📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মুতারিলাদের বিরুদ্ধে ইমাম

📄 মুতারিলাদের বিরুদ্ধে ইমাম


মুতাযিলাদের বিভিন্ন সংশয় ও বিভ্রান্তি নিরসনেও ইমামের ভূমিকা ছিল সরব। তাদের সঙ্গে তিনি মুনাযারা করতেন, তাদের খণ্ডন করতেন। একবার মুতাযিলা ফিরকার প্রতিষ্ঠাতা আমর ইবনে উবাইদ ইমাম আজম রহ.-এর কাছে এসে প্রশ্ন করল :

আমর : মানুষের কর্মের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
ইমাম : আল্লাহর সৃষ্টি, বান্দার কামাই।
আমর : তাহলে বান্দা যা করে না, আল্লাহ সেটা সৃষ্টি করেন না?
ইমাম : এভাবে বলা যাবে না; বরং এভাবে বলতে হবে—আল্লাহ সৃষ্টি করেন, বান্দা কর্ম করে। কারণ, আল্লাহ মানুষের কর্মেরও সৃষ্টিকর্তা।
আমর : এটা তো যৌক্তিক কথা হলো না।
ইমাম : বরং এটাই যৌক্তিক। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির মৃত্যুদানকে কখনো নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন, তিনি বলেন, ﴿اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا ﴾ অর্থ : ‘আল্লাহই প্রাণ হরণ করেন জীবসমূহের তাদের মৃত্যুর সময়।’ [যুমার : ৪২] কখনো একজন মৃত্যুর ফেরেশতার দিকে সম্পৃক্ত করেছেন : ﴿ قُلْ يَتَوَفَّكُمْ ﴾ مَلَكُ الْمَوْতِ الَّذِي وُكَّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ تُرْجَعُوْনَ অর্থ: ‘বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে।’ [সাজদা : ১১] আবার কখনো একাধিক ফেরেশতার দিকে সম্পৃক্ত করেছেন: ﴿ وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ، وَيُرْسِلُ عَلَيْكُمْ حَفَظَةً حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْত تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ ) তিনি স্বীয় বান্দাদের উপর পরাক্রমশালী, আর তিনিই তোমাদের জন্য রক্ষক প্রেরণ করেন। অবশেষে যখন তোমাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন আমার প্রেরিতরা তার মৃত্যু ঘটায়, আর তারা কোনো ত্রুটি করে না।’ [আনআম: ৬১] এই সম্পৃক্ততা দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে। একইভাবে আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে বলেন, ﴿ فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى) হত্যা করোনি, আল্লাহই তাদের হত্যা করেছেন। (হে রাসুল) আপনি যখন নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি, আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন।’ [আনফাল : ১৭] এখানেও আল্লাহ তায়ালা হত্যাকে কখনো নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। এটা সৃষ্টি হিসেবে। কিন্তু মূল কাজ মানুষই করেছে। একইভাবে নিক্ষেপটা সৃষ্টি হিসেবে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। নতুবা এটা করেছেন রাসুলুল্লাহ নিজেই। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা নেই। সুতরাং যে আল্লাহর গুণকে সৃষ্টির উপর প্রয়োগ করল, সে যেন আল্লাহর সঙ্গে শিরক করল! পৃথিবীতে অসংখ্য উপাস্য বানাল!

ইমামের এ কথা শুনে আমর নীরবে উঠে চলে গেল।

মুতাযিলাদের বিভিন্ন কুতর্কের ব্যাপারে ইমাম ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। তাকে ‘জিসম’ (দেহ) ও ‘আরাজ’ (অমৌল; রূপ-রং) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘আমর ইবনে উবাইদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। সে মুসলমানদের উপর এটা নিয়ে বিতর্কের দরজা উন্মুক্ত করেছে।’

নুহ আল-জামি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হানিফাকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘জিসম’, ‘আরাজ’ ইত্যাদি নিয়ে মানুষ যেসব নতুন কথা শুরু করেছে, সে ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী? তিনি বললেন, “এগুলো দার্শনিকদের কথা। ‘আসার’ তথা সুন্নাত ও সালাফের অনুসরণ করো। প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, সেগুলো বিদআত।”

টিকাঃ
৭৮. তালখিসুল আদিল্লাহ (৬৬৫-৬৬৬)।
৭৯. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/২৬১-২৬২)। শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৩৪-৩৫)।
৮০. যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি (৫/২০৭)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 শিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম

📄 শিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম


অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও ইমাম আজম রহ. সংগ্রাম করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে মুনাযারা করেছেন। বিশেষত কুফায় বসবাসকারী শিয়া নেতা মুহাম্মাদ ইবনে আলি আল-বাজালির সঙ্গে তিনি একাধিকবার বিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং তাকে পরাস্ত করে আহলে সুন্নাতের আকিদার বিজয়-নিশান উড়িয়েছেন।

শানে সাহাবার ইজ্জত-আবরু রক্ষার ক্ষেত্রেও রাফেযিদের বিরুদ্ধে ইমামের সংগ্রাম প্রসিদ্ধ। ইয়াহইয়া ইবনে নসর ইবনে হাজেব মারওয়াযি বলেন, ‘ইমাম আজম রাসুলুল্লাহর সাহাবাদের প্রতি সর্বাপেক্ষা শ্রদ্ধাশীল (মুআদ্দাব) ছিলেন। তাদের ব্যাপারে সর্বোত্তম কথা বলতেন।’ ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাহাবিবিদ্বেষী রাফেযিদের তিনি অপছন্দ করতেন। তাদের সাহাবাবিদ্বেষী মতাদর্শকে ঘৃণা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক থেকে বর্ণিত, নুহ ইবনে আবি মারইয়াম ইমামকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করব? তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক ইনসাফগার সত্যে অবিচল (আদল) ব্যক্তির কাছ থেকে গ্রহণ করো। তবে রাফেযিদের কাছ থেকে গ্রহণ করো না। কেননা, তাদের মাযহাবের ভিত্তিই হচ্ছে নবিজির সাহাবাদের গোমরাহ বলা। আবু বকর ও উমরকে শ্রেষ্ঠ বলো। আলি ও উসমানকে ভালোবাসো। তাদের যে ভালো না বাসে, তার থেকে হাদিস গ্রহণ করো না।’

ইমাম রাফেযিদের খণ্ডনে আরও বলেন, ‘খাদিজাতুল কুবরার পরে আয়েশা রাযি. জগতের নারীদের ভিতরে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি মুমিনদের মাতা (উম্মুল মুমিনিন)। ব্যভিচার থেকে পূত-পবিত্র। রাফেযিদের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি তাকে কেউ ব্যভিচারিণী বলে, তবে সে নিজে ব্যভিচারের ফসল (হারামজাদা)।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সাহাবা-সংক্রান্ত আকিদা অধ্যায়ে আসবে, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
৮১. দেখুন: মিনহাজুস সুন্নাহ (৮/১৯৮)।
৮২. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৫৭)।
৮৩. প্রাগুক্ত (১৫৮)।
৮৪. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৬১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মুরজিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম

📄 মুরজিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম


অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো ভ্রান্ত মুরজিয়াদের বিরুদ্ধেও ইমাম সংগ্রাম করেছেন। মুনাযারা ও বিতর্ক করে তাদের ভ্রান্তি উন্মোচিত করেছেন। বিভিন্ন সময় তাদের ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন করেছেন। ঈমানের প্রশ্নে জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় মুরজিয়া। ফলে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মূলত মুরজিয়াদের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম। এ ছাড়াও ইমাম আজম তাঁর আকিদাবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে ঈমান ও ইরজা, ঈমান ও আমল ইত্যাদি সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে মুরজিয়াদের নানান ধারার সকল ভ্রান্তি খণ্ডনপূর্বক এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের বিশুদ্ধ আকিদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ইমাম আজম রহ. একদিন কুফার মসজিদে ছিলেন। তখন একব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, আপনি কি মুরজিয়া? ইমাম আবু হানিফা বললেন, “আমি আল্লাহর ‘রাজি’ (আশাবাদী)। আল্লাহ তায়ালা কুরআনেও জানিয়েছেন তাঁর বান্দাদের মাঝে কিছু ‘মুরজাআ’ (যাদের পরিণতি স্থগিত/আল্লাহর কাছে সমর্পিত) আছে। আল্লাহ বলেন, وَءَاخَرُونَ مُرْجَوْنَ لِأَمْرِ اللَّهِ إِمَّا يُعَذِّبُهُمْ وَإِمَّا يَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ , ‘আল্লাহর আদেশের প্রতীক্ষায় অন্য কিছু লোকের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকল। তিনি তাদের শাস্তি দেবেন অথবা ক্ষমা করবেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' [তাওবা : ১০৬] আল্লাহ চাইলে তাদের গুনাহের কারণে তাদের শাস্তি দিতে পারেন। আবার চাইলে নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করতে পারেন। সুতরাং আমি যদি আল্লাহর গুনাহগার বান্দাদের পরিণতি তাদের সৃষ্টিকর্তার হাতে ‘ইরজা করি’ (সঁপে দিই), তবে আমাকে নিষেধ করো না (মুরজিয়া বলো না)। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তাদের ক্ষমার ঘোষণা করেছেন, وَمَا أَصَبَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَن كَثِيرٍ , অর্থ : ‘তোমাদের উপর যেসব বিপদাপদ পতিত হয়, সেগুলো তোমাদের কর্মের ফল। উপরন্তু তিনি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন'।” [শুরা : ৩০]

আগন্তুক : খুনি ও ব্যভিচারীর ব্যাপারে আপনার মত কী? আল্লাহ কি তাকে জাহান্নামের শাস্তি দেবেন না?
ইমাম : যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে মুখে স্বীকৃতি দেয়, অন্তরে বিশ্বাস করে, পরকাল, পুনরুত্থান এবং গায়েবের প্রতি ঈমান রাখে, তবে তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে—এমন কথা বৈধ নয়। আল্লাহ চাইলে তাদের অপরাধ পরিমাণ শাস্তি দিতে পারেন; চাইলে একেবারেই শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দিতে পারেন।

আগন্তুক : চিরস্থায়ী শাস্তি দিতে কী সমস্যা?
ইমাম : কারণ, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যার অন্তরে এক দানা পরিমাণ ঈমান রয়েছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে।' রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেছেন, 'আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ার পরে আমার শাফায়াতের মাধ্যমে একদল মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।'

টিকাঃ
৮৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৪৮-১৪৯)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 দাহরিয়্যাহদের বিরুদ্ধে ইমাম

📄 দাহরিয়্যাহদের বিরুদ্ধে ইমাম


আকিদাগত বিভিন্ন বিচ্যুতি এবং বিভ্রান্ত ফিরকার বিরুদ্ধে ইমামের অব্যাহত সংগ্রামের কারণে একাধিকবার তাঁর জীবন সংকটের মাঝে পতিত হয়েছে। দাহরিয়্যাহ (বস্তুবাদী নাস্তিক) সম্প্রদায়কে তিনি কঠোরভাবে খণ্ডন করতেন; অথচ তারা সে সময় অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। তাদের সংখ্যাও অনেক বেশি ছিল। কিন্তু ইমাম তাদের শক্তি ও সংখ্যাধিক্যকে পরোয়া করতেন না। বিশুদ্ধ আকিদা প্রচার করতেন। তাদের বিভ্রান্তির মুখোশ উন্মোচন করতেন। ফলে তারা ইমামকে হত্যার সুযোগ খুঁজত। একাধিকবার তারা ইমামের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করেছে এমন ঘটনাও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে প্রমাণিত।

মক্কি বর্ণনা করেন, একদিন ইমাম তার মসজিদে একা ছিলেন। তখন একদল দাহরিয়্যিন তার উপর তরবারি ও ছুরি নিয়ে আক্রমণ করে। তারা তাকে হত্যার উপক্রম করে। তখন ইমাম তাদের বলেন, 'একটু সবর করো! আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিয়ে যা মন চায় করো।' তারা বলল, কী প্রশ্ন? তিনি বললেন, 'সে ব্যক্তির ব্যাপারে তোমাদের কী বক্তব্য যে বলে, আমি তরঙ্গোবেল সমুদ্রে একটি মালবোঝাই জাহাজ দেখেছি যেটা সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ এবং ঝোড়ো হাওয়ার মাঝেও ডানেবামে না গিয়ে সোজা ধীরস্থিরভাবে চলছে, অথচ তাতে কোনো মাঝিমাল্লা নেই, পাল-মাস্তুল নেই। এই কথা কি বিশ্বাসযোগ্য?' তারা বলল, কখনো নয়। এটা কোনো যৌক্তিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক কথা নয়। ইমাম বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! মাঝিমাল্লাবিহীন একটি নৌকা যদি সমুদ্রে সোজাভাবে চলতে না পারে, তবে এই বিশাল পৃথিবী, পৃথিবীতে বিদ্যমান এত রং ও রূপ, এত সৃষ্টি ও বৈচিত্র্য—এগুলো কোনো সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এমনিতেই অস্তিত্বে চলে এসেছে? কোনো রক্ষাকর্তা ছাড়া এমনিতেই বিদ্যমান রয়েছে?' ইমামের কথা হামলাকারীদের মনে দারুণ প্রভাব ফেলল। সকলে কাঁদতে কাঁদতে ইমামকে বলল, আপনি সত্য বলেছেন। অতঃপর তারা অস্ত্র ফেলে দিয়ে ইমামের হাতে তাদের গোমরাহি থেকে তাওবা করে ঈমানে ফিরে এলো।

টিকাঃ
৮৬. মানাকিব, মক্কি (১৫১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00