📄 চার. এসব গ্রন্থ ইমাম আজমের আকিদার ঐতিহাসিক দলিল
আমরা যদি তাদের আপত্তির সঙ্গে একমত হয়ে এই গ্রন্থগুলো সরাসরি ইমাম আজম রহ.-এর লেখা নয় বলে মেনে নিই, তবুও এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে, এগুলোতে যেসব আকিদা রয়েছে, সেগুলো সামগ্রিকভাবে ইমাম আজম রহ.-এর আকিদা। অর্থাৎ, হয়তো আমরা বলব, স্বয়ং ইমাম রহ. এসব গ্রন্থ নিজের হাতে লিখেছেন, অথবা বলব, তিনি তাঁর ছাত্রদের ক্লাসে এবং বিভিন্ন মজলিসে এগুলো বলেছেন, লিখিয়েছেন এবং ছাত্ররা কিংবা ছাত্রদের ছাত্ররা পরবর্তীকালে এগুলো সংকলন করেছেন। এই উভয় অবস্থাতেই ফলাফল এক। অর্থাৎ, তাঁর ছাত্ররা কিংবা ছাত্রের ছাত্ররা সংকলন করলেও এগুলোকে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর গ্রন্থ বলা যাবে। কারণ, সে সময়ে রচিত বা সংকলিত অধিকাংশ গ্রন্থের সংকলনের গল্পই এমন। বরং ছাত্ররা সংকলন করার কারণে যদি তাঁর আকিদা বলা না যায়, তবে তো ফিকহের ক্ষেত্রেও ইমাম আজমের ফিকহ এবং হানাফি মাযহাব বলতে কিছু থাকে না। কারণ, তিনি ফিকহ বিষয়েও নিজের হাতে লেখা কোনো গ্রন্থ রেখে যাননি। তাঁর শাগরেদদের লেখা গ্রন্থ এবং তাদের মতামত থেকেই ইমামের মত জানতে পারি আমরা।
উপরন্তু যদি আমরা আক্ষরিক অর্থে তাঁর গ্রন্থ নাও বলতে পারি, তথাপি এগুলোতে বিদ্যমান বিষয়সমূহকে তাঁর আকিদা বলার মাঝে বিন্দুমাত্র সমস্যা নেই। এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য কেউ মতভেদ করেছেন বলে আমার জানা নেই। কারণ, তাওহিদ ও সিফাতের ক্ষেত্রে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি, তাকদিরের ক্ষেত্রে তাঁর মতামত এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমানের সংজ্ঞার্থ, হাকিকত ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইমামের প্রতিষ্ঠিত মাযহাবের বাস্তব ও পুঙ্খানুপুঙ্খ রেকর্ড এসব গ্রন্থ। এগুলোতে এমন কোনো বক্তব্য নেই যেটা ইমাম আজমের আকিদা হিসেবে উম্মাহর কাছে স্বীকৃত নয়। এগুলোতে এমন কোনো বক্তব্য নেই যা পরবর্তী হানাফি ফুকাহা এবং উলামায়ে কেরাম আবু হানিফার মাযহাব হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। হ্যাঁ, কিছু মাসআলাতে তারা ইমামের বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু সেটা ইমামের আকিদা হিসেবে অস্বীকৃতি জানিয়ে নয়, বরং ইমামের বক্তব্য হিসেবে মেনে নেওয়ার পরেই। উপরন্তু এসব গ্রন্থের পারস্পরিক আলোচ্য বিষয়ের মাঝে মিল-মিছিল বেশ বিস্ময়কর ও ইতিবাচক। অর্থাৎ, প্রায় প্রত্যেকটি মাসআলাতে আলোচ্য পাঁচটি গ্রন্থকে আমরা একে অন্যের পরিপুরক দেখি। ফলে এগুলো যে একই ব্যক্তির আকিদা ও আদর্শ সেটা বুঝতে দূরদর্শী মানুষের কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এমনকি আকিদার বাইরে হানাফি মাযহাবের ফিকহি মুসতানাদ গ্রন্থগুলো, ইমাম আজমের দিকে সম্পৃক্ত হাদিসের মাসানিদগুলো—সবগুলোতে বর্ণিত ইমামের বক্তব্য অত্যন্ত কাছাকাছি। একই উৎস থেকে উৎসারিত।
তা ছাড়া, এগুলোর বাইরের আরও একাধিক প্রাচীন সূত্র ইমামের দিকে সামগ্রিকভাবে এক ও অভিন্ন আকিদাই সম্পৃক্ত করে, যেমন ইমাম তহাবি (৩২১ হি.)-এর ‘আকিদাহ তহাবিয়্যাহ’। সায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ উসতাওয়াবি নিশাপুরি (৪৩২ হি.)-এর ‘আল-ইতিকাদ’। এগুলো ইমামের প্রায় দেড়-দুইশো বছর পরে লেখা হলেও উভয় গ্রন্থের বিষয়বস্তু অত্যন্ত কাছাকাছি এবং ইমাম আজমের দিকে নিসবতকৃত উপরের পাঁচটি গ্রন্থের সঙ্গে এগুলোর মৌলিক কোনো সংঘাত তো নেই-ই, উপরন্তু এসব গ্রন্থের মিল-মিছিল দেখলে যে কাউকে বিস্মিত হতে হয়; বরং তহাবিতে বর্ণিত আকিদা এবং ‘আল-ইতিকাদে’ বর্ণিত ইমাম আজমের শাগরেদদের দিকে নিসবতকৃত বক্তব্যগুলো দেখলে যে কারও বুঝে আসবে, ইমামের পাঁচটি গ্রন্থে বর্ণিত আকিদা সামগ্রিকভাবে সকল হানাফি ইমামের আকিদা ছিল। এগুলো হানাফি আলেমদের মজলিসে মজলিসে চর্চা হতো, ধারণ করা হতো। এগুলোর সঙ্গে যদি মুওয়াফফাক ইবনে আহমদ আল-মক্কি (৫৬৮ হি.)-এর ‘মানাকিব’-এর বিস্তারিত ঘটনাগুলো মিলিয়ে পড়া হয়, তবে যে-কেউ উপলব্ধি করবে যে, এসব গ্রন্থে যেসব আকিদা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো প্রকৃতপক্ষেই ইমাম আজম রহ. থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ আকিদা। তাঁর ছাত্ররা বিভিন্ন ভূখণ্ডে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরম্পরায় এসব আকিদা বহন করেছেন, চর্চা করেছেন এবং প্রচার করেছেন। ফলে এগুলোতে বর্ণিত আকিদা ইমাম আজমের কি না সেটা নিয়ে সশংয় প্রকাশ বিলকুল অযৌক্তিক ব্যাপার।
এখানে আরেকটি বিষয় পর্যালোচনার দাবি রাখে। সেটা হলো, ইমাম তহাবির আকিদাগ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে সবাই একমত। খোদ সংশয় প্রকাশকারীরাও ইমাম তহাবির বর্ণিত আকিদাকে ইমাম আজমের আকিদা বলে মানেন। অথচ ইমাম তহাবি তাঁর আকিদার কোনো সনদ উল্লেখ করেননি; তিনি কোত্থেকে ইমাম আজম এবং তাঁর দুই শাগরেদের আকিদা গ্রহণ করেছেন সেটাও স্পষ্ট করেননি; তবুও বিনাবাক্যে তাঁর বর্ণিত বক্তব্যকে ইমাম আজমের আকিদা হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে। অথচ তিনি ইমাম আজমের কয়েক স্তরের পরের শাগরেদ। তাহলে তার পুত্র হাম্মাদ এবং প্রথম স্তরের শাগরেদ আবু মুতি বলখি, আবু মুকাতিল সমরকন্দির বর্ণনা মেনে নিতে এত কষ্ট কেন? এগুলোর সনদকে হাদিসের সনদের মতো নিরীক্ষণ করা হচ্ছে কেন?
মুরতাযা যাবিদি (১২০৫ হি.) লিখেন, “উক্ত পাঁচটি কিতাবের প্রামাণ্যতা নিয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উম্মাহর আলেমগণ এগুলো কবুল করে নিয়েছেন। ইমাম নিজে এগুলো হাম্মাদ, আবু ইউসুফ, আবু মুতি বলখি, আবু মুকাতিল সমরকন্দি প্রমুখ শাগরেদকে লিখিয়েছেন, তারা নিজেরা সেগুলো সংকলন করেছেন। তাদের থেকে পরবর্তী আলেমগণ তথা ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ, মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযি, মুহাম্মাদ ইবনে সামাআহ, নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া, শাদ্দাদ ইবনুল হাকাম প্রমুখ গ্রহণ করেছেন। এভাবে বিশুদ্ধ সনদে সেগুলো ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে [বলা বাহুল্য, এভাবে ইমামে আহলে সুন্নাত আবু জাফর তহাবি পর্যন্তও পৌঁছেছে]। সুতরাং কেউ যদি এসব গ্রন্থ ইমাম আজমের দিকে সম্পৃক্ত করে, সেটা যেমন সঠিক; কারণ এসব আকিদা তাঁরই, কেউ যদি এগুলোর প্রথম স্তরের সংকলক কিংবা আরও পরবর্তী কারও দিকে সম্পৃক্ত করে, সেটাও সঠিক; কারণ, তারা এগুলো সংকলন করেছেন। মোটকথা, পরবর্তী উম্মাহ এগুলো ইমাম আজমের আকিদা হিসেবে মেনে নিয়েছে। এ কারণে ফখরুল ইসলাম বাযদাবির ‘উসুল’ এবং এটার বিভিন্ন ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যথা—হুসামুদ্দিন সিগনাকির ‘আল-কাফি’, কিওয়ামুদ্দিন (আমির কাতিব) ইতকানির ‘আশ-শামেল’, জালালুদ্দিন কারলানির ‘আশ-শাফি’, কিওয়ামুদ্দিন সাক্কাকির ‘বায়ানুল উসুল’, আলাউদ্দিন বুখারির ‘কাশফুল আসরার’, আকমালুদ্দিন বাবিরতির ‘আত-তাকরির’ ইত্যাদি সকল গ্রন্থে এসব পুস্তিকার আলোচনা এসেছে। হামাদানির ‘খিযানাতুল আকমাল’-এর শেষের দিকে ‘আল-ওয়াসিয়্যাহ’ পুস্তিকা পুরোটাই উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম নাতেফি ‘আল-আজনাস ফি ফুরুয়িল ফিকহিল হানাফি’ গ্রন্থে এটা উল্লেখ করেছেন। ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থের অনেক মাসআলা নাজমুদ্দিন নাসাফি, খাওয়ারযেমি প্রমুখ কৃত ইমামের ‘মানাকিব’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। আল-ফিকহুল আকবারের কিছু মাসআলা ‘আল-মুহিতুল বুরহানি’, শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনে ইলিয়াসের ‘ফাতাওয়া’, ইবনুল হুমামের ‘আল-মুসায়ারাহ’-তে এসেছে। আল-ফিকহুল আবসাতের কিছু মাসআলা আবুল মুইন নাসাফি তার ‘আত-তাবসিরাহ’, নুরুদ্দিন সাবুনি তাঁর ‘আল-কিফায়াহ’, হাফিজুদ্দিন নাসাফি তাঁর ‘আল-ইতিমাদ’, আবুল আলা সায়েদ তাঁর ‘আল-ইতিকাদ’, আবু শুজা নাসেরি তাঁর তহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যা ‘আন-নূরুল লামি’ ওয়াল-বুরহানুস সাতি’, আবুল মাহাসিন কওনভি তাঁর তহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যাতে উল্লেখ করেছেন। আতা ইবনে আলি আল-জুযজানি এর একটি মূল্যবান ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন (শরহুল ফিকহিল আকবার নামে; মূল ব্যাখ্যা আবসাতের)। .... আকমালুদ্দিন বাবিরতি আল-ওয়াসিয়্যাহর ব্যাখ্যা লিখেছেন। এভাবে উক্ত পাঁচটি পুস্তিকার বিভিন্ন অংশ ইমামদের প্রায় ত্রিশটি কিতাবে আলোচিত হয়েছে। উম্মাহর কাছে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।”
টিকাঃ
১৯৬. দেখুন: ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন (২/১৮-১৯)।