📄 ঈমানের হাকিকত (ঈমান কীভাবে সংঘটিত হয়?)
পিছনে যেমনটা বলেছি, ঈমান অর্থ হলো বিশ্বাস ও সত্যায়ন। তবে ঈমানের হাকিকত কী কিংবা এটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সেটা নিয়ে রয়েছে বড় মাপের বিভিন্নতা এবং দীর্ঘ বিতর্ক। বড় বিতর্ক রয়েছে আহলে সুন্নাত ও আহলে বিদআতের মাঝে। কিছু ভিন্নতা রয়েছে আহলে সুন্নাতের নানান ধারার মাঝে। আরেকটা বিতর্ক রয়েছে খোদ ইমাম আজম এবং পরবর্তী হানাফি উলামায়ে কেরামের মাঝে। ধারাবাহিকভাবে সবগুলো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।
📄 জাহমিয়্যাহ ও মুরজিয়াদের মতে ঈমান স্রেফ জানা
ভ্রান্ত জাহমিয়্যাদের মতে ঈমান হলো—আল্লাহ তায়ালা, রাসুল এবং তিনি আল্লাহর কাছ থেকে যা-কিছু নিয়ে এসেছেন সেগুলো স্রেফ জানা। জানার বাইরে মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন ও আত্মসমর্পণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, ভয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল—এগুলোর কোনোকিছুই ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের কাছে কুফর হলো স্রেফ আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতা! ফলে কোনো ব্যক্তির যদি জানা থাকে যে, আল্লাহ বলতে একজন আছেন, এরপর মুখে তাকে অস্বীকার করে, তবুও সে কাফের নয়! চরমপন্থি মুরজিয়াদের (যেমন আবুল হুসাইন সালেহির) মতে, ঈমান হলো স্রেফ আল্লাহকে জানা, আর কুফর হলো তাকে না জানা। ফলে কেউ যদি তিন খোদায় বিশ্বাস করে, তবুও কাফের হবে না। তবে এটুকু যে, কাফের ছাড়া আর কেউ এটা বলে না। তাদের মতে, আল্লাহকে জানাই যথেষ্ট। এটাই তাঁকে ভালোবাসা, তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ করা। তাদের মতে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনাই ইবাদত। ফলে নামায কোনো ইবাদত নয়।
জাহমিয়্যাহ ও মুরজিয়াদের উক্ত মূলনীতি অনুযায়ী জগতে কাফের খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ, এ মূলনীতি অনুযায়ী ইবলিস, ফিরাউন, আবু জাহল, আবু লাহাব—সবাই মুমিন হয়ে যায়। জগতের সকল ধর্মে বিশ্বাসী লোকজন কোনো-না-কোনোরূপে আল্লাহ অথবা একজন স্রষ্টার কথা জানে। ফলে সবাই মুমিন হয়ে পড়ে! এগুলো কুফরি কথা। ইমাম আজম রহ. তাদের খণ্ডনে বলেন, ‘কেবল অন্তরের জানার নামই ঈমান নয়। এমন হলে আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা সবাই মুমিন হিসেবে গণ্য হতো। কারণ, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন, ‘আমি যাদের কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে যেমন চেনে নিজেদের সন্তানকে।’ [বাকারা: ১৪৬] অথচ তবুও তারা মুমিন নয়। কারণ, তারা জানলেও স্বীকৃতি দেয় না।’ একইভাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা অন্যায় ও অহংকার করে নিদর্শনাবলি প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে জেনেছিল।’ [নামল: ১৪] জানা সত্ত্বেও তারা মুমিন নয়। কারণ, ঈমান স্রেফ জানা নয়, বরং গভীর বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ।
টিকাঃ
২২৪. দেখুন : মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, আশআরি (১/১১৪-১১৫)।
২২৫. আল-ওয়াসিয়্যাহ, আবু হানিফা (২৮)।
📄 কাররামিয়্যাহদের মতে ঈমান স্রেফ মুখের স্বীকৃতি
কাররামিয়্যাহদের মত জাহমিয়্যাহ ও মুরজিয়াদের ঠিক বিপরীত। তাদের মতে, ঈমান হলো স্রেফ মুখের স্বীকৃতি। অন্তরের সত্যায়ন ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। আমলও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের দলিল হলো তায়ালার বাণী : ‘তোমরা বলো, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সেই বাণীর প্রতি যা আমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে আর যা ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাদের সন্তানদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা দেওয়া হয়েছিল মুসা ও ঈসাকে, যা অন্য নবিগণকে তাঁদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। আমরা নবিগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই অনুগত।’ [বাকারা : ১৩৬] আল্লাহর বাণী : ‘রাসুলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তারা যখন সেটা শোনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রুসিক্ত দেখতে পাবেন। এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলে : হে আমাদের প্রতি পালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব, আমাদেরও সাক্ষ্যদাতাদের তালিকাভুক্ত করে নিন।’ [মায়িদা : ৮৩] তাদের বক্তব্য হলো, এসব আয়াতে স্রেফ ‘বলা’ তথা মুখের স্বীকতিকেই ঈমান বলা হয়েছে। মুখের স্বীকৃতি ঈমান না হলে শুধু এটাকে ঈমান বলা হতো না।
এটা গলত ও জঘন্য আকিদা। কারণ, এর মাধ্যমে সকল মুনাফিকও মুমিন গণ্য হবে। পৃথিবীতে মুনাফিক বলতে কিছু থাকবে না। ইমাম আজম রহ. তাদের খণ্ডনে বলেন, “কেবল মুখের স্বীকৃতি ঈমান নয়। কারণ, এমন হলে মুনাফিকরাও সবাই মুমিন হিসেবে গণ্য হতো। অথচ তারা মুখে স্বীকৃতি দিলেও অন্তরে বিশ্বাস করে না। তাই তারা মুমিন নয়। বরং আল্লাহ তাদের মিথ্যুক অভিহিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী’।” [মুনাফিকুন : ১]
মুখের স্বীকৃতি থাকার পরও মুনাফিকদের আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকার ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘মুনাফিকরা থাকবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তাদের জন্য আপনি কখনো কোনো সহায় পাবেন না।’ [নিসা : ১৪৫] ফলে মুনাফিকরাও কাফের। তাদের কখনোই ক্ষমা না করার ঘোষণা করে বলেন, ‘আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন বা না করেন একই কথা৷ আপনি সত্তরবার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তাদের কখনোই ক্ষমা করবেন না। এ জন্য যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।’ [তাওবা : ৮০]
পাশাপাশি কুরআনের সেসব আয়াতও কাররামিয়্যাহদের ভ্রান্ত মাযহাবের খণ্ডন যেখানে অন্তরকে ঈমানের আধার বলা হয়েছে। যেমন-আল্লাহ তায়ালা ‘হে রাসুল, যারা কুফরির দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে, তারা যেন আপনাকে দুঃখ না দেয়। তারা সেসব লোক যারা মুখে বলে: ঈমান এনেছি। কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান আনেনি।’ [মায়িদা : ৪১] অন্যত্র বলেন, ‘বেদুইনরা বলে, ‘আমরা ঈমান আনলাম।’ বলুন! ‘তোমরা ঈমান আনোনি’, বরং তোমরা বলো, ‘আমরা (বাহ্যিকভাবে) আত্মসমর্পণ করেছি।’ কারণ, ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।” [হুজুরাত : ১৪] আরও এক স্থানে আল্লাহ বিশ্বাসহীন মুখের স্বীকৃতিকে ঈমান বলা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘কিছু লোক এমন আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান এনেছি, অথচ (প্রকৃতপক্ষে) তারা মুমিন নয়।’ [বাকারা : ৮] এখানে উল্লিখিত প্রত্যেকটি আয়াতে মুখের স্বীকৃতিকে অগ্রহণযোগ্য, অনির্ভরযোগ্য ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে। বোঝা গেল, স্রেফ মুখের স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়, বরং মুখের স্বীকৃতির সঙ্গে যদি অন্তরের বিশ্বাস ও বাস্তবতা না থাকে, তবে সে মুনাফিক গণ্য হবে।
টিকাঃ
২২৬. দেখুন: শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, মুফতি যাদাহ (৩২)। আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/১১৩)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০৭৬)।
২২৭. আল-ওয়াসিয়্যাহ, আবু হানিফা (২৭)।
📄 খারেজি ও মুতাযিলাদের বিচ্যুতি
ঈমানের সংজ্ঞার্থের ক্ষেত্রে খারেজি ও মুতাযিলাদের মত সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাতের মাযহাবের মতোই। মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়ন এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল তিনের সমন্বয়। কিন্তু আহলে সুন্নাত ও তাদের মাঝে পার্থক্য হলো, তারা সবগুলো বিষয়কে একটি একক মনে করে। ফলে সামান্য নষ্ট হলে পুরোটা নষ্ট গণ্য করে। এ কারণেই তাদের কাছে ঈমানের আরেকটি শর্ত হলো : সকল প্রকারের কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা। কারণ, কবিরা গুনাহ করার অর্থ হলো আমলের ক্ষেত্রে বিচ্যুতি আসা। আর আমল যেহেতু ঈমানের অঙ্গ এবং ঈমান যেহেতু তাদের কাছে একটি একক, ফলে তাদের মতে কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি কাফের। এই ভ্রান্ত মতবাদের উপর ভিত্তি করেই তারা আলি ও মুআবিয়াসহ (রাযি.) অসংখ্য সাহাবিকে কাফের বলেছে, হত্যা করেছে! যুগে যুগে তাদের অনুসারীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছে। অন্যায়ভাবে তাদের রক্তপাত করেছে, আজও করছে। খারেজিদের বিপরীতে মুতাযিলারা কবিরা গুনাহকারীকে কাফের না বললেও ইহকালের ব্যাপারে ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি রাখে। মুমিন হিসেবে স্বীকার করে না। পরকালের ব্যাপারে খারেজিদের মতোই চিরস্থায়ী জাহান্নামি বলে।
তাদের বক্তব্যের দলিল হিসেবে তারা বলে—আল্লাহর বাণী: ‘আর যারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যা হত্যা করতে নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যে এইগুলি করে, সে শাস্তির মুখোমুখি হবে। কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে।’ [ফুরকান : ৬৮-৬৯] তাদের মতে, এখানে শিরকের ফলাফল যেমন চিরস্থায়ী জাহান্নাম বলা হয়েছে, কবিরা গুনাহের ফলও চিরস্থায়ী জাহান্নাম বলা হয়েছে। সুতরাং বোঝা গেল, কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ঈমানের অংশ। কবিরা গুনাহ ঈমান ভঙ্গকারী বিষয়।
এটা গলত বক্তব্য। কারণ, এখানে কবিরা গুনাহের শাস্তি চিরস্থায়ী নয়, বরং দীর্ঘ সময় বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআনের অন্য অনেক আয়াত এর সাক্ষী। বিস্তারিত আলোচনা ‘ঈমান ও কবিরা গুনাহ’ অধ্যায়ে আসবে।
টিকাঃ
২২৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৪৮)।