📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আহলে সুন্নাতের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য

📄 আহলে সুন্নাতের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য


আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল—তিনটি বিষয়ের সমন্বয় বোঝেন। মালেক, শাফেয়ি, আওযায়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ প্রমুখের মতো ফকিহ ও মুহাদ্দিস এমনকি মুতাকাল্লিমিন এবং সুফিয়ায়ে কেরামের মধ্য থেকে হারেস মুহাসেবি, আবুল আব্বাস কালানেসি প্রমুখ এই মত রাখেন। তাদের মতে ঈমান অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল সবগুলো।

মুহাম্মাদ ইবনে নসর মারওয়াযি তাঁর ‘তাজিমু কাদরিস সালাত’ গ্রন্থে বড় বড় ইমাম থেকে উক্ত সংজ্ঞার্থ বর্ণনা করেছেন। আবদুর রাযযাক তাঁর ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে একই সংজ্ঞা সুফিয়ান সাওরি, মালেক ইবনে আনাস, আওযায়ি, ইবনে জুরাইজ, মা’মার ইবনে রাশেদসহ বিভিন্ন ফকিহ ও মুহাদ্দিস থেকে বর্ণনা করেছেন। লালাকায়ি তাঁর ‘শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ’ গ্রন্থে এ বক্তব্য শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ, আবু উবাইদ (কাসেম ইবনে সাল্লাম)-সহ অন্যান্য ইমাম থেকে বর্ণনা করেছেন। হাকেম ‘মানাকিবে শাফেয়ি’ গ্রন্থে রবি ইবনে সুলাইমান সূত্রে বর্ণনা করেছেন; শাফেয়ি বলেন, ‘ঈমান হলো স্বীকৃতি ও আমল। বাড়ে ও কমে।’

যেমনটা বলা হয়েছে, কেবল ফুকাহা ও মুহাদ্দিসিন নন, বরং সালাফের যুগের তাসাওউফের শায়খগণও ঈমানের সংজ্ঞার্থের ক্ষেত্রে জমহুরের মত রাখতেন। ফুযাইল ইবনে ইয়াযকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে ঈমান হলো: মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের গ্রহণ (কবুল) এবং আমল।’

কিন্তু ইমাম আজম এটাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম থেকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। তিনি আমল তথা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলকে (প্রথমত) ঈমানের সংজ্ঞার্থের বাইরে রাখেন। আল-ওয়াসিয়্যাহতে ইমাম আজম রহ. ঈমানকে তিনটি বিষয়ের সমষ্টি বলেছেন। তাঁর মতে ঈমান হলো, মুখের স্বীকারোক্তি (ইকরার), অন্তরের সত্যায়ন (তাসদিক) এবং হৃদয়ের জানা (মারিফাত)। মারিফাত দ্বারা এখানে স্রেফ জানা উদ্দেশ্য নয়, বরং এর দ্বারা তাসদিক (অন্তরের সত্যায়ন) উদ্দেশ্য। ফলে ইমামের কাছে ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি। এ জন্য ইমাম তহাবি রহ. ঈমানের সংজ্ঞার্থে লিখেছেন, ‘ঈমান হলো : মুখে স্বীকার করা, অন্তরে সত্যায়ন করা।’

দেখা গেল, ঈমানের হাকিকত নির্ধারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাত এবং ইমাম আজমের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে; কিন্তু এই পার্থক্য তাত্ত্বিক। অর্থাৎ, যদিও সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে ইমাম আজম রহ. ঈমান থেকে আমলকে আলাদা করেন, কিন্তু প্রায়োগিকভাবে তিনি ঈমানকে বিশ্বাস ও কাজ সবগুলোর সমন্বিত রূপ মনে করেন।

আবু মুকাতিল সমরকন্দি ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থে ইমাম থেকে বর্ণনা করেন, ঈমান হলো, ‘সত্যায়ন করা (তাসদিক), জানা (মারিফাত), ইয়াকিন রাখা, স্বীকৃতি দেওয়া (ইকরার) এবং আত্মসমর্পণ করা (ইসলাম)।’ খেয়াল করে দেখুন, এখানে ইমাম ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল-সবগুলোকে বোঝেন। কারণ, তিনি ঈমানের অর্থের মাঝে ‘ইসলাম’-কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর ইসলাম হলো বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল। যেমন- নামায, রোযা ইত্যাদি। ফলে তাত্ত্বিকভাবে তিনি আমলকে আলাদা করলেও প্রায়োগিকভাবে ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল-সবগুলোকেই বোঝেন। এতে তাঁর বক্তব্যের মাঝে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের বক্তব্যের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকল না। ইমাম আজম বলেন, “aunque এগুলোর নাম ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু মূলকথা এক (أسماء مختلفة ومعناها واحد), আর তা হলো ঈমান। মানুষকে যেমন ‘রাজুল’ (ব্যক্তি), ‘ইনসান’ (মানুষ), ‘ফুলান’ (জনৈক) বিভিন্ন নামে বোঝানো যায়, ঈমানকেও বিভিন্ন নামে বোঝানো হয়।”

ইমাম আজম ঈমান ও ইসলাম (তথা আমল)-এর সম্পর্ক স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইসলাম ছাড়া ঈমান হয় না, আবার ঈমান ছাড়া ইসলাম পাওয়া যায় না। উভয়ে পিঠ ও পেটের মতো।’ নিশাপুরির বর্ণনায় এ ব্যাপারে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি স্পষ্ট হয়। তিনি লিখেন, হাম্মাদ ইবনে যায়দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হানিফা রহ.-এর সঙ্গে মসজিদুল হারামে ছিলাম। তখন একব্যক্তি এসে তাকে ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন, ‘দুটো এক’। ফলে কার্যত জমহুর আহলে সুন্নাত এবং ইমাম আজমের মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই। ‘ঈমান’ ও ‘ইসলাম’, ‘ঈমান’ ও ‘আমল’-এর সম্পর্ক নিয়ে সামনে আরও বিস্তারিত আলোচনা আসবে, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
২২৯. দেখুন: তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৭৫)। শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, মুফতি যাদাহ (৩৩)।
২৩০. দেখুন: ফাতহুল বারি (১/৪৬-৪৭)।
২৩১. আস-সুন্নাহ, আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ (২৭৫)।
২৩২, আল-ওয়াসিয়্যাহ, আবু হানিফা (২৭)।
২৩৩. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২১)।
২৩৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৩)।
২৩৫. প্রাগুক্ত (১৪)।
২৩৬. আল-ফিকহুল আকবার (৬)।
২৩৭. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১০৪)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ঈমানের জন্য কি মুখের স্বীকৃতি (ইকরার) জরুরি?

📄 ঈমানের জন্য কি মুখের স্বীকৃতি (ইকরার) জরুরি?


ইমাম আজম রহ.-এর কাছে ঈমান অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতিসহ একাধিক অনুষঙ্গ নিয়ে গঠিত হলেও মূল ‘ঈমান হৃদয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে কোনো ব্যক্তি যদি মুখে ঈমান আনে, কিন্তু হৃদয়ে ঈমান না আনে, তবে সে আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে না। বিপরীতে যে ব্যক্তি হৃদয়ে বিশ্বাস করে, কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ না করে, আল্লাহর কাছে সে মুমিন গণ্য হবে।’ ইমাম আরও বলেন, ‘ঈমানের মূল জায়গা অন্তর। এর শাখা-প্রশাখা শরীরে বিস্তৃত।’

এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি-এক. আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়া, দুই. মানুষের কাছে গৃহীত হওয়া। ইমাম আজম রহ. মনে করেন, আল্লাহর কাছে ঈমানকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য মূলত অন্তরের সত্যায়নই যথেষ্ট। কারণ, তিনি অন্তর্যামী। ফলে কেউ যদি অন্তরে অন্তরে তাঁর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে সে তাঁর কাছে মুমিন গণ্য হবে। মুখে প্রকাশ করা কিংবা সর্বত্র জানান দেওয়া শর্ত নয়। কিন্তু আমরা মানুষ তো সেটা জানতে পারব না। কারণ, আমাদের কারও হৃদয়ের ভিতরের কথা জানার সুযোগ নেই। তাই আমরা কেবল বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে ফয়সালা করব-মুখে স্বীকৃতি দিলে তাকে মুমিন গণ্য করব; মুখে স্বীকৃতি না দিলে মুমিন গণ্য করব না।

ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা মুমিন ও কাফের সাব্যস্ত করেন অন্তরের অবস্থার ভিত্তিতে। কারণ, তিনি অন্তর্যামী। কিন্তু আমরা মানুষেরা মানুষকে মুমিন ও কাফের সাব্যস্ত করব বাহ্যিক স্বীকারোক্তি, মিথ্যাচার, পোশাক-আশাক ও ইবাদত দেখে। উদাহরণস্বরূপ আমরা যদি অপরিচিত কোনো এলাকায় গিয়ে একদল মানুষকে মসজিদে কিবলামুখী হয়ে নামায আদায় করতে দেখি, তবে আমরা তাদের মুসলিম বলব; অথচ হতে পারে তারা ইহুদি বা খ্রিষ্টান! কিন্তু এ কারণ আল্লাহ আমাদের পাকড়াও করবেন না। কারণ, মানুষের অন্তরের খবর রাখা আমাদের দায়িত্ব নয়। আমাদের কেবল বাহ্যিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে কাউকে মুমিন কিংবা কাফের বলা, ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তরের খবর রাখবেন আল্লাহ তায়ালা।’

টিকাঃ
২৩৮. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১০)।
২৩৯. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৭)।
২৪০. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২২)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মুখের স্বীকৃতি যেভাবে বাদ পড়ে যায়

📄 মুখের স্বীকৃতি যেভাবে বাদ পড়ে যায়


উপরের আলোচনা দ্বারা বাহ্যিকভাবে মনে হয়, ইমাম আজমের কাছে মূল ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি কেবল বাহ্যিক বিচারের জন্য, মানুষকে জানানোর জন্য। ফলে এটা ঈমানের মৌলিক বিষয় (রুকন) নয়। এটাকে এভাবেই বুঝেছেন পরবর্তী যুগের অনেক হানাফি আলেম। তারা বলেছেন, ইমামের মাযহাব হলো— মুখের স্বীকৃতি সর্বাবস্থায় কেবলই বাহ্যিক বিধিবিধান প্রয়োগের জন্য। এটা ঈমানের রুকন নয়, বরং শর্ত। এটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকলেও বড় জটিলতা ছিল না। কিন্তু বড় জটিলতা হলো, কেউ কেউ আরও সামনে এগিয়ে একপর্যায়ে স্বীকৃতিকে ঈমানের সংজ্ঞার্থ থেকে খারিজ করে দেন। ঈমানের আলোচনায় মৌখিক স্বীকৃতির বিষয়টি পুরোপুরি গায়েব করে দেন, যা ইমাম আজমের বিশুদ্ধ মত নয়। বরং এটা পরবর্তী সময়ের আশআরি মাযহাবের মত।

ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি (৩৩৩ হি.) ‘আত-তাওহিদ’-এ বলেন, ‘একদল লোক (কাররামিয়্যাহ) দাবি করেছে—ঈমান কেবল মুখের স্বীকৃতি; অন্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু আমরা বলি, ঈমানের মূল পাত্র হলো অন্তর। ... অন্তরে ঈমান থাকা অবস্থায় মুখের কুফরকে আল্লাহ কুফর বলেননি। বোঝা গেল, ঈমানের মূল জায়গা অন্তর। ...কেউ বলতে পারে—হাদিসে যে শাহাদাহ দেওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার কথা বলা হয়েছে, সেটার ব্যাখ্যা কী? আসলে এর মাধ্যমে এটা বোঝায় না যে, শাহাদাহটাই ঈমান কিংবা ঈমান অন্তরের বিষয় নয়; বরং এটা (শাহাদাহ তথা বাহ্যিক স্বীকৃতি) ঈমানের নির্দেশক ও পরিচায়ক। ফলে পার্থিব বিধিবিধানের ক্ষেত্রে আমাদের এটা গ্রহণ করা ছাড়া উপায় নেই। পৃথিবীর সব কাজেই এমন করতে হয়—বাহ্যিক অবস্থা দেখে ফয়সালা করতে হয়। ভিতরের বাস্তবতা সেটার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এমনটা জরুরি নয়...।’ ইমাম মাতুরিদি তাঁর তাফসিরের বিভিন্ন জায়গাতেও কাছাকাছি, বরং আরও স্পষ্ট মত ব্যক্ত করেছেন। যেমন—তিনি সূরা মায়িদার ৪১ নং আয়াতের তাফসিরে লিখেন, ‘এর দ্বারা বোঝা যায়, মুখের স্বীকৃতি ঈমানের শর্ত নয়; বরং ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। মুখ দ্বারা স্রেফ অন্তরের সত্যায়নটা প্রকাশ করা হয়।’ তিনি অন্যত্র লিখেন, ‘ঈমান স্রেফ সত্যায়ন; অন্যকিছু নয়।’ মাইমুন নাসাফি (৫০৮ হি.) বলেন, ‘আবু মনসুর আল-মাতুরিদির কাছে ঈমান হচ্ছে স্রেফ সত্যায়ন (الإيمان مجرد التصديق)।’ তাঁর অনুসরণে আবু সালামাহ সমরকন্দিও লিখেন, ‘ঈমান হলো সত্যায়ন।’

নাসাফি বলেন, ‘ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। এটাই আবু মনসুর মাতুরিদির মত। আবু হানিফা থেকেও এটা বর্ণিত।’ নাসাফি তাঁর ‘আত-তামহিদ’-এ লিখেন, ‘ঈমানের শাব্দিক অর্থ সত্যায়ন করা। এই শাব্দিক অর্থ তথা অন্তরের সত্যায়নই ঈমানের হাকিকত। এটুকুই বান্দার উপর ওয়াজিব। সুতরাং কেউ যখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যা-কিছু নিয়ে এসেছেন সেগুলোকে সত্যায়ন করে, তবে আল্লাহর কাছে সে মুমিন গণ্য হবে। তবে মুখের স্বীকৃতি হচ্ছে মানুষকে জানানোর জন্য, (ব্যক্তির উপর) ইসলামের বিধিবিধান প্রয়োগের জন্য।’ জামালুদ্দিন আহমদ গযনবিও একই কথা লিখেছেন।

নুরুদ্দিন সাবুনি (৫৮০ হি.) লিখেন, ‘আমাদের মুহাক্কিকদের মাযহাব হলো, ঈমান স্রেফ অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি দুনিয়ার বিধিবিধানের জন্য। ফলে কেউ অন্তরে সত্যায়নের পরে মুখে স্বীকৃতি না দিলেও আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে। ...এটা ইমাম আবু হানিফা এবং আবু মনসুর মাতুরিদির বক্তব্য। ফলে মূল ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি কিংবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ, যেহেতু অন্তরের সত্যায়ন বাইরের কারও জানার সুযোগ নেই, তাই এর আলামতস্বরূপ কাজ করবে মুখের স্বীকৃতি। দুনিয়ার বিধিবিধান সে আলোকে নির্ধারিত হবে।’

মাহমুদ ইবনে যায়েদ লামিশি (৫২২ হি.) লিখেন, ‘অধিকাংশ আহলে সুন্নাতের কাছে ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি এবং অন্তরের সত্যায়ন দুটোর সমন্বয়। ফলে একদিকে অন্তরের সত্যায়ন করতে হবে, অন্যদিকে ঈমানের বিধান প্রয়োগের জন্য মুখে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিপরীতে আবু হানিফা রহ. থেকে বর্ণিত আছে, ঈমান কেবল অন্তরের সত্যায়ন। মুখের স্বীকৃতি রুকন নয়, বরং ঈমানের নির্দেশক। এটা আবুল হাসান আশআরি এবং আবু মনসুর মাতুরিদিসহ একদল মুতাকাল্লিমের বক্তব্য।’

আবু বারাকাত নাসাফি (৭১০ হি.) ‘আল-ইতিমাদ’-এ লিখেন, ‘ঈমান হচ্ছে তাসদিক তথা অন্তরের সত্যায়ন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসুল (ﷺ) যা-কিছু তাঁর পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন সেগুলোকে সত্যায়ন করবে, আল্লাহর কাছে সে মুমিন গণ্য হবে। মুখের স্বীকৃতি ইসলামের বিধিবিধান প্রয়োগের জন্য। এটাই ইমাম আবু হানিফার মত। এটাকেই গ্রহণ করেছেন শায়খ আবু মনসুর আল-মাতুরিদি এবং আশআরির বিশুদ্ধ মতও এটাই।’

আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (৮৫৫ হি.) বলেন, ‘মুখের স্বীকৃতি ঈমানের রুকন নাকি স্রেফ দুনিয়ার বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত, এটা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কারও কারও মতে এটা শর্ত। ফলে যদি কেউ আল্লাহ ও রাসুলকে অন্তরে স্বীকার করে, তবে সে আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে, মুখে স্বীকৃতি না দিলেও চলবে। নাসাফি থেকে বর্ণিত, এটাই ইমাম আবু হানিফা, আশআরি ও মাতুরিদির মত। বিপরীতে কারও কারও মত হলো, মুখের স্বীকৃতি রুকন। হ্যাঁ, অন্তরের সত্যায়নের মতো মূল রুকন নয়, বরং অতিরিক্ত রুকন। এ কারণে বাধ্যবাধকতা বা অক্ষমতার সময় এক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। ফখরুল ইসলাম বাযদাবি বলেন, ফকিহদের কাছে এটা (অতিরিক্ত) রুকন। আর মুতাকাল্লিমিনের কাছে এটা দুনিয়ার বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত।’

টিকাঃ
২৪১. আত-তাওহিদ, মাতুরিদি (২৬৮-২৭০)।
২৪২. তাফসিরে মাতুরিদি (তাবিলাতু আহলিস সুন্নাহ) (৩/৫২০)।
২৪৩. তাফসিরে মাতুরিদি (৪/৫৩৩)।
২৪৪. দেখুন: বাহরুল কালাম, নাসাফি (১৫১-১৫২)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/১৫৪)।
২৪৫. দেখুন: জুমাল মিন উসুলিদ্দিন (১৪-১৫)।
২৪৬. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৭৭)।
২৪৭. আত-তামহিদ ফি উসুলিদ্দিন (১৪৬-১৪৭)।
২৪৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন, গযনবি (২৫২)।
২৪৯. দেখুন: আল-কিফায়াহ, সাবুনি (৩৫৩-৩৫৪)। আল-বিদায়াহ মিনাল কিফায়াহ (১৫২)
২৫০. দেখুন : আত-তামহিদ, লামিশি (১২৬-১২৭)।
২৫১. আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (৩৭০)।
২৫২. উমদাতুল কারি, আইনি (১/১০৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ইমাম আজমের মাযহাব নির্ধারণ

📄 ইমাম আজমের মাযহাব নির্ধারণ


ইমাম আজমের মাযহাব নির্ধারণ: কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। অর্থাৎ, ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্য দ্বারা—তিনি মুখের স্বীকৃতিকে ঈমানের রুকন মনে করতেন না, স্রেফ বাহ্যিক বিধিবিধান প্রয়োগের শর্ত বলতেন—সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায় না। কারণ, তিনি ঈমানের পরিচয়দানে সর্বত্রই মুখের স্বীকৃতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। স্রেফ ‘তাসদিক’ তথা সত্যায়নকে তিনি কোথাও ঈমান বলেননি।

আল-ফিকহুল আকবারের শুরুতেই ইমাম বলেন, ‘তাওহিদ ও আকিদার মূল বিষয় হলো মুখে স্বীকৃতি দেওয়া যে (يجب أن يقول), আমি ঈমান আনলাম আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণের উপর, তাঁর কিতাবসমূহের উপর, তাঁর রাসুলগণের উপর, মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর, আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তাকদিরের ভালোমন্দের উপর, পরকালের হিসাব-নিকাশ, মিযান (আমলের দাঁড়িপাল্লা) এবং জান্নাত-জাহান্নামের উপর। আমি বিশ্বাস করি এগুলো সব সত্য।’ এখানে ইমাম ঈমানকে মুখে স্বীকৃতি দিতে বলেছেন, ‘স্রেফ অন্তরে বিশ্বাস করবে’ এমন বলেননি। আল-ফিকহুল আকবারের অন্যত্র আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘ঈমান হলো স্বীকৃতি ও সত্যায়ন (الإقرار والتصديق)।’

সায়েদ নিশাপুরি ওয়াকি ইবনুল জাররাহ থেকে বর্ণনা করেন, আবু হানিফা রহ. বলেছেন, কেবল জানাশোনার (মারিফাত) মাধ্যমে কেউ মুমিন হতে পারবে না, বরং (হৃদয়ের) জানার পাশাপাশি মুখেও স্বীকৃতি দিতে হবে। যখন জানার পাশাপাশি মুখে স্বীকৃতি দেবে, তখনই মুমিন হবে (لا يكون مؤمنا بالمعرفة، حتى يعرف ويقر بلسانه، فإذا عرف وأقر بلسانه فهو مؤمن)।

আল-ফিকহুল আবসাতে আবু মুতি বলখি ঈমান সম্পর্কে জানতে চাইলে ইমাম আজম বলেন, ‘ঈমান হলো—আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই—এ মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া। আর আল্লাহর ফেরেশতা, তাঁর নাযিলকৃত কিতাব, তাঁর প্রেরিত রাসুল, তাঁর জান্নাত, জাহান্নাম, কিয়ামত এবং তাকদিরের ভালোমন্দে সাক্ষ্য দেওয়া। আরও সাক্ষ্য দেওয়া যে, পৃথিবীর কাউকে তার নিজের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি; বরং আল্লাহ তাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন প্রত্যেককে সেদিকেই যেতে হবে। প্রত্যেকে তাকদিরের অধীন।’

একইভাবে ইমাম নিজস্ব রেওয়ায়াতে হাদিসে জিবরিল বর্ণনা করেন। সেখানে জিবরিলের প্রশ্নের উত্তরে রাসুলুল্লাহ (স) বলেন ঈমান হচ্ছে, ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল—এই মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া।’ আর সাক্ষ্য হচ্ছে মুখের স্বীকৃতি। আবু মুতি তা-ই বুঝেছেন। ফলে তিনি ইমামকে বলেন, যদি এগুলো বিশ্বাস করে এবং স্বীকৃতি দেয়, তবে সে মুমিন? ইমাম বলেন, ‘হ্যাঁ। কারণ, যখন এগুলোর স্বীকৃতি দিলো, তখন সে সামগ্রিক ইসলামের স্বীকৃতি দিলো। তাই সে মুমিন (فإذا استيقن بهذا وأقر به فهو مؤمن؟ قال نعم، إذا أقر بهذا فقد أقر بجملة الإسلام وهو مؤمن)।’

আবু মুতি তাকে আরও জিজ্ঞাসা করেন, যদি কেউ শিরকের ভূখণ্ডে বসে ইসলামের সামগ্রিক বিষয়কে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু ফরয বিধিবিধান ও শরিয়ত সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান না থাকে, আল্লাহর কিতাব ও শরিয়তের কোনো-কিছুতে স্বীকৃতি না থাকে, তবে আল্লাহকে স্বীকার করে, তাঁর প্রতি ঈমানকে স্বীকার করে এবং এই অবস্থায় মারা যায়, সে কি মুমিন? ইমাম বললেন, ‘হ্যাঁ। যদি শরিয়ত সম্পর্কে কোনো জ্ঞান না থাকে এবং কোনো আমল না থাকে, কিন্তু ঈমানের স্বীকৃতি থাকে, তবে সে মুমিন।’ এখানে প্রত্যেকটি জায়গাতে ‘মুখের স্বীকৃতি’ (الإقرار) বলা হয়েছে। স্রেফ অন্তরের সত্যায়ন (التصديق) শব্দটা উল্লেখ করাই হয়নি। ফলে ইমাম ঈমান বলতে কেবল অন্তরের সত্যায়নকে বুঝতেন, মুখের স্বীকৃতিকে অতিরিক্ত শর্ত বলতেন—এটা দলিলবিহীন বক্তব্য। শিরকের ভূখণ্ডে তার উপর কে ইসলামের আইন প্রয়োগ করবে? তবুও সেখানে ইমাম ‘স্বীকৃতি’র কথা বলেছেন। বোঝা গেল, এটা কেবল বাহ্যিক বিধান প্রয়োগের শর্ত নয়, বরং ঈমানের মৌলিক অঙ্গ (রুকন)।

ইমাম আজম তাঁর জীবনের সর্বশেষ মুহূর্তে কৃত ওসিয়তও শুরু করেছেন ঈমানের পরিচয় দিয়ে। সেখানেও একই কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘ঈমান হলো (الإيمان هو إقرار باللسان وتصديق بالجنان)।’ এখানে দেখুন, ইমাম মুখের স্বীকৃতিকে সত্যায়নের আগে নিয়ে এসেছেন। বরং আল-ওয়াসিয়‍্যাহতে ইমাম আজম ঈমানের প্রত্যেকটি বিষয় আলোচনার আগে ‘আমরা স্বীকৃতি দিই’ (نقر) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ফলে এটা ঈমানের হাকিকত নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর মাযহাব বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যদি মুখের স্বীকৃতিকে তিনি ঈমানের রুকন মনে না করতেন, তবে ‘আমরা সত্যায়ন করি’ (نصدق) কিংবা ‘বিশ্বাস করি’ (نؤمن) এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করলেই পারতেন। এর পরেও যেসব আলেম ঈমান স্রেফ সত্যায়নের প্রবক্তা, তারা এগুলোকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন।

টিকাঃ
২৫৩. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
২৫৪. প্রাগুক্ত (৬)।
২৫৫. আল-ইতিকাদ (১০২-১০৩)।
২৫৬. আল-ফিকহুল আবসাত (৪২)।
২৫৭. প্রাগুক্ত (৪০-৪১)।
২৫৮. আল-ফিকহুল আবসাত (৪১)।
২৫৯. দেখুন : আল-ফিকহুল আবসাত (৪২)।
২৬০. আল-ওয়াসিয়্যাহ (২৭)।
২৬১. দেখুন: শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, বাবিরতি (৫১-৫৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00