📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 শিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম

📄 শিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম


অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও ইমাম আজম রহ. সংগ্রাম করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে মুনাযারা করেছেন। বিশেষত কুফায় বসবাসকারী শিয়া নেতা মুহাম্মাদ ইবনে আলি আল-বাজালির সঙ্গে তিনি একাধিকবার বিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং তাকে পরাস্ত করে আহলে সুন্নাতের আকিদার বিজয়-নিশান উড়িয়েছেন।

শানে সাহাবার ইজ্জত-আবরু রক্ষার ক্ষেত্রেও রাফেযিদের বিরুদ্ধে ইমামের সংগ্রাম প্রসিদ্ধ। ইয়াহইয়া ইবনে নসর ইবনে হাজেব মারওয়াযি বলেন, ‘ইমাম আজম রাসুলুল্লাহর সাহাবাদের প্রতি সর্বাপেক্ষা শ্রদ্ধাশীল (মুআদ্দাব) ছিলেন। তাদের ব্যাপারে সর্বোত্তম কথা বলতেন।’ ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাহাবিবিদ্বেষী রাফেযিদের তিনি অপছন্দ করতেন। তাদের সাহাবাবিদ্বেষী মতাদর্শকে ঘৃণা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক থেকে বর্ণিত, নুহ ইবনে আবি মারইয়াম ইমামকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করব? তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক ইনসাফগার সত্যে অবিচল (আদল) ব্যক্তির কাছ থেকে গ্রহণ করো। তবে রাফেযিদের কাছ থেকে গ্রহণ করো না। কেননা, তাদের মাযহাবের ভিত্তিই হচ্ছে নবিজির সাহাবাদের গোমরাহ বলা। আবু বকর ও উমরকে শ্রেষ্ঠ বলো। আলি ও উসমানকে ভালোবাসো। তাদের যে ভালো না বাসে, তার থেকে হাদিস গ্রহণ করো না।’

ইমাম রাফেযিদের খণ্ডনে আরও বলেন, ‘খাদিজাতুল কুবরার পরে আয়েশা রাযি. জগতের নারীদের ভিতরে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি মুমিনদের মাতা (উম্মুল মুমিনিন)। ব্যভিচার থেকে পূত-পবিত্র। রাফেযিদের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি তাকে কেউ ব্যভিচারিণী বলে, তবে সে নিজে ব্যভিচারের ফসল (হারামজাদা)।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সাহাবা-সংক্রান্ত আকিদা অধ্যায়ে আসবে, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
৮১. দেখুন: মিনহাজুস সুন্নাহ (৮/১৯৮)।
৮২. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৫৭)।
৮৩. প্রাগুক্ত (১৫৮)।
৮৪. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৬১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মুরজিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম

📄 মুরজিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম


অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো ভ্রান্ত মুরজিয়াদের বিরুদ্ধেও ইমাম সংগ্রাম করেছেন। মুনাযারা ও বিতর্ক করে তাদের ভ্রান্তি উন্মোচিত করেছেন। বিভিন্ন সময় তাদের ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন করেছেন। ঈমানের প্রশ্নে জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় মুরজিয়া। ফলে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মূলত মুরজিয়াদের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম। এ ছাড়াও ইমাম আজম তাঁর আকিদাবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে ঈমান ও ইরজা, ঈমান ও আমল ইত্যাদি সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে মুরজিয়াদের নানান ধারার সকল ভ্রান্তি খণ্ডনপূর্বক এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের বিশুদ্ধ আকিদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ইমাম আজম রহ. একদিন কুফার মসজিদে ছিলেন। তখন একব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, আপনি কি মুরজিয়া? ইমাম আবু হানিফা বললেন, “আমি আল্লাহর ‘রাজি’ (আশাবাদী)। আল্লাহ তায়ালা কুরআনেও জানিয়েছেন তাঁর বান্দাদের মাঝে কিছু ‘মুরজাআ’ (যাদের পরিণতি স্থগিত/আল্লাহর কাছে সমর্পিত) আছে। আল্লাহ বলেন, وَءَاخَرُونَ مُرْجَوْنَ لِأَمْرِ اللَّهِ إِمَّا يُعَذِّبُهُمْ وَإِمَّا يَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ , ‘আল্লাহর আদেশের প্রতীক্ষায় অন্য কিছু লোকের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকল। তিনি তাদের শাস্তি দেবেন অথবা ক্ষমা করবেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' [তাওবা : ১০৬] আল্লাহ চাইলে তাদের গুনাহের কারণে তাদের শাস্তি দিতে পারেন। আবার চাইলে নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করতে পারেন। সুতরাং আমি যদি আল্লাহর গুনাহগার বান্দাদের পরিণতি তাদের সৃষ্টিকর্তার হাতে ‘ইরজা করি’ (সঁপে দিই), তবে আমাকে নিষেধ করো না (মুরজিয়া বলো না)। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তাদের ক্ষমার ঘোষণা করেছেন, وَمَا أَصَبَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَن كَثِيرٍ , অর্থ : ‘তোমাদের উপর যেসব বিপদাপদ পতিত হয়, সেগুলো তোমাদের কর্মের ফল। উপরন্তু তিনি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন'।” [শুরা : ৩০]

আগন্তুক : খুনি ও ব্যভিচারীর ব্যাপারে আপনার মত কী? আল্লাহ কি তাকে জাহান্নামের শাস্তি দেবেন না?
ইমাম : যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে মুখে স্বীকৃতি দেয়, অন্তরে বিশ্বাস করে, পরকাল, পুনরুত্থান এবং গায়েবের প্রতি ঈমান রাখে, তবে তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে—এমন কথা বৈধ নয়। আল্লাহ চাইলে তাদের অপরাধ পরিমাণ শাস্তি দিতে পারেন; চাইলে একেবারেই শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দিতে পারেন।

আগন্তুক : চিরস্থায়ী শাস্তি দিতে কী সমস্যা?
ইমাম : কারণ, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যার অন্তরে এক দানা পরিমাণ ঈমান রয়েছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে।' রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেছেন, 'আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ার পরে আমার শাফায়াতের মাধ্যমে একদল মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।'

টিকাঃ
৮৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৪৮-১৪৯)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 দাহরিয়্যাহদের বিরুদ্ধে ইমাম

📄 দাহরিয়্যাহদের বিরুদ্ধে ইমাম


আকিদাগত বিভিন্ন বিচ্যুতি এবং বিভ্রান্ত ফিরকার বিরুদ্ধে ইমামের অব্যাহত সংগ্রামের কারণে একাধিকবার তাঁর জীবন সংকটের মাঝে পতিত হয়েছে। দাহরিয়্যাহ (বস্তুবাদী নাস্তিক) সম্প্রদায়কে তিনি কঠোরভাবে খণ্ডন করতেন; অথচ তারা সে সময় অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। তাদের সংখ্যাও অনেক বেশি ছিল। কিন্তু ইমাম তাদের শক্তি ও সংখ্যাধিক্যকে পরোয়া করতেন না। বিশুদ্ধ আকিদা প্রচার করতেন। তাদের বিভ্রান্তির মুখোশ উন্মোচন করতেন। ফলে তারা ইমামকে হত্যার সুযোগ খুঁজত। একাধিকবার তারা ইমামের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করেছে এমন ঘটনাও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে প্রমাণিত।

মক্কি বর্ণনা করেন, একদিন ইমাম তার মসজিদে একা ছিলেন। তখন একদল দাহরিয়্যিন তার উপর তরবারি ও ছুরি নিয়ে আক্রমণ করে। তারা তাকে হত্যার উপক্রম করে। তখন ইমাম তাদের বলেন, 'একটু সবর করো! আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিয়ে যা মন চায় করো।' তারা বলল, কী প্রশ্ন? তিনি বললেন, 'সে ব্যক্তির ব্যাপারে তোমাদের কী বক্তব্য যে বলে, আমি তরঙ্গোবেল সমুদ্রে একটি মালবোঝাই জাহাজ দেখেছি যেটা সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ এবং ঝোড়ো হাওয়ার মাঝেও ডানেবামে না গিয়ে সোজা ধীরস্থিরভাবে চলছে, অথচ তাতে কোনো মাঝিমাল্লা নেই, পাল-মাস্তুল নেই। এই কথা কি বিশ্বাসযোগ্য?' তারা বলল, কখনো নয়। এটা কোনো যৌক্তিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক কথা নয়। ইমাম বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! মাঝিমাল্লাবিহীন একটি নৌকা যদি সমুদ্রে সোজাভাবে চলতে না পারে, তবে এই বিশাল পৃথিবী, পৃথিবীতে বিদ্যমান এত রং ও রূপ, এত সৃষ্টি ও বৈচিত্র্য—এগুলো কোনো সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এমনিতেই অস্তিত্বে চলে এসেছে? কোনো রক্ষাকর্তা ছাড়া এমনিতেই বিদ্যমান রয়েছে?' ইমামের কথা হামলাকারীদের মনে দারুণ প্রভাব ফেলল। সকলে কাঁদতে কাঁদতে ইমামকে বলল, আপনি সত্য বলেছেন। অতঃপর তারা অস্ত্র ফেলে দিয়ে ইমামের হাতে তাদের গোমরাহি থেকে তাওবা করে ঈমানে ফিরে এলো।

টিকাঃ
৮৬. মানাকিব, মক্কি (১৫১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অভ্যন্তরীণ লড়াই (অভিযোগ-অপবাদ)

📄 অভ্যন্তরীণ লড়াই (অভিযোগ-অপবাদ)


ভ্রান্ত ফিরকার বিরুদ্ধে অব্যাহত সংগ্রামের পাশাপাশি ইমামকে অভ্যন্তরীণ সংকটও মোকাবিলা করতে হয়েছে সমানভাবে। কখনো বিভ্রান্ত ফিরকার অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার ফলে, আবার কখনো ভুল বোঝাবুঝির ফলে, কখনো মতাদর্শিক পার্থক্যের টানাপোড়েনে, আবার কখনো-বা স্রেফ হিংসার বশবর্তী হয়ে খোদ আহলে সুন্নাতের অনুসারী বিভিন্ন ব্যক্তি ইমামের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়েছেন, তাঁর শক্ত সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ—ইমাম আবু হানিফা কুরআনকে 'মাখলুক' বলেন। আর যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলে, সে কাফের। ফলে তারা এ যুক্তিতে ইমাম আজমকে 'মুশরিক' আখ্যা দেন। অথচ ইমাম আজমের উপর এটা সর্বৈব মিথ্যাচার। তিনি জীবনের কোনো এক মুহূর্তেও কুরআনকে মাখলুক বলেননি। তাঁর কোনো শাগরেদ বা শাগরেদের শাগরেদও কুরআনকে মাখলুক বলেননি। বরং উলটো জাহম ইবন সাফওয়ান এবং জাহমিয়্যাহদের এই বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে ইমাম আজম এবং তাঁর শাগরেদরা নিরন্তর লড়াই চালিয়েছেন। অথচ শেষে তাদের ঘাড়েই জাহমিয়্যাহদের এই অপবাদ চাপিয়ে মুশরিক বলা হয়েছে! 'জাহমি অবস্থায় তিনি মারা গেছেন' বলে অপবাদ দেওয়া হয়েছে! নাউযুবিল্লাহ! কুরআন-সংক্রান্ত আলোচনায় এর বাস্তবতা বিস্তারিত দেখব, ইনশাআল্লাহ।

আরেক দল তাকে মুরজিয়া আখ্যা দিয়েছে। তারা দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণি হলো ভ্রান্ত খারেজি, মুতাযিলা ও মুরজিয়া সম্প্রদায়। গাসসানিয়্যাহ মুরজিয়ারা ইমামকে মুরজিয়া হিসেবে প্রচার করত ইমামের নামের মাধ্যমে তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ সহজে মানুষের মাঝে বিকানোর উদ্দেশ্যে। খারেজি ও মুতাযিলারা তাকে মুরজিয়া বলে অপ্রপচার চালাত তিনি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন বলে। একদিকে ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের অপপ্রচার, অপরদিকে ইমাম আজমের কিছু বক্তব্য ভুল বুঝে স্বয়ং আহলে সুন্নাতের ইমামগণ নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হন। তারা ইমামকে মুরজিয়া আখ্যা দিতে থাকেন। কারণ, ইমাম তাত্ত্বিকভাবে আমলকে ঈমানের সংজ্ঞার্থের অন্তর্ভুক্ত করতেন না। কবিরা গুনাহকারীর পরিণাম আখেরাতে আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিতেন। এটাকে 'ইরজা' তথা আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা বলতেন। এ থেকেই তারা তাঁর নাম দিয়েছেন মুরজিয়া। অথচ ভ্রান্ত মুরজিয়া আর ইমাম আজমের 'ইরজা'র মাঝে আকাশপাতাল তফাত। ভ্রান্ত মুরজিয়ারা মনে করে ঈমানের সঙ্গে আমলের কোনো সম্পর্কই নেই। সুতরাং কেউ ঈমান আনার পরে যত অন্যায়-অপরাধ করুক, ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না। বিপরীতে ইমাম আজম রহ. মনে করতেন আমল ঈমানের জন্য আবশ্যক ফলাফল—গুনাহ ঈমানের ক্ষতি করে। গুনাহগারকে আল্লাহ চাইলে পরকালে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে পারেন। এটা সকল আহলে সুন্নাতের আকিদা। উপরন্তু ইমাম আজীবন মুরজিয়াদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, তাদের ভ্রান্তি উন্মোচিত করেছেন, যেমনটা পিছনে উদাহরণ দেখানো হয়েছে, সামনেও এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা আসবে।

এতকিছুর পরও ইমামের উপর আক্রমণ বন্ধ হয়নি; বরং মুরজিয়া অপবাদ ইমামকে রীতিমতো বিমর্ষ করে তোলে। ইমামের অনেক কাছের মানুষও তাঁর ব্যাপারে সন্দেহ করতে থাকেন। ফলে তাঁকে চিঠি লিখে স্পষ্ট করতে হয় যে, তিনি মুরজিয়া নন। উসমান আল-বাত্তির কাছে ইমামের 'আর-রিসালা' চিঠির মূল প্রেক্ষাপট এই অভিযোগেরই খণ্ডন। সেখানে ইমাম বলেন, “আপনার কাছে নাকি সংবাদ পৌঁছেছে যে, আমি মুরজিয়া। কুরআন এবং রাসুলুল্লাহর সুন্নাহর বাইরে মুক্তির কোনো পথ নেই। এর বাইরে যা-কিছু আছে, সব ভ্রষ্টতা ও বিদআত। তাই আমার বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করুন। মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে সতর্ক থাকুন। আমি আল্লাহর কাছে আমার নিজের জন্য এবং আপনার জন্য রহমত ও তৌফিক কামনা করছি। ... সুতরাং আমার বক্তব্য হলো, আহলে কিবলার সকলে মুমিন। ফরয ইবাদতের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতির কারণে আমি কাউকে ঈমান থেকে বের করে দিই না। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সঙ্গে সকল ফরয বিধান মেনে চলবে, সে আমাদের কাছে 'জান্নাতের অধিকারী' বিবেচিত হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমান ও আমল দুটোই ছেড়ে দেবে, সে জাহান্নামের অধিবাসী কাফের বিবেচিত হবে। আর যে ঈমানকে ঠিক রেখে ফরযের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতি করবে, সে আমাদের কাছে গুনাহগার মুমিন গণ্য হবে। পরকালে সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে—চাইলে তিনি শাস্তি দেবেন, চাইলে বিনা শাস্তিতে ক্ষমা করে দেবেন।” ...চিঠির শেষে ইমাম তাঁর মুরজিয়া হওয়াকে গোমরাহ ফিরকাগুলোর পক্ষ থেকে অপবাদ সাব্যস্ত করে বলেন, 'এক সম্প্রদায় ইনসাফের সঙ্গে কথা বলেছে। কিন্তু বিদআতিরা তাদের মুরজিয়া আখ্যা দিয়েছে; অথচ তারা মুরজিয়া নয়, বরং তারা ইনসাফের পতাকাবাহী আহলে সুন্নাত। বিদ্বেষবশত সেসব সম্প্রদায় তাদের এই অপবাদ দিয়েছে।'

এর পরও তারা থামেননি। ফলে আজও একশ্রেণির মানুষ ইমাম ও তাঁর শাগরেদদের 'মুরজিয়াতুল ফুকাহা' বলার মাঝে তৃপ্তি খোঁজেন। আকিদার ক্ষেত্রে ইমামের উচ্চাবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন। সহজে গ্রহণ করতে পারেননা। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা আমরা 'ঈমান ও ইরজা' অধ্যায়ে করব, ইনশাআল্লাহ।

অন্য এক দল ইমাম আজমকে পরকালে 'আল্লাহর দিদার অস্বীকারকারী' আখ্যা দেয়; অথচ ইমাম তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর দিদার সংঘটনের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ফলে এটাও যে ভিত্তিহীন অপপ্রচার ছিল, সেটা স্পষ্ট। কিন্তু তাতেও প্রোপাগান্ডা থামেনি। শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারেও তাকে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে চিঠি লিখতে হয়েছে। যেমন— জনৈক ব্যক্তির কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে ইমাম বলেন, “তুমি আমার নামে প্রচার করেছ যে, আমি নাকি জান্নাতবাসীদের জন্য আল্লাহর দিদারে বিশ্বাস করি না! সুবহানাল্লাহ! এটা কী করে সম্ভব হতে পারে? আমি কী করে এমন কথা বলতে পারি? অথচ আল্লাহ বলেছেন, وَجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ • إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٌ অর্থ : সেদিন কতক চেহারা হবে আলোকোজ্জ্বল; তাকিয়ে থাকবে তাদের পালনকর্তার দিকে।' [কিয়ামাহ: ২২-২৩] ফলে আমি যদি বলি আল্লাহকে দেখা যাবে না, সেটা তো কুরআনকে অস্বীকার করা হবে।”

এখানেই শেষ নয়। ইমাম থেকে জান্নাতে আল্লাহর দিদার-সম্পর্কিত সুস্পষ্ট বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও ইমাম আবু হানিফার অনুসারী দাবিদার একদল জাহমিয়্যাহ সেগুলোর অর্থ বিকৃত করেছে। উদাহরণস্বরূপ: কারও দাবি, যদিও ইমাম বলেছেন পরকালে আল্লাহকে দেখা যাবে, কিন্তু এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর কাজ ও নিদর্শনাবলি দেখা। তাঁর সত্তাকে দেখা নয়। অথচ এটা ইমামের উপর অপবাদ, যা আমরা সামনে প্রমাণ-সহ দেখব, ইনশাআল্লাহ।

আরেক দল তাঁর নামে অভিযোগ করেছে, তিনি নাকি জান্নাত ও জাহান্নামকে ধ্বংসশীল বলতেন। এটাও ইমামের নামে সুস্পষ্ট মিথ্যাচার। তিনি কোনো দিন জান্নাত-জাহান্নামকে ধ্বংসশীল বলেননি। তাঁর আকিদার কিতাবগুলো এর সাক্ষী। বরং তিনি বলেছেন, 'জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্ট। বর্তমানে বিদ্যমান। কখনো ধ্বংস হবে না। জান্নাতের হর কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। আল্লাহর শাস্তি কখনো শেষ হবে না। শেষ হবে না তাঁর প্রতিদান।' ইমাম তাঁর ওসিয়তে বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য। এ দুটি সৃষ্টি, বর্তমানে বিদ্যমান। এগুলো কিংবা এগুলোর অধিবাসীরা কখনো ধ্বংস হবে না। আল্লাহ তায়ালা এ দুটো মুমিনদের পুরস্কার এবং কাফেরদের শাস্তির জন্য সৃষ্টি করেছেন।'

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, একটি বিশাল পুণ্যবানের দলও উপরে বর্ণিত জুলুমবাজদের সঙ্গে যোগ দেন। ফলে তারা মানবিক দুর্বলতা এবং স্রেফ মতাদর্শিক সংকীর্ণতার কারণে ইমামের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে যান। উম্মাহর কাছে ইমামের অবস্থান, গ্রহণযোগ্যতা, শুহরাত ও কবুলিয়্যাত ইত্যাদি তাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা ইমামের নামে অযৌক্তিক ও অনৈতিক প্রোপাগান্ডা চালান। তাঁর অন্যায় সমালোচনা করেন। তাদের কেউ কেউ ইমামকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি আখ্যা দেন! কেউ আবার বলেন, ইসলামে তার চেয়ে অলক্ষুনে ও ক্ষতিকর কারও জন্ম হয়নি! খারেজিদের বিরুদ্ধে ইমামের অব্যাহত সংগ্রাম, খারেজি কর্তৃক তাকে তাওবা পড়ানো এবং ইবনে হুবাইরার পক্ষ থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাবকে নাকচ করার ফলে ইবনে হুবাইরার জুলুমের ঘটনাকে তারা 'কুফর থেকে তাওবা করানো' বলে প্রকাশ করেন। বরং একজন আরও জঘন্যভাবে বলেন, ছাগলের মতো তাঁর দাড়ি ধরে মানুষের মজলিসে মজলিসে ঘোরানো হতো আর তাওবা করানো হতো! একদল লোক তাঁর মৃত্যুতে উচ্ছ্বসিত স্বরে 'আলহামদুলিল্লাহ' পড়েন! বিশ্রী ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করেন! 'এক জাহমি মারা গেছে' বলে উল্লসিত হন। বরং তাদের কেউ কেউ বিদ্রুপ করে তাঁর নাম বিকৃত করে 'আবু হানিফা'র বদলে 'আবু জিফাহ' [শবের বাপ] বলে ডাকতেন!

এগুলো কোন শরিয়তে বৈধ? অথচ তাদের কেউ কেউ আহলে সুন্নাতের বড় আলেম ছিলেন! অবশ্য তারা না চিনলেও অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় ইমাম তাঁকে চিনেছিলেন। ইমাম শুবা ইবনুল হাজ্জাজের কাছে যখন ইমাম আজমের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছায়, তিনি দোয়া পড়ার পরে বলেন, 'কুফার ইলমের প্রদীপ নিভে গেল। তাঁর মতো আর কাউকে তারা পাবে না।' বরং সাধারণ মানুষও তাকে চিনেছিল। ফলে তাঁর জানাযায় এত অধিক সংখ্যক মানুষের সমাগম হয়েছিল, যা কারও পক্ষে গণনা সম্ভব ছিল না। অত্যধিক মানুষ হওয়ার কারণে ছয়বার তাঁর জানাযা আদায় করা হয়। অত্যধিক ভিড়ের কারণে দাফনের কাজ বিলম্বিত হয়। বরং দাফনের পরও বিশ দিন পর্যন্ত মানুষ তাঁর কবরের কাছে এসে জানাযার নামায আদায় করে।

বস্তুত ইমামের প্রতিপক্ষের এসব বক্তব্যের পক্ষে তাদের কাছে যৌক্তিক ও শক্তিশালী কোনো দলিল কিংবা কারণ ছিল না। স্রেফ অপপ্রচার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া এগুলো গ্রহণ করেছেন, আবার অনেক সময় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ত্রুটির শিকার হয়েছেন, কখনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা তথা হিংসার কাছে নতিস্বীকার করে এসব বক্তব্য দিয়েছেন। নতুবা তারা যদি ইখলাস ও ইহতিমামের সঙ্গে যাচাই করে দেখতেন, তবে বুঝতেন তাদের আকিদা ও মূলনীতির সঙ্গে ইমাম আজমের আকিদা ও মূলনীতির মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। তারা তাঁর ব্যাপারে যা বলেছেন, ভুল বলেছেন। ন্যায়নিষ্ঠ মুহাক্কিক আল্লামা ইবনে আবদিল বার লিখেন, 'ইমাম আজমকে মানুষ হিংসা করত। তাঁর ব্যাপারে মিথ্যাচার করত। তাঁর নামে এমন অনেক কথা বলত, যা তিনি কখনো বলেননি। ' বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ ও আহমদ ইবনে হাম্বলসহ অসংখ্য মুহাদ্দিসের শায়খ ও উস্তায ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈনও এই তিক্ত বাস্তবতা স্বীকার করে তুলনামূলক নম্রভাবে বলেন, 'আমাদের লোকজন (তথা মুহাদ্দিসগণ) আবু হানিফার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছে।' সুফিয়ান সাওরিও সেটা বিনয়বশত স্বীকার করেছেন। সাইমারি বর্ণনা করেন—যখনই সাওরিকে কোনো সূক্ষ্ম মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হতো তিনি বলতেন-'এ ব্যাপারে একজন মানুষের চেয়ে আর কেউ ভালো বলতে পারবে না, অথচ আমরা তাকে হিংসা করেছি।' অতঃপর ইমাম আজমের শাগরেদদের জিজ্ঞাসা করতেন-এ ব্যাপারে আপনাদের শাইখের বক্তব্য কী; এবং তিনি সে অনুযায়ী ফাতাওয়া দিতেন।

টিকাঃ
৮৭. দেখুন : আল-ইবানাহ আন উসুলিদ দিয়ানাহ, আবুল হাসান আশআরি (২৯)। খালকু আফআলিল ইবাদ, মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল বুখারি (৭)। আত তারিখুল কাবির, বুখারি (৪/১২৭)। তারিখে বাগদাদ, আবু বকর খতিবে বাগদাদি (১৫/৫১৮)।
৮৮. দেখুন: তারিখে বাগদাদ (১৫/৫১৩)।
৮৯. আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, আবদুল করিম শাহরাস্তানি (১/১৪১)।
৯০. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৩)।
৯১. রিসালাতু আবি হানিফা ইলা উসমান আল-বাত্তি (৩৪-৩৮)।
৯২. কালায়িদু উকুদিদ দুরার, আবুল কাসেম আল-ইয়ামানি (৫৯)।
৯৩. দেখুন: নাকজুদ দারেমি আল-বিশর আল-মারিসি (১/১৯৩)।
৯৪. তারিখে বাগদাদ (১৫/৫৩১)।
৯৫. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
৯৬. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৪-৫৬)।
৯৭. ফাযায়িলু আবি হানিফা (৬৭, ৭৫)।
৯৮. দেখুন: তারিখে বাগদাদ (১৫/৫১৩, ৫২৪, ৫৪৮, ৫০৬)। আস-সুন্নাহ, আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ (১৩৮-১৮৬)।
৯৯. আখবারু আবি হানিফা, সাইমারি (৯০)।
১০০. দেখুন: আল-খাইরাতুল হিসান, হাইতামি (১৫৪)।
১০১. দেখুন : কাশফুল আসারিশ শরিফাহ, হারেসি (১/৩৩৭-৩৯)। ইবনে আবিল আওয়াম তাঁর জীবনীগ্রন্থে 'হিংসা'র ঘটনাগুলো নিয়ে আলাদা একটা অধ্যায় তৈরি করেছেন। দেখুন: ফাযায়িলু আবি হানিফা (৭৬)।
১০২. জামেউ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাযলিহি (১০৮০)।
১০৩. দেখুন: প্রাগুক্ত (১০৮১)।
১০৪. দেখুন: আখবারু আবি হানিফা (৬৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00