📄 শেষ কথা
প্রশ্ন হলো, তাহলে কি এইসব আপত্তি আমরা সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দিচ্ছি? আমরা কি এসব গ্রন্থকে ভুলমুক্ত কিংবা সব ধরনের হস্তক্ষেপ থেকে নিষ্পাপ দাবি করছি? না। সে দাবি করার দুঃসাহস ও যৌক্তিকতা কোনোটাই নেই; বরং বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে মানবিক হস্তক্ষেপ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বীকৃত বিষয়। ‘আকিদাহ তহাবিয়্যাহ’ গ্রন্থ এত প্রসিদ্ধ এবং তুলনামূলক পরবর্তী সময়ে রচিত হওয়া সত্ত্বেও সেটা সম্পূর্ণ হস্তক্ষেপমুক্ত থাকেনি, যা আমরা আকিদাহ তহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যায় বিভিন্ন জায়গাতে দেখিয়েছি। কেবল তহাবি নয়, আশআরি, মাতুরিদি, আহমদ ইবনে হাম্বলসহ সালাফে সালেহিনের বিভিন্ন গ্রন্থে এ ধরনের পরিবর্তন-পরিবর্ধন কিংবা নিদেনপক্ষে নুসখার ভিন্নতা একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠিত বিষয়। ফলে আল-ফিকহুল আকবারসহ ইমামের গ্রন্থাবলিতে এ ধরনের হস্তক্ষেপ হতেই পারে এবং সেটা নিতান্তই স্বাভাবিক।
যেমন—আল-ফিকহুল আকবারে আল্লাহ তায়ালার সিফাতকে ‘যাতিয়্যাহ’ (সত্তাগত) ও ‘ফি’লিয়্যাহ’ (কর্মগত) বিভাজন করা। এ কথা বলা যায় যে, এমন বিভাজন সে যুগে ছিল না; বরং সালাফে সালেহিন সকল সিফাতের ব্যাপারে স্বাভাবিক কথা বলতেন। একইভাবে ইমাম আজম আল্লাহর কয়েকটি সিফাতের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, (أما الذاتية فالحياة وَالْقُدْرَةِ وَالْعلم وَالْكَلَাম والسمع وَالْبَصَر وَالْإِرَادَة) অর্থ : “তাঁর সত্তাগত গুণাবলি হচ্ছে, ‘হায়াত’ (জীবন), ‘কুদরত’ (শক্তি), ‘ইলম’ (জ্ঞান), ‘কালাম’ (কথা), ‘সাম্’ (শ্রবণ), ‘বাসার’ (দর্শন) এবং ‘ইরাদা’ (ইচ্ছা)।” এখানে সত্তাগত হিসেবে স্রেফ সাতটা সিফাত উল্লেখ করা হয়েছে; ‘ইত্যাদি’ (وغيره) বা এ ধরনের শব্দও ব্যবহার করা হয়নি। বোঝা গেল, এগুলো উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হয়নি, বরং সত্তাগত সিফাত স্রেফ সাতটা মেনেই সম্ভবত উল্লেখ করা হয়েছে। এবার ইমাম আজমের প্রায় দেড় শতাব্দ পরে লেখা আবুল হাসান আশআরির একটি বক্তব্য দেখুন : (وأجمعوا على إثبات حياة الله عز وجل لم يزل بها حياً، وعلماً لم يزل به عالماً، وقدرة لم يزل بها قادراً، وكلاماً لم يزل به متكلماً، وإرادة لم يزل بها مريداً، وسمعاً وبصراً لم يزل به سميعاً بصيراً) আল্লাহর জন্য যেসব সিফাত সাব্যস্ত করার ব্যাপারে একমত তা হলো : আল্লাহ সদা-সর্বদা ‘হায়াত’ (জীবন), ‘ইলম’ (জ্ঞান), ‘কুদরত’ (শক্তি), ‘কালাম’ (কথা), ‘ইরাদা’ (ইচ্ছা), ‘সাম্’ (শ্রবণ), ‘বাসার’ (দর্শন) গুণে গুণান্বিত। এখানেও সিফাত হিসেবে স্রেফ সাতটাকে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং ‘আল-ফিকহুল আকবারের অন্য এক জায়গায় এসেছে : (لم يزل عالما بِعِلْمِهِ وَالْعلم صفة في الأزل، وقাদرا بقدرته وَالْقُدْرَة صفة في الأزل، ومتكلما بِكَلَامِهِ وَالْكَلَام صفة فِي الْأَزَل...) এই বাক্য এবং আশআরির বাক্যের মাঝে কোনো সামঞ্জস্য দেখা যায়? দেখা গেলে সেটা কী পরিমাণ? বরং এসব বক্তব্যের মাঝে আন্তঃসম্পর্কের একটা বিপুল মাত্রা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এ কারণেই অনেকে এ বক্তব্য ইমাম আজমের হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, যদিও এ কারণে এগুলোকে ইমাম আজমের হওয়া চূড়ান্তভাবে নাকচও করা যায় না; বরং বিপরীতভাবে এগুলোকে ইমাম আজমের বক্তব্য ধরে পরবর্তী লোকদের মাযহাব ইমাম আজমের মাযহাব থেকে গৃহীত বলা গেলেও যেতে পারে।
একইভাবে আল-ফিকহুল আকবারে ইমাম আজম আল্লাহ তায়ালাকে ‘জাওহার’ ও ‘আরাজ’ থেকেও মুক্ত ঘোষণা করেছেন; তাঁর উপর এসব শব্দ প্রয়োগ নিষেধ করেছেন। তিনি লিখেন, “তিনি ‘শাইউন’ (বস্তু), কিন্তু অন্যান্য বস্তুর মতো নন। আর ‘শাইউন’-এর অর্থ হলো ‘জিসম’ (দেহ), ‘জাওহার’ (মৌল), ‘আরাজ’ (বাহ্যিক রূপ-রং)-বিহীন বিদ্যমান সত্তা। তাঁর কোনো ‘হদ’ (সীমা) নেই, প্রতিপক্ষ নেই, সমকক্ষ নেই; তাঁর মতো কিছু নেই।” আল্লাহর শানে ‘জাওহার’, ‘আরাজ’ ইত্যাদি বিতর্ক শুরু হয় আরও পরে; আব্বাসি যুগে যখন দর্শনের কিতাবগুলো আরবি হতে থাকে, তখন। ফলে ইমাম আজম এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ করবেন বলে মনে হয় না। তাই অসম্ভব নয় যে, এসব শব্দ পরবর্তীকালে সংযোজিত হয়েছে, যেমনটা শিবলি নুমানিসহ একদল সমকালীন গবেষক বলেছেন। তবে এটাও সুনিশ্চিত কিংবা চূড়ান্ত কথা নয়, বরং অনুমাননির্ভর। কারণ, অনুবাদের কাজগুলো আরও পরে শুরু হলেও মৌখিক প্রচার ও চর্চা ইমামের যুগেই শুরু হয়েছিল। বিশেষত আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে জাদ ও জাহমের এবং তাকদিরের ক্ষেত্রে মাবাদ ও গাইলানের এমন অনেক বক্তব্য রয়েছে, যেগুলো পরবর্তী সময়ে সেই ইমাম আহমদের যুগে মুতাযিলাদের মাঝে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। এর মানে কি সেগুলো সে সময়ের আগে ছিল না? না, কস্মিনকালেও এমন নয়। মোটকথা, ইমাম আজম রহ.-এর যুগে এসব শব্দের আত্মপ্রকাশ ঘটা অসম্ভব নয়। ফলে আল্লাহর উপর এসব শব্দ প্রয়োগে তিনি তখনই নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন। বিশেষত আকিদার পঞ্চপুস্তক ছাড়াও অন্যান্য গ্রন্থে ইমাম আজম কর্তৃক এসব শব্দের ব্যবহার নাকচের বর্ণনা রয়েছে, যা আমরা পিছনে উল্লেখ করেছি।
তর্কের খাতিরে এসব বিষয়কে যদি পরবর্তীকালে সংযোজিত ধরে নেওয়াও হয়, এ কারণে পুরো গ্রন্থকে অস্বীকার করা যাবে? নাহ্। এসব শব্দের সংযোজন-বিয়োজনের কারণে পুরো গ্রন্থ অস্বীকার করা ইনসাফ নয়, যেমনটা কেউ কেউ দাবি করেছেন; বরং আমরা ইমাম আশআরির ‘ইবানাহ’, তহাবির ‘আকিদাহ’ থেকে শুরু করে সব ঘরানার প্রাচীন গ্রন্থে কিছু-না-কিছু সংযোজন-বিয়োজনের অভিযোগ পাই, খোদ সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দের আলেমদের কিতাবেও সংযোজিত হয়েছে, অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে—এ ধরনের অভিযোগ শুনতে পাই। তাহলে কি আমরা তাদের সম্পূর্ণ গ্রন্থ অস্বীকার করি? না, সেটা করার সুযোগ নেই।
ফলে এসব সংযোজন-বিয়োজনের বক্তব্য মেনে নিলেও মৌলিকভাবে এগুলো ইমাম আজম রহ.-এর গ্রন্থ। এগুলোকে সমূলে তাঁর গ্রন্থ হিসেবে অস্বীকারের কোনো জ্ঞানগত কিংবা ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। হ্যাঁ, মতাদর্শগত ভিত্তি আছে। ফলে দুঃখজনকভাবে আমরা দেখি, কিছু ব্যতিক্রম বাদে ইমাম আজম রহ.-এর এসব গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানের সমালোচনা এবং সেগুলোকে ঘিরে সশংয় তৈরির মূল কারণ হলো মতাদর্শিক ক্ষুদ্র ও সীমিত দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব গ্রন্থের বিচার। অর্থাৎ, অধিকাংশ ব্যক্তি, যারা এসব গ্রন্থের বিভিন্ন অংশের উপর আপত্তি তুলেছেন, তারা বিভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও এক জায়গায় তাদের মাঝে ব্যাপক মিল-মিছিল চোখে পড়ে। সেটা হলো—প্রত্যেকে কেবল সেসব বিষয়ের উপরই আপত্তি করেছেন, কেবল সেগুলোকেই অনুপ্রবেশকৃত কিংবা পরবর্তীকালে সংযোজিত বলে মত প্রকাশ করেছেন, যেগুলো তাদের নিজেদের মতাদর্শিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিছু উদাহরণ আমরা পিছনে পেশ করেছি। ফলে এসব আপত্তির ভিত্তি ঐতিহাসিক কিংবা দালিলিক থাকেনি; বরং নিজেদের প্রচলিত বিশ্বাসের সঙ্গে সংঘর্ষই এসব আপত্তির একমাত্র ভিত্তি! অথচ এটা গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক কোনো ভিত্তি হতে পারে না। এটাকে গ্রহণযোগ্য আপত্তির দলিল মেনে নিলে প্রত্যেক সম্প্রদায় তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অংশটুকু প্রত্যাখ্যান করবে, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খণ্ডনীয় বক্তব্যগুলোকে গ্রহণ করবে। এতে করে একসময় পুরো গ্রন্থ কিংবা সিংহভাগ অংশই প্রত্যাখ্যাত হয়ে পড়বে। এসব গ্রন্থের অস্তিত্ব অর্থহীন হয়ে যাবে।
তাই প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ইমাম আজম রহ. প্রথম জীবনে যে একজন তুখোড় মুনাযির এবং ইসলামবিরোধী শক্তির কঠোর প্রতিবাদকারী ছিলেন এ ব্যাপারে তাঁর সকল জীবনীকার একমত। পরবর্তীকালে তিনি ‘তর্কশাস্ত্র’ পরিত্যাগ করে ফিকহ ও ইজতিহাদে নিমগ্ন হন। কিন্তু দ্বীনের পথে সংগ্রাম কখনোই পরিত্যাগ করেননি, করার সুযোগও ছিল না। কারণ, সর্বত্রই বিভিন্ন নতুন বিদআতের প্রাদুর্ভাব ঘটছিল। এ কারণে ফিকহ ও ইজতিহাদের পাশাপাশি তিনি বিশুদ্ধ আকিদার প্রচার এবং বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামও অব্যাহত রাখেন। আকিদা বিষয়ে অধিক গুরুত্বদানের ফলেই তিনি এটাকে সবচেয়ে বড় ফিকহ (আল-ফিকহুল আকবার) আখ্যা দেন। ঈমানের পরিচয় ও হাকিকত, কবিরা গুনাহকারীর বিধান, তাকদির-সম্পর্কিত বিভিন্ন সশংয়ের জবাব, কুরআনকেন্দ্রিক বিভ্রান্তি খণ্ডন, মানুষের স্বাধীনতা ও পরাধীনতা ইত্যাদি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান রাখেন। এগুলোই পরবর্তীকালে হয়তো তিনি অথবা তাঁর ছাত্ররা সংকলন করেন। ফলে উপরের পাঁচটি গ্রন্থ—সরাসরি তাঁর মাধ্যমে কিংবা তাঁর শাগরেদদের মাধ্যমে সংকলিত হোক—সামগ্রিকভাবে তাঁর আকিদারই প্রতিচ্ছবি। এসব গ্রন্থের বিষয়বস্তুও মৌলিকভাবে এক ও অভিন্ন। এতে যদি কিছু শব্দ বা ছত্র পরবর্তীকালে বাইরে থেকে সংযোজিত হয়, তাতেও সবগুলো গ্রন্থের সারবত্তা বিকৃত হয় না, ইমামের আকিদাগত তুরাসের মূল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
আমরা এ কারণেই সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ইমাম আজমের যেকোনো একটা গ্রন্থকে ব্যাখ্যা করতে যাইনি। একটা গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে আমাদের এই প্রকল্প দাঁড় করাইনি; বরং আমরা ইমাম আজম রহ.-এর পাঁচটি গ্রন্থকেই বেছে নিয়েছি। পাঁচটি গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে ইমাম আজম রহ.-এর আকিদার দুর্গ নির্মাণ করেছি। ফলে আমরা দেখব, পাঁচটি গ্রন্থ মূলত সাংঘর্ষিক নয়, বরং একে অন্যের পরিপূরক। একটার অপূর্ণ আলোচনা অন্যটা পূর্ণ করছে, একটার অস্পষ্টতা অন্যটা দূর করছে। মৌলিক কোনো অন্তর্বিরোধ থেকে এগুলো মুক্ত, যা এটার প্রমাণ যে, সামগ্রিকভাবে এসব গ্রন্থ এক ব্যক্তির আকিদার প্রতিনিধি, হোক তাঁর লেখা কিংবা তার পরের কোনো প্রতিনিধির লেখা। এ কারণে আমরা পাঁচটি গ্রন্থকেই সম্মিলিতভাবে এই গ্রন্থের ভিত্তিস্বরূপ গ্রহণ করেছি। প্রত্যেকটি মাসআলাতে একাধিক গ্রন্থে বর্ণিত ইমামের বক্তব্যগুলো একসঙ্গে তুলে ধরেছি। অতিরিক্ত ভিত্তি হিসেবে রেখেছি ইমাম তহাবির ‘আকিদাহ তহাবিয়্যাহ’-কে। ফলে এখানে ইমাম আজমের আকিদার যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, আমরা আশা করছি সেটা নিখুঁত হবে, ইমামের প্রতি এবং ইলমের প্রতি ইনসাফ হবে। এটাকে যৌক্তিকভাবে ও যথার্থরূপে ‘ইমাম আজমের আকিদা’ সংকলন বলা যাবে, ইনশাআল্লাহ।