📄 সংশয়ের পর্যালোচনা
এগুলো সঠিক ও যৌক্তিক অভিযোগ নয়। দলিল-প্রমাণবিহীন কেবল অনুমানকে ভিত্তি বানিয়ে ইমাম আজমের কিতাবকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টা। মূলত তাদের প্রচলিত মতাদর্শের সঙ্গে ইমামের আকিদার সংঘর্ষ তৈরি হওয়াতে এগুলোকে তারা অপ্রমাণিত ও পরবর্তীকালে সংযোজিত বলেছেন। অথচ শক্তিশালী দলিল ব্যতীত এমন দাবি গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ নেই।
যেমন-প্রথম বাক্যে তাদের আপত্তির জায়গা হলো, আল্লাহর কালাম সিফাতকে ‘আযাল’ তথা ‘অনাদি’ বলা। তারা বিশ্বাস করেন, মুসা আ.-এর সঙ্গে আল্লাহ অক্ষর ও আওয়াজ-সহ কথা বলেছেন, যা তাদের কাছে হাদেস (নবসৃষ্ট)। অথচ ইমাম বলছেন, “আল্লাহ যখন মুসার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তখন তাঁর সেই শাশ্বত ‘কালাম’ গুণের মাধ্যমে কথা বলেছিলেন।” এটা তাদের প্রচলিত আকিদার সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। একইভাবে ইমামের বক্তব্য ‘আল্লাহ কথা বলেন উপকরণ ও অক্ষর ছাড়া।’-তাদের আকিদার সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। ইমামের বক্তব্য ‘কুরআনে (পাঠের সময়) আমাদের শব্দগুলো সৃষ্ট। ’-এটাও তাদের প্রতিষ্ঠিত মতাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা, তারা এগুলোকেও আল্লাহর কালাম মনে করেন। সবশেষে ইমামের বক্তব্য ‘আখেরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে; মুমিনরা জান্নাতে স্বচক্ষে আল্লাহর দিদার লাভ করবে, তবে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য ও ধরন ব্যতিরেকে। তাঁর ও সৃষ্টির মাঝে তখন কোনো দূরত্ব থাকবে না।’- এটাও তারা নাকচ করেন। কারণ, তাদের বিশ্বাস, আল্লাহকে সামনাসামনি উপরের দিকে দেখা যাবে। ফলে ইমাম যখন ‘দূরত্ব’ নাকচ করে দিলেন, তখন তাদের আকিদার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি হয়ে গেল। কারণ, এর মাধ্যমে ‘দিক’, ‘সামনাসামনি’ সবকিছু নাকচ হয়ে গেল, যেগুলোকে তারা সালাফের আকিদা বলে প্রচার করেন এবং বিশ্বাস রাখেন।
ফলে দেখা যাচ্ছে, তাদের এসব আপত্তির মূল কারণ ইলমি বা ঐতিহাসিক নয়, বরং মতাদর্শিক। ইমাম আজমের এসব বক্তব্য তাদের প্রচলিত আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু ইমাম আজম রহ. যেহেতু সালাফে সালেহিনের আকিদা রাখতেন, বরং তিনি নিজেই সালাফে সালেহিনের প্রথম সারির বরেণ্য ইমাম, আর এসব আকিদা তাদের মতাদর্শমতে সালাফের আকিদা নয়; অন্যদিকে ইমাম আজমকে সালাফ থেকে বের করাও যাচ্ছে না, তাকে আহলে বিদআতও বলা যাচ্ছে না, এ জন্য তারা এগুলোকে পরবর্তীকালে সংযোজিত বলেছেন। অথচ এগুলো পরবর্তীকালে সংযোজিত নয়। বস্তুত এটা তাদের জন্য একটা বড় মাথাব্যথার কারণ। অন্যকথায়, ইমামকে নিয়ে এ ধারার লোকজন উভয়সংকটে পতিত। কারণ, তাদের ‘সালাফ’ মুরজিয়া, জাহমিসহ হেন কোনো অভিধা নেই যা ইমামের উপর প্রয়োগ করেননি। অন্যকথায়, তারা ইমামকে সম্পূর্ণ গোমরাহ মনে করতেন, পিছনে যার উদাহরণ দিয়েছি আমরা। এতে স্পষ্ট যে, ইমামের আকিদা তাদের আকিদার মতো ছিল না। কিন্তু তাদের মতাদর্শের পরবর্তী মূল প্রতিষ্ঠাতারা আবার ইমামের ব্যাপারে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। ইমাম আজমের আকিদা বাকি তিন ইমামের মতো বলেছেন। এই দুই বিপরীতমুখী বক্তব্যই তাদের জটিলতায় ফেলেছে। ইমামকে তারা গোমরাহ বলতে পারছেন না, আবার ইমামের সব আকিদা মেনেও নিতে পারছেন না। ফলে অনন্যোপায় হয়ে যেসব ক্ষেত্রে ইমামের আকিদা তাদের আকিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে না, সেগুলোকে ‘অপ্রমাণিত’ বলছেন, ভিন্নভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা করছেন। এই ‘অপ্রমাণিত’ বলা ভিত্তিহীন দাবি। এগুলো অপ্রমাণিত হলে তাদের সালাফ তো ইমামকে তাদের মতোই বলতেন। জাহমি কেন বলেছেন? মোটকথা, ইমামের প্রতি তারা কেমন দৃষ্টিভঙ্গি রাখবেন সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ইমামের আকিদার ভিতর থেকে কিছু আকিদাকে প্রমাণিত বলবেন, আবার কিছু নাকচ করবেন—এটা হতে পারে না।
আমাদের দাবির স্বপক্ষে অনেকগুলো প্রমাণ রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো :
এক. প্রথম প্রমাণ তো হলো সবগুলো পাণ্ডুলিপিতে এসব বক্তব্য বিদ্যমান রয়েছে। আমাদের জানামতে, এমন কোনো প্রাচীন পাণ্ডুলিপি নেই যাতে এসব বক্তব্য আসেনি। ফলে এগুলোকে পরবর্তীকালে সংযোজিত বলতে হলে সে ধরনের কোনো গ্রহণযোগ্য প্রাচীন পাণ্ডুলিপি দেখাতে হবে যাতে এসব বক্তব্য নেই।
দুই. এসব বক্তব্য আগপাছের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাযুজ্যপূর্ণ। অর্থাৎ, এমন নয় যে, হঠাৎ মাঝখানে অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে, ফলে এগুলো প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে; বরং প্রত্যেকটি বিষয় সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক এবং ইমামের বক্তব্য ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন—প্রথম বক্তব্যে ইমাম বলেন, (زند كَانَ الله تَعَالَى متكلما ولم يكن كلم مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَام وَقد كَانَ الله تَعَالَى خَالِقًا فِي الْأَزَلِ وَلم يخلق الخلق فَلَمَّا كلم الله مُوسَى كَلمه بِكَلَامِهِ الَّذِي هُوَ لَهُ صفة فِي الْأَزَّل) অর্থ : “আল্লাহ মুসার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। কিন্তু মুসার সঙ্গে কথা বলার অনেক আগে অনাদিতেও আল্লাহ তায়ালা ‘মুতাকাল্লিম’ (কালাম গুণসম্পন্ন) ছিলেন, যেমন গোটা সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করার আগেও আল্লাহ তায়ালা ‘খালিক’ (সৃষ্টিকর্তা) ছিলেন। সুতরাং তিনি যখন মুসার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তখন তাঁর সেই শাশ্বত ‘কালাম’ গুণের মাধ্যমে কথা বলেছিলেন।”-এখানে গভীরভাবে লক্ষ করে দেখুন, কেবল ‘কালাম’-এর ব্যাপারেই ‘আযাল’ (তথা অনাদি) ব্যবহার করা হয়নি, বরং ‘খলক’ তথা সৃষ্টি গুণের ব্যাপারেও একই শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। ইমাম তহাবি রহ. তাঁর আকিদাতে এটাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা একটু পরে উল্লেখ করা হচ্ছে। ফলে এটা ইমাম আজমের আকিদা হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
একইভাবে (وَاللهُ تَعَالَى يَتَكَلَّم بِلَا آلَةٍ وَلَا حُرُوف) অর্থ : ‘আল্লাহ কথা বলেন উপকরণ ও অক্ষর ছাড়া।’-এটাও প্রসঙ্গবিহীন নয়। ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার সকল সিফাত (গুণ) মাখলুকের সিফাতের (গুণ) চেয়ে ভিন্ন। তিনি জানেন, কিন্তু আমাদের জানার মতো নয়। তিনি শক্তি রাখেন, কিন্তু আমাদের শক্তির মতো নয়। তিনি দেখেন, তবে আমাদের দেখার মতো নয়। তিনি কথা বলেন, তবে আমাদের কথা বলার মতো নয়। তিনি শোনেন, তবে আমাদের শোনার মতো নয়। আমরা বিভিন্ন উপকরণ ও অক্ষরের মাধ্যমে কথা বলে থাকি; তিনি কথা বলেন উপকরণ ও অক্ষর ছাড়াই। অক্ষর হলো সৃষ্ট, কিন্তু আল্লাহর কালাম সৃষ্ট নয়।’ পাঠক, এখানে গভীরভাবে লক্ষ করে দেখুন, পুরো বক্তব্য প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক। আল্লাহর সকল সিফাত আমাদের সিফাতের চেয়ে ভিন্ন। তাঁর দেখা ও শোনা আমাদের মতো নয়। সুতরাং তাঁর বলাও আমাদের মতো নয়। আমরা উপকরণ ও অক্ষর দিয়ে কথা বলে থাকি: তিনি কথা বলেন এগুলো ছাড়াই। কারণ, তিনি কোনোকিছুর প্রতি মুখাপেক্ষী নন। যারা এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন, কেন করেছেন? কারণ, এটা তাদের আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো, আল্লাহ অক্ষর ও আওয়াজ-সহ কথা বলেন। তারা যেহেতু ইমাম আজমকে তাদের পরিভাষায় আহলে সুন্নাত মনে করেন, ফলে এগুলো তাঁর আকিদা সেটা নাকচ করা জরুরি হয়ে যায়, নতুবা তাদের নিজেদের আকিদাই নাকচ হয়ে যায়!
একইভাবে ইমামের বক্তব্য, ‘কুরআন (পাঠের সময়) আমাদের শব্দ সৃষ্ট।’— এটাও সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক এবং যৌক্তিক। এখানে ইমামের পুরো বাক্য হলো, ‘কুরআন আল্লাহ তায়ালার ‘কালাম’ (বাণী); গ্রন্থে লিপিবদ্ধ, হৃদয়ে সুরক্ষিত, মুখে পঠিত, নবিজি (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ। কুরআনে (পাঠের সময়) আমাদের শব্দগুলো সৃষ্ট। কুরআন (লেখার সময়) আমাদের লেখাগুলো সৃষ্ট। আমাদের (কুরআনের) পাঠ (তেলাওয়াত) সৃষ্ট; কিন্তু স্বয়ং কুরআন সৃষ্ট নয়।’ এখানে অতিরিক্ত এমন কী কথা আছে, যাতে এটা পরবর্তীকালে অনুপ্রবেশকৃত বলে বিশ্বাস করতে হবে? আমরা যখন কুরআন তেলাওয়াত করি, তখন আমাদের আওয়াজ সৃষ্ট। আমরা যখন কুরআন কাগজের উপর কালি দিয়ে লিখি, এই লেখাগুলোও সৃষ্ট। সুতরাং আমরা যখন আমাদের মুখ, জিহ্বা ও কণ্ঠের সাহায্যে কুরআন পড়ি, তখন আমাদের উচ্চারিত শব্দগুলো কেন সৃষ্ট হবে না? হ্যাঁ—যেমনটা ইমাম বলেছেন—এতে কুরআন সৃষ্ট হয়ে যায় না। কারণ, মূল কুরআন আল্লাহর কালাম।
তাদের কারও কারও যুক্তি ‘কুরআনে (পাঠের সময়) আমাদের শব্দ সৃষ্ট। ’- এসব পরিভাষা ইমাম আহমদ রহ.-এর যুগে মুতাযিলাদের সঙ্গে সৃষ্ট সংঘাতের পরে অস্তিত্বে এসেছে। ফলে বোঝা গেল, এটা ইমাম আজমের আকিদা নয়, বরং পরবর্তীকালে সংযোজিত। কিন্তু এটা অজ্ঞতাপ্রসূত বক্তব্য। কারণ, কুরআনকেন্দ্রিক বিতর্কের জন্ম হয় জাদ ইবনে দিরহাম এবং জাহম ইবনে সাফওয়ানের যুগেই। ফলে এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর বিশ্লেষিত ও বিস্তারিত বক্তব্য থাকা মোটেই অসম্ভব নয়; বরং ইমাম আজম রহ. জাহম ইবনে সাফওয়ানের সঙ্গে মুনাযারাও করেছেন, কুরআনকেন্দ্রিক বিভিন্ন ভ্রান্তির খণ্ডন করেছেন, যা আমরা পিছনে দেখেছি এবং সামনেও দেখব। ফলে এগুলো ইমাম আজমের যুগে ছিল না-এমন দাবি সঠিক নয়।
একইভাবে আল্লাহর দিদারের ক্ষেত্রে ইমামের বক্তব্য ‘তাঁর ও সৃষ্টির মাঝে তখন কোনো দূরত্ব থাকবে না।’— এখানেও দূরত্বের বিষয়টি নাকচ করা মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়; বরং আল-ফিকহুল আকবারের একাধিক জায়গাতে এটাকে নাকচ করা হয়েছে। যেমন—ইমাম অন্যত্র বলেন, ‘আল্লাহর নৈকট্য বা দূরত্ব (বস্তুগত) কাছে বা দূরে থাকার ভিত্তিতে নয়; এটা মর্যাদা ও অপমানের ভিত্তিতে। অনুগত বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী, ধরন ব্যতিরেকে। আর অবাধ্য আল্লাহ থেকে দূরবর্তী, ধরন ব্যতিরেকে। একইভাবে জান্নাতে আল্লাহর পাশে থাকা ধরন ব্যতিরেকে। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো ধরন ব্যতিরেকে।’ ফলে তানযিহের সর্বোচ্চ স্তর বজায় রাখতে ইমাম যে সর্বত্র এ ধরনের শব্দ আল্লাহর উপর প্রয়োগ থেকে বিরত থাকেন, সেটা স্পষ্ট। কেবল ইমাম নন, মুতাযিলাদের খণ্ডনে সে যুগে এবং পরবর্তী সময়ে অনেক আলেমই এ ধরনের কুয়ুদ (শর্তযুক্ত শব্দ) ব্যবহার করেছেন।
তিন. এগুলো কেবল আল-ফিকহুল আকবারের বক্তব্য—এমন নয়, বরং ইমামের অন্যান্য গ্রন্থেও কাছাকাছি বক্তব্য রয়েছে, যা সুস্পষ্টভাবেই এগুলো ইমামের বক্তব্য বলে প্রমাণ করে। যেমন—প্রথম বক্তব্য, যেখানে কালামকে ‘অনাদি গুণ’ বলা হয়েছে, সেটা অন্য সকল সিফাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সৃষ্টি, শ্রবণ, দর্শন-সবগুলো আল্লাহর অনাদি গুণ। এমনকি ইমাম তহাবিও বিভিন্ন সিফাতের ক্ষেত্রে ‘আযালি’ তথা অনাদি শব্দটা ব্যবহার করেছেন। সুতরাং ‘এটা পরবর্তীকালে অনুপ্রবেশকৃত’-এমন কথার যুক্তি নেই। তহাবি বলেন, (مَا زَلَ بِصِفَاتِهِ قَدِيماً قَبْلَ خَلْقِهِ، لَمْ يَزْدَدْ بِكَوْنِهِمْ شَيْئًا لَمْ يَكُنْ قَبْلَهُمْ مِنْ صِفَتِهِ، وَكَمَا كَانَ بِصِفَاتِهِ أَزَلِيًّا، كَذَلِكَ لا يَزَالُ عَلَيْهَا أَبَدِيَّا، لَيْسَ بَعْدَ خَلْقِ الخَلْقِ اسْتَفَادَ اسْمَ الخَالِقِ، وَلا بِإِحْدَاثِهِ البَرِيَّةَ اسْتَفَادَ اسْمَ البَارِي অর্থ : “সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার আগে থেকেই তিনি সকল গুণের অধিকারী। সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর মাঝে এমন কোনো গুণের সংযোজন ঘটেনি, যা আগে ছিল না। তিনি সর্বদাই নিজের গুণাবলি নিয়ে ছিলেন (আযালি), সর্বদাই তেমন থাকবেন (আবাদি)। তাই সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার পর থেকে তাঁর নাম ‘খালিক’ (সৃষ্টিকর্তা) হয়নি, জগৎকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনায় তাঁর নাম ‘বারি’ (উদ্ভাবক) হয়নি।” —ইমাম তহাবির এই বক্তব্য আর ইমাম আজমের বক্তব্যের মাঝে সিয়াক (প্রসঙ্গ) ও উসলুব (বর্ণনাপদ্ধতি)-গত কোনো পার্থক্য নেই।
একইভাবে (وَاللَّهُ تَعَالَى يَتَكَلَّم بِلَا آلَةٍ وَلَا حُرُوف) অর্থ : ‘আল্লাহ কথা বলেন কোনো উপকরণ ও অক্ষর ছাড়া।’-এটাও নতুন কোনো বিষয় নয়; বরং অন্যান্য গ্রন্থেও কাছাকাছি এবং একই ধরনের বক্তব্য রয়েছে। যেমন—‘আল-ওয়াসিয়্যাহ’ গ্রন্থে ইমাম রহ. বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলুক নয়। এটা তাঁর ওহি এবং তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, তাঁর গুণ (সিফাত)। লেখা (الكتابة), অক্ষর (الحرف), শব্দ (الكلمات) ও আয়াত (الآيات) -এগুলো কুরআনের নির্দেশক। মানুষের প্রয়োজনে এগুলো অস্তিত্বে এসেছে। বিপরীতে আল্লাহর কালাম তাঁর সত্তার সঙ্গে বিদ্যমান। সেই কালামের অর্থ বোধগম্য হয় এসব উপকরণের মধ্য দিয়ে। পাঠক, এখানে খেয়াল করুন, ইমাম আজম রহ. ওয়াসিয়্যাহ গ্রন্থেও ‘অক্ষর’-সহ অন্যান্য মানবিক উপকরণ সুস্পষ্টভাবে নাকচ করেছেন। ফলে এটাকেও পরবর্তীকালে অনুপ্রবেশকৃত বলতে হবে। একইভাবে তিনি এখানে ‘কালিমা’-কে নাকচ করেছেন। আর ‘কালিমা’ মূলত ‘লফজ’ বা শব্দই। ফলে আল-ফিকহুল আকবারের ‘কুরআনে (পাঠের সময়) আমাদের শব্দগুলো সৃষ্ট। ’-বক্তব্য আল-ওয়াসিয়্যাহ গ্রন্থের বক্তব্যের মাধ্যমেও প্রমাণিত।
وَالله تَعَالَى يرى فِي الْآখِرَةِ وَيَرَاهُ الْمُؤْمِنُونَ وهم في الجنَّة بأعين رؤوسهم بلا تشبيه وَلَا كَيْفَيَّة وَلَا يكون بينه وَبَين خلقه مَسَافَة অর্থ : ‘আখেরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে; মুমিনরা জান্নাতে স্বচক্ষে আল্লাহর দিদার লাভ করবে, তবে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য ও ধরন ব্যতিরেকে। তাঁর ও সৃষ্টির মাঝে তখন কোনো দূরত্ব থাকবে না।’—এটাও কেবল আল-ফিকহুল আকবারের বক্তব্য নয়, অন্যান্য গ্রন্থেও প্রমাণিত। যেমন—আল-ওয়াসিয়্যাহ গ্রন্থে ইমাম আজম রহ. বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, জান্নাতিরা তাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে। আল্লাহ বলেন, وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا নাত্বিরাহ অর্থ : ‘সেদিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের পালনকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে।’ [কিয়ামাহ : ২২-২৩] তবে এই দর্শন কোনো ধরন (কাইফিয়্যাহ), সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য (তাশবিহ) ও দিক (জিহাহ) ছাড়া। কারণ, আল্লাহ এসবের ঊর্ধ্বে।” এখানে খেয়াল করে দেখুন, ইমাম আজম আল্লাহকে দেখার ক্ষেত্রে ‘দিক’ সুস্পষ্টভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। আর এর মাধ্যমে ‘দূরত্ব’ (মাসাফাহ) নাকচ হয়ে গেল। বরং ইমাম তহাবিও আকিদাহ তহাবিয়্যাহতে সুস্পষ্টভাবে বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের সীমাপরিসীমা ও গণ্ডির ঊর্ধ্বে। তিনি সকল উপাদান, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও উপকরণ থেকে মুক্ত। সৃষ্টির মতো ছয় দিক তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না।’ এখানেও দিক নাকচ করা হয়েছে। ফলে ইমাম আজমের আল-ফিকহুল আকবারের বক্তব্যকে নাকচ করার কোনো অর্থ নেই; বরং তাদের মাযহাবের সঙ্গে যাক বা না যাক, এটাই ইমামের মাযহাব।
টিকাঃ
১৯৭. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
১৯৮. প্রাগুক্ত (২)।
১৯৯. প্রাগুক্ত (২)।
২০০. প্রাগুক্ত (৬)।
২০১. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
২০২. প্রাগুক্ত (২)।
২০৩. আল-ফিকহুল আকবার (৭-৮)।
২০৪. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৯-১০)।
২০৫. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪০-৪২)।
২০৬. এ প্রসঙ্গে দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৭৩-৭৪)।
২০৭. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৮-৫৯)।
২০৮. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১৪৭)।
২০৯. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১৫)।
২১০. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
২১১. প্রাগুক্ত (১)।
২১২. রিসালাহ ইলা আহলিস সাগর (১২১)।
২১৩. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
২১৪. আল-ফিকহুল আকবার (২)।
২১৫. দেখুন: তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/২৬১-২৬২)। যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি (৫/২০৭)। শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৩৪-৩৫)।
📄 শেষ কথা
প্রশ্ন হলো, তাহলে কি এইসব আপত্তি আমরা সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দিচ্ছি? আমরা কি এসব গ্রন্থকে ভুলমুক্ত কিংবা সব ধরনের হস্তক্ষেপ থেকে নিষ্পাপ দাবি করছি? না। সে দাবি করার দুঃসাহস ও যৌক্তিকতা কোনোটাই নেই; বরং বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে মানবিক হস্তক্ষেপ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বীকৃত বিষয়। ‘আকিদাহ তহাবিয়্যাহ’ গ্রন্থ এত প্রসিদ্ধ এবং তুলনামূলক পরবর্তী সময়ে রচিত হওয়া সত্ত্বেও সেটা সম্পূর্ণ হস্তক্ষেপমুক্ত থাকেনি, যা আমরা আকিদাহ তহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যায় বিভিন্ন জায়গাতে দেখিয়েছি। কেবল তহাবি নয়, আশআরি, মাতুরিদি, আহমদ ইবনে হাম্বলসহ সালাফে সালেহিনের বিভিন্ন গ্রন্থে এ ধরনের পরিবর্তন-পরিবর্ধন কিংবা নিদেনপক্ষে নুসখার ভিন্নতা একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠিত বিষয়। ফলে আল-ফিকহুল আকবারসহ ইমামের গ্রন্থাবলিতে এ ধরনের হস্তক্ষেপ হতেই পারে এবং সেটা নিতান্তই স্বাভাবিক।
যেমন—আল-ফিকহুল আকবারে আল্লাহ তায়ালার সিফাতকে ‘যাতিয়্যাহ’ (সত্তাগত) ও ‘ফি’লিয়্যাহ’ (কর্মগত) বিভাজন করা। এ কথা বলা যায় যে, এমন বিভাজন সে যুগে ছিল না; বরং সালাফে সালেহিন সকল সিফাতের ব্যাপারে স্বাভাবিক কথা বলতেন। একইভাবে ইমাম আজম আল্লাহর কয়েকটি সিফাতের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, (أما الذاتية فالحياة وَالْقُدْرَةِ وَالْعلم وَالْكَلَাম والسمع وَالْبَصَر وَالْإِرَادَة) অর্থ : “তাঁর সত্তাগত গুণাবলি হচ্ছে, ‘হায়াত’ (জীবন), ‘কুদরত’ (শক্তি), ‘ইলম’ (জ্ঞান), ‘কালাম’ (কথা), ‘সাম্’ (শ্রবণ), ‘বাসার’ (দর্শন) এবং ‘ইরাদা’ (ইচ্ছা)।” এখানে সত্তাগত হিসেবে স্রেফ সাতটা সিফাত উল্লেখ করা হয়েছে; ‘ইত্যাদি’ (وغيره) বা এ ধরনের শব্দও ব্যবহার করা হয়নি। বোঝা গেল, এগুলো উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হয়নি, বরং সত্তাগত সিফাত স্রেফ সাতটা মেনেই সম্ভবত উল্লেখ করা হয়েছে। এবার ইমাম আজমের প্রায় দেড় শতাব্দ পরে লেখা আবুল হাসান আশআরির একটি বক্তব্য দেখুন : (وأجمعوا على إثبات حياة الله عز وجل لم يزل بها حياً، وعلماً لم يزل به عالماً، وقدرة لم يزل بها قادراً، وكلاماً لم يزل به متكلماً، وإرادة لم يزل بها مريداً، وسمعاً وبصراً لم يزل به سميعاً بصيراً) আল্লাহর জন্য যেসব সিফাত সাব্যস্ত করার ব্যাপারে একমত তা হলো : আল্লাহ সদা-সর্বদা ‘হায়াত’ (জীবন), ‘ইলম’ (জ্ঞান), ‘কুদরত’ (শক্তি), ‘কালাম’ (কথা), ‘ইরাদা’ (ইচ্ছা), ‘সাম্’ (শ্রবণ), ‘বাসার’ (দর্শন) গুণে গুণান্বিত। এখানেও সিফাত হিসেবে স্রেফ সাতটাকে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং ‘আল-ফিকহুল আকবারের অন্য এক জায়গায় এসেছে : (لم يزل عالما بِعِلْمِهِ وَالْعلم صفة في الأزل، وقাদرا بقدرته وَالْقُدْرَة صفة في الأزل، ومتكلما بِكَلَامِهِ وَالْكَلَام صفة فِي الْأَزَل...) এই বাক্য এবং আশআরির বাক্যের মাঝে কোনো সামঞ্জস্য দেখা যায়? দেখা গেলে সেটা কী পরিমাণ? বরং এসব বক্তব্যের মাঝে আন্তঃসম্পর্কের একটা বিপুল মাত্রা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এ কারণেই অনেকে এ বক্তব্য ইমাম আজমের হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, যদিও এ কারণে এগুলোকে ইমাম আজমের হওয়া চূড়ান্তভাবে নাকচও করা যায় না; বরং বিপরীতভাবে এগুলোকে ইমাম আজমের বক্তব্য ধরে পরবর্তী লোকদের মাযহাব ইমাম আজমের মাযহাব থেকে গৃহীত বলা গেলেও যেতে পারে।
একইভাবে আল-ফিকহুল আকবারে ইমাম আজম আল্লাহ তায়ালাকে ‘জাওহার’ ও ‘আরাজ’ থেকেও মুক্ত ঘোষণা করেছেন; তাঁর উপর এসব শব্দ প্রয়োগ নিষেধ করেছেন। তিনি লিখেন, “তিনি ‘শাইউন’ (বস্তু), কিন্তু অন্যান্য বস্তুর মতো নন। আর ‘শাইউন’-এর অর্থ হলো ‘জিসম’ (দেহ), ‘জাওহার’ (মৌল), ‘আরাজ’ (বাহ্যিক রূপ-রং)-বিহীন বিদ্যমান সত্তা। তাঁর কোনো ‘হদ’ (সীমা) নেই, প্রতিপক্ষ নেই, সমকক্ষ নেই; তাঁর মতো কিছু নেই।” আল্লাহর শানে ‘জাওহার’, ‘আরাজ’ ইত্যাদি বিতর্ক শুরু হয় আরও পরে; আব্বাসি যুগে যখন দর্শনের কিতাবগুলো আরবি হতে থাকে, তখন। ফলে ইমাম আজম এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ করবেন বলে মনে হয় না। তাই অসম্ভব নয় যে, এসব শব্দ পরবর্তীকালে সংযোজিত হয়েছে, যেমনটা শিবলি নুমানিসহ একদল সমকালীন গবেষক বলেছেন। তবে এটাও সুনিশ্চিত কিংবা চূড়ান্ত কথা নয়, বরং অনুমাননির্ভর। কারণ, অনুবাদের কাজগুলো আরও পরে শুরু হলেও মৌখিক প্রচার ও চর্চা ইমামের যুগেই শুরু হয়েছিল। বিশেষত আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে জাদ ও জাহমের এবং তাকদিরের ক্ষেত্রে মাবাদ ও গাইলানের এমন অনেক বক্তব্য রয়েছে, যেগুলো পরবর্তী সময়ে সেই ইমাম আহমদের যুগে মুতাযিলাদের মাঝে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। এর মানে কি সেগুলো সে সময়ের আগে ছিল না? না, কস্মিনকালেও এমন নয়। মোটকথা, ইমাম আজম রহ.-এর যুগে এসব শব্দের আত্মপ্রকাশ ঘটা অসম্ভব নয়। ফলে আল্লাহর উপর এসব শব্দ প্রয়োগে তিনি তখনই নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন। বিশেষত আকিদার পঞ্চপুস্তক ছাড়াও অন্যান্য গ্রন্থে ইমাম আজম কর্তৃক এসব শব্দের ব্যবহার নাকচের বর্ণনা রয়েছে, যা আমরা পিছনে উল্লেখ করেছি।
তর্কের খাতিরে এসব বিষয়কে যদি পরবর্তীকালে সংযোজিত ধরে নেওয়াও হয়, এ কারণে পুরো গ্রন্থকে অস্বীকার করা যাবে? নাহ্। এসব শব্দের সংযোজন-বিয়োজনের কারণে পুরো গ্রন্থ অস্বীকার করা ইনসাফ নয়, যেমনটা কেউ কেউ দাবি করেছেন; বরং আমরা ইমাম আশআরির ‘ইবানাহ’, তহাবির ‘আকিদাহ’ থেকে শুরু করে সব ঘরানার প্রাচীন গ্রন্থে কিছু-না-কিছু সংযোজন-বিয়োজনের অভিযোগ পাই, খোদ সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দের আলেমদের কিতাবেও সংযোজিত হয়েছে, অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে—এ ধরনের অভিযোগ শুনতে পাই। তাহলে কি আমরা তাদের সম্পূর্ণ গ্রন্থ অস্বীকার করি? না, সেটা করার সুযোগ নেই।
ফলে এসব সংযোজন-বিয়োজনের বক্তব্য মেনে নিলেও মৌলিকভাবে এগুলো ইমাম আজম রহ.-এর গ্রন্থ। এগুলোকে সমূলে তাঁর গ্রন্থ হিসেবে অস্বীকারের কোনো জ্ঞানগত কিংবা ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। হ্যাঁ, মতাদর্শগত ভিত্তি আছে। ফলে দুঃখজনকভাবে আমরা দেখি, কিছু ব্যতিক্রম বাদে ইমাম আজম রহ.-এর এসব গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানের সমালোচনা এবং সেগুলোকে ঘিরে সশংয় তৈরির মূল কারণ হলো মতাদর্শিক ক্ষুদ্র ও সীমিত দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব গ্রন্থের বিচার। অর্থাৎ, অধিকাংশ ব্যক্তি, যারা এসব গ্রন্থের বিভিন্ন অংশের উপর আপত্তি তুলেছেন, তারা বিভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও এক জায়গায় তাদের মাঝে ব্যাপক মিল-মিছিল চোখে পড়ে। সেটা হলো—প্রত্যেকে কেবল সেসব বিষয়ের উপরই আপত্তি করেছেন, কেবল সেগুলোকেই অনুপ্রবেশকৃত কিংবা পরবর্তীকালে সংযোজিত বলে মত প্রকাশ করেছেন, যেগুলো তাদের নিজেদের মতাদর্শিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিছু উদাহরণ আমরা পিছনে পেশ করেছি। ফলে এসব আপত্তির ভিত্তি ঐতিহাসিক কিংবা দালিলিক থাকেনি; বরং নিজেদের প্রচলিত বিশ্বাসের সঙ্গে সংঘর্ষই এসব আপত্তির একমাত্র ভিত্তি! অথচ এটা গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক কোনো ভিত্তি হতে পারে না। এটাকে গ্রহণযোগ্য আপত্তির দলিল মেনে নিলে প্রত্যেক সম্প্রদায় তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অংশটুকু প্রত্যাখ্যান করবে, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খণ্ডনীয় বক্তব্যগুলোকে গ্রহণ করবে। এতে করে একসময় পুরো গ্রন্থ কিংবা সিংহভাগ অংশই প্রত্যাখ্যাত হয়ে পড়বে। এসব গ্রন্থের অস্তিত্ব অর্থহীন হয়ে যাবে।
তাই প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ইমাম আজম রহ. প্রথম জীবনে যে একজন তুখোড় মুনাযির এবং ইসলামবিরোধী শক্তির কঠোর প্রতিবাদকারী ছিলেন এ ব্যাপারে তাঁর সকল জীবনীকার একমত। পরবর্তীকালে তিনি ‘তর্কশাস্ত্র’ পরিত্যাগ করে ফিকহ ও ইজতিহাদে নিমগ্ন হন। কিন্তু দ্বীনের পথে সংগ্রাম কখনোই পরিত্যাগ করেননি, করার সুযোগও ছিল না। কারণ, সর্বত্রই বিভিন্ন নতুন বিদআতের প্রাদুর্ভাব ঘটছিল। এ কারণে ফিকহ ও ইজতিহাদের পাশাপাশি তিনি বিশুদ্ধ আকিদার প্রচার এবং বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামও অব্যাহত রাখেন। আকিদা বিষয়ে অধিক গুরুত্বদানের ফলেই তিনি এটাকে সবচেয়ে বড় ফিকহ (আল-ফিকহুল আকবার) আখ্যা দেন। ঈমানের পরিচয় ও হাকিকত, কবিরা গুনাহকারীর বিধান, তাকদির-সম্পর্কিত বিভিন্ন সশংয়ের জবাব, কুরআনকেন্দ্রিক বিভ্রান্তি খণ্ডন, মানুষের স্বাধীনতা ও পরাধীনতা ইত্যাদি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান রাখেন। এগুলোই পরবর্তীকালে হয়তো তিনি অথবা তাঁর ছাত্ররা সংকলন করেন। ফলে উপরের পাঁচটি গ্রন্থ—সরাসরি তাঁর মাধ্যমে কিংবা তাঁর শাগরেদদের মাধ্যমে সংকলিত হোক—সামগ্রিকভাবে তাঁর আকিদারই প্রতিচ্ছবি। এসব গ্রন্থের বিষয়বস্তুও মৌলিকভাবে এক ও অভিন্ন। এতে যদি কিছু শব্দ বা ছত্র পরবর্তীকালে বাইরে থেকে সংযোজিত হয়, তাতেও সবগুলো গ্রন্থের সারবত্তা বিকৃত হয় না, ইমামের আকিদাগত তুরাসের মূল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
আমরা এ কারণেই সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ইমাম আজমের যেকোনো একটা গ্রন্থকে ব্যাখ্যা করতে যাইনি। একটা গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে আমাদের এই প্রকল্প দাঁড় করাইনি; বরং আমরা ইমাম আজম রহ.-এর পাঁচটি গ্রন্থকেই বেছে নিয়েছি। পাঁচটি গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে ইমাম আজম রহ.-এর আকিদার দুর্গ নির্মাণ করেছি। ফলে আমরা দেখব, পাঁচটি গ্রন্থ মূলত সাংঘর্ষিক নয়, বরং একে অন্যের পরিপূরক। একটার অপূর্ণ আলোচনা অন্যটা পূর্ণ করছে, একটার অস্পষ্টতা অন্যটা দূর করছে। মৌলিক কোনো অন্তর্বিরোধ থেকে এগুলো মুক্ত, যা এটার প্রমাণ যে, সামগ্রিকভাবে এসব গ্রন্থ এক ব্যক্তির আকিদার প্রতিনিধি, হোক তাঁর লেখা কিংবা তার পরের কোনো প্রতিনিধির লেখা। এ কারণে আমরা পাঁচটি গ্রন্থকেই সম্মিলিতভাবে এই গ্রন্থের ভিত্তিস্বরূপ গ্রহণ করেছি। প্রত্যেকটি মাসআলাতে একাধিক গ্রন্থে বর্ণিত ইমামের বক্তব্যগুলো একসঙ্গে তুলে ধরেছি। অতিরিক্ত ভিত্তি হিসেবে রেখেছি ইমাম তহাবির ‘আকিদাহ তহাবিয়্যাহ’-কে। ফলে এখানে ইমাম আজমের আকিদার যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, আমরা আশা করছি সেটা নিখুঁত হবে, ইমামের প্রতি এবং ইলমের প্রতি ইনসাফ হবে। এটাকে যৌক্তিকভাবে ও যথার্থরূপে ‘ইমাম আজমের আকিদা’ সংকলন বলা যাবে, ইনশাআল্লাহ।