ইমাম আবু হানিফার মত। এটাকেই গ্রহণ করেছেন শায়খ আবু মনসুর আল-মাতুরিদি এবং আশআরির বিশুদ্ধ মতও এটাই।’
আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (৮৫৫ হি.) বলেন, ‘মুখের স্বীকৃতি ঈমানের রুকন নাকি স্রেফ দুনিয়ার বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত, এটা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কারও কারও মতে এটা শর্ত। ফলে যদি কেউ আল্লাহ ও রাসুলকে অন্তরে স্বীকার করে, তবে সে আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে, মুখে স্বীকৃতি না দিলেও চলবে। নাসাফি থেকে বর্ণিত, এটাই ইমাম আবু হানিফা, আশআরি ও মাতুরিদির মত। বিপরীতে কারও কারও মত হলো, মুখের স্বীকৃতি রুকন। হ্যাঁ, অন্তরের সত্যায়নের মতো মূল রুকন নয়, বরং অতিরিক্ত রুকন। এ কারণে বাধ্যবাধকতা বা অক্ষমতার সময় এক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। ফখরুল ইসলাম বাযদাবি বলেন, ফকিহদের কাছে এটা (অতিরিক্ত) রুকন। আর মুতাকাল্লিমিনের কাছে এটা দুনিয়ার বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত।’
টিকাঃ
২৪১. আত-তাওহিদ, মাতুরিদি (২৬৮-২৭০)।
২৪২. তাফসিরে মাতুরিদি (তাবিলাতু আহলিস সুন্নাহ) (৩/৫২০)।
২৪৩. তাফসিরে মাতুরিদি (৪/৫৩৩)।
২৪৪. দেখুন: বাহরুল কালাম, নাসাফি (১৫১-১৫২)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/১৫৪)।
২৪৫. দেখুন: জুমাল মিন উসুলিদ্দিন (১৪-১৫)।
২৪৬. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৭৭)।
২৪৭. আত-তামহিদ ফি উসুলিদ্দিন (১৪৬-১৪৭)।
২৪৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন, গযনবি (২৫২)।
২৪৯. দেখুন: আল-কিফায়াহ, সাবুনি (৩৫৩-৩৫৪)। আল-বিদায়াহ মিনাল কিফায়াহ (১৫২)
২৫০. দেখুন : আত-তামহিদ, লামিশি (১২৬-১২৭)।
২৫১. আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৩৭০)।
২৫২. উমদাতুল কারি, আইনি (১/১০৩)।
📄 ইমাম আজমের মাযহাব নির্ধারণ
ইমাম আজমের মাযহাব নির্ধারণ: কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। অর্থাৎ, ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্য দ্বারা—তিনি মুখের স্বীকৃতিকে ঈমানের রুকন মনে করতেন না, স্রেফ বাহ্যিক বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত বলতেন—সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায় না। কারণ, তিনি ঈমানের পরিচয়দানে সর্বত্রই মুখের স্বীকৃতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। স্রেফ ‘তাসদিক’ তথা সত্যায়নকে তিনি কোথাও ঈমান বলেননি।
আল-ফিকহুল আকবারের শুরুতেই ইমাম বলেন, ‘তাওহিদ ও আকিদার মূল বিষয় হলো মুখে স্বীকৃতি দেওয়া যে (يجب أن يقول), আমি ঈমান আনলাম আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণের উপর, তাঁর কিতাবসমূহের উপর, তাঁর রাসুলগণের উপর, মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর, আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তাকদিরের ভালোমন্দের উপর, পরকালের হিসাব-নিকাশ, মিযান (আমলের দাঁড়িপাল্লা) এবং জান্নাত-জাহান্নামের উপর। আমি বিশ্বাস করি এগুলো সব সত্য।’ এখানে ইমাম ঈমানকে মুখে স্বীকৃতি দিতে বলেছেন, ‘স্রেফ অন্তরে বিশ্বাস করবে’ এমন বলেননি। আল-ফিকহুল আকবারের অন্যত্র আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘ঈমান হলো স্বীকৃতি ও সত্যায়ন (الإقرار والتصديق)।’
সায়েদ নিশাপুরি ওয়াকি ইবনুল জাররাহ থেকে বর্ণনা করেন, আবু হানিফা রহ. বলেছেন, কেবল জানাশোনার (মারিফাত) মাধ্যমে কেউ মুমিন হতে পারবে না, বরং (হৃদয়ের) জানার পাশাপাশি মুখেও স্বীকৃতি দিতে হবে। যখন জানার পাশাপাশি মুখে স্বীকৃতি দেবে, তখনই মুমিন হবে (لا يكون مؤمنا بالمعرفة، حتى يعرف ويقر بلسانه، فإذا عرف وأقر بلسانه فهو مؤمن)।
আল-ফিকহুল আবসাতে আবু মুতি বলখি ঈমান সম্পর্কে জানতে চাইলে ইমাম আজম বলেন, ‘ঈমান হলো—আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই—এ মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া। আর আল্লাহর ফেরেশতা, তাঁর নাযিলকৃত কিতাব, তাঁর প্রেরিত রাসুল, তাঁর জান্নাত, জাহান্নাম, কিয়ামত এবং তাকদিরের ভালোমন্দে সাক্ষ্য দেওয়া। আরও সাক্ষ্য দেওয়া যে, পৃথিবীর কাউকে তার নিজের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি; বরং আল্লাহ তাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন প্রত্যেককে সেদিকেই যেতে হবে। প্রত্যেকে তাকদিরের অধীন।’
একইভাবে ইমাম নিজস্ব রেওয়ায়াতে হাদিসে জিবরিল বর্ণনা করেন। সেখানে জিবরিলের প্রশ্নের উত্তরে রাসুলুল্লাহ (স) বলেন ঈমান হচ্ছে, ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল—এই মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া।’ আর সাক্ষ্য হচ্ছে মুখের স্বীকৃতি। আবু মুতি তা-ই বুঝেছেন। ফলে তিনি ইমামকে বলেন, যদি এগুলো বিশ্বাস করে এবং স্বীকৃতি দেয়, তবে সে মুমিন? ইমাম বলেন, ‘হ্যাঁ। কারণ, যখন এগুলোর স্বীকৃতি দিলো, তখন সে সামগ্রিক ইসলামের স্বীকৃতি দিলো। তাই সে মুমিন (فإذا استيقن بهذا وأقر به فهو مؤمن؟ قال نعم، إذا أقر بهذا فقد أقر بجملة الإسلام وهو مؤمن)।’
আবু মুতি তাকে আরও জিজ্ঞাসা করেন, যদি কেউ শিরকের ভূখণ্ডে বসে ইসলামের সামগ্রিক বিষয়কে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু ফরয বিধিবিধান ও শরিয়ত সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান না থাকে, আল্লাহর কিতাব ও শরিয়তের কোনো-কিছুতে স্বীকৃতি না থাকে, তবে আল্লাহকে স্বীকার করে, তাঁর প্রতি ঈমানকে স্বীকার করে এবং এই অবস্থায় মারা যায়, সে কি মুমিন? ইমাম বললেন, ‘হ্যাঁ। যদি শরিয়ত সম্পর্কে কোনো জ্ঞান না থাকে এবং কোনো আমল না থাকে, কিন্তু ঈমানের স্বীকৃতি থাকে, তবে সে মুমিন।’ এখানে প্রত্যেকটি জায়গাতে ‘মুখের স্বীকৃতি’ (الإقرار) বলা হয়েছে। স্রেফ অন্তরের সত্যায়ন (التصديق) শব্দটা উল্লেখ করাই হয়নি। ফলে ইমাম ঈমান বলতে কেবল অন্তরের সত্যায়নকে বুঝতেন, মুখের স্বীকৃতিকে অতিরিক্ত শর্ত বলতেন—এটা দলিলবিহীন বক্তব্য। শিরকের ভূখণ্ডে তার উপর কে ইসলামের আইন প্রয়োগ করবে? তবুও সেখানে ইমাম ‘স্বীকৃতি’র কথা বলেছেন। বোঝা গেল, এটা কেবল বাহ্যিক বিধান প্রয়োগের শর্ত নয়, বরং ঈমানের মৌলিক অঙ্গ (রুকন)।
ইমাম আজম তাঁর জীবনের সর্বশেষ মুহূর্তে কৃত ওসিয়তও শুরু করেছেন ঈমানের পরিচয় দিয়ে। সেখানেও একই কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘ঈমান হলো (الإيمان هو إقرار باللسان وتصديق بالجنان)।’ এখানে দেখুন, ইমাম মুখের স্বীকৃতিকে সত্যায়নের আগে নিয়ে এসেছেন। বরং আল-ওয়াসিয়্যাহতে ইমাম আজম ঈমানের প্রত্যেকটি বিষয় আলোচনার আগে ‘আমরা স্বীকৃতি দিই’ (نقر) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ফলে এটা ঈমানের হাকিকত নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর মাযহাব বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যদি মুখের স্বীকৃতিকে তিনি ঈমানের রুকন মনে না করতেন, তবে ‘আমরা সত্যায়ন করি’ (نصدق) কিংবা ‘বিশ্বাস করি’ (نؤمن) এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করলেই পারতেন। এর পরেও যেসব আলেম ঈমান স্রেফ সত্যায়নের প্রবক্তা, তারা এগুলোকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন।
টিকাঃ
২৫৩. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
২৫৪. প্রাগুক্ত (৬)।
২৫৫. আল-ইতিকাদ (১০২-১০৩)।
২৫৬. আল-ফিকহুল আবসাত (৪২)।
২৫৭. প্রাগুক্ত (৪০-৪১)।
২৫৮. আল-ফিকহুল আবসাত (৪১)।
২৫৯. দেখুন : আল-ফিকহুল আবসাত (৪২)।
২৬০. আল-ওয়াসিয়্যাহ (২৭)।
২৬১. দেখুন: শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, বাবিরতি (৫১-৫৩)।
📄 ঈমানের জন্য মুখের স্বীকৃতি আবশ্যক
ঈমানের জন্য মুখের স্বীকৃতি আবশ্যক: মোটকথা, ইমাম আজমের একাধিক গ্রন্থের অগণিত বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত যে, তাঁর কাছে ঈমান মানে অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই। বরং মুখের স্বীকৃতির অধিক গুরুত্ব বোঝাতে তিনি এটাকে সর্বত্র অন্তরের সত্যায়নের আগে উল্লেখ করেছেন। প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে এই আলোচনার শুরুর দিকে উদ্ধৃত ইমামের বক্তব্য— ‘ঈমান হৃদয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে কোনো ব্যক্তি যদি মুখে ঈমান আনে কিন্তু হৃদয়ে ঈমান না আনে, তবে সে আল্লাহর কাছে মুমিন হিসেবে গণ্য হবে না। বিপরীতে যে ব্যক্তি হৃদয়ে বিশ্বাস করে কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ না করে, আল্লাহর কাছে সে মুমিন বলে গণ্য হবে।’-এর ব্যাখ্যা কী? এর দ্বারা তো স্পষ্টভাবে বোঝা যায় মুখের স্বীকৃতি মূল ঈমানের জন্য নিষ্প্রয়োজন।
আমরা বলব—হ্যাঁ, এখানকার বক্তব্য দ্বারা তা-ই বোঝা যায়। কিন্তু এই একটা বক্তব্য দ্বারাই ‘ইমাম মৌখিক স্বীকৃতিকে ঈমানের রুকন মনে করতেন না।’—এ ধরনের দাবি করা যায় না। কারণ, অন্যান্য বক্তব্য দেখলে বুঝে আসবে, এটা স্বাভাবিক অবস্থায় নয়। বরং তিনি ‘আমল’ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয় সেটা বোঝাতে গিয়ে বলেছেন যে, মুখে স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়াও মুমিন হওয়ার পথ রয়েছে। অর্থাৎ, যেভাবে আমল ছাড়া ঈমান সংঘটিত হয়, একইভাবে স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়াও ঈমান সংঘটিত হবে। কিন্তু সেটা সর্বাবস্থায় নয়, বরং বিশেষ প্রয়োজন-সাপেক্ষে—স্বীকৃতির পথে প্রতিবন্ধকতা থাকা অবস্থাতে। যেমন—কেউ স্বীকৃতি দেওয়ার আগেই মারা গেল। অথবা অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য ওজরের কারণে মুখে স্বীকৃতি দিতে পারল না। তার জন্য কেবল অন্তরের সত্যায়ন দ্বারা ই ঈমান সংঘটিত হয়ে যাবে। মানুষের কাছে কাফের থাকলেও আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে। কারণ, তিনি অন্তর্যামী। এক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের কারও দ্বিমত নেই।
কিন্তু সুযোগ ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মুখের স্বীকৃতি পরিত্যাগ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সকল ইমামের মতো ইমাম আজমের মতেও আল্লাহর কাছেও মুমিন গণ্য হবে না। কারণ, সে ঈমানের রুকন ভঙ্গ করেছে। আমাদের দাবির দলিল খোদ ইমামের বক্তব্য। তিনি বলেন (আবু ইউসুফের বর্ণনা অনুযায়ী) : (وَإِنْ عُرِفَ الله وصدق به، ومات قبل أن يقر بلسانه مع إمكانه فهو كافر، لأن الله تعالى جعل الإيمان في كتابه بجارحة القلب واللسان) অর্থাৎ, ‘এটা হলো তাদের ক্ষেত্রে যাদের মুখে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব না হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তির পক্ষে মুখে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হওয়ার পরও যদি মুখে স্বীকৃতি না দেয়, তবে তার অন্তরের ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না এবং সে মৃত্যুবরণ করলে কাফের হিসেবে মৃত্যুবরণ করবে। কেননা, ঈমান অন্তরের বিশ্বাস এবং মুখের স্বীকারোক্তি দুটোই। ইমাম এক্ষেত্রে কিছু দলিল পেশ করে বলেন,
‘তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মুসা, ঈসা, অন্যান্য নবিকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে সবকিছুর উপর। আমরা তাদের মাঝে ভেদাভেদ করি না। আমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণকারী। অতএব, তারা যদি ঈমান আনে তোমাদের ঈমান আনার মতো, তবে তারা সুপথ পাবে।’ [বাকারা : ১৩৬-১৩৭] আরও বলেন, ﴾وَأَلْزَمَهُمْ كَلِمَةَ Тَقْوَى﴿ অর্থ : ‘তাদের উপর তাকওয়ার কালিমা (মুখের স্বীকৃতি) অপরিহার্য করে দিলেন।’ [ফাতাহ : ২৬]
আরও বলেন, ﴾ وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا ﴿ অর্থ : ‘তারা অন্যায় ও অহংকারবশত (আমার) নিদর্শনাবলিকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে চিনেছিল।’ [নামল : ১৪]
অন্যত্র বলেন, ‘আমি যাদের কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে যেমন চেনে নিজেদের সন্তানকে।’ [বাকারা : ১৪৬] অন্তরের বিশ্বাস ও চেনা সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা তাদের মুমিন বলেননি (কারণ, তারা সত্যায়ন ও স্বীকৃতি দেয়নি)। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা বলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তাহলে সফলকাম হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বলবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন।’ ফলে কেবল জানলেই হবে না, মুখে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
উল্লিখিত কুরআনের আয়াত ও হাদিসগুলোতে সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ঈমানকে মুখেও ‘স্বীকৃতি দিতে’ বলা হচ্ছে। বোঝা গেল, মুখের স্বীকৃতি স্রেফ বাহ্যিক বিধিবিধানের জন্য শর্ত নয়, বরং এটা ঈমানের রুকন। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্যও অন্তরের সত্যায়নের পাশাপাশি মুখের স্বীকৃতি প্রয়োজন। কারণ, তিনি নিজেই এটাকে প্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করেছেন। হ্যাঁ, কেউ বিশেষ পরিস্থিতিতে মুখে স্বীকৃতি না দিতে পারলে তখন অন্তরের ঈমান আল্লাহর কাছে মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে, ইনশাআল্লাহ, যেমনটা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘কেউ ঈমান আনার পরে আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরের জন্য হৃদয় উন্মুক্ত করলে তার উপর আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হবে এবং তার জন্য আছে মহা শাস্তি। তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফর করতে বাধ্য করা হয় এবং তার চিত্ত ঈমানে অবিচল থাকে।’ [নাহল : ১০৬] কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া স্বীকৃতি ছেড়ে দিলে ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে মুখের স্বীকৃতি ইমাম আজমের কাছে ঈমানের রুকন; কিন্তু অবস্থার প্রেক্ষিতে কখনো কখনো তাতে ‘রুখসত’ (ছাড়) দেওয়ার সুযোগ আছে।
ফলে ইমামের মাযহাব স্পষ্ট। বিশেষ প্রয়োজনে মুখের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় মুখের স্বীকৃতি রুকন গণ্য হবে এবং মুখের স্বীকৃতি ছাড়া আল্লাহর কাছেও ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। জাহম ইবনে সাফওয়ানের সঙ্গে ইমামের আলোচনার মাঝেও এটার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। পিছনে আমরা সবিস্তারে এটা উল্লেখ করেছি। সেখানে দেখেছি, জাহম ইমামকে জিজ্ঞাসা করেন, মুখের স্বীকৃতি ছাড়া কেবল অন্তরের জানাশোনা (মারিফাত) দ্বারা কেউ মুমিন হবে কি না? ইমাম তার জবাবে বলেন, ‘যদি অন্তরের জানা মুখে স্বীকার না করে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে কাফের।’ জাহম প্রশ্ন করেন, আল্লাহর সকল সিফাত জানার পরেও মুমিন হবে না কীভাবে? ইমাম আজম তখন তার সামনে কুরআন ও সুন্নাহর একাধিক দলিল উপস্থাপন করেন, যেখানে মুখের স্বীকৃতির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ঈমানকে হৃদয় ও মুখ দুটোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা রাসুলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যখন শোনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রুসিক্ত দেখতে পাবেন। এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব, আমাদেরও সাক্ষ্যদাতাদের তালিকাভুক্ত করে নিন। আল্লাহ এবং আমাদের কাছে আগত সত্যে আমাদের ঈমান না আনার কী কারণ থাকতে পারে যখন আমরা প্রত্যাশা করি, আল্লাহ আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের তালিকাভুক্ত করুন? সুতরাং তাদের এ কথার কারণে আল্লাহ তাদের এমন সব উদ্যান দান করবেন যার তলদেশে নহর প্রবহমান থাকবে। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান।’ [মায়িদা : ৮৩-৮৫] ফলে জান্নাতে যাওয়ার জন্য অন্তরের জানা এবং মুখের স্বীকৃতি দুটোই জরুরি। আল্লাহ তায়ালা
‘তোমরা বলে দাও যে, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সেই বাণীর প্রতি যা আমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে আর যা ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাদের সন্তানের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা দেওয়া হয়েছিল মুসা ও ঈসাকে, যা অন্যান্য নবিকে তাঁদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। আমরা নবিগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই অনুগত। অতএব, তারা যদি ঈমান আনে যেভাবে তোমরা ঈমান এনেছ, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।’ [বাকারা : ১৩৬-১৩৭]
ইমাম আরও বলেন—আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা বলো লা ইলাহা ইলাল্লাহ, তাহলে সফলতা লাভ করবে।’ ফলে মুখের স্বীকৃতি ছাড়া কেবল অন্তরে জানলে কেউ মমিন হবে না। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “জাহান্নাম থেকে সে ব্যক্তি বের হয়ে আসবে যে বলত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, আর যার অন্তরে দানাপরিমাণ ঈমান থাকবে।” রাসুলুল্লাহ (স) এটা বলেননি যে, আল্লাহকে চিনত; বরং ঈমান যদি স্বীকৃতির পরিবর্তে কেবল জানার নামই হতো, তবে ঈমান প্রত্যাখ্যানকারী প্রত্যেককে মুমিন বলা হতো। এই যুক্তিতে ইবলিসও মুমিন হতো। কেননা, সে আল্লাহকে চেনে ও জানে। তাকে স্রষ্টা, রিযিকদাতা, জীবন ও মৃত্যুদাতা হিসেবে চেনে। ...বরং এতে সকল কাফের মুখে অস্বীকার করা সত্ত্বেও
‘তারা অন্যায় ও অহংকার করে নিদর্শনাবলিকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে নিশ্চিত জেনেছিল।’ [নামল : ১৪] এখানে তাদের অন্তরের নিশ্চিত জানা (ইয়াকিন) সত্ত্বেও তাদের মুমিন বলা হয়নি। কারণ, তারা মুখে অস্বীকার করেছে। আল্লাহ আরও বলেন, ‘তারা আল্লাহর নেয়ামত চেনার পরও অস্বীকার করে। তাদের অধিকাংশই অকৃতজ্ঞ।’ [নাহল : ৮৩] আল্লাহ আরও বলেন, “আপনি জিজ্ঞাসা করুন, কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে জীবনোপকরণ সরবরাহ করেন? শোনা ও দেখা কার কর্তৃত্বাধীন? জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করেন, আর মৃতকে জীবিত থেকে কে বের করেন? এবং সকল বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন? তখন তারা বলবে, ‘আল্লাহ’। বলো, তবুও কি তোমরা (তাকে) ভয় পাবে না?” [ইউনুস : ৩১] এখানেও দেখো, কেবল অন্তরের জানাশোনা কোনো কাজে আসেনি। মুখে অস্বীকার করার কারণে অন্তরে নবিজিকে নিজেদের সন্তানের মতো চিনেও তারা মুমিন হতে পারেনি।
এটা কেবল ইমাম আজমের নয়, জমহুর আহলে সুন্নাতের ইমামদের বক্তব্যও এক ও অভিন্ন। ইমাম বুখারি বলেন, ‘আমি হিজায, মক্কা, মদিনা, কুফা, ওয়াসেত, ইরাক, বাগদাদ, শাম ও মিশরের হাজারের অধিক আলেমের সাক্ষাৎ পেয়েছি। তাদের কয়েকজন হলেন মক্কি ইবনে ইবরাহিম, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, কুতাইবা ইবনে সাইদ, শিহাব ইবনে মা'মার, মুহাম্মাদ আল-ফিরয়াবি, ইয়াহইয়া ইবনে কাসির, আবু সালেহ, নুআইম ইবনে হাম্মাদ, হুমাইদি, মুতাররিফ ইবনে আবদুল্লাহ, ইবরাহিম ইবনুল মুনযির, যাহহাক ইবনে মাখলাদ, হিশাম ইবনে আবদুল মালিক, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম, ইসহাক ইবনে ইবরাহিম হানযালি... (আরও অনেক নাম উল্লেখ করে বলেন), তাদের কাউকে এই বিষয়ে আমি মতভেদ করতে দেখিনি যে, দ্বীন (তথা ঈমান) হলো মুখের স্বীকারোক্তি ও আমল (অন্তরের সত্যায়ন এবং বাহ্যিক আমল) (الدين قول وعمل)।
টিকাঃ
২৬২. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৩১-৩২)।
২৬৩. দেখুন: মানাকিব, মক্কি (১২৪-১২৬)। মানাকিব, বাযযাযি (২০১-২০২)।