📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 খারেজি ও মুতাযিলাদের বিচ্যুতি

📄 খারেজি ও মুতাযিলাদের বিচ্যুতি


ঈমানের সংজ্ঞার্থের ক্ষেত্রে খারেজি ও মুতাযিলাদের মত সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাতের মাযহাবের মতোই। মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল তিনের সমন্বয়। কিন্তু আহলে সুন্নাত ও তাদের মাঝে পার্থক্য হলো, তারা সবগুলো বিষয়কে একটি একক মনে করে। ফলে সামান্য নষ্ট হলে পুরোটা নষ্ট গণ্য করে। এ কারণেই তাদের কাছে ঈমানের আরেকটি শর্ত হলো : সকল প্রকারের কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা। কারণ, কবিরা গুনাহ করার অর্থ হলো আমলের ক্ষেত্রে বিচ্যুতি আসা। আর আমল যেহেতু ঈমানের অঙ্গ এবং ঈমান যেহেতু তাদের কাছে একটি একক, ফলে তাদের মতে কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি কাফের। এই ভ্রান্ত মতবাদের উপর ভিত্তি করেই তারা আলি ও মুআবিয়াসহ (রাযি.) অসংখ্য সাহাবিকে কাফের বলেছে, হত্যা করেছে! যুগে যুগে তাদের অনুসারীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছে। অন্যায়ভাবে তাদের রক্তপাত করেছে, আজও করছে। খারেজিদের বিপরীতে মুতাযিলারা কবিরা গুনাহকারীকে কাফের না বললেও ইহকালের ব্যাপারে ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি রাখে। মুমিন হিসেবে স্বীকার করে না। পরকালের ব্যাপারে খারেজিদের মতোই চিরস্থায়ী জাহান্নামি বলে।

তাদের বক্তব্যের দলিল হিসেবে তারা বলে—আল্লাহর বাণী: ‘আর যারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যা হত্যা করতে নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যে এইগুলি করে, সে শাস্তির মুখোমুখি হবে। কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে।’ [ফুরকান : ৬৮-৬৯] তাদের মতে, এখানে শিরকের ফলাফল যেমন চিরস্থায়ী জাহান্নাম বলা হয়েছে, কবিরা গুনাহের ফলও চিরস্থায়ী জাহান্নাম বলা হয়েছে। সুতরাং বোঝা গেল, কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ঈমানের অংশ। কবিরা গুনাহ ঈমান ভঙ্গকারী বিষয়।

এটা গলত বক্তব্য। কারণ, এখানে কবিরা গুনাহের শাস্তি চিরস্থায়ী নয়, বরং দীর্ঘ সময় বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআনের অন্য অনেক আয়াত এর সাক্ষী। বিস্তারিত আলোচনা ‘ঈমান ও কবিরা গুনাহ’ অধ্যায়ে আসবে।

টিকাঃ
২২৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৪৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আহলে সুন্নাতের মাযহাব

📄 আহলে সুন্নাতের মাযহাব


আহলে সুন্নাত ঈমান বলতে উপরের সবগুলো বিষয়ের সমষ্টি বোঝেন। ভ্রান্ত ফিরকাগুলো যেমন একেক প্রান্তিকতায় অবস্থান নিয়েছে, একেক ফিরকা একেকটা বিষয়কে ঈমান মনে করেছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত সবগুলো বিষয়ের সমন্বিত রূপকে ঈমান মনে করেন এবং এটাই সত্য। অর্থাৎ, ঈমানের উদাহরণ একটি প্রাসাদ, যা কয়েকটি স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো। ভ্রান্ত ফিরকাগুলো সবাই একেকটা স্তম্ভ ধরে সেটাকেই ঈমান মনে করেছে। পিছনে তাদের উল্লেখ করা কুরআনের আয়াতগুলোই সেটার প্রমাণ৷ প্রত্যেকেই কুরআনের আয়াত দিয়ে দলিল দিয়েছে। এর অর্থ হলো, প্রত্যেকে একটা অংশকে সম্পূর্ণ ঈমান মনে করেছে। মুরজিয়া ও জাহমিয়্যাহরা সেসব আয়াত দিয়ে দলিল দিয়েছে, যেগুলোতে ঈমানকে স্রেফ জানা কিংবা অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বিপরীতে কাররামিয়্যাহরা সেসব আয়াত উল্লেখ করেছে, যেগুলোতে ঈমানকে কেবল মুখের স্বীকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। খারেজি ও মুতাযিলারা সেসব আয়াত দিয়ে দলিল দিয়েছে, যেগুলোতে কবিরা গুনাহকে ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ এগুলোর প্রত্যেকটি ঈমানের অংশ, পূর্ণ ঈমান নয়। পূর্ণ ঈমান হলো এই সবগুলো আয়াতের সমষ্টি, সবগুলো স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকা অবকাঠামো।

তাদের ঈমানের সংজ্ঞার্থকে অন্ধের হাতি দেখার সঙ্গেও তুলনা করা যায়, যারা হাতির একেকটা অঙ্গকে সম্পূর্ণ হাতি মনে করছে। অথচ হাতি হলো সবগুলোর সমন্বয়। ফলে আহলে সুন্নাতের কাছে অন্তরের জানা, সত্যায়ন, গভীর বিশ্বাস ও ভরসা, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, রাসুলুল্লাহর (ﷺ) প্রতি মহব্বত, আল্লাহর ভয় ও আশা, মুখে ঈমানের স্বীকৃতি, আল্লাহর যিকির এবং রাসুলুল্লাহর (ﷺ) প্রতি দরুদ-সালাম, নামায-রোযা, তাওয়াক্কুল, ইখলাস, তাযকিয়া-ইহসান এই সবকিছু ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।

এটা হলো আহলে সুন্নাতের সামগ্রিক মাযহাব। তবে তাত্ত্বিকভাবে আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন মাযহাবের মাঝেও শাখাগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহের সঙ্গে ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. তথা হানাফি এবং আশআরিদের ঈমানের সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। আশআরিদের মতে, ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন। ইমাম আজমের মতে—যা সামনে আসবে—ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি এবং অন্তরের সত্যায়ন। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফের মতে, ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল সবগুলো।

বিভিন্ন ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিরোধের বিপরীতে এখানে আহলে সুন্নাতের মতপার্থক্যের ফারাক হচ্ছে: বিভ্রান্ত সম্প্রদায়গুলো ঈমানকে এই তিনটি বিষয়ের সমষ্টি না বলে একেক সম্প্রদায় একেকটা গ্রহণ করেছে। ফলে এক্ষেত্রে তারা মৌলিক বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে, এমন ধরনের বিভ্রান্তি যে ক্ষেত্রে ঈমান ও কুফরের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না। ফলে তাদের কারও সংজ্ঞা অনুযায়ী মুমিন, কাফের, মুশরিক ও মুনাফিক—সব সমান হয়ে যায়। আবার কারও সংজ্ঞা অনুযায়ী মুমিন কাফের হয়ে যায়। কিন্তু আহলে সুন্নাতের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য শাব্দিক ও তাত্ত্বিক; মৌলিক নয়। ফলে তাদের সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্য থাকলেও তাতে কাফের মুমিন হয় না কিংবা মুমিন কাফের হয় না।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আহলে সুন্নাতের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য

📄 আহলে সুন্নাতের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য


আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল—তিনটি বিষয়ের সমন্বয় বোঝেন। মালেক, শাফেয়ি, আওযায়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ প্রমুখের মতো ফকিহ ও মুহাদ্দিস এমনকি মুতাকাল্লিমিন এবং সুফিয়ায়ে কেরামের মধ্য থেকে হারেস মুহাসেবি, আবুল আব্বাস কালানেসি প্রমুখ এই মত রাখেন। তাদের মতে ঈমান অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল সবগুলো।

মুহাম্মাদ ইবনে নসর মারওয়াযি তাঁর ‘তাজিমু কাদরিস সালাত’ গ্রন্থে বড় বড় ইমাম থেকে উক্ত সংজ্ঞার্থ বর্ণনা করেছেন। আবদুর রাযযাক তাঁর ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে একই সংজ্ঞা সুফিয়ান সাওরি, মালেক ইবনে আনাস, আওযায়ি, ইবনে জুরাইজ, মা’মার ইবনে রাশেদসহ বিভিন্ন ফকিহ ও মুহাদ্দিস থেকে বর্ণনা করেছেন। লালাকায়ি তাঁর ‘শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ’ গ্রন্থে এ বক্তব্য শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ, আবু উবাইদ (কাসেম ইবনে সাল্লাম)-সহ অন্যান্য ইমাম থেকে বর্ণনা করেছেন। হাকেম ‘মানাকিবে শাফেয়ি’ গ্রন্থে রবি ইবনে সুলাইমান সূত্রে বর্ণনা করেছেন; শাফেয়ি বলেন, ‘ঈমান হলো স্বীকৃতি ও আমল। বাড়ে ও কমে।’

যেমনটা বলা হয়েছে, কেবল ফুকাহা ও মুহাদ্দিসিন নন, বরং সালাফের যুগের তাসাওউফের শায়খগণও ঈমানের সংজ্ঞার্থের ক্ষেত্রে জমহুরের মত রাখতেন। ফুযাইল ইবনে ইয়াযকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে ঈমান হলো: মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের গ্রহণ (কবুল) এবং আমল।’

কিন্তু ইমাম আজম এটাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম থেকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। তিনি আমল তথা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলকে (প্রথমত) ঈমানের সংজ্ঞার্থের বাইরে রাখেন। আল-ওয়াসিয়্যাহতে ইমাম আজম রহ. ঈমানকে তিনটি বিষয়ের সমষ্টি বলেছেন। তাঁর মতে ঈমান হলো, মুখের স্বীকারোক্তি (ইকরার), অন্তরের সত্যায়ন (তাসদিক) এবং হৃদয়ের জানা (মারিফাত)। মারিফাত দ্বারা এখানে স্রেফ জানা উদ্দেশ্য নয়, বরং এর দ্বারা তাসদিক (অন্তরের সত্যায়ন) উদ্দেশ্য। ফলে ইমামের কাছে ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন এবং মুখের স্বীকৃতি। এ জন্য ইমাম তহাবি রহ. ঈমানের সংজ্ঞার্থে লিখেছেন, ‘ঈমান হলো : মুখে স্বীকার করা, অন্তরে সত্যায়ন করা।’

দেখা গেল, ঈমানের হাকিকত নির্ধারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাত এবং ইমাম আজমের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে; কিন্তু এই পার্থক্য তাত্ত্বিক। অর্থাৎ, যদিও সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে ইমাম আজম রহ. ঈমান থেকে আমলকে আলাদা করেন, কিন্তু প্রায়োগিকভাবে তিনি ঈমানকে বিশ্বাস ও কাজ সবগুলোর সমন্বিত রূপ মনে করেন।

আবু মুকাতিল সমরকন্দি ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থে ইমাম থেকে বর্ণনা করেন, ঈমান হলো, ‘সত্যায়ন করা (তাসদিক), জানা (মারিফাত), ইয়াকিন রাখা, স্বীকৃতি দেওয়া (ইকরার) এবং আত্মসমর্পণ করা (ইসলাম)।’ খেয়াল করে দেখুন, এখানে ইমাম ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল-সবগুলোকে বোঝেন। কারণ, তিনি ঈমানের অর্থের মাঝে ‘ইসলাম’-কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর ইসলাম হলো বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল। যেমন- নামায, রোযা ইত্যাদি। ফলে তাত্ত্বিকভাবে তিনি আমলকে আলাদা করলেও প্রায়োগিকভাবে ঈমান বলতে অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল-সবগুলোকেই বোঝেন। এতে তাঁর বক্তব্যের মাঝে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের বক্তব্যের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকল না। ইমাম আজম বলেন, “aunque এগুলোর নাম ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু মূলকথা এক (أسماء مختلفة ومعناها واحد), আর তা হলো ঈমান। মানুষকে যেমন ‘রাজুল’ (ব্যক্তি), ‘ইনসান’ (মানুষ), ‘ফুলান’ (জনৈক) বিভিন্ন নামে বোঝানো যায়, ঈমানকেও বিভিন্ন নামে বোঝানো হয়।”

ইমাম আজম ঈমান ও ইসলাম (তথা আমল)-এর সম্পর্ক স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইসলাম ছাড়া ঈমান হয় না, আবার ঈমান ছাড়া ইসলাম পাওয়া যায় না। উভয়ে পিঠ ও পেটের মতো।’ নিশাপুরির বর্ণনায় এ ব্যাপারে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি স্পষ্ট হয়। তিনি লিখেন, হাম্মাদ ইবনে যায়দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হানিফা রহ.-এর সঙ্গে মসজিদুল হারামে ছিলাম। তখন একব্যক্তি এসে তাকে ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন, ‘দুটো এক’। ফলে কার্যত জমহুর আহলে সুন্নাত এবং ইমাম আজমের মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই। ‘ঈমান’ ও ‘ইসলাম’, ‘ঈমান’ ও ‘আমল’-এর সম্পর্ক নিয়ে সামনে আরও বিস্তারিত আলোচনা আসবে, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
২২৯. দেখুন: তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৭৫)। শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, মুফতি যাদাহ (৩৩)।
২৩০. দেখুন: ফাতহুল বারি (১/৪৬-৪৭)।
২৩১. আস-সুন্নাহ, আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ (২৭৫)।
২৩২, আল-ওয়াসিয়্যাহ, আবু হানিফা (২৭)।
২৩৩. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২১)।
২৩৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৩)।
২৩৫. প্রাগুক্ত (১৪)।
২৩৬. আল-ফিকহুল আকবার (৬)।
২৩৭. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১০৪)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ঈমানের জন্য কি মুখের স্বীকৃতি (ইকরার) জরুরি?

📄 ঈমানের জন্য কি মুখের স্বীকৃতি (ইকরার) জরুরি?


ইমাম আজম রহ.-এর কাছে ঈমান অন্তরের সত্যায়ন, মুখের স্বীকৃতিসহ একাধিক অনুষঙ্গ নিয়ে গঠিত হলেও মূল ‘ঈমান হৃদয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে কোনো ব্যক্তি যদি মুখে ঈমান আনে, কিন্তু হৃদয়ে ঈমান না আনে, তবে সে আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে না। বিপরীতে যে ব্যক্তি হৃদয়ে বিশ্বাস করে, কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ না করে, আল্লাহর কাছে সে মুমিন গণ্য হবে।’ ইমাম আরও বলেন, ‘ঈমানের মূল জায়গা অন্তর। এর শাখা-প্রশাখা শরীরে বিস্তৃত।’

এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি-এক. আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়া, দুই. মানুষের কাছে গৃহীত হওয়া। ইমাম আজম রহ. মনে করেন, আল্লাহর কাছে ঈমানকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য মূলত অন্তরের সত্যায়নই যথেষ্ট। কারণ, তিনি অন্তর্যামী। ফলে কেউ যদি অন্তরে অন্তরে তাঁর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে সে তাঁর কাছে মুমিন গণ্য হবে। মুখে প্রকাশ করা কিংবা সর্বত্র জানান দেওয়া শর্ত নয়। কিন্তু আমরা মানুষ তো সেটা জানতে পারব না। কারণ, আমাদের কারও হৃদয়ের ভিতরের কথা জানার সুযোগ নেই। তাই আমরা কেবল বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে ফয়সালা করব-মুখে স্বীকৃতি দিলে তাকে মুমিন গণ্য করব; মুখে স্বীকৃতি না দিলে মুমিন গণ্য করব না।

ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা মুমিন ও কাফের সাব্যস্ত করেন অন্তরের অবস্থার ভিত্তিতে। কারণ, তিনি অন্তর্যামী। কিন্তু আমরা মানুষেরা মানুষকে মুমিন ও কাফের সাব্যস্ত করব বাহ্যিক স্বীকারোক্তি, মিথ্যাচার, পোশাক-আশাক ও ইবাদত দেখে। উদাহরণস্বরূপ আমরা যদি অপরিচিত কোনো এলাকায় গিয়ে একদল মানুষকে মসজিদে কিবলামুখী হয়ে নামায আদায় করতে দেখি, তবে আমরা তাদের মুসলিম বলব; অথচ হতে পারে তারা ইহুদি বা খ্রিষ্টান! কিন্তু এ কারণ আল্লাহ আমাদের পাকড়াও করবেন না। কারণ, মানুষের অন্তরের খবর রাখা আমাদের দায়িত্ব নয়। আমাদের কেবল বাহ্যিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে কাউকে মুমিন কিংবা কাফের বলা, ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তরের খবর রাখবেন আল্লাহ তায়ালা।’

টিকাঃ
২৩৮. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১০)।
২৩৯. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৭)।
২৪০. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00