📄 খারেজিদের বিরুদ্ধে ইমাম
ভ্রান্ত আকিদা থেকে সৃষ্ট সকল অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে ইমাম আজম সবসময় সরব ছিলেন। সত্যপ্রকাশ এবং বিশুদ্ধ আকিদা প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের ক্ষেত্রে তিনি জালেমের জুলুম কিংবা শাসকের উৎপীড়নকে ভয় করতেন না। খারেজি নেতা যাহহাক ইবনে কাইস শাইবানি যখন কুফা দখল করে নিল, জামে মসজিদে ঢুকে সেখানকার পুরুষদের হত্যা এবং নারীদের বন্দি করার নির্দেশ দিলো। ইমাম আজম একটি জামা ও চাদর গায়ে জড়িয়ে মসজিদে গেলেন। যাহহাককে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আমি আপনাকে একটি কথা বলতে চাই।’ যাহহাক বলল, ‘বলুন!’ ইমাম বললেন, ‘কীসের ভিত্তিতে আপনি এসব পুরুষকে হত্যা এবং নারী-শিশুকে বন্দি করা হালাল বানিয়েছেন?’ যাহহাক বলল, ‘তারা ধর্মত্যাগী (মুরতাদ) হয়ে গিয়েছে, তাই।’ ইমাম বললেন, ‘আগে কি তাদের অন্য কোনো ধর্ম ছিল যে, ইসলাম ত্যাগ করে সে ধর্মে ফিরে গিয়েছে?’ যাহহাক বলল, ‘কী বললেন বুঝিনি! আবার বলুন।’ ইমাম আবার বললেন। যাহহাক তাঁর কথা শুনে বলল, ‘ ভুল হয়ে গেছে।’ অতঃপর তারা তরবারি কোষবদ্ধ করে চলে গেল। ইমামের বরকত ও সাহাসে কুফাবাসী রক্ষা পেল। এ কারণে কুফাবাসীকে ‘আবু হানিফার মাওয়ালি’ (আযাদকৃত দাস) বলা হতো।
কাযি আবু বকর আতিক ইবনে দাউদ খারেজিদের সঙ্গে ইমামের আরও একটি মুনাযারার কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, খারেজিরা যখন কুফা দখল করে নিল, আবু হানিফা তাদের হাতে আটক হলেন। তাদের বলা হলো, এই লোক (আবু হানিফা) এখানকার শায়খ। খারেজিরা যেহেতু তাদের প্রতিপক্ষকে কাফের মনে করত, ফলে তারা ইমামকে লক্ষ্য করে বলল, ‘শায়খ, আপনি কুফর থেকে তাওবা করুন।’ ইমাম বললেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে সকল প্রকারের কুফর থেকে তাওবা করলাম।’ তারা তাঁর পথ ছেড়ে দিলো। ইমাম চলে যাওয়ার পরে কেউ তাদের বলল, ‘তিনি কুফর বলতে আপনাদের কুফর থেকে তাওবা করেছেন।’ তখন তারা আবার তাকে ডেকে পাঠাল। ইমাম আসার পর খারেজিদের নেতা বলল, ‘শায়খ, আপনি কি আমাদের মতাদর্শকে কুফর মনে করে সেটা উদ্দেশ্য নিয়েছেন?’ ইমাম বললেন, ‘এটা তুমি ধারণা করে বললে, নাকি জেনেশুনে?’ খারেজি নেতা বলল, ‘ধারণা করে।’ ইমাম বললেন, “আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘নিঃসন্দেহে কিছু ধারণা পাপ।’ সুতরাং তুমি পাপ করেছ। আর তোমাদের কাছে পাপ হচ্ছে কুফর। অতএব, তুমি আগে কুফর থেকে তাওবা করো।’ খারেজি নেতা বলল, ‘সত্য বলেছেন। ঠিক আছে, আমি কুফর থেকে তাওবা করছি। আপনিও তাওবা করুন।’ ইমাম বললেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে সকল প্রকারের কুফর থেকে তাওবা করছি।’ তারা ইমামকে ছেড়ে দিলো।
ইমামপুত্র হাম্মাদ বর্ণনা করেন, যখন খারেজি সম্প্রদায় জানতে পারে ইমাম আবু হানিফা গুনাহের কারণে কোনো মুসলমানকে কাফের বলেন না, তখন তাদের সত্তর জন লোকের একটি দল কুফায় আসে। ইমামের আশেপাশে তখন অনেক ছাত্র ছিল। তারা তাকে ঘিরে রাখে। খারেজিরা ইমামকে লক্ষ্য করে বলল, আবু হানিফা, আমরা সবাই এক মিল্লাতের অনুসারী। লোকদের দূরে সরে যেতে বলুন। তিনি সবাইকে সরে যেতে বললেন। খারেজিরা ইমামের মাথার কাছে এসে তরবারি খুলে দাঁড়াল। অতঃপর তাকে লক্ষ্য করে বলল, হে আবু হানিফা, হে উম্মাহর দুশমন! তাদের কেউ কেউ বলল, হে উম্মাহর শয়তান! তোমাকে হত্যা করা আমাদের প্রত্যেকের কাছে সত্তর বছর জিহাদ করার চেয়ে উত্তম। কিন্তু আমরা তোমার উপর জুলুম করতে চাই না। ইমাম তাদের বললেন, ‘তাহলে কি ইনসাফ করতে চাও?’ তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘তবে সবার আগে তরবারি কোষবদ্ধ করো।’ তারা বলল, সেটা সম্ভব নয়। তোমার রক্ত দিয়ে আমরা এগুলো সিক্ত করতে চাই। ইমাম বললেন, ‘তবে আল্লাহর নাম নিয়ে কথা শুরু করো।’ তারা বলল, ধরুন মসজিদের দরজায় দুটো জানাযা আছে; একটা হলো পুরুষ লোকের, যে মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান করে মারা গিয়েছে। আরেকটা এক নারীর, যে ব্যভিচারের মাধ্যমে গর্ভবতী হওয়ার পর আত্মহত্যা করেছে। তাদের দুজনের বিধান কী? ইমাম বললেন, ‘তাদের দুজন কি ইহুদি ছিল?’ তারা বলল, না। ইমাম বললেন, ‘খ্রিষ্টান ছিল?’ তারা বলল, না। ইমাম বললেন, ‘অগ্নিপূজক ছিল?’ তারা বলল, না। ইমাম বললেন, ‘তাহলে তারা কোন ধর্মের ছিল?’ তারা বলল, যে ধর্ম বলে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনা ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (স) তাঁর বান্দা ও রাসুল। ইমাম বললেন, ‘তবে এবার আমাকে বলো, এই সাক্ষ্য ঈমানের কতটুকু অংশ? অর্ধেক নাকি এক- তৃতীয়াংশ অথবা এক-চতুর্থংশ?’ তারা বলল, ঈমানের মাঝে কোনো বিভাজন হয় না। তিনি বললেন, ‘তাহলে এই সাক্ষ্য ঈমানের কতটুকু অংশ?’ তারা বলল, এটাই পূর্ণ ঈমান। তিনি বললেন, ‘তোমরা নিজের মুখেই স্বীকার করেছ তারা দুজন মুমিন ছিল। তাহলে আবার এমন প্রশ্ন কেন?’ তারা বলল, এসব বাদ দিন। আমরা জানতে চাচ্ছি তারা জান্নাতি নাকি জাহান্নামি? ইমাম বললেন, ‘এটা তো আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। যদি বলতেই হয়, তবে আমি তাদের ব্যাপারে সে কথা বলব, যা আল্লাহর নবি নুহ আ. তাদের চেয়েও অধিক অপরাধী সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলেছিলেন, وَقَالَ وَمَا عِلْمِي بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ অর্থ : ‘নুহ বললেন, তারা কী কাজ করত আমি কীভাবে বলব?’ [শুরা : ১১২] যেমনটা আল্লাহর খলিল ইবরাহিম আ. তাদের দুজনের চেয়ে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধী সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলেছিলেন, رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيْرًا مِّنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّى وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক, এরা অনেক মানুষকে বিপথগামী করেছে। অতএব, যে আমার অনুসরণ করে, সে আমার দলভুক্ত; আর যে আমার অবাধ্য হলো, নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।’ [ইবরাহিম : ৩৬] যেমনটা ঈসা ইবনে মারইয়াম তাদের দুজনের চেয়ে গর্হিত অপরাধে নিমজ্জিত সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলেছিলেন, إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ অর্থ : ‘যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন, তবে তারা তো আপনারই বান্দা। আর যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ [মায়িদা : ১১৮] আমি সে কথা বলব যা অবতীর্ণ হয়েছিল আমাদের নবি মুহাম্মাদ (স)-এর উপর : وَلَا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ إِنِي مَلَكٌ وَلَا أَقُولُ لِلَّذِينَ تَزْدَرِي أَعْيُنُكُمْ لَن يُؤْتِيَهُمُ اللَّهُ خَيْرًا اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا فِي أَنفُسِهِمْ إِنِّي إِذًا لَّمِنَ الظَّالِمِينَ অর্থ : ‘আর আমি তোমাদের বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ধনভান্ডার রয়েছে। এ কথাও বলি না যে, আমি গায়েব তথা অদৃশ্যের সংবাদ জানি। এ কথাও বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা। আর আমি এ কথা বলি না যে, তোমাদের দৃষ্টিতে যারা ক্ষুদ্র-নগণ্য, আল্লাহ তাদের কোনো কল্যাণ দান করবেন না। তাদের মনের কথা আল্লাহ ভালো করেই জানেন। সুতরাং এমন কথা বললে আমি অন্যায়কারী হব।’ [হুদ : ৩১] ইমামের এসব কথা শুনে তারা বলল, আমাদের মুক্ত করলেন। আল্লাহ আপনাকেও মুক্ত করুন। আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তাঁর কাছে আমাদের সকল বিভ্রান্তি থেকে তাওবা করছি। অতঃপর তারা খারেজি মতাদর্শ ত্যাগ করে আহলে সুন্নাতের অনুসারী হয়ে গেল।
খারেজিরা আলি ও মুআবিয়া রাযি.-সহ সিফফিনের ‘তাহকিম’ [সালিশ নিয়োগ]-এর ঘটনার সঙ্গে জড়িত সাহাবাদের কাফের মনে করত। তাদের সমর্থন করার কারণে আহলে সুন্নাতকেও তারা বিভ্রান্ত ও কাফের আখ্যা দিত। খারেজিরা যখন কুফা দখল করে নিল, তখন ইমামকে তাওবা করতে বলল। ইমাম বললেন, ‘কীসের তাওবা?’ তারা বলল, আলি ও মুআবিয়ার ব্যাপারে সন্তুষ্টি থেকে তাওবা। তিনি বললেন, ‘তোমরা আমার সঙ্গে মুনাযারা করবে?’ তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘যদি কোনো বিষয়ে আমাদের দ্বিমত হয়, তবে সেটা কে নিরসন করবে?’ তারা তাদের একজনকে দেখিয়ে বলল, অমুক। ইমাম বললেন, ‘তাকে আমাদের মাঝে মীমাংসাকারী হিসেবে তোমরা রাজি?’ তারা বলল, হ্যাঁ। ইমাম বললেন, “এই তোমরাও তো ‘তাহকিম’-এর সমর্থক।” (অর্থাৎ আলি ও মুআবিয়াকে যে কারণে তোমরা কাফের মনে করো, একই কারণ তো তোমাদের মাঝেও বিদ্যমান!) তখন তারা চুপ হয়ে গেল।
টিকাঃ
৭২. দেখুন: মানাকিব, মক্কি (১৪৯)।
৭৩. প্রাগুক্ত (১৪৯)।
৭৪. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১১৫-১১৬)। মানাকিব, মক্কি (১০৮-১০৯)। বাযযাযি (১৮১-১৮২)।
৭৫. আল-ইনতিকা (৩০৭)।
📄 কাদারিয়্যাহদের বিরুদ্ধে ইমাম
বাশশার ইবনে কিরাত বর্ণনা করেন, একবার কুফায় কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায়ের সত্তর জন ফকিহ আগমন করেন। তারা কুফার মসজিদে তাকদির বিষয়ে কথা বলেন। আবু হানিফা রহ.-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বলেন, ‘গোমরাহি প্রচার করতে এসেছে।’ আবু হানিফা রহ.-এর এ মন্তব্য শুনে তারা তাঁর কাছে এসে বলল, আমরা আপনার সঙ্গে মুনাযারা করতে চাই। তিনি বললেন, ‘কী বিষয়ে?’ তারা বলল, তাকদির বিষয়ে। ইমাম বললেন, ‘তোমরা কি জানো তাকদিরের দিকে তাকানো কিয়ামতের সূর্যের দিকে তাকানোর মতো—যতই সেদিকে তাকাবে, ততই অস্থিরতা বাড়বে?’ তারা (কৌশলের আশ্রয় নিয়ে) বলল, তাহলে আল্লাহর ফয়সালা ও ইনসাফ (কাযা ও আদল) নিয়ে বিতর্ক করব। ইমাম বললেন, ‘ঠিক আছে, আল্লাহর নামে শুরু করো।’
কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় : কোনো মানুষের আল্লাহর দুনিয়ায় তাঁর ফয়সালার বাইরে কিছু করার সাধ্য আছে? (তাহলে কাফেরদের দোষ কী?)
ইমাম : না। তবে ফয়সালা দুই প্রকার। একটা হলো ওহির নির্দেশ তথা অপার্থিব, আরেকটা হলো পার্থিব। পার্থিব নির্দেশ চূড়ান্তরূপে বাস্তবায়িত হয়। বিপরীতে ওহির নির্দেশ। এখানেও আল্লাহর ফয়সালা আছে (কিন্তু তিনি এক্ষেত্রে মানুষকে স্বাধীনতা দেন)। ফলে তিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে কুফরের ফয়সালা করেন, কিন্তু সেটার নির্দেশ দেন না; বরং উলটো নিষেধ করেন (ফলে মানুষ নিজ ইচ্ছামতো ঈমান ও কুফর বেছে নিতে পারে)।
কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় : আল্লাহর নির্দেশ কি তাঁর ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি সাংঘর্ষিক?
ইমাম : আল্লাহর নির্দেশ তাঁর ইচ্ছার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ইচ্ছা নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত নয় (অর্থাৎ, যখন নির্দেশ দেন, তখন নিজের ইচ্ছাতেই দেন। কিন্তু নির্দেশ দিলেই সেটা বাস্তবায়নের ইচ্ছা করবেন, সেটা জরুরি নয়। ফলে নির্দেশ দেওয়ার পরও কোনোটা বাস্তবায়িত নাও হতে পারে)। যেমন-ইবরাহিম আ.-এর ব্যাপারে আল্লাহর বক্তব্য : ﴿فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَبُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَابَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّبِرِينَ﴾ অর্থ : “এরপর সে যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম বলল, ‘বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী, বলো।’ সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন’।” [সাফফাত : ১০২] এখানে না চাইলেও ধৈর্যশীল হবেন এমন কথা বলেননি। কারণ, এটা তাঁর নির্দেশ (আর ইচ্ছা নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত নয়)। যেহেতু তার যবাই হওয়া আল্লাহর ইচ্ছা ছিল না, তাই তাকে যবাই হতে হয়নি।
কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় : ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَرَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُم بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِؤُنَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن قَبْلُ قَتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ
ইহুদিরা বলে উযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে মসিহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মতো কথা বলে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন। কোন উলটো পথে যাচ্ছে তারা?’ [তাওবা : ৩০] আল্লাহ কি নিজের ব্যাপারে চেয়েছেন যে, তাকে গালি দেওয়া হবে অথবা তার জন্য স্ত্রী ও সন্তান নির্ধারণ করা হবে?
ইমাম : আল্লাহ নিজের উপর কোনো ফয়সালা করেন না, বরং বান্দাদের উপর ফয়সালা করেন। নিজের উপর ফয়সালা করলে তিনি নিজেও তাকদিরের ভিতরে পড়ে যান (অর্থাৎ, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা নিজেদের জন্য আল্লাহর সমালোচনাকে বেছে নিয়েছে, তখন আল্লাহ তাদের ব্যাপারে উক্ত ফয়সালা দিয়েছেন, অর্থাৎ সমালোচনার সুযোগ ও ক্ষমতা দিয়েছেন। নিজ থেকে নিজের বিরুদ্ধে তাদের সমালোচনার নির্দেশ ও তৌফিক দিয়েছেন-এমন নয়)।
কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় : আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কাছ থেকে কুফর চান, তিনি কি তার প্রতি ইনসাফ করলেন, নাকি জুলুম করলেন?
ইমাম : নির্দেশের বিরোধিতার নাম জুলুম। আল্লাহ এটা থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি বান্দাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাদের কাছ থেকে ঈমান চান (অর্থাৎ, আল্লাহ বান্দাদের থেকে ঈমান চান, তাদের ঈমানের নির্দেশ দেন। ফলে আল্লাহ ইনসাফগার। বিপরীতে মানুষ নিজে কুফর বেছে নিয়ে আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতা করে। ফলে মানুষ নিজে জালেম)।
কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় : আবু হানিফা, আপনি কি মুমিন?
ইমাম : আলবত।
কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় : আপনি কি আল্লাহর কাছেও মুমিন?
ইমাম : তোমরা কি আমার জানার থাকা কথা জানতে চাইছ, নাকি আল্লাহর কাছে যেটা আছে সেটা?
কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় : আপনার যেটা জানা সেটা বলুন, আল্লাহরটা না।
ইমাম : আমি যেটা জানি সেটা হলো আমি মুমিন। আল্লাহর কাছে কী আছে সেটা আমার জানা দরকার নেই (অর্থাৎ, পরিণতির ব্যাপারে আল্লাহর প্রতি সদিচ্ছা রেখে নিজের দায়িত্ব নিজে পালন করে যাওয়া মুমিনের কাজ)।
কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় : আবু হানিফা, কত দিন পর্যন্ত মানুষকে গোমরাহ করতে থাকবেন?
ইমাম : গোমরাহ তিনিই করতে পারেন, যিনি হেদায়াত দিতে পারেন। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন, যাকে ইচ্ছা গোমরাহ করেন।
আলি ইবনে হারমালা এবং ইমামপুত্র হাম্মাদ বর্ণনা করেন, (কাদারিয়্যাত সম্প্রদায়ের নেতা) গায়লান দিমাশকির এক শাগরেদ শাম থেকে কুফায় এলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল আবু হানিফা রহ.-এর সঙ্গে তাকদির বিষয়ে বিতর্ক করা। ইমাম তাকে বললেন, তোমার প্রশ্ন উত্থাপন করো।
আগন্তুক বললেন : আল্লাহ তায়ালা ফিরাউনের জন্য কী চেয়েছেন?
ইমাম : আল্লাহ তার জন্য কুফর চেয়েছেন।
আগন্তুক : ইবলিস ফিরাউনের জন্য কী চেয়েছে?
ইমাম : ইবলিস তার জন্য কুফর চেয়েছে।
আগন্তুক : ফিরাউন নিজের জন্য কী চেয়েছে?
ইমাম : সে নিজের জন্য কুফর চেয়েছে।
আগন্তুক : মুসা আ. ফিরাউনের জন্য কী চেয়েছেন?
ইমাম : মুসা আ. তার জন্য ঈমান চেয়েছেন।
আগন্তুক : তাহলে কি মুসার চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, আর ইবলিসের চাওয়া আল্লাহর চাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে গেল না? কারণ, আল্লাহ কুফর চেয়েছেন, ইবলিসও কুফর চেয়েছে; অথচ মুসা আল্লাহর চাওয়ার বিরুদ্ধে গিয়ে তার জন্য ঈমান চেয়েছেন!
ইমাম : না। কারণ, আল্লাহ ফিরাউনের জন্য কুফর চেয়েছেন। ইবলিসের জন্য চেয়েছেন সে যেন ফিরাউনের জন্য কুফর চায়। ফিরাউনের জন্য চেয়েছেন সে যেন নিজের জন্য কুফর চায়। আর মুসার জন্য চেয়েছেন তিনি যেন ফিরাউনের জন্য ঈমান চান। ফলে ইবলিসের চাওয়া, ফিরাউনের চাওয়া এবং মুসার চাওয়া- সবগুলো আল্লাহর চাওয়ার অধীনে।
আগন্তুক : (ইমামের জবাব শুনে হতভম্ব হয়ে) আল্লাহ মুসলমানদের জন্য আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। আমার অতীতের বক্তব্য থেকে তাওবা করছি। কিন্তু আমার প্রকৃত তাওবা কীভাবে হবে? ইমাম বললেন, ‘তোমার তাওবা হলো, শামে ফিরে গিয়ে যাদের এতদিন বিভ্রান্ত করেছ, তাদের হেদায়াতের পথে ফিরিয়ে আনবে।’ তখন লোকটি তাওবা করে শামে ফিরে গেল। সেখানকার বিভ্রান্ত লোকদের মাঝে দাওয়াত ও মুনাযারার কাজ করতে লাগল। একসময় অনেক লোক তার হাত ধরে সুন্নাহর পথে ফিরে এলো।
টিকাঃ
৭৬. আল-ইনতিকা (৩১৫-৩১৭)।
৭৭. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১২২)। তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৪৩-৭৪৪)। কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় মূলত আল্লাহ কর্তৃক মানুষের জন্য নির্ধারিত তাকদিরকে অস্বীকার করত। ফলে ইমাম তাদের এভাবে জবাব দিয়েছেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা তাকদিরের উপর ঈমান অধ্যায়ে দেখুন।
📄 মুতারিলাদের বিরুদ্ধে ইমাম
মুতাযিলাদের বিভিন্ন সংশয় ও বিভ্রান্তি নিরসনেও ইমামের ভূমিকা ছিল সরব। তাদের সঙ্গে তিনি মুনাযারা করতেন, তাদের খণ্ডন করতেন। একবার মুতাযিলা ফিরকার প্রতিষ্ঠাতা আমর ইবনে উবাইদ ইমাম আজম রহ.-এর কাছে এসে প্রশ্ন করল :
আমর : মানুষের কর্মের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
ইমাম : আল্লাহর সৃষ্টি, বান্দার কামাই।
আমর : তাহলে বান্দা যা করে না, আল্লাহ সেটা সৃষ্টি করেন না?
ইমাম : এভাবে বলা যাবে না; বরং এভাবে বলতে হবে—আল্লাহ সৃষ্টি করেন, বান্দা কর্ম করে। কারণ, আল্লাহ মানুষের কর্মেরও সৃষ্টিকর্তা।
আমর : এটা তো যৌক্তিক কথা হলো না।
ইমাম : বরং এটাই যৌক্তিক। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির মৃত্যুদানকে কখনো নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন, তিনি বলেন, ﴿اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا ﴾ অর্থ : ‘আল্লাহই প্রাণ হরণ করেন জীবসমূহের তাদের মৃত্যুর সময়।’ [যুমার : ৪২] কখনো একজন মৃত্যুর ফেরেশতার দিকে সম্পৃক্ত করেছেন : ﴿ قُلْ يَتَوَفَّكُمْ ﴾ مَلَكُ الْمَوْতِ الَّذِي وُكَّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ تُرْجَعُوْনَ অর্থ: ‘বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে।’ [সাজদা : ১১] আবার কখনো একাধিক ফেরেশতার দিকে সম্পৃক্ত করেছেন: ﴿ وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ، وَيُرْسِلُ عَلَيْكُمْ حَفَظَةً حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْত تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ ) তিনি স্বীয় বান্দাদের উপর পরাক্রমশালী, আর তিনিই তোমাদের জন্য রক্ষক প্রেরণ করেন। অবশেষে যখন তোমাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন আমার প্রেরিতরা তার মৃত্যু ঘটায়, আর তারা কোনো ত্রুটি করে না।’ [আনআম: ৬১] এই সম্পৃক্ততা দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে। একইভাবে আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে বলেন, ﴿ فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى) হত্যা করোনি, আল্লাহই তাদের হত্যা করেছেন। (হে রাসুল) আপনি যখন নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি, আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন।’ [আনফাল : ১৭] এখানেও আল্লাহ তায়ালা হত্যাকে কখনো নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। এটা সৃষ্টি হিসেবে। কিন্তু মূল কাজ মানুষই করেছে। একইভাবে নিক্ষেপটা সৃষ্টি হিসেবে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। নতুবা এটা করেছেন রাসুলুল্লাহ নিজেই। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা নেই। সুতরাং যে আল্লাহর গুণকে সৃষ্টির উপর প্রয়োগ করল, সে যেন আল্লাহর সঙ্গে শিরক করল! পৃথিবীতে অসংখ্য উপাস্য বানাল!
ইমামের এ কথা শুনে আমর নীরবে উঠে চলে গেল।
মুতাযিলাদের বিভিন্ন কুতর্কের ব্যাপারে ইমাম ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। তাকে ‘জিসম’ (দেহ) ও ‘আরাজ’ (অমৌল; রূপ-রং) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘আমর ইবনে উবাইদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। সে মুসলমানদের উপর এটা নিয়ে বিতর্কের দরজা উন্মুক্ত করেছে।’
নুহ আল-জামি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হানিফাকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘জিসম’, ‘আরাজ’ ইত্যাদি নিয়ে মানুষ যেসব নতুন কথা শুরু করেছে, সে ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী? তিনি বললেন, “এগুলো দার্শনিকদের কথা। ‘আসার’ তথা সুন্নাত ও সালাফের অনুসরণ করো। প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, সেগুলো বিদআত।”
টিকাঃ
৭৮. তালখিসুল আদিল্লাহ (৬৬৫-৬৬৬)।
৭৯. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/২৬১-২৬২)। শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৩৪-৩৫)।
৮০. যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি (৫/২০৭)।
📄 শিয়াদের বিরুদ্ধে ইমাম
অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও ইমাম আজম রহ. সংগ্রাম করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে মুনাযারা করেছেন। বিশেষত কুফায় বসবাসকারী শিয়া নেতা মুহাম্মাদ ইবনে আলি আল-বাজালির সঙ্গে তিনি একাধিকবার বিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং তাকে পরাস্ত করে আহলে সুন্নাতের আকিদার বিজয়-নিশান উড়িয়েছেন।
শানে সাহাবার ইজ্জত-আবরু রক্ষার ক্ষেত্রেও রাফেযিদের বিরুদ্ধে ইমামের সংগ্রাম প্রসিদ্ধ। ইয়াহইয়া ইবনে নসর ইবনে হাজেব মারওয়াযি বলেন, ‘ইমাম আজম রাসুলুল্লাহর সাহাবাদের প্রতি সর্বাপেক্ষা শ্রদ্ধাশীল (মুআদ্দাব) ছিলেন। তাদের ব্যাপারে সর্বোত্তম কথা বলতেন।’ ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাহাবিবিদ্বেষী রাফেযিদের তিনি অপছন্দ করতেন। তাদের সাহাবাবিদ্বেষী মতাদর্শকে ঘৃণা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক থেকে বর্ণিত, নুহ ইবনে আবি মারইয়াম ইমামকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করব? তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক ইনসাফগার সত্যে অবিচল (আদল) ব্যক্তির কাছ থেকে গ্রহণ করো। তবে রাফেযিদের কাছ থেকে গ্রহণ করো না। কেননা, তাদের মাযহাবের ভিত্তিই হচ্ছে নবিজির সাহাবাদের গোমরাহ বলা। আবু বকর ও উমরকে শ্রেষ্ঠ বলো। আলি ও উসমানকে ভালোবাসো। তাদের যে ভালো না বাসে, তার থেকে হাদিস গ্রহণ করো না।’
ইমাম রাফেযিদের খণ্ডনে আরও বলেন, ‘খাদিজাতুল কুবরার পরে আয়েশা রাযি. জগতের নারীদের ভিতরে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি মুমিনদের মাতা (উম্মুল মুমিনিন)। ব্যভিচার থেকে পূত-পবিত্র। রাফেযিদের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি তাকে কেউ ব্যভিচারিণী বলে, তবে সে নিজে ব্যভিচারের ফসল (হারামজাদা)।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সাহাবা-সংক্রান্ত আকিদা অধ্যায়ে আসবে, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
৮১. দেখুন: মিনহাজুস সুন্নাহ (৮/১৯৮)।
৮২. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৫৭)।
৮৩. প্রাগুক্ত (১৫৮)।
৮৪. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৬১)।