📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 তিন. উলামায়ে কেরামের কাছে গ্রহণযোগ্যতা

📄 তিন. উলামায়ে কেরামের কাছে গ্রহণযোগ্যতা


এসব গ্রন্থের প্রামাণ্যতার আরেকটি মজবুত দলিল হলো এগুলোর ব্যাপারে সহস্রাধিক বছরব্যাপী বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষ্য। হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দ থেকেই বিভিন্ন আলেম ও গবেষকের গ্রন্থে আবু হানিফা রহ.-এর প্রতি এসব গ্রন্থ সম্পৃক্ত করা ব্যাপকভাবে চোখে পড়ে। উপরে ইমাম তহাবি, আবু মনসুর মাতুরিদি এবং আবুল লাইস সমরকন্দির ব্যাপারে বলা হয়েছে।

শাইখুল মুতাকাল্লিমিন আবু বকর ইবনে ফওরক (৪০৬) ইমামের ‘আল-আলিম ওয়াল-মুতাআল্লিম’ পুস্তিকার ব্যাখ্যা লিখেছেন যা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এ গ্রন্থের শুরুতে তিনি এটাকে ইমাম আজমের কিতাব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইবনুন নাদিম (৪৩৮ হি.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফিহরিস্ত’ (৩৭৭ হি.)-এ ইমাম আজমের দিকে একাধিক গ্রন্থ সম্পৃক্ত করেছেন। তিনি লিখেন, “আবু হানিফা বেশকিছু গ্রন্থ রেখে গিয়েছেন। তন্মধ্যে ‘আল-ফিকহুল আকবার’, ‘আর-রিসালাহ ইলাল বাত্তি’, মুকাতিলের বর্ণনায় ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ এবং ‘আর-রাদ্দু আলাল কাদারিয়্যাহ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।” ‘আল ফিহরিস্ত’ লেখা হয়েছিল চতুর্থ হিজরিতে। সুতরাং ‘পঞ্চম হিজরির আগে এসব গ্রন্থের অস্তিত্ব নেই’ এটা আরেকবার নাকচ হলো।

আবদুল কাহের বাগদাদি (৪২৯ হি.) ইমামের বিভিন্ন গ্রন্থের আলোচনা করেছেন। তিনি তাঁর ‘উসুলুদ্দিন’ গ্রন্থে লিখেন, “ফকিহদের মাঝে প্রথম মুতাকাল্লিম হলেন আবু হানিফা ও শাফেয়ি। কাদারিয়্যাহদের খণ্ডনে আবু হানিফার একটি গ্রন্থ রয়েছে, যার নাম রেখেছেন ‘আল-ফিকহুল আকবার।’ তাঁর একটি রিসালাহও রয়েছে, যা তিনি আহলে সুন্নাতের ‘সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ) কাজ করার সময় আসে’ নীতির সমর্থনে লিখেছেন।”

আবুল মুজাফফর আল-ইসফারায়েনি (৪৭১ হি.) লিখেন, “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ি, মালেক, আওযায়ি, দাউদ, যুহরি, লাইস ইবনে সাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল, সুফিয়ান সাওরি, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ, মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক হানযালি.... আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ, যুফার, আবু সাওর প্রমুখের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। হিজায, শাম, ইরাক, খোরাসান, মা-ওয়াগাউন-নাহারসহ সকল আলেমের আকিদা এটা। এটাই সাহাবা, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িনের আকিদা। যে ব্যক্তি যাচাই করতে চায়, সে যেন আবু হানিফা রহ.-এর গ্রন্থগুলো দেখে। যেমন : ‘কিতাবুল ইলম’ (আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম?), ‘আল-ফিকহুল আকবার’ [বর্তমানে আল-ফিকহুল আবসাত নামে প্রসিদ্ধ], যেটা আবু হানিফা → আবু মুতি → নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া থেকে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে আমার কাছে এসে পৌঁছেছে, ‘আল-ওয়াসিয়্যাহ’ যেটাকে তিনি আবু আমর উসমান আল-বাত্তির কাছে লিখেছেন...।” যদিও ইসফারায়েনির তথ্যের মাঝে কিছু বিভ্রাট রয়েছে, কিন্তু মৌলিক বিষয় যে প্রমাণিত, আমাদের সেটা দেখানো উদ্দেশ্য।

ফখরুল ইসলাম বাযদাবি (৪৮২ হি.) তাঁর বিখ্যাত ‘উসুল’-এর শুরুতে লিখেন, “ইলম দুই প্রকারের। এক. আল্লাহর তাওহিদ ও সিফাতের ইলম। দুই. ফিকহ, শরিয়ত ও হালাল-হারামের ইলম। প্রথম প্রকারের ইলমের ক্ষেত্রে একমাত্র বিশুদ্ধ পদ্ধতি হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, প্রবৃত্তির অনুসরণ ও বিদআত বর্জন করা, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পথে অবিচল থাকা, যে পথে ছিলেন সাহাবা, তাবেয়িন ও সালাফে সালেহিন। এ পথেই অটল ছিলেন ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং তাদের সকল শাগরেদ। ইমাম আবু হানিফা রহ. ইলমে তাওহিদের ক্ষেত্রে ‘আল-ফিকহুল আকবার’ নামে স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেছেন। তাতে তিনি (আল্লাহর) সিফাত ‘ইসবাত’ করতে বলেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’, ‘রিসালাহ’ ইত্যাদি।”

হাফিজুদ্দিন নাসাফি (৭১০ হি.) ইমাম আজমের ‘আল-ফিকহুল আকবার’, ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ ও ‘আর-রিসালাহ’ তিনটি গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন এবং সেগুলো থেকে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছেন। আবদুল আযিয বুখারি (৭৩০ হি.) উসুলুল বাযদাবির ব্যাখ্যায় আল-ফিকহুল আকবার ও আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম দুটো গ্রন্থই তাঁর কাছে আছে বলে জানিয়েছেন এবং তিনি এসব গ্রন্থ থেকে একাধিক মাসআলার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। মক্কির (৫৬৮) বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায়, খলিফা মামুনের কাছেও ইমাম আজমের কিছু কিতাব পৌঁছেছিল। শায়খ ইবনে তাইমিয়্যাহও (৭২৮ হি.) ‘আল-ফিকহুল আকবার’ (আবু মুতির আল-ফিকহুল আবসাত)-কে ইমাম আজমের গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইবনে কুতলুবুগা (৮৭৯ হি.) আবু মুতি বলখিকে ‘আল-ফিকহুল আকবার’- (যা মূলত আবসাত) এর বর্ণনাকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এভাবে যুগে যুগে বিভিন্ন মাযহাব-মাসলাক নির্বিশেষে মুহাক্কিক আলেমগণ এগুলোকে ইমাম আজমের গ্রন্থ বিবেচনা করেছেন এবং সেগুলো থেকে নিজ রচনায় উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

বরং আবুল লাইস সমরকন্দি থেকে শুরু করে আতা ইবনে আলি জুযজানি (৫৬৫ হি. পূর্ব), আকমালুদ্দিন বাবিরতি (৭৮৬ হি.), ইলিয়াস সিনোবি (৮৯১ হি.), বাহাউদ্দিন যাদাহ রাহমাভি (প্রায় ৯৫২ হি.), আবুল মুনতাহা মাগনিসাভি (১০০০ হি.), মোল্লা আলি কারি (১০১৪ হি.) পর্যন্ত বড় বড় হানাফি মুহাক্কিক এসব কিতাবের ব্যাখ্যা লিখেছেন। এর দ্বারাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা এগুলো এবং বিশেষত আল-ফিকহুল আকবার ও আল-ফিকহুল আবসাত দুটোকেই ইমাম আজম রহ.-এর গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। কারণ, এমন না হলে তারা এসব গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখতেন না। ফলে সেই প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত হানাফি আলেমগণ এসব কিতাবকে ইমাম আজমের আকিদার সংকলন হিসেবেই দেখে আসছেন, প্রচার-প্রসার করছেন, শিখছেন এবং মানুষকে শেখাচ্ছেন। বরং আল্লামা মাগনিসাভি স্পষ্টভাবে লিখেন, ‘আল-ফিকহুল আকবার গ্রন্থটি, যা ইমাম আজম লিখেছেন, একটি বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য কিতাব।’ তিনি আল-ফিকহুল আকবারের পাশাপাশি অন্যান্য গ্রন্থের প্রামাণ্যতাও স্বীকার করেছেন।

এভাবে যুগের পর যুগ হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি-সহ সকল ধারার আলেম এসব গ্রন্থকে ইমাম আজম রহ.-এর গ্রন্থ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন, মেনে নিয়েছেন, এগুলোর ব্যাখ্যা লিখেছেন এবং চর্চা করেছেন। সমকালীন যুগের আগে কেউ সামগ্রিকভাবে এসব গ্রন্থ ইমাম আজমের বলে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন—এমন কোনো বক্তব্য অধমের চোখে পড়েনি। আধুনিক যুগে এসে কিছু প্রাচ্যবিদ এসব গ্রন্থকে ইমামের বলে মেনে নিতে সংশয় সৃষ্টি ও প্রকাশ করেছেন এবং কিছু মুসলিম আলেম সেটার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। ফলে এসব গ্রন্থের উপর আপত্তি নিতান্তই অধুনা সৃষ্ট, যার ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

হ্যাঁ, তাদের আগে একদল মানুষ এসব গ্রন্থের প্রামাণ্যতা নাকচ করেছেন, কিন্তু তারা আহলে সুন্নাতের কেউ নন, বরং মুতাযিলা সম্প্রদায়। তদুপরি সেটাও ইলমি দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং ইমামের নামে তাদের নিজস্ব মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার হীন উদ্দেশ্যে তারা এই কাজ করে। বাযযাযি (৮২৭ হি.) লিখেন, ‘কেউ বলতে পারে আবু হানিফার লেখা কোনো গ্রন্থ নেই। আমরা বলব, এটা মুতাযিলাদের দাবি। তারা ইমামকে তাদের তথা মুতাযিলি মাযহাবের অনুসারী দাবি করত। অথচ ইমামের এসব গ্রন্থে, বিশেষত আল-ফিকহুল আকবার এবং আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিমে, মুতাযিলাদের খণ্ডনে এবং আহলে সুন্নাতের আকিদা প্রতিষ্ঠায় একাধিক বক্তব্য রয়েছে। ফলে তাদের এই মিথ্যা দাবি টিকিয়ে রাখতে তারা এসব গ্রন্থ ইমামের বলে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং আবু হানিফা (আস-সগির) বুখারির বলে প্রচার করে। কিন্তু এটা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। কারণ, আমি শামসুল মিল্লাহ কারদারির নিজ হাতের লেখায় এই দুটো কিতাব দেখেছি এবং তিনি তাতে এ দুটোকে ইমাম আজমের কিতাব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অসংখ্য মাশায়েখ এ ব্যাপারে একমত। ’

টিকাঃ
১৮৩. দেখুন: শরহুল আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৩-২৪)।
১৮৪. দেখুন: আল-ফিহরিস্ত (২৫১)।
১৮৫. দেখুন: উসুলুদ্দিন (৩০৮)। তাকদির অধ্যায়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
১৮৬. আত-তাবসির ফিদ-দ্বীন (১৮৪)।
১৮৭. দেখুন: উসুলুল বাযদাবি (৩)।
১৮৮. দেখুন: কাশফুল আসরার শরহুল মানার (১/৭)।
১৮৯. দেখুন: কাশফুল আসরার শরহু উসুলিল বাযদাবি (১/১৭-১৮)।
১৯০. দেখুন: মানাকিব, মক্কি (৩১০-৩১১)।
১৯১. আল-ফাতাওয়া আল-হামাবিয়্যাহ আল-কুবরা (৩১৮)।
১৯২, তাজুত তারাজিম (৩৩১)।
১৯৩. যেমনটা পিছনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, উক্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থটি ইমাম মাতুরিদির নামে প্রচারিত হয়েছে, কিন্তু সেটা সঠিক হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তাতে আশআরিদের বিপক্ষে অনেক খণ্ডন রয়েছে। অথচ মাতুরিদি ও আশআরি দুজন সামসময়িক ছিলেন। দুজন পৃথিবীর দুই প্রান্তে ছিলেন। বোঝা গেল, এটা পরবর্তী সময়ে কারও লেখা। তা ছাড়া, ইমাম মাতুরিদির গ্রন্থতালিকার কোথাও এই ব্যাখ্যাগ্রন্থের কথা পাওয়া যায় না। বিপরীতে উক্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থ আবুল লাইস সমরকন্দির হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
১৯৪. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১০২)।
১৯৫. দেখুন: মানাকিব, বাযযাযি (১২২)। ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন, যাবিদি (২/১৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 চার. এসব গ্রন্থ ইমাম আজমের আকিদার ঐতিহাসিক দলিল

📄 চার. এসব গ্রন্থ ইমাম আজমের আকিদার ঐতিহাসিক দলিল


আমরা যদি তাদের আপত্তির সঙ্গে একমত হয়ে এই গ্রন্থগুলো সরাসরি ইমাম আজম রহ.-এর লেখা নয় বলে মেনে নিই, তবুও এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে, এগুলোতে যেসব আকিদা রয়েছে, সেগুলো সামগ্রিকভাবে ইমাম আজম রহ.-এর আকিদা। অর্থাৎ, হয়তো আমরা বলব, স্বয়ং ইমাম রহ. এসব গ্রন্থ নিজের হাতে লিখেছেন, অথবা বলব, তিনি তাঁর ছাত্রদের ক্লাসে এবং বিভিন্ন মজলিসে এগুলো বলেছেন, লিখিয়েছেন এবং ছাত্ররা কিংবা ছাত্রদের ছাত্ররা পরবর্তীকালে এগুলো সংকলন করেছেন। এই উভয় অবস্থাতেই ফলাফল এক। অর্থাৎ, তাঁর ছাত্ররা কিংবা ছাত্রের ছাত্ররা সংকলন করলেও এগুলোকে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর গ্রন্থ বলা যাবে। কারণ, সে সময়ে রচিত বা সংকলিত অধিকাংশ গ্রন্থের সংকলনের গল্পই এমন। বরং ছাত্ররা সংকলন করার কারণে যদি তাঁর আকিদা বলা না যায়, তবে তো ফিকহের ক্ষেত্রেও ইমাম আজমের ফিকহ এবং হানাফি মাযহাব বলতে কিছু থাকে না। কারণ, তিনি ফিকহ বিষয়েও নিজের হাতে লেখা কোনো গ্রন্থ রেখে যাননি। তাঁর শাগরেদদের লেখা গ্রন্থ এবং তাদের মতামত থেকেই ইমামের মত জানতে পারি আমরা।

উপরন্তু যদি আমরা আক্ষরিক অর্থে তাঁর গ্রন্থ নাও বলতে পারি, তথাপি এগুলোতে বিদ্যমান বিষয়সমূহকে তাঁর আকিদা বলার মাঝে বিন্দুমাত্র সমস্যা নেই। এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য কেউ মতভেদ করেছেন বলে আমার জানা নেই। কারণ, তাওহিদ ও সিফাতের ক্ষেত্রে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি, তাকদিরের ক্ষেত্রে তাঁর মতামত এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমানের সংজ্ঞার্থ, হাকিকত ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইমামের প্রতিষ্ঠিত মাযহাবের বাস্তব ও পুঙ্খানুপুঙ্খ রেকর্ড এসব গ্রন্থ। এগুলোতে এমন কোনো বক্তব্য নেই যেটা ইমাম আজমের আকিদা হিসেবে উম্মাহর কাছে স্বীকৃত নয়। এগুলোতে এমন কোনো বক্তব্য নেই যা পরবর্তী হানাফি ফুকাহা এবং উলামায়ে কেরাম আবু হানিফার মাযহাব হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। হ্যাঁ, কিছু মাসআলাতে তারা ইমামের বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু সেটা ইমামের আকিদা হিসেবে অস্বীকৃতি জানিয়ে নয়, বরং ইমামের বক্তব্য হিসেবে মেনে নেওয়ার পরেই। উপরন্তু এসব গ্রন্থের পারস্পরিক আলোচ্য বিষয়ের মাঝে মিল-মিছিল বেশ বিস্ময়কর ও ইতিবাচক। অর্থাৎ, প্রায় প্রত্যেকটি মাসআলাতে আলোচ্য পাঁচটি গ্রন্থকে আমরা একে অন্যের পরিপুরক দেখি। ফলে এগুলো যে একই ব্যক্তির আকিদা ও আদর্শ সেটা বুঝতে দূরদর্শী মানুষের কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এমনকি আকিদার বাইরে হানাফি মাযহাবের ফিকহি মুসতানাদ গ্রন্থগুলো, ইমাম আজমের দিকে সম্পৃক্ত হাদিসের মাসানিদগুলো—সবগুলোতে বর্ণিত ইমামের বক্তব্য অত্যন্ত কাছাকাছি। একই উৎস থেকে উৎসারিত।

তা ছাড়া, এগুলোর বাইরের আরও একাধিক প্রাচীন সূত্র ইমামের দিকে সামগ্রিকভাবে এক ও অভিন্ন আকিদাই সম্পৃক্ত করে, যেমন ইমাম তহাবি (৩২১ হি.)-এর ‘আকিদাহ তহাবিয়্যাহ’। সায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ উসতাওয়াবি নিশাপুরি (৪৩২ হি.)-এর ‘আল-ইতিকাদ’। এগুলো ইমামের প্রায় দেড়-দুইশো বছর পরে লেখা হলেও উভয় গ্রন্থের বিষয়বস্তু অত্যন্ত কাছাকাছি এবং ইমাম আজমের দিকে নিসবতকৃত উপরের পাঁচটি গ্রন্থের সঙ্গে এগুলোর মৌলিক কোনো সংঘাত তো নেই-ই, উপরন্তু এসব গ্রন্থের মিল-মিছিল দেখলে যে কাউকে বিস্মিত হতে হয়; বরং তহাবিতে বর্ণিত আকিদা এবং ‘আল-ইতিকাদে’ বর্ণিত ইমাম আজমের শাগরেদদের দিকে নিসবতকৃত বক্তব্যগুলো দেখলে যে কারও বুঝে আসবে, ইমামের পাঁচটি গ্রন্থে বর্ণিত আকিদা সামগ্রিকভাবে সকল হানাফি ইমামের আকিদা ছিল। এগুলো হানাফি আলেমদের মজলিসে মজলিসে চর্চা হতো, ধারণ করা হতো। এগুলোর সঙ্গে যদি মুওয়াফফাক ইবনে আহমদ আল-মক্কি (৫৬৮ হি.)-এর ‘মানাকিব’-এর বিস্তারিত ঘটনাগুলো মিলিয়ে পড়া হয়, তবে যে-কেউ উপলব্ধি করবে যে, এসব গ্রন্থে যেসব আকিদা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো প্রকৃতপক্ষেই ইমাম আজম রহ. থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ আকিদা। তাঁর ছাত্ররা বিভিন্ন ভূখণ্ডে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরম্পরায় এসব আকিদা বহন করেছেন, চর্চা করেছেন এবং প্রচার করেছেন। ফলে এগুলোতে বর্ণিত আকিদা ইমাম আজমের কি না সেটা নিয়ে সশংয় প্রকাশ বিলকুল অযৌক্তিক ব্যাপার।

এখানে আরেকটি বিষয় পর্যালোচনার দাবি রাখে। সেটা হলো, ইমাম তহাবির আকিদাগ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে সবাই একমত। খোদ সংশয় প্রকাশকারীরাও ইমাম তহাবির বর্ণিত আকিদাকে ইমাম আজমের আকিদা বলে মানেন। অথচ ইমাম তহাবি তাঁর আকিদার কোনো সনদ উল্লেখ করেননি; তিনি কোত্থেকে ইমাম আজম এবং তাঁর দুই শাগরেদের আকিদা গ্রহণ করেছেন সেটাও স্পষ্ট করেননি; তবুও বিনাবাক্যে তাঁর বর্ণিত বক্তব্যকে ইমাম আজমের আকিদা হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে। অথচ তিনি ইমাম আজমের কয়েক স্তরের পরের শাগরেদ। তাহলে তার পুত্র হাম্মাদ এবং প্রথম স্তরের শাগরেদ আবু মুতি বলখি, আবু মুকাতিল সমরকন্দির বর্ণনা মেনে নিতে এত কষ্ট কেন? এগুলোর সনদকে হাদিসের সনদের মতো নিরীক্ষণ করা হচ্ছে কেন?

মুরতাযা যাবিদি (১২০৫ হি.) লিখেন, “উক্ত পাঁচটি কিতাবের প্রামাণ্যতা নিয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উম্মাহর আলেমগণ এগুলো কবুল করে নিয়েছেন। ইমাম নিজে এগুলো হাম্মাদ, আবু ইউসুফ, আবু মুতি বলখি, আবু মুকাতিল সমরকন্দি প্রমুখ শাগরেদকে লিখিয়েছেন, তারা নিজেরা সেগুলো সংকলন করেছেন। তাদের থেকে পরবর্তী আলেমগণ তথা ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ, মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযি, মুহাম্মাদ ইবনে সামাআহ, নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া, শাদ্দাদ ইবনুল হাকাম প্রমুখ গ্রহণ করেছেন। এভাবে বিশুদ্ধ সনদে সেগুলো ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে [বলা বাহুল্য, এভাবে ইমামে আহলে সুন্নাত আবু জাফর তহাবি পর্যন্তও পৌঁছেছে]। সুতরাং কেউ যদি এসব গ্রন্থ ইমাম আজমের দিকে সম্পৃক্ত করে, সেটা যেমন সঠিক; কারণ এসব আকিদা তাঁরই, কেউ যদি এগুলোর প্রথম স্তরের সংকলক কিংবা আরও পরবর্তী কারও দিকে সম্পৃক্ত করে, সেটাও সঠিক; কারণ, তারা এগুলো সংকলন করেছেন। মোটকথা, পরবর্তী উম্মাহ এগুলো ইমাম আজমের আকিদা হিসেবে মেনে নিয়েছে। এ কারণে ফখরুল ইসলাম বাযদাবির ‘উসুল’ এবং এটার বিভিন্ন ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যথা—হুসামুদ্দিন সিগনাকির ‘আল-কাফি’, কিওয়ামুদ্দিন (আমির কাতিব) ইতকানির ‘আশ-শামেল’, জালালুদ্দিন কারলানির ‘আশ-শাফি’, কিওয়ামুদ্দিন সাক্কাকির ‘বায়ানুল উসুল’, আলাউদ্দিন বুখারির ‘কাশফুল আসরার’, আকমালুদ্দিন বাবিরতির ‘আত-তাকরির’ ইত্যাদি সকল গ্রন্থে এসব পুস্তিকার আলোচনা এসেছে। হামাদানির ‘খিযানাতুল আকমাল’-এর শেষের দিকে ‘আল-ওয়াসিয়্যাহ’ পুস্তিকা পুরোটাই উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম নাতেফি ‘আল-আজনাস ফি ফুরুয়িল ফিকহিল হানাফি’ গ্রন্থে এটা উল্লেখ করেছেন। ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থের অনেক মাসআলা নাজমুদ্দিন নাসাফি, খাওয়ারযেমি প্রমুখ কৃত ইমামের ‘মানাকিব’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। আল-ফিকহুল আকবারের কিছু মাসআলা ‘আল-মুহিতুল বুরহানি’, শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনে ইলিয়াসের ‘ফাতাওয়া’, ইবনুল হুমামের ‘আল-মুসায়ারাহ’-তে এসেছে। আল-ফিকহুল আবসাতের কিছু মাসআলা আবুল মুইন নাসাফি তার ‘আত-তাবসিরাহ’, নুরুদ্দিন সাবুনি তাঁর ‘আল-কিফায়াহ’, হাফিজুদ্দিন নাসাফি তাঁর ‘আল-ইতিমাদ’, আবুল আলা সায়েদ তাঁর ‘আল-ইতিকাদ’, আবু শুজা নাসেরি তাঁর তহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যা ‘আন-নূরুল লামি’ ওয়াল-বুরহানুস সাতি’, আবুল মাহাসিন কওনভি তাঁর তহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যাতে উল্লেখ করেছেন। আতা ইবনে আলি আল-জুযজানি এর একটি মূল্যবান ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন (শরহুল ফিকহিল আকবার নামে; মূল ব্যাখ্যা আবসাতের)। .... আকমালুদ্দিন বাবিরতি আল-ওয়াসিয়্যাহর ব্যাখ্যা লিখেছেন। এভাবে উক্ত পাঁচটি পুস্তিকার বিভিন্ন অংশ ইমামদের প্রায় ত্রিশটি কিতাবে আলোচিত হয়েছে। উম্মাহর কাছে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।”

টিকাঃ
১৯৬. দেখুন: ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন (২/১৮-১৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00